এর ফলে ব্যবসায় আমাদের যে শুধু পাঁচ লক্ষ ডলারই আটকে গেল তাই নয়, এছাড়াও আমরা বারোমাসের জন্য আরও দশ লক্ষ ডলারের স্ট্রবেরি কেনায় চুক্তিবদ্ধ ছিলাম। ব্যাঙ্ক থেকেও আমরা সাড়ে তিন লক্ষ ডলার ঋণও করেছিলাম। আমরা নতুন ঋণ করা বা আগের ঋণ শোধও করতে পারছিলাম না। অবাক হবার মত দুশ্চিন্তায় ডুবে গেলাম।
আমি ক্যালিফোর্ণিয়ার ওয়ান্টনভিলে আমাদের কারখানায় ছুটে গেলাম। সেখানে আমি আমাদের প্রেসিডেন্টকে বোঝাতে চাইলাম অবস্থা বদল হয়ে আমাদের বিপদ ঘটতে চলেছে। তিনি সেটা বিশ্বাসই করতে চাইলেন না। তিনি উল্টে সব দোষ চাপালেন আমাদের নিউ ইয়র্ক অফিসের উপর। বললেন তারা বিক্রির কায়দাই জানে না।
বেশ কদিন ধরে ওকালতি করার পর তাকে বাকি সব স্ট্রবেরি টিনে না ভরে খোলাবাজারে বিক্রিতে রাজি করাতে পারলাম। তাতে আমাদের সব সমস্যার প্রায় সমাধান হলো। আমার দুশ্চিন্তা আর না হওয়াই উচিত ছিলো–কিন্তু তা হলো না কারণ দুশ্চিন্তা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যায়। আমার তাই হলো।
যখন নিউ ইয়র্কে ফিরলাম, সব কিছু নিয়েই দুশ্চিন্তা হতে লাগলো। ইতালী থেকে যে চেরী কিনেছিলাম আর হাওয়াই থেকে যে আনারস কিনেছিলাম, সে সব নিয়ে দুশ্চিন্তা শুরু হলো। দুশ্চিন্তায় আমার স্নায়ু ভেঙে পড়ার মত হলো।
অবশেষে হতাশায় এমন এক জীবন যাত্রা বেছে নিলাম, যাতে আমার নিদ্রাহীনতা আর দুশ্চিন্তা দূর হয়ে গেলো। সব সমস্যা নিয়ে এমন ভাবে জড়িয়ে থাকতে চাইলাম যে দুশ্চিন্তার আর অবকাশই রইলো না। রোজ সাতঘন্টা কাজ করে চলোম । রোজ সকাল আটটায় অফিসে এসে প্রায় মাঝ রাত অবধি রইলাম। নতুন কাজ আর দায়িত্ব নিতে লাগলাম। মাঝরাতে যখন বাড়ি ফিরতাম তখন এতোই পরিশ্রান্ত থাকতাম যে বিছানায় শোবার কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যেই আমার সাড়া থাকতো না।
এইভাবে তিনমাস চালালাম। ইতিমধ্যে আমার দুশ্চিন্তার অভ্যাস দূর হয়ে গিয়েছিলো তাই আবার দৈনিক সাত, আটঘন্টা কাজ করতে লাগলাম। এ ঘটনা ঘটে আঠারো বছর আগে। এরপর আর কখনই নিদ্রাহীনতা বা দুশ্চিন্তায় ভুগিনি।
জর্জ বার্নার্ড শ ঠিক বলেছিলেন : দুঃখী হয়ে ওঠার রহস্য হলো আপনি সুখী না দুখী ভাবতে পারার মত সময় থাকা। এতএব এটা নিয়ে আর ভাববেন না। বরং কাজে লেগে পড়ুন, তাতে রক্ত চলাচল হবে। আপনার মন চনমন করতে থাকবে–অচিরেই আপনার শরীরে এই নিশ্চিন্ত শক্তি আপনার মন থেকে দুশ্চিন্তা দূর করে দেবে। তাই ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করুন। এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো আর সস্তা ওষুধ।
অতএব দুশ্চিন্তার অভ্যাস দূর করার একনম্বর নিয়ম হল : কাজে ব্যস্ত থাকুন।
০৭. দুশ্চিন্তার ভার বইবেন না
এই নাটকীয় কাহিনীটি আমৃত্যু আমর মনে থাকবে। নিউ জার্সির রবার্ট মূর এটা আমায় বলেছিলেন।
তিনি যা বলেছিলেন সেটা এই রকম : ১৯৪৫ সালের মার্চ মাসে আমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা পাই। ইন্দোচীনের উপকূলের কিছু দূরে জলের ২৭৬ ফিট নিচে আমার এটা শিক্ষালাভ হয়। এম, এস, বায়া–৩১৮ নামে একটা ডুবোজাহাজের অষ্টাশি জনের মধ্যে আমি ছিলাম একজন। আমরা রাডারে আবিষ্কার করি ছোট্ট একটা জাপানি জাহাজ আমাদের দিকে আসছে। সকাল হওয়ার মুখে আমরা সেটা আক্রমণের জন্য ডুব মেরে তৈরি হলাম। পেরিস্কোপের মধ্য দিয়ে দেখলাম একটা জাপানি ডেস্ট্রয়ার, একটা ট্যাঙ্কার আর মাইনফেলা জাহাজও আছে। আমরা তিনটে টর্পেডো ছড়লাম–কিন্তু কোনোটাই লাগলো না। প্রত্যেকটা টর্পেডোর মধ্যে কিছু গোলযোগ ঘটে যায়। ডেস্ট্রয়ারটা যে আক্রান্ত হয়েছে না বুঝেই এগিয়ে চললো। আমরা শেষের মাইন পাতা জাহাজটা আক্রমণ করবো ভেবে তৈরি হতেই সে আচমকা ঘুরে আমাদের দিকে চলে এলো (একটা জাপানি প্লেন আমাদের ষাট ফুট জলের নিচে দেখতে পেয়ে মাইন পাতা জাহাজটাকে জানিয়ে দেয়।) আমরা ১৫দ্ম ফিট নেমে গেলাম যাতে আমাদের আর দেখা না যায় আর ডেপথচার্জ আক্রমণের জন্য তৈরি হলাম। আমরা নিঃশব্দে থাকার জন্য ফ্যান বন্ধ করলাম, ঠাণ্ডা করার যন্ত্র আর বিদ্যুৎ ব্যবস্থাও বন্ধ করে দিলাম।
তিন মিনিট পরে যেন নরক ভেঙে পড়ল। আমাদের চারপাশে ছয়টা ডেপথচার্জ ফেটে আমাদের ঠেলে প্রায় সমুদ্রের ডাঙ্গায় পৌঁছে দিল–প্রায় ২৭৬ ফিট তলায়। আমরা প্রচণ্ড ভয় পেলাম। একহাজার ফিট গভীরতায় আক্রমণই বিপজ্জনক–পাঁচশো ফিটের কম হলে তো মারাত্মক। আর আমাদের প্রায় তার অধেক জলের গভীরতায় আক্রমণ করা হয়েছে–মাত্র হাঁটু জলে। পনেরো ঘন্টা ধরে জাপানি মাইন পাতা জাহাজটা ডেপথচার্জ ফাটিয়ে গেল। ডুবোজাহাজের সতেরো ফিটের মধ্যে ডেফথচার্জ ফাটলে সেই ধাক্কায় এতে গর্ত হতে পারে। আমাদের পঞ্চাশ ফিটের মধ্যে গাদা গাদা ডেফথচার্জ ফাটলো । আমাদের আদেশ দেওয়া হয় চুপচাপ নিজেদের বাঙ্কে শুয়ে থাকতে। আমি এমনই ভয় পেয়ে যাই যে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। বারবার নিজেকে বলতে থাকি মৃত্যুর আর দেরি নেই! মৃত্যুর আর দেরি নেই!… পাখা আর ঠাণ্ডার যন্ত্র বন্ধ থাকায় ভিতরে তাপ প্রায় একশ ডিগ্রী দাঁড়ায়–তা সত্ত্বেও আমার এমনই শীত লাগতে থাকে যে একটা সোয়েটার আর জ্যাকেট পরেও শীতে থরথর করে কেঁপে চলি। আমার দাঁতে দাঁত লেগে যায়। আক্রমণ প্রায় পনেরো ঘন্টা চললো, তারপরে আচমকা বন্ধ হয়ে যায়। আপাতদৃষ্টিতে বোঝা গেল জাপানীদের ডেপথচার্জ নিঃশেষ হওয়াতেই তারা চলে গেছে। ওই পনেরো ঘন্টা আমার কাছে পনেরো কোটি বছর বলেই মনে হয়েছিল। আমার সারা জীবনের ঘটনাগুলো চোখের সামনে ফুটে উঠেছিল। সারা জীবনে যত খারাপ কাজ করেছি আর সামান্য ব্যাপারে যে দুশ্চিন্তা করেছি তাই ভাবতে লাগলাম। নৌবাহিনীতে যোগদানের আগে আমি একটা ব্যাঙ্কের কেরানী ছিলাম। কম মাইনে, দীর্ঘ সময়, ভবিষ্যতে ক্ষীণ উন্নতির আশা সম্পর্কে দুশ্চিন্তা করতাম। নিজস্ব একটা বাড়ি ছিলো না বলেও ভাবতাম, নতুন গাড়ি আর স্ত্রীকে ভালো পোশাক কিনে দিতে পারতাম না বলেও ভাবতাম। আমার বসের সম্বন্ধে কত কথা ভাবতাম, কি রকম তাকে ঘৃণাও করতাম! ভাবলাম রাতে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরে স্ত্রীর সঙ্গে কি সামান্য বিষয় নিয়ে ঝগড়া করতাম। আমার কপালে গাড়ি দুর্ঘটনায় ঘটা একটা কাটা দাগ নিয়েও কত ভাবতাম সেটাও মনে পড়ে।
