গৃহযুদ্ধের সময় একবার লিঙ্কনের বন্ধুরা যখন তার শত্রুদের নিন্দা করছিলেন লিঙ্কন বলেন : সম্ভবতঃ আপনাদের মত আমার ব্যক্তিগত শত্রুতা নেই। খুব সম্ভবত আমার অতটা নেই, আর মনে হয় এতে ফল ভালো হয় না। একজন লোকের জীবনের অর্ধেক সময় ঝগড়া করে কাটানোর দরকার নেই। কেউ আমায় আক্রমণ করা বন্ধ করলে আমি তার অতীত নিয়ে কখনই ভাবি না।
আমার এক পিসিমা আছেন, তাঁর নাম এডিথ পিসিমা। পিসিমার যদি লিঙ্কনের মত ক্ষমাশীল মন থাকতো তাহলে বড় ভালো হত। তিনি ও ফ্রাঙ্ক পিসেমশাই একটা খামারে থাকতেন। খামারটা বাঁধা দেওয়া ছিল এবং সেখানকার মাটিও খারাপ আর আগাছায় ভর্তি থাকতো। পিসিমা কিছু পর্দা ধার করে এনে বাড়িটা সাজাতে চেয়েছিলেন । ফ্রাঙ্ক পিসেমশাই ধার ভালোবাসতেন না। ধার সম্পর্কে তাঁর কৃষক সুলভ ভীতি ছিল, তাই তিনি দোকানীকে বলে দেন এডিথ পিসিমাকে যেন ধার না দেওয়া হয় । পিসিমা সেকথা জানতে পেরে চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় করেন। আর আশ্চর্য ব্যাপার ওই ঘটনার পঞ্চাশ বছর পরেও পিসিমা চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় করতেন। গল্পটা তিনি বহুবার আমাদের শুনিয়েছেন। এডিথ পিসিমার পিসেমশাই যখন সত্তর বছর বয়স তখন আমি বলেছিলাম : এডিথ পিসি, পিসেমশাই অন্যায় করেছেন ঠিকই কিন্তু পঞ্চাশ বছর পরে চেঁচিয়ে কোন লাভ আছে?
এডিথ পিসিকে এর জন্য ঢের দামও দিতে হয়। সারা জীবন তিক্ত অভিজ্ঞতা বয়ে বেড়াতে হয়। তাঁর মনের শান্তিও তাতে নষ্ট হয়।
বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের যখন সাত বছর বয়স তখন তিনি এমন একটা ভুল করেন, যেটা সত্তর বছর ধরে মনে রেখেছিলেন। সাত বছর বয়সে একটা বাঁশিকে ভালোবেসে ফেললেন । তিনি এতই উত্তেজিত হলেন যে একটা খেলনার দোকানে গিয়ে জমানো সব পয়সা ঢেলে একটা বাঁশি কিনে ফেললেন। বাঁশির দাম জানা ইচ্ছেও হলো না। তিনি সত্তর বছর পরে এক বন্ধুকে লেখেন, এরপর যখন বাড়ি ফিরে এলাম বাঁশিটা বাজিয়ে আনন্দে সারা বাড়ি মাতিয়ে রাখলাম। তারপর আমার দাদা দিদিরা যখন টিটকিরি দিয়ে বললেন বাঁশিটার জন্য অনেক বেশি দাম দিয়েছি তখন দুঃখে কেঁদে ভাসালাম।
.
বহু বছর পরে ফ্রাঙ্কলিন যখন বিশ্ব বিখ্যাত হন আর ফ্রান্সে আমেরিকার রাষ্ট্রদূত তখনও তিনি মনে রেখেছিলেন বাঁশির জন্য বেশি দাম দিয়েছিলেন আর সেটা তাকে আনন্দের চেয়ে দুঃখই দিয়েছিল।
তবে এর মধ্য দিয়ে যে শিক্ষা ফ্রাঙ্কলিন পেয়েছিলেন তাতে তাঁর উপকারই হয়। তিনি তাই লিখেছিলেন, আমার বয়স বাড়লে যখন মানুষের ব্যবহার লক্ষ্য করলাম, তখন দেখলাম এমন বহু মানুষই আমার চেনা যারা তাদের বাঁশির জন্য বেশি দাম নিয়েছে। সংক্ষেপে বলতে গেলে বলতে হয় মানুসের দুঃখের একটা বড় কারণ হল তারা জিনিসগুলোর আসল দাম বুঝতে পারে না অথচ তারা তাদের বাঁশির জন্য বেশি দাম দেয়।
গিলবার্ট আর সুলিভান তাদের বাঁশির জন্য ঢের দাম দিয়েছিলেন। এডিথ পিসিমাও তাই। এমন কি ডেল কার্নেগীও বহু সময় তাই করে। আর সেই রকম করেন অমর সাহিত্যিক লেভ টলস্টয় যিনি দুটি বিখ্যাত উপন্যাস– ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ এবং ‘আনা কারেনিনা’ লিখেছিলেন। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রটানিকার মতানুযায়ী লিও টলষ্টয় তার শেষ ত্রিশ বছরের জীবনে পৃথিবীতে সবচেয়ে শ্রদ্ধাস্পদ মানুষ ছিলেন। তাঁর মত্যর বিশ বছর আগে–১৮৯০ থেকে ১৯১০ পর্যন্ত তার বাড়িতে তাঁথযাত্রাদের মত লোক সমাগম ঘটত। তারা একবারের জন্য অন্তত তাকে চোখের দেখা দেখতে বা তার কথা শুনতে বা তার পোশাকের প্রান্ত স্পর্শ করতে চাইতো। তিনি যা বলতেন তার সবটাই নোটবইয়ে লিখে নেওয়া হত যেন তা ঐশ্বরীক বাণী । কিন্তু সাধারণ জীবন সম্বন্ধে টলষ্টয় একেবারে অজ্ঞ ছিলেন। ফ্রাঙ্কলিনের সাত বছর বয়সে যে জ্ঞান ছিল তার সত্তর বছর বয়সেও তা ছিল না! আসলে এসম্বন্ধে তাঁর কোন জ্ঞানই ছিলো না।
যা বলতে চাই তা এই রকম। টলস্টয় যে মেয়েটিকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন তাকেই বিয়ে করেন। আসলে তারা এতই সুখী ছিলেন যে তাঁরা হাঁটু গেড়ে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা জানাতেন যেন তাদের এ সুখ চিরস্থায়ী হয়। কিন্তু টলষ্টয় যে মেয়েটিকে বিয়ে করেন তিনি একটু ঈর্ষাপরায়ণা ছিলেন । তিনি চাষী রমণীর পোশাক পরে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে টলস্টয়ের উপর গোয়েন্দাগিরি চালাতেন। তাদের প্রচণ্ড ঝগড়া হত। তাঁর স্ত্রী এতই ঈর্ষা কাতর ছিলেন যে নিজের ছেলেমেয়েদের প্রতিও ঈর্ষা প্রকাশ করতেন। একবার বন্দুক নিয়ে মেয়ের ছবি গুলিতে ফুটো করে দেন। একবার এক বোতল আফিম ঠোঁটের সামনে ধরে তিনি মাটিতে গড়াগড়ি খেয়ে আত্মহত্যা করবেন বলে ভয় দেখিয়ে ছিলেন। তখন তার ছেলেমেয়েরা ভয়ে এক কোনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে চলেছিল।
টলস্টয় তখন কি করতেন? ভদ্রলোক রাগে সব আসবাবপত্র ভেঙে ফেলেন বলে সেজন্য তার উপর রাগ করতে পারছি না সত্যিই রাগের কারণ ছিল। কিন্তু টলষ্টয় আরও খারাপ কাজ করেন। তিনি গোপনে একটা ডায়েরী লিখতেন। হ্যাঁ, সেই ডায়েরীতে সব দোষ তিনি তার স্ত্রীর উপর চাপিয়েছিলেন। ওই ডায়েরী ছিল তার বাঁশি? তিনি ঠিক করেছিলেন পরবর্তী বংশধরদের জানিয়ে দেবেন দোষ তার নয়, তারা যাতে তাঁকে মার্জনা করে সব দোষ তাঁর স্ত্রীর বুঝতে পারে। এটা দেখে তাঁর স্ত্রী কি করেছিলেন শুনুন। তার স্ত্রী রাগে ডায়েরীর সব পাতা ছিঁড়ে আগুন ধরিয়ে দেন আর নিজেও একখানা ডায়েরী লিখতে শুরু করেন এবং তাতে স্বামীকে একটা শয়তানের রূপ দেন। তিনি এ ছাড়া একটা উপন্যাসও লেখেন তার নাম দেন কার দোষ? ওই উপন্যাসে স্বামীকে তিনি গৃহের দানব বিশেষ আর নিজেকে একজন শহীদ হিসেবে চিত্রিত করেন।
