দেশ জোড়া পেনী ষ্টোর্সের প্রতিষ্ঠাতা জে. সি. পেনী আমায় বলেন : আমার প্রতিটি ডলারের ক্ষতি হলেও দুশ্চিন্তা করি না–কারণ তাতে কোন লাভ হয় না। আমি ভালোভাবে কাজ করার চেষ্টা করি–ফল ঈশ্বরের হাতেই ছেড়ে দিই।
হেনির ফোর্ডও আমাকে বলেছিলেন একই কথা! যখন কোন ব্যাপার নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না তখন তাদের হাতেই ব্যাপারটা ছেড়ে দিই।
ক্রাইশলার কর্পোরেশনের প্রেসিডেন্ট কে. টি. কেলারকে যখন প্রশ্ন করেছিলাম তিনি দুশ্চিন্তাকে কিভাবে ঠেকিয়ে রাখেন, তিনি উত্তর দেন : যখন কোন কঠিন অবস্থার সামনে পড়ি, তখন নিজে কিছু করার থাকলে তা করি, না থাকলে স্রেফ ভুলে যাই। আমি ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবি না, কারণ জানি যে কোন মানুষই ভবিষ্যতের গর্ভে কি আছে তা জানতে পারে না। বহু শক্তিই ভবিষ্যৎকে নিয়ন্ত্রণ করে। কে. টি কেলারকে যদি বলতাম তিনি দার্শনিক তাহলে বোধ হয় তিনি অস্বস্তিতে পড়তেন, কারণ তিনি একজন ভালো ব্যবসায়ী। এসত্ত্বেও কিন্তু তিনি উনিশ শতক আগে, এপিক্টাস রোমে যে দর্শনের কথা বলেছিলেন সেই কথাই বলেছেন। এপিক্টাস বলেছিলেন : সুখ লাভের একটাই পথ আছে আর তা হলো আমাদের ক্ষমতার বাইরে যা আছে তা নিয়ে দুশ্চিন্তা না করা।
সারা বার্নহার্ট, যার নাম ‘ঐশ্বরিক সারা’–তিনি জানতেন কিভাবে অবশ্যম্ভাবীকে মানিয়ে নিতে হয়। প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে চারটে মহাদেশের মঞ্চে তিনি সকলের হৃদয় জয় করে রাণীর মত রাজত্ব করেছিলেন–তিনি ছিলেন দুনিয়ার সবচেয়ে প্রিয় অভিনেত্রী। তার সত্তর বছর বয়সের সময় তিনি সম্পূর্ণ কপর্দকহীন হয়ে যান। সেই সময় তার চিকিৎসক, প্যারীর প্রফেসর পোৎসী তাঁকে জানালেন তার একটা পা কেটে বাদ দিতে হবে কারণ আটলান্টিক পার হতে গিয়ে জাহাজে পড়ে পায়ে প্রচন্ড আঘাত লাগে; এবং তার পায়ের শিরা ফুলে যায়। পা কুঁচকে যায়। তাতে এতই যন্ত্রণা হতে থাকে যে ডাক্তার পা বাদ দিতে চান। ডাক্তার কথাটা তাকে জানাতে ভয় পান, কেননা ঐশ্বরিক সারা কিভাবে তা গ্রহণ করবেন জানা ছিল না। সারা ভেবেছিলেন তিনি হয়তো হিষ্টিরিয়ায় আক্রান্ত হবেন। কিন্তু তাদের ভুলই হয়। সারা শান্তভাবে তাকিয়ে থেকে বলেন, এটা যদি করতে হয় তাহলে করতে হবে। এই হল ভাগ্য।
তাকে যখন হুইল চেয়ারে করে অপারেশন কামরায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তার ছেলে কাঁদছিল। তিনি তাকে ডেকে বেশ হাসি মুখেই বলেন : একটু দাঁড়াও, আমি এখনই ফিরব।
অপারেশন কক্ষে যাওয়ার সময় তিনি তার একটা নাটক থেকে আবৃত্তি করতে থাকেন। একজন তার কাছে জানতে চায় নিজের মন প্রফুল্ল রাখার জন্যই তিনি আবাও করছেন কিনা। তিনি উত্তর দেন : না, ডাক্তার আর নাসকে প্রফুল্ল রাখার জন্য। ওদের মনের উপর অনেক চাপ পড়বে, তাই।
অপারেশন থেকে সেরে ওঠার পর সারা বার্নহার্ট সারা বিশ্ব ঘুরে আরও সাত বছর ধরে মানুষকে মোহিত করেন।
রীডার্স ডাইজেস্ট পত্রিকায় এসলি ম্যাককরমিক লিখেছিরেন, আমরা যখন অবশ্যম্ভাবীর সঙ্গে লড়াই করা ছেড়ে দিই তখন নতুন শক্তির জন্ম হয়ে আমাদের জীবন পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
কোন লোকই এমন শক্তিশালী হতে পারে না যে অবশ্যম্ভাবীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারে আর বাকি ক্ষমতায় নতুনজীবন গড়ে তুলতে পারে। যে কোন একটাকেই গ্রহণ করতে হবে। অবশ্যম্ভাবী ঝড় শিলা বৃষ্টি মেনে নিলে আপনি বেকে পড়তে পারেন কিন্তু তাকে প্রতিরোধ করতে গেলে একেবারে ভেঙে পড়বেন।
মিসোরীর এক খামারে আমি ব্যাপারটা ঘটতে দেখেছি। ঐ খামারে আমি অনেক গাছ লাগিয়ে ছিলাম। প্রথমে তারা বেশ দ্রুত বেড়ে উঠলো। তারপর একদিন তুষারপাত গাছের সব ডাল ঢেকে ফেলল। বোঝার ভারে গাছগুলো না নুইয়ে পড়ে গর্বের সঙ্গে তা প্রতিরোধ করার চেষ্টা চালালো তারপর ভারের ফলে ভেঙে পড়লে সবগুলোকে কেটে ফেলতে হল। গাছগুলো উত্তরাঞ্চলের গাছের মত জ্ঞান অর্জন করতে পারে নি। আমি কানাডার চিরসবুজ অরণ্য এলাকায় শত শত মাইল ঘুরেছি। কোথাও দেখিনি কোন স্কুস বা দেবদারু গাছ ভেঙে পড়েছে। কারণ ওই চিরসবুজ গাছগুলো জানে কিভাবে নিজেকে বাঁকাতে হয় আর অবশ্যম্ভাবীতাকে কিভাবে মেনে নিতে হয়।
জুজুৎসু শিক্ষকরা তাদের ছাত্রদের বলে থাকেন; উইলো গাছের মতই নিজেকে বাঁকাবে, ওক গাছের মত প্রতিরোধ করবে না।
গাড়ির চাকা কিভাবে খারাপ রাস্তায় ধাক্কা সামলায় জানেন? প্রথমে যে চাকা বানানো হয়েছিল সেটা রাস্তার ধাক্কা সামলাতেই দেখা যায় সব চাকাই টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। এরপর তাই এমন চাকা বানানো হলো যাতে ধাক্কা সামলাতে পারে। জীবনের ক্ষেত্রেও একই কথা
আমরা যদি জীবনের ধাক্কাকে হজম না করে বাধা দেবার চেষ্টা করি তাহলে কি ঘটবে? আমরা উইলোর মত নমনীয় না হয়ে যদি ওকের মত শক্ত হতে চাই? এতে এক বিরাট অন্তর্দ্বন্দ্বে পতিত হব আর এর ফলে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে ক্লান্ত, অসুস্থ হয়ে পড়ব।
আমরা যদি আরও অগ্রসর হয়ে কঠিন বাস্তবকে অগ্রাহ্য করে নিজেদের মনে গড়া কোন স্বপ্নময় জগতে প্রবেশ করি তাহলে আমরা অপ্রকৃতিস্থ হয়ে যাব।
.
যুদ্ধের সময় লক্ষ লক্ষ সৈন্য এই অবশ্যম্ভাবীকে হয় মেনে নিয়েছে বা ভেঙে পড়ছে। এ ব্যাপারে একটা উদাহরণ রাখা যাক। নিউইয়র্কের উইলিয়াম ক্যাসেলিয়াসের কাছ থেকে যা বিবরণ পাই তা এই রকম :
