তাতে কাজ হলো। অচিরেই দারুণ ব্যস্ত হয়ে পড়লাম : দলে দলে ক্রেতারা আসায় তাদের চাহিদা মেটাতে হল। কেবলমাত্র তখনকার কাজ ছাড়া আর কিছুই মনে রইল না। রাত্রি এলে পায়ের ব্যথা ছাড়া আর কিছুই মনে থাকতো না। খাওয়ার পরেই শুয়ে ঘুমিয়ে পড়তাম। দুশ্চিন্তা করার মত আর শক্তি বা সময় আমার থাকেনি।
জন কাউপার পাউইস তার অপ্রীতিকর চিন্তা তাড়ানোর উপায় বইয়ে যা বলেছেন মহিলাটি তাই আবিষ্কার করেন। সেটা এই : কিছু নিশ্চিন্ত নিশ্চিয়তা, কিছুটা প্রগাঢ় মানসিক শান্তি কিছুটা সুখকর বোধশক্তি হীনতা–এইসব মানুষ নামক প্রাণীকে তার কাজে আনন্দ জোগায়।
আর এটায় কত আর্শীবাদই না থাকে। পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত মহিলা অভিযানকারী ওসা জনসন সম্প্রতি আমায় বলেছেন কিভাবে তিনি দুশ্চিন্তা আর দুঃখ ভুলেছিলেন। তার জীবনী ‘আমার সঙ্গী অ্যাডভেঞ্চার’ বইটি আপনি পড়ে থাকতে পারেন। কোন মহিলা অ্যাডভেঞ্চারকে যদি সঙ্গী করে থাকেন তিনিই সেই মহিলা। তাকে ষোল বছর বসে বিয়ে করেন মার্টিন জনসন আর প্রায় উড়িয়ে নিয়ে যান কানসাসের ক্যানিউট শহর থেকে বোর্নিওর জঙ্গলে। প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে এই দম্পতি সারা দুনিয়ার সর্বত্র ঘোরেন এবং এশিয়া ও আফ্রিকার বিলীয়মান প্রাণীদের ছবি তোলেন। ন’বছর আগে আমেরিকায় ফিরে তারা বক্তৃতা দিয়ে বেড়াচ্ছিলেন আর সেইসঙ্গে তাদের বিখ্যাত চলচ্চিত্রগুলো দেখাচ্ছিলেন। এরপর ডেনভার থেকে প্লেনে উপকূলের দিকে যাচ্ছিলেন। প্লেনটা এক পাহাড়ে ধাক্কা খায়। মার্টিন জনসন সঙে সঙ্গেই মারা যান। ডাক্তাররা বলেছিলেন ওসা আর কোনদিন বিছানা ছেড়ে উঠতে পারবেন না। তিন মাস পরে তিনি হুইল চেয়ারে বসলেন কারণ তারা ওসা জনসনকে চিনতেন না। ওই ভাবেই তিনি বক্তৃতা দিয়ে চললেন। আসলে একবছর তিনি প্রায় একলা সভায় বক্তৃতা দিলেন। আমি তাকে প্রশ্ন করেছিলাম তিনি ওই কাজ কেন করলেন। তাতে তিনি জবাব দেন; এটা করি যাতে শোক আর দুশ্চিন্তার কোন অবকাশ আমার না থাকে।
ওসা জনসন টেনিসনের মতোই সেই একশ বছর আগের সত্য আবিষ্কার করেছিলেন : আমায় কাজে জড়িয়ে থাকতে হবে, না হলে আমি হতাশায় পাগল হয়ে যাবো।
একই সত্য আবিষ্কার করেন অ্যাডমিরাল বার্ড, তিনি যখন পাঁচ মাস একটা বাজে কাঠের ঘরে দক্ষিণ মেরুর তুষারাবৃত অঞ্চলে নির্জনে বাস করেন। ওই কুমেরুর তুষার অঞ্চলের পরিধি যুক্তরাষ্ট্র আর ইউরোপের মিলিত এলাকার চেয়েও বড়। সেখানে ছিল প্রকৃতির অপার রহস্য। কোন দিকেই একশ মাইলের মধ্যে কোন প্রাণী ছিল না। ঠাণ্ডা এমনই প্রচণ্ড যে নিঃশ্বাস ফেললেও সেটা জমাট বেঁধে উঠত। সেখানে সম্পূর্ণ একাকী কাটান বার্ড। তার লেখা বই ‘একাকী’তে বার্ড বর্ণনা করেছেন আশ্চর্য আত্মা ধ্বংসকারী অন্ধকারের কথা। দিনও সেখানে রাতের মতই আঁধার ঘেরা ছিল। উম্মাদ হওয়া থেকে রক্ষা পেতেই নিজেকে তার ব্যস্ত রাখতে হত।
তিনি লেখেন : রাত্রিবেলা লণ্ঠন নেভানোর আগে আমি পরের দিনের কাজের তালিকা তৈরী করে রাখতাম। নিজেই নিজেকে কাজ দিতাম–পালানোর সুড়ঙ্গের কাজে একঘন্টা, আধঘন্টা বরফ সমান। করার কাজ, একঘণ্টা বইয়ের তাক কাটার কাজ ইত্যাদি…।
তিনি লিখেছেন, এইভাবে কাজ করাটা চমৎকার লাগত। এটা আমার নিজের উপর দারুণ নিয়ন্ত্রণ আনতে সাহায্য করে…ওটা না থাকলে সারাটা দিনই আমার কাছে উদ্দেশ্য বিহীন হয়ে পড়তো। আর তাহলে দিনও শেষ হ’ত অসম্পূর্ণ ভাবেই।
আপনি বা আমি যদি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হই তাহলে মনে রাখবেন আমরা প্রাচীন সেই কাজ করাকে ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করতে পারি। হার্ভার্ডে–র ক্লিনিক্যাল মেডিসিনের ভূতপূর্ব অধ্যাপক ডাক্তার রিচার্ড সি. ক্যাবটের মত লোকই সেটা বলেছেন। তিনি তাঁর বই মানুষ কিসে বাঁচে’ বইতে বলেছেন, ডাক্তার হিসেবে আমি আনন্দের সঙ্গে লক্ষ্য করেছি কাজ করার ফলে লোকে সন্দেহ, ইতস্তত ভাব, অনিশ্চয়তা ইত্যাদি থেকে জন্মানো পক্ষাঘাত, যাতে লোকে কাঁপতে থাকে এই রোগ সেরে গেছে…যে কাজ থেকে সাহসের জন্ম তাকে চিরস্থায়ীরূপে গৌরবান্বিত করেছেন এমার্সন।
আপনি বা আমি যদি ব্যস্ত না থাকি–শুধু বসে চিন্তা করি–তাহলে তা থেকে জন্ম নেবে চার্লস্ ডারউইন যা বলেছেন দুষ্ট প্রকৃতির ভূত। এই ভূত আমাদের কাজের আর ইচ্ছা শক্তিকে ধ্বংস করে ফেলে।
আমি নিউইয়র্কের একজন ব্যবসায়ীকে জানি যিনি ওই ভুতকে নানা ধরনের কাজের মধ্য দিয়ে দূর করেন। তার নাম হলো ট্রেম্পার লংম্যান। দুশ্চিন্তা করার কোন সময় তার থাকেনি। তিনি আমার বয়স্ক শিক্ষার কাসে এসে এই কাহিনী শুনিয়েছিলেন : আঠারো বছর আগে দুশ্চিন্তায় আমার নিদ্রাহীনতা ধরেছিল। আমি শক্ত, বিরক্ত আর খিটখিটে হয়ে পড়ি। আমার ভয় হচ্ছিল হয়তো স্নায়বিক অবসাদে ভেঙে পড়ব।
আমার দুশ্চিন্তার কারণও ছিলো। আমি নিউইয়র্কের ক্রাউন ফুট কোম্পানির কোষাধ্যক্ষ ছিলাম। এক গ্যালন টিনের পাত্রে স্ট্রবেরি ভরার জন্য আমাদের পাঁচ লক্ষ ডলার নিয়োগ করা হয়। বিশ বছর ধরেই আমরা এইসব আইসক্রিম কোম্পানীদের বিক্রি করে আসছিলাম। আচমকা আমাদের বিক্রি পড়ে গেল। কারণ আইসক্রিম প্রস্তুকারীরা তাদের উৎপাদন বাড়াতে চেয়ে তারা গ্যালন টিনের পরিবর্তে বড় বড় ব্যারেলের স্ট্রবেরি কিনছিলো।
