হাঁটার চেষ্টা করাটা এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে নিদারুণ দৈহিক যন্ত্রণার মতো। সেই যন্ত্রণা পুরো দেহে ছড়িয়ে পড়েছে। তারপর মনে হলো এর আর অস্তিত্ব নেই। এখন তার ভেতরে কিছু একটা জ্বলছে, সেটা তাকে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে মরে যেতে দিচ্ছে না।
বাতাসের ঝাপটায় মুখ ঢেকে রাখা কাপড়টা সরে যেতেই খোলা মুখের চামড়ায় জ্বলন্ত সূর্যের তেজ কেটে বসেছে। তারপর আবার সে মুখ থুবড়ে বালুতে পড়ে গেল, আবার জামাল তাকে টেনে তুলল। এবার সে জামালের চওড়া কাঁধে এলিয়ে পড়ল। সে ভ্রু কুঁচকে মাথা ঝাঁকাল, চেষ্টা করল পরিষ্কারভাবে সবকিছু ভাবতে, কিন্তু কোন কাজ হলো না। এখন আর কোন কিছুই ভাল নেই। সে অন্ধকার একটা তাপের শূন্যতার মাঝে সেঁধিয়ে একটু একটু করে তার সব স্মৃতি হারিয়ে ফেলল।
তার মুখে বালু ঢুকেছে। সে তার হাতের আঙুল দিয়ে মাটি আঁচড়াতে লাগল। কিন্তু এবার কোন শক্ত হাত তাকে ধরে টেনে তুলল না। এবার সে সম্পূর্ণ একা। জামাল চলে গেছে।
সে আর কখনো সেই মেয়েটির কাছে ফিরে যেতে পারবে না। ফর্সা হাত পা আর শীতল ঠোঁট যে মেয়েটির। যাকে সে সারা জীবন ধরে চেয়েছে, তার সাথে মিশে দুজনে এক সত্তা হয়ে বেঁচে থাকবে। দুজনে এক সাথে মিলে জীবনকে উপভোগ করবে পরিপূর্ণভাবে।
সে কি গ্যাভিন কেইন নাকি সে আলেক্সিয়াস, দ্য গ্রিক। দশম লিজিয়নের একশে সেনাদলের নেতা। আর সেই ফর্সা হাতপা আর শীতল ঠোঁটের মেয়েটি কে? এর কোন উত্তর নেই। অন্তত পৃথিবীর বুকে নেই।
পানির ঝাপটা তার মুখের উপর পড়তেই যেন একটা প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়ে সে জেগে উঠল। কপাল থেকে পানি বেয়ে মুখে ঢুকতেই প্রচণ্ডভাবে কাশতে শুরু করল। একটা শক্ত হাত তাকে ধরে তুলল আর দাঁতের ফাঁকে ধাতব পানির বোতলের মুখ ঢুকিয়ে দিল। সে গপ গপ করে পানি গিলতেই বিষম খেলো।
লাল লাল ফোলা চোখ খুলে সে দেখল জর্ডন তাকে এক হাঁটুর উপর ঠেস দিয়ে ধরে রেখেছে। পেছনে একটা ট্রাক পার্ক করা রয়েছে।
কেইন মুখ খুলে কোন মতে এটুকু বলতে পারল-পেছনে মরুভূমিতে, সে কর্কশ কণ্ঠে বলল, তুমি ওদেরকে তাড়াতাড়ি নিয়ে এসো।
জর্ডন ওকে আশ্বস্ত করে মাথা নাড়ল। কোন কিছু নিয়ে তুমি চিন্তা করো না। ওদের আনার ব্যাপারে বন্দোবস্ত করা হয়েছে। আমার অন্য ট্রাকটা নিয়ে তোমার সেই বিশালদেহী সোমালি লোকটা পথ দেখিয়ে আমার দুজন লোককে সাথে করে নিয়ে গেছে। সে হেসে বলল। জামাল সত্যি একটা মানুষ বটে।
কিন্তু কেইন আর কোন কিছু শুনতে পেল না। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সে দুচোখ বুঝলো। সব কিছু তার সামনে অন্ধকার হয়ে গেল।
.
১৭.
সে ধীরে ধীরে চোখ খুলল। একটা মুহূর্ত তার মন সম্পূর্ণ ফাঁকা হয়েছিল। সে একটি কনুইয়ে ভর দিয়ে বসল, আতঙ্কে তার মন ছেয়ে গেল। তারপর সব কিছু মনে পড়তেই একটা লম্বা শ্বাস ফেলে আবার শুয়ে পড়ল।
সে একটা ক্যাম্প খাটে শুয়েছিল, মাথার উপর চারটে খুঁটির উপর ঝোলানো একটা নিচু ছাউনি। কাছেই দুটো ট্রাক পার্ক করা আর কয়েক গজ দূরে একটা তাঁবু খাটানো হয়েছে।
কেইন নড়ে উঠতেই খাটের পায়ের কাছে মাটিতে আসন গেড়ে বসে থাকা জামাল উঠে এসে তার উপর ঝুঁকে দৃষ্টি বুলালো। দুজনের মাঝে চোখাচোখি হতেই জামালের মুখ হাসিতে ভরে উঠল। কেইন নিঃশব্দে একটি হাত বাড়াল।
জামাল হাতটা ধরল, তারপর ধীরে ধীরে তার মুখ থেকে মৃদু হাসিটা চলে গেল। একটা মুহূর্ত তাদের মধ্যে এমন একটা অনুভূতির সৃষ্টি হলো যা এর আগে ছিল না। তারপর সে ঘুরে জর্ডনের দিকে এগোলো, সে তখন ক্যাম্পের মাঝখানে একটা স্পিরিট স্টোভের উপর ঝুঁকে দাঁড়িয়েছিল।
একহাতে একটা পট আর অন্য হাতে একটা প্লাস্টিক কাপ নিয়ে জর্ডন কেইনের কাছে এল। কফি?’ সে দাঁত বের করে হাসল।
কেইন মাটিতে পা নামিয়ে খাটের উপর বসল। তখনো তার মাঝে দুর্বলতা আর মাথা হালকা মনে হচ্ছিল। আর সবকিছু কেমন অবাস্তব আর আবছা আবছা মনে হচ্ছিল।
খানিকটা কফি গিলতেই গরম কফি গলা বেয়ে পেটে পড়তেই সে শিউড়ে উঠল। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে আসলে আমার এখানে থাকার কথা নয়।’
জর্ডন বলল, কম করে বললে তাই ভাবতে পার।
কেইন ছাউনি থেকে উবু হয়ে বাইরে বের হল। ওরা পাহাড়ের পাদদেশেই তাঁবু গেড়েছে। সামনেই মরুভূমি চলে গেছে দূরে। আমরা এখন কোথায়?
‘শাবওয়া থেকে দশ বারো মাইল দূরে আছি,’ জর্ডন উত্তর দিল। ‘তাড়াহুড়া করে এখানে ক্যাম্প করেছি কারণ কানিংহাম আর তার স্ত্রীর অবস্থা কেমন তা বুঝে উঠতে পারিনি।’
‘এখন কেমন আছে ওরা?’ কেইন জিজ্ঞেস করল।
জর্ডন তাকে একটা সিগারেট দিয়ে বলল, সামান্য পানি শূন্যতায় ভূগছে, আর সব ঠিক আছে। আমি ওদের দুজনকেই ঘুমের ওষুধ দিয়েছি। ওরা তাঁবুতেই ঘুমিয়ে আছে।
কেইন সিগারেটে একটা লম্বা টান দিল। আমাদের ভাগ্য ভাল যে তুমি জামালের দেখা পেয়েছিলে। এত দূরে মরুভূমিতে তুমি কি করছিলে?’
‘গত তিন দিন ধরে আমি তোমাদের খুঁজছিলাম, জর্ডন বলল। মেরি যে ট্রাকটা নিয়ে গিয়েছিল সেটা নিয়ে ফিরে না আসায়, ট্রাকের ড্রাইভার– পরদিন সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করে আমার কাছে এসে খবরটা জানাল। গতকাল এরোপ্লেনটা পেয়েছি কিন্তু ট্রাকের কোন চিহ্ন নেই। আমি ভাবলাম হয়তো ফেরার পথে ট্রাকটা নষ্ট হয়ে কোথাও না কোথাও পড়ে রয়েছে। আমরা এরোপ্লেন আর এই জায়গার মাঝে খুঁজতে খুঁজতে জামালের দেখা পেলাম।
