এটা ঠিক যে, সব সময় পারিপার্শ্বিকতা মানুষকে সুখী বা অসুখী করে না। পারিপার্শ্বিকতায় আমাদের প্রতিক্রিয়াই আমাদের অনুভূতি গড়ে তোলে। যীশু বলেছিলেন স্বর্গের আবাস মানুষেরই মনে, আবার নরকও তাই।
আমরা সকলেই নিরুপায় হলে অনেক সময় ধ্বংস আর শোককে জয় করতে পারি। মনে হতে পারে এটা আমাদের দ্বারা সম্ভব নয়, অথচ আমাদের অন্তরের শক্তি এতই প্রবল যে ইচ্ছে করলেই পারা যায়। আমরা নিজেদের যা ভাবি তার চেয়ে ঢের শক্ত ধাতুর আমরা।
স্বর্গীয় বুথ টার্কিংটন বলেছিলেন : জীবনে যা ঘটুক সবই আমি সহ্য করতে পারবো শুধু অন্ধতু ছাড়া। এটা আমি কিছুতেই সহ্য করতে পারব না।
এরপর একদিন তিনি যখন ষাট বছর বয়সে মেঝের কার্পেটের দিকে তাকালেন তার মনে হলো রঙগুলো কেমন অস্পষ্ট হতে চাইছে। তিনি সঙ্গে সঙ্গে বিশেষজ্ঞের কাছে গেলেন। আর তখনই দুঃখজনক সেই কথাটা জানতে পারলেন : তিনি দৃষ্টি হারাচ্ছেন। তার একটা চোখ অন্ধ হয়ে গেছে, অন্যটারও সেই অবস্থা হবে। যা ভয় করতেন তাই হতে চলেছে।
টার্কিংটন এই ভয়ানক পরিস্থিতি কিভাবে গ্রহণ করেছিলেন? তিনি যা ভেবেছিলেন, তাই হলো? এটাই কি আমার জীবনের শেষ? না, তিনি নিজেই আশ্চর্য হয়ে যান যে তিনি খুশি থাকতে পেরেছেন। অনেক মজার কথাও বলতে পেরেছিলেন তিনি। আশ্চর্য ব্যাপার, তিনি অন্ধকারে নানারকম ভেসে চলা মূর্তি দেখতে আরম্ভ করেন। একসময় বলেও ফেলেন : বাঃ কি মজার ব্যাপার। দাদু ভেসে চলেছেন–কিন্তু এত সকালে কোথায় চললেন?
এমন মনোভাব যার, ভাগ্য তার কী করবে? সত্যিই জয় করতে পারেনি তাকে। সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে যাওয়ার পর টার্কিংটন বলেন : দেখলাম দৃষ্টি হারানোকে আমি সহজ মনেই গ্রহণ করতে পেরেছি। মানুষ যেভাবে সব পারে। আমার পাঁচটা ইন্দ্রিয়ও যদি নষ্ট হয়ে যায় আমি জানি আমার মনের জোরেই আমি বেঁচে থাকব। কারণ এই মনের মধ্যেই আমরা বাস করি আর মন দিয়েই দেখি।
দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার জন্য টার্কিংটনকে বারোবারেরও বেশি অস্ত্রোপচার করা হয় এক বছরে। আর সবটাই স্থানীয় ভাবে চোখকে অসাড় করে, সম্পূর্ণভাবে তাঁকে অজ্ঞান করা হয়নি। তিনি এজন্যে বিদ্রোহ করেছিলেন? তিনি জানতেন এটা করতেই হবে, এ থেকে তার রেহাই নেই। তাই মুক্তি পাওয়ার পথ হল শান্ত ভাবে তা গ্রহণ করা। তাঁকে আলাদাভাবে রাখার কথায় তিনি আপত্তি করেন এবং হাসপাতালের ওয়ার্ডেই থাকেন। কারণ তাতে তিনি অন্য সকলের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন বলে। তিনি সকলকে উৎসাহ দিতেন। তারপর সজ্ঞানে যখন অস্ত্রোপচার করা হল, তিনি কি ভাগ্যবান বলেই না নিজেকে ভাবলেন। তিনি বলেছিলেন, কি আশ্চর্য কথা । বিজ্ঞান মানুষের চোখের মত কোমল বস্তুতে ও অস্ত্রোপচার করার কৌশল আয়ত্ত করেছে!
সাধারণ মানুষ এরকম হলে ভেঙে পড়ত। তবুও টার্কিংটন বলেন, এর চেয়েও কোন সুখবর অন্য কিছুর জন্য এ অভিজ্ঞতা বদল করবে না। এ ব্যাপারে তাকে মেনে নেবার কৌশল শিখিয়েছিল–আরও শিখিয়েছিল জীবনে যাই আসুক তাকে সহ্য করে নেওয়ার ক্ষমতা। জন মিল্টনও আবিষ্কার করেছিলেন, অন্ধ হওয়া দুঃখের নয়, দুঃখের হল তা সহ্য করার ক্ষমতা যদি না থাকে।
নিউ ইংল্যাণ্ডের বিখ্যাত মহিলা আন্দোলনকারী মার্গারেট ফুলার একবার বলেছিলেন : ধর্ম সম্পর্কে আমি পৃথিবীকে গ্রহণ করেছি। খুঁতখুঁতে স্বভাবের বুড়ো টমাস কার্লাইল যখন কথাটা শুনেছিলেন তিনি বলে ওঠেন : হুম তার এটা করাই উচিত! আর আসল কথাটা হল এরকম আমরা সবাই অবশ্যম্ভাবীকে মেনে নিলেই ভালো।
আমারাও যদি অবশ্যম্ভাবীর বিরুদ্ধে মাথা খুঁড়ি তাহলে ফল কিছুই হবে না–যা ঘটার তা ঘটবেই, তার বিরুদ্ধে গেলে ক্ষতি আমাদের নিজেদেরই। একবার আমি ও অবশ্যম্ভাবী কোন ব্যাপার মেনে নিতে পারিনি। বোকার মতই বিদ্রোহ করেছিলাম। তাতে আমার রাতের ঘুম চলে যায়। শেষ পর্যন্ত একবছর আত্মনির্যাতনের পর ব্যাপারটা মেনে নিতেই হল। অথচ আমি আগে থেকেই জানতাম এটা পরিবর্তনের শক্তি আমার নেই।
.
ওয়াল্ট হুইটম্যানের সঙ্গে গলা মিলিয়েই আমার বলা উচিত ছিল যে জন্তু আর বৃক্ষের মত হওয়াই ভালো, তারা কি সুন্দরভাবে রাত্রি, ঝঞঝা, ক্ষুধা, দুর্ঘটনাকে এড়িয়ে যায়।
আমি বারো বছর গোরুবাছুরের দেখাশোনা করেছি অথচ কোনদিন তাদের বৃষ্টির অভাব নিয়ে ভেবে জ্বর বাধাতে দেখিনি। জন্তুরা রাত্রি, ঝড় বা ক্ষুধাকে শান্তভাবেই গ্রহণ করে। তাই তাদের স্নায়ু ভেঙে পড়ে। না বা পেটে আলসারও হয় না, মাথাও খারাপ হয় না ।
তাহলে কি আমি যে বিপদই আসুক তাকে মাথা নিচু করে মেনে নিতে বলছি? না, কখনও তা নয়! এ হলে তো নিয়তির দাস হতে হয়। যতক্ষণ কোন ব্যাপারে উদ্ধার পাওয়ার আশা থাকে ততক্ষণ চেষ্টা করতেই হবে। কিন্তু যদি স্পষ্ট বোঝা যায় কোন দিকেই কোন আশা নেই তখন যেন কি পাবো বা না পাবো তার হিসেব মেলানোর চেষ্টা না করি ।
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ডীন হগস্ আমাকে বলেছিলেন তিনি একটা ছড়ার মধ্য থেকে তার জীবনের আদর্শ ঠিক করেছিলেন। সেটা এই রকম ছিল :
সব ব্যথারই ওষুধ আছে, হয়তো বা তা নেই, থাকে যদি হাত পেতে নাও, চেয়োনা অলীককেই।
এ বই লেখার সময় বহু আমেরিকান ব্যবসায়ীর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলাম। একটা ব্যাপার আমার খুব মনে লেগেছিল তা হল এই যে, তাদের প্রায় সবাই অবশ্যম্ভাবীকে মেনে নিয়ে দুশ্চিন্তাকে জয় করেছিলেন। এটা না করলে তারা ওই যন্ত্রণার চাপে ভেঙে পড়তেন।
