আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী, নৌসেনাদের মনোবল বাড়ানোর জন্য তাদের গড়পড়তা নিয়ম কাজে লাগাতো। একজন প্রাক্তন সেনা আমাকে বলে ছিলেন তাদের দাহ্য তৈলবাহী জাহাজে কাজ দেওয়া হত । সবাই ভয়ে কাঠ হয়ে থাকতো কারণ তারা ভাবতো টর্পেডোর আঘাতে জাহাজ পুড়ে যাবে।
নৌবাহিনী জানতো তা ঠিক নয়–তাই তারা আসল তথ্য প্রকাশ করল । দেখা গেল একশটা জাহাজে টর্পেডোর আঘাত লাগলে চল্লিশটা ডোবে আর ষাটটা ভেসে থাকে। পাঁচটা জাহাজ দশ মিনিটের কম সময় ধরে ডোবে তাতে পালাবার সময় থাকে। অর্থাৎ হতাহতের সংখ্যা কম হয়। গড়পড়তা নিয়মের এই তত্ত্বের ফলে আমার ভয় কেটে যায়। সব সৈনিকই এরপর নিশ্চিন্ত হয়।
দুশ্চিন্তা দূর করার তিন নম্বর নিয়ম হল : আসুন দেখে নিই গড়পড়তার নিয়মে যা ভয় করছি তা আদৌ ঘটতে পারে কি না।
০৯. অবশ্যম্ভাবীকে মেনে চলুন
আমি যখন ছোট ছিলাম তখন একদিন মিসৌরীর উত্তর–পশ্চিম দিকে এক পরিত্যক্ত বাড়ির চিলে কোঠায় বন্ধুদের সঙ্গে খেলা করছিলাম। যখন চিলে কোঠায় জানালায় পা রেখে নামতে গেলাম আমার হাতের আঙটিটা পেরেকে লেগে যাওয়ায় একটা আঙুল প্রায় ছিঁড়ে গেল।
ভয়ে আতঙ্কে আমি চিৎকার করে উঠি। আমার মনে হয়েছিল আমি মারা যাব । তারপর হাতটা সেরে গেলে এনিয়ে কোন সময়েই দুশ্চিন্তা করিনি। আমার ওই হাতে যে মাত্র চারটে আঙ্গুল আছে একটা মাসে একবারও তা নিয়ে ভাবিনা। ভেবে লাভ কি? অবশ্যম্ভাবীকে অর্থাৎ যা ঘটবেই তাই আমি মেনে নিয়েছি।
ক বছর আগে একজন লিফট চালককে কব্জি পর্যন্ত কাটা হাত নিয়ে কাজ করতে দেখে তাকে প্রশ্ন করেছিলাম কাটা হাত নিয়ে সে ভাবে কিনা। সে জানিয়েছে আদৌ না, একমাত্র সুঁচে সুতো পরানোর সময়েই একটু ভাবনা হয়।
এটা খুবই আশ্চর্যের বিষয় আমরা যে কোন অবস্থাতেই অবশ্যম্ভাবীকে যেমন মানিয়ে নিতে পারি–তেমন সব ভুলেও যাই ।
প্রায়ই আমার হলান্ডের আমস্টারডামের একটা প্রাচীন গির্জায় ধ্বংসাবশেষে লেখা একটা বাণীর কথা মনে হয় । বাণীটি ফ্লেমিশ ভাষায় লেখা আর এই রকম : এটা এই রকম। কারণ অন্যরকম হতে পারে না।
আমি বা আপনি যখন যুগ যুগ ধরে এগিয়ে চলি তখন কিছু না কিছু অপ্রীতিকর অবস্থার সামনে পড়ি যা অন্যরকম হতে পারে না। আমাদের দুটো পথই থাকে–হয় অবস্থাটা মেনে নেওয়া অথবা বিদ্রোহ করে, নিজেদের স্নায়ুকে ভেঙে ফেলতে পারি ।
উইলিয়ম জেমস–ই এবিষয়ে আমার প্রিয় দার্শনিক। তিনি বলেছেন : যা ঘটেছে তাকে মেনে নিতে তৈরি হও। দুর্দশা এড়ানোর জন্য যা ঘটেছে তাকে মেনে নেয়াই শ্রেয়। অরিগণের এলিজাবেথ কলেকে অনেক দাম দিয়েই এটা শিখতে হয়েছিল। সম্প্রতি তিনি আমাকে এই চিঠিটা লিখেছেন : যেদিন আমেরিকা উত্তর আফ্রিকায় বিজয় দিবস পালন করছিল তখন আমি সমরদপ্তর থেকে একটা চিঠি পেলাম, তাতে জানানো হয়েছিল আমার ভাইপো যাকে দুনিয়ায় সবচেয়ে ভালোবাসি–তাকে পাওয়া যাচ্ছেনা। কিছুদিন পরেই খবর এল সে মারা গেছে।
আমি দুঃখে ভেঙে পড়লাম। এর আগে পর্যন্ত ভাবতাম আমার জীবন কত সুখের। আমার পছন্দসই একটা চাকরি ছিল। ভাইপোকে আমিই মানুষ করেছি। আমার কাছে সে ছিল সব আশা আকাঙ ক্ষার প্রতীক। … আর প্রয়োজন নেই। কাজে অবহেলা শুরু করলাম। বন্ধুদেরও তাই। সবই ত্যাগ করলাম। সারা জীবন আমার তিক্ত হয়ে উঠল। কেন আমার ভাইপোকে কেড়ে নিল? এত সুন্দর একটি ছেলেকে কেন যুদ্ধে মারা যেতে হল? সারা জীবন যে ওর সামনে পড়ে ছিল। আমি কিছুতেই এটা মেনে নিতে পারলাম না। আমার শোক এতই ভয়ঙ্কর হল যে ভাবলাম সব ছেড়ে পালিয়ে যাব।
চলে যাওয়ার জন্য আমার ডেক্সটা সাফ করছিলাম–তখনই একটা চিঠি আমার হাতে পড়ল। এই চিঠি আমার ভাইপো–ই আমায় লিখেছিল ক’ বছর আগে আমার মার মৃত্যু হলে। চিঠিটায় ছিল, নিশ্চয়ই আমরা তাকে আর পাবনা, বিশেষ করে তুমি। তবু জানি তুমি শোক সামলে নিতে পারবে। তোমার নিজের ব্যক্তিগত জীবন দর্শনেই তা মেনে নিতে পারবে। যে সুন্দর সত্য তুমি আমায় শিখিয়েছ তা কখনই ভুলব না। আমি যেখানে যতদূরেই থাকি সব সময় মনে রাখব তুমি আমাকে হাসতে শিখিয়েছ জীবনে যা ঘটুক তাকে মেনে নিতে শিখিয়েছ, প্রকৃত মানুষের মত গ্রহণ করতে তুমি আমায় শিখিয়েছিলে।
আমি বারবার চিঠিটা পড়লাম। মনে হল সে যেন আমার পাশেই দাঁড়িয়ে। সে যেন বলছে আমাকে যা শিখিয়েছ তাই করছে না কেন? যাই ঘটুক কাজ করে যাও। তোমার ব্যক্তিগত শোক সরিয়ে রেখে হেসে এগিয়ে চল।
আবার তাই কাজে ফিরে গেলাম। তিক্ত সেই বিদ্রোহী ভাব ত্যাগ করলাম। বারবার নিজেকে বললাম : যা হবার হয়ে গেছে, আমি এটা বদলাতে পারব না। আমি যা করতে পারি তা হল, সে যা করতে বলেছে তাই করা। আমি সৈন্যদের আর অন্যান্য ছেলেদের চিঠি লিখতে লাগলাম। রাতের এক শিক্ষাক্রমে যোগ দিলাম নতুন বহু বন্ধুও হল। আমার নিজের পরিবর্তন দেখে আমি আশ্চর্য হয়ে গেছি। আমার ভাইপো যা চাইতো আমি তাই করে চলেছি, ভাগ্যকে আমি মেনে নিয়েছি। জীবনকে এখন আমি সম্পূর্ণ উপভোগ করছি।
পোর্টল্যাণ্ডের এলিজাবেথ কনলি যা শিখেছিলেন এখন আমাদেরও তাই শেখা দরকার–আর তা হল যা অবশ্যম্ভাবী তাকে মেনে নিতেই হবে। যা হবার তা হবেই। এটা শেখা অবশ্য সহজ নয়। রাজা মহারাজাদেরও এটা বারবার স্মরণে রাখতে হয়। স্বৰ্গতঃ রাজা পঞ্চম জর্জ বাকিংহাম প্যালেসে তার লাইব্রেরীর দেওয়ালে এই লেখাটা ফ্রেমে বাঁধিয়ে রেখেছিলেন : আমি যেন অসম্ভবকে সম্ভব করতে না চাই, যা ঘটে গেছে তার জন্য অনুতাপ না করি। ঠিক এমনই করেছেন শোপেন হাওয়ার : জীবনপথে চলার জন্য একটু উদাসীনতা চাইই।
