চব্বিশ শো বছর আগে পেরিক্লিস বলেন, থামুন ভদ্রমহোদয়েরা, আমরা সামান্য বিষয় নিয়ে বড় সময় নষ্ট করছি। সত্যিই আমরা তাই করি।
কলোরাডোর লঙ পাহাড়ের গায়ে এক বিশাল গাছের ধ্বংসাবশেষ আছে। প্রকৃতিবিজ্ঞানীরা বলেন গাছটা চারশো বছর বেঁচেছিল। কলম্বাস যখন যান সালভাডরে নামেন এই গাছটি তখন শিশু, আর প্লীমাউথে যখন ঔপনিবেশিকরা আসে তখন সেটা অর্ধেক বড় হয়। ওই গাছটির উপর চোদ্দবার বাজ পড়ে এ কত যে তুষার ঝড় হয়ে গেছে তাও তার কিছু হয়নি। অবশেষে একঝাক মৌমাছি গাছটিকে একেবারে হয়ে দেয়। এই সব পোকারা গাছটির ভিতরের সব শক্তি করে করে খেয়ে নেয়। এই বিশাল অরণ্যের দেত্য যে বয়সের ভারে ভেঙে পড়েনিঃ বজ যাকে শেষ করতে পারেনি, সে কিনা সামান্য পোকার আক্রমণে শেষ হয়ে গেল! যে পোকাকে মানুষ আঙুলে টিপে মারতে পারে।
আমরাও ওই অরণ্যের দৈত্যের মত যুদ্ধ করছি না কি? আমরা জীবনযুদ্ধের ঝড় ঝাঁপটা আর হিমবাহের ধাক্কা অনেকটা সহ্য করতে পারি কিন্তু ছোট ছোট দুশ্চিন্তা যা আমরা দুআঙুলে মারতে পারি, তারই কাছে হেরে যাই।
কয়েক বছর আগে আমি উইওমিঙের ট্রেটন ন্যাশানাল পার্কের মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করছিলাম, সঙ্গে ছিলেন উইওমিঙের চার্লস্ সিফ্রেড, আর তার কিছু বন্ধু । সিফ্রেড ছিলেন সেখানকার বড় রাস্তার কর্তা। আমরা সবাই চলেছিলাম জন ডি রকফেলারের জমিদারী দেখতে। কিন্তু ব্যাপার হলো আমি যে গাড়িতে ছিলাম সেটা ভুল পথে গিয়ে প্রায় একঘন্টা পরেই নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছল। মিঃ সিফ্রেডের কাজেই ছিল গেটের চাবি, তাই তিনি ওই একঘণ্টা মশার উৎপাতের মধ্যে বাগান অপেক্ষায় ছিলেন। ওগুলো যে সে মশা নয়, যে কোন সাধুকেও ক্ষেপিয়ে তুলতে পারতো। কিন্তু সেইসব মশারা চার্লস সিফ্রেডকে কিছুই করতে পারেনি। তিনি গাছের একটা ডাল কেটে বাঁশি বানিয়ে দিব্যি তা বাজিয়ে সময় কাটাচ্ছিলেন। আমি বাঁশিটা সযতে রেখে দিয়েছি স্মৃতি হিসেবে–যাতে একজন মানুষ সামান্য ব্যাপার কি করে কাটান সেটা আমার যাতে মনে পড়ে।
দুশ্চিন্তার অভ্যাস কাটাতে হলে দু নম্বর নিয়ম হল :
ছোটখাটো সব ব্যাপারে দুশ্চিন্তা না করে তা ভুলে যাওয়াই উচিত। মনে রাখবেন জীবন ছোট বলেই এত মহান।
০৮. যে নীতিতে অনেক দুশ্চিন্তা দূর হয়
ছোটবেলায় আমি মানুষ হই মিসৌরীর এক খামারে । একদিন মাকে চেরীফল তুলতে সাহায্য করতে গিয়ে আমি কাঁদছিলাম। মা জিজ্ঞেস করলেন, কাঁদছ কেন ডেল? আমি কাঁদতে কাঁদতে জবাব দিলাম, আমার মনে হচ্ছে আমার জ্যান্ত অবস্থায় কবর ঘটবে!
সে সময় আমার নানা দুশ্চিন্তা ছিল । ঝড় বৃষ্টি হলে ভয় লাগতো বজ্রপাতে মারা যাবো। অভাব এলে মনে হত, না খেয়েই মরতে হবে। ভয় লাগতো মরে বোধ হয় নরকেই যাবো। দারুণ ভয় পেতাম আমার চেয়ে বয়সে বড় স্যাম হোয়াইট যখন বলতো আমার বড় বড় কান দুটো সে কেটে নেবে। টপি তললে মেয়েরা আমায় দেখে হাসবে তাই ভেবেও ভয়ে পেতাম। কোন মেয়ে আমাকে বিয়ে করবে না ভেবেও ভীত হতাম। আরও ভয় লাগতো, ঠিক বিয়ের পর বউকে কি কথা বলবো ভেবেও। এই সব নানা অকিঞ্চিৎকর দুশ্চিন্তা আর ভয় আমায় পেয়ে বসত। কিন্তু অনেক বছর পরে দেখলাম, যে সব ভয় আমি করতাম তার শতকরা নিরানব্বই ভাগই ঘটেনি।
যেমন বজ্রপাত সম্পর্কে ভয় পেতাম। কিন্তু এখন জানি বাজপড়ে মৃত্যু ঘটার সম্ভাবনা আমার সাড়ে তিন লক্ষ ভাগে মাত্র এক। আমার জ্যান্ত অবস্থায় কবর হওয়া আরও হাস্যকর–এককোটিতে একজনই মাত্র। অথচ এই নিয়ে আমার ভাবনা ছিল।
প্রতি আটজনে একজন ক্যান্সারে মারা যায়–তাই যদি ভয় পেতে হত তালে ক্যান্সারে ভয় পাওয়াই সঙ্গত ছিলো। বাজ পড়ে বা জ্যান্ত কবর হওয়ার জন্য নয়।
আমি শিশু আর বাল্যকালের দুশ্চিন্তার কথাই বলছি। তবে বয়স্কদেরও অনেক ক্ষেত্রে হাস্যকর রকম ভয় জাসে; আপনি বা আমি এখনই গড়পড়তার নিয়মের মধ্য দিয়ে দেখে নিতে পারি আমাদের দুশ্চিন্তার সত্যিই কারণ আছে কিনা।
বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত বীমা কোম্পানি লন্ডনের লয়েডস বিনা কারণে মানুষের দুশ্চিন্তায় নির্ভর করেই কোটি কোটি টাকা আয় করেছে। লয়েডস বাজী ধরে মানুষকে বলে তারা যে বিপদের ভয় করে তা আদৌ ঘটবে না। অবশ্য ব্যাপারটাকে তারা বাজী ধরা বলেন না, বলেন বীমা করা। আসলে ব্যাপারটা গড়পড়তার নীতিতে কার্যকর। এই প্রতিষ্ঠান দুশো বছর ধরে চলেছে, আর মানুষের প্রকৃতির যদি বদল না ঘটে তবে আরও পঞ্চাশ শতাব্দীই চলতে থাকবে। এই ভাবেই মানুষ জুতো থেকে আরম্ভ করে জাহাজ পর্যন্ত বীমা করে যাবে।
.
আমরা যদি গড়পড়তার নিয়মটা ভালো মত পরীক্ষা করি তাহলে যা দেখব তাতে হতবাক হয়ে যাবো। ধরা যাক, আমি যদি জানি আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে আমাকে গেটিসবার্গের যুদ্ধের মত রক্তাক্ত লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়তে হবে তাহলে আমি ঘাবড়ে যাব । তাহলে যতটা পারি বীমা করিয়ে উইলও করে ফেলবো। আমি বলতে চাইবো, এ যুদ্ধ থেকে আমার বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা বেশ কম–এতএব যতদিন সময় আছে সব গুছিয়ে ফেলি। অথচ ব্যাপারটা হল গড়পড়তার নিয়মে শান্তির সময়ে পঞ্চান্ন বছর বাচা যতটা বিপদজনক গেটিসবার্গ যুদ্ধের সময়েও তাই ছিল। যা বলতে চাই তা হল, শান্তির সময়েও পঞ্চাশ থেকে পঞ্চান্ন বছরে যত মানুষ মারা যায় গেটিসবার্গ যুদ্ধের ১,৬৩,০০০ সৈন্যের মধ্যে প্রতি পাঁচ হাজারে সেই সংখ্যাই মারা পড়ে।
