আমি জানতাম আমি প্রায় অন্ধকারে ঢিল ছুড়ছিলাম। আমাকে নির্ভরশীল থাকতে হচ্ছিল কিছুটা ভাগ্য আর অন্য লোকের মনের উপর।
আমি আমার ভুল সম্পর্কে ভাবলাম আর ঠিক করলাম আবার কাজে নামার আগে সব ব্যাপারটা যাচাই করবো। তাই শেষ পর্যন্ত ফাটকাবাজারের সবচেয়ে বিখ্যাত মানুষ বার্টন এন. ক্যাসেলকে খুঁজে বের করে পরিচয় করলাম। আমি ভাবলাম ভদ্রলোক দীর্ঘকাল ফাটকাবাজারে ভাগ্যের জোরে জেতেননি। তাই তাঁর সব কৌশল আমার জানতে ইচ্ছে হল ।
তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন আমি আগে কেমনভাবে কারবার করেছি–তা শোনার পর তিনি আমায় চমকার একটা পরামর্শ দিলেন। তিনি বলেন, বাজারে টাকা ছাড়লে আমি সব সময়েই বলে দিই ক্ষতি বন্ধ করতে। ধরা যাক আমি পঞ্চাশ ডলারের কোন শেয়ার কিনতে হলে বলে দিই শেয়ারের দাম পয়তাল্লিশ ডলার হলেই তা বিক্রি করে দিতে হবে। এতে ক্ষতি হবে মাত্র পাঁচ ডলার।
প্রথমেই যদি আপনি চিন্তা করে শেয়ার কেনেন তাহলে আপনার লাভ হবে গড়পড়তা দশ, পঁচিশ বা পঞ্চাশ পয়েন্টই। ক্ষতিকে যদি পাঁচ পয়েন্টের মধ্যেই রাখা যায় তাহলেও প্রচুর লাভ করা যাবে।
আমি সঙ্গে সঙ্গেই ওই কৌশল কাজে লাগালাম। এর ফলে আমার হাজার হাজার ডলার লাভ হয়েছে।
কিছুদিন পরে টের পেলাম ওই ‘ক্ষতি–বন্ধ’ ব্যাপারটা কেবল স্টক মার্কেট ছাড়াও অন্যান্য ব্যাপারেও কাজে লাগানো যায়। আমি এরপর অর্থনৈতিক ব্যাপার ছাড়া অন্যান্য দুশ্চিন্তাতেও এটা কাজে লাগাই। এতে যাদুর মত কাজ হয়েছে।
একটা উদাহরণ দিই। আমি প্রায়ই এক বন্ধুর সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ সমাধা করতাম। বন্ধু প্রায়ই মধ্যাহ্নভোজ অর্ধেক শেষ হবার মুখে দেরী করে আসতেন। শেষ পর্যন্ত আমি সেই ক্ষতি–বন্ধ নীতি কাজে লাগালাম। তাকে বললাম, ভাই, বিল, আমি তোমাকে ঠিক দশ মিনিট সময় দেব। দশ মিনিট পরে এলে আমাকে আর পাচ্ছেনা।
ওহ্! কেন যে এ কথাটা আগে ভাবিনি। এই ক্ষতিবন্ধ নিয়মের ফলে আমার অধৈর্য ভাব, মেজাজ, অনুশোচনা ইত্যাদি সব মানসিক ব্যাপারে কত সুবিধেই না হত । আমার যখন সব শান্তি নষ্ট হয়েছে তখন কেন যে অবস্থা বুঝে নিজেকে বলিনিঃ ওহে, ডেল কার্নেগী, এ ব্যাপারে ঠিক এতোটাই সময় নষ্ট করা চলতে পারে, তার বেশি নয়…। কেন যে তা করিনি?
যাই হোক, অন্ততঃ একবার নিজের বুদ্ধির জন্য নিজেকে তারিফ করতে পেরেছি। আর ব্যাপারটা অত্যন্ত মারাত্মকই ছিল–সেটা আমার জীবনের একটা সঙ্কটকাল। তখন আমি আমার বহু বছরের কাজ ও স্বপ্নকে ধুলিসাৎ হতে দেখেছি। এটা হয় এইভাবে। আমার ত্রিশ বছরের কাছাকাছি বয়সে আমি উপন্যাস লিখে জীবন কাটার ভেবেছিলাম । আমি হতে চাইছিলাম দ্বিতীয় ফ্রাঙ্ক নরিস, বা জ্যাক লণ্ডন বা টমাস হার্ডি হতে। আমার এমনই আগ্রহ ছিল যে দুবছর ধরে, যুদ্ধের পরবর্তীকালে ইউরোপে থেকে সস্তায় বই লিখে কাটালাম। বিরাট একখানা বই–নাম দিই তুষার ঝড়। নামটা পছন্দসই হয়েছিল বলাই বাহুল্য, কারণ প্রকাশকদের কাছে সেটা বেশ ঠাণ্ডা অভ্যর্থনাই পায়। এমন তুষার মাখা ঠাণ্ডা যে বোধ হয় ডাকোটা রাজ্যেও কেউ দেখেনি। আমার প্রকাশক তখন বললেন লেখাটা কিছুই হয়নি অর্থাৎ আমার কোন সাহিত্যিক গুণ নেই– অন্ততঃ উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রে। এই কথা শোনার পর আমার হৃৎপিন্ড প্রায় থমকে যায়। একটা ঘোরের মধ্য দিয়েই আমি অফিসের বাইরে এসেছিলাম। আমায় তিনি যদি একটা ডান্ডা দিয়ে আঘাত করতেন তাহলেও বোধ হয় এতোটা লাগতো না। আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। আমি এটাই বুঝলাম জীবনের একটা সন্ধিস্থলে এসে পৌঁছেছি এবং নিশ্চিত একটা কিছু ঠিক করতে হবে। কি করা উচিত আমার? কোন পথে যাব? ওই ঘোর কাটাতে প্রায় সপ্তাহ কাবার হয়ে গেল। দুশ্চিন্তার ক্ষেত্রে তখন ওই ‘ক্ষতি–বন্ধ’ কথাটা শুনিনি। এখন অতীতের কথা ভাবলে দেখতে পাই ঠিক তাই করেছিলাম। দু’বছরের পরীক্ষার ফলে যা পেয়েছিলাম তাকে মনে করলাম একটা মহান পরীক্ষা মাত্র–সেখান থেকে নতুন পথে মোড় ফিরালাম। আমি আবার আমার আগেকার বয়স্ক–শিক্ষার ক্লাসে ফিরে আমি আমার জীবনী লেখায় মন দিই–জীবনী আর প্রবন্ধ লেখার কাজ, যেমন এই বইটিতে এখন যা আপনারা পড়ছেন।
.
ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম বলে কি আমি আনন্দিত হই? আনন্দিত? যতবারই কথাটা ভাবি ততবারই রাস্তায় হাত তুলে নাচতে ইচ্ছে হয়। সত্যি কথা বলতে গেলে টমাস হার্ডি হতে পারিনি বলে, এরপর একবারের জন্যও ভাবনা হয়নি।
এক শতাব্দী আগে ওয়ালডেন জলাশয়ের কাছে যখন একটা প্যাঁচা কর্কশ ধ্বনি তুলেছিল হেনরি থোরো তার হাঁসের পালকের কলম আর নিজের বানানো কালিতে তাঁর ডায়েরীতে লিখেছিলেন : কোন জিনিসের দাম জীবনের একটা অংশেরই সমান–তা সেই দাম এখনই বা পরে যখনই দিতে হোক।
অন্যভাবে বললে বলতে হয় কোন জিনিসের যখন আমাদের অস্তিত্ব দিয়ে দাম দিই সেটা হয় অত্যন্ত বেশিই দাম দেওয়া।
অথচ গিলবার্ট আর সুলিভান ঠিক তাই করেছিলেন। তাঁরা জানতেন কেমন করে হাসির কথা আর গান সৃষ্টি করতে হয়–কিন্তু তাঁরা নিজেদের জীবনে কিভাবে আনন্দ আনতে হয় তা জানতেন না। বেশ মজার কিছু গীতিনাট্য তাঁরা রচনা করেন, যেমন, পেশেন্স, পিনাফোর আর দিমিকাডো। কিন্তু তারা নিজেদের মেজাজ ঠিক রাখতে পারতেন না। সামান্য একখন্ড কার্পেটের দাম নিয়ে তারা সারা জীবন তিক্ত করে তোলেন। সুলিভান তাঁদের থিয়েটারের জন্য একটা কার্পেটের অর্ডার দেন । গিলবার্ট যখন বিলটা দেখলেন তখন একদম রাগে ফেটে পড়লেন। ব্যাপারটা আদালত পর্যন্ত গেল–আমৃত্যু তারা পরস্পরের সঙ্গে বাক্যালাপ করেন নি। সুলিভান নতুন অপেরার জন্য গান লিখতেন আর সেটা গিলবার্টকে ডাকে পাঠিয়ে দিতেন। গিলবার্টও তাই করতেন। একবার যখন দুজনকে একসঙ্গে দর্শকদের সামনে আসতে হল দুজনে স্টেজের দুধারে পরস্পরের দিকে পিছন ফিরে অভিবাদন গ্রহণ করেছিলেন তাঁরা লিঙ্কনের মত ক্ষতি–বন্ধ করবার ব্যাপারটা একবারও ভাবেন নি।
