বহু বছর আগে এসব দুশ্চিন্তা কত বিরাটই না মনে হত। কিন্তু আমার চারদিকে যখন ডেপথচার্জ পড়ছে আর আমাকে স্বর্গে নিয়ে যাওয়ার বন্দোবস্ত হচ্ছে তখন সেগুলো কতই না তুচ্ছ মনে হলো। আমি শপথ নিলাম এবার যদি বেঁচে উঠে আবার সূর্যের আলো দেখতে পাই তাহলে আর কখনও দুশ্চিন্তা করবো না। কখনও না। সিরাকিউজ বিশ্ববিদ্যালয়ে চারবছর অধ্যয়ন করে যা শিখিনি ওই পনেরো ঘন্টায় তার চাইতে ঢের বেশি শিখেছি।
আমরা অনেকক্ষেত্রে বড় বড় বিপদগুলি বেশ সাহসের সঙ্গেই প্রতিরোধ করতে পারি। কিন্তু সামান্য জিনিস নিয়ে আমরা ভেঙ্গে পড়ি। এ প্রসঙ্গে স্যামুয়েল পিপস্ তার ডায়েরিতে বর্ণনা করেছেন কীভাবে তিনি লন্ডনে স্যার হ্যারিভেনের মাথা কেটে ফেলতে দেখেন। তিনি তখন তার জীবন ভিক্ষা করেন নি। তিনি ঘাতককে শুধু বলেছিলেন তার ঘাড়ের উপর একটা খুব যন্ত্রণাদায়ক ফোড়া আছে সেটার উপর যেন খাঁড়ার ঘা না পড়ে!
ঠিক এমনই প্রমাণ পান এ্যাডমিরাল বার্ড মেরু প্রদেশের প্রচণ্ড ঠাণ্ডায়–তিনি বলেন মানুষ বড় বড় বিপদের চেয়ে ছোট খাট বিপদ নিয়েই বেশি চিন্তা করে। তারা প্রায়ই শূন্য ডিগ্রির চাইতে আশি ডিগ্রির বেশি ঠাণ্ডায় অনেক কষ্ট সহ্য করতে পারত। অ্যাডমিরাল বার্ড বলেছেন, কিন্তু আমার কিছু সঙ্গীর কথা জানি যারা একে অন্যের সঙ্গে কথা বন্ধ করে দেয় কারণ তারা ভেবেছিল তাদের নির্ধারিত জায়গায় অন্যেরা তাদের যন্ত্রপাতি রেখেছে। আমি একজনকে জানতাম যে কিছুতেই ফ্রেচেরিষ্টের সামনে খেতে পারতো না, সে দূরে এক জায়গায় গিয়ে খেত। কারণ ফ্লেচেরিষ্টের অভ্যাস ছিল পেটে যাওয়ার আগে খাদ্যগুলোকে আঠাশবার চিবিয়ে খাওয়া।
কোন মেরুশিবিরে অ্যাডমিরাল বার্ড বলেন, এধরনের ছোট ব্যাপার ও শিক্ষিত মানুষকেও উম্মাদ করে তোলার পক্ষে যথেষ্ট।
অ্যাডমিরাল বার্ডের মত আপনি আর একটা বিষয়ও জানতে পারেন, তাহলো বিয়ের ব্যাপারেও এইরকম ছোটখাটো ব্যাপার মানুষকে উম্মাদ করে দিতে পারে ।
এটাই বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন। উদাহরণ হিসাবে শিকাগোর যোশেফ স্যাবাথের কথাই ধরুন। তিনি অন্ততঃ চল্লিশ হাজার অসুখী বিবাহ বিচ্ছেদের শুনানী গ্রহণ করেন। তিনি বলেছেন, বিয়ের অসুখী হওয়ার মূল অতি তুচ্ছ কিছু ঘটনা । নিউইয়র্কের ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নী ফ্রাঙ্ক এস. বোগানও বলেছেন, আমাদের ফৌজদারী আদালতের অর্ধেক মামলাই অতি তুচ্ছ কারণে ঘটে। কোন খারাপ কাজ–এই সব তুচ্ছ ব্যাপার থেকেই মারামারি আর খুনজখম ঘটে যায়। আমাদের মধ্যে সামান্য কেউই বড় কোন কারণে আঘাত পাই, তুচ্ছ কোন কারণেই আমাদের অহমিকায় আঘাত লাগে।
এলিনর রুজভেল্টের যখন সবে বিয়ে হয় তিনি অনেকদিন চিন্তায় ছিলেন কারণ তার বঁধুনি অতি বাজে রান্না করতো। মিসেস রুজভেন্ট বলেছেন, ব্যাপারটা আজ ঘটলে আমি গ্রাহ্যই করতাম না। এটাই সবচেয়ে ভালো। এমনকি ক্যাথরিন দি গ্রেটও চরম কর্তৃত্বপরায়না হয়েও পাঁচক রান্না খারাপ করলে হেসে উড়িয়ে দিতেন।
ডিসরেলি বলেছিলেন : জীবন ছোট বলেই এত মহান। একটি পত্রিকায় আন্দ্রে মারোয়া বলেন, এই কথা কটি আমাকে বহু কষ্টকর অবস্থা থেকে মুক্ত করেছে। যে সব ব্যাপার ভুলে যাওয়া দরকার এমন ছোটোখাটো ব্যাপারই আমাদের পীড়ন করে। আমরা যে এই পৃথিবীতে আছি, কবছরই বা আমরা বেঁচে থাকবো; এরই মধ্যে আমরা কত তুচ্ছ বিষয়ে দুশ্চিন্তা করি এবং একবছরের মধ্যেই আমরা তা ভুলে যাবো। না, আসুন আমরা আমাদের জীবন ভালো কাজের মধ্যে দিয়ে সার্থক করে তুলি কারণ জীবন ছোট বলেই তো এতো মহান।
রাডিয়ার্ড কিপলিংয়ের মত বিখ্যাত মানুষও কথাটা ভুলে গিয়েছিলেন। ফল কি হলো? তিনি আর তার শ্যালক ভারমন্ট ইতিহাসে বিখ্যাত মামলায় জড়িয়ে পড়েন। এ ব্যাপারটা এতোই বিখ্যাত হয়ে ওঠে যে একটা বইও লেখা হয়, যার নাম রাডিয়ার্ড কিপলিংয়ের ভারমন্ট বিবাদ।
ব্যাপারটা ছিলো এই রকম : কিপলিং ভারমন্টের একটি মেয়ে ক্যারোলিন ব্যালেস্টিয়ারকে বিয়ে করেন। তিনি ব্র্যাটলবোরোতে চমৎকার একটা বাড়ি বানান সেখানেই বরাবর থাকবেন বলে। তার শালা বিটি ব্যালেসটিয়ারের সঙ্গে কিপলিংয়ের দারুণ বন্ধুত্ব হয়। তারা একসঙ্গে কাজকর্ম আর খেলাধুলো করতেন।
কিপলিং শালার কাছ থেকে কিছু জমি কেনেন, তাতে ব্যবস্থা থাকে ব্যালেস্টিয়ার প্রতিবছর সেখান থেকে খড় কেটে নেবেন। একদিন ব্যালেস্টিয়ার দেখলেন কিপলিং ওই মাঠে ফুলের বাগান তৈরি করছেন। তার রক্ত গরম হয়ে গেল আর তাই তিনি চোটপাট করতে লাগলেন। কিপলিংও জবাব দিলেন। সারা ভারমন্ট গরম হয়ে গেল!
.
এরপর একদিন কিপলিং যখন সাইকেল চড়ছিলেন তখন তার শালা একটা গাড়ি এবং কিছু ঘোড়া নিয়ে এমন আচমকা হাজির হলেন যে কিপলিং প্রায় পড়ে গেলেন। আর সেই কিপলিংই, যিনি লিখেছিলেন তোমার চারপাশের লোক যখন মাথা খারাপ করে, তার জন্য তোমায় দোষ দেয়, তখন তোমার মাথা ঠিক রাখার ক্ষমতা থাকা চাই। তিনি স্বয়ং মাথা খারাপ করে বসলেন। তিনি শালাকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশকে জানালেন। একটা দারুণ মামলা চলল–নানা শহর থেকে বহু সাংবাদিক এলেন–সারা পৃথিবীতে তা রাষ্ট্র হল। কিন্তু সমাধান হলো না। এর ফলে কিপলিং এবং তার স্ত্রী আর আমেরিকায় থাকা সম্ভব না হওয়ায় তারা সেখান থেকে চিরকালের জন্য দেশত্যাগ করলেন। ব্যাপারটা কিন্তু নেহাতই সামান্য–এক বোঝা খড়!
