বিখ্যাত বিজ্ঞানী পাস্তুর বলেন গবেষণাগার আর পাঠাগারেই শান্তি থাকে। এরকম শান্তি সেখানে কেন থাকে? কারণ মানুষ সেখানে নিজের কাজে এমনই ব্যস্ত থাকে যে দুশ্চিন্তার সময় থাকে না। গবেষণাকারীদের কচিৎ স্নায়বিক অবসাদ ঘটে, কারণ এ বিলাসিতার সময় তাদের থাকে না।
ব্যস্ত থাকার মত সহজ ব্যাপারে দুশ্চিন্তা দূর হয় কেন? এর কারণ মনস্তত্বের একটা সরল নিয়ম। সেটা হলো : কোন মানুষ তিনি যতই বুদ্ধিমান হোন কিছুতেই একই সময়ে একাধিক বিষয়ে ভাবতে পারে না। বিশ্বাস করতে পারছেন না? তাহলে আসুন একটা পরীক্ষা করা যাক।
আপনি চেয়ারে হেলান দিয়ে ভাবুন তো স্ট্যাচু অব লিবার্টির কথা আর তার সঙ্গে কাল সকালে কি কি করবেন।
আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন যে একটার পর একটা ভাবতে পারছেন কিন্তু কিছুতেই একসঙ্গে নয়। আবেগের ক্ষেত্রেও তাই। কোনো উৎসাহের কাজে জড়িত থেকে একই সঙ্গে উদ্বেগে আমরা কাহিল হইনা। একটা আবেগ অন্যটাকে দূর করে দেয়। আর এই সহজ ব্যাপার আবিষ্কারের ফলেই সামরিক মনস্তত্ববিদেরা যুদ্ধে অলৌকিক ঘটনা করতে পারে।
যুদ্ধের অভিজ্ঞতা নিয়ে সৈন্যরা বাড়ি ফিরলে তাদের প্রায়ই তাদের সাইকো নিউরোটিক নামক এক প্রকার রোগ হত। তাদের চিকিৎসার জন্য ডাক্তাররা ব্যস্ত রাখতে বলতেন। এইসব লোকদের যা অবস্থা, প্রতিটি মুহূর্ত কাজে ব্যস্ত রাখা হত–বিশেষ করে মাছধরা, শিকার, বল খেলা, গলফ খেলা, ছবি তোলা, বাগান তৈরি, নাচ ইত্যাদিতে। তাদের অভিজ্ঞতা নিয়ে ভাবতেই সময় দেওয়া হত না।
কাজকে ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করার মনস্তাত্ত্বিক নাম হলো ‘অকুপেশনাল থেরাপি’ (ব্যস্তরাখার ওষুধ)। এটা নতুন নয়। প্রাচীন গ্রীক ডাক্তাররা খ্রীষ্টের জন্মের পাঁচশ বছর আগেও এই বিধান দিতেন।
বেন ফ্রাঙ্কলিনের সময়েও কোয়েকার সমিতি এটা ফিলাডেলফিয়ায় ব্যবহার করতেন। কোয়েকার স্যানাটোরিয়ামে ১৭৭৪ সালে একজন গিয়ে অবাক হয়ে দেখেন মানসিক রোগীরা শনের তন্তু বুনছে। তিনি ভেবেছিলেন লোকগুলোকে বেআইনীভাবে শোষণ করা হচ্ছে। পরে কোয়েক সমিতি তাকে বুঝিয়ে দেন আসলে কাজে ব্যস্ত থাকায় রোগীদের মানসিক উন্নতি হয়। এতে স্নায়ু শান্ত থাকে।
যে কোন মনস্তাত্ত্বিকই বলবেন কাজে ব্যস্ত থাকাই স্নায়ুর পক্ষে সেরা দাওয়াই। হেনরি ডব্লিউ লঙফেলো সেটা বুঝেছিলেন তিনি যখন তার তরুণী বধূকে হারান। আগুনে পুড়ে তার স্ত্রীর মৃত্যু হয়। কিছুদিন পর্যন্ত লঙফেলো এমন শোকে কাটালেন যে প্রায় পাগল হওয়ার মতই হন। তবুও তার তিনটি ছোট ছেলেমেয়েকে দেখতে হতো–একেবারে তাদের বাবামার মতই তাকে হতে হয়। তিনি তাদের বেড়াতে নিয়ে যান, গল্প শোনান, খেলা করেন। ছেলেদের ঘন্টা নামের বইতে তিনি তার ছেলেমেয়েদের সঙ্গের মুহূর্তগুলো অমর করে গেছেন। তিনি দান্তের অনুবাদও করেন। ওইসব করতে গিয়ে তিনি এতই ব্যস্ত থাকতেন যে নিজেকে একেবারে ভুলে মানসিক শান্তি ফিরে পান। টেনিসন লিখেছিলেন তার প্রিয় বন্ধু আর্থার হ্যাঁলামকে হারিয়ে বলেছিলেন, আমায় কাজে ব্যস্ত থাকতে হবে, না হলে আমি হতাশায় পাগল হয়ে যাব।
আমাদের অনেককেই নিজেদের কাজের মধ্যে হারিয়ে ফেলতে বেগ পেতে হয় না। কিন্তু কাজের পরবর্তী সময়টাই হল মারাত্মক। কাজের পর যখন আমাদের অবসর কাটানোর কথা তখনই দুশ্চিন্তার কালো মেঘ আমাদের ঘিরে ধরে। তখনই মনে হয় যেন জীবনে কিছু হলো না।
.
আমরা যখন ব্যস্ত থাকি না আমাদের মন তখন শূন্য হয়ে যায়। পদার্থবিদ্যার প্রতিটি ছাত্রই জানে প্রকৃতি শূন্যতাকে ঘৃণা করে। জ্বলন্ত বাল্বের মধ্যে যে শূন্যতা, বাল্বটা ভাঙলেই সেটা থাকে না–প্রকৃতি তখন সেখানে বাতাস পূর্ণ করে দেয়।
প্রকৃতি শূন্যমন ভরাট করতে চায়। কিন্তু কি দিয়ে? স্বভাবতই আবেগ দিয়ে। কেন? কারণ আবেগ হলো–দুশ্চিন্তা, ভয়, ঘৃণা, ঈর্ষা এইসব থেকেই আসা–এগুলোর জঙ্গলের শক্তি থাকে। এই সব আবেগের এতই ক্ষমতা যে শান্তি আর সুখের চিন্তাকে ঘরছাড়া করে দেয়।
কলম্বিয়ার শিক্ষা বিভাগের অধ্যাপক জেম্স এল মুর্শেল চমৎকারভাবে বলেছেন : দুশ্চিন্তা আপনার কাজে থাকার সময় ভর করে না বরং দিনের কাজের শেষেই করে। সে সময় আপনার কল্পনাগুলো উদ্ভট হতে চায় সমস্ত রকম অসম্ভব কথা মনে হতে চায়, ছোটখাটো ভুলকে বিরাট মনে হয়। এই সময় আপনার মনটা মোটর চালিত হয়ে চলে, কোনোরকম বোঝা তখন এই মোটর টানে না। মোটর এত জোরে চলে যেন মনে হয় মনকে পুড়িয়ে ভেঙে নিঃশেষ করে দেবে। দুশ্চিন্তা তাড়ানোর একমাত্র পন্থা হলো তাই গঠনমূলক কিছু করা।
এটা বুঝতে হলে আর বাস্তবে কাজে লাগাতে আপনাকে কলেজের অধ্যাপক হতে হবে না। যুদ্ধের সময় একজন শিকাগোর গৃহকত্রীর সঙ্গে কথা বলেছিলাম, তিনি আমায় বলেন তিনি দেখেছেন দুশ্চিন্তা তাড়াবার একমাত্র উপায় হলো গঠনমূলক কোন কাজে ব্যাপৃত থাকা।
ভদ্রমহিলা আর তার স্বামীর সঙ্গে আমার আলাপ হওয়ার পর তিনি আমায় বলেন যে তাদের ছেলে। পার্ল হারবার আক্রমণের পরদিন যুদ্ধে যোগ দেয়। ক্রমাগত তার ছেলের কথা মনে হত। সে কোথায় আছে? সে নিরাপদ তো? নাকি যুদ্ধ করছে? সে কি আহত হবে? মারা যাবে না তো?
আমি যখন তার কাছে কিভাবে দুশ্চিন্তা দূর করলেন জানতে চাই তিনি জবাব দিয়েছিলেন : আমি কাজে ব্যস্ত থাকতে চাইলাম। প্রথমে তাদের ঝিকে ছাড়িয়ে দিয়ে তিনি নিজেই সব ঘরের কাজ করতে লাগলেন, কিন্তু তাতে খুব সুবিধে হলো না। তিনি বলেছিলেন : মুশকিল হল ঘরের কাজ যান্ত্রিক ভাবেই করা হত, মনের ব্যবহার দরকার হতো না। তাই ঘরের কাজ করতে গিয়ে বুঝলাম আমার অন্য কিছু কাজ চাই যাতে সারাদিন শারীরিক আর মানসিকভাবে ব্যস্ত থাকি। তাই একটা বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে কাজ নিলাম।
