ব্ল্যাক অর্ডার ( (সিগমা ফোর্স – ৩)

 ০১. রুফ অফ দ্য ওয়ার্ল্ড

ব্ল্যাক অর্ডার – জেমস রোলিন্স / রূপান্তর : সাঈম শামস্ – নিউ ইয়র্ক টাইমস্ বেস্টসেলার

সিগমা ফোর্স # ৩

জীববিজ্ঞানের মেরুদণ্ড হলো বিবর্তনবাদ। এই অংশ বিজ্ঞানের একটি উন্নত থিওরির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এখন প্রশ্ন হলো, বিবর্তনবাদ বিজ্ঞান নাকি বিশ্বাস?
–চার্লস ডারউইন

বিজ্ঞান ছাড়া ধর্ম পঙ্গু, ধর্ম ছাড়া বিজ্ঞান অন্ধ।
–আলবার্ট আইনস্টাইন

কে বলে আমি ঈশ্বরের বিশেষ নিরাপত্তায় নেই?
–অ্যাডলফ হিটলার

.

ইতিহাস থেকে

দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের শেষ কয়েক মাসে যখন জার্মানির অবস্থা একেবারে শোচনীয় তখন কে কার আগে নাৎসি বিজ্ঞানীদের বিভিন্ন প্রযুক্তি লুঠ করবে তা নিয়ে মিত্রবাহিনীর মধ্যে নতুন এক যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। এই লুঠ প্রতিযোগিতায় নেমেছিল ব্রিটিশ, আমেরিকান, ফ্রেন্স এবং রাশিয়ানরা। যে যার মতো করে নিজের দেশের জন্য লুঠপাট চালিয়েছিল। অনেক পেটেন্ট লুষ্ঠিত হয়েছিল তখন। যেমন : নতুন ভ্যাকুয়াম টিউব, চমকপ্রদ কেমিক্যালস, প্লাস্টিকস্ এমনকী ইউ ভি লাইটসহ পাস্তুরিত তরল দুধ! কিন্তু স্পর্শকাতর অনেক পেটেন্ট স্রেফ গায়েব হয়েছিল। যেমন : অপারেশন পেপার ক্লিপ; একশ নাৎসি ভি-২ রকেট বিজ্ঞানীদেরকে গোপনে নিযুক্ত করে আমেরিকায় নিয়ে আসা হয়েছিল তখন। পরে অপারেশন পেপার ক্লিপ সম্পর্কে তেমন কিছু আর জানা যায়নি।

তবে নিজেদের প্রযুক্তি বিনা যুদ্ধে সপে দেয়নি জার্মানরা। গোপন প্রযুক্তি ও পরবর্তী রাইখ প্রজননর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার জন্য তারা অনেক চেষ্টা করেছিল। বিজ্ঞানীদের খুন করা, রিসার্চ ল্যাব ধ্বংস করে দেয়া থেকে শুরু করে গুহায় প্রিন্ট লুকিয়ে রাখা, লেকের পানিতে ডুবিয়ে দেয়া, ভূগর্ভস্থ কোটরে পুঁতে দেয়ার মতো নানান পদক্ষেপ নিয়েছিল তারা। আর এসবই ছিল মিত্রবাহিনীর হাত থেকে নিজেদের প্রযুক্তি রক্ষা করার বিভিন্ন কৌশল।

নির্বিচারে লুণ্ঠন অভিযান চলেছিল। নাৎসিদের রিসার্চ এবং অস্ত্রের ল্যাব ছিল সংখ্যায় শত শত। কতগুলো ছিল মাটির নিচে, বাকিগুলো জার্মানের বিভিন্ন জায়গায় ছড়ানো-ছিটানো। এছাড়াও অস্ট্রিয়া, চেকোস্লোভাকিয়া এবং পোলান্ডেও তাদের অস্তিত্ব ছিল। তারমধ্যে সবচেয়ে রহস্যময় ছিল ব্রিসলাউ শহরের বাইরে অবস্থিত একটি রূপান্তরিত খনি। রিসার্চ ফ্যাসিলিটির কোড নাম ছিল “দ্য বেল”। এই রিসার্চ ফ্যাসিলিটির আশেপাশের এলাকার বাসিন্দারা বিভিন্ন সময় রিপোর্ট করেছিলেন, অদ্ভুতুড়ে আলো দেখা, রহস্যময় মৃত্যু ও বিভিন্ন অজানা রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন তারা।

রাশিয়ান ফোর্স খনিতে পৌঁছেছিল সবার আগে। তারা গিয়ে রিসার্চ ফ্যাসিলিটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পায়। এই প্রজেক্টের সাথে জড়িত ৬২ জন বিজ্ঞানীর সবাইকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। আর ফ্যাসিলিটির বাদ বাকি সব সরঞ্জাম কোথায় গায়েব হয়েছিল সেটা এক ঈশ্বর ছাড়া আর কেউ জানে না।

সে যা-ই হোক, তবে এতটুকু নিশ্চিত “দ্য বেল”-এর অস্তিত্ব সত্যি সত্যিই ছিল।

.

প্রস্তাবনা

১৯৪৫ ৪ঠা মে, সকাল ৬:২২ মিনিট।
ফরট্রেস সিটি অফ বিসলাউ, পোল্যান্ড

পয়ঃনিষ্কাশন পাইপের ভেতরে থাকা নোংরা পানিতে একটা ছেলের লাশ ভাসছে। ফুলে কেঁপে উঠেছে লাশটা। জুতোর ফিতে, প্যান্ট, শার্ট এগুলোতে দাঁত বসাচ্ছে ইঁদুর। সেনাবাহিনী হামলার স্বীকার এ-শহরের কোনকিছুই অপচয় হয় না।

লাশটার পাশ দিয়ে চলে যাওয়ার সময় নাক কুঁচকালো জ্যাকব স্পোরেনবার্গ। নাড়ি-ভূড়ি, বিষ্ঠা, রক্তের দুর্গন্ধ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ওয়েট মাস্ক নাকে-মুখে জড়িয়ে রেখেছে। যুদ্ধের তিক্ত স্বাদ পাচ্ছে ও। সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় পয়ঃনিষ্কাশন পাইপ দিয়ে এখন তুলনামূলক কম লাশ যাচ্ছে। জ্যাকবের এখানে কিছু করার নেই। কিন্তু ওপর থেকে নির্দেশ দেয়া আছে, থাকতে হবে।

মাথার ওপরে এক জোড়া রাশিয়ান কামান শহরের বারোটা বাজিয়ে দেয়ার কাজ করছে। প্রতিটি গোলা বিস্ফোরণের সময় পুরো শরীরসহ নাড়ি-ভূড়ি কেপে উঠছে জ্যাকবের। রাশিয়ানরা গেট ভেঙ্গেছে, বোমা মেরেছে এয়াপোর্টে। কাইসারট্র্যাসে সাধারণ পরিবহন নেমে গেছে এমন অবস্থাতেও তাদের ট্যাংকগুলো সড়কগুলোতে দুলকিচালে ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রধান সড়ককে রূপান্তর করা হয়েছে ল্যান্ডিং স্ট্রিপে। আড়াআড়ি তেলের ব্যারেল বসিয়ে ব্যারেল থেকে ধোয়া তৈরি করে করা হচ্ছে কাজটা। ব্যারেলগুলো থেকে বেরুনো ধোঁয়ায় ছেয়ে গেছে ভোরের সকাল। আকাশ আজকে ভোর থেকে আর সকালে রূপান্তরিত হতে পারছে না। প্রতিটি রাস্তায়, গলিতে যুদ্ধ হচ্ছে। প্রতিটি বাড়ির বেসমেন্ট থেকে শুরু করে চিলেকোঠা পর্যন্ত যুদ্ধে জর্জরিত।

প্রতিটি বাড়ি যেন একেকটি দূর্গে পরিণত হয়।

সাধারণ জনতার উদ্দেশে গাউফিফটার হ্যাঁঙ্কস-এর শেষ নির্দেশ ছিল এটা। শহরকে যতক্ষণ সম্ভব নিজেদের কজায় রাখতে হবে। এর ওপর জার্মানির তৃতীয় প্রজন্ম নির্ভর করছে।

জ্যাকব স্পেরেনবার্গের ওপরেও নির্ভর করছে অনেক কিছু।

নিজের পেছনে থাকা অধীনস্থদের ওপরে গর্জে উঠল জ্যাকব। ওর ইউনিট হলো–স্পেশাল ইভ্যাকুয়েশন কমান্ডো। অর্থাৎ, জরুরি মুহূর্তে কোনো কিছু স্থানান্তর কিংবা অপসারণ করার কাজে ওর টিম দক্ষ।

হাঁটু পর্যন্ত ডুবে যাওয়ায় নোংরা পানি ঠেলে টিমের সদস্যরা জ্যাকবের পেছন পেছন আসছে। সংখ্যায় ওরা ১৪ জন। সবাই সশস্ত্র। সবার পোশক কালো। ভারী প্যাক বইছে সবাই। টিমের মাঝখানে অবস্থান করছে চারজন দীর্ঘাকায় সদস্য, এরা সবাই ইউরোপীয় সাবেক কম্যান, অতীতে বিভিন্ন জাহাজ ও বন্দরে পণ্য খালাস করার কাজ করে এসেছে। এদের কাঁধে রয়েছে ছিদ্রকারী পোল। বেজায় ওজন পোলগুলোর।

জার্মানি ও পোল্যান্ডের মধ্যে সাডেটেনে অবস্থিত এই নিঃসঙ্গ শহরে রাশিয়ানদের আক্রমণ করার একটা বিশেষ কারণ আছে। হাইল্যান্ডে যাওয়ার প্রবেশদ্বারে কড়া নিরাপত্তা পাহারা হিসেবে কাজ করছে ব্রিসলাউ’র দুর্গগুলো। বিগত দু’বছর ধরে নানান শ্রমিকদেরকে ধরে একটা পাহাড়ে গর্ত খোঁড়ার কাজে জড়ো করা হয়েছে গোসরোজেন ক্যাম্পে। তাদেরকে দিয়ে ১০০ কিলোমিটার টানেল খুড়িয়ে তারপর সেটাকে ধসিয়ে দেয়া হয়েছে। আর এসব কাণ্ড করা হয়েছে একটা গোপন প্রজেক্টকে মিত্রবাহিনীর লোপ চোখ থেকে আড়াল করার জন্য।

ডাই রেইজ… দ্য জায়ান্ট।

কিন্তু এত কাজ করেও ঘটনা পুরোপুরি গোপন করা যায়নি। ওয়েনসেলস্ মাইনের বাইরের কোনো এক গ্রামের বাসিন্দারা অদ্ভুত সব রোগ নিয়ে কানাঘুষা করেছিল। রহস্যময় রোগগুলো শুধু সেই বিশেষ এলাকার বাসিন্দাদেরকেই ভোগায়নি, যারা পার্শ্ববর্তী এলাকায় বাস করতো তাদেরকেও ভুগিয়েছে।

যদি প্রজেক্টের বিজ্ঞানীরা তাদের রিসার্চ সম্পন্ন করার জন্য আরও সময় পেতেন…

জ্যাকবের মনের এক অংশে এখন সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। গোপন সেই প্রজেক্ট সম্পর্কে সে আসলে সবকিছু জানতে পারেনি। অধিকাংশই হলো কোড নেম। যেমন : ক্রোনস। তবে সে যতটুকু জানতে পেরেছে সেটাও নেহাত কম নয়। প্রজেক্টের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজে ব্যবহৃত বডি দেখেছে সে। তাদের চিৎকার শুনেছে।

বিভীষিকা!

জ্যাকবের মনে ওই একটা শব্দ এলো। পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা ভাবতেই যেন ঠাণ্ডা হয়ে গেল ওর রক্ত।

বিজ্ঞানীদের পরপারে পাঠাতে ওর কোনো সমস্যা হয়নি। ৬২ জন পুরুষ ও এক নারীকে বাইরে নিয়ে গিয়ে দু’বার করে মাথায় বুলেট ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। ওয়েনসেলস মাইনের গভীরে কী হচ্ছিল… কিংবা এখানে এসে কী পাওয়া গিয়েছিল সেটা কারো জানা চলবে না। শুধু একজন গবেষককে প্রাণে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে।

ডক্টর টোলা হিরজফিল্ড।

জ্যাকব শুনতে পেল ওর পেছন পেছন আসতে টোলা হিরজফিল্ড গাইগুই করছে। অনেকটা টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে আসা হচ্ছে তাকে। দু’হাত পিছমোড়া করে বাঁধা। ডক্টর টোলা মেয়ে হিসেবে বেশ লম্বা। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। ওর স্তনগুলো ছোট হলেও প্রশস্ত কোমর আর পা দুটো বেশ সুগঠিত। চুলের রং কালো, মসৃণ। তিন মাস মাটির নিচে, সংরক্ষিত দুধের মতো ফ্যাকাসে রঙের ত্বক ওর। অন্য সবার সাথে ওকেও মেরে ফেলা হতো কিন্তু বাবা হিউগো হিরজফিল্ডের কারণে বেঁচে যাচ্ছে ও। প্রজেক্টের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কর্মরত ছিলেন হিউগো। কিন্তু তার রক্তে দুর্নীতির কণা বইছে, একদম শেষ মুহূর্তে এসে সেটা প্রমাণ করে দিয়েছেন। ইহুদির রক্ত বইছে তার শরীরে। নিখাদ ইহুদি হলে এক কথা ছিল কিন্তু তিনি হলেন শংকর জাতের ইহুদি। যাকে বলে, আধা-ইহুদি। নিজের রিসার্চের যাবতীয় ফাইল ধ্বংস করার চেষ্টা করেছিলেন হিউগো কিন্তু অফিসে আগুন লাগানোর আগেই একজন গার্ড তাকে গুলি করে। তার মেয়ের কপাল ভাল, এই রিসার্চ সম্পর্কে পুরো জ্ঞান আছে ওর। ডক্টর টোলা রিসার্চের কাজগুলো চালিয়ে যেতে পারবে। বাবার মতো মেয়েও অনেক মেধাবী। এখানকার অন্য কোনো বিজ্ঞানীর চেয়ে টোলা ওর বাবার রিসার্চ সম্পর্কে বেশি জ্ঞান রাখে।

কিন্তু ওকে ভয় না পাইয়ে প্রলোভন দেখিয়ে এখান থেকে নিয়ে গেলেই বরং ভাল হতো।

যখনই টোলার দিকে তাকাচ্ছে তখনই ওর চোখে ঘৃণার আগুন দেখতে পাচ্ছে জ্যাকব। ওর সেই ঘৃণার উত্তাপ জ্যাকব বেশ ভাল করে টের পাচ্ছে। সমস্যা নেই, মেয়েটা ঠিক ওর বাবার মতো সহযোগিতা করবে। ইহুদিদের সাথে কীভাবে চলতে হয় সেটা জ্যাকবের ভাল করেই জানা আছে। বিশেষ করে এরকম আধা-ইহুদিদের ব্যাপারে সে একজন বিশেষজ্ঞ।

শংকর জাত।

আধা-ইহুদি, এরা সবচেয়ে জঘন্য। জার্মানির সেনাবাহিনীতে প্রায় লাখ খানেক আধা-ইহুদি আছে। ইহুদিদের চেয়ে আধা-ইহুদিদের একটু বেশিই খাটতে হয়। কোনো ক্ষেত্রে জীবন দেয়ার প্রয়োজন হলে সেখানে এইসব আধা-ইহুদিদেরকে পাঠানো হয়ে থাকে। সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়ার সময়ও বাড়তি পরীক্ষা দিয়ে ঢুকতে হয় আধা-ইহুদিদের। তাদেরকে প্রমাণ করতে হয়, সৈন্য হিসেবে তারা অনেক কঠোর ও হিংস্র, জার্মান সরকারের প্রতি তাদের আনুগত্য ইহুদিদের চেয়েও বেশি।

যতই আনুগত্যের পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হয়ে আসুক না কেন, জ্যাকব কখনো এসব আধা-ইহুদিদেরকে বিশ্বাস করে না। টোলার বাবা-ই জ্যাকবের অবিশ্বাসকে সঠিক প্রমাণ করে দিয়েছেন। হিউগোকে রিসার্চের যাবতীয় তথ্য ধ্বংস করার চেষ্টা করতে দেখে জ্যাকব মোটেও অবাক হয়নি। ইহুদিদের কখনো বিশ্বাস করতে নেই, ওদেরকে শেষ করে দিতে হয়।

কিন্তু হিউগো হিরজফিন্ডকে হত্যা করার অর্ডারে স্বয়ং ফাহরির সাইন করেছেন। সেই অর্ডারে শুধু এই আধা-ইহুদি বাবার মেয়েই নয় জার্মানের মাঝখানে কোনো এক জায়গায় বসবাসরত একজোড়া বুড়ো বাবা-মা’কেও বাঁচিয়ে রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। শংকর জাতের ইহুদিদের প্রতি জ্যাকবের যতই অবিশ্বাস থাক না কেন ফাহরির নির্দেশ তাকে পালন করতেই হবে। অর্ডার পেপারে পরিষ্কার লেখা ছিল : পুরো মাইন খালি করতে হবে। রিসার্চের কাজ চালিয়ে নেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় রির্সোস রেখে বাকি সবকিছু ধ্বংস করতে হবে।

তারমানে ডক্টর টোলাকে প্রাণে বাঁচিয়ে রাখতেই হচ্ছে।

এবং একটা শিশুকেও বাঁচিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

কাপড়ে প্যাঁচিয়ে একটা প্যাকে রাখা হয়েছে নবজাতকটিকে। ইহুদি শিশু। বয়স সর্বসাকুল্যে এক মাসের বেশি হবে না। বাচ্চাটিকে চুপ করিয়ে রাখার জন্য হালকা সিডেটিভ দেয়া হয়েছে।

বাচ্চাটি জ্যাকবের ঘৃণা ভরা মনে আকস্মিক পরিবর্তন এনে দিয়েছে। এই ইহুদি বাচ্চার ক্ষুদে হাতের ওপর নির্ভর করছে তৃতীয় নাৎসি প্রজন্ম। যদিও এধরনের চিন্তা একটু কঠিন। তারচেয়ে বরং বাচ্চাটাকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মেরে ফেলাই ভাল ছিল। কিন্তু জ্যাকবের এখানে কিছু করার নেই। সে নির্দেশ পালন করছে মাত্র।

ডক্টর টোলা বাচ্চাটির দিকে কীভাবে তাকাচ্ছে সেটা খেয়াল করেছে জ্যাকব। টোলার চোখে সে একই সাথে আগুন ও দুর্দশার ছাপ দেখতে পেয়েছে। বাবার রিসার্চ চালিয়ে নেয়ার পাশাপাশি ওকে বাচ্চাটির পালক মায়ের দায়িত্বও পালন করতে হবে। ইতোমধ্যে বাচ্চাকে ঘুম পাড়ানো, খাওয়ানো এসব কাজ করতে হচ্ছে ওকে। এই বাচ্চাটির মুখের দিকে তাকিয়েই জ্যাকবের টিমের সাথে সহযোগিতা করছে টোলা। বাচ্চার প্রাণনাশের হুমকি দেয়ার পরেই টোলা ওদেরকে সাহায্য করতে রাজি হয়েছে।

ওদের মাথার উপরে মর্টার শেল বিস্ফোরিত হলো। হাঁটু টলে উঠল সবার। বিস্ফোরণের শব্দে কানে তালা লাগার জোগাড়। সিমেন্টের পলেস্তরায় ফাটল ধরল, চুন, সুরকি পড়ল ড্রেনের নোংরা পানিতে।

কম্পনের ধাক্কা থেকে নিজেকে সামলে নিল জ্যাকব। পাশে এসে দাঁড়িয়ে পয়ঃনিষ্কাশন পাইপের সামনের দিকে থাকা একটা শাখার দিকে নির্দেশ করল তার সেকেন্ড ইন কমান্ড, অসকার হেনরিকস।

‘স্যার, আমরা ওই টানেল ধরে এগোব। ওটা স্টর্ম ড্রেন, বেশ পুরোনো। মিউনিসিপ্যালের ম্যাপ বলছে, এটা নদীতে গিয়ে মিশেছে। ক্যাথেড্রাল আইল্যান্ড থেকে জায়গাটা খুব বেশি দূরে নয়।’

সায় দিয়ে মাথা নাড়ল জ্যাকব। আইল্যান্ডের কাছাকাছি কোথাও একজোড়া ছদ্মবেশী গানবোট অপেক্ষায় রয়েছে। ওখানে রয়েছে আরেকটা কমান্ডো ইউনিট। দূরত্বের হিসেবে এখান থেকে খুব একটা বেশি নয়।

মাথার উপরে মুহুর্মুহু গোলাবর্ষণ করে রীতিমতো তুলকালাম চালাচ্ছে রাশিয়ানরা। জ্যাকব খুব দ্রুত সবাইকে পথ দেখিয়ে এগিয়ে চলল। সর্বনাশের মোলোকলা পূর্ণ করতে শহরে রাশিয়ানরা পাগলের মতো আক্রমণ করছে। শহরের বাসিন্দাদেরকে আত্মসমপর্ণ করতেই হবে, তাছাড়া কোনো উপায় নেই।

শাখা টানেলের কাছে পৌঁছেই জ্যাকব জলকপাটের নোংরা মই বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করল। ওপরে ওঠার সময় তার জুতো থেকে প্যাঁচ-প্যাঁচ শব্দ হচ্ছে। টানেলের ভেতরে থাকা তীব্র দুর্গন্ধে জ্যাকবের নাড়ি-ভূড়ি গলা দিয়ে উঠে আসে আসে অবস্থা। দুর্গন্ধ যেন মই বেয়ে ওর পেছন পেছন তাড়া করছে।

ইউনিটের বাকি সবাই ওর পথ অনুসরণ করল।

জ্যাকব ওর হ্যান্ড-টর্চ জ্বালিয়ে সিমেন্ট ড্রেনের দিকে তাক করল।

বাতাস থেকে এখনো দুর্গন্ধ কমেনি নাকি?

টর্চের আলোর রশ্মিকে সামনে রেখে নতুন উদ্যমে এগিয়ে গেল সে। আর একটু গেলেই পালানোর রাস্তা, মিশন প্রায় কমপ্লিট। রাশিয়ানরা ওয়েনসেলস্ মাইনে থাকা ইঁদুর দর্শন করতে পারার আগেই ওর ইউনিট সিলেসিয়ার অর্ধেক পথে থাকবে। রাশিয়ানদের স্বাগতম জানানোর জন্য জ্যাকব ল্যাবরেটরির প্যাসেজগুলোতে বুবি ট্র্যাপ বোম সেট করে এসেছে। যমদূতের দর্শন ছাড়া ওখানে রাশিয়ান আর তাদের মিত্রবাহিনীরা কিছুই পাবে না।

নিজের কাজে সন্তুষ্ট হয়ে তাজা বাতাস টানতে টানতে এগিয়ে চলল জ্যাকব। এই সিমেন্ট টানেল তির্যকভাবে ঢাল তৈরি করে ধীরে ধীরে নেমে গেছে। জ্যাকবের ইউনিট এগোচ্ছে আগের চেয়ে আরও দ্রুতগতিতে। ওদের এগোনোর ফাঁকে ফাঁকে বোমা ফাটাচ্ছে রাশিয়ান সেনাবাহিনী। রাশিয়ানরা তাদের পুরো শক্তি নিয়ে হাজির হয়ে গেছে। নদী কতক্ষণ ফাঁকা থাকবে সেটা বলা যাচ্ছে না।

বাচ্চাটি মৃদু স্বরে কান্না শুরু করল। হালকা ভোজের সিডেটিভের প্রভাব কেটে গেছে। জ্যাকব তার টিমের মেডিক্যাল সদস্যকে সাবধান করে দিয়েছিল, বাচ্চাটিকে যেন কড়া ডোজের সিডেটিভ না দেয়া হয়। বাচ্চার জীবন ঝুঁকিতে ফেলা চলবে না। কিন্তু হয়তো ওদের ভুল ছিল…

কান্নার আওয়াজ ধীরে ধীরে শক্তিশালী হচ্ছে।

উত্তর দিকে কোথাও একটা মর্টার শেল বিস্ফোরিত হলো।

বাচ্চার কান্নার ভলিউম এখন তুঙ্গে। টানেলের ভেতরে প্রতিধ্বনি করছে ওর কান্নার আওয়াজ।

‘বাচ্চাটাকে চুপ করাও!’ যে সৈনিক বাচ্চাটিকে নিয়ে এগোচ্ছিল তাকে নির্দেশ দিল জ্যাকব।

বাচ্চা রাখার প্যাকটা কাঁধ থেকে দ্রুত নামাতে গিয়ে হালকা গড়নের সৈনিকের মাথায় থাকা কালো ক্যাপ পড়ে গেল। বাচ্চাটিকে শান্ত করতে গিয়ে আরও কাঁদিয়ে ফেলল সে।

‘দাও… দেখি,’ বলল টোলা। ওর কনুই ধরে ছিল একজন, তার কাছ থেকে জোর করে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল ও। বাচ্চাটাকে আমার কাছে দিন।

জ্যাকবের দিকে তাকাল সৈনিক। ওদের মাথার ওপরে চলা বিস্ফোরণের বহর এখন থেমেছে। সব চুপচাপ। কিন্তু নিচে বাচ্চাটা কেঁদেই চলেছে। মুখ কুঁচকে সায় দিল জ্যাকব।

টোলার কব্জিতে থাকা বাধন খুলে দেয়া হলো। নিজের আঙুলগুলোতে রক্ত সঞ্চালন করার জন্য ডলতে ডলতে বাচ্চাটির কাছে গেল ও। বাচ্চাকে টোলার কাছে দিয়ে ভারমুক্ত হলো সৈনিক। বাচ্চটিকে কোলে তুলে আস্তে আস্তে দোল খাওয়াতে শুরু করল টোলা। বাচ্চার দিকে ঝুঁকে ওকে আরও কাছে নিল ও। শিশুটির কানের কাছে টোলা ফিসফিস করে কী যেন বলতে শুরু করল। টোলার পুরো শরীর নরম হয়ে উষ্ণ আবেশে জড়িয়ে নিল বাচ্চাটিকে।

ধীরে ধীরে কান্নার আওয়াজ থেমে গেল। বাচ্চাটি এখন চুপচাপ কাঁদছে।

সন্তুষ্ট হয়ে টোলার গার্ডের দিকে মাথা ঝাঁকাল জ্যাকব। টোলার পিঠে গ্যার ঠেকিয়ে ধরল গার্ড। বাচ্চার কান্না থেমেছে। এবার চুপচাপ ব্রিসলাউের ভূগর্ভস্থ টানেলের ভেতর দিয়ে এগোতে শুরু করল সবাই।

অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে ড্রেনের নোংরা দুর্গন্ধের জায়গায় স্থান করে নিল ধোয়ার গন্ধ। জ্যাকবের হ্যান্ড-টর্চ স্টর্ম ড্রেনের শেষ প্রান্ত আলোকিত করল। কামান থেকে গোলাবর্ষণ থামলেও প্রায়ই গোলাগুলির আওয়াজ ভেসে আসছে পূর্বদিক থেকে। ধারে কাছে পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দ শোনা যাচ্ছে।

পেছনে থাকা সদস্যদের দিকে তাকাল জ্যাকব। ওদেরকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকার নির্দেশ দিয়ে রেডিওম্যানকে বলল, “বোটগুলোকে সিগন্যাল দাও।‘

কেতাদুরস্তভাবে মাথা ঝাঁকিয়ে সামনে এগোল রেডিওম্যান। ধোয়ার ভেতরে অদৃশ্য হয়ে গেল সে। কয়েক মুহূর্তের ভেতরে লাইটের ফ্ল্যাশ ব্যবহার করে পার্শ্ববর্তী আইল্যান্ডে সিগন্যাল আদান-প্রদান করা হয়ে গেল। জলপথটুকু পেরিয়ে জায়গামতো বোট পৌঁছুতে মিনিট খানেক সময় লাগবে।

টোলার দিকে তাকাল জ্যাকব। মেয়েটা এখনো বাচ্চাটিকে কোলে রেখেছে। চুপচাপ চোখ বন্ধ করে রয়েছে বাচ্চাটি।

জ্যাকবের চোখে চোখ পড়ল টোলার, দৃঢ়ভাবে বলল, “আপনি জানেন, আমার বাবা-ই ঠিক ছিলেন,’ এতটুকু বলে হঠাৎ চুপ মেরে গেল ও। সৈনিকদের কাছে থাকা বিভিন্ন সিলমারা বারের দিকে একবার দৃষ্টি বুলিয়ে আবার জ্যাকবের দিকে ফিরল টোলা। ‘আপনি আপনার চেহারা দেখেই সেটা বুঝতে পারছি। আমরা… আমরা অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছিলাম।’

‘আমি বা আপনি, আমাদের কেউ-ই ওরকম বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার কোনো অধিকার রাখি না,’ জ্যাকব জবাব দিল।

‘তাহলে কে রাখে?’

মাথা নাড়ল জ্যাকব, অন্যদিকে ঘুরতে শুরু। স্বয়ং হেনরিক হিমল্যার ওকে এই অর্ডার দিয়েছেন। এখানে জ্যাকবের কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ ছিল না। ও বুঝতে পারছে, টোলা এখনো ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে।

‘এটা ঈশ্বর ও প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ করেছিল,’ ফিসফিস করে বলল টোলা।

‘বোট চলে এসেছে,’ রেডিওম্যানের এই ঘোষণা জ্যাকবকে কোনো জবাব দেয়া থেকে বাঁচিয়ে দিল। রেডিওম্যান স্টর্ম ড্রেনের মুখ থেকে ফিরে আসছে।

নিজের লোকদের শেষবারের মতো নির্দেশ দিল জ্যাকব। সবাইকে জায়গামতো দাঁড় করালো। সামনে থেকে সবাইকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল ও। এই টানেল ওদেরকে রিভার ওডের একটা ঢালু তীরে পৌঁছে দেবে। অন্ধকার ধীরে ধীরে কমতে শুরু করছে। মিশনের জন্য এই অন্ধকার ওদের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু উজ্জ্বল হয়ে উঠছে পুব আকাশ। তবে নদীর ওপরে ঝুলে থাকা ধোয়ার মেঘ পানিকে এখনো সূর্যের আলো থেকে বাঁচিয়ে রেখেছে। এই ধোয়ার ভারী চাদর ওদেরকে সাহায্য করতে পারে।

কিন্তু সেটা কতক্ষণ?

একটানা গুলিবর্ষণ শুরু হয়ে গেছে। ওগুলোকে পটকাবাজির মতো শোনাচ্ছে। যেন। ব্রিসলাউ শহরের ধ্বংস উপলক্ষে ফোঁটানো হচ্ছে ওগুলো।

দুর্গন্ধের কবল থেকে মুক্তি পেয়ে জ্যাকব তার ওয়েট মাস্ক খুলে ফেলল। ফুসফুসে ভরে নিল তাজা বাতাস। সীসার মতো ধূসর পানিতে চোখ বুলাল ও। বিশ ফুটি দুটো বোট নদীর পানি কেটে তরতর করে এগিয়ে আসছে। মৌমাছির গুঞ্জনের মতো একটানা শব্দ করছে ওগুলোর ইঞ্জিন। বোট দুটোর অগ্রভাগে সবুজ তেরপলের নিচে কোনমতে লুকিয়ে রাখা হয়েছে একজোড়া এমজি-৪২ মেশিন গান।

বোটের পেছনে এইমাত্র আইল্যান্ডের একটা কালো অবয়ব ফুটে উঠল। ক্যাথেড্রাল আইল্যান্ড আসলে আক্ষরিক অর্থে কোনো দ্বীপ নয়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে মাটি দিয়ে ভরাট করে এই দ্বীপের সাথে তীরের সংযোগ করে দেয়া হয়েছে। ওই শতাব্দীতেই ঢালাই লোহা দিয়ে তৈরি সবুজ রঙের একটা ব্রিজ তীরের সাথে দ্বীপের সংযোগ আরও উন্নত ও সহজ করে দিয়েছে। সেই ব্রিজের নিচ দিয়ে দুটো গানবোট এগিয়ে আসছে।

চার্চের দুটো টাওয়ারের চূড়োর দিকে তাকাল জ্যাকব। সূর্যের আলো এসে পড়ছে ওগুলোতে। এই গির্জার কারণেই দ্বীপের নাম ক্যাথেড্রাল আইল্যান্ড নামকরণ করা হয়েছিল। এই আইল্যান্ডে আধ ডজন চার্চ আছে।

টোলা হিরজফিল্ডের কথাগুলো এখনো জ্যাকবের কানে বাজছে।

এটা ঈশ্বর ও প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ করেছিল।

সকালের ঠাণ্ডা জ্যাকবের ভেজা কাপড়ের ভেতর সেঁধিয়ে পড়ছে। চামড়ায় গিয়ে বিঁধছে কাঁটার মতো। এখান থেকে চলে গিয়ে এই দিনগুলো ভুলে যেতে পারলে তৃপ্তি পাবে সে।

প্রথম বোট তীরে পৌঁছে গেছে। নিজের ভাবনার জাল ছিঁড়ে যাওয়ায় খুশিই হলো জ্যাকব। ইউনিটের সদস্যদেরকে চটজলদি দুটো বোটে উঠে পড়ার জন্য তাগাদা দিল সে।

কোলে বাচ্চাটিকে নিয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে আছে টোলা। ওর পাশে একজন গার্ড পাহারা দিচ্ছে। সূর্যের আলোতে ঝকমকিয়ে ওঠা চার্চের চুড়ো দুটো ওর চোখেও পড়েছে। গোলাগুলি চলছে এখনো। ধীরে ধীরে গোলাগুলির আওয়াজ আরও কাছে আসছে। ট্যাংকগুলো এগোচ্ছে ধীর গতিতে, সেই শব্দও শোনা যাচ্ছে। চিৎকার ও কান্নার আওয়াজ মিলেমিশে একাকার।

টোলা যে ঈশ্বরের বিরুদ্ধাচরণের কথা বলে ভয় পাচ্ছিল সেই ঈশ্বর কোথায়?

নিশ্চয়ই এখানে নয়।

বোট ভরে যাওয়ার পর টোলার দিকে এগোল জ্যাকব। বোটে উঠন। কথাটা সে আরও কঠিনভাবে বলতে চাইলেও টোলার চেহারায় কিছু একটা ছিল যার কারণে ততটা কঠোরভাবে বলতে পারল না।

নির্দেশ মতো কাজ করল টোলা। দৃষ্টি এখনো ক্যাথেড্রালের দিকে। ওর চিন্তা ভাবনার সীমানা আকাশকেও ছাড়িয়ে গেছে।

ঠিক এই সময়ে জ্যাকব খেয়াল করে দেখল ডক্টর টোলা নারী হিসেবে কত সুন্দরী। হোক না আধা-ইহুদি। টোলা বোটে পা রাখল। একটু টলে উঠলেও সামলে নিল নিজেকে। বাচ্চার ব্যাপারে খুব সতর্ক রয়েছে। ধূসর পানি আর ধোয়ার চাদরের দিকে আবার তাকাল টোলা। পাথরের মতো শক্ত হলো ওর চোখ-মুখ। নিজের বসার জন্য সিট দেখার সময়ও ওর চোখে স্ফুলিঙ্গ দেখা গেল।

স্টারবোর্ড বেঞ্চে গিয়ে বসল টোলা। ওর সাথে সাথে গার্ডও এগোল।

ওদের থেকে একটু তফাতে বসল জ্যাকব। বোটের পাইলটকে যাত্রা শুরু করার নির্দেশ দিল। দেরি করা চলবে না। নদীতে চোখ বুলাল সে। পশ্চিম দিকে যাত্রা শুরু করছে ওরা। সূর্য উদয়ের দিক থেকে সম্পূর্ণ উল্টো দিকে।

ঘড়ি দেখল জ্যাকব। এতক্ষণে নিশ্চয়ই এখান থেকে দশ কিলোমিটার দূরে একটা পরিত্যক্ত এয়ারফিল্ডে জার্মান জাঙ্কার জু-৫২ ট্রান্সপোর্ট প্লেন ওদের জন্য অপেক্ষা করছে। হামলা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য জার্মান রেড ক্রস দিয়ে মেডিক্যাল ট্রান্সপোর্টের ছদ্মবেশ দেয়া হয়েছে ওটাকে।

বোট দুটো গভীর পানিতে নেমে গেল, ইঞ্জিনের গুঞ্জন বাড়ছে। রাশিয়ানরা এখন ওদেরকে আর আটকাতে পারবে না। মিশন কমপ্লিট।

বোটের দূরবর্তী প্রান্তে কিছু একটা নড়াচড়া করায় জ্যাকবের দৃষ্টি

সামনে ঝুঁকে বাচ্চাটির মাথায় গুচ্ছ খানেক চুলে আলতো করে চুমো দিল টোলা। মুখ তুলে জ্যাকবের চোখে চোখ রাখল ও। জ্যাকব ওর চোখে ঘৃণা কিংবা রাগ দেখতে পেল না। টোলার চোখের ভাষায় ছিল দৃঢ়সংকল্প।

টোলা এখন কী করতে যাচ্ছে সেটা জ্যাকব বুঝতে পেরেছিল। ‘না…।’

কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

পেছনে থাকা নিচু রেইলের দিকে ঝুঁকে পা ছুঁড়ে নিজেকে ওপরে তুলে দিল টোলা। বাচ্চাটাকে বুকের ভেতরে নিয়ে উল্টো দিকে ডিগবাজি খেয়ে ঠাণ্ডা পানিতে পড়ল।

আচমকা এরকম ঘটনায় একেবারে হকচকিয়ে গেছে টোলার গার্ড। হতভম্ব হয়ে পানিতে অন্ধের মতো গুলি করতে শুরু করল সে।

দ্রুত সামনে এগিয়ে এসে গার্ডকে থামাল জ্যাকব। বাচ্চাটার গায়ে লেগে যাবে তো।

বোটের কিনারায় গিয়ে পানির ওপর সে অনুসন্ধানী দৃষ্টি বুলল। ওর ইউনিটের সদস্যরা উঠে দাঁড়াতেই দুলে উঠল বোট। জ্যাকব ধূসর পানিতে নিজের প্রতিবিম্ব ছাড়া আর কিছু দেখতে পেল না। বোটের পাইলটকে বৃত্ত রচনা করে পানির ওপর চক্কর দেয়ার নির্দেশ দিল সে।

কিছুই পাওয়া গেল না।

পানির নিচ থেকে ভেসে আসা বুদবুদ খুঁজছিল জ্যাকব, কিন্তু বোট বেশি ওজন হয়ে যাওয়ার ফলে পানিতে অতিরিক্ত টেউ খেলে যাচ্ছিল। বুদবুদ চোখে পড়ল না। রাগে, হতাশায় রেইলে ঘুষি মারল জ্যাকব।

যেমন বাবা… তেমন মেয়ে…।

একমাত্র আধা-ইহুদিরাই এরকম দুঃসাহসিক কাজ করতে পারে। জ্যাকব এর আগেও এরকম ঘটনা দেখেছে। মা তার নিজের সন্তানকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে, যাতে সন্তানকে সামনে আরও বেশি কষ্ট ভোগ করতে না হয়। জ্যাকব ভেবেছিল, টোলা ওরকম নয়। মেয়েটার মন হয়তো আরও শক্ত। কিন্তু যা হওয়ার তা তো হলোই। হয়তো টোলার আর কোনো উপায় ছিল না। বাধ্য হয়ে কাজটা করেছে সে।

নিশ্চিত হওয়ার জন্য অনেক সময় নিয়ে চক্রাকারে ঘুরল জ্যাকবের বোট! ওর ইউনিটের লোকেরা দু’পাশের তীরে সতর্ক দৃষ্টি রাখল। নেই। মাথার ওপর থেকে হু উস করে একটা মর্টার শেল উড়ে যেতে দেখে আর বেশি দেরি করল না ওরা।

ইউনিটের সবাইকে যার যার সিটে বসার নির্দেশ দিল জ্যাকব। পশ্চিম দিক দেখাল সে, ওখানে প্লেন অপেক্ষা করছে। ওদের কাছে এখনো প্রয়োজনীয় বাক্স ও কাগজ-পত্র আছে। টোলা আর বাচ্চাটা হাতছাড়া হওয়ায় দুটো ক্ষতি হয়েছে। টোলার বিকল্প না পাওয়া গেলেও বাচ্চার ক্ষতি হয়তো পুষিয়ে নেয়া যাবে। আরেকটা বাচ্চা নিয়ে গেলেই হলো।

‘চলো।‘ অর্ডার দিল জ্যাকব।

বোট দুটো আবার রওনা হয়ে গেল। ইঞ্জিন গর্জে উঠল পূর্ণ শক্তিতে।

ব্রিসলাউ পুড়ে তৈরি হওয়া ধোয়ার চাদরের ভেতরে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ওরা অদৃশ্য হয়ে গেল।

***

টোলা শুনতে পেল বোটের শব্দ ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে।

ক্যাথেড্রাল ব্রিজের একটা মোটা পিলারের আড়ালে পানিতে ভাসছে ও। এক হাতে বাচ্চাটির মুখ শক্ত করে চেপে ধরে আছে, যাতে কোনো শব্দ না হয়। মনে মনে আশা করছে, ছোট বাচ্চাটি যেন নাক দিয়ে যথেষ্ট বাতাস নিতে পারে। কিন্তু বাচ্চাটি বেশ দুর্বল।

দুর্বল টোলাও।

টোলার গলার একপাশ ভেদ করে বুলেট বেরিয়ে গেছে। টকটকে লাল রক্ত নিঃশব্দে মিশে যাচ্ছে পানিতে। দৃষ্টিশক্তি কমে গেছে টোলার। পানির ওপরে বাচ্চাটিকে ধরে রাখার জন্য রীতিমতো নিজের সাথে যুদ্ধ করছে।

কিছুক্ষণ আগে, বাচ্চাসহ ও যখন পানিতে লাফ দিয়েছিল তখন ইচ্ছে ছিল ওরা দু’জনই পানির নিচে মারা যাবে। সোজা কথায়, বাচ্চাটিকে নিয়ে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল টোলা। কিন্তু বরফ শীতল পানি আর গলায় বুলেটের আঘাত পাওয়ায় ওর পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসে। চার্চের চুড়ো এসে পড়া সূর্যের আলোর কথা মনে পড়ল ওর। না, ও ধর্মের কথা স্মরণ করেনি। আলোর কথা মনে পড়ায় ও উপলব্ধি করতে পেরেছিল “মেঘ দেখে কেউ করিসনে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে।” পৃথিবীর অনেক জায়গা এরকম আছে যেখানে ভাই ভাইয়ের সাথে লড়াই করে না। মায়েরা তাদের বাচ্চাদেরকে খুন করে না।

পানির আরও গভীরে সঁতরে গিয়েছিল টোলা। স্রোত ওকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল ব্রিজের দিকে, আপত্তি করেনি ও, স্রোতের মর্জিমতো ভেসে গিয়েছে। পানির নিচ দিয়ে ডুব-সাঁতার দেয়ার সময় নিজের ফুসফুসে থাকা বাতাস বাচ্চাকে দিয়ে বাঁচিয়েছিল টোলা। হাত দিয়ে বাচ্চাটির নাক চেপে মুখে মুখ লাগিয়ে বাতাস দিয়েছিল ও। যদিও ওর ইচ্ছে ছিল আত্মহত্যা করবে কিন্তু সিদ্ধান্ত বদল করার পর যখন বাঁচার জন্য সংগ্রাম শুরু করল তখন টোলা হয়ে উঠল দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।

ছেলেটির কোনো নাম রাখা হয়নি।

নামবিহীন অবস্থায় কারো মারা যাওয়া উচিত নয়।

বাচ্চার মুখে আবার বাতাস ভরল ও। অন্ধের মতো পানির নিচে সাঁতরে এগোল। নিতান্তই ভাগ্যগুণে মোটাপিলারের আড়ালে আশ্রয় পেয়ে গেল টোলা।

বোট দুটো চলে গেছে, ওর আর দেরি করা চলবে না। রক্তক্ষরণ হচ্ছে ওর। টোলা বেশ ভাল করেই বুঝতে পারছে, ঠাণ্ডা পানির কারণেই এখনো বেঁচে আছে ও। কিন্তু সেই ঠাণ্ডা দুর্বল বাচ্চাটির জীবনকে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

তীরের দিকে সাতারাতে শুরু করল টোলা। উনুতভাবে পা ছুড়ছে। দুর্বলতার কারণে সঠিকভাবে এগোতে পারছে না। বাচ্চাটিকে নিয়ে পানির নিচে ডুবে গেল টোলা।

না।

ডুব-সাঁতার দিয়ে এগোচ্ছে। হঠাৎ করে যেন খুব ভারী হয়ে গেছে পানি। বেশ যুদ্ধ করতে হচ্ছে পানির সাথে।

টোলা হার মানার পাত্রী নয়।

হঠাৎ একটা পাথরের সাথে বেমক্কা ধাক্কা খেল ওর পা। চিৎকার করে উঠল টোলা। ভুলে গিয়েছিল সে এখন পানির নিচে। হড়হড় করে নদীর পানি ওর মুখে ঢুকে গেল। পানির ভেতরে আরেকটু তলিয়ে গেল ও। শেষবারের মতো টোলা পা ছুঁড়তে শুরু করল। পানির নিচ দিয়ে তরতর করে এগিয়ে চলল ও।

খাড়া তীরের ছোঁয়া পেল পায়ের নিচে।

এক হাত আর হাঁটুর ওপর ভর করে পানি থেকে উঠে আসার চেষ্টা করল টোলা। গলার কাছে বাচ্চাটাকে ধরে রেখেছে। তীরে পৌঁছে মুখ থুবড়ে পড়ল ও। আর এক ইঞ্চিও সামনে এগোনোর শক্তি পাচ্ছে না। ওর রক্তে বাচ্চাটির শরীরে মাখামাখি হয়ে গেছে। অনেক কষ্টে বাচ্চাটির দিকে তাকাল ও।

কোনো নড়াচড়া করছে না বাচ্চাটি। শ্বাসও নিচ্ছে না। একদম চুপচাপ।

চোখ বন্ধ করে প্রার্থনা করল টোলা।

কাঁদো, বাবু, একটু কাদো…

***

আওয়াজটা প্রথম শুনতে পান ফাদার ভেরিক।

তিনি আর তার ব্রাদাররা সেন্ট পিটার অ্যান্ড পল চার্চের একটা ভূগর্ভস্থ ওয়াইন। সেলারে আশ্রয় নিয়েছেন। গতকাল রাতে যখন ব্রিসলাউে বোমা হামলা শুরু হয়েছিল তখন এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছেন তারা। হাঁটু গেড়ে প্রার্থনা করেছেন, তাদের আইল্যান্ড যেন নিরাপদ থাকে। পঞ্চদশ শতাব্দীতে এই চার্চ নির্মাণ করা হয়েছিল। শহরের সীমানা নির্ধারণ করার সময় ভাগ্যগুণে রক্ষা পেয়েছিল চার্চটি। এখন আবার সেই স্বর্গীয় সৌভাগ্যের প্রয়োজনীয়তা উপস্থিত হয়েছে।

সেই আওয়াজ এবার দেয়ালে প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করল।

ফাদার ভেরিক উঠে দাঁড়ালেন। বয়স হয়ে গেছে তাঁর, উঠে দাঁড়াতে বেশ বেগ পেতে হলো।

“কোথায় যাচ্ছেন?” জানতে চাইল ফ্রানজ।

‘আমি একটু দেখে আসি বিড়ালগুলো বোধহয় ডাকছে,’ ফাদার জবাব দিলেন। গত দুই দশক ধরে নদীর পাড়ে থাকা বিড়াল ও বিভিন্ন সময় চার্চের আশেপাশে ঘুরে বেড়ানন কুকুরদেরকে এটা সেটা খাইয়ে আসছেন ফাদার।

‘এখন সঠিক সময় না,’ আরেকজন ব্রাদার সতর্ক করলেন, তার কণ্ঠে ভয়।

মৃত্যুকে এখন আর ফাদার ভেরিক ভয় পান না। সেলার পেরিয়ে ছোট প্যাসেজে পা রাখলেন তিনি। প্যাসেজটা নদীর সামনে গিয়ে শেষ হয়েছে। অন্যসময় এই প্যাসেজে কয়লা দিয়ে সবুজ বোতল স্টোর করে রাখা হয়। যদিও বোতলগুলো এখন ওক গাছ আর ধুলোবালির ভেতর গড়াগড়ি খাচ্ছে।

পুরোনো দরজার কাছে পৌঁছে খিল তুলে দিলেন ফাদার।

কাজটা করার সময় এক কাধ দিয়ে দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। ক্যাচ ক্যাচ শব্দে আর্তনাদ করে উঠল পুরোনো দরজা।

প্রথমেই ধোয়া এসে তার মুখে আঘাত হানল। আবার হলো আওয়াজটা। শব্দের উৎসের খোঁজে নিচ দিকে তাকালেন ফাদার। “Mein Gott im Himmel”

একজন নারী দেহ পড়ে রয়েছে। কোনো নড়াচড়া নেই। তাড়াতাড়ি নারীর কাছে এগিয়ে গেলেন তিনি। নতুন এক প্রার্থনা করতে করতে হাঁটু গেড়ে বসলেন।

নারীর গলায় হাত দিয়ে পরীক্ষা করলেন, এখনো বেঁচে আছে কি-না। কিন্তু ভেজা রক্ত ছাড়া আর কোনো সাড়া পেলেন না ফাদার। শরীরের মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঠাণ্ডায় পাথর হয়ে গেছে।

মৃত।

আওয়াজটা আবার হলো। কান্নার আওয়াজ। নারী দেহের ওপাশ থেকে এসেছে।

নারীর নিচে বাচ্চাটির দেহ অর্ধেক চাপা পড়ে আছে। সারা গায়ে রক্ত।

বাচ্চাটি ভিজে ঠাণ্ডায় নীল হয়ে গেছে, বেঁচে আছে এখনো। নারী দেহের নিচ থেকে বাচ্চাটিকে উদ্ধার করলেন ফাদার। ভেজা বাচ্চাটিকে নিজের গায়ের কাপড় দিয়ে জড়িয়ে নিলেন তিনি।

ছেলে শিশু।

তিনি দ্রুত বাচ্চাটির পুরো শরীর পরীক্ষা করলেন। দেখলেন রক্ত বাচ্চার শরীর থেকে ঝরেনি। মায়ের শরীরের রক্ত বাচ্চাটির শরীরে মেখে গিয়েছিল।

দুঃখ মাখা দৃষ্টিতে বাচ্চার মায়ের দিকে তাকালেন তিনি। এত মানুষ মারা যাচ্ছে। নদীর ওপারে তাকালেন। পুড়ছে শহর, ধোঁয়া দলা পাকিয়ে উঠে আকাশে আশ্রয় নিচ্ছে। গুলিবর্ষণ চলছে এখনো। এই নারী কী বাচ্চাকে বাঁচানোর জন্য পুরো নদীপথ পাড়ি দিয়ে এসেছিল?

‘শান্তিতে থাকো, নারীকে উদ্দেশ্য করে বললেন ফাদার। শান্তিই তোমার প্রাপ্য, তুমি এটা অর্জন করে নিয়েছ।’

ফাদার ভেরিক প্যাসেজের দরজার কাছে এসে দাঁড়ালেন। রক্ত, পানি মুছে দিলেন বাচ্চার শরীর থেকে। বাচ্চার মাথার চুলগুলো তুষারের মতো সাদা; বেশ নরম, পাতলা। বয়সে এক মাসের বেশি হবে না।

ফাদারের পরিচর্যা পেয়ে বাচ্চার কান্না আরও শক্তিশালী হয়ে উঠল। চোখ বন্ধ করে খুব জোর দিয়ে কাঁদছে বাচ্চাটি, ওর ছোট্ট চেহারায় সেটার ছাপ ফুটে উঠল। যদিও এখনো ও দুর্বল, ঠাণ্ডায় কাতর।

‘বাবু, তুমি কাঁদছ।

ফাদারের কণ্ঠ শুনে বাচ্চাটি চোখ খুলল। কেঁদে চোখ দুটো ফুলিয়ে ফেলেছে। সুন্দর নীল চোখ মেলে তাকাল ফাদারের দিকে। নীল চোখ বুদ্ধিমত্তা ও সতোর পরিচয় বহন করে। যদিও এখানকার অধিকাংশ নবজাতক নীল চোখ নিয়েই জন্ম নেয়। তবুও, ফাদারের মনে হলো, এই চোখ জোড়া নীল চোখের সুনাম রাখবে।’

শরীরের উষ্ণতা দেয়ার জন্য বাচ্চাটিকে আরও কাছে নিলেন ফাদার। একটা রং তার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। আরে কী ওটা? বাচ্চাটির পা দেখলেন তিনি। গোড়ালির ওপর কে যেন একটা চিহ্ন এঁকে দিয়েছে।

না, আঁকেনি। ঘষে নিশ্চিত হয়ে নিলেন ফাদার।

গাঢ় লাল কালি দিয়ে ট্যাটু করা হয়েছে।

তিনি ট্যাটুটা ভাল করে দেখলেন। দেখতে একটা কাকের থাবার মতো লাগছে।

ফাদার ভেরিক তার তরুণ সময়ের একটা বড় অংশ ফিনল্যান্ডে কাটিয়ে এসেছেন। সেই সূত্রে, এই চিহ্ন চিনতে পারলেন তিনি। নরওয়েজীয় প্রাচীন বর্ণমালার একটা হলো এই চিহ্ন। কিন্তু এই বর্ণ দিয়ে ঠিক কী বুঝানো হয়েছে তা সম্পর্কে ফাদারের কোনো ধারণা নেই।

মাথা নাড়লেন তিনি। এরকম বোকামি কে করল?

তিনি বাচ্চার মায়ের দিকে আবার তাকালেন।

পিতার পাপের বোঝা সন্তানকে বইতে হবে না।

বাচ্চার মাথায় লেগে থাকা রক্তের শেষ ফোঁটাটুকু মুছে দিলেন ফাদার। নিজের উষ্ণ গাউনের ভেতরে বাচ্চাটিকে জড়িয়ে নিলেন।

‘ছোট বাচ্চা… পৃথিবীতে এসেই কী কঠিন পরিস্থিতির মুখেই না পড়েছে।‘

.

প্রথম খণ্ড

০১.

রুফ অফ দ্য ওয়ার্ল্ড

বর্তমান সময় ১৬ মে, সকাল ৬:৩৪ মিনিট।
হিমালয়
এভারেস্ট বেজ ক্যাম্প, ১৭ হাজার ৬০০ ফিট।

বাতাসের পিঠে মৃত্যু ভর করেছে।

প্রধান শেরপা তাসকি তার পেশাদারিত্বের গাম্ভীর্য বজায় রেখে ঘোষণা করলেন। এই ব্যক্তি বেশ খাটো। মাথায় থাকা কাউবয় হ্যাটসহ তার উচ্চতা টেনে-টুনে পাঁচ ফুট হতে পারে। কিন্তু যেভাবে পাহাড় বেয়ে তরতর করে উঠে এসেছেন তাতে মনে হয়, তিনিই বুঝি এখানকার সবার চেয়ে লম্বা ব্যক্তি। আড়চোখে প্রেয়ার পতাকাগুলোর দাপাদাপি দেখছেন তিনি।

ডা. লিসা কামিংস ওর নিকন ডি-১০০ ক্যামেরার ঠিক মাঝখানে আনল তাসকিকে। ছবি তুলল। তাসকি এই গ্রুপের গাইড হিসেবে কাজ করলেও লিসার কাছে তিনি একটা সাইকোমেট্রিক টেস্ট সাবজেক্ট। লিসা বর্তমানে যে বিষয়টা নিয়ে গবেষণা করছে সেটার জন্য একদম মোক্ষম ব্যক্তি এই তাসকি।

অক্সিজেনের কোনো বাড়তি সরবরাহ ছাড়া এভারেস্টে উঠতে গেলে মানব শরীরে কী কী প্রভাব পড়ে সেসব নিয়ে গবেষণা করার জন্য নেপালে এসেছে লিসা। ১৯৭৮ সালের আগে কেউ-ই বাড়তি অক্সিজেন সরবরাহ ছাড়া এভারেস্ট জয় করতে পারেনি। এখানকার বাতাস খুবই পাতলা। অবস্থা এতটাই নাজুক যে, প্রচুর অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পর্বতারোহীরা বোতলজাত অক্সিজেনের সাহায্য নিয়েও বিভিন্ন রকম সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। যেমন : দুর্বল হয়ে যাওয়া, বিভিন্ন অঙ্গের সমন্বয়তার অভাব, একজন মানুষকে দুজন দেখা, দৃষ্টিভ্রম ইত্যাদি। ধরে নেয়া হয়েছিল, এভারেস্টের সর্বোচ্চ চূড়া অর্থাৎ আট হাজার মিটার উচ্চতায় বোতলজাত অক্সিজেনের সহায়তা ছাড়া পৌঁছুনো অসম্ভব।

তারপর ১৯৭৮ সালে দু’জন আনাড়ী পবর্তারোহী এই অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখালেন। হাঁপাতে থাকা ফুসফুস নিয়ে তারা পৌঁছে গেলেন এভারেস্টের চূড়ায়। পরবর্তী কয়েক বছরে প্রায় ৬০জন নারী-পুরুষ সেই দু’জন পর্বতারোহীদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে এভারেস্ট জয় করে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

নিম্ন-চাপযুক্ত বায়ুমণ্ডলে মানব শরীর কেমন আচরণ করে সেটা পরীক্ষা করে দেখার জন্য এরচেয়ে আর ভাল পরিবেশ পাওয়া লিসার পক্ষে সম্ভব নয়।

এখানে আসার আগে উচ্চ-চাপে মানব শরীর কেমন আচরণ করে-এর ওপর পাঁচ বছর পড়াশোনা করেছে লিসা। পড়ার পাশাপাশি বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য ডিপ ফ্যাদম নামের এক রিসার্চ শিপে চড়ে গভীর সমুদ্রে গিয়ে ডুবুরিদের পর্যবেক্ষণ করেছে। তারপর ওর ব্যক্তিগত ও পেশাগত দুটো জীবনেই পরিবর্তনের প্রয়োজন পড়ায় এনএসএফ-এর প্রস্তাব গ্রহণ করেছিল ও। এবার ওর গবেষণার বিষয়বস্তু সম্পূর্ণ উল্টো : নিম্নচাপযুক্ত বায়ুমণ্ডলে মানব শরীর কেমন আচরণ করে তা পর্যবেক্ষণ।

আর এই গবেষণার কাজেই ডা. লিসা পৃথিবীর ছাদ অর্থাৎ এভারেস্টে এসেছে।

শেরপা তাসকি’র আরেকটা ছবি তোলার জন্য তৈরি হলো লিসা। অন্যান্য শেরপার মতো তাসকি তার দলকে নিজের নামের মতো আগলে রেখেছেন।

পতপত করে উড়তে থাকা প্রেয়ার পতাকাগুলোর কাছ থেকে একটু সরে গিয়ে দাঁড়ালেন তাসকি। ধীরে ধীরে মাথা ঝাঁকালেন তিনি। হাতের দুই আঙুলের ফাঁকে একটা সিগারেট ধরে এভারেস্টের চূড়ার দিকে তাক করে আছেন। দিনটা ভাল না। এই বাতাসের পিঠে মৃত্যু ভর করেছে। একই কথার পুনরাবৃত্তি করলেন তিনি। হাত নামিয়ে সরে গেলেন। নিজের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছেন তাসকি।

যদিও দলে থাকা অন্যান্যের মতামত এখনো নেয়া হয়নি।

দলের সদস্যদের মাঝে আপত্তিসূচক গুঞ্জন শোনা গেল। মুখ তুলে মেঘবিহীন নীল আকাশ দেখল সবাই। দশ জনের এই দলটি বিগত নয় দিন যাবত অনুকূল আবহাওয়াপূর্ণ একটা ভাল দিনের অপেক্ষায় রয়েছে। এর আগে, ঠিক গত সপ্তাহে যখন ঝড় হয়েছিল তখন পাহাড়ে না ওঠার ব্যাপারে অবশ্য কেউ কোনো আপত্তি তোলেনি। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট সাইক্লোনের কারণে এখানকার পরিবেশ একদম খারাপ হয়ে গিয়েছিল। একশ মাইলেরও বেশি বেগে আসা ঝড়ো হাওয়া নাজেহাল করেছিল ক্যাম্পকে। রান্নার জন্য খাটানো তাবু উড়ে গিয়েছিল, মানুষজনকে শুইয়ে ফেলেছিল উন্মত্ত হাওয়া। তার ওপর তুষার ঝরার ফলে অবস্থা আরও খারাপ হয়েছিল। তুষার এসে যেন ত্বক ডলে দিচ্ছিল সিরিশ কাগজের মতো।

পরদিন ভোরটা হলো পর্বতারোহীদের আশার মতো উজ্জ্বল। সূর্যের আলো প্রতিফলিত হচ্ছিল কুমু হিমবাহ আর বরফের দেয়াল থেকে। সবার মাথার উপরে তুষারাবৃত এভারেস্ট অবিচল হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এভারেস্টের আশেপাশে রয়েছে আরও কয়েকটা পাহাড়ের চূড়া। দেখে মনে হচ্ছে, সাদা পোশাকে কোনো বিয়ের অনুষ্ঠান হচ্ছে।

একশ’র মতো ছবি তুলল লিসা। দিনের আলো পরিবর্তনের সাথে সাথে প্রাকৃতিক পরিবেশেরও যে সৌন্দর্যের পরিবর্তন ঘটে সেটা ধরা পড়ল ওর ক্যামেরায়। এভারেস্টের স্থানীয় নামের মর্ম বুঝল ও। চোমোলাংমা, চীনা ভাষা। অর্থ করলে দাঁড়ায়–পৃথিবীর স্বর্গীয় দেবী। নেপালিতে বলে সাগারমাতা। অর্থাৎ, আকাশের দেবী।

মেঘের মাঝে অবিচল দাঁড়িয়ে থাকা বরফ ও চুড়া সমৃদ্ধ এই পর্বত যেন সত্যিই এক দেবী। ওগুলো যেন এভারেস্টের পূজো করতে এসেছে, আকাশকে ছুঁয়ে চুমো খাওয়ার জন্য নিজেদেরকে প্রমাণ করছে ওরা। জনপ্রতি খরচা হয়েছে পয়ষট্টি হাজার ডলার। ক্যাম্পের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, কুলি, শেরপা, ইয়াক (চমরি গাই); এসব কিছুর ব্যবস্থা হয়েছে ওই পয়ষট্টি হাজার টাকার মধ্যে। খাটো সাইজের একটা মাদি ইয়াক ডাক ছাড়ল, ওর ডাক প্রতিধ্বনি হলো উপত্যকার গায়ে। পর্বতারোহীদের কাজের জন্য দুই ডজন ইয়াক আছে এখানে। ওগুলোর লাল-হলুদ রঙ ক্যাম্পের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে। ঝড়ের দেবতা কবে এখান থেকে ফিরে যাবেন এই আশায় আরও পাঁচটা ক্যাম্প এই পাথুরে পাহাড়ি ঢলে অপেক্ষা করছে।

তবে ওদের প্রধান শেরপার ভাষ্য অনুযায়ী, ঝড়ের দেবতা আজ ফিরে যাচ্ছেন না।

‘একদম বিরক্ত হয়ে গেলাম,’ বোস্টন স্পোর্টিং কোম্পানির ম্যানেজার ঘোষণা করলেন। তার পরনে লেটেস্ট ডাউন-ডুভেট ওয়ান পিস। নিজের ভারি প্যাকের পাশে দাঁড়িয়ে দু’হাত আড়াআড়ি অবস্থায় রেখেছেন তিনি। বসে বসে দিন প্রতি ছয়শ ডলারেরও বেশি অপচয় করছি। ওরা আমাদেরকে ঠকাঁচ্ছে। আকাশে তো মেঘের কোনো ছিটেফোঁটাও নেই!

বিরক্ত হলেও নিজের গলার স্বর যতদূর সম্ভব নিচু রেখেই কথাগুলো বললেন তিনি। অসন্তোষ প্রকাশ করে সবার সামনে খারাপ হওয়ার কোনো ইচ্ছে নেই।

লিসা এরকম স্বভাবের লোক আগেও দেখেছে। এই স্বভাবের লোকগুলো খচর টাইপের হয়। লোকটার সাথে এক বিছানায় রাত কাটানো ঠিক হয়নি, ভাবল লিসা। স্মৃতি হাতড়াতে শুরু করল ও। স্টেটস্-এ একটা সাক্ষাতের কথা মনে পড়ল। সেটুল এর হ্যাঁয়াটে একটা প্রাতিষ্ঠানিক মিটিঙের পর বেশ খানিকটা হুইস্কি খেয়ে ওখানে গিয়েছিল লিসা। লিসা যদি একটা জাহাজ হয় তাহলে বোস্টন বব হলো এক বন্দরের নাম। এই অঞ্চলে বব ছাড়া হয়তো আরও বন্দর আছে। কিন্তু লিসা একটা ব্যাপারে মোটামুটি নিশ্চিত, ভবিষ্যতে কখনো বোস্টন ববের বন্দরে নোঙ্গর করবে না ও।

ওর এরকম ভাবনার অন্যতম কারণ হলো এই লোকটার বিরক্তিকর স্বভাব। লোকটা সবসময় উল্টো কথা বলে। মেজাজটা এমন, যেন যুদ্ধ করবে।

অন্যদিকে মুখ ঘোরাল লিসা। রাগ করে শক্তি নষ্ট করার দরকার নেই। ছোট ভাইয়ের দিকে তাকাল ও। জশ; লিসার ছোট ভাই। বিগত দশ বছর ধরে পর্বতারোহণ করছে সে। অভিজ্ঞতা প্রচুর। বোনের টিমে সে একজন পথ প্রদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। বছরে কম করে হলেও দুবার এরকম পর্বত অভিযানে দায়িত্ব পালন করে জশ।

জশ কামিংস ওর এক হাত উঁচু করল। বোনের মতো সে-ও স্বর্ণকেশী, হালকা পাতলা। পরনে কালো জিন্স, ওর স্পোর্টস বুটের ভেতরে গরম পরিধেয় গুঁজে রাখা। গায়ে দিয়েছে ধূসর রঙের থার্মাল শার্ট। বিভিন্ন অভিযানের জন্য এই শার্টগুলো বিশেষভাবে তৈরি হয়ে থাকে।

গলা খাকারি দিল ও। ‘তাসকি বারো বার এভারেস্টে উঠেছেন। পাহাড়ের মতি গতি ভাল বোঝেন তিনি। যদি তিনি বলেন, সামনে এগোনোর জন্য আবহাওয়া সুবিধের নয় তাহলে আমরা এখানে আরও একটা দিন থাকব। আমাদের সময় পার করব দক্ষতার চর্চা করে। আর যদি কেউ অন্য কোথাও ঘুরে আসতে চায়, সেক্ষেত্রে আমি তাদেরকে দুটো গাইড দিয়ে দিতে পারি। একদিনের জন্য তাঁরা রডোডেনড্রন বনের কুমু উপত্যকা থেকে ঘুরে আসতে পারে।‘

দলের ভেতর থেকে একজন হাত তুলা। ‘আচ্ছা, এভারেস্ট ভিউ হোটেলে একটা চক্কর মেরে আসলে কেমন হয়? গত ছয় দিন ধরে আমরা এই ছাতামার্কা তাবুতে ক্যাম্প করে সময় কাটাচ্ছি। ওখানে গিয়ে একটু গরম পানিতে গোসল করতে পারলে কিন্তু মন্দ হয় না।’

প্রস্তাবের সপক্ষে গুঞ্জন শোনা গেল।

‘আমার মনে হয় না, কাজটা খুব একটা ভাল হবে,’ সাবধান করল জশ। ‘ওই হোটেলে যেতেই লাগবে এক দিন। হোটেলে রুমগুলোতে উচ্চতা জনিত সমস্যা মোকাবেলার জন্য অক্সিজেনের ব্যবস্থা করা আছে। কিন্তু ওখানে থাকলে আপনাদের এই বর্তমান সহ্য শক্তি দুর্বল হয়ে যাবে। মোটের ওপর, আমাদের অভিযানের দেরি হয়ে যাবে।’

‘হ্যাঁ! আমরা তো খুব দ্রুত এগোচ্ছি! কোনও দেরি হচ্ছে না!’ ফোড়ন কাটল বোস্টন বব।

জশ ববকে পাত্তা দিল না। লিসা খুব ভাল করেই জানে, তাঁর ছোট ভাইকে বৈরি আবহাওয়ার ব্যাপারে কোনো বিষয়ে জোর করে লাভ হবে না। জশ অহেতুক কোনো ঝুঁকি নেবে না। যদিও এখন আকাশ একদম ঝকঝকে নীল দেখাচ্ছে। কিন্তু লিসা এ-ও জানে, আকাশের এই রূপ বদলাতে বড়জোর কয়েক মিনিট লাগে। ক্যাটালিনা কোস্টের সাগরের পাশে বড় হয়েছে ও আর জশ। ওরা দুজনই জানে ঝকঝকে মেঘমুক্ত আকাশ কী করে রুদ্র মূর্তি ধারণ করে। আকাশের ভাব-গতি ওদের চেনা আছে। আবহাওয়ার নাড়ি-নক্ষত্র বোঝার জন্য শেরপা’র মতো অত দক্ষ চোখ হয়তো জশের নেই কিন্তু একজন শেরপার সিদ্ধান্তকে সে সম্মান দিতে জানে।

এভারেস্টের চূড়ায় ভাসমান তুষার পুচ্ছের দিকে তাকাল লিসা। তুষার পুচ্ছের ধারা শিখরের ওখান দিয়ে ঘন্টায় দুইশ’ মাইলেরও বেশি গতিতে ছুটছে। পুচ্ছটির লেজ বেশ দীর্ঘ। দেখে মনে হচ্ছে আট হাজার মিটার উপরের ওই জায়গায় তুষার ঝড় বেশ ভালই তাণ্ডব চালাচ্ছে। এই ঝড় যে-কোনো মুহূর্তে ওদের দিকে ধেয়ে আসতে পারে।

‘আচ্ছা, আমরা অন্তত ক্যাম্প ওয়ান পর্যন্ত তো যেতে পারি, নিজের মত দাঁড় করানোর চেষ্টা করল বোস্টন বব। ওখানে গিয়ে তারপর নাহয় আবহাওয়ার মতি-গতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে’।

আমতা আমতা করে যতটা সম্ভব সাবধানে নিজের অভিমত দিল স্পোর্টস স্টোরের ম্যানেজার। এখানে আরও সাত দিন বসে থাকতে হবে ভেবে হতাশায় তার চেহারা লাল হয়ে গেছে।

এই লোকটার প্রতি লিসা আগে অনেক আকর্ষণবোধ করতো।

ববের কথার জবাবে উঁচু গলায় কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল জশ। কিন্তু নতুন একটা আওয়াজ ওকে বাধা দিল। ড্রাম থেকে উৎপন্ন থাম্প-থাম্প ধরনের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। শব্দের উৎস, পুব দিকে চোখ ঘোরাল সবাই। উদীয়মান সূর্যকে পেছনে রেখে একটা কালো হেলিকপ্টার এগিয়ে আসছে। দেখতে অনেকটা ভীমরুলের মতো, বি-টু স্কুইরেল এ-স্টার ইকুইরেল। উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার। এভারেস্টের মতো বিশালাকৃতির পাহাড়ের গায়ে নির্বিঘ্নে উদ্ধার অভিযান চালানোর জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা হয়েছে একে।

দলের মাঝে পিনপতন নীরবতা।

এক সপ্তাহ আগে, সর্বশেষ ঝড় শুরু হওয়ার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে একটা দল নেপালের সাইড দিয়ে এগিয়ে গিয়েছিল। রেডিও যোগাযোগের মাধ্যমে ওরা পৌঁছে গেছিল ক্যাম্প টু-তে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে একুশ হাজার ফিটের বেশি উচ্চতায়।

সূর্যের আলো থেকে নিজের চোখ আড়াল করল লিসা। ওই দলের কোনো বিপদ হয়েছে নাকি?

ফিরিচের হিমালয় রেসকিউ অ্যাসোসিয়েশনের হেলথু ক্লিনিকে (এইচ.আর.এ) গিয়েছিল লিসা। পাহাড়ে উঠতে গিয়ে বিভিন্ন রোগে ও অসুস্থতায় পড়ে পবর্তারোহীরা এখানে ভর্তি হয়। হাড় ভাঙ্গা, ফুসফুস ও মস্তিষ্ক সংক্রান্ত সমস্যা, মাংসে বরফের পচন ধরাসহ, হৃদরোগ, আমাশয়, তুষার অন্ধতা, বিভিন্ন রকমের জখম এবং এসটিডি নিয়ে এই ক্লিনিকের কাছে দারস্থ হয় পর্বতারোহীরা। এমনকী যৌনরোগ নিয়েও এখানে অনেকে ভর্তি হয়।

কিন্তু এখন কী হয়েছে? রেডিওর জরুরি ব্যান্ডে তো কোনো বিপদ সংকেত পাওয়া যায়নি। একটা হেলিকপ্টার বেজ ক্যাম্পের চেয়ে একটু উঁচু পর্যন্ত উড্ডয়ন করতে পারে। পাতলা বায়ুর কারণে তারপর আর এগোতে পারে না। যার মানে, হেলিকপ্টারটা নির্দিষ্ট উচ্চতা পর্যন্ত উদ্ধার অভিযান চালাতে সক্ষম। পঁচিশ হাজার ফিটের উপরে কোনো লাশ থাকলে সেটাকে উদ্ধার করা সম্ভব হয় না। এভারেস্টের বরফ শীতল কবরে সেই লাশের ঠাই হয়। পরিত্যক্ত গিয়ার, শূন্য অক্সিজেন সিলিন্ডারের সাথে লাশের সলিল সমাধি ঘটে। বরফে শক্ত হয়ে মমির মতো রয়ে যায় এভারেস্টের গায়ে।

হেলিকপ্টারের আওয়াজে একটু পরিবর্তন এলো।

‘ওটা এই দিকে আসছে,’ বলল জশ। সবাইকে স্টর্ম তাবুর কাছে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিল। হেলিকপ্টারকে নামার জন্য সামনে থাকা সমতল কঁকা করল ও।

আকাশ থেকে অবতরণ করল কালো হেলিকপ্টার। রোটরের বাতাসে বরফের টুকরো এদিক-সেদিক ছিটকে গেল। কী যেন সঁই করে ছুটে গেল লিসার নাকের ঠিক নিচ দিয়ে। প্রেয়ার পতাকাগুলো বাতাসের ঝাপটায় উন্মাদের মতো নৃত্য শুরু করেছে। ইয়াকওলো চেঁচিয়ে উঠল। পাহাড়ের গায়ে অনেক দিনের জমে থাকা সুনসান নীরবতা আজ কেটে গেল।

কিডের ওপর ভর দিয়ে নামল হেলিকপ্টার। দরজা খুলে বেরিয়ে এল দু’জন। একজনের পরনে সবুজ ক্যামোফ্লেজ ইউনিফর্ম, কাঁধে অটোমেটিক ওয়েপন, রয়েল নেপালিজ আর্মির একজন সৈন্য সে। আরেকজন বেশ লম্বা, পরনে লাল রঙের গাউন কোমরের ওখানটায় শার্শির রশি বাঁধা, পুরো মাথা পরিষ্কার করে কামানো। বুদ্ধ সন্ন্যাসী।

দু’জন সামনে এগোতে এগোতে শেরপাদের সাথে নেপালী ভাষায় দ্রুত কী যেন বলল। বিভিন্ন রকম অঙ্গ-ভঙ্গি শেষে নির্দেশ করল এক হাত দিয়ে।

হাতটা লিসার দিকে তাক করা।

সন্ন্যাসী লিসার দিকে পা বাড়ালেন। পঁয়তাল্লিশের মতো বয়স তার, গায়ের রং ফর্সা কিন্তু ফাঁকাসে, চোখ বাদামি।

সৈনিকের ত্বক অবশ্য একটু কালো। তার দুচোখের অবস্থান স্বাভাবিকের চেয়ে কাছাকাছি। লিসার বুকের ওপর দৃষ্টি আটকে রয়েছে ওর। জ্যাকেটের চেইন খুলে রেখেছে লিসা। লোমশ ওভারকোটের নিচে থাকা স্পোর্টস ব্রা দেখা যাচ্ছে। নেপালিজ সৈনিকের দৃষ্টি ঠিক ওখানেই আটকে রয়েছে।

অন্যদিকে সন্ন্যাসী তাঁর চোখ সংযত রেখেছেন, লিসাকে উদ্দেশ্য করে একটু মাথা নোয়ালেন তিনি। ব্রিটিশ উচ্চারণে নিখুঁত ইংলিশে বললেন, ‘ডা. কামিংস, এভাবে বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত। কিন্তু বিষয়টা জরুরি। এইচ,আর,এ থেকে জানতে পারলাম, আপনি একজন মেডিক্যাল ডাক্তার।

ভ্রু কুঁচকে মুখ হাঁড়ি করে লিসা জবাব দিল, “হ্যাঁ।

‘কাছের এক মঠে রহস্যময় রোগ দেখা দিয়েছে। অসুস্থ হয়ে পড়েছে ওখানে থাকা সবাই। পাশের গ্রাম থেকে এক লোক তিন দিন পায়ে হেঁটে খুন্ডি হাসপাতালে গিয়ে খবরটা পৌঁছে দিয়েছিল। আমরা ভেবেছিলাম খবরটা জানার পর এইচ.আর.এ থেকে কোনো একজন ডাক্তার ওখানে হাজির হবে। পরে জানতে পারলাম ক্লিনিকেই ডাক্তার সংকট চলছে। ডা, সোরেনসন আপনার কথা বললেন, বেজ ক্যাম্পে আছেন আপনি’।

সাইজে ছোট-খাটো কানাডিয়ান ডাক্তারের কথা মনে পড়ল ওর। মহিলা ডাক্তার। এক সন্ধ্যায় লিসা ও সেই ডাক্তার একসাথে চা খেয়েছিল। আমি কীভাবে আপনাদের সাহায্য করতে পারি? লিসা প্রশ্ন করল।

‘আমাদের সাথে ওখানে যাবেন? মঠটা দুর্গম জায়গায় হলেও এই হেলিকপ্টারে করে যাওয়া যাবে’।

‘কতক্ষণ…?’ প্রশ্ন করে জশের দিকে তাকাল ও। দলের অন্য সদস্যদের কাছ থেকে এদিকে এগিয়ে আসছে সে।

সন্ন্যাসী মাথা নাড়লেন। কিছুটা লজ্জা ও কুষ্ঠাবোধ তার চোখে দেখা গেল। যেতে ঘণ্টা তিনেক লাগবে। ওখানে গিয়ে কী অবস্থা দেখতে পাব সেটা আগেভাগে বলা যাচ্ছে না।’ দুশ্চিন্তায় আবার মাথা নাড়লেন।

‘আমরা এখানে একদিন আছি, সমস্যা নেই।’ বলল জশ। বোনের কনুই ধরে কাছে এল ও। কিন্তু আমি তোমার সাথে যাব।’

জশের প্রস্তাব লিসার খুব একটা পছন্দ হলো না। নিজের খেয়াল কীভাবে রাখতে হয় সেটা লিসা ভাল করেই জানে। অন্যদিকে ওকে নেপালের রাজনৈতিক অবস্থাও মাথায় রাখতে হবে। ১৯৯৬ সাল থেকে এখানে বিভিন্ন সময় চোরাগুপ্ত হামলা হয়ে আসছে। মাওবাদীরা মঠগুলোকে ভেঙ্গে সেখানে সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। বিভিন্ন সময় লোকজনদেরকে ধরে কৃষি কাজে ব্যবহৃত কাস্তে দিয়ে একটা একটা করে অঙ্গ কেটে নেয়ার জন্য তারা কুখ্যাত। যদিও এখন যুদ্ধবিরতি চলছে। কিন্তু নৃশংস ঘটনাগুলো ঘটছে মাঝেমাঝেই।

সৈনিকের হাতে থাকা তেল চিকচিকে রাইফেলের দিকে তাকাল লিসা। সন্ন্যাসীর মতো একজন পবিত্র মানুষের সাথে সশস্ত্র প্রহরী! ছোট ভাইয়ের প্রস্তাবটা হয়তো আরেকবার ভেবে দেখা উচিত।

‘আমার কাছে মনিটরিঙের জন্য কিছু ইকুইপমেন্ট আর সামান্য ফাস্ট এইড কিট ছাড়া তেমন কিছুই নেই’। ইতস্তত করে সন্ন্যাসীকে বলল লিসা। ‘গুরুতর পরিস্থিতি হলে একাধিক রোগীর জন্য আমি হয়তো খুব একটা সাহায্যে আসতে পারব না।’

মাথা নেড়ে হেলিকপ্টার দেখালেন বুদ্ধ। ওটার রোটর এখনো ঘুরছে। ‘ডা. সোরেনসন আমাদের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু সংগ্রহ করে রেখেছেন। আপনাকে আমরা একদিনের বেশি আটকে রাখব না। আপনি ওখানে গিয়ে কীরকম পরিস্থিতি বুঝলেন সেটা পাইলটের স্যাটেলাইট ফোনের মাধ্যমে প্রয়োজনমতো জায়গায় জানিয়ে দিতে পারবেন। এমনও হতে পারে পরিস্থিতি এখন অনেকটা অনুকূলে। সেক্ষেত্রে দুপুর নাগাদ আমরা ফিরে আসতে পারব।’

শেষ বাক্যটা বলার সময় তার মুখের ওপর দিয়ে কেমন যেন এক ছায়া দেখা গেল। শেষ কথাটা তিনি নিজে বিশ্বাস করেন না। তার শব্দগুলোতে চিন্তার রেশ ছিল… সাথে ভয়ও।

বুক ভরে পাতলা বাতাস টেনে নিল লিসা। ওতে ওর ফুসফুস কোনমতে ভরল। একটা শপথ করেছিল লিসা। অনেক ছবি তোলা হয়েছে। আসল কাজে নেমে পড়তে হবে ওকে।

বুদ্ধ সন্ন্যাসী লিসার চেহারা দেখে কিছু একটা বুঝতে পারলেন। তাহলে আপনি আসছেন?

‘হ্যাঁ।

‘লিসা…’ সতর্ক করল জশ।

‘আমি ভাল থাকব। ভাইয়ের হাত চেপে ধরল ও। পাহাড়ে ওঠার জন্য তোমাকে একটা টিমের নেতৃত্ব দিতে হবে।’

বোস্টন ববের দিকে ফিরে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল জশ।

‘অতএব আমি না আসা পর্যন্ত এখানে নিজের দায়িত্ব পালন করো।’

বোনের দিকে তাকাল জশ। সস্তুষ্ট হতে পারলেও আর কথা বাড়াল না ও। নিজের চোখ-মুখ শক্ত করে বলল, “সাবধানে থেকো।’

রয়্যাল নেপালিজ আর্মি আমার নিরাপত্তা দেবে, সমস্যা নেই।

সৈনিকের অস্ত্রের দিকে তাকাল জশ। ‘সেজন্যই তো চিন্তা হচ্ছে।’ কথাটা যতটুকু সম্ভব হালকা করে বলার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল ও। কিন্তু তিক্ততা প্রকাশ হয়েই গেল।

লিসা জানে এরচেয়ে ভাল কোনো উপায়ে জশকে পটানো যেতো না। চট করে ভাইকে জড়িয়ে ধরল ও। নিজের তাবু থেকে যাবতীয় মেডিক্যাল ব্যাকপ্যাক আনলো। তারপর ঘুরন্ত রোটরের ঝাপটা বাঁচিয়ে চড়ে বসল হেলিকপ্টারের ব্যাকসিটে।

পাইলট ওর দিকে ফিরেও তাকাল না। কোপাইলটের সিটে বসল সৈনিক। বুদ্ধ সন্ন্যাসী, নিজেকে আং গেলু নামে পরিচয় দিয়েছেন, লিসার সাথে ব্যাকসিটে বসলেন তিনি।

কানে শব্দ নিরোধক হেডফোন পরল লিসা। হেলিকপ্টারের ইঞ্জিনের গর্জন বাড়ার সাথে পাল্লা দিয়ে রোটর ঘোরার গতি বেড়ে গেল। হালকা বাতাসে ভর দিয়ে উঠতে গিয়ে দ্রুত উপর-নিচ দুলে উঠল যান্ত্রিক পাখি! সাবসনিক ধরনের তীক্ষ্ণ আওয়াজ তুলে

অবশেষে পাথুরে ভূমি ছাড়ল হেলিকপ্টার। দ্রুত উপর দিকে উঠতে লাগল।

গিরিসঙ্কটের ওপর দিয়ে হেলিকপ্টারটা যখন বাঁক নিচ্ছিল তখন লিসার মনে হলো ওর পাকস্থলী বোধহয় নাভির নিচে নেমে গেছে। জানালা দিয়ে নিচে তাকাল ও। তাবু ও ইয়াকগুলোকে দেখতে পেল। জশকে দেখল, একটি হাত উঁচু করে রেখেছে। বিদায় জানাচ্ছে নাকি সূর্যের আলো থেকে চোখ আড়াল করার জন্য হাত তুলেছে? জশের পাশে দাঁড়িয়ে আছে তাসকি শেরপা। কাউবয় হ্যাঁটের কারণে তাকে হেলিকপ্টার থেকেও সহজে চিহ্নিত করা গেছে।

কিছুক্ষণ আগে শেরপা আকাশ দেখে যা বলেছিলেন সেটা আবার মনে হতেই লিসার চিন্তা-ভাবনাগুলো যেন বরফে জমে গেল।

বাতাসের পিঠে মৃত্যু ভর করেছে।

এই মুহূর্তে চিন্তাটা মোটেও সুখকর নয়।

লিসার পাশে ঠোঁট নাড়িয়ে নীরবে প্রার্থনা করছেন বুদ্ধ সন্ন্যাসী। কীসের ভয়ে প্রার্থনা করছেন তিনি? এই হেলিকপ্টারে চড়ার ভয় নাকি মঠে গিয়ে কী অবস্থা দেখবেন সেটার ভয়?

পেছনে হেলান দিল লিসা। শেরপার কথাটা এখনও ওর কানে বাজছে।

আজকের দিনটা সত্যিই খারাপ।

.

সকাল ৯টা ১৩ মিনিট।
উচ্চতা : ২২ হাজার ২৩০ ফিট।

বড় বড় পা ফেলে গভীর ফাটলযুক্ত অঞ্চল অনায়াসে পেরিয়ে যাচ্ছে সে। স্টিলের ক্রাম্পগুলো সেঁধিয়ে যাচ্ছে তুষার ও বরফের গভীরে। নগ্ন পাথর নিয়ে গড়ে উঠেছে পাহাড়ের দু’পাশে থাকা উপত্যকা। ওখানটা শৈবাল জাতীয় উদ্ভিদে ছেয়ে গেছে। খাড়া হয়ে উঠে গেছে এই গিরিসঙ্কট।

তার লক্ষ্যের দিকে।

পরনে ওয়ান-পিস গুজ-ডাউন স্যুট। সাদা-কালো রঙের রেখায় ক্যামোফ্লেজ করা। তার মাথা ঢাকা রয়েছে সোমশ হুডি দিয়ে, স্লে-গগলস পরার কারণে আড়াল হয়ে গেছে চোখ দুটো। একটা প্যাক নিয়ে উঠছে সে। ওটার ওজন একুশ কেজি। ওর মধ্যে বিভিন্ন রকম জিনিস আছে। যেমন : বরফ আকড়ে ধরার কুঠার, সেই কুঠারের এক মাথায় আবার প্যাচানো রয়েছে পলি বোপ (দড়ি)। এছাড়াও আছে হেকলার অ্যান্ড কচ অ্যাসল্ট রাইফেল, অতিরিক্ত বিশ রাউন্ড ম্যাগাজিন এবং একটা ব্যাগে রয়েছে নয়টি অগ্নি-সংযোগকারী গ্রেনেড।

বাড়তি কোনো অক্সিজেন প্রয়োজন নেই তার। এমনকি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এত উঁচুতে উঠেও নয়। বিগত চুয়াল্লিশ বছর ধরে এই পাহাড়কে সে নিজের ঘর-বাড়ি বানিয়ে ফেলেছে। যেকোনো শেরপার সাথে পাল্লা দেয়ার মতো জ্ঞান রাখে। তবে এই ব্যক্তি কিন্তু শেরপাদের ভাষায় কথা বলে না। এর চোখ দুটোও ভিন্ন রঙের। একটা হিম শীতল নীল অন্যটা ধবধবে সাদা! এরকম ভিন্ন ধরনের দুটো চোখ থাকার কারণে তাকে সহজেই আলাদা করে লক্ষ করা যায়। আরেকটা বিষয় তাকে আলাদা করার জন্য দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। সেটা হলো, তার ঘাড়ে থাকা ট্যাটু।

কানে থাকা রেডিও বেজে উঠল।

‘মঠে পৌঁছেছ?”

নিজের গলা ছুঁয়ে নিল সে। ‘চোদ্দ মিনিট লাগবে।’

‘দুর্ঘটনা সম্পর্কে কিছু একটা শব্দও ফাঁস হওয়া চলবে না।’

‘সব সামাল দেয়া হবে।’ নাক দিয়ে নিঃশ্বাস নেয়ার মধ্যেও নিজের কণ্ঠস্বর অক্ষত রাখল সে। নির্দেশদাতার কণ্ঠে ভয়ের সুর ছিল, বিষয়টা তার কান এড়ায়নি। কত ভয় পায়। আসলে এই গ্রানাইট ক্যাসলের এদিকে ও খুব একটা আসে না। তাই নির্দেশদাতা ভয় পাচ্ছেন। একদম কোনো এক প্রান্তে থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে সে।

কেউ তার কাছে এসে কিছু জানতে চায় না। না চাওয়াটাই ভাল।

তবে যখন প্রয়োজন পড়ে তখন ওকে ডেকে নেয়া হয়।

ওর ইয়ারপিস আবার জ্যান্ত হয়ে উঠল। ওরা খুব শীঘ্রি মঠে পৌঁছে যাবে।

জবাব দেয়ার কোনো প্রয়োজনবোধ করল না ও। দূর থেকে ভেসে আসা হেলিকপ্টার রোটরের আওয়াজ শুনতে পেয়েছে। মগজকে হিসেবের কাজে লাগিয়ে দিল ও। তাড়াহুড়োর কোনো প্রয়োজন নেই। পাহাড় ওকে ধৈর্য ধরতে শিখিয়েছে।

ফুসফুসের গতিকে অক্ষুণ্ণ রেখে লাল-টাইলের ছাদযুক্ত পাথুরে ভবনের দিকে এগিয়ে চলল সে। টেম্প অচ মঠের অবস্থান উপত্যকার কিনারায়। নিচ থেকে এখানে সহজে উঠে আসার রাস্তা একটাই। মঠের সন্ন্যাসী ও তাদের শিষ্যরা বাইরের দুনিয়া নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামায় না।

তবে সেটা বজায় ছিল তিন দিন আগ পর্যন্ত।

ওই দুর্ঘটনা।

তার কাজ ছিল পুরো কাজ একদম পরিষ্কারভাবে শেষ করা।

হেলিকপ্টারের আওয়াজ বেড়ে যাচ্ছে। নিচ থেকে উঠে আসছে ওটা। আপন গতিতে এগোল সে। হাতে যথেষ্ট সময় আছে। হেলিকপ্টারে যারা আছে ওদের মঠে পৌঁছুনো প্রয়োজন।

সবকটা একসাথে খুন করতে সুবিধে হবে।

.

সকাল ৯টা ৩৫ মিনিট।

হেলিকপ্টার থেকে নিচের পৃথিবীকে দেখে মনে হচ্ছে এটা যেন পুরোদস্তুর একটা ছবির ফটোগ্রাফিক নেগেটিভ। রঙহীন, সাদা-কালো। তুষার ও পাথরে মাখামাখি। কুয়াশা ঢেকে রেখেছে পর্বতের চূড়োগুলোকে, ছায়ায় ঢাকা পড়েছে গিরিসঙ্কটগুলো। বরফ আচ্ছাদিত উপত্যকা থেকে প্রতিফলিত হচ্ছে সূর্যরশ্মি। প্রতিফলিত রশ্মির দাপটে চোখ প্রায় তুষার অন্ধতায় আক্রান্ত হওয়ার দশা।

এত উজ্জ্বল আলো থেকে বাঁচতে চোখ পিট পিট করল লিসা। মূল দুনিয়াকে ছেড়ে এসে এখানে বাস করে কারা? এরকম বৈরি পরিবেশে কারা থাকে? আরাম ও ভাল জায়গা থাকা সত্ত্বেও মানুষ কেন এরকম দুর্গম এলাকাকে বেছে নেয়?

এই প্রশ্ন লিসাকে ওর মা প্রায়ই জিজ্ঞেস করত। কেন এত কষ্ট করা? রিসার্চ শিপে পাঁচ বছর কাটানো, তারপর পাহাড়ের কঠিন পরিস্থিতিতে টিকে থাকার জন্য এক বছর ট্রেনিং নেয়া আর এখন নেপালে এভারেস্টে ওঠার পায়তারা! আরামের জীবনকে পায়ে ঠেলে এত ঝুঁকি নেয়া কেন?

একদম সাদামাটা জবাব ছিল লিসার : কারণ এখানে চ্যালেঞ্জ আছে। পর্বতারোহণের কিংবদন্তী জর্জ ম্যালেরিকে যখন প্রশ্ন করা হয়েছিল, কেন তিনি এভারেস্টে চড়েছেন, তখন কী তিনি এরকম জবাব দেননি? এভারেস্ট ছিল তাই চড়েছি। প্রশ্নাঘাত করতে ওস্তাদ সাংবাদিকের মুখের ওপর এই বিখ্যাত লাইনকে জবাব হিসেবে ছুঁড়ে দিয়েছিলেন তিনি। মায়ের প্রশ্নের বিপরীতে লিসার জবাবও কী একেবারে মোক্ষম ছিল না? এখানে কী করছে লিসা? জীবনে প্রতিদিন নিত্য নতুন চ্যালেঞ্জ আসে। জীবিকা নির্বাহ করা, অবসরের জন্য সঞ্চয় করা, ভালবাসার মানুষকে খুঁজে বের করা, বিপদ-আপদকে মোকাবিলা করা, সন্তান মানুষ করা ইত্যাদি।

ভাবনার ঘুড়ি উড়ানো বন্ধ করল লিসা। হঠাৎ এক ধরনের উপলব্ধি হলো ওর। প্রকৃত জীবনকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য আমি কোনো ভিন্ন জীবনের পেছনে ছুটছি না তো? এজন্যই কী আমার জীবনে এত পুরুষ আসা সত্ত্বেও কেউ নোঙর ফেলেনি?

লিসার বয়স এখন তেত্রিশ। একা, কোনো বাধন নেই, প্রত্যাশা নেই। একজন মানুষ ঘুমাতে পারবে এরকম স্লিপিং ব্যাগে একা একা রাত কাটিয়ে কোম্পানির জন্য গবেষণা করে যাচ্ছে। মাথার চুল কামিয়ে এরকম একটা পাহাড়ি মঠে সন্ন্যাসী হয়ে যাওয়াটাই বোধহয় ওর জন্য ভাল হবে।

কেঁপে উঠল হেলিকপ্টার, একটু খাড়া হয়েছে।

চিন্তার জাল ছিঁড়ে বাস্তবে ফিরল লিসা।

ওহ, শিট…

দম আটকে ফেলল ও। পাহাড়ের বিপজ্জনক রিজু এর ওপর দিয়ে আলতো করে ভেসে গেল হেলিকপ্টার। কোনোমতে পাশের একটা গিরিসঙ্কটের সাথে সংঘর্ষ এড়াল এটা।

সিটের হাতলকে শক্ত করে চেপে ধরছে ওর আঙুলগুলো। আঙুলের চাপ হালকা করার চেষ্টা করল ও। হঠাৎ ওর মনে হলো, তিন বেডরুমের একটা কটেজ আর আড়াইটা বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে জীবন কাটালে মন্দ হয় না!

লিসার পাশে থাকা আং গেলু সামনে ঝুঁকে পাইলট আর সৈনিকের দিকে তাকিয়ে নিচের দিকে ইশারা করে নির্দেশ দিলেন। রোটরের আওয়াজে তার মুখের কথা ঢাকা পড়ল।

বাইরের দৃশ্য দেখার জন্য জানালার কাঁচের সাথে নিজের গাল ঠেকাল লিসা। আলতো করে বাঁকানো প্লেক্সিগ্লাস ওর নরম গালে চুমো খেল। প্রথমবারের মতো নিচে একটু রঙের আভাস দেখা যাচ্ছে। লাল টাইলের ছাদ। আটটা পাথরের ভবন চোখে পড়ল। ওটার তিনদিকে দাঁড়িয়ে আছে বিশ হাজার ফুটি পাহাড়। আর একদিক আগলে রেখেছে পাহাড়ের খাড়া কিনারা।

টেম্প ওচ মঠ।

অত্যন্ত খাড়াভাবে ভবনের দিকে নামতে শুরু করল হেলিকপ্টার। লিসা খেয়াল করল একপাশে একটা আলুর ক্ষেত আছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কিছু গবাদি পশু আর গোলাঘর চোখে পড়ল। সব কেমন চুপচাপ। যান্ত্রিক পাখিতে চড়ে আসা অতিথিদেরকে স্বাগত জানাতে কেউ এগিয়ে এল না।

তারচেয়েও অলক্ষুণে ব্যাপার খেয়াল করল লিসা, কিছু ছাগল আর নীল রঙের ভেড়া রয়েছে গবাদি পশুর মধ্যে। ওগুলোও নড়াচড়া করছে না। মনে হচ্ছে, হেলিকপ্টারের শব্দ শুনে ঘাবড়ে গিয়ে ভয়ে শক্ত হয়ে গিয়েছে। ভূমিতে পড়ে আছে ওগুলো, পাগুলো মোচড় খেয়ে রয়েছে, ঘাড় বাঁকা, একদম অস্বাভাবিক অবস্থা।

আং গেলু-ও এসব দেখে নিজের সিটে বসলেন। লিসার চোখে চোখ পড়ল তার। কী হয়েছে? সামনে পাইলট আর সৈনিকটির মধ্যে কোনো একটা বিষয় নিয়ে মত বিরোধ চলছে। পাইলট এরকম জায়গায় হেলিকপ্টার নামাতে চাইছে না। কিন্তু জয় হলো সৈনিকের। কারণ সে পাইলটের পাছায় রাইফেলের নল ঠেসে ধরেছে। ক্রুদ্ধ হয়ে নিজের নাকে-মুখে অক্সিজেন মাস্ক আরো জোরে চেপে ধরল পাইলট। মাস্ক চেপে ধরার পেছনে রাগ আর বাতাসের প্রয়োজনের চেয়ে ভয়ের প্রভাবটাই বেশি।

সৈনিকের কথা মতো চলছে পাইলট। কন্ট্রোলের গলা টিপে ধরে হেলিকপ্টারকে ভূমিতে নামাতে শুরু করল। গবাদি পশুরগুলোর কাছ থেকে যতটা সম্ভব দূরে নামবে সে। মঠের পাশে থাকা আলু ক্ষেতের প্রান্তকে স্থির করল লক্ষ্য হিসেবে।

চারদিকে পাহাড়বেষ্টিত সমতল ভূমিতে সারি সারি অবস্থায় ক্ষেতটা গড়ে উঠেছে। সদ্য গজানো সবুজ অঙ্কুরে সেজেছে ক্ষেত। পাহাড়ের এত উঁচুতে আলু চাষ করার পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিল ব্রিটিশরা, উনবিংশ শতাব্দীতে। তারপর থেকে আলু এরকম অঞ্চলের জন্য একটি অপরিহার্য শস্যে পরিণত হয়।

বেমক্কা ঝাঁকি খেয়ে পাহাড়ি ভূমিতে অবতরণ করল হেলিকপ্টার। নামতে গিয়ে বেশ কয়েকটা চারা গাছ নষ্ট করেছে, সেটা বলাই বাহুল্য। রোটরের বাতাসের তোপে অঙ্কুরগুলো থরথর করে কাঁপছে।

এখনও কেউ তাদের আগমন সম্পর্কে হাজিরা দেয়নি। মৃত গবাদিপশুর কথা ভাবল লিসা। বাঁচানোর মতো কেউ কী এখানে আছে? নাকি সবাই মরে গেছে? কী হয়েছে এখানে? সম্ভাব্য বিভিন্ন কারণ ওর মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল। খাদ্যে বিষক্রিয়া, বিষাক্ত বাতাস, ছোঁয়াচে কোনো রোগ কিংবা কোনো সংক্রামক? জানতে হলে ওর আরও তথ্য প্রয়োজন।

‘আপনি বরং এখানেই থাকুন,’ সিট বেল্ট খুলতে খুলতে লিসাকে বললেন আং গেল। আমরা মঠ পরীক্ষা করে আসি।

নিজের মেডিক্যাল প্যাক তুলে নিল লিসা। মাথা নেড়ে বলল, “আমি ভয় পাই না। আর আপনাদের সাথে গেলে হয়তো আমি কিছু প্রশ্নের উত্তরও দিতে পারব।’

নড় করলেন আং গেলু, হড়বড় করে কী যেন বললেন সৈনিককে। সশব্দে হেলিকপ্টারের পেছনের হ্যাঁচ খুলে নিচে নামলেন। এক হাত বাড়িয়ে দিলেন লিসার দিকে।

রোটরের ঝাপটার সহায়তায় ঠাণ্ডা হাওয়া হেলিকপ্টারের উষ্ণ শরীরের ভেতরে ঢুকে পড়ল। মাথায় পারকা’র হুড তুলে দিয়ে লিসা টের পেল এখানে যতই ঠাণ্ডা পড়ক অক্সিজেন এখনও আছে। তবে এমনও হতে পারে, ভয়ে ঠাণ্ডা লাগছে ওর। খানিক আগে ওর মুখ থেকে বেরোনো কথাটা একটু বাড়িয়েই বলা ছিল।

সন্ন্যাসীর হাত ধরল ও। পশমি হাতমোজা থাকার পরও টের পেল সন্ন্যাসী বেশ শক্তিশালী এবং হাত বেশ উষ্ণ। পরিষ্কার করে কামানো মাথা ঢাকার কোনো প্রবণতা দেখা গেল না তার মধ্যে। এরকম হিম শীতল ঠাণ্ডায় তিনি অভ্যস্ত।

হেলিকপ্টার থেকে নামার পরও রোটরের বাতাসের নিচে দাঁড়িয়ে রইল লিসা। সবশেষে নামল সৈনিক। পাইলট নামেনি। নির্দেশ অনুযায়ী বাধ্য হয়ে এখানে হেলিকপ্টার ল্যান্ড করিয়েছে ঠিকই কিন্তু ককপিট ছাড়তে রাজি নয়।

হ্যাচ বন্ধ করে দিলেন আং গেলু। আলুর ক্ষেত পেরিয়ে পাথুরে ভবনগুলোর দিকে দ্রুত এগোল ওরা তিন জন।

ওপর থেকে লাল টালিঅলা ভবনগুলো দেখতে যতটা লম্বা মনে হচ্ছিল নিচে নেমে দেখা গেল ওগুলো তারচেয়েও লম্বা। মাঝের ভবনটাকে দেখে মনে হচ্ছে ওটা তিন তলার মতো উঁচু। প্যাগোডার মতো ছাদ আছে ওতে। সব ভবন বেশ সুন্দর পরিপাটি করে সাজানো। দরজা, জানালার কাঠামোর চিত্রে রংধনুর রং ব্যবহার করা হয়েছে। সোনালি রঙের লতা-পাতা আঁকা আছে দরজার সরদলে। ছাদের কোণা থেকে নেমে এসেছে পাথরের ড্রাগন আর পৌরাণিক পাখি। ছাদযুক্ত দ্বার-মণ্ডপ আরও কয়েকটা ভবনের সাথে সংযোগ স্থাপন করে একটু উঠোন ও ব্যক্তিগত জায়গা করে দিয়েছে। কাঠের তৈরি প্রার্থনার চাকায় খোদাই করা রয়েছে প্রাচীন হরফ। বিভিন্ন রঙের প্রার্থনা পতাকা ঝুলছে ছাদ থেকে। বাতাসের কারণে থেমে থেমে দুলছে ওগুলো।

সাঙরিলা নামের পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এই ভবনগুলো দেখতে অনেকটা রূপকথার মতো মনে হচ্ছে। লিসা খেয়াল করে দেখল এসব দেখতে দেখতে ধীরে ধীরে পা ফেলছে ও। কোনোকিছু নড়ছে না। বন্ধ করা রয়েছে অধিকাংশ জানালা। নীরবতা একদম জেঁকে বসেছে।

বাতাসে কেমন যেন একটু দুর্গন্ধ পাওয়া গেল। গবেষক হওয়ার আগে লিসা যখন মেডিক্যাল স্টুডেন্ট ছিল তখন থেকেই মৃত জিনিসগুলোর সাথে তার ওঠা-বসা। মৃত জিনিসের দুর্গন্ধ সে এখনও ভোলেনি। ও প্রার্থনা করল, গন্ধটা যেন মাঠের এই গবাদি পশুদের হয়। কিন্তু এখানে কারও চিহ্ন না দেখে খুব একটা আশাবাদী হতে পারল না লিসা।

সৈনিককে সাথে নিয়ে আং গেলু পথ দেখাচ্ছেন। ওদের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য দ্রুত পা চালাল লিসা। দুটো ভবন পার হয়ে ওরা এখন মাঝখানে দাঁড়ানো ভবনের দিকে এগোচ্ছে।

মূল উঠোনে বিভিন্ন কৃষি যন্ত্রপাতি কেমনভাবে যেন ছড়ানো-ছিটানো অবস্থায় রয়েছে। দেখে মনে হচ্ছে, তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে ফেলে গেছে কেউ। দু’চাকার একটা গাড়ির সাথে বাঁধা অবস্থায় রয়েছে ইয়াক। গাড়ি উল্টো হয়ে রয়েছে, মারা গেছে জন্তুটা। এটার পা-গুলোও শক্ত হয়ে ছড়িয়ে আছে, ফুলে গেছে পেট। দুধ সাদা চোখ মেলে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে প্রাণহীন দেহ। কালো দুই ঠোঁটের ভেতর দিয়ে ওর ফোলা জিহ্বা বেরিয়ে এসেছে।

লিসা খেয়াল করে দেখল মৃতদেহের কাছে মাছি কিংবা অন্য কোনো ছোট কীট পতঙ্গের আনাগোনা নেই। পাহাড়ের এত উঁচুতে কী মাছি থাকে? ও সঠিক জানে না। আকাশের দিকে তাকাল লিসা। কোনো পাখি নেই। বাতাসের শব্দ ছাড়া কোনো শব্দ নেই।

‘এই দিকে,’ বললেন আং গেলু।

কয়েকটা লম্বা দরজার দিকে এগোলেন সন্ন্যাসী! দরজাগুলো পেরিয়ে ভবনের মাঝখানে অর্থাৎ মঠের মূল কেন্দ্রে যাওয়া যাবে। হাতল ধরে পরীক্ষা করে দেখলেন ওটা তালাবন্ধ নয়, খোলা। তিনি দরজা খুললেন, কজাগুলো ঝাঁকিয়ে উঠল।

দরজার ওপাশে প্রথম প্রাণের চিহ্ন মিলল। দরজার দু’পাশে ব্যারেল সদৃশ বাতি জ্বলছে। ডজনখানেক মোমবাতি জ্বলছে ওগুলোর সাথে। বাতিগুলো মাখনের সাহায্যে জ্বলে। ইয়াকের মাখন। কিন্তু ভেতরে সুগন্ধের বদলে আরও বেশি দুর্গন্ধ পাওয়া গেল। এটা কোনো শুভ লক্ষণ নয়।

এমনকী সৈনিকটিও এখন দরজার চৌকাঠের কাছ থেকে পিছিয়ে দাঁড়িয়েছে। তার অটোমেটিক ওয়েপনকে এক কাধ থেকে আরেক কাঁধে স্থান বদল করল, নিজেকে নিশ্চিত করল আরকী। সন্ন্যাসী অবলীলায় ভেতরে পা চালালেন। শব্দ করে ডাকলেন তিনি। প্রতিধ্বনিত হলো তার আওয়াজ।

আং গেলুর পেছন পেছন প্রবেশ করল লিসা। সৈনিকটি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল।

আরও কয়েকটা ব্যারেল বাতি জ্বলে উঠে আলোকিত করল মন্দিরের ভেতরটা। ঘরের দু’পাশের দেয়ালে প্রার্থনার চাকা সারিবদ্ধ করে রাখা। জুনিপারের সুগন্ধীযুক্ত মোমবাতি আর ধূপকাঠি জ্বলছে সেগুন কাঠ দিয়ে তৈরি আট ফুট উঁচু বুদ্ধ মূর্তির কাছে। বাকি দেবতাগণ তার কাঁধের পেছনে জায়গা করে নিয়েছে।

মন্দিরের অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশে নিজের চোখগুলোকে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে লিসা। ও খেয়াল করে দেখল, কাঠের গায়ে এবং দেয়ালে আঁকা চিত্রে এমন কিছু দৃশ্য দেখানো হয়েছে যেগুলো দেখতে খুব একটা ভাল লাগছে না। মোমবাতির অল্প আলোতে পৈশাচিক লাগছে ওগুলোকে। উপরের দিকে তাকাল ও। কাঠের খুঁটি দোতলা পর্যন্ত উঠে গেছে। ওপর থেকে ঝুলে থাকা এক গুচ্ছ বাতিকে ধরে রেখেছে ওগুলো। তবে বাতিগুলো জ্বলছে না। সব বন্ধ ও ঠাণ্ডা।

আবার হাঁক ছাড়লেন আং গেলু।

ওদের মাথার উপরে কোনো এক স্থানে কিছু একটা শব্দ করে উঠল।

হঠাৎ শব্দ হওয়ায় ভড়কে গেল ওরা। সৈনিক একটা ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে ওপরের দিকে তাকাল। লাইটের আলো আর তার পাশে ছায়া ছাড়া আর কোনোকিছু চোখে পড়ল না।

কাঠের ওপর আবার শব্দ হলো। ওপরের তলায় কে যেন নড়াচড়া করছে। কেউ বেঁচে আছে এরকম সংকেত পাওয়া সত্ত্বেও ভয়ে লিসার রোম দাঁড়িয়ে গেল।

মুখ খুললেন আং গেলু। ‘মন্দিরের দেখাশোনা করার জন্য একটা ব্যক্তিগত মেডিটেশন রুম আছে। সিঁড়ি পেছন দিকে। আমি যাচ্ছি। আপনি থাকুন।

লিসা তার কথা মেনে নিতে চাচ্ছিল কিন্তু মেডিক্যাল ব্যাকপ্যাক আর দায়িত্ব, দুটোর প্রয়োজনীয় উপলব্ধি করল ও। গবাদি পশুগুলোর মৃত্যুর জন্য মানুষ দায়ী নয়। সেটা লিসা বেশ ভাল করেই বুঝতে পারছে। যদি কেউ এখনও বেঁচে থাকে তাহলে সে হয়তো বলতে পারবে, এখানে আসলে কী ঘটেছিল। আর এ-কাজে লিসা-ই সবচেয়ে উপযুক্ত।

নিজের ব্যাকপ্যাকটাকে আরও ভাল করে কাঁধে রাখল লিসা। ‘আমি আসছি।’

কথাটা জোর গলায় বললেও আং গেলু’র পেছনেই রইল ও।

বুদ্ধ মূর্তির পেছনে গেলেন সন্ন্যাসী। ওদিকে একটা দরজা আছে। স্বর্ণখচিত পর্দা পেরিয়ে এগোলেন তিনি। একটা ছোট হলওয়ে ভবনের আরও গভীরে যাওয়ার পথ দেখিয়ে দিল। বন্ধ জানালাগুলোর ফাঁক-ফোকর দিয়ে অল্প করে রুপোলি আলো ভেতরে আসছে। ভেতরটা অন্ধকারাচ্ছন্ন, ধূলিময়। সাদা চুনকাম করা দেয়ালের দিকে আলো ফেলল ওরা। টকটকে লাল রক্ত আর নোনতা গন্ধেই যা বোঝার বোঝা গেল। আরও কাছে গিয়ে পরীক্ষা না করলেও চলবে।

রক্ত।

এক জোড়া নির্জীব নিথর পা হলের মাঝখানের একটা দরজার সামনে পড়ে রয়েছে। আং গেলু লিসাকে মন্দিরে ফিরে যাওয়ার জন্য ইশারা করলেন। মাথা নাড়ল লিসা, সন্ন্যাসীকে পেরিয়ে এগোল। যে পড়ে আছে তাকে বাঁচানোর কোনো আশা নেই, এটা লিসা জানে। কিন্তু অভ্যাসবশত এগোচ্ছে সে। পাঁচবার লম্বা লম্বা পা ফেলে লাশের কাছে পৌঁছে গেল লিসা।

দৃশ্য দেখে বুক ছলকে উঠল ওর। পিছিয়ে এলো।

পা দুটো ওখানে আছে কিন্তু কোনো শরীর নেই। শুধুই একজোড়া কাটা পা, উরুর কাছ থেকে কেটে নেয়া হয়েছে। সাহস করে রুমের ভেতরে তাকাল ও। কাঠের ডাল পালার মতো মানুষের ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হাত-পা জড়ো করা রয়েছে রুমের মাঝখানে। এ যেন এক কসাইখানা।

শুধু তাই-ই নয়। কয়েকটা কাটা মুণ্ডুও আছে। দেয়াল ঘেঁষে সুন্দর করে সাজানো আছে ওগুলো। সব মুণ্ডুর চোখ খোলা অবস্থায় ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। ভয়ঙ্কর।

লিসার পাশে এলেন আং গেলু। এরকম দৃশ্য দেখে তার চোখ-মুখ শক্ত হয়ে গেল। মুখ দিয়ে কী যেন বলতে শুরু করলেন বিড়বিড় করে। শুনে মনে হলো ওগুলোর অর্ধেক প্রার্থনা, অর্ধেক অভিশাপ।

তার আওয়াজ শুনেই বোধহয় রুমের ভেতরে কিছু একটা নড়ে উঠল। হাত-পা’র স্তূপ থেকে একটু দূরে একটা নগ্ন দেহ চোখে পড়ল। পুরো মাথা কামানো। সদ্যজাত শিশুর মতো সারা শরীরে রক্ত। ইনি মন্দিরের একজন সন্ন্যাসী।

নগ্ন দেহের কণ্ঠ থেকে হিস-হিস শব্দ ভেসে এলো পাগলের প্রলাপের মতো। তার চোখে অল্প আলোক রশ্মি প্রতিফলিত হচ্ছে, রাতের আঁধারে থাকা নেকড়ের মতো লাগছে তাকে।

নগ্ন দেহটা ওদের দিকে এগোতে শুরু করল। হাতে ধরে নিয়ে আনছে একটি তিন ফুটি ধারালো কাস্তে। কয়েক কদম পিছিয়ে গেল লিসা। আগন্তুককে থামানোর জন্য হাত তুলে আং গেলু নরম কণ্ঠে বললেন, ‘রেলু নাআ, রেলু নাআ।

লিসা বুঝতে পারল আং গেল এই পাগলকে চেনেন। এই মঠে আসার আগে থেকেই একে চিনতেন আং গেলু। হাত তুলে নাম ধরে ডাকার ফলে পাগল সন্ন্যাসীর পাগলামো থামল। কিন্তু এতে পরিস্থিতি আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল।

বিকট চিৎকার জুড়ে দিয়ে পাগল সন্ন্যাসী ঝাঁপিয়ে পড়ল তার জ্ঞাতি ভাইয়ের ওপর। আং গেলু তাকে বুকে জড়িয়ে নিলেন। শরীরের সাথে সাথে পাগল সন্ন্যাসীর মানসিক অবনতিও ঘটেছে। তাকে জড়িয়ে ধরে দরজার কাঠামোর একপাশে বসালেন আং গেলু।

চটপট কাজে লেগে পড়ল লিসা। প্যাক নামিয়ে জিপার খুলল ও। মেটাল কেস বের করে খুলল ওটা।

ভেতরে এক সারি প্লাস্টিক সিরিঞ্জ আছে। আপদকালীন সময়ে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ওষুধ ভরা রয়েছে ওগুলোতে। যেমন : ব্যথার জন্য মরফিন, শ্বাসকষ্টের জন্য ইপিনিফিরিন, ফুসফুস সংক্রান্ত সমস্যার জন্য ল্যাসিক্স ইত্যাদি। প্রত্যেকটা সিরিঞ্জের গায়ে নাম লেখা থাকলেও লিসা ওগুলোর অবস্থান মুখস্থ করে রেখেছে। কারণ জরুরি মুহূর্তে প্রতিটি সেকেন্ড অনেক মূল্যবান। মেটাল কেসের ভেতরে থাকা সর্বশেষ সিরিঞ্জটা বের করল লিসা।

মিডাজোলেম। স্নায়বিক উত্তেজনা কমায়। এরকম উচ্চতায় পাগলামো ও দৃষ্টিভ্রম মোটামুটি সাধারণ ঘটনা। ওষুধের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়।

নিজের দাঁত ব্যবহার করে সিরিঞ্জের উঁচ উনাক্ত করল লিসা। তাড়াতাড়ি হাত চালাল।

আং গেলু এখনও লোকটাকে ধরে রেখেছেন। কিন্তু পাগল সন্ন্যাসী তার হাত থেকে ছোটার জন্য ছটফট করছে। ঠোঁট ফেটে গেছে আং গেলুর। তিনি গলার একপাশে কাস্তে ধরে রেখেছেন।

‘ওকে শক্ত করে ধরে রাখুন!” চিৎকার করে বলল লিসা।

আং গেলু তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেন। কিন্তু সে-সময়, সম্ভবত ডাক্তারের মতি গতি বুঝতে পেরে পাগল সন্ন্যাসী খেপে গেল। আং গেলুর গালে গভীরভাবে কামড় বসাল সে। আং গেলু আর্তনাদ করে উঠলেন। তাঁর গালের মাংস উঠে হাড় বেরিয়ে পড়েছে।

কিন্তু পাগলকে এখনও ছাড়েননি। শক্ত করে ধরে রেখেছেন।

লিসা তার সিরিঞ্জের উঁচ ঢুকিয়ে দিল পাগলের গলায়। ঠেলে দিল প্লঞ্জার। ‘ছেড়ে দিন ওকে!’

পাগলকে দরজার কাঠামোর সাথে শক্ত করে ঠেসে ধরলেন আং গেলু। পাগলের মাথার খুলি কাঠের সাথে বাড়ি লেগে আওয়াজ করে উঠল। ধাক্কা দিয়ে পেছনে সরল ওরা।

‘এক মিনিটের মধ্যে সিডেটিভ ওর শরীরে কাজ করবে।‘ ইনজেকশনটা পাগলের শিরদাঁড়ায় দিতে পারলে বেশি ভাল হতো। কিন্তু যেরকম আক্রমণ চলছিল তাতে গলায় না দিয়ে কোনো উপায় ছিল না। আশা করা যায়, এতেই কাজ হয়ে যাবে। একবার শান্ত হয়ে গেলে তারপর সেবা করা যাবে। হয়তো কিছু প্রশ্নের জবাবও মিলবে তখন।

যন্ত্রণায় গুঙিয়ে উঠল নগ্ন সন্ন্যাসী, গলায় হাত দিয়ে রেখেছে। সিডেটিভ পুশ করা হয়েছে ওখানে। আবার ওদের দিকে ফিরল সে। মেঝে থেকে সেই কাস্তেটা তুলে দাঁড়াল সোজা হয়ে।

আং গেলুকে হেঁচকা টান দিয়ে সরাল লিসা।‘ থামো…

ধ্রাস!

সরু হল কাঁপিয়ে রাইফেল গর্জে উঠল। রক্তের ফোয়ারা বইয়ে ফেটে গেল পাগল সন্ন্যাসীর মাথা। নিজের মাথার টুকরো টুকরো অংশের ওপর ধপাস করে পড়ে গেল সে।

গুলি নিক্ষেপকারীর দিকে তাকাল লিসা ও আং গেলু।

নেপালিজ সৈনিকের কাঁধে অস্ত্র ঝুলানো রয়েছে। ধীরে ধীরে নিচে নামিয়ে আনল ওটা। সৈনিকের সাথে আবার আঞ্চলিক ভাষায় ভর্ৎসনা করতে শুরু করলে আং গেলু। সৈনিকের কাছ থেকে অস্ত্র নিয়ে নিলেন।

লাশের কাছে গিয়ে পালস চেক করল লিসা। নেই। লাশের দিকে তাকিয়ে কিছু উত্তর খোঁজার চেষ্টা করল ও। পাগলামোর মূল কারণ বের করার জন্য একটা মর্গ ও সাথে ফরেনসিক সংক্রান্ত আধুনিক সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজন। তবে সেই লোকের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, এখানে যা কিছু হয়ে থাকুক না কেন সেটা কেবল মাত্র একজনকে আক্রান্ত করেনি। বিভিন্ন মাত্রায় ভুগিয়েছে সবাইকে।

কিন্তু কী সেটা? ওদের পানিতে কোনো ভারী ধাতু ছিল, ভূগর্ভস্থ বিষাক্ত গ্যাস কিংবা কোনো বিষাক্ত ছত্রাক, খাদ্যশস্য? নাকি তারচেয়েও বড় কিছু, যেমন ইবোলা? নাকি নতুন কোনো ধরনের রোগ? গরুর পাগলামো সংক্রান্ত কিছু? ইয়াকগুলোর কথা মনে করল লিসা। পেট ফোলা মৃত গবাদি পশুগুলোর কথা ভাবল ও। কিছুই বুঝতে পারছে না।

আং গেল ওর কাছে এগিয়ে এলেন। তাঁর গাল রক্তে ভেসে যাচ্ছে তবে তিনি সেটাকে পাত্তাই দিচ্ছেন না। তাঁর যত কষ্ট এই মৃত দেহটাকে নিয়ে।

“ওর নাম রেলু নাআ হাভারসি।’

‘আপনি ওকে চিনতেন।

সম্মতি সূচক মাথা নাড়লেন সন্ন্যাসী। ‘আমার বোনের বরের চাচাতো ভাই ছিল ও। বড় হয়েছিল এক অজোপাড়ায়। মাওবাদী বিদ্রোহীদের সাথে জড়িয়ে পড়েছিল ও। কিন্তু ওদের ওরকম সহিংস আচরণ ওর পছন্দ হয়নি। ওখান থেকে পালিয়ে গেল। আর মাওবাদীদের দল থেকে কারও পালানো মানে হলো মৃত্যুর টিকেট কেটে নেয়া। ওকে লুকানোর জন্য আমি মঠের একটা পদে বসিয়েছিলাম। মাওবাদীরা ওকে কোনোদিনও খুঁজে পেত না। এখানে ও বেশ শান্তিতেই ছিল… আর ওর জন্য এরকমই প্রার্থনা করেছিলাম আমি। আর এখন তো ও নিজের শান্তির পথ খুঁজে পেয়েছে।’

‘আমি দুঃখিত।

দাঁড়াল লিসা। পাশের রুমে থাকা বিচ্ছিন্ন হাত-পায়ের দৃশ্য আবার কল্পনা করল। কোনো আঘাতের ফলে কী ওরকম পাগলামোর সূচনা হয়েছিল? ওসবের ভয়েই এমন পাগলামো করছিল সন্ন্যাসী?

আরেকবার শব্দ হলো মাথার ওপরে।

সব চোখ ওপর দিকে তাকাল।

ওরা সবাই কীসের জন্য ওপরে এসেছিল, ব্যাপারটা লিসা ভুলেই গিয়েছিল। সরু ঢালু একটা সিঁড়ি দিকে নির্দেশ করলেন আং গেলু। ওটা লিসার চোখে পড়েনি। তবে ওটাকে সিঁড়ি না বলে মই বলাই ভাল।

“আমি যাব,’ বললেন তিনি।

‘একসাথে থাকব আমরা,’ আপত্তি তুলল লিসা। ব্যাগের কাছে গিয়ে আরেকটা সিরিঞ্জ তুলে নিল ও। এটাতেও সিডেটিভ লোড করা আছে। সিরিঞ্জটা হাতে রাখল। ‘আপনার তুষোড় সৈনিককে বলুন, সে যেন অস্ত্রের ট্রিগার থেকে আঙুল দূরে সরিয়ে রাখে।’

মইয়ে সবার আগে পা রাখল সৈনিক। দ্রুত ওপরে উঠে গিয়ে ওদেরকে ইশারা করল সে। লিসা মই বেয়ে উপরে উঠে দেখল এটা একটা ফাঁকা রুম। এক কোণায় পাতলা বালিশের তূপ দেখা গেল। রজন আর নিচ থেকে ভেসে আসা ধূপের গন্ধ পাওয়া গেল রুমে।

সৈনিকটি দূর প্রান্তে থাকা কাঠের দরজার দিকে অস্ত্র তাক করে রেখেছে। দরজার নিচ দিয়ে আলো আসছে। কেউ কাছে এগোবার আগেই একটা ছায়া আলোর ওপর দিয়ে চলে গেল।

কেউ আছে ওখানে।

আং গেলু সামনে এগিয়ে গিয়ে দরজায় নক করলেন।

শব্দ থামল।

দরজার এপাশ থেকে ডাকলেন তিনি। লিসা তার কথাগুলো বুঝতে না পারলেও কেউ একজন বুঝতে পারল। শব্দ হলো কাঠের সাথে ঘষা খাওয়ার। খিড়কি ভোলা হয়েছে। একটু ফাঁক হলো দরজা… ওই পর্যন্তই।

দরজায় হাত রাখলেন আং গেলু।

‘সাবধান!’ ফিসফিস করে বলল লিসা। নিজের হাতে থাকা সিরিঞ্জকে আরও শক্ত করে চেপে ধরল। এটাই ওর একমাত্র অস্ত্র।

ওর পাশে থাকা সৈনিকটিও একই আচরণ করল তার অস্ত্রের সাথে।

আং গেলু দরজা পুরোপুরি খুলে ফেললেন। সরু গলির সাইজের রুম দেখা গেল। মেঝেতে পাতা বিছানা রয়েছে রুমের এক কোণায়। একটা ছোট্ট সাইড টেবিলের পাশে জায়গা করে নিয়েছে তেলবাতি। প্রসাবের তীব্র কটু গন্ধ আর বিছানার নিচে রাখা ভোলা পট থেকে আসা মলের গন্ধে রুমের বাতাস পুরোপুরি দুর্গন্ধ হয়ে আছে। এখানে যে-ই থাকুক না কেন, এরকম ব্যক্তি আজকের দিনে বিরল!

এক কোণায় এক লোক ওদের দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আং গেলুর মতো তার পরনেও লাল গাউন কিন্তু গাউনটা নোংরা, ছিঁড়ে গেছে জায়গায় জায়গায়। লোকটা গাউনের নিচের অংশ উরুর ওপরে বেঁধে রেখেছে। তার নগ্ন পা দুটো দেখা যাচ্ছে। দেয়ালে লেখার কাজ করছে সে। আঙুল দিয়ে আঁকছে।

রং হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে তার নিজের রক্ত!

আগেরটার চেয়েও বেশি পাগলামোয়

তার অন্য হাতে একটা ছোরা ধরা আছে। নগ্ন পা দুটোর বিভিন্ন জায়গায় গভীর ক্ষত। তার রঙের উৎস ওগুলো। আং গেলু রুমে ভেতরে ঢোকার পরও তার কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। সে আপনমনে নিজের কাজ করে যাচ্ছে।

‘লামা খেমসার,’ বললেন আং গেলু, তার কণ্ঠে উদ্বেগ।

তার পেছন পেছন ঢুকল লিসা, ওর হাতে সিরিঞ্জ একদম তৈরি। আং গেলু ওর দিকে তাকাতেই মাথা নাড়ল ও। সৈনিকের দিকে ফিরে ইশারা করল লিসা। নিচে যেটা ঘটেছে এখানেও সেটা পুনরাবৃত্তি হোক এটা চায় না ও।

ঘুরল লামা খেমসার। তার চেহারা নির্জীব, চোখগুলো কাঁচের মতো এবং একটু দুধ সাদা ধাঁচের। কিন্তু মোমের আলো তার চোখ থেকে খুব উজ্জ্বলভাবে প্রতিফলিত হলো, খুবই উজ্জ্বলভাবে।

‘আং গেলু’, বিড়বিড় করল বুড়ো সন্ন্যাসী, মাথা ঘুরিয়ে চার দেয়ালে আঁকা হাজার হাজার রেখার দিকে তাকাল। রক্তমাখা আঙুল তুলল সে, আবার কাজ শুরু করবে।

একদম স্বাভাবিকভাবে সন্ন্যাসীর দিকে এগোলেন আং গেলু। এই সন্ন্যাসী হলো মঠের প্রধান ব্যক্তি। এর অবস্থা এখনও অত খারাপ হয়নি। হয়তো তার কাছ থেকে কিছু উত্তর পাওয়া যাবে। স্থানীয় ভাষায় কথা বলতে শুরু করলেন আং গেলু।

মাথা নাড়ল লামা খেমসার, যদিও তার রক্ত শিল্পকর্ম এখনও বন্ধ হয়নি। বুড়ো

সন্ন্যাসীর সাথে কথা বলার চেষ্টা করছেন আং গেলু, এই ফাঁকে লিসা দেয়ালের দিকে নজর দিল। এই ধরনের লেখার সাথে লিসার কোনো পরিচিতি নেই, তবে ও লক্ষ করল দেয়ালে প্রায় একই ধরনের চিহ্ন বারবার লেখা হয়েছে, প্রায় কাছাকাছি দেখতে ওগুলো।

নিশ্চয়ই কোনো অর্থ আছে ওগুলোর। ব্যাগ থেকে এক হাত দিয়ে ক্যামেরা বের করল লিসা। কোমরের কাছে ক্যামেরা রেখে দেয়ালের দিকে তাক করে ছবি তুলল ও। কিন্তু ফ্ল্যাশলাইটের কথা ওর খেয়াল ছিল না।

ফ্ল্যাশের আলোয় ঝলসে উঠল পুরো রুম।

চিৎকার করে উঠল বুড়ো সন্ন্যাসী। হাতে ছোরা নিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। বাতাসে চালাল ছোরাটাকে। চমকে উঠে পিছু হটলেন আং গেলু। কিন্তু তাকে লক্ষ্য করে ছোরা চালানো হয়নি। অস্পষ্ট শব্দ করে ভয়ে আর্তনাদ করে উঠল লামা খেমসার, ছোরা চালিয়ে দিল নিজের গলায়। টকটকে লাল রক্তের ধারা গড়াতে শুরু করল। শ্বাসনালী কেটে গেছে। রক্তে বুদবুদ তৈরি করে শেষ নিঃশ্বাস শ্রাগ করল বুড়ো সন্ন্যাসী।

শরীর ঘুরিয়ে ছোরার খোঁচা এড়িয়ে ছিলেন আং গেলু। লামা খেমসারকে ধরে মেঝে শুইয়ে দিলেন তিনি। রক্তে আং গেলুর গাউন, হাত ও কোল ভিজে গেল। আঘাতপ্রাপ্ত স্থান থেকে রক্ত ঝরা বন্ধ করার চেষ্টা করলেন আং গেলু কিন্তু সে চেষ্টা বৃথা।

‘ওকে নিচে নিয়ে যেতে হবে, আমাকে সাহায্য করুন।’ বলল লিসা। ‘ওনার শ্বাসকার্য চালানোর ব্যবস্থা করতে হবে।’

মাথা নাড়লেন আং গেলু। তিনি জানেন, আর কোনো লাভ হবে না। বুড়ো সন্ন্যাসীর দেহকে একটু নড়ালেন তিনি। রক্তের সাথে বের হওয়া বুদবুদগুলো দেখে বোঝা যাচ্ছিল বুড়ো সন্ন্যাসী শ্বাস নিচ্ছে। ইতোমধ্যে সেই বুদবুদগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। বয়স, রক্তক্ষরণ ও পানিশূন্যতার কারণে লামা খেমসার এমনিতেই দুর্বল ছিল।

‘আমি দুঃখিত,’ বলল লিসা। ‘আমি ভেবেছিলাম…’ দেয়ালের দিকে দেখাল ও। ‘আমি ভেবেছিলাম ওগুলো গুরুত্বপূর্ণ।

আং গেলু মাথা নাড়লেন। ‘কিছুই না। স্রেফ পাগলের পাগলামো।’

আর কী বলবে ভেবে পেল না লিসা। স্টেথোস্কোপ বের করে বুড়ো সন্ন্যাসীর বুক পরীক্ষা করতে শুরু করল। ব্যস্ততার মুখোশ পড়ে নিজের অপরাধ ঢাকার চেষ্টা করল ও। ভাল করে কানপাতল ও। কোনো হার্টবিট নেই। কিন্তু সন্ন্যাসীর পাজরে অদ্ভুত ক্ষত আবিষ্কার করল। আস্তে করে গাউন সরিয়ে বুকের ক্ষতগুলো উন্মুক্ত করল লিসা।

নিচের দিকে তাকালেন আং গেলু, দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।

দেখা গেল শুধু দেয়ালে লিখেই ক্ষান্ত হয়নি লামা খেমসার। সন্ন্যাসীর বুকে একটা চূড়ান্ত চিহ্ন আঁকা রয়েছে। ওই একই ছোরা দিয়ে এবং সম্ভবত সন্ন্যাসী তার নিজ হাতেই কাজটা করেছে। তবে দেয়ালে আঁকা চিহ্নগুলোর মতো ভাঙ্গা ক্রসের এই চিহ্নটা অপরিচিত নয়।

একটা স্বস্তিকা।

হঠাৎ ওরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রথম বিস্ফোরণের ধাক্কায় ভবন কেঁপে উঠল।

.

সকাল ৯ টা ৫৫ মিনিট।

আতঙ্ক নিয়ে জেগে উঠল সে।

বজ্রপাতের শব্দ তাকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। না বজ্রপাত নয়। বিস্ফোরণ। নিচু সিলিং থেকে পাস্টারের ধূলি নেমে এলো। উঠে বসল সে। কোথায় আছে সে, বুঝতে পারছে না। ওর সামনে থাকা রুম যেন একটু চক্কর মেরে উঠল। শরীর থেকে পশমি কম্বল ফেলে দিল ও। অদ্ভুত ধরনের খাটে রয়েছে সে, পরনে শুধু লিনেনের একটা ব্রিচক্লাউট। এক হাত উঁচু করল ও। হাত কাঁপছে। গরম পেস্টের মতো স্বাদ পেল মুখের ভেতর। পুরো রুম প্রায় অন্ধকারই বলা চলে, চোখ জ্বালা করলো ওর। আকস্মিক কাঁপুনিতে কেঁপে উঠল শরীর।

এখন কোথায় আছে, আগে কোথায় ছিল সে-সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই তার।

বিছানা থেকে পা নামিয়ে ওঠার চেষ্টা করল সে। উচিত হয়নি। ওর পৃথিবী আবার অন্ধকার হয়ে গেল। ধপ করে পড়ে গিয়ে জ্ঞান হারাতে যাচ্ছিল কিন্তু গুলির আওয়াজ সেটা হতে দিল না। অটোমেটিক ফায়ার। কাছেই হয়েছে। গুলির শব্দ মিলিয়ে গেল।

আবার চেষ্টা করল ও। আগের চেয়ে জোরদারভাবে। কিন্তু ওর স্মৃতিশক্তি এমনভাবে ধরা দিল যেন ও একটা দরজার দিকে এগোচ্ছে। আঘাত করছে দরজায়, হাত দিয়ে টানছে, নব ধরে ঘোরানোর চেষ্টা করছে কিন্তু…

সেটা তালাবন্ধ।

.

সকাল ৯ টা ৫৭ মিনিট।

‘হেলিকপ্টার,’ বললেন আং গেলু। ‘ধ্বংস হয়ে গেছে ওটা।’

উঁচু জানালার একপাশে দাঁড়িয়ে আছে লিসা। কিছুক্ষণ আগে বিস্ফোরণ হয়েছে। প্রাথমিক ধাক্কা কেটে যাওয়ার পরই জানালা খুলে বাইরে তাকিয়েছে ওরা। সৈনিকটা বলছে, সে হয়তো নিচে উঠোনের ওদিকে কাউকে নড়াচড়া করতে দেখেছিল।

এখান থেকে গুলি ছোঁড়া হলেও জবাবে ওদিক থেকে কোনো গুলি ছোঁড়া হয়নি।

‘কাজটা কী পাইলট করেছে?’ প্রশ্ন করল লিসা। হয়তো ইঞ্জিনে কোনো সমস্যা দেখা দিয়েছিল, ভয়ে কাজটা করেছে সে।

সৈনিকটি এখনও জানালার কাছে নিজের পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একচোখ স্কোপে রেখে নজর রাখছে।

আলু ক্ষেতের ওদিক থেকে উঠে আস: ধোয়ার দিকে নির্দেশ করলেন আং গেলু। হেলিকপ্টার ওখানেই পার্ক করা ছিল। ‘ওটা কোনো যান্ত্রিক দুর্ঘটনা ছিল, আমি বিশ্বাস করি না।’

‘তাহলে আমরা এখন কী করব?’ লিসা জানতে চাইল। আরেকজন পাগল সন্ন্যাসী হেলিকপ্টার উড়িয়ে দিয়েছে নাকি? যদি দিয়ে থাকে তাহলে এই মঠে এরকম কতজন ম্যানিয়াক ঘুরে বেড়াচ্ছে? কাস্তে হাতে থাকা সন্ন্যাসী ও নিজের গলায় ছোরা ঢুকিয়ে দেয়া সন্ন্যাসীর কথা মনে করল ও। হচ্ছেটা কী এখানে?

‘আমাদের যেতে হবে?’ বললেন আং গেলু।

‘কোথায়?

‘এখান থেকে হাঁটা পথে একদিন লাগবে, ছোট্ট একটা গ্রাম আছে। এখানে যা-ই হয়ে থাকুক না কেন সেটা আমাদের তিনজন ছাড়াও আরও লোকজনের জানা দরকার।’

‘এখানে থাকা বাকিরা কোথায়? সবাই আপনার আত্মীয়ের মতো অতটা অসুস্থ নাও হয়ে থাকতে পারে। আমাদের তো তাদেরকে সাহায্য করা উচিত, তাই না?

‘ডা, কামিংস, আমার প্রথম কাজ হলো আপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তারপর এই ঘটনাকে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষকে জানানো।

‘কিন্তু যদি এখানে সংক্রামক জীবাণু থেকে থাকে? ভ্রমণের ফলে আমরা তো তাহলে ওগুলোকে ছড়িয়ে দেব।

জখম হওয়া গালে আঙুল বুলালেন সন্ন্যাসী! ‘হেলিকপ্টার ধ্বংস হয়ে গেছে, যার মানে দাঁড়াচ্ছে আমাদের যোগাযোগ মাধ্যম নেই। যদি এখানে থেকে যাই তাহলে আমরাও মারা যাব। বাইরের দুনিয়া এই ঘটনা সম্পর্কে কিছুই জানতে পারবে না।’

আং গেলু উচিত কথা বলেছেন।

‘যতক্ষণ না আরও বিস্তারিত না জানতে পারছি ততক্ষণ বাইরের মানুষদের কাছে আমরা আমাদের উপস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি।’ বললেন তিনি। সাহায্য চাইব ঠিকই কিন্তু সেটা করব নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে।

‘কোনো শারীরিক সংযোগ নয়’ বিড়বিড় করল লিসা।

মাথা নাড়লেন সন্ন্যাসী। ‘আমরা যে তথ্য বহন করছি, সেটার জন্য এতটুকু ॥ নেয়া যেতেই পারে।’

লিসা ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। নীল আকাশের দিকে যাত্রা করা কালো ধোঁয়ার দিকে তাকাল ও। এখানে যে কতজন আক্রান্ত হয়েছে সেটা এখনও অজানা। ওরা নিশ্চয়ই বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পেয়েছে। যদি ওদের তিনজনকে পালাতেই হয় তাহলে খুব দ্রুত পালানো উচিত।

‘চলুন।’ বলল লিসা।

তীক্ষভাবে সৈনিককে কিছু বললেন আং গেলু। মাথা নেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল সে। জানালার কাছ থেকে পজিশন বদলে নিজের অস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত হলো।

রুম ও সন্ন্যাসীর দিকে শেষবারের মতো দুশ্চিন্তাগ্রস্ত দৃষ্টিতে তাকাল লিসা। ধরে নিল, সম্ভাব্য সংক্রামক জীবাণু আছে। ওরা কী ইতোমধ্যে ওতে আক্রান্ত হয়ে গেছে। নিজেকে বিচার বিশ্লেষণ করতে করতে রুম থেকে বেরিয়ে মই বেয়ে নামল লিসা। ওর মুখ শুকিয়ে গেল, শক্ত হয়ে গেল চোয়ালের মাংস, হৃদপিণ্ড যেন উঠে এল গলার কাছে। কিন্তু এগুলো তো হচ্ছে ভয়ের কারণে, তাই না? উড়ে এসে এরকম পরিস্থিতিতে পড়ার ফলে এরকম প্রতিক্রিয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। নিজের কপালে হাত দিল ও। একটু ভেজা, তবে জ্বরের কোনো লক্ষণ নেই। নিজেকে সামলে নেয়ার জন্য গভীরভাবে নিঃশ্বাস নিল ও। বোকামীর কথা চিন্তা করল। যদি সংক্রামক জীবাণুগুলো আক্রমণ করে থাকে তাহলে ওটার প্রভাব এক ঘণ্টার মধ্যেই দেখা দেবে।

মন্দিরে থাকা বুদ্ধ ও তার পার্শ্ববর্তী দেবতাদের অতিক্রম করে এগোল ওরা। দরজার ওখানে দিনের আলো একদম জ্বলজ্বল করছে।

এক মিনিট ধরে উঠোন পরীক্ষা করল সৈনিক। সন্তুষ্ট হয়ে ওদের ইশারা করল। এগিয়ে গেল লিসা ও আং গেলু।

উঠোনে পা দিয়েই ওখানকার অন্ধকারাচ্ছন্ন কোণাগুলোর দিকে তাকাল লিসা। আশা করছিল, কাউকে হয়তো নড়াচড়া করতে দেখবে। কিন্তু সব চুপচাপ, সুনসান। কিন্তু বেশিক্ষণের জন্য নয়…

ও আরেকটু সামনে এগোতেই দ্বিতীয় বিস্ফোরণ ঘটল। ভবন বিস্ফোরিত হলো এবার। তার ধাক্কা পৌঁছে গেল উঠোন পর্যন্ত। বিস্ফোরণের ধাক্কায় হাত-পা ছড়িয়ে ছিটকে পড়ল লিসা। কাঁধের ওপর ভর করে গড়িয়ে পড়ল, ওর দৃষ্টি পেছন দিকে।

আগুনের লেলিহান শিখাকে সাথে নিয়ে আকাশের দিকে যাত্রা করেছে লাল টাইলগুলো। জানালাগুলোকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে বেরিয়ে এল বিস্ফোরণের আগুন। দরজাগুলো টুকরো-টুকরো হয়ে গেল। আরও ধোয়া ও আগুনের জন্ম হলো। এক পশলা গরম বাতাস বয়ে গেল লিসার ওপর দিয়ে।

কয়েক পা সামনে এগিয়ে থাকা সৈনিকটির পেছনে এসে ধাক্কা দিয়েছিল শকওয়েভ। অস্ত্রের সাথে তার আঙুলগুলো জড়িয়ে ছিল আষ্টেপৃষ্ঠে। হামাগুড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে আকাশ থেকে ফিরতি পথ ধরে নেমে আসা টাইলগুলোর কবলে পড়ল সে।

ধাক্কা কাটিয়ে আং গেলু উঠে দাঁড়িয়ে লিসার দিকে এক হাত বাড়িয়ে দিলেন।

এটাই ছিল তার শেষ কাজ।

আগুনের গর্জন ও টাইল ভাঙ্গার আওয়াজকে ছাপিয়ে আরেকটা আওয়াজ শোনা গেল। একটা গুলির আওয়াজ। সন্ন্যাসীর চেহারার ওপরের অংশ রক্তে ভেসে গেল।

কিন্তু এবার ওই সৈনিকটি গুলি করেনি।

সৈনিকের কাধ থেকে স্ট্রীপের সাহায্যে অস্ত্রটি ঝুলে আছে। টাইলগুলোর কবল থেকে নিজেকে সরিয়ে নিল সৈনিক। গুলির আওয়াজ হয়তো ওর কানে যায়নি, কিন্তু আং গেলুকে লুটিয়ে পড়তে দেখে ওর চোখ বড়বড় হয়ে গেল। খুব দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখাল সে। ডান দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে পার্শ্ববর্তী ভবনের ছায়ায় আশ্রয় নিল। লিসার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করল ও, আতঙ্কিত হওয়ায় ঠিকভাবে উচ্চারণ করতে পারল না।

মন্দিরের দরজার দিকে হামাগুড়ি দিয়ে পিছিয়ে গেল লিসা। পাথুরে উঠোনে আরেকটা গুলির আওয়াজ হলো। লিসার পায়ের আঙুলের কাছে এসে মুখ থুবড়ে পড়ল বুলেট। নিজেকে রীতিমতো উড়িয়ে নিয়ে গেল লিসা। দরজা পেরিয়ে অন্ধকারে প্রবেশ করল।

কোণায় দাঁড়িয়ে ও খেয়াল করল, সৈনিকটি দেয়াল ঘেঁষে এগোচ্ছে। এখানেই কোথাও স্নাইপার দিয়ে গুলি চালাচ্ছে কেউ। তাই স্নাইপারের দৃষ্টি বাঁচাতে সতর্কতা অবলম্বন করছে সে।

লিসা জানে না কীভাবে শ্বাস নিচ্ছে ও। ওর চোখ দুটো বড় হয়ে গেছে। ছাদের প্রান্ত আর জানালাগুলোয় সন্ধানী দৃষ্টি বুলাল ও। আং গেলু’কে গুলি করল কে?

তারপর একজনকে দেখতে পেল লিসা।

অন্য ভবনের ধোয়ার চাদর থেকে একটা ছায়া বেরিয়ে এলো। লোকটা দৌড় দেয়ায় আগুনের ঝলসানিতে তার হাতে থাকা ধাতব কিছু একটা ঝকমক করে উঠল। অস্ত্র। স্নাইপার তাহলে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে নতুন জায়গায় যাচ্ছে।

পিছু হটল লিসা। প্রার্থনা করল ছায়া যেন ওকে পুরোপুরি লুকিয়ে রাখে। ইশারা করে সৈনিককে ডাকল ও। দেয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে সে, আস্তে আস্তে লিসার দিকে এগিয়ে আসছে, মন্দিরের দিকে। তার দৃষ্টি ও অস্ত্র দুটোই ছাদের দিকে তাক করা। স্নাইপারের দৌড় ওর চোখে পড়েনি।

চিৎকার করল লিসা। গেট আউট! সৈনিকটি হয়তো ওর ভাষা বুঝতে পারবে না কিন্তু কী বোঝাতে চাচ্ছে সেটা তো বুঝতে পারবে। সৈনিকের চোখে চোখ পড়ল ওর। নিজের লুকোনো জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকেই ইশারা করল লিসা। স্নাইপার কোন পথ দিয়ে গেছে সেটার একটা রাস্তা ইশারায় বুঝিয়ে দেয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু ওই লোক গেল কোথায়? এতক্ষণে কী নিজের পজিশন নিয়ে নিয়েছে?

‘দৌড়াও!’ চিৎকার করল লিসা।

লিসার দিকে এক পা এগোল সৈনিক। তার কাঁধের পেছনে ঝলসে উঠল কী যেন। ভুল প্রমাণিত হলো লিসার ধারণা। পাশের ভবনের একটা জানালার পেছনে আগুন নৃত্য শুরু করে দিয়েছে। আরেকটা বোম।

হায় ঈশ্বর…

সৈনিকটি এগোনোর মাঝপথে বিস্ফোরিত হলো ওটা। তার পেছনে থাকা দরজা হাজার টুকরো হয়ে ছিটকে গেল, সৈনিকটিকেও ছাড়ল না। তাকে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে ফেলল উঠোনের ওপর। মুখের ওপর ভর করে আছড়ে গড়াতে শুরু করল সে।

গড়ানো থেমে গেলেও সৈনিকটি আর নড়ল না। ওর পোশাকে আগুন ধরে যাওয়ার পর নিথর হয়ে পড়ে রইল সে।

মূল মন্দিরের আরও ভেতরে চলে গেল লিসা, দরজা খুঁজছে। পেছনের পথের দিকে গিয়ে সরু হলে পা রাখল ও। ওর কোনো পরিকল্পনা নেই। সত্যি বলতে, কী করছে কী ভাবছে সেটার উপরে ওর নিজেরই কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।

তবে ও একটা ব্যাপারে নিশ্চিত। আং গেলু আর ওদের সৈনিককে যে খুন করেছে সে কোনো পাগল সন্ন্যাসী নয়। প্রতিটা বিস্ফোরণ খুব হিসেব করে ঘটানো হয়েছে, পুরো ব্যাপারটা দক্ষ হাতের কাজ।

লিসা এখন একা।

সরু হলওয়ে দেখল ও। রেলু নাআ’র রক্তাক্ত লাশ চোখে পড়ল ওর। ওটা ছাড়া হলওয়ের বাকিটুকু একদম পরিষ্কার। মৃত সন্ন্যাসীর কাস্তেটা যদি ও নিতে পারতো,.. তাহলে অন্তত একটা অস্ত্র হতো হাতে…

হলের দিকে পা বাড়াল লিসা।

এক পা ফেলে দ্বিতীয় পা ফেলতে যাবে এমন সময় পেছন থেকে বাধাগ্রস্ত হলো ও। একটা নগ্ন বাহু ওর গলা প্যাচিয়ে ধরল। কর্কশ কণ্ঠে ওর কানের কাছে ঘেউ করে উঠল সে। ‘নড়বে না।’

অবশ্যই নড়বে! লিসা আক্রমণকারীর পেটে কনুই চালিয়ে দিল।

উফ শব্দ করে মালিক তার বাহু সরিয়ে নিল। কারুকার্য খচিত পর্দার ওপর গিয়ে পড়ল সে। ওজন সইতে না পেরে পর্দা খসে পড়ল। পাছার ওপর ভর করে আছড়ে পড়ল সে।

ঘুরে দাঁড়িয়েছে লিসা, দৌড় দেয়ার জন্য একদম তৈরি।

লোকটার পরনে জাঙ্গিয়া ছাড়া কিছুই নেই। তার চামড়ার রং তামাটে তবে এখানে সেখানে পুরোনো কাটা-ছেঁড়ার দাগ আছে। কালো লম্বা চুলগুলো এলোমেলো, চেহারার প্রায় অর্ধেক ঢেকে দিয়েছে। আকার আকৃতিতে লোকটা বেশ পেশিবহুল, চওড়া কাঁধের অধিকারী। তাকে দেখতে তিব্বতিয়ান সন্ন্যাসী নয়, আমেরিকান মনে হচ্ছে।

কিংবা পরনে থাকা জাঙ্গিয়ার জন্যও এরকম মনে হতে পারে।

গুঙিয়ে লিসার দিকে তাকাল সে। তার নীল চোখ দুটোতে বাতির আলো প্রতিফলিত হলো।

‘কে তুমি?’ প্রশ্ন করল লিসা।

‘পেইন্টার,’ গোঙানির সাথে জবাব দিল সে। ‘পেইন্টার ক্রো।’

০২. ডারউইন’স বাইবেল

০২.

ডারউইন’স বাইবেল

১৬ মে, সকাল ৬ টা ৫ মিনিট।
কোপেনহ্যাগেন, ডেনমার্ক।

বইয়ের দোকানের সাথে বিড়ালের কীসের সম্পর্ক?

হোটেল ন্যাভন থেকে বের হওয়ার পর আরও একটি চুষে খাওয়ার ক্লেরিটিন ট্যাবলেটকে কচকচ করে গুড়ো করে ফেলল কমান্ডার গ্রেসন পিয়ার্স। গতকাল কোপেনহ্যাগেনের বইপড়য়া কমিউনিটিতে গবেষণা করার পর আজ শহরের আধ ডজন বই সংক্রান্ত স্থানে ঢু মারতে হয়েছে তাকে। প্রতিটি বইয়ের দোকানে বিড়াল নিজেদের থাকার ব্যবস্থা করে নিয়েছে। কাউন্টারগুলোতে ঘুরোঘুরি, বুকশেলফে রাখা বইয়ের ওপরে জমে থাকা ধূলোর ওপর দিয়েও তাদের অবাধ যাতায়াত।

বিড়ালগুলোর জন্য এখন ওকে ভুগতে হচ্ছে। একটা হাঁচি দিল ও। তবে এই হাঁচি ঠাণ্ডা পড়তে শুরু করার কারণেও হতে পারে। কোপেনহ্যাগেনের বসন্ত কাল নিউ ইংল্যান্ডের শীতকাল একই কথা। পিয়ার্স যথেষ্ট গরম কাপড় সাথে আনেনি।

হোটেলের পাশে থাকা এক বুটিকের দোকান থেকে কেনা একটি সোয়েটার পরে আছে ও। গলা কাটা দাম রেখেছে দোকানে। সোয়েটারের উঁচু কলারটা ভেড়ার পশমে মোড়ানো। কোনো রং করা নেই। পশমগুলো চুলকালেও ভোরের ঠাণ্ডা থেকে রক্ষা করছে বেশ ভালভাবেই। অবশ্য ভোর হয়েছে আরও ঘণ্টাখানেক আগে। কালচে-ধূসর আকাশে সূর্যের যেরকম নোনা তেজ দেখা যাচ্ছে তাতে আজ তাপমাত্রা বাড়ার কোনো আশা নেই। কলারের ওখানটায় একটু চুলকে নিল পিয়ার্স। সেন্ট্রাল রেল স্টেশনের দিকে এগোচ্ছে ও।

শহরের একটি খালের পাশে ছিল ওর হোটেল। সুন্দর করে রং করা এক সারি ঘর ছিল ওটা। পানির দু’ধারে বিভিন্ন ধরনের দোকান, ছাত্রাবাস ও ব্যক্তিগত বাড়ি ছিল। এরকম দৃশ্য দেখে আমসটার্ডামের কথা মনে পড়ে গিয়েছিল ওর। দুই পাড়ে নোঙর করা ছিল হরেক রকম জলযান। কম আকর্ষণীয় নিচু ছাদের পাল তোলা নৌকা থেকে শুরু করে চমৎকার প্রমোদতরী, কাঠের তৈরি স্কুনার, ঝলমলে ইয়ট; সবই ছিল ওখানে। মাথা নেড়ে একটি ইয়টের পাশ দিয়ে চলে এলো গ্রে। ওটাকে দেখতে ভাসমান ওয়েডিং কেকের মতো লাগছিল। এত সকালেও ক্যামেরা কাঁধে নিয়ে কিছু দর্শনার্থী এখানে হাজির হয়ে গেছে। এদিক-সেদিক তাকাচ্ছে কিংবা ব্রিজের রেইলের ওখানে গিয়ে ছবি তুলছে মনের সুখে।

পাথরের খাম পেরিয়ে খালের তীর ধরে হাফ ব্লক পর্যন্ত এগোল গ্রে। ইটের পাচিলের সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে পানির দিকে তাকাল ও। স্থির পানিতে ওর প্রতিবিম্ব আছে, একটু বাঁকা অংশ দু’ভাগে আলাদা করেছে থুতনিকে। চেহারার মসৃণতা ও তীক্ষ্ণ ধাকগুলো বলে দিচ্ছে ও যুক্তরাজ্যে ওয়েলস প্রদেশের অধিবাসী। বাবার মতোই হয়েছে গ্রে। একটা ব্যাপার গ্রেসনের মাথায় প্রায়ই ঘুরপাক খায়, রাতে ঘুম হয় না ওর।

বাবার কাছ থেকে আর কী কী পেয়েছে ও?

এক জোড়া ব্ল্যাক সোয়ান ওর পাশ দিয়ে আঁতরে গেল। পানিতে আলোড়ন তৈরি না হওয়ায় প্রতিবিম্ব আর ঠিক থাকল না। হাঁস দুটো ব্রিজের দিকে এগোচ্ছে। গলা নড়িয়ে নির্লিপ্তভঙ্গিতে সাঁতরাচ্ছে ওরা।

গ্রে ওদের দেখে শিখল। সোজা হয়ে নোঙর করে রাখা নৌকাগুলোর ছবি তোলার ভান করল ও। তবে ওর মূল উদ্দেশ্য হলো এইমাত্র পেরিয়ে আসা ব্রিজ পর্যবেক্ষণ করা। কোনো একাকী ব্যক্তি, পরিচিত মুখ কিংবা সন্দেহজনক কাউকে দেখা যায় কি না দেখল ও। খালের পাশে অবস্থান নেয়ার একটা সুবিধা আছে। কেউ পিছু নিয়েছে কি-না সেটা ব্রিজ থেকে সহজেই খেয়াল করা যায়। কারণ, ক্রস করে রাখা পাথরের খামের পর পিছু নেয়া ব্যক্তিকে নিজের অস্তিতের জানান দিতেই হবে। কোনো উপায় নেই। এক মিনিট ধরে পর্যবেক্ষণ করার পর সন্তুষ্ট হলো গ্রে। যাদেরকে দেখল তাদের সবার চেহারা আর হাঁটার ভঙ্গি মাথায় গেঁথে নিল। এগোল নিজের পথে।

এরকম ছোটো অ্যাসাইনমেন্টে এত সতর্কতার তেমন কোনো প্রয়োজন নেই কিন্তু ওর গলায় দায়িত্বের বোঝা আছে। জিনিসটি হলো একটি চেইন। রূপোর ছোট একটি ড্রাগন ঝুলছে ওতে। আড়ালে থাকা এক খেলোয়ারের কাছ থেকে উপহার পেয়েছে এটা। মনে রাখার জন্য গলায় পরে ও। সতর্ক থাকার জন্য কাজে দেবে।

সামনে এগিয়েছে এমন সময় পকেটে পরিচিত কম্পন অনুভব করল গ্রেসন পিয়ার্স। সেল ফোন বের করল ও। এত সকাল সকাল কে ফোন করল ওকে?

‘পিয়ার্স বলছি,’ বলল ও।

‘গ্রে, যাক, তোমাকে পাওয়া গেল।

সকালের ঠাণ্ডার মধ্যেও পরিচিত মসৃণ কণ্ঠস্বর শুনে উষ্ণতাবোধ করল গ্রে। ওর কঠোর চেহারায় এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। র‍্যাচেল…? কথা বলতে গিয়ে একটু ধীরে পা ফেলল ও। কোনো সমস্যা হয়েছে?

গ্রেসন পিয়ার্সের আটলান্টিক পেরিয়ে এই ডেনমার্ক আসার পেছনে মূল কারণ হলো এই র‍্যাচেল ভেরোনা। এখানে বর্তমানে যে তদন্ত চলছে সেটা সিগমার কোনো লো-লেভেল রিসার্চ অ্যাসিসটেন্টকে দিয়ে করিয়ে নেয়া যেত। কিন্তু এই মিশন হাতে নিলে কালো চুলের অধিকারিণী সুন্দরী ইটালিয়ান লেফটেন্যান্টের সাথে দেখা করার মোক্ষম সুযোগও পাওয়া যায়। ওদের দুজনের প্রথম দেখা হয়েছিল রোমে, সর্বশেষ একটি কেস নিয়ে। তখন থেকে দুজন দেখা করার জন্য মুখিয়ে আছে, কিন্তু উপযুক্ত সুযোগ পাচ্ছে না। র‍্যাচেল ইউরোপে নিজের কাজ নিয়ে বন্দী থাকে অন্যদিকে ফোর্সের হয়ে কাজ করার সুবাদে ওয়াশিংটন থেকে সরার খুব একটা সময় পায় না গ্রে।

ওদের শেষ দেখা হওয়ার পর প্রায় আট সপ্তাহ কেটে গেছে। দুজন একসাথে ফিরল ওরা।

আট সপ্তাহ। অনেক দিন পার হয়ে গেছে।

ওদের সর্বশেষ দেখা হওয়ার ঘটনা মনে পড়ল গ্রেসন পিয়ার্সের। ভেনিসের এক ভিলায় ছিল ওরা। সূর্যের আলো পেছনে থাকায় বেলকুনির খোলা দরজার সামনে র‍্যাচেলের দেহ কাঠামো ফুটেছিল। পুরো সন্ধ্যায় বিছানায় কাটিয়েছিল দু’জন। স্মৃতির জোয়ারে ভাসতে শুরু করল গ্রে। র‍্যাচেলের ঠোঁটের সেই দারুচিনি ও চকোলেটের স্বাদ, ভেজা চুলের ঘ্রাণ, ঘাড়ে পড়া উষ্ণ নিঃশ্বাস, আলতো গোঙানি, দু’জনের জড়ানো শরীর, নরম আদর….

ব্ল্যাক টেডি বিয়ারটাকে প্যাক করার কথা যেন র‍্যাচেলের মনে থাকে, প্রার্থনা করল গ্রে।

‘আমার ফ্লাইট টাইম পিছিয়ে গেছে। লেট।’ বলল র‍্যাচেল। ওকে কল্পনা থেকে বাস্তবে নিয়ে এল।

‘কী?’ খালের পাশে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল ও। গলার স্বরের হতাশা লুকোতে ব্যর্থ হয়েছে।

‘কেএলএম ফ্লাইটে চড়ে আসব আমি। রাত দশটায় ল্যান্ড করব।”

দশটায়। ভ্রু কুঁচকানো গ্রে। তার মানে মধ্যযুগীয় এক মঠ ভল্টের পাশে অবস্থিত সেন্ট জারট্রাডস ক্লোসটার-এর ডিনার বিজারভেশনটা বাতিল হয়ে যাচ্ছে। নির্দিষ্ট দিনের পাক্কা এক সপ্তাহ আগে বুকিং দিয়েছিল গ্রেসন।

‘আমি দুঃখিত, পিয়ার্সের নীরবতা বুঝে বলল র‍্যাচেল।

‘না… কোনো সমস্যা নেই। তুমি এসো। তোমার আসাটাই সবচেয়ে বড় ব্যাপার।’

‘আমি জানি। আমি তোমাকে অনেক মিস করি।’

‘আমিও।

র‍্যাচেলকে এত সাদামাটাভাবে জবাব দেয়ার কারণে গ্রেসন দুর্বলভাবে মাথা নাড়ল। কত কিছু ভেবে রেখেছিল ও কিন্তু কিছুই বলতে পারল না। কেন কেমন হয়? প্রত্যেক প্রেমিক-প্রেমিকার প্রথম মিলনের দিনে একটি কঠিন ধাপ উত্তীর্ণ হতে হয়। সেটা হলো : অস্বস্তিকর লজ্জা। দুজনে দুজনার প্রেমে ডুবে বাহুডোরে বাঁধা পড়ল…। এরকম কাব্যিক কথা বলা সহজ হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। অতীতের স্মৃতিকে পুঁজি করে প্রথম এক ঘন্টা ওরা প্রায় অপরিচিত মানুষের মতো আচরণ করেছিল। জড়িয়ে ধরে, চুমো খেয়ে, আসল কথা বলে ফেললেই তো ল্যাঠা চুকে যায়। কিন্তু গভীর প্রণয় জমতে একটু সময়ের প্রয়োজন। আটলান্টিকের দুই তীরে বসবাসরত দুই মানব-মানবীর একে অপরকে বোঝার জন্য এক ঘন্টা লেগে গিয়েছিল। কিন্তু সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, ছন্দ খুঁজে পেয়েছিল ওরা। কথা বলতে গিয়ে কণ্ঠস্বরের উঁচু-নিচু হয়ে যাওয়া ওদেরকে আরও আবেগপ্রবণ করে দিয়েছিল।

আর গ্রেসন প্রতিবারই ভয় পাচ্ছিল ওরা হয়তো শেষপর্যন্ত মূল লক্ষ্য খুঁজে পাবে না।

‘তোমার বাবা কেমন আছে?’ নাচতে শুরু করার প্রথম স্টেপ দেয়ার সময় জিজ্ঞেস করেছিল র‍্যাচেল।

প্রয়োজনীয় হোক বা না থোক ভিন্ন প্রসঙ্গে কথা শুরু হওয়ায় আপত্তি ছিল না গ্রেসনের। আর যেহেতু ওর কাছে ভাল খবর আছে, তাহলে আর সমস্যা কীসের। সে

কয়েকটি অনিশ্চয়তার ধাপ আছে এই আরকী। আমার মায়ের ধারণা বাবার এই উন্নতির পেছনে তরকারির প্রভাব আছে।

‘তারকারি? ঝাল দেয়া?

‘একদম। কোনো আর্টিকেলে সে পড়েছিল হলুদ তরকারি নাকি এরকম রোগে ভাল কাজে দেয়।’

“আচ্ছা। তারপর?

‘তারপর থেকে আমার মা সবকিছুতে তরকারি দেয়া শুরু করল। এমনকি আমার বাবার সকালের ডিমও রেহাই পেল না। ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টের মতো ঘ্রাণ বের হয় পুরো বাড়ি থেকে।

র‍্যাচেলের নরম হাসি নিরানন্দ সকালকে মিষ্টি করে তুলল। ‘যাক। তিনি অন্তত রান্নাটা করছেন।’

চওড়া হাসি দিল গ্রে। ওর মা জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির বায়োলজির প্রফেসর। ঘরের কাজে তার কোনো দক্ষতা ছিল বলে ইতিপূর্বে জানা ছিল না। একটি ইন্ডাসট্রিয়াল দুর্ঘটনায় স্বামী অচল হয়ে যাওয়ার পর নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে বিগত বিশ বছর ধরে অনেক ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন তিনি। এখন তার পরিবারে নতুন এক সমস্যার উদয় হয়েছে। গ্রে’র বাবার অ্যালঝেইমার-এর প্রাথমিক অবস্থা চলছে। ইউনিভার্সিটি থেকে অল্প কিছুদিনের ছুটি নিয়ে স্বামীর সেবা করছিলেন তিনি। কিন্তু তার ক্লাসে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে, তাগাদা দেয়া হচ্ছে ভার্সিটি থেকে। ওয়াশিংটন থেকে গা বাঁচিয়ে এই ঝটিকা ভ্রমণে গ্রে’র সবকিছু বেশ ভালই কেটেছিল।

নতুন করে কিছু বলার আগেই আরেকটি কলের ধাক্কায় কেঁপে উঠল ওর ফোন। কে ফোন করেছে, দেখল গ্রে। ধুর…

‘র‍্যাচেল, সেন্ট্রাল কমান্ড থেকে ফোন করেছে। ফোনটা ধরতে হচ্ছে। আমি দুঃখিত।

‘ওহ, আচ্ছা। ঠিক আছে, রাখো।’

দাঁড়াও, র‍্যাচেল। তোমার নতুন ফ্লাইট নাম্বার।

‘কেএলএম ফ্লাইট ফোর জিরো থ্রি।

“ঠিক আছে। আজ রাতে দেখা হচ্ছে।’

‘হুঁ, আজরাতে।’ পুনরাবৃত্তি করে লাইন কেটে দিল র‍্যাচেল। ফ্ল্যাশ বাটন চেপে অন্য কল ধরল গ্রে। পিয়ার্স বলছি।

‘কমান্ডার পিয়ার্স।’ নিউ ইংল্যান্ডীয় উচ্চারণেই বোঝা গেল বক্তার নাম লোগান গ্রেগরি, সিগমা ফোর্সের সেকেন্ড ইন কমান্ড। ডিরেক্টর পেইন্টার ক্রো’র সরাসরি তত্ত্বাবধানে কাজ করেন তিনি। বরাবরের মতো লোগান এবারও কোনো আলগা কথা বলে সময় নষ্ট করলেন না।

‘আমরা এমন একটা খবর পেয়েছি যেটার সাথে হয়তো তোমার কোপেনহ্যাগেন অনুসন্ধানের কোনো সম্পর্ক আছে। ইন্টারপোল থেকে বলা হয়েছে আজকের নিলাম অনুষ্ঠানের প্রতি হঠাৎ সবাই অনেক আগ্রহী হয়ে উঠেছে।

আরেকটি ব্রিজ পেরিয়ে আবার থামল গ্রে। দশ দিন আগে, ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি কয়েকজন কালো বাজারিকে চিহ্নিত করেছে, যাদের সবাই ভিক্টোরিয়ান-যুগের বিজ্ঞানীদের বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিলাদি বেচা-কেনার সাথে জড়িত। কেউ পাণ্ডুলিপি, প্রতিলিপি, আর কেউ আবার দলিল, চিঠি আর ডায়েরি সংগ্রহ করে থাকে। সেই ভিক্টোরিয়ান-যুগের সময় থেকে বিভিন্ন লোকের হাত বদল হয়ে তাদের কাছে এসে পৌঁছে ওগুলো। এরকম বিষয়ে সিগমা ফোর্স একটু আগ্রহ দেখালে দেখাতে পারে যদি সেটা নিরাপত্তার জন্য কোনো প্রকার হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু এনএসএ বলছে এগুলো থেকে প্রাপ্ত অর্থ সন্ত্রাস গোষ্ঠীদের কাছে যাচ্ছে। অথচ এরকম প্রতিষ্ঠানের অর্থ কোখী থেকে কোথায় যাচ্ছে সেটার ওপর সবসময় নজরদারি করা হয়ে থাকে।

কিছু বোঝা যাচ্ছে না। তবে এরকম ঐতিহাসিক দলিলপত্র অর্থ বিনিয়োগের জন্য ভাল জিনিস, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এগুলোর সাথে তো সন্ত্রাস গোষ্ঠীদের সম্পর্ক থাকে না। কে জানে, দিনকাল বদলেছে। কত কিছুই তো হতে পারে।

এই ব্যাপারের সাথে সম্পর্কযুক্ত প্রধান বিষয়গুলো অনুসন্ধানে নেমেছে সিগমা ফোর্স। আজ সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিতব্য নিলাম অনুষ্ঠানের ব্যাপারে যত বেশি সম্ভব তথ্য সংগ্রহ করাই হচ্ছে গ্রে’র অ্যাসাইনমেন্ট। স্থানীয় সগ্রাহক ও দোকানগুলো কোন কোন জিনিস নিয়ে বেশি আগ্রহী সেটাও জানতে হবে ওকে। এজন্যই গত দুই দিন কোপেনহ্যাগেনের বিভিন্ন সরু গলি-ঘুপচিতে থাকা ধূলো ভর্তি বইয়ের দোকান ও অ্যান্টিকশপগুলোতে টু মেরেছে। তাদের মধ্যে হজব্রা প্ল্যাডস-এর একটি দোকান ওর সবচেয়ে বেশি কাজে এসেছে। জর্জিয়ার এক সাবেক আইনজীবীর দোকান ওটা। তার সাহায্য পেয়ে গ্রে ভেবেছিল, ও এখন কাজের জন্য প্রস্তুত। পিয়ার্সের আজকের প্ল্যান ছিল অনেকটা এরকম :

সকালে উঠে নিলামের এলাকাটা দেখে অনুষ্ঠানে ঢোকা আর বের হওয়ার রাস্তায় কয়েকটি বাটনহোল ক্যামেরা বসাবে, ব্যস। নিলামে গিয়ে ওর কাজ হবে নিলামে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের ভাল করে পর্যবেক্ষণ করা এবং সুযোগ পেলে ছবি তুলে নেয়া। ছোট অ্যাসাইনমেন্ট।

‘আকর্ষণীয় কী উঠছে আজ?’ জিজ্ঞেস করল গ্রে।

নতুন আইটেম। আমরা যাদের ব্যাপারে অনুসন্ধান করছি ওটা তাদের অনেকের আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে। একটা পুরোনো বাইবেল। কোনো এক প্রাইভেট পার্টি নিলামে তুলেছে।

‘এতে এত উত্তেজনার কী আছে?

‘আইটেমের বিবরণে লেখা আছে, বাইবেলটা ডারউইনের।

‘চার্লস ডারউইন, বিবর্তনবাদের জনক?

“হ্যাঁ।

ব্রিজের রেলিঙে আঙুল ঠুকল গ্রে। চার্লস ডারউইন, ইনিও ভিক্টোরিয়ান-যুগের বিজ্ঞানী। বিষয়টা ভাবতে ভাবতে পাশের ব্রিজের ওপর চোখ বুলাল ও।

গ্রে দেখল হুড তোলা গাঢ় নীল সোয়েটার জ্যাকেট পরা এক অল্প বয়সী মেয়ে ওর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সতের… আঠারো বয়স। মসৃণ চেহারা, ত্বকের রং রোদে পোড়া। হুডের একপাশ দিয়ে বেরিয়ে আসা চুলের লম্বা বিণুনি দেখে ভাবল ও… ভারতীয়? নাকি পাকিস্তানি? মেয়েটির বাম কাঁধে একটি সবুজ রঙের ব্যাগ রয়েছে। কলেজ পড়ুয়া অনেক ছাত্র-ছাত্রীর কাছে এরকম ব্যাগ থাকে।

কিন্তু ঘটনা হলো, গ্রে এই মেয়েকে এর আগেও দেখেছে… প্রথম ব্রিজ পার হওয়ার সময়। প্রায় ১৫০ ফুট সামনে দাঁড়ানো মেয়েটির চোখে চোখ পড়েছিল ওর। চট করে অন্যদিকে ঘুরেছিল মেয়েটি অস্বাভাবিক ব্যাপার।

মেয়েটি ওকে ফলো করছিল।

লোগান বলে যাচ্ছে, ‘তোমার ফোনের ডাটাবেসে আমি বিক্রয়কারীর ঠিকানা আপলোড করে দিয়েছি। নিলাম শুরু হওয়ার আগে তার সাথে কথা বলার জন্য যথেষ্ট সময় পাবে তুমি।’

ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা ঠিকানায় চোখ বুলাল গ্রে। শহরের ম্যাপে নির্দিষ্ট স্থান নির্দেশ করা রয়েছে। এখান থেকে আট ব্লক দূরে, স্ট্রোগেটের পাশেই। বেশি দূরে নয়।

কিন্তু প্রথমে…

চোখের কোণা দিয়ে গ্রে এখনও ব্রিজের নিচে থাকা খালের পানির প্রতিবিম্বের দিকে নজর রেখেছে। ও দেখল মেয়েটি কাঁধ কুঁজো করে তার ব্যাকপ্যাক উঁচু করল, নিজের শরীর আড়াল করার ব্যর্থ চেষ্টা।

মেয়েটি বুঝতে পেরেছে সে ধরা পড়ে গেছে?

‘কমান্ডার পিয়ার্স?’ বললেন লোগান।

ব্রিজের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছে মেয়েটি। লম্বা লম্বা পা ফেলে পাশের রাস্তায় অদৃশ্য হয়ে গেল। একটু অপেক্ষা করল গ্রে। মেয়েটি যদি আবার উল্টো দিকে ফিরে আসে।

‘কমান্ডার পিয়ার্স, ঠিকানা পেয়েছ?

‘হ্যাঁ। আমি ওখানে এখুনি যাচ্ছি।’

‘ভেরি গুড।’ লোগান সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিলেন।

ওই মেয়ে কিংবা সন্দেহজনক অন্য কাউকে দেখার আশায় রেলিঙের কাছে দাঁড়িয়ে থেকে নিজের চারদিকে চোখ বুলাল গ্রে। হোটেলের সেফে নিজের নাইম এমএম গ্রুক রেখে আসার জন্য আক্ষেপ করল। কিন্তু অকশন হাউজ থেকে প্রদত্ত নির্দেশনাবলিতে বলা ছিল ওখানে ঢোকার সময় সবাইকে মেটাল ডিটেকটর দিয়ে সার্চ করা হবে। তাই বাধ্য হয়ে অস্ত্র রেখে এসেছে গ্রেসন। বুটের ভেতর লুকোনো একটি কার্বনাইজড চাকু-ই এখানে ওর একমাত্র অস্ত্র।

অপেক্ষা করল গ্রে।

বেলা বাড়ার সাথে সাথে ওর আশেপাশে মানুষের আনাগোনাও বেড়ে গেল। ওর পেছনে একটি মাছ-মাংসের দোকানদার রাস্তার পাশে বরফের টুকরো নামিয়ে ঝুড়ি থেকে টাটকা মাছ বের করে আনছে। সৌল, কড, স্যাভ ইল এবং আরও নানা রকম সামুদ্রিক মাছ।

ওগুলোর গন্ধে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হলো গ্রেসন। নিজের পেছনে সতর্ক দৃষ্টি রেখে এগিয়ে গেল ও।

হয়তো গ্রে একটু বেশিই খুঁতখুঁতে কিন্তু ও যে পেশায় আছে এখানে এরকম স্বভাবকে গুণ হিসেবে ধরা হয়। গলায় ঝুলোনো ড্রাগন ছুঁয়ে দেখল পিয়ার্স। এগিয়ে চলল শহরের ভেতরে।

কয়েক ব্লক পার হওয়ার পর নিরাপদ বুঝে একটি নোটপ্যাড বের করল ও। আজকে হতে যাওয়া নিলাম অনুষ্ঠানে কোন কোন জিনিসের প্রতি সংগ্রাহকদের বেশি আগ্রহ আছে সেগুলোর নাম লিস্ট করতে শুরু করল।

১. ১৮৬৫ সালে জেনেটিক্সের ওপর লেখা গ্রেগর মেন্ডেল-এর একটি পেপার।

২. ফিজিক্সের ওপর লেখা ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কস-এর দুটো বই। নাম : Thermodynamik (১৮৯৭) এবং Theorie der Warmestrahlung (১৯০৬)। দুটো বই-ই লেখক কর্তৃক স্বাক্ষরিত।

৩. উদ্ভিদবিজ্ঞানী হিউগো ডি ভ্রিসেস-এর উদ্ভিদ রূপান্তরের ওপর লেখা ডায়েরি। গতকাল এই জিনিসগুলো সম্পর্কে যত তথ্য জেনেছে সবটা টীকা আকারে লিখে রাখল গ্রে। তারপর এই তালিকায় আরও একটি নতুন নাম যোগ করল।

৪. চার্লস ডারউইন-এর পারিবারিক বাইবেল। নোটপ্যাড বন্ধ করল গ্রেসন। এখানে আসার পর থেকে যে ব্যাপারটা নিয়ে এপর্যন্ত প্রায় ১০০ বার চিন্তাটা করেছে সেটা নিয়ে আবার ভাবল ও সম্পর্কটা কোথায়?

হয়তো এই প্রশ্নের উত্তর সিগমার অন্য কেউ দিতে পারবে। গ্ৰে ভাবছে লোগনিকে এই তথ্যগুলো ওর সহকর্মী মনক ক্যালিস ও ক্যাথরিন ব্রায়ান্টকে দিতে বলবে কি-না। আগেই প্রমাণিত হয়ে গেছে, এই যুগল বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তকে সাজিয়ে গুছিয়ে দিতে ওস্তাদ। এমনকি আদৌ যদি কোনো কিছু নাও থাকে তবুও ওরা ঠিকই একটা প্যাটার্ন দাঁড় করিয়ে দিতে সক্ষম! যা-ই হোক, হয়তো এই কেসে সত্যিই কোনো প্যাটার্ন নেই। এত তাড়াতাড়ি ওদের জানানো ঠিক হবে না। গ্রে’কে মাথা খাঁটিয়ে আরও কিছু তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। বিশেষ করে ৪ নম্বর জিনিসটির ব্যাপারে।

ততক্ষণ পর্যন্ত ওই দুই টোনা-টুনি’কে নিজেদের মতো থাকতে দেয়া যায়।

.

রাত ৯ টা ৩২ মিনিট।
ওয়াশিংটন, ডি.সি.।

‘সত্যি?’

প্রেয়সীর উন্মুক্ত পেটে হাতের তালু রেখেছে মনক। কমলা-কালো রঙের নাইক সোয়েটপ্যান্ট পরে বিছানার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে আছে ও। সন্ধ্যাবেলার জগিং শেষ করে এসে ভেজা শার্ট কাঠের মেঝেতে ফেলে রেখেছে। চোখের ভ্রু ছাড়া ওর মাথায় আর কোনো চুল নেই। পুরো মাথা পরিষ্কার করে কামানো। ইতিবাচক উত্তরের আশায় আছে মনক।

‘হ্যাঁ,’ ক্যাট নিশ্চিত করল। আস্তে করে মনকের হাত সরিয়ে বিছানার অপর পাশে চলে গেল ও।

চওড়া হাসি ফুটল মনকের ঠোঁটে। “তুমি শিওর?

বড় বড় পা ফেলে বাথরুমের দিকে এগোল ক্যাট। সাদা পেন্টি আর ঢোলা জর্জিয়া টেক টি-শার্ট ওর পরনে। কাঁধের ওপর দিয়ে ফেলে রেখেছে ওর লালচে বাদামি সোজা চুলগুলো। ‘আমার পাঁচ দিন দেরি হয়েছিল,’ গোমড়ামুখে বলল ও। “গতকাল ইপিটি টেস্ট করিয়েছি।

উঠে দাঁড়াল মনক। ‘গতকাল? আমাকে বলোনি কেন?

বাথরুমের ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেল ক্যাট, দরজাটা আধখোলা।

‘ক্যাট?

শাওয়ার ছাড়ার শব্দ শুনল মনক। ঘুরে বিছানা পেরিয়ে বাথরুমের দিকে এগোল ও। আরও জানতে চায় মনক। জগিং থেকে ফিরে আসতে না আসতেই ওর কানে বোমা ফাটিয়েছিল ক্যাট। ফোলা ফোলা চোখ আর মলিন মুখ করে বিছানায় শুয়েছিল ও কাঁদছিল। সারাদিন কোন বিষয়টি ওকে কষ্ট দিচ্ছিল সেটা বের করতে মনকের অনেক তেল খরচ করতে হয়েছে।

দরজায় থাবা মারল ও। যতটা শব্দ করতে চেয়েছিল তারচেয়েও জোরে শব্দ হলো দরজায়। বেহায়া হাতের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকাল মনক। ডারপা (ডিএআরপিএ)-এর আধুনিক গেজেট হলো ওর এই কৃত্রিম হাত। একটি মিশনে নিজের হাত হারানোর পর এই হাত-ই ওকে সঙ্গ দিয়ে আসছে। কিন্তু প্লাস্টিক ও ধাতু তো আর মাংস নয়। দরজায় টোকা মারতে গিয়ে এমন আওয়াজ হলো যেন ও দরজা ভেঙে ফেলতে চাইছে।

‘ক্যাট, কথা বলো,’ নরম সুরে বলল ও।

‘আমি চট করে গোসল সেরে আসছি।

শব্দের পেছনে লুকিয়ে থাকা টানটান ভাবটা বুঝতে পারল মনক। বাথরুমের ভেতর উঁকি দিল ও। বিগত এক বছর ধরে একে অন্যকে দেখছে ওরা। আর এখন তো ক্যাটের অ্যাপার্টমেন্টে নিজের জায়গা করে নিয়েছে মনক। তবে ওরা একটি নির্দিষ্ট মাত্রার শালীনতা বজায় রাখে।

বন্ধ করা হাই কমোডের ওপর বসে আছে ক্যাট। হাতের ওপর মাথা রেখেছে।

‘ক্যাথরিন…’

মাথা তুলে চাইল ও। মনকের এরকম অনুপ্রবেশে চমকে উঠেছে। মনক! দরজার খোলা অংশটুকু বন্ধ করার চেষ্টা করল।

পা দিয়ে দরজা ঠেকিয়ে দিল মনক। ‘তুমি তো বাথরুম ব্যবহার করছ না।’

‘শাওয়ারের পানি গরম হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।’

বাথরুমে ঢোকার সময় আয়নায় বাষ্প জমতে দেখেছে মনক। জেসমিনের সৌরভ ছড়িয়ে আছে বাথরুমের ভেতরে। ঘ্রাণটি মনকের ভেতরে থাকা আকুতিকে জাগিয়ে তুলল। ক্যাটের সামনে হাঁটু গেড়ে বসল ও।

ক্যাট পেছন দিকে হেলান দিল।

ক্যাটের দুই হাঁটুতে নিজের দু’হাত রাখল মনক। ওর চোখে চোখ রাখছে না ক্যাট, মাথা পেছন দিকে ঝুলিয়ে রেখেছে।

ওর হাঁটু একটু আলাদা করে ওদুটোর ভেতরে ঢুকল মনক। ঊরুর বাইরের অংশ দিয়ে হাত নিয়ে ক্যাটের পশ্চাৎদেশ জড়িয়ে ধরল। নিজের দিকে টেনে নিল ও।

‘আমি…’ শুরু করতে যাচ্ছিল ক্যাট।

‘তুমি আমার কাছে আসবে।’ ক্যাটকে উঁচু করে নিজের কোলে বসাল মনক। ও এখন দুই পা ফাঁক করে বসে আছে। ক্যাটের নিঃশ্বাস এসে পড়ছে ওর মুখে।

অবশেষে মনকের চোখে চোখ রাখল ও। “আমি… আমি দুঃখিত।

ক্যাটের আরও কাছে ঝুঁকল ও। ‘কীসের জন্য? দু’জন দুজনার ঠোঁটে ঠোঁট ঘষল।

‘আমার আরও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল।’

‘আমি কোনো অভিযোগ করেছি বলে তো মনে পড়ছে না।”

‘কিন্তু এরকম ভুল…’

‘চুপ।’ ওকে শক্ত করে চুমো খেল মনক। রাগে নয়, ওকে নিশ্চিত করতে। আর কখনও এ-কথা বলবে না। ওদের দুই জোড়া ঠোঁটের মাঝে মনক উচ্চারণ করল।

ক্যাট ওর ওপর মোমের মতো গলে পড়ল। মনকের গলা প্যাচিয়ে ধরল ওর দুই হাত। ওর চুল থেকে জেসমিনের সৌরভ আসছে। আমরা কী করতে যাচ্ছি?

‘আমি হয়তো সবকিছু জানি না তবে তোমার প্রশ্নের উত্তরটা জানি।

একবার গড়ান দিয়ে ক্যাটকে নিজের নিচে একটি ভোয়ালের ওপর রাখল ও।

“ওহ,’ বলল ক্যাট।

.

সকাল ৭টা ৫৫ মিনিট।
কোপেনহ্যাগেন, ডেনমার্ক।

ছোট্ট অ্যান্টিকশপটির বিপরীতে থাকা একটি ক্যাফেতে বসে আছে গ্রে। রাস্তার ওপাশে থাকা ভবনটিকে পর্যবেক্ষণ করছে।

জানালায় লেখা রয়েছে SJAELDEN BOGER, দুষ্প্রাপ্য বই। লাল টাইলের ছাদযুক্ত দোতলা ভবনের দোতলায় এই বইয়ের দোকানের অবস্থান। প্রতিবেশীদের কাছে ভবনটি বেশ পরিচিত। বিত্ত-বৈভবের কমতি থাকায়, শহরের এদিকটা আধুনিকায়ন হয়নি। উপর তলার জানালায় তক্তা মারা রয়েছে। এমনকী স্টিলের উপ গেট বসিয়ে দোতলায় থাকা দোকানটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে।

দোকান এখন বন্ধ।

দোকান খোলার অপেক্ষায় আছে গ্রে। তরল হারশিস’র বারের মতো পুরু ডেনমার্কের হট চকোলেটে চুমুক দিতে দিতে ভবনটিকে আরও ভাল করে পর্যবেক্ষণ করছে ও। তক্তা মারা জানালা ছাড়িয়ে দৃষ্টি মেলল গ্রে। ভবন পুরোনো হয়ে গেলেও এর পুরোনো সৌন্দর্য এখনও বজায় আছে। দোতলার খাম বাইরে বেরিয়ে গেছে, ছাদের এক ঢালু অংশে জমে আছে অনেকদিনের জমাট বাঁধা বরফ, ছাদের পলেস্তরা প্যাঁচার চোখের মতো কুতকুতে দৃষ্টিতে বাইরে উঁকি দিচ্ছে। এমনকি এককালে জানালার নিচে রাখা ফুলের বাক্স রাখার ফুটোও গ্রে’র নজরে পড়ল।

গ্রে মনে মনে ভবনটিকে তার অতীত সৌন্দর্যে সাজাতে চেষ্টা করল। ইঞ্জিনিয়ারিং ও সৌন্দর্যের মিশেলে এটা একধরনের মানসিক অনুশীলন।

কল্পনা করতে করতে করাতের ভোর গন্ধ পর্যন্ত নিতে পারছে গ্রে।

শেষ জিনিসটি ওর কল্পনার জাল ছিঁড়ে ফেলল। অনাহুত এক স্মৃতি এসে ঝেটিয়ে বিদায় করল কল্পনাগুলোকে। ওর বাবার কাঠের গ্যারেজ ছিল, স্কুল শেষ করে ওখানে তার সাথে কাজ করত গ্রে। ওখানে ওরা দুজন একসাথে হওয়ার পর ছোট কথা দিয়ে পরিস্থিতি খারাপ হলেও সেটা শেষ হতো অনেক কঠিন ও তিক্ত শব্দ দিয়ে। যেটা মেনে নেয়া অনেক কষ্টের ছিল। সেই তিক্ততার ফলস্বরূপ হাই স্কুল ছেড়ে মিলিটারিতে যোগ দিতে হয়েছিল গ্রে’কে। পরবর্তীতে অনেক দিন পর বাপ-বেটা একে অপরের সাথে ভাল মুখে কথা বলা রপ্ত করতে পেরেছে। দু’জনের ভিন্নতাগুলোকে মেনে নিয়ে মিলগুলো গ্রহণ করতে শিখেছে ওরা।

এখনও গ্রে’কে ওর মায়ের একটি প্রশ্ন তাড়া করে বেড়ায়। বাপ-বেটার মধ্যে এত অমিল থাকা সত্ত্বেও এখন দুজনের মধ্যে মিল হলো কীভাবে। এতদিন পরে এসে কেন গ্রে’র এই প্রশ্ন মনে আসছে? মাথা ঝাঁকিয়ে চিন্তার মেঘকে দূরে ঠেলে দিল ও।

কল্পনার রথ থামিয়ে ঘড়ি দেখল গ্রে। আজকের দিন নিয়ে বেশ চিন্তিত। ইতোমধ্যে নিলাম অনুষ্ঠানে ঢোকার সামনের ও পেছনের অংশে দুটো ক্যামেরা বসিয়ে এসেছে ও। এবার ওর কাজ হচ্ছে বাইবেলের মালিকের সাথে কথা বলে জিনিসটি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য জেনে নেয়া। এই কাজগুলো শেষ হলেই ও র‍্যাচেলের সাথে একটা লম্বা ছুটি কাটাতে যাবে।

র‍্যাচেলের হাসিমুখের কথা মনে পড়তেই কাঁধ শিথিল হয়ে গেল গ্রে’র। গলায় থাকা নটে ঢিল পড়ল।

অবশেষে রাস্তার অপর পাশে একটি ঘণ্টা বেজে উঠল। দোকানের দরজা খুলে গেল, সরতে শুরু করল নিরাপত্তা গেট।

গ্রে আরও সোজা হয়ে বসল। দোকান যে খুলছে তাকে দেখে অবাক হয়েছে ও। বিণুনি করা কালো চুল, আরবদের মতো তামাটে রং, কাঠবাদামের মতো চওড়া চোখের অধিকারিণী দোকান খুলছে। এই মেয়েটি ওকে তখন ফলো করছিল। এমনকি এখনও সে ওই একই সোয়েটার-জ্যাকেট আর সবুজ ব্যাগ নিয়ে রয়েছে।

ক্যাফের টেবিলে বিল রেখে বেরিয়ে পড়ল গ্রে। কল্পনার সাগরে হাবুডুবু খাওয়া বন্ধ করে কাজে নামতে পেরে ও বরং খুশিই হয়েছে।

বড় বড় পা ফেলে সরু রাস্তা পার হলো ও। মেয়েটি তখন মাত্র গেট খোলা শেষ করেছে। গ্রে’র দিকে তাকাল মেয়েটি। মোটেও অবাক হয়নি।

“আচ্ছা বন্ধু, দাঁড়াও আন্দাজ করি…’ ব্রিটিশ উচ্চারণে কেতাদুরস্ত ইংরেজিতে বলল মেয়েটি। গ্রে’র পা থেকে মাথা পর্যন্ত চোখ বুলিলে বলল, ‘আমেরিকান।

ওর এরকম অপ্রত্যাশিত আচরণ দেখে ভ্রু কুঁচকাল গ্রে। ওকে এখনও একটি শব্দও বলতে দেয়া হয়নি। তবে যতটুকু সম্ভব চেহারায় আগ্রহ ফুটিয়ে রাখল ও একটু আগে যে মেয়েটি ওকে ফলো করছিল আর ও-ও সেটা ধরে ফেলেছে ব্যাপারটা বুঝতে দিতে চাচ্ছে না। তুমি কীভাবে জানলে?’

‘তুমি যেভাবে হাঁটো, পাছা উঁচু করো, ওতেই বুঝেছি।

‘তাই?

গেট আটকিয়ে দিল ও। গ্রে খেয়াল করল মেয়েটির জ্যাকেটে কয়েকটা পিন আছে। রংধনুঅলা সবুজ পতাকা, রুপোর কেল্ট চিহ্ন, একটি সোনার ইজিপশিয়ান ক্রস ও বাহারি রঙিন বোতামগুলোতে ডেনিশ এবং ইংরেজিতে স্লোগান লেখা রয়েছে। ওর হাতে সাদা রঙের একটি রাবারের ব্রেসলেট আছে, “আশা” শব্দটি লেখা রয়েছে ওতে।

সামনে সরে যাওয়ার জন্য গ্রে’কে ইশারা করল ও। কিন্তু গ্রে চট করে সরে না যাওয়ায় দুজনের একটু ধাক্কা লাগল। রাস্তার ওপাশে চলে গেল মেয়েটি। আরও এক ঘণ্টা পর দোকান খুলবে দুঃখিত, বন্ধু।

দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে একবার দরজা আরেকবার মেয়েটির দিকে তাকাল গ্রে। মেয়েটি ক্যাফের দিকে এগোচ্ছে। গ্রে একটু আগে যে টেবিল ছেড়ে উঠে গিয়েছে সেই টেবিলের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় গ্রে’র রেখে যাওয়া নোটগুলো থেকে একটি নোট তুলে নিল মেয়েটি। অপেক্ষা করল গ্রে। জানালা দিয়ে দেখল মেয়েটি দুটো কফির অর্ডার করে চুরি করা টাকা দিয়ে বিল পরিশোধ করে দিল।

দুই হাতে দুটো লম্বা সাইজের স্টাইরোফোম কাপ নিয়ে ফিরল ও।

‘এখনও দাঁড়িয়ে আছো?’ গ্রে’কে প্রশ্ন করল।

‘এই মুহূর্তে অন্য কোথাও যাওয়ার মতো জায়গা নেই আমার।

“আহারে!’ দু’হাত উঁচু করে বন্ধ দরজা খুলে দেয়ার ইশারা করল মেয়েটি।

‘খুশি?

‘ওহ!’ দরজা খুলে দিল গ্রে।

ভেতরে ঢুকল মেয়েটি। ‘বারটেল!’ হাঁক ছাড়ল ও। পেছন দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ভেতরে ঢুকবেন নাকি দরজা আটকাবো?

‘আমি ভেবেছিলাম…’।

‘আজব!’ চোখ পাকিয়ে বলল ও। “অনেক ঢং করেছ। এমন একটা ভাব করছ যেন আমাকে আগে দেখইনি।’

ভাবল গ্রে। আচ্ছা, তাহলে ওটা কাকতালীয় ছিল না। মেয়েটা ওকে ফলো করছিল।

দোকানের আরও ভেতরে গিয়ে আবার হাঁক ছাড়ল ও। বারটেল! কোথায় তুমি? দ্বিধা ও দুশ্চিন্তা নিয়ে মেয়েটির পেছন পেছন দোকানে ঢুকল গ্রে। অবশ্য বেশি ভেতরে ঢুকল না, দরজার কাছেই থাকল। প্রয়োজন বুঝে কেটে পড়বে।

দোকানটা সরু গলির মতো চাপা সাইজের। দোকানের দু’পাশে মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট বুকশেলফ আছে। বিভিন্ন ধরনের বই আছে ওতে। ভ্যলিউম, ধর্মগ্রন্থ, পুস্তিকা সবই আছে। কয়েক পা সামনে এগিয়ে চোখে পড়ল দুটো গ্লাস কেবিনেট রয়েছে দোকানের মাঝখানে। চামড়ায় বাধানো বই আছে ওগুলোর ভেতর।

গ্রে আরও ভেতরে চোখ বুলাল।

সকালের সূর্যের আলোতে দেখা গেল পাতলা ধূলো উড়ছে। বাতাসে পুরোনো বোটকা গন্ধ। বইয়ের পরিমাণ বাড়ার সাথে সাথে গন্ধটাও বাড়ছে। এখানটা একদম ইউরোপের মতো। বয়সের ভার আর প্রাচীন ঐতিহ্য এখানকার প্রতিদিনের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

অবশ্য ভবনের জীর্ণদশা ছাড়া দোকানের ভেতরটা বেশ ভাল অবস্থাতেই আছে। গ্লাস ওয়ালের সাথে পর্যাপ্ত মই ঠেক দিয়ে রাখা আছে। ওগুলো দিয়ে বুকশেলফে উঠে প্রয়োজনীয় বই নামিয়ে নেয়া যাবে। দোকানের ভেতরে বেশি লোক হয়ে গেলে যাতে বাইরে লোজন বসতে পারে তার জন্য সামনের জানালার আছে অতিরিক্ত দুটো চেয়ারও আছে।

আর সবচেয়ে ভাল দিক হচ্ছে…

গভীরভাবে শ্বাস নিল গ্রে।

কোনো বিড়াল নেই।

আর কেন নেই সেটারও জবাব হাজির হয়ে গেল।

একটি শেলফের পাশে এক উস্কখুস্ক আকৃতি চোখে পড়ল। আকৃতির মালিকটির চোখ দুটো থলথলে, বাদামি রঙের। হঠাৎ করে কুকুরটি ওদের দিকে পা টেনে টেনে এগোতে শুরু করল। বাম পায়ের সামনের অংশ লেংচিয়ে এগোচ্ছে। বাম পায়ের থাবার ওই অংশটুকু নেই।

‘এই যে, বারটেল।’ সামনে ঝুঁকে কফি কাপ থেকে তরলটুকু মেঝেতে রাখা একটি সিরামিকের বাটিতে ঢালতে শুরু করল মেয়েটি। কুকুরটি এগিয়ে এসে খুব আগ্রহ নিয়ে বাটিতে জিহ্বা ডুবাতে শুরু করল।

‘কুকুরের জন্য কফি বোধহয় খুব একটা ভাল জিনিস নয়,’ সতর্ক করল গ্রে।

উঠে দাঁড়াল মেয়েটি। কাঁধের পাশ দিয়ে বিনুনি করা চুল সরিয়ে দিল। “চিন্তার কিছু নেই। এই কফিতে ক্যাফেইন নেই।’ দোকানের আরও ভেতরে এগোল ও।

‘আচ্ছা, ওর পায়ে কী হয়েছিল?’ পরিস্থিতির সাথে ধাতস্থ হওয়ার ফাঁকে একটু আলাপ করে নিতে চাইছে গ্রে। পাশ দিয়ে আসার পর গ্রে গায়ে একটু আদর করার বিনিময়ে লেজ নাড়ানো উপহার পেল কুকুরের কাছ থেকে।

‘বরফে পচন ধরে ছিল। ফ্রস্টবাইট। মাট্টি ওকে অনেক দিন আগে নিয়ে গিয়েছিল।’

‘মাট্টি?

‘আমার নানু। তোমার জন্য অপেক্ষা করছে সে।’

দোকানের শেষ প্রান্ত থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এল। Er det han der vil kobe bogene, ফিওনা?’

‘Ja, মাট্টি! ক্রেতা আমেরিকান। ইংরেজিতে বল।’

‘Send ham ind paa mit kontor.’

‘মাট্টি তোমার সাথে তার অফিসে দেখা করবে।’ ফিওনা নামের মেয়েটি গ্রেকে দোকানের পেছনের দিকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল। কুকুরটি তার সকালের কফি খাওয়া শেষ করছে। এবার সে গ্রে’র পিছু পিছু হাঁটা ধরল।

দোকানের মাঝখানে এসে একটি ছোট ক্যাশ-রেজিস্টার ডেস্কের পাশ দিয়ে এগোল ওরা। ডেস্কের ওপর সনি কম্পিউটার ও প্রিন্টার রাখা আছে। এই পুরাকীর্তি ধাচের দোকানে কম্পিউটার দেখে মনে হলো, যাক, তাহলে আধুনিকতার ছোঁয়া পৌঁছেছে এখানে।

‘আমাদের নিজস্ব ওয়েবসাইট আছে,’ গ্রে’র মনের কথা আন্দাজ করে বলল ফিওনা।

রেজিস্টার পেরিয়ে দোকানের পেছন দিকে খোলা দরজা দিয়ে একটি রুমে ঢুকল। তবে এটাকে অফিস না বলে ড্রয়িংরুম বলাই শ্রেয়। একটি সোফা, টেবিল আর দুটো চেয়ার আছে এখানে। রুমের এক কোণে থাকা ডেস্কটিকে অফিসিয়াল কার্যক্রম পরিচালনা করার চেয়ে গরম প্লেট আর চায়ের কেটলি রাখার কাজেই বেশি ব্যবহার করা হয় বলে মনে হলো। দেয়ালে এক সারি কালো কেবিনেট আছে। ওগুলোর ওপরে আছে একটি শিকঅলা জানালা। ওটা দিয়ে সকালের মিষ্টি আলো অফিস রুমে ঢুকছে।

বয়স্কা মহিলা উঠে দাঁড়িয়ে নিজের হাত বাড়িয়ে দিলেন। ‘ড, সয়্যার,’ এই মিশনে গ্ৰে যে ছদ্মনাম ব্যবহার করছে সেটা সমোধন করে বললেন তিনি। বোঝা গেল, ভদ্রমহিলা গ্রে’র ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করে নিয়েছেন। ‘আমি গ্রিট্টি নেয়াল।’

মহিলার হাতের মুঠো বেশ শক্ত-পোক্ত। হালকা-পাতলা গড়ন, ত্বকের রং ফ্যাকাসে। তার শরীর স্বাস্থ্য দেখে আবারও প্রমাণিত হলো এই অঞ্চলের বাসিন্দাদের শরীর কতটা অদম্য, কতটা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী এরা। গ্রে’কে একটি চেয়ারে বসার ইশারা করলেন তিনি। মহিলার আচরণ বেশ স্বাভাবিক, এমনকি তার পোশাকও; নেভি জিন্স, ফিরোজা রঙের ব্লাউজ আর কালো পাম্প স্যু। মাথার রুপোলি চুলগুলো সোজা করে চিরুণি করা। দেখে মনে হতে পারে তিনি খুব সিরিয়াস। কিন্তু চোখ দুটো হাসি হাসি।

‘আমার নাতনির সাথে আপনার দেখা হয়েছে। বেশ নিখাদ ইংরেজিতে বললেন গ্রিট্টি তবে তার উচ্চারণভঙ্গিতে ডেনিশের ছোঁয়া আছে। অবশ্য নাতনির এই সমস্যা নেই।

ফ্যাকাসে রঙের বয়স্কা মহিলা আর কালো মেয়েটির মধ্যে চোখ বুলাল গ্রে। এদের দু’জনকে দেখে মনে হচ্ছে না, এদের কোনো পারিবারিক সম্পর্ক আছে। তবে গ্রে এটা নিয়ে কোনো কথা বলল না। এরচেয়েও গুরুত্বপূর্ণ নিয়ে কথা বলতে হবে তাকে।

‘হ্যাঁ, দেখা হয়েছে।’ গ্রে জবাব দিলো। আসলে, আজকে আপনার নাতনির সাথে আমার দুবার দেখা হয়েছে।’

‘ওহ, ফিওনার এত কৌতূহলী স্বভাব একদিন সত্যিই ওকে বিপদে ফেলবে।’ হাসি দিয়ে রাগ আড়াল করে বললেন গ্রিট্টি। ‘আপনার ওয়ালেট ফিরিয়ে দিয়েছে তো?

গ্রে’র কপালে ভাঁজ পড়ল। পেছন পকেটে হাত দিয়ে দেখল, খালি।

নিজের প্যাকের সাইড পকেট থেকে গ্রে’র বাদামি রঙের চামড়ার ওয়ালেট বের করে দিল ফিওনা।

ওর হাত থেকে প্রায় ছিনিয়ে নিল গ্রে। ওর মনে পড়ল, একটু আগে মেয়েটির সাথে ধাক্কা খেয়েছিল। মাত্রাতিক্ত অভদ্রতা এটা।

‘আপনি বিষয়টাকে খারাপভাবে নেবেন না, প্লিজ,’ গ্রে’কে শান্ত করার জন্য বললেন গ্রিট্টি। আমার নাতনি এভাবেই “হ্যালো” বলে থাকে।

‘ওর সব আইডি চেক করেছি। কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল ফিওনা।

‘ফিওনা, তাহলে ওনার পাসপোর্টটাও ফিরিয়ে দাও।

নিজের আরেকট পকেট চেক করল গ্রে। নেই! ওহ খোদা!

কভারে আমেরিকান ঈগলের ছবিযুক্ত নীল রঙের ছোট্ট বইটি ওর দিকে ছুঁড়ে দিল ফিওনা।

‘শেষ? নাকি আরও আছে’? নিজেকে সামলে নিতে নিতে বলল গ্রে।

শ্রাগ করল ফিওনা।

‘নাতনির এরকম আচরণের জন্য আমি আবারও ক্ষমা চাচ্ছি। মাঝে মধ্যে ও একটু বেশিই সতর্কতা অবলম্বন করে।

ওদের দুজনের দিকে তাকাল গ্রে। ‘আচ্ছা, আপনারা দয়া করে বলবেন এখানে কী হচ্ছে?’

‘আপনি দ্য ডারউইন বাইবেল সম্পর্কে খোঁজ নিতে এসেছেন।’ বললেন গ্রিট্টি।

‘বাইবেল! দ্য বাইবেল! শুধরে দিল ফিওনা।

নাতনির দিকে মাথা নেড়ে সায় দিলেন ভদ্রমহিলা। মাঝেমাঝে জিহ্বা ফসকে যায়।

‘আমি একজন আগ্রহী ক্রেতার পক্ষ হয়ে কাজ করছি।’ বলল গ্রে।

‘হ্যাঁ। আমরা জানি সেটা। এও জানি, গতকাল সারাটা দিন আপনি নিলামে উঠতে যাওয়া অন্যান্য জিনিস সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিয়ে কাটিয়েছেন, তাই না?”

বিস্ময়ে গ্রে’র ভ্রু উঁচু হয়ে গেল।

‘কোপেনহ্যাগেনে বইপড়য়াদের কমিউনিটিটা খুবই ছোট। আমাদের মধ্যে কথা খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

ভ্রুকূটি করল গ্রে। আরও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল।

‘আপনার ওরকম খোঁজ-খবর নেয়ার ব্যাপারটা আমার ডারউইন বাইবেলটিকে নিলামে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য সাহায্য করেছে। পুরো কমিউনিটি ভিক্টোরিয়ান যুগের বৈজ্ঞানিক গবেষণামূলক গ্রন্থের জন্য মুখিয়ে আছে এখন।’

‘বিক্রি করার জন্য এটাই ভাল সময়। কঠিন গলায় বলল ফিওনা। মনে হলো কোনো একটি যুক্তি-তর্কের ইতি টানল ও। ফ্ল্যাটের ইজারা এক মাস…’।

ওর কথা আর এগোল না। সিদ্ধান্তটা বেশ কঠিন ছিল। ১৯৪৯ সালে বাইবেলটি কিনেছিলেন আমার বাবা। ডারউইন পরিবারের পেছনে প্রথিতযশা চার্লস-পর্যন্ত মোট দশ প্রজন্মের নাম হাতে লেখা রয়েছে ওতে। কিন্তু বাইবেলটিতে ইতিহাসও আছে। এইচএমএস বিগলে চড়ে এক ব্যক্তি পৃথিবী ভ্রমণের কথা দিয়ে শুরু হয়েছে ওটা। আপনি এটা জানেন কি-না জানি না কিন্তু চালর্স ডারউইন একবার ক্যাথলিক যাজকদের কলেজে ঢুকেছিলেন। এই বাইবেলে আপনি ধার্মিক ও বিজ্ঞানী হিসেবে একই ব্যক্তির অবস্থান পাশাপাশি দেখতে পাবেন।

মাথা নাড়ল গ্রে। মহিলা ওকে পটানোর চেষ্টা করছে। এসব করছে যাতে ও নিলামে এই বাইবেল কিনতে যায়? বেশি মূল্য দিয়ে কেনে? তবে এই তথ্যগুলোকে গ্রে তার নিজের সুবিধার্থে কাজে লাগাতে পারে, সমস্যা নেই।

‘এজন্যই ফিওনা আমাকে ফলো করছিল?’ গ্রে প্রশ্ন করল।

গ্রিষ্টিকে একটু ক্লান্ত দেখাল। ওরকম কাজের জন্য আমি আবারও ক্ষমা চাচ্ছি। একটু আগে যেমনটা বললাম, ভিক্টোরিয়ান-যুগের এরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিলের প্রতি অনেকেরই আগ্রহ আর আমাদের কমিউনিটিটাও ছোট। কালো বাজারিদের কথা তো আমরা সবাই জানি… তাই আরকী!

‘হ্যাঁ, আমিও গুজব শুনেছি।’ বিনয় দেখিয়ে বলল গ্রে। আরও তথ্য জানতে চায়।

‘অনেক ক্রেতা আছে যারা নিলামের মূল্য পরিশোধের ক্ষেত্রে কথা রাখে না, অবৈধভাবে টাকা দেয়, ভুয়া চেক দেয় ইত্যাদি। ফিওনা ওইদিক নিয়ে সতর্ক থাকার চেষ্টা করছে। কিন্তু মাঝে মাঝে ও অনেক বেশিদূরে চলে যায় যে কাছে থাকা জিনিসটাও দেখতে পায় না।’ নাতনির দিকে এক চোখের ভ্রু উঁচু করে তাকালেন তিনি।

ফিওনা হঠাৎ করে তার পুরো মনোযোগ মেঝেতে দিয়ে দিল।

‘এক ভদ্রলোক বছর খানেক আগে প্রায় এক মাসে আমার ফাইল-পত্র ঘেঁটে দেখেছেন ওটা আমাদেরই কি-না।’ দেয়ালে থাকা কেবিনেটের দিকে ইশারা করলেন তিনি। ডারউইন বাইবেলের টাকা পরিশোধের জন্য তিনি চুরি করা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন।

‘তবুও আমাদের সতর্কতার অবলম্বন করা যাবে না, তাই না? খোঁচা মারল ফিওনা।

‘লোকটিকে চেনেন?

‘না, তবে আবার দেখলে চিনতে পারব। অদ্ভুত লোক, ফ্যাকাসে চেহারা।

ফিওনা আবার জ্বলে উঠল। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ওর পেছনে অনুসন্ধান করে নাইজেরিয়া থেকে সাউথ আফ্রিকা পর্যন্ত গিয়েছিল। তারপর শেষ। বেজন্মা হারামিটা পেছনে কোনো সূত্র ফেলে যায়নি।

ভ্রুকূটি করলেন গ্রিট্টি। ‘মুখের ভাষা সামলে কথা বলো, ফিওনা।’

‘তো ওরকম একজন বাজে লোকের পেছনে এত অনুসন্ধান করার কারণ?’ গ্রে প্রশ্ন করল।

আবারও মেঝেতে মনোযোগ দিল ফিওনা।

গ্রিট্টি চট করে নাতনির দিকে তাকালেন। ‘ওনার বিষয়টা জানার অধিকার আছে।’

‘মাট্টি…’ মাথা নাড়ল ফিওনা।

‘কী জানব?

ফিওনা একবার গ্রে’র দিকে তাকিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। ও গিয়ে অন্য সবাইকে বলে দেবে। তখন আমরা অর্ধেক দাম পাব।’

এক হাত উঁচু করল গ্রে। “আমি সতর্ক থাকব।’

এক চোখ সরু করে গ্রে’কে পর্যবেক্ষণ করলেন গ্রিট্টি। কিন্তু আপনি কতখানি সত্যবাদী… সেটা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে, ভ, সয়্যার।

দুই নারীর সামনে নিজেকে চোর চোর লাগল গ্রে’র। ওর ছদ্মবেশ কী এখনও টিকে আছে। দুই নারীর চোখা দৃষ্টি ওকে অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে।

অবশেষে গ্রিট্টি মুখ খুললেন। ‘আপনার জানা উচিত। সেই লোক এখান থেকে পালানোর কিছু দিন পরেই দোকান ভেঙে কারা যেন ঢুকেছিল। কিছুই চুরি যায়নি তবে ডারউইন বাইবেল আমরা সাধারণত যে শোকেসে রাখি ওটা ভোলা হয়েছিল। কপাল ভাল, বাইবেলটি আমাদের জন্য অনেক মূল্যবান তাই রাতে ওটাকে মেঝের ভল্টে রেখেছিলাম। অ্যালার্মের আওয়াজ শুনে পুলিশ বেশ চটপট হাজির হয়ে তাদের পিছুও নিয়েছিল কিন্তু ডাকাতি করতে কারা এসেছিল সেটা রহস্যই থেকে গেল।’

‘ওই শালা…’ বিড়বিড় করল ফিওনা।

সেই রাত থেকে বাইবেলটিকে আমরা পাশের ব্যাংকের সেফ-ডিপোজিটে রাখি। এরপরও আমাদের এখানে গত বছর দুবার ডাকাতির চেষ্টা করা হয়েছিল। অ্যালার্ম অকেজো করে পুরো দোকান খোঁজা হয়েছিল তন্ন তন্ন করে।

কেউ একজন বাইবেলটিকে খুঁজছে।’ বলল গ্রে।

‘আমাদেরও তা-ই ধারণা।

গ্রে বুঝতে শুরু করল। অর্থের সংকট-ই শুধু মূল কারণ নয়, এরা বাইবেলের বোঝা থেকে নিজেদেকে হালকা করতে চাচ্ছে। কেউ একজন বাইবেলের পেছনে লেগেছে। সামনে হয়তো বাইবেলটিকে হাতানোর জন্য তারা আরও হিংস্র ও হন্য হয়ে উঠবে। বাইবেল হাত বদলের পর যে নতুন মালিকের কাছে যাবে এই হুমকি হয়তো তার ওপর গিয়েও পড়বে।

চোখের কোণা দিয়ে ফিওনাকে দেখে নিল গ্রে। মেয়েটি এপর্যন্ত যা যা করেছে সবই ওর নানুকে বাঁচানোর জন্য, ওদের আর্থিক দিক রক্ষার জন্য। গ্রে এখনও মেয়েটির চোখে আগুন দেখতে পাচ্ছে। মেয়েটি চায়, ওর নানু যেন কথা চেপে রাখে।

‘বাইবেলটি হয়তো আমেরিকার কোনো এক ব্যক্তিগত সংগ্রহে নিরাপদ থাকবে।’ বললেন গ্রিট্টি। এরকম সমস্যা হয়তো সাগর পেরিয়ে ওপারে পৌঁছাবে না।

মাথা নাড়ল গ্রে। টের পেল বাইবেল বিক্রি করার জন্য কথাগুলোর পেছনে তেল মাখানো আছে।

‘আচ্ছা, আপনি বুঝতে পেরেছেন কেন বাইবেলের পেছনে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা উঠে পড়ে লেগেছে? ও জিজ্ঞেস করল।

নাতনির পর এবার নানু প্রথমবারের মতো অন্যদিকে মনোযোগ দিলেন।

‘তথ্যটা পেলে বাইবেলটি আমার ক্লায়েন্টের কাছে হয়তো আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।’ গ্রে জোর করল।

গ্রে’র দিকে চট করে তাকালেন গ্রিট্টি। কোনো একভাবে তিনি গ্রে’র কথার পেছনে লুকিয়ে থাকা মিথ্যের আঁচ করতে পেরেছেন। গ্রে’কে আবার পর্যবেক্ষণ করলেন। সত্য জানার চেষ্টা করছেন তিনি।

এমন সময় অফিসে বারটেল প্রবেশ করল। ডেস্কে থাকা কেটলির পাশে কয়েকটি কেক আছে ওগুলোর কাছ দিয়ে একবার নাক টেনে ঘুরে মেঝেতে ধপ করে বসল সে। ওর মুখের কিছু অংশ গ্রে’র বুটের ওপর রইল। দোকানে আগত অতিথির সাথে বেশ খাতির হয়ে গেছে ওর।

পর্যবেক্ষণ যথেষ্ট হয়েছে ভেবে ক্ষান্ত হলেন গ্রিট্টি। দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করলেন তিনি। একটু নরম হয়ে বললেন, আমি নিশ্চিত জানি না। তবে কিছু অনুমান করতে পারি।’

‘আপনি বলুন, আমি শুনছি।

‘যুদ্ধের পর খণ্ড খণ্ড করে বিক্রি হওয়া এক লাইব্রেরির সম্পর্কে খোঁজ নিতে সেই লোকটি এখানে এসেছিল। আজকের সন্ধ্যার নিলামে যে জিনিসগুলো উঠতে যাচ্ছে ওগুলোর খবরই চাচ্ছিল সে। হিউগো ডি ভ্রিসেস-এর ডায়েরি, গ্রেগর মেন্ডেল-এর পেপার এবং ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কস-এর লেখা দুটো বই।

গ্রে জানে ওর নোটপ্যাডে এই একই তালিকা আছে। এই জিনিসগুলো সবার নজর কেড়েছে। কে কিনতে চায় ওগুলো? কেন কিনতে চায়?

‘এই পুরোনো লাইব্রেরি কালেকশন সম্পর্কে আরও কিছু জানাতে পারেন? এর শিকড় কোথায়? কোনো বিশেষ অর্থ বহন করে কি-না, এসব?

গ্রিট্টি উঠে তাঁর ফাইলগুলোর দিকে এগোলেন। ‘আমার বাবা ১৯৪৯ সালে কিনেছিলেন। ওটার মূল রিসিপ্ট আমার কাছে আছে। একটা গ্রাম আর ছোট এলাকার নাম দেয়া আছে ওতে। দাঁড়ান দেখি তো পাই কিনা।

পেছনের জানালা দিয়ে আসা সূর্যালোকের একটি বিম পেরিয়ে মাঝের ড্রয়ার খুললেন তিনি। ‘আমি আপনাকে মূল কপি দিতে পারব না। তবে ফিওনা আপনাকে এটা ফটোকপি করে দিলে খুশি মনে দেব।’

বয়স্কা মহিলা তার ফাইলের ভেতরে ডুবে যেতেই গ্রে’র পায়ের কাছ থেকে নাক তুলল বারটেল। কিছু একটা পেয়েছে সে। মৃদু স্বরে গরগর করে উঠল।

তবে ওটা গ্রে’র জন্য করেনি।

প্লাস্টিকের হাত মোজা পরে একটি হলুদ কাগজ তুলে ধরলেন গ্রিট্টি। ‘এই যে, পেয়েছি।

মহিলার হাতের দিকে না তাকিয়ে পায়ের দিকে মনোযোগ দিল গ্রে। সূর্যালোকের ভেতর দিয়ে ছোট্ট একটি ছায়া সুড়ৎ করে চলে গেল।

বসে পড়ুন!

সোফার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বয়স্কা মহিলার দিকে এগোলো গ্রে।

ওর পেছনে গর্জে উঠল বারটেল। গ্লাস ভাঙ্গার আওয়াজ ওর গর্জনের নিচে প্রায় চাপা পড়ে যাচ্ছিল।

এখনো এগোচ্ছে গ্রে কিন্তু দেরি হয়ে গেছে। গ্রিট্টির কাছে পৌঁছুনোর আগেই রক্ত আর হাড়ের সম্মিলিত বিস্ফোরণে তার চেহারা বিলীন হয়ে গেল। গ্রিষ্টির পেছন থেকে গুলি ছুঁড়েছে স্নাইপার।

গ্রে তার শরীর ধরে সোফায় শুইয়ে দিল।

চিৎকার করে উঠল ফিওনা।

পেছনের জানালার কাঁচ ভাঙ্গার পাশাপাশি দুটো “ঠকাস” শব্দ হলো। কালো রঙের দুটো ক্যানিস্টার অফিস রুমে ঢুকে অপর প্রান্তের দেয়ালে আঘাত হানল। ড্রপ খাচ্ছে ওদুটো।

সোফা থেকে লাফিয়ে নামল গ্রে, কাঁধ দিয়ে ফিওনাকে আড়াল করল। অফিস। থেকে ফিওনাকে সরিয়ে এক কোণায় নিয়ে চলল ও।

ওদের পেছন পেছন খুড়িয়ে খুড়িয়ে এগোল বারটেল।

গ্রে ফিওনাকে বুককেসের পেছনে অর্ধেক ঢুকিয়েছে এমন সময় ক্যানিস্টার দুটো অফিস রুমে বিস্ফোরিত হলো। দেয়ালকে প্লাস্টারের মতো চুর্ণ করে দিল ওটা।

বুককেস লাফিয়ে উঠে পাশে হেলে পড়ল। ফিওনাকে নিজের নিচে নিয়ে ঢেকে ফেলল গ্রে।

বিভিন্ন কাগজপত্রে আগুন ধরে ওদের মাথার ওপরে ছাই হয়ে বৃষ্টির মতো পড়তে লাগল।

বৃদ্ধ কুকুরটিকে দেখল গ্রে। বেচারা পঙ্গু পা নিয়ে ধীরে ধীরে এগোচ্ছিল। বিস্ফোরণের ধাক্কা ওকে ওপাশের দেয়ালের ওপর নিয়ে আছড়ে ফেলেছে। নড়ছে না একটুও। ওর লোমে আগুন জ্বলছে দপদপ করে।

দৃশ্যটা যেন ফিওনার চোখে না পড়ে তাই ওদিকটা আড়াল করল গ্রে। ‘আমাদেরকে সরতে হবে।

হেলে পড়া বুককেসের নিচ থেকে হকচকিয়ে যাওয়া ফিওনাকে বের করল ও। আগুন আর ধোঁয়ায় দোকানের পেছনের অর্ধেক প্রায় ভরে গেছে। মাথার ওপরে অগ্নি নির্বাপক যন্ত্র থেকে পানি ঝরছে। দেরি হয়ে গেছে অনেক আর পরিমাণেও অল্প। এই আগুনকে থামানোর জন্য এতটুকু পানির ছিটা যথেষ্ট নয়।

‘সামনে চলো!’ তাড়া দিল শ্রে।

হোঁচট খেতে খেতে ফিওনাকে নিয়ে এগোল ও।

ওদের সামনে বাইরের সিকিউরিটি গেট ভেঙ্গে পড়ল। বন্ধ হয়ে গেল সামনের দরজা, জানালা। গেটের দু’পাশে অনেক ছায়ার আগাগোনা খেয়াল করল গ্রে। আরও অস্ত্রধারী আসছে।

গ্রে পেছনে তাকাল। দোকানের পেছনটা খুঁড়ো হওয়া দেয়াল, আগুন আর ধোঁয়ায় ভর্তি।

ফাঁদে আটকা পড়েছে ওরা।

.

রাত ১১টা ৫৭ মিনিট।
ওয়াশিংটন, ডি.সি.।

স্বর্গীয় সুখানুভূতি নিয়ে আধো ঘুমে ডুবে আছে মনক। বাথরুমের মেঝে থেকে শুরু হওয়া ভালবাসা ঠাই পেয়েছিল বিছানায়। প্রেমে মত্ত হয়ে উঠেছিল দু’জন। ফিসফিস করে উচ্চারিত কিছু শব্দ আর আলতো নরম ছোঁয়ায় ওরা সমৃদ্ধ হয়েছিল। চাদর ওদের দু’জনের নগ্ন শরীরকে ঢেকে রেখেছে। জড়াজড়ি ধরে শুয়ে আছে ওরা। এখন একে অপরকে ছাড়ার কোনো ইচ্ছেই নেই। শারীরিকভাবে নয়, কোনোভাবেই নয়।

ক্যাটের নগ্ন বুকের বাকে আস্তে করে আঙুল বুলাল মনক। ওর ছোঁয়ায় কামনার চেয়ে ভালবাসার স্পর্শ বেশি ছিল। ক্যাট ওর পা দিয়ে মনকের পায়ে আলতো করে স্পর্শ করল।

নিখুঁত সাড়া। নিখাদ ভালবাসা।

ওদের এই মাখামাখি অক্ষুণ্ণ থাকবে, কেউ ভাঙতে পারবে না…

হঠাৎ ওদের দুজনকে হকচকিত করে রুমের ভেতরে রিং বেজে উঠল।

বিছানার পাশ থেকে শব্দ আসছে। ওখানে প্যান্ট খুলে রেখেছে মনক। ঠিক খুলে নয় শরীর থেকে রীতিমতো হেঁচকা টান মেরে প্যান্টটি ওখানে রেখেছিল। মনকের পেজার এখনও প্যান্টের রাবারের কোমরের সাথে লাগানো রয়েছে। ওর মনে আছে, জগিং শেষ করে ফেরার পর যন্ত্রটিকে ভাইব্রেশন মোডে সেট করে রেখেছিল। তাহলে এভাবে রিং হওয়ার একটাই মানে হতে পারে।

জরুরি কিছু।

বিছানার আরেকপাশ থেকে দ্বিতীয় পেজার বেজে উঠল।

এটা ক্যাটের।

দুজনই উঠল, চোখে দুশ্চিন্তার ছায়া।

‘সেন্ট্রাল কমান্ড বোধহয়,’ বলল ক্যাট।

নিচ থেকে নিজের প্যান্ট ও পেজার তুলে নিল মনক। ক্যাটের ধারণা সঠিক।

মেঝেতে পা নামিয়ে তাড়াতাড়ি ফোনের কাছে গেল মনক। ক্যাট ওর পাশে বসল। চাদর দিয়ে ও নিজের উন্মুক্ত স্তন দুটোকে ঢেকে নিয়েছে। সেন্ট্রাল কমান্ডের সাথে কথা বলবে, তাই এই ভদ্রতা। হোক ফোনে, তাতে কী। সরাসরি সিগমা ফোর্সে ডায়াল করল মনক। ওপাশ থেকে সাথে সাথে ফোন রিসিভ হলো।

‘ক্যাপ্টেন ব্রায়ান্ট’ বললেন লোগান গ্রেগরি।

‘না, স্যার। আমি মনক কক্যালিস। তবে ক্যাট… ক্যাপ্টেন ব্রায়ান্ট আমার কাছেই আছেন।’

‘আমি তোমাদের দুজনকে জরুরি ভিত্তিতে কমাতে চাই।’ চটপট আসল কথা জানিয়ে দিলেন লোগান।

মাথা নেড়ে সায় দিল মনক। ‘আমরা এখুনি বেরোচ্ছি।’ ফোন কেটে দিল।

ক্যাটের চোখে চোখ পড়ল ওর। ক্যাট ভ্রু জোড়া কুঁচকে রেখেছে। ‘কী সমস্যা?’

‘বিরাট সমস্যা।

‘গ্রের কিছু হয়েছে?

‘না। আমি নিশ্চিত সে ঠিক আছে। প্যান্ট পরে নিল ও। হয়তো র‍্যাচেলের সাথে দারুণ সময় পার করছে।

‘তাহলে…?

‘ডিরেক্টর ক্রো। নেপালে কিছু একটা হয়েছে। বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি। তবে প্লেগ টাইপের কিছু একটা হবে।’

‘ডিরেক্টর ক্রো কী রিপোর্ট করেছেন?

‘এপর্যন্তই করেছেন। তার সর্বশেষ রিপোর্ট ছিল তিন দিন আগের। কিন্তু ঝড় এসে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। তবে ওটা তেমন চিন্তার বিষয় ছিল না। কিন্তু আজ ঝড় থেমে গেছে অথচ এখনও তার কোনো খবর নেই। আর এখন গুজব শোনা যাচ্ছে প্লেগ, মৃত্যু আর এরচেয়ে কোনো বড় কিছু একটা হচ্ছে ওখানে। মাওবাদীদের হামলাও হতে পারে।

চোখ বড় বড় করল ক্যাট।

‘লোগান সবাইকে কমান্ডে ডেকেছেন।

বিছানা ছেড়ে নিজের পোশাকের দিকে এগোল ক্যাট। ‘ওখানে কী হতে পারে?

‘ভাল কিছু হচ্ছে না, সেটা নিশ্চিত।

.

সকাল ৯টা ২২ মিনিট।
কোপেনহ্যাগেন, ডেনমার্ক।

‘উপরে যাওয়ার কোনো রাস্তা আছে?’ গ্রে জিজ্ঞাসা করল।

বন্ধ গেটের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে ফিওনা। গ্রে বুঝতে পারল মেয়েটি ঘটনার আকস্মিকতার ধাক্কা সামলে উঠতে পারেনি।

‘ফিওনা…’ মেয়েটির কাছে এগিয়ে এল গ্রে। নাকের সামনে নাক এনে ওর দৃষ্টিপথ ঢেকে দিল। ফিওনা, আগুন থেকে আমাদের পালাতে হবে।

ফিওনার পেছনে আগুনের তাণ্ডবলীলা দ্রুত বাড়ছে। আগুনের লেলিহান শিখাকে রসদ যোগাচ্ছে শুকনো কড়কড়ে বই আর বুকশেলফ। আগুনের শিখা উঁচু হয়ে সিলিং ছুঁয়ে ফেলেছে। ধোয়া পাকাচ্ছে ছাদের নিচে। অগ্নি নির্বাপক যন্ত্র থেকে পানি ছিটে বেরোচ্ছে ঠিকই কিন্তু একটু ধোয়া তৈরি করা ছাড়া কাজের কাজ কিছুই করতে পারছে না।

প্রতিবার নিঃশ্বাসের সাথে গরমের আঁচ বাড়ছে। ফিওনার হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে গ্রে খেয়াল করল মেয়েটি কাঁপছে, পুরো শরীর কাঁপছে ওর। তবে হাত ধরায় মেয়েটি এবার ওর দিকে তাকাল।

‘উপর তলায় যাওয়ার কোনো সিঁড়ি আছে?

ফিওনা উপর দিকে চোখ মেলল। ধোয়ার চাদরে সিলিং আড়াল হয়ে গেছে।

‘কিছু পুরোনো রুম। একটা চিলেকোঠা…’

‘বেশ। আমরা ওখানে যেতে পারব?

প্রথমে ধীরে মাথা নাড়লেও পরে বিপদের হিসেব কষে জোরালোভাবে না-সূচক মাথা নাড়ল ও। ‘না। একটাই সিঁড়ি আছে আর ওটা…’ আগুনের দিকে নির্দেশ করল ফিওনা। ‘বিল্ডিঙের পেছন দিকে।

‘মানে–বাইরে?

মাথা নাড়ল ও। আগুনের লেলিহান দেয়াল আরও সামনে এগোতেই ওদের মাথার উপরে ছাইয়ের কুণ্ডলী এসে আঘাত হানল।

দাতে দাঁত পিষল গ্রে। উপরের রুমগুলো থেকে নিচতলাকে আলাদা করে দোকান বানানোর আগে নিশ্চয়ই ভেতরে একটি সিঁড়ির ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু এখন নেই। পথ খুঁজে বের করতে হবে।

‘তোমাদের এখানে কোনো কুড়াল আছে? গ্রে প্রশ্ন করল।

ফিওনা মাথা নাড়ল।

‘ক্রোবার (ভারি জিনিস ভোলার জন্য বাঁকা প্রান্ত বিশিষ্ট লোহার দণ্ড) নেই? বক্স কিংবা ঝুড়ি খোলার মতো কিছু?

মাথা নাড়ল ও। ‘ক্যাশ রেজিস্টারের ওখানে।’

‘এখানে থাকো। হাতের বাঁ পাশে থাকা দেয়াল ঘেঁষে এগোল গ্রে। এদিক দিয়ে এগোলে তরতর করে সেন্ট্রাল ডেস্কে পৌঁছুনো যাবে। আগুন এখনও এদিকটীয় আসেনি।

গ্রে’র পিছু নিল ফিওনা।

‘আমি তোমাকে ওখানে থাকতে বলেছি।

‘ক্রোবারটা কোথায় আছে জানি আমি,’ গ্রের ওপর তেঁতে উঠল ও।

ফিওনার রাগের পেছনে লুকিয়ে থাকা ভয় টের পেল গ্রে। তবে কিছুক্ষণ আগে হতভম্ব হয়ে থাকা ফিওনার চেয়ে রাগী ফিওনা ঢের ভাল। তাছাড়া এরকম রাগী স্বভাব গ্রে’র সাথে যায় ভাল। মেয়েটি এর আগে পিছু নিয়েছিল, ওটা খারাপ হলেও এখন তো পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। অজ্ঞাত আততায়ী গ্রে’কে কোণঠাসা করে ফেলেছে। র‍্যাচেলের চিন্তা করতে করতে মিশন সম্পর্কে তুলনামূলক কম সজাগ ছিল গ্রে। যার ফলস্বরূপ এবার ওর জীবন হুমকির মুখে।

গ্রে’কে ধাক্কা দিল ফিওনা। ধোয়ায় বেচারির চোখ লাল হয়ে গেছে, কাশছে। ‘এই যে, এখানে।’ ডেস্কের পেছন থেকে সবুজ রঙের একটি স্টিলের বার বের করল ও।

‘চলো।‘ বাড়তে থাকা আগুনের দিকে এগোল গ্রে। নিজের উলের সোয়েটারের বিনিময়ে ক্রেবার নিল ও।

‘যন্ত্র থেকে ছিটে আসা পানিতে ভাল করে সোয়েটারকে ভিজাও।’ ক্রোবার দিয়ে উপরের অগ্নি নির্বাপক যন্ত্র দেখাল ও। এবং পারলে নিজেকেও ভিজিয়ে নাও।

‘তুমি কী করতে যাচ্ছো…?

‘আমাদের জন্য একটা সিঁড়ি বানানোর পায়তারা করছি।

বুকশেলফের জন্য রাখা একটি মইয়ে উঠল গ্রে। ওর মুখের ওপর ধোয়া পাক খেল। বাতাস পুড়ে গেল যেন। ক্রোবার দিয়ে টিনের সিলিং টাইলসে গুতা দিল গ্রে। সহজেই নিজের স্থান থেকে সরে গেল ওটা। যে যেমনটা ধারণা করেছিল, দোকানের ছাদে নিচে একটি ড্রপ সিলিং আছে। এই সিলিং উপর তলার মেঝেতে থাকা কাঠ তার স্তর ঢেকে রেখেছিল।

মইয়ের একদম উঁচুতে উঠল গ্রে। ওখান থেকে বুককেসের শেষ কয়েক তাকে চড়ল ও। বুককেসের উপরে রীতিমতো চড়ে বসে ক্রোবার দিয়ে দুটো তক্তার ভেতরে ঢুকাল গ্রে। ক্রোবার বেশ গভীরে চলে গেল। এবার নিজের গায়ের জোর খাটাল ও। স্টিলের বার পুরোনো কাঠ চিরে দিল। কিন্তু ওটার আকার একটি ইঁদুরের গর্তের মতো।

চোখ জ্বালাপোড়া করে পানি পড়ছে। নিচ দিকে ঝুঁকল গ্রে। কাশল। অবস্থা ভাল নয়। ধোয়ার সাথে প্রতিযোগিতা করে ক্রোবার চালাতে হবে ওকে। পেছন ফিরে আগুনের দিকে তাকাল গ্রে। আগুনের হিংস্রতা বাড়ার সাথে সাথে ধোয়াও বেড়ে চলেছে।

এই গতিতে কাজ করতে থাকলে কিছুই হবে না।

কিছু একটা নড়ে ওঠায় গ্রে নিচ দিকে তাকাল। মই বেয়ে উঠছে ফিওনা। এক টুকরো কাপড় পেয়ে ওটাকে ভিজিয়ে নিজের নাক-মুখে বেঁধেছে ও। গ্রে’র উলের সোয়েরটা সে উপরে তুলে ধরল। এটাকেও ভিজিয়ে এনেছে, ভিজে সাইজে ছোট হয়ে গেছে সোয়েটার, দেখতে কুকুরের ছোট্ট বাচ্চার মতো লাগছে। গ্রে অনুধাবন করল মেয়েটির বয়স ১৭ নয় তারচেয়েও কম। ওর আগের ধারণা ভুল ছিল। এই মেয়ের বয়স ১৫’র বেশি হতে পারে না। আতঙ্কে ওর চোখ দুটো লাল হলেও ওখানে আশার আলো আছে, গ্রের ওপর অন্ধের মতো ভরসা করছে মেয়েটি।

কেউ যখন ওকে এভাবে অন্ধের মতো ভরসা করে, বিশ্বাস করে গ্রে’র তখন রাগ হয়। কারণ, ও তাদের ভরসা না রেখে পারে না।

সোয়েটারের দুই হাতা নিজের গলায় বেঁধে বাকি অংশ পিঠের ওপর ফেলে রাখল গ্রে। ছাইযুক্ত বাতাসের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য হাতার এক অংশ তুলে নিয়ে নিজের নাক-মুখ ঢাকল।

গ্রে’র শার্টের পেছনের অংশ ভিজে যাচ্ছে ভেজা সোয়েটারের কারণে। এতে বরং ভালই হচ্ছে। ঘাড়ত্যাড়া কাঠের তক্তাগুলোকে শায়েস্তা করার জন্য আবার যুদ্ধে নামল ও। ওর নিচে ফিওনা দাঁড়িয়ে আছে, গ্রে নিজের দায়িত্ব আঁচ করতে পারল।

ড্রপ সিলিং আর কাঠের তক্তার স্তরের মধ্যকার ফাঁকা জায়গাটুকুতে চোখ বুলাল গ্রে। যদি পালানোর জন্য বিকল্প কোনো রাস্তা পাওয়া যায়। চারিদিকে পাইপিং আর ওয়্যারিঙের ছড়াছড়ি। নিচের অংশ দোকান আর ওপরের অংশ রুম হিসেবে আলাদা হওয়ার পর বাড়তি অনেক কিছু যোগ হয়েছে এখানে। নতুন যুক্ত হওয়া পাইপিংগুলো দেখতে বিশ্রী লাগছে। পুরোনো ওয়্যারিং ও পাইপিংগুলো সুন্দর গোছানোভাবে করা হলেও নতুনগুলো করা হয়েছে একদম যা-তা ভাবে।

গ্রে খুঁজতে খুঁজতে সারি সারি কাঠের তক্তার মাঝে একটি জায়গায় বক্স আকৃতির ভিন্নতা লক্ষ করল। জায়গাটির আকার তিন বর্গ ফুট, পুরু করে চিহ্ন দেয়া। সাথে সাথে চিনতে পারল ও। ওর ধারণাই সঠিক। উপরতলার সাথে নিচ তলার যোগাযোগের জন্য আগে এখানে একটি সিঁড়ির ব্যবস্থা ছিল।

কিন্তু এটাকে এরকম সুন্দর করে বন্ধ করা হয়েছে কীভাবে?

সেটা জানার মাত্র একটাই রাস্তা আছে।

বুককেসের একদম ওপরে উঠে দাঁড়াল ও। বক্স আকৃতির জায়গাটির কাছে যাওয়ার জন্য বুককেসের ওপর দিয়ে এগোল, ওটাকে খুলবে। খুব বেশি দূরে নয়, মাত্র কয়েক ফুট কিন্তু সমস্যা হলো যেদিকে আগুন জ্বলছে ওকে সেই দিকে যেতে হবে।

‘তুমি কোথায় যাচ্ছ?’ মইয়ের উপরে দাঁড়িয়ে থাকা ফিওনা প্রশ্ন করল।

জবাব দেবার মতো অবস্থায় নেই গ্রে। ওর প্রতি পদক্ষেপে ধোয়া আরও ভারি হয়ে উঠছে। তাপমাত্রাও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। অবশেষে ও বন্ধ করে দেয়া সিঁড়ির ওখানটায় গিয়ে পৌঁছল।

নিচ দিকে তাকাল ও। বুককেসের নিচের তাকে ইতোমধ্যে আগুন ধরে গেছে। আগুনে চুড়োর কাছাকাছি চলে এসেছে গ্রে।

কোনভাবেই সময় নষ্ট করা চলবে না।

নিজেকে তৈরি করে ক্রোবারকে কাজে লাগাল ও।

পাতলা কাঠের তক্তার ভেতর দিয়ে সহজেই ক্রোবার ঢুকে পড়ল। ঠিক তক্তা নয়, পাতলা ফাইবারবোর্ড আর ভিনাইল টাইলস। বর্তমান যুগের জিনিসগুলো যেমন হালকা পাতলা হয়, সেরকম। গ্রে’র ধারণা এবারও সঠিক প্রমাণিত হলো। আধুনিক যুগের এরকম হালকা-পাতলা জিনিস দিয়ে কাজ সারার নীতির জন্য মনে মনে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিল গ্রে।

বাতাসে তাপ বাড়ছে। হাতে ধরা ক্রোবারকে যন্ত্রের মতো ব্যবহার করে উপরে ওঠার মতো যথেষ্ট জায়গা তৈরি করল ও।

সদ্য খোলা জায়গা দিয়ে ক্রোবারটিকে উপরে ছুঁড়ে দিল গ্রে। উপরে আছড়ে পড়ে ঠনঠন আওয়াজ করল ওটা।

ফিওনার দিকে তাকিয়ে ওর কাছে আসার ইশারা করল।

‘পারবে বুকশেলফের উপরে উঠে তারপর…?

‘আমি দেখেছি, তুমি কীভাবে ওখানে উঠেছ। বুককেসে চড়তে শুরু করল ফিওনা।

নিচ দিক থেকে ভেসে আসা একটি শব্দ গ্রে’র দৃষ্টি আকর্ষণ করল। ওর নিচে থাকা বুককেস কেঁপে উঠল থরথর করে।

এই সেরেছে…।

গ্রে’র ওজন আর বুককেসের নিচে আগুন ধরে যাওয়ার কারণে বুককেসের নিচের অংশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। তৈরি করা গর্তে নিজের অর্ধেক তুলে দিয়ে শেলফের ওপর থেকে ওজন কমাল ও।

‘তাড়াতাড়ি,’ মেয়েটিকে তাড়া দিল।

ভারসাম্য রক্ষার জন্য হাত ছড়িয়ে রেখে ফিওনা বুককেসের ওপরে চড়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রে’র কাছ থেকে প্রায় তিন ফুট দূরে আছে ও।

‘তাড়াতাড়ি করো, গ্রে আবার তাড়া দিল।

‘প্রথম যখন বলেছ তখনই শুনেছি তো…?

গ্রের নিচে থাকা বুককেস সশব্দে ধসে পড়ল। বুককে ধসে পড়তে দেখে গর্তের কিনারা আরও শক্ত করলে ধরল গ্রে। এক পশলা টাটকা ছাই, আগুন আর তাপমাত্রা উপরে উঠে এল।

ফিওনার পায়ের নিচে থাকা বুককেসের অংশ কেঁপে উঠতেই চিৎকার করে উঠেছিল তবে সামলে নিয়েছে।

হাতে ঝুলে থাকা অবস্থায় মেয়েটিকে ডাকল ও। ‘লাফ দাও। আমার কাঁধ ধরবে।

আর কিছু বলে সাহস যোগাতে হয়নি গ্রে’র, বুককেস আবার কেঁপে উঠতেই লাফ দিল ফিওনা। গ্রে’কে জাপটে ধরল। গ্রে’র গলায় হাত আর কোমরে পা প্যাচিয়ে ধরেছে। ফিওনার লাফের দমকে আর একটু হলেই গ্রে’র হাত ফসকে গিয়েছিল।

‘আমার শরীরকে ব্যবহার করে গর্তের ভেতরে উঠে যেতে পারবে?’ টান টান অবস্থায় বলল গ্রে।

‘ম…মনে হয় পারব।’

চুপচাপ গ্রে’কে ধরে ঝুলে থাকল ও। নড়ল না।

গর্তের এবড়োখেবড়ো কিনারা গ্রে’র আঙুলে আঘাত করছে। ‘ফিওনা…’

একটু কেঁপে উঠে গ্রে’র পিঠের ওপর কাজ শুরু করল ও। নড়তে শুরু করেই এক পা গ্রে’র বেল্টে বাধিয়ে কাঁধে ভর দিয়ে মাকড়সা ও বানরসুলভ যৌথ দক্ষতার সমন্বয়ে চটপট উপরে উঠে গেল মেয়েটি।

নিচে বইয়ে লাগা আগুন দাবানলে রূপ নিয়েছে।

ফিওনার পর গ্রে নিজেও গর্তের ভেতর দিয়ে উপরে উঠে এল। একটি হলওয়ের মাঝখানে এসে উঠেছে ওরা। ওর দু’পাশে রুম ছড়ানো আছে।

‘আগুন এখানেও চলে এসেছে,’ ফিসফিস করে বলল ফিওনা, যেন ওর কথা শুনতে পেলে আগুন এদিকে আরও বেশি করে ধেয়ে আসবে। গর্তের ভেতর থেকে পা উঠিয়ে গ্রে খেয়াল করল অ্যাপার্টমেন্টের পেছনের দিক থেকে উজ্জ্বল শিখার আভাস দেখা যাচ্ছে। এখানে থোয়াও আছে, তবে নিচের চেয়ে কম।

‘চলো,’ বলল গ্রে। দৌড় এখনও শেষ হয়নি।

আগুনের উল্টো দিকে দ্রুত এগোল ও। উপরের দিকে বসানো একটি জানালার কাছে এসে থামল। দুই পাতের ভেতর দিয়ে উঁকি দিল গ্রে। দূর থেকে সাইরেনের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। লোকজন জড়ো হয়েছে নিচের রাস্তায়। লাজুক দর্শক এরা। তবে এদের মধ্যে নিশ্চিতভাবে দু-একজন আততায়ীও ঘাপটি মেরে আছে।

জানালা দিয়ে বেয়ে ওঠার চেষ্টা করলে ওরা দুজনই সবার চোখে পড়ে যাবে।

ফিওনা-ও লোজনের দিকে তাকাল। ‘ওরা আমাদেরকে বেরোতে দেবে না, তাই না?

‘আমরা আমাদের নিজেদের পথ বের করে নেব।’

পেছনে হটে খুঁজতে শুরু করল গ্রে। রাস্তা থেকে বিল্ডিঙের যা যা দেখেছিল মনে করার চেষ্টা করল। ছাদে যেতে হবে ওদের।

গ্রে’র মতলব বুঝল ফিওনা। ‘পাশের রুমে একটা মই আছে।’ পথ দেখিয়ে এগোল ও। ‘আমি এখানে এসে মাঝে মাঝে পড়তাম যখন মাট্টি…’ ওর কণ্ঠ ভেঙে গেল। শব্দগুলো আর বেরোল না।

গ্রে জানে, মেয়েটিকে ওর নানুর মৃত্যু অনেকদিন তাড়া করে বেড়াবে। মেয়েটির কাঁধে এক হাত রাখল ও কিন্তু রেগে কাঁধ ঝাঁকিয়ে গ্রে’কে সরিয়ে দিল ফিওনা।

‘এককালে’ বসার ঘর হিসেবে ব্যবহৃত রুমে ঢুকে বলল ও। এখন এই রুমে কয়েকটি বাক্স আর ফাটা-ছেঁড়া সোফা ছাড়া কিছুই নেই।

সিলিং থেকে ঝুলে থাকা একটি ক্ষয়প্রাপ্ত রশি দেখাল ফিওনা, ছাদের একটি ট্রাপড়োরের সাথে ওটা লাগানো রয়েছে।

গ্রে রশি ধরে টান দিতেই একটি কাঠের মই ওপর থেকে মেঝেতে নেমে এল। মই বেয়ে প্রথম উঠল গ্রে, ওর পেছন পেছন উঠল ফিওনা।

চিলেকোঠাটির নির্মাণ কাজ শেষ না করে অসমাপ্ত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছিল। এখানে থাকা দুটো জানালা দিয়ে ভেতরে আলো আসছে। একটি জানালার মুখ রয়েছে সামনের রাস্তার দিকে আর অন্যটি পেছন দিকে। ধোয়া এখানেও হাজির হয়েছে তবে কোনো আগুন নেই।

গ্রে প্রথমে পেছনের জানালা দিয়ে চেষ্টা করবে বলে সিদ্ধান্ত নিল। পশ্চিম দিকে মুখ করে রয়েছে ওটা, দিনের এসময়টায় ওখানে ছাদের ছায়া পাওয়া যাবে। এছাড়াও বিল্ডিঙের ওদিকেই আগুন লেগেছে। তাই হামলাকারীরা হয়তো ওদিকে কম নজর দেবে। কাঠের তক্তার ওপর দিয়ে লাফিয়ে এগোল গ্রে। নিচ থেকে উঠে আসা তাপের আঁচ ও এখানেও অনুভব করতে পারছে।

জানালার কাছে পৌঁছে নিচ দিকে তাকাল গ্রে। নিচ তলার ছাদের বাড়তি অংশ এমনভাবে রয়েছে যে ও দোকানের পেছন দিকটা দেখতে পারছে না। যদি গ্রে হামলাকারীদের দেখতে না পারে তাহলে হামলাকারীরাও গ্রে’কে দেখতে পাবে না। তার ওপর নিচের ভাঙ্গা জানালাগুলো থেকে গলগল করে ধোয়া বেরিয়ে এসে এদিকটাকে আড়াল করে দিয়েছে।

একবারের জন্য হলেও আগুন ওদের উপকারে এলো!

জানালার পাল্লা খুলে দেয়ার পরও গ্রে ওখানে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। অপেক্ষা করছে। না, কোনো গুলি হলো না। তবে রাস্তার ওপাশে জড়ো হওয়া সাইরেনগুলোর আওয়াজ শোনা গেল।

‘আমি আগে যাচ্ছি, ফিওনাকে ফিসফিস করে বলল গ্রে। যদি সব ঠিক থাকে তাহলে…’।

ওদের পেছনে ছোট গর্জনের মতো শব্দ হলো।

দু’জনই ঘুরল ওরা। আগুনের একটি জিহ্বা এসে কাঠের তক্তায় আঘাত হেনে ওটার সর্বনাশ করে দিয়েছে। সশব্দে ভেঙে, ধোয়া তৈরি করল ওটা। ওদের হাতে সময় খুব কম।

‘আমাকে দেখো,’ বলল গ্রে।

জানালার বাইরে গেল ও, নিচু হয়ে আছে। একটানা শ্বাসরুদ্ধকর তাপমাত্রায় থাকার পর ছাদের এ-অংশের বাতাসকে সুন্দর ঠাণ্ডা মনে হলো ওর।

পালানোর স্বার্থে ছাদের টাইলসগুলো পরীক্ষা করল গ্রে। জায়গাটি বেশ খাড়া ও ঢালু তবে ওর জুতোয় বেশ ভাল গ্রিপ আছে। সাবধানে হাঁটলে, সম্ভব। জানালার কাছ থেকে সরে উত্তরদিকের ছাদের কিনারার দিকে এগোল ও। সামনে দুটো বিল্ডিঙের মাঝে প্রায় ফুট তিনেক ফাঁকা জায়গা আছে। সমস্যা নেই, এটুকু ওরা লাফিয়ে পার হয়ে যেতে পারবে।

সন্তষ্ট হয়ে জানালার দিকে ফিরল ও। “ঠিক আছে, ফিওনা… সাবধানে।

ফিওনা জানালা দিয়ে আগে মাথা বের করে চারিদিক দেখে নিল, তারপর নামল ছাদে। নিচু হয়ে প্রায় বসে বসে এগোচ্ছে ও।

মেয়েটির জন্য গ্রে অপেক্ষা করছে। ‘বেশ দারুণ করছ তুমি।

কথা শুনে গ্রে’র দিকে তাকাল মেয়েটি। মনোযোগ সরে যাওয়া একটি ভাঙ্গা টাইলের ওপর পা পড়ল ওর। টাইল ভেঙ্গে যাওয়ায় ফিওনার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেল। পেটের ওপর ভর দিয়ে আছড়ে পড়ল বেচারি। ঢালু ছাদ দিয়ে পিছলে নামতে শুরু করল।

হাত-পা দিয়ে নিজেকে থামাতে চেষ্টা করলেও ফিওনা আকড়ে ধরার মতো কিছু পেল না।

গ্রে ওকে বাঁচানোর জন্য সামনে ঝুঁকে হাত বাড়িয়ে দিল, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হলো না।

টাইলসগুলোর ওপর দিয়ে পিছলে যেতে যেতে ওর গতি বাড়তে লাগল। আরও টাইলস ভাঙ্গল হাত-পা ছোঁড়ার কারণে। ওর সামনে থাকা টাইলস ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে “টাইলসধস”-এর মতো অবস্থা হলো।

উপুড় হয়ে পড়ে রইল গ্রে। কিছুই নেই ওর।

‘গাটার! (ছাদ থেকে পানি গড়ানোর জন্য পাইপ বা নালী)’ মেয়েটিকে উদ্দেশ্য করে বলল গ্রে। “গাটার ধরো!’

ফিওনা দেখে মনে হলো ও কিছুই শুনতে পায়নি। টাইলস ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে নিচে চলে যাচ্ছে সে। হঠাৎ লাফিয়ে উঠে এবার গড়াতে শুরু করল ও। একটি আর্তচিৎকার বেরিয়ে এলো ওর গলা দিয়ে।

প্রথমে ভেঙ্গে যাওয়া কয়েকটি টাইলস কিনারা থেকে ছিটকে পড়ল। আগুনের চিরবির শব্দের সাথে পাথুরে উঠোনে ওগুলো আছড়ে পড়ার শব্দও শুনতে পেল গ্রে।

ফিওনাও ওগুলোর অনুসরণ করল, হাত ছড়িয়ে ছাদের কিনারা থেকে খসে পড়ল বেচারি।

চলে গেল ফিওনা।

০৩. উকুফা

০৩. উকুফা

সকাল ১০টা ২০ মিনিট।
হুলুহুলুই-আমফলোজি গেম প্রিজার্ভ
জুলুল্যান্ড, সাউথ আফ্রিকা।

কোপেনহ্যাগেন থেকে ছয় হাজার মাইল দূরে, একটি ভোলা জিপ আফ্রিকার বুনো পথ মাড়িয়ে এগোচ্ছে।

গরমে গলদঘর্ম অবস্থা, আফ্রিকার উষ্ণ উদোম প্রান্তরে মরীচিকা ঝিকমিক করছে। রিয়্যার ভিউ আয়নায় দেখা যাচ্ছে, সূর্যের তাপে দারুণভাবে সেদ্ধ হচ্ছে সমতল ভূমি। তবে সূর্যের এই মহৎ কাজে মাঝে মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কাটাঅলা ঝোঁপ-ঝাড় আর হালকা লাল কাঠের গাছপালা। জিপের সামনে দুম করে একটি ছোট ঢিবির উদয় হলো। বাবলাজাতীয় গাছের কাণ্ড, গুলা পাতার পুরু স্তরে ঢাকা ওটা।

‘ভক্টর, এটাই কী সেই জায়গা?’ শুকনো নদীর ওপর দিয়ে ঝাঁকি খেয়ে স্টিয়ারিং ঘুরাতে ঘুরাতে খামিশি টেইলর জানতে চাইল। জিপের পেছনে মোরগের লেজের মতো ধূলো উড়ছে। পাশে থাকা নারীর দিকে তাকাল সে।

যাত্রী সিটে ড. মারসিয়া ফেয়ারফিল্ড প্রায় দাঁড়িয়ে আছে। ঝাঁকি সামাল দিতে এক হাত দিয়ে উইন্ডশিল্ডের কিনারা ধরে আছে ও। আরেক হাত দিয়ে দেখিয়ে বলল, ‘পশ্চিম দিকে। ওখানে একটা গভীর গহ্বর আছে।’

খামিশি গিয়ার নামিয়ে ডান দিকে গাড়ি চালাল। হুলুহুলুই-আমলোজি গেম প্রিজার্ভের বর্তমান গেম ওয়ার্ডেন (প্ররক্ষক) হিসেবে তাকে কিছু নিয়ম-নীতি মেনে চলতেই হয়। বেআইনিভাবে পশু-পাখি শিকার করা দণ্ডনীয় অপরাধ, তবুও শিকার হচ্ছে। বিশেষ করে পার্কের নির্জন অংশে।

এমনকি ওর নিজের লোকজন, কিছু জুলু উপজাতির বাসিন্দারাও মাঝে মাঝে তাদের ঐতিহ্য চর্চা করতে গিয়ে পশু-পাখি মেরে ফেলে। এই কাজ করার জন্য ওকে ওর দাদার বয়স্ক বন্ধুদেরকেও জরিমানা করতে হয়েছে। ওরা খামিশির নাম পড়িয়ে “ফ্যাট বয়”। উপহাসের সুরেই এই নামে ডাকেন তারা। খামিশি বুঝতে পারে ওনারা ওকে এখনও পছন্দ করে উঠতে পারেননি। ওকে এখনও একজন সাদা চামড়াধারী লোকের চাকরি করার যোগ্য বলে মানেন না তারা। খামিশি এখনও এখানে বেশ পরিচিত। ওর যখন ১২ বছর বয়স তখন বাবা ওকে অস্ট্রেলিয়া নিয়ে গিয়েছিলেন। অস্ট্রেলিয়ার উত্তর উপকূলে ডারউইন শহরের বাইরে জীবনের একটি অংশ দারুণভাবে কাটিয়ে এসেছে ও। ওখান থেকে ফিরে এসে গেম ওয়ার্ডেন পদে চাকরি নিশ্চিত করে এখানে থিতু হয়েছে।

“ফ্যাট বয়” উপাধি বাগিয়ে নিয়েছে শিকারিদের শান্তি নষ্ট করে।

‘আরেকটু জোরে যাওয়া যাবে? ওর যাত্রী তাড়া দিল।

ড. মারসিয়া ফেয়ারফিল্ড ক্যামব্রিজ থেকে পাস করা জীববিজ্ঞানী। গণ্ডার সম্পর্কিত অপারেশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানিত অংশ হিসেবে সে কাজ করছে। মারসিয়ার সাথে কাজ করতে খামিশির বেশ ভালই লাগে। ড. মারসিয়া খুব সাদামাটাভাবে চলা ফেরা করে, পরনে খাকি সাফারি জ্যাকেট, মাথার রুপোলি ধূসর চুলগুলো মাথার পেছনে গোছা করে বেঁধে রেখে দিব্যি ঘুরছে ও। কোনো ছলনা নেই, ভনিতা নেই। হয়তো এই কারণেই খামিশি তাকে পছন্দ করে।

কিংবা হয়তো মারসিয়ার পছন্দের বিষয়ের জন্য।

‘বাচ্চা জন্ম দিতে গিয়ে যদি মা গণ্ডার মারা যায় তাহলে বাচ্চাটি হয়তো বাঁচবে কিন্তু সেটা কতক্ষণ?’ উইন্ডশিন্ডের কিনারায় থাবা মারল ড.। ‘ওদের দুজনকে হারানো চলবে না।

গেম ওয়ার্ডেন হিসেবে মারসিয়ার কথার মর্মার্থ বুঝতে পারল খামিশি। ১৯৭০ সাল থেকে কালো রাইনো (গণ্ডার) এর সংখ্যা আফ্রিকা থেকে ৯৬% কমে গেছে। কালো রাইনোর এই বিলুপ্তি রোধ করার চেষ্টা করছে হুলুহুলুই-আমলোজি। এখানে সাদা রাইনো আছে। এই পার্কের অন্যতম প্রধান চেষ্টা হলো কালো রাইনোর বিলুপ্তি বন্ধ করা।

প্রত্যেকটি কালো রাইনো গুরুত্বপূর্ণ।

‘ট্রাকিং ইমপ্ল্যান্ট (কারও অবস্থান জানার জন্য ব্যবহৃত যন্ত্র) ব্যবহারের কারণে আমরা ওর অবস্থান জানতে পেরেছি, নইলে এটা সম্ভব হতো না। বলল ড. ফেয়ারফিল্ড। হেলিকপ্টার দিয়ে ওকে দেখলাম ঠিকই কিন্তু যদি বাচ্চার জন্ম দিয়ে দেয় তাহলে তো সেই বাচ্চার আর হদিস জানার উপায় থাকবে না।’

‘কেন, মায়ের সাথেই তো বাচ্চার থাকার কথা, তাই না? খামিশি জানতে চাইল। এর আগে এরকম ঘটনা সে নিজে দেখেছে। দুই বছর আগের কথা, এক জোড়া সিংহের বাচ্চা ওদের মায়ের ঠাণ্ডা পেটের কাছে গাদাগাদি করে বসেছিল। ওদের মা মারা গিয়েছিল শৌখিন শিকারির গুলিতে।

‘এতিমদের কপালে কী জোটে তা তো জানেন। শিকারি প্রাণীগুলো হামলে পড়বে। যদি বাচ্চাটি ইতোমধ্যে ভূমিষ্ঠ হয়ে রক্তমাখা শরীর নিয়ে…

খামিশি মাথা নাড়ল। গ্যাস পেডালে চাপ দিয়ে জিপকে খাড়া পাথুরে ঢালে লাফিয়ে নিয়ে গেল ও। এলোমলো অবস্থায় কিছু নুড়ি-পাথর পড়ে রয়েছে, ও সেগুলোর তোয়াক্কা করল না।

পাহাড় পেরিয়ে সামনে এগিয়ে দেখা গেল ওদের সামনের মি গভীর উপত্যকায় দুই ভাগ হয়ে গেছে। এই দুই ভাগ করার কাজটি করে দিয়েছে নদীর ক্ষীণকায় জলধারা। এখানে গাছপালার পরিমাণ বেশি ডুমুর, মেহগনি ও নায়লা গাছ রয়েছে। এই পার্কের অন্যতম “ভেজা” অঞ্চল এটি। সাধারণত পর্যটকরা যেদিক দিয়ে চলাচল করে সেখান থেকে এই জায়গাটির অবস্থান বেশ দূরে, একটু তফাতে। এখানে অনুমতিপ্রাপ্ত স্বল্প সংখ্যক কিছু লোক প্রবেশ করতে পারে এবং সেই প্রবেশেরও সময়সীমা বেঁধে দেয়া আছে। যেমন : দিনের আলোতে আসা যাবে, কোনোভাবেই রাত কাটানো যাবে না ইত্যাদি। পার্কের পশ্চিম সীমান্ত ঘেঁষে এই অঞ্চলের অবস্থান।

খাড়া ঢাল থেকে জিপ নামানোর সময় দিগন্তে চোখ বুলাল খামিশি। মাইল খানিক দূরে, গেম ফেন্সিং (বেড়া) ভেঙ্গে গেছে। দশ ফুট উঁচু এই বেড়াটি পার্শ্ববর্তী সংরক্ষিত ব্যক্তিগত এলাকা থেকে আলাদা করেছে পার্ককে। এরকম সংরক্ষিত এলাকায় সব সময় পার্কের সীমানা থাকে যাতে পর্যটকরা পার্কের বন্য পরিবেশকে একদম কাছ থেকে উপভোগ করতে পারে।

কিন্তু এটা কোনো সাধারণ সংরক্ষিত এলাকা নয়।

১৮৯৫ সালে হুলুহুলুই-আমলোজি পার্ক স্থাপন করা হয়। পুরো আফ্রিকার সবচেয়ে পুরোনো অভয়ারণ্য এটা। এর পাশে থাকা সংরক্ষিত এলাকাটি এর চেয়েও পুরোনো। জমির মালিক ওয়ালেনবার্গ, এরা একদম খাঁটি বোয়্যার পরিবার। সাউথ আফ্রিকার রাজবংশের লোক বলা যায় এদের, সেই সতেরশ শতাব্দী থেকে এদের প্রজন্ম চলে আসছে। পার্ক স্থাপনের আগে থেকেই এই জমির মালিক তাঁরা। পার্কের আকারের চার ভাগের তিন ভাগ হলো এই সংরক্ষিত এলাকা। এখানে প্রচুর পরিমাণে বন্য প্রাণী আছে। হাতি, গণ্ডার, চিতা, সিংহ ও কেইপ মহিষই নয় বিভিন্ন প্রজাতির শিকারি প্রাণীও আছে এখানে : নাইল কুমির, জলহস্তি, চিতা, হায়েনা, হরিণ, শিয়াল, জিরাফ, জেব্রা, কুতু, ওয়াটারবাক, রিডবাক, শুয়োর, বেবুন ইত্যাদি। বলা হয়ে থাকে এখানে নাকি মালিকদের অজান্তে বেশকিছু দুর্লভ ওকাপি (আফ্রিকার রোমন্থক প্রাণী) বাস করছে। ১৯০১ সালে জিরাফের আত্মীয়র কাতারে পড়া এই প্রাণী আবিষ্কৃত হয়।

ওয়ালেনবার্গের এই সংরক্ষিত এলাকা নিয়ে বরাবরই বিভিন্ন গুজব চালু রয়েছে। পার্কে ছোট প্লেন কিংবা হেলিকপ্টার নিয়ে প্রবেশ করা যায়। বনে যাওয়ার আগ পর্যন্ত অবশ্য রাস্তা ধরেই এগোনো সম্ভব। আর এখানকার দর্শনার্থীরা মামুলি কেউ নন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আসা উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা আসেন এখানে। কথিত আছে, টেডি রুজভেল্ট এখানে এসে শিকার করে যাওয়ার পর আমেরিকার ন্যাশনাল পার্কের সিস্টেম গড়ে ছিলেন।

এই পার্কে একটি দিন কাটানোর জন্য খামিশি ওর সামনের দুটো দাঁত দিতেও রাজি!

কিন্তু হুলুহুলুই-এর প্রধান ওয়ার্ডেন-ই শুধু সেটা করার অধিকার রাখেন। ওয়ালেনবার্গ স্টেটে একবার ঘুরে এসে এই পার্কের বিভিন্ন গোপনীয়তা জানার ভীষণ কৌতূহল জেগেছে খামিশির। ও আশা করে, একদিন নিজের কৌতূহল মেটাতে পারবে।

কিন্তু আশা করলেই তো সব আশা পূরণ হয় না।

ওর এই কালো চামড়ায় তো নয়-ই।

জুলু বংশের লোক আর শিক্ষাগত যোগ্যতা ওকে হয়তো এই চাকরি পাওয়া পর্যন্ত সাহায্য করতে পেরেছে কিন্তু ওর সীমানা এপর্যন্তই। যদিও এখানে আর আগের মতো বর্ণবৈষম্য নেই। তবে ঐতিহ্য মেনে এগোতে গেলে চামড়া কালো হোক বা সাদা কঠিন পথ পাড়ি দিতেই হবে। তার ওপর খামিশির বর্তমান পদটি খুব একটা শক্ত-পোক্ত নয়। এখানকার বিভিন্ন স্থানীয় গোত্রের বাচ্চাদেরকে সাধারণত অল্প শিক্ষা কিংবা অশিক্ষিত করে গড়ে তোলা হয়। শিক্ষার এরকম দশা হওয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ আছে। যেমন : উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের গাফিলতি, অর্থ সঙ্কট, পৃথককরণ ও অস্থিরতা ইত্যাদি। সংক্ষেপে বললে, এই প্রজন্মের তেমন কোনো ভবিষ্যৎ নেই। তাই খামিশি ওর সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। নিজে শিক্ষিত হয়েছে এবং পরবর্তী প্রজন্মের সুবিধার জন্য যতদূর সম্ভব সুযোগ-সুবিধা করে দিয়ে যেতে চায় সে।

ফ্যাট বয় হিসেবে থাকতে ওর কোনো আপত্তি নেই, যদি এভাবে থেকে ওর উদ্দেশ্য হাসিল হয়…

‘ওই যে!’ ৬, ফেয়ারফিল্ড চিৎকার করে উঠল। খামিশির পেছনে থাকা প্যাচানো রাস্তার দিকে নির্দেশ করে বলল, বাওবাব গাছের বাঁ দিক দিয়ে পাহাড়টির নিচে চলুন

প্রাগৈতিহাসিক বিরাটাকার গাছটি চোখে পড়ল খামিশির। গাছটির প্রত্যেকটি শাখা-প্রশাখা থেকে বড় বড় সাদা ফুল ফুটে রয়েছে। গোলাকার বাটি আকৃতির রাস্তা নেমে গেছে গাছের বাম দিক দিয়ে। পানিতে যেন চিকচিক করে উঠল, খেয়াল করল খামিশি।

ডোবা।

পুরো পার্কে এরকম ডোবা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। কোনোটা প্রাকৃতিক আবার কোনোটা কৃত্রিম। বুনো জীবজন্তু দেখার সেরা জায়গা হলো ওই জলাধারগুলো তবে পায়ে হেঁটে গেলে ব্যাপারটা অনেক বিপজ্জনক।

‘আমাদেরকে তো এখান থেকে হেঁটে যেতে হবে। গাছের কাছে গিয়ে একটু গলা চড়িয়েই বলল খামিশি।

ড, মাথা নাড়ল। রাইফেল তুলে নিল দু’জন। ওরা দুজনই বন্য প্রাণী রক্ষা ও সংরক্ষণের জন্য কাজ করলেও দক্ষিণ আফ্রিকার বুনো পরিবেশে কীরকম বিপদ ওঁত পেতে থাকে সে সম্পর্কে জানে।

জিপ থেকে নেমে একটি বড়-বোর ডাবল রাইফেল .৪৬৫ নিট্রো হল্যান্ড অ্যান্ড হল্যান্ড রয়্যাল নিজের কাঁধে ঝোলাল খামিশি। তেড়ে আসা পাগলা হাতিকে থামানোর ক্ষমতা রাখে এই অস্ত্র। বুনো পরিবেশে এরকম করিৎকর্মা রাইফেল খামিশির বেশি পছন্দ।

ঝোঁপ-ঝাড় ও ঘাস মাড়িয়ে ঢাল বেয়ে ওরা নামতে শুরু করল। ওদের মাথার ওপরে একটি গাছের ডাল-পালা সূর্যের তাপ থেকে রক্ষা করলেও গভীর ছায়া তৈরি করল নিচে। সামনে এগোতে এগোতে খামিশি খেয়াল করল চারিদিক বেশ নিশ্চুপ। কোনো পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে না। বানরের চেঁচামেচি নেই। কিছু পোকামাকড়ের ঝিঁঝি আওয়াজ ছাড়া কোনো শব্দ নেই এখানে। এরকম নীরবতা দেখে দাঁতে দাঁত পিষল খামিশি।

ওর পাশে, ড. মারশিয়া তার জিপিএস ট্রাকার চেক করছে।

এক হাত উঁচিয়ে নির্দেশ করল ড.। একটি কর্দমাক্ত ডোবার পাশ নির্দেশ করা হয়েছে। খামিশি নল-খাগড়ার ভেতর গিয়ে এগোতেই পচা মাংসের দুর্গন্ধ এসে ধাক্কা মারল। এরকম উৎকট দুর্গন্ধের উৎস খুঁজে বের করতে খুব একটা সময় লাগল না।

কালো গণ্ডারটির ওজন হবে প্রায় তিন হাজার পাউন্ড। রীতিমত দানবাকৃতির।

‘ওহ ঈশ্বর, নাকে-মুখে রুমাল চেপে বিস্ময় প্রকাশ করল ড. মারশিয়া। ‘হেলিকপ্টার থেকে যখন রবার্টো দেহের অবশিষ্টাংশ দেখিয়েছিল…’।

‘সবসময় মাঠে নামলে দেখা যায় অবস্থা আরও জঘন্য,’ বলল খামিশি।

ফুলে ওঠা দেহাবশেষের দিকে এগোল ও। বাঁ কাত হয়ে পড়ে রয়েছে ওটা। ওরা এগোতেই মাছি কালো মেঘ তৈরি করে উড়াল দিল। গণ্ডারটির পেট চিড়ে দেয়া হয়েছে। পাকস্থলী থেকে মলদ্বার পর্যন্ত খাদ্যনালীর নিচের অংশ বেরিয়ে এসেছে, গ্যাসে ফুলে উঠেছে। ফুলে যাওয়ায় এইসব কিছু গারটির পেটে কীভাবে ছিল, কীভাবে জায়গা করে নিয়েছিল ভাবতে অসম্ভব মনে হচ্ছে। দেহের অন্যান্য অঙ্গ গড়াগড়ি খাচ্ছে ধূলোয়। রক্তের দাগ দেখে মনে হচ্ছে পাশে থাকা জঙ্গলের ভেতরে এখান থেকে কিছু একটা টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

মাছিগুলো উড়াউড়ি বন্ধ করে আবার যে যার জায়গায় বসে পড়ল।

কামড়ে খাওয়া লাল কলিজার কাছে এগোল খামিশি। গণ্ডারটির পেছনের অংশ দেখে মনে হচ্ছে উরুর অংশ থেকে রীতিমতো ফেড়ে ফেলা হয়েছে। চোয়ালে কতটা শক্তি থাকলে এরকম কাজ করা সম্ভব…।

এমনকী একটি প্রাপ্তবয়স্ক সিংহের পক্ষেও এরকম অবস্থা করা কঠিন।

গণ্ডারের মাথার কাছে যাওয়ার আগ পর্যন্ত খামিশি ঘুরে ঘুরে দেখল খামিশি।

গণ্ডারের খাটো-মোটা গোছের একটি কান কামড়ে ছিঁড়ে নেয়া হয়েছে। গলা চিরে দেয়া হয়েছে নৃশংসভাবে। প্রাণহীন কালো চোখ দুটো নিথর তাকিয়ে রয়েছে খামিশির দিকে। আতঙ্কে চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেছে। ভয়ে কিংবা যন্ত্রণায় ঠোঁট দুটো উঠে গেছে পেছন দিকে। মুখ থেকে চওড়া জিহ্বা বেরিয়ে এসেছে, শরীরের নিচে যেন রক্তের পুকুর। কিন্তু এগুলোর কিছুই তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়।

খামিশি জানে, ওকে কী পরীক্ষা করতে হবে।

ফেনা ও ছোট ঘোট ফুটকিঅলা নাকের ওপরে থাকা গণ্ডারের শিংটি একদম অক্ষত অবস্থায় আছে।

‘একাজ কোনো শিকারি করেনি, নিশ্চিত।’ বলল খামিশি।

শিকারির কাজ হলে এই শিং আর থাকতো না। এই শিং-এর কারণেই গণ্ডারের সংখ্যা এখনও আশংকাজনক হারে কমছে। এশিয়ার বাজারে এই শিঙের গুড়োকে পুরুষাঙ্গের বলবর্ধক হিসেবে বিক্রি করা হয়ে থাকে। গণ্ডারের একটি শিঙের দাম নেহাত কম নয়।

খামিশি সোজা হয়ে দাঁড়াল।

গণ্ডার দেহের অন্য পাশে গিয়ে বসল ড. মারশিয়া। শরীরের সাথে ঠেস দিয়ে রাইফেলটিকে দাঁড় করিয়ে রেখে হাতে প্লাস্টিকের গ্লোবস পরে নিয়েছে ও। গণ্ডারটা কোনো বাচ্চা প্রসব করেছে বলে তো মনে হচ্ছে না।

‘তাহলে কোনো বাচ্চাও এতিম হচ্ছে না।

জীববিজ্ঞানী মারশিয়া দেহাবশেষের গর্ভের কাছে আবার এগিয়ে গেল। সামনে ঝুঁকে কোনো সংকোচ না করে ফেড়ে দেয়া গর্ভের এক অংশ খুলে ভেতরে হাত দিল।

অন্যদিকে ঘুরল খামিশি।

“শকুন কিংবা অন্য কোনো প্রাণী এখনও এই দেহাবশেষ চেটে-পুটে খায়নি কেন? কাজ করতে করতে প্রশ্ন করল মারশিয়া।

‘গণ্ডারের মাংস তো আর কম নয়, খামিশি বিড়বিড় করল। পেছনে গোল হয়ে হাঁটছে ও। এখানকার এরকম সুনসান নীরবতা ওর অস্বস্তি হচ্ছে। ওপর থেকে সূর্যের তাপ যেন ঠেসে ধরেছে ওদের।

মারশিয়া তার পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে। ‘উঁহু, আমার তা মনে হয় না। গতরাত থেকে এই লাশ এখানে পড়ে আছে। কাছেই জলাধার। আর কিছু না হোক, গণ্ডারের ভেতরের সবকিছু তো শিয়ালেরই পরিষ্কার করে ফেলার কথা।’

দেহাবশেষের উপর আবার চোখ বুলাল খামিশি। পেছনে ছেঁড়া পা আর ফেড়ে যাওয়া গলা দেখল ও। বড় কোনো প্রাণী গণ্ডারটিকে কাবু করেছিল এবং সেটা করেছিল খুব দ্রুত।

ওর গলার পেছনে কেমন যেন এক খচখচানি শুরু হলো। ‘

মরা দেহ খাওয়ার প্রাণীগুলো ছিল কোথায়?

এই রহস্যের গভীরে চিন্তা করার আগেই ড. খামিশিকে বলল ‘বাচ্চা নেই। চলে গেছে।’

‘কী?’ এদিকে ঘুরে দাঁড়াল খামিশি। আপনি না বললেন গণ্ডার কোনো বাচ্চা জন্ম দেয়নি।

ড. মারশিয়া উঠে দাঁড়িয়ে হাত থেকে গ্লোভস খুলে রাইফেল তুলে নিল। ভূমিতে চোখ রেখে গণ্ডারের লাশের কাছ থেকে সরে যেতে লাগল ও।

খামিশি খেয়াল করল ড. রক্তের সেই দাগ অনুসরণ করছে। আয়েশ করে খাওয়া জন্য গণ্ডারের পেট থেকে কিছু একটাকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ওদিক দিয়ে।

ওহ, ঈশ্বর…

মারশিয়ার পিছু নিল ও।

ঝোঁপ-ঝাড়ের কাছে গেল ড. ফেয়ারফিল্ড। ওর রাইফেলের ডগা দিয়ে কিছু খাটো ডালপালা সরিয়ে দেখতে পেল, পেট থেকে কী বের করে আনা হয়েছে।

একটি গণ্ডারের বাচ্চা।

হাড্ডিসার শরীরটিকে বিভিন্ন অংশে টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়েছে, দেখে মনে হয়েছে এর সাথে কেউ রীতিমতো কুস্তি লড়েছে।

‘আমার মনে হয়, মায়ের পেট থেকে যখন বাচ্চাটিকে বের করা হচ্ছিল ওখনও জীবিত ছিল বাচ্চাটি। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রক্তের দাগের দিকে ইঙ্গিত করে বলল ড. ফেয়ারফিল্ড, বেচারা।’

পিছু হটল খামিশি। মারশিয়ার করা শেষ প্রশ্নটি ওর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। দেহাবশেষটুকু বিভিন্ন মাংসভোজী প্রাণীরা খেয়ে শেষ করল না কেন? শকুন, শিয়াল, হায়েনা, এমনকী সিংহ; এদের কেউ-ই কেন গণ্ডারের দেহাবশেষ খেয়ে শেষ করল না? ড. মারশিয়ার প্রশ্নটি একদম যৌক্তিক। এত মাংস তো মাছি আর লার্ভার জন্য পড়ে থাকার কথা নয়।

কেন এমন হলো কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।

যদি না…

খামিশির বুকে ধুকপুকানি বেড়ে গেল।

যদি না সেই প্রাণীটি এখনও এখানে থাকে। প্রাণীটি যদি এখানে এখনও থেকে থাকে তাহলে অন্য কেউ এদিকে আসার সাহস না-ও পেতে পারে। নিজের রাইফেল উঁচু করে ধরল খামিশি। ও লক্ষ করল, ছায়া ভরা ঝোঁপ-ঝাড়ের ভেতরে এখনও সুনসান নীরবতা। গণ্ডারটিকে যে প্রাণী মেরে থাকুক, মনে হচ্ছে পুরো জঙ্গল সেটার ভয়ে সিটিয়ে রয়েছে।

বাতাসে ঘ্রাণ খুঁকে, কান পেতে আর তীক্ষ্ণ চোখের দৃষ্টি নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করল খামিশি। ওর চারপাশের ছায়া যেন ধীরে ধীরে আর গম্ভীর হয়ে যাচ্ছে।

সাউথ আফ্রিকায় নিজের ছোটবেলা কাটানোর ফলে খামিশি এক জঙ্গল থেকে আরেক জঙ্গলে দাপিয়ে বেড়ানো বিভিন্ন অলৌকিক ধারণা, দানবের ফিসফিসানি সম্পর্কে ওর জানাশোনা আছে। দ্য ndalaw০, উগান্ডার জঙ্গলের গর্জন করা এক নরখাদক; দ্য mbilinto, কঙ্গোর হাতির মতো বিরাটাকার জলহস্তী; দ্য mngwa, সমুদ্রতীরের নারিকেল বাগানে ওঁত পেতে থাকা লোমশ দানব ইত্যাদি।

কিন্তু আফ্রিকায় কখনও কখনও পৌরাণিক কাহিনিগুলো বাস্তবে হাজির হয়ে যায়। যেমন: nsui-fisi, রোডেশিয়ার নরখাদক, যার গায়ে ছোরা কাটা দাগ আছে। সাদা চামড়ার লোকদের মুখ থেকে ওটার নানান শোনা কাহিনি থেকে জানা যায়। তবে তার এক দশক পর আবিষ্কার হলো ওটা ছিল চিতার একটি নতুন জাত চিতার শ্রেণিবিভাগ অনুযায়ী ওটাকে Acinonyx rex গোত্রে ফেলা হয়েছে।

জঙ্গলে চোখ বুলাতে বুলাতে আরেকটি কিংবদন্তি দানবের কথা মনে পড়ল খামিশির। পুরো আফ্রিকা জুড়ে পরিচিতি ছিল তার। নানান রকম নাম ছিল : দ্য dubu, দ্য lumbwa, দ্য kerit, দ্য getet ইত্যাদি। স্থানীয় লোকজনদের মনে এই নামগুলো ত্রাসের সৃষ্টি করতো। গরিলার মতো বিরাটাকৃতির দানবটি ছিল দ্রুতগামী, ভীষণ চালাক এবং হিংস্র। সাক্ষাৎ যমদূত বলতে যা বোঝায় আরকী! প্রায় এক শতাব্দী জুড়ে বিভিন্ন সময় সাদা ও কালো চামড়ার নানান লোক দাবি করেছে, ওই দানবকে এক নজর হলেও দেখেছে তারা। এখানকার সব বাচ্চাদেরকে ওই দানবের বিশেষ গর্জন সম্পর্কে শিক্ষা দিয়ে বড় করা হয়ে থাকে। এই জুলু সম্প্রদায়ও সেটার ব্যতিক্রম নয়।

‘উকুফা…’ বিড়বিড় করল খামিশি।

‘কিছু বললেন?’ ড. মারশিয়া জিজ্ঞেস করল। গণ্ডারের মৃত বাচ্চার পাশে বসে রয়েছে সে।

জুলু সম্প্রদায় ওই দানবকে এই নামে ডেকে থাকে।

উকুফা।

মৃত্যু।

ওই দানবের কথা খামিশির এই মুহূর্তে মনে পড়ার একটি কারণ আছে। পাঁচ মাস আগে, উপজাতির এক বুড়ো বলেছিল সে নাকি এইখানে কোথাও একটি উকুফা দেখেছে। অর্ধেক পশু, অর্ধেক ভূত, চোখ দুটো আগুনের মতো জ্বলছিল ওটার, কোনোমতে মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফিরতে পেরেছিল সে।

কিন্তু আজ এখানে এই গভীর ছায়ার ভেতরে…

‘আমাদের চলে যাওয়া উচিত,’ বলল খামিশি।

“কিন্তু আমরা তো এখনও জানি না গণ্ডারটাকে কীসে মেরে ফেলেছিল?

‘কোনো শিকারির কাজ নয় এটা।’ এই মুহূর্তে খামিশির এরচেয়ে বেশি জানার কোনো প্রয়োজন নেই। জিপের দিকে রাইফেল তাক করল ও। প্রধান ওয়ার্ডেনকে রেডিওতে পুরো বিষয়টি জানিয়ে দিতে পারে খামিশি। বুনো জানোয়ারের আক্রমণে মৃত্যু, কোনো শিকারির কাজ নয়। আর এই দেহাবশেষকে বিভিন্ন প্রাণীর খাবার হিসেবে রেখে গেলেই ল্যাঠা চুকে যায়। তাতে খাদ্যশৃঙ্খল বজায় থাকে। বুনো জীবন তো এভাবেই চলে আসছে।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠে দাঁড়াল ড. ফেয়ারফিল্ড।

ছায়ায় ঢাকা জঙ্গলের বুক চিরে ঠিক ওদের ডান দিক থেকে উঁচু লয়ের বুনো চিৎকার —হুঁউউ ইইইই ওওওও–ভেসে এলো।

নিজের জায়গায় দাঁড়ানো অবস্থায় টলে উঠল খামিশি। এই চিৎকার ওর চেনা। শুধু স্মৃতিশক্তি কিংবা মগজ দিয়ে নয় মেরুদণ্ডের শিরশিরে অনুভূতি দিয়েও চেনে এই চিৎকার। গভীর রাতে করা ক্যাম্পফায়ার, রক্ত আর ভয়ের গল্প কিংবা আদিকালের কাহিনিতেও এই চিৎকার শোনা যায়।

উকুফা।

মৃত্যু।

চিৎকার ধীরে ধীরে বাতাসে মিলিয়ে যেতেই আবার নীরবতা নেমে এলো।

মনে মনে ওদের দুজনের কাছ থেকে জিপের দূরত্ব আন্দাজ করল খামিশি। ওদের এখান থেকে কেটে পড়তে হবে তবে সেটা তাড়াহুড়ো করে নয়। আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পালাতে গেলে দানবের রক্ততৃষ্ণা বাড়বে, কাজের কাজ কিছুই হবে না।

জঙ্গলের বাইরে আরেকটি চিৎকার শোনা গেল।

তারপর আরও একটি।

আরেকটি।

সব ভিন্ন ভিন্ন দিক থেকে আসছে।

পরমুহূর্তেই খামিশি বুঝতে পারল মাত্র একটি সুযোগ আছে ওদের হাতে। ‘দৌড় দিন।’

.

সকাল ৯ টা ৩১ মিনিট।
কোপেনহ্যাগেন, ডেনমার্ক।

ছাদের টাইলসের ওপর পেটে ভর দিয়ে উপুড় হয়ে পড়ে আছে গ্রে। মাথা নিচু করে ফিওনাকে ধরতে ব্যর্থ হওয়ার স্থানে হাত পা ছড়িয়ে পড়ে রয়েছে ও। মেয়েটির হাদের কিনারা দিয়ে পড়ে যাওয়ার দৃশ্য বারবার ওর মানসপটে ভেসে উঠছে। বুকের ভেতর লাফাচ্ছে হৃদপিণ্ডটা।

ওহ, খোদা… এ কী করলাম আমি…?

ওর কাঁধের ওপরে চিলেকোঠা দিয়ে আগুনের নতুন লেলিহান শিখার বিস্ফোরণ হলো। উপরি হিসেবে ধেয়ে এলো ধোঁয়া আর তপ্ত হাওয়া। হতাশা সরিয়ে রেখে নড়তে হলো ওর।

কনুইতে ভর দিয়ে উঠতে শুরু করল গ্রে। একটু পর পর আগুন যেখান দিয়ে উঁকি দিচ্ছে ওদিকে ঝুঁকল ও। পিছু হটল একটু পরেই। নিচ থেকে কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে। লুকোচুরি করে তাগাদা দিচ্ছে কণ্ঠগুলো। গ্রে’র একদম কাছে… একটু গোঙানি শোনা গেল। ছাদের ঠিক নিচেই।

ফিওনা…?

গ্রে আবার নিজের পেটের ওপর ভর দিল। ছাদের কিনারা দিয়ে নিয়ন্ত্রিত গতিতে পিছলে নামল ও। নিচের জানালাগুলো থেকে ভকভক করে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। গ্রে এই ধোয়ার চাদরকে নিজের আড়াল হিসেবে ব্যবহার করল। ছাদ থেকে পানি গড়ানোর পাইপের কাছে পৌঁছে নিচে তাকাল ও।

ঠিক ওর নিচেই একটি লোহার বারান্দা… না ঠিক বারান্দা নয়। এটা সিঁড়িতে নামার একটি জায়গা। ফিওনা বলেছিল বিল্ডিঙের বাইরে একটি সিঁড়ি আছে, এই হলো সেই সিঁড়ি।

সিঁড়ির ল্যান্ডিঙের ওপর একটি মেয়ে হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে আছে।

দ্বিতীয়বারের মতো গুঙিয়ে রেলিং ধরে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল ফিওনা।

অন্যরা ওর নড়াচড়া লক্ষ করছে।

নিচের উঠোনে গ্রে দুজনকে দেখতে পেল। তাদের একজন ফুটপাতের মাঝে দাঁড়িয়ে রয়েছে, কাঁধে রাইফেল। আয়েশ করে গুলি করার সুযোগ খুঁজছে সে। অ্যাপার্টমেন্টের ভাঙ্গা জানালা থেকে বেরুনো কালো ধোয়া ফিওনাকে আড়াল করে রেখেছে। রেলিঙের ওপরে ফিওনার মাথা ওঠার জন্য অপেক্ষা করছে অস্ত্রধারী।

নিচু হয়ে থাকো, ফিসফিস করে ফিওনাকে বলল গ্রে।

ওপর দিকে তাকাল ফিওনা। ওর কপালের ওপর দিয়ে তাজা রক্ত গড়াচ্ছে।

দ্বিতীয় অস্ত্রধারী ঘুরে দাঁড়াল। কালো পিস্তল লোড করে সিঁড়ির দিকে তাক করল সে। ওর মতলব হলো এই বিল্ডিং থেকে পালানোর সব রাস্তা বন্ধ করা।

গ্রে ফিওনাকে ইশারা করে বলল, ও যেন নিচু হয়ে থাকে। তারপর গ্রে ছাদের কিনারা ঘেঁষে নিজের শরীর গড়িয়ে দিল। পৌঁছে গেল দ্বিতীয় অস্ত্রধারীর ওপরে। ধোয়ার চাদর এখনও ওকে আড়াল দিয়ে যাচ্ছে। সিঁড়ির দিকেই অস্ত্রধারীর মনোযোগ বেশি। নিজের পজিশনে থেকে অপেক্ষা করল গ্রে। ওপর থেকে গড়িয়ে নামার সময় ফিওনার ধাক্কায় আলগা হয়ে যাওয়া ছাদের একটি টাইল ডান হাতে তুলে নিল ও।

আঘাত করার জন্য হয়তো মাত্র একবারই সুযোগ পাবে।

নিচে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি হাতের পিস্তল দিয়ে সিঁড়িতে আগত যেকোনো লোককে পরপারে পাঠানোর জন্য একদম তৈরি হয়ে আছে।

ছাদের কিনারায় গিয়ে কুঁকল গ্রে, হাত উঁচু করে রেখেছে।

শিস বাজাল তীক্ষ্ণ শব্দে।

ওপরে তাকাল অস্ত্রধারী, হাতের অস্ত্র ঘুরিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল সে; চোখ ধাঁধানো দ্রুতগতিতে…

কিন্তু মাধ্যাকর্ষণের গতি তার চেয়ে বেশি।

হাতে থাকা টাইল ছুঁড়ে মারল গ্রে। কুড়ালের মতো বাতাস কেটে একদম অস্ত্রধারীর চেহারায় গিয়ে আঘাত হানল ওটা। ছিটকে রক্ত বেরুল লোকটির নাক দিয়ে। ঠাস করে ফুটপাতে আছড়ে পড়ল সে। রাস্তার ওপর ওর মাখা ড্রপ খেল। শেষ, আর কোনো নড়াচড়া নেই।

ফিওনার কাছে ফিরল গ্রে।

চিৎকার করে উঠল আরেক অস্ত্রধারী।

গ্রে তার ওপর দৃষ্টি রাখল। গ্রে ভেবেছিল সহযোগীকে লুটিয়ে পড়তে দেখে এই ব্যাটা বোধহয় সাহায্য করতে এগিয়ে যাবে কিন্তু কপাল খারাপ। অস্ত্রধারী বিপরীত দিকে দৌড় দিল। ডাস্টবিনের আড়ালে নিজেকে লুকোনোর চেষ্টা করলেও গ্রে’র আক্রমণ করার রাস্তা এখনও খোলা আছে। ওর পজিশন হলো পুড়ে দোকানের পেছনের অংশে। এবার পাশের জানালা থেকে বেরিয়ে আসা ধোয়ার সুবিধে পাচ্ছে ও।

ফিওনার দিকে ফিরে নিচু হয়ে থাকার জন্য আবারও ইশারা করল গ্রে। ফিওনাকে ওপরে উঠিয়ে আনতে গেলে মৃত্যু ঝুঁকি নিতে হবে ওদের। বেশ কিছুক্ষণ ওদেরকে উক্ত অবস্থায় থাকতে হবে।

মাত্র একটি উপায় আছে।

ছাদের পানি গড়ানোর পাইপ ধরে সিঁড়ির ল্যান্ডিঙে নামল গ্রে। লোহার ল্যান্ডিঙে নামমাত্র টং করে শব্দ হলো। নিচু হলো গ্রে।

ওর মাথার ওপরে থাকা একটি ইটের দফারফা হয়ে গেল।

রাইফেল থেকে গুলি করা হয়েছে।

পায়ের গোড়ালিতে হাত দিয়ে ছোরা বের করে নিল গ্রে।

ফিওনা দেখে বলল, “আমরা কী করতে…’

‘তুমি এখানেই থাকবে,’ গ্রে আদেশ করল।

রেলিঙের ওপর হাত রাখল গ্রে। প্রতিপক্ষকে চমকে দিতে চাচ্ছে। কোনো ঢাল বা আমার নেই, অস্ত্রও নেই। আছে শুধু একটি ছোরা।

‘আমি যখন বলব তখন দৌড় দেবে,’ বলল গ্রে। সোজা সিঁড়ি দিয়ে নেমে গিয়ে পাশের বাড়ির বেড়া ডিঙিয়ে পালাবে। তারপর পুলিশ কিংবা ফায়ার সার্ভিসের কাউকে খুঁজে বের করবে, পারবে তো?’

ফিওনা গ্রে’র চোখের দিকে তাকাল। দেখে মনে হলো ফিওনা আপত্তি করবে কিন্তু। চোখ-মুখ শক্ত করে হা-সূচক মাথা নাড়ল।

লক্ষ্মী মেয়ে।

হাতে ছোরা নিয়ে ভারসাম্য ঠিক করে নিল গ্রে। আবার মাত্র একটা সুযোগ পাওয়া যাবে। বড় করে শ্বাস নিল ও। রেলিঙে লাফিয়ে উঠে নিচে ঝাঁপ দিল। ফুটপাতে ল্যান্ডিং করার আগে শূন্যে থাকা অবস্থায় একই সময়ে দুটো কাজ করল গ্রে।

‘দৌড়াও!’ চিৎকার করে বলল সে। একই সাথে লুকিয়ে থাকা অস্ত্রধারীকে তাক করে ছোরা ছুঁড়ে মারল। খুন করে ফেলার ইচ্ছে নেই, স্রেফ মনোযোগ ঘুরিয়ে দেয়ার চেষ্টা। এরকম কঠিন পরিস্থিতে একজন লোক রাইফেল তাক করে থাকলে কেমন যেন লাগে।

ভূমিতে অতরণ করে দুটো জিনিস লক্ষ করল ও।

একটি ভাল, অন্যটি মন্দ।

গ্রে ধাতব সিঁড়ি দিয়ে ফিওনার দৌড়ে যাওয়ার আওয়াজ পেল।

মেয়ে পালাচ্ছে।

ভাল।

অন্যদিকে গ্রে’র ছুঁড়ে দেয়া ছোঁড়াটি ধোয়ার চাদরের ভেতর দিয়ে গিয়ে ডাস্টবিনের গায়ে আঘাত হেনে ছিটকে পড়েছে। কাজের কাজ তেমন কিছুই হয়নি।

খারাপ কথা।

ঘাপটি মেরে থাকা লোকটি নিজের রাইফেল তুলে নিয়ে সোজা গ্রে’র বুক বরাবর তাক করল।

‘না!’ সিঁড়ির নিচে পৌঁছে চিৎকার করল ফিওনা।‘

ট্রিগার টানার সময় অস্ত্রধারী লোকটা হাসল না পর্যন্ত।

.

সকাল ১১টা ৫ মিনিট।
হুলহুলুই-আমলোজি গেম প্রিজার্ভ।
জুলুল্যান্ড, সাউথ আফ্রিকা।

‘দৌড় দিন!’ খামিশি আবার তাড়া দিল।

ড. মারশিয়াকে আর তাড়া দেয়ার প্রয়োজন ছিল না। জিপের দিকে ছুটে চলেছে ওরা দুজন। জলাধারের কাছে পৌঁছে গেছে ওরা। ড. মারশিয়াকে আগে এগিয়ে যাওয়ার জন্য ইশারা করল খামিশি। নল-খাগড়ার ভেতরে ঢুকল মারশিয়া, তবে তার আগে খামিশির চোখে চোখ পড়ল ওর। দু’জনের চোখেই আতঙ্ক।

জঙ্গলের ভেতরে যে প্রাণী চিৎকার জুড়ে দিয়েছিলে ওটা বোধহয় বেশ বড়সড় হবে। শব্দে তো সেরকমই মনে হলো। আর সম্প্রতি খুন করে ওটা বোধহয় আরও বেশি উত্তেজিত হয়ে রয়েছে। পেছন ফিরে গণ্ডারের দেহাবশেষের দিকে তাকাল খামিশি। দানব আসছে কি-না, এই তথ্য ছাড়া এই বনের আর কোনো তথ্য আপাতত তার কোনো প্রয়োজন নেই।

চারিদিক দেখে নিয়ে জীববিজ্ঞানীকে অনুসরণ করে এগোচ্ছে খামিশি।

একটু পর পর নিজের কাঁধের ওপর দিয়ে পেছনে তাকাচ্ছে, কান খুলে রেখেছে, কেউ ধাওয়া করছে কি-না সেটা জানার জন্য। পাশের জলাশয়ে কিছু একটা ঝপাৎ করে পড়ল। খামিশি ব্যাপারটিকে গুরুত্ব দিল না। পানিতে ঝপাৎ করে পড়ার শব্দটা বেশ কমই ছিল। ওটাকে আমলে না নিলেও চলে। পোকামাকড়ের ঝি ঝি শব্দ আর নল-খাগড়া ভাঙ্গা শব্দগুলোকে এড়িয়ে গেল ও। তবে প্রকৃত বিপদ সংকেত সম্পর্কে সজাগ রয়েছে। খামিশির বয়স যখন ৬ বছর তখন ওর বাবা ওকে শিকার করা শিখিয়েছে। গাছপালার ভেতর দিয়ে কীভাবে শিকারকে খুঁজে নিতে হয় সেসব শিখিয়েছে ছিল ওর বাবা।

কিন্তু এখন ও শিকারি নয়, শিকার।

আতঙ্কিত হয়ে ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ ওর চোখ ও কান দুটোরই মনোযোগ আকর্ষণ করল।

একটু নড়াচড়া।

আকাশে।

শ্ৰাইক নামের একটি পাখি ডানা মেলেছে।

কিছু একটা ভয় পাইয়ে দিয়েছে ওকে।

কিছু একটা নড়ছে, এগোচ্ছে।

নল-খাগড়া পেরিয়ে আসার পর ড. মারশিয়ার সাথে নিজের দূরত্ব কমিয়ে নিল খামিশি। ‘জলদি।’ ক্লান্তিতে ফিসফিস করে বলল ও।

রাইফেল লাফিয়ে উঠতেই নিজের ঘাড় টান দিল ড. মারশিয়া। ওর চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে, শ্বাস নিচ্ছে কষ্ট করে। ড.-কে পেরিয়ে সামনে তাকাল খামিশি। ওদের জিপ ঢালু অংশের ওপরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বাওবাব গাছের ছায়ায় পার্ক করা হয়েছিল ওটাকে। নিচে নামার সময় ঢালটিকে এত বড় আর খাড়া মনে হয়নি এখন যতটা মনে হচ্ছে।

‘এগোতে থাকুন।’ খামিশি তাড়া দিল।

ও পেছনে তাকিয়ে দেখল তামাটে রঙের একটি হরিণ বড় বড় লাফ দিয়ে জঙ্গলের কিনারা দিয়ে ধূলো উড়িয়ে গায়েব হয়ে গেল।

হরিণকে দেখে ওদের দুজনের পালানো শেখা উচিত।

ঢাল বেয়ে উঠছে ড. মারশিয়া। তার পাশে পাশে এগোচ্ছে খামিশি। পেছনে থাকা জঙ্গলের দিকে দোনলা রাইফেল তাক করে রেখেছে।

‘খাওয়ার জন্য খুন করেনি ওরা,’ সামনে থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল ড. মারশিয়া।

গভীর জঙ্গলের দিকে খামিশি আবার ফিরে তাকাল। ড, ঠিক বলছে কি-না সেটা ও কীভাবে বুঝবে?

‘ক্ষুধা ওদেরকে হিংস্র করেনি,’ জীববিজ্ঞানী বলে যাচ্ছে। কথা বলে নিজের আতঙ্ক একটু কমানোর চেষ্টা হয়তো। ‘গণ্ডারের তেমন কিছুই খায়নি। দেখে মনে হলো, ওরা আনন্দের জন্য খুন করেছে। বাড়ির বিড়াল যেভাবে ইঁদুর শিকার করে, অনেকটা সেরকম।

অনেক জানোয়ারের সাথে পরিচয় আছে খামিশির। জানোয়াররা তো এরকম আচরণ করে না। সিংহরা খাওয়ার পর কালেভদ্রে ভয় দেখায়। সাধারণত খাওয়া দাওয়া হয়ে গেলে ওরা আরাম করে। তখন ওদের বেশ কাছেও যাওয়া যায়। তবে সেটা একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্ত। একটি পরিতৃপ্ত প্রাণী কখনই স্রেফ আনন্দের জন্য এরকম একটা গণ্ডারকে ফেড়ে ফেলে না, পেট থেকে ওটার বাচ্চাকে টেনে বের করে নেয় না।

ড. ফেয়ারফিল্ড তার ভাষণ দিয়েই যাচ্ছে। বর্তমান বিপদটি যেন একটি ধাঁধা, ভেবে চিন্তে এটার সমাধান করতে হবে। বাড়িতে থাকা বিড়ালকে বেশ ভাল খাবার দাবার দেয়া হয়ে থাকে। তারপরও ওরা কিন্তু ইঁদুর ধরে। ইঁদুর ধরার খেলা খেলার জন্য যথেষ্ট শক্তি ও সময়ও থাকে বিড়ালগুলোর।

খেলা?

খামিশির ঠিক বিশ্বাস হলো না।

‘সামনে এগোন তো,’ বলল ও। মারশিয়ার ভাষণ আর শুনতে চায় না।

ড, মাথা নাড়ল কিন্তু শব্দগুলো ঘুরঘুর করতে লাগল খামিশির মাথায়। কোন ধরনের প্রাণী এভাবে খুন করে থাকে স্রেফ আনন্দের জন্য? উত্তর একটাই।

মানুষ।

কিন্তু গণ্ডারের যা হাল, ওটা তো কোনো মানুষের কাজ হতে পারে না।

কিছু একটা নড়াচড়া আবার খামিশির দৃষ্টি আকর্ষণ করল। এক মুহূর্তের মধ্যে একটি ধূসর অবয়ব জঙ্গলের কিনারার পেছনে গেল। চোখের কোণা দিয়ে বিষয়টা খেয়াল করল ও। সেদিকে ভাল করে তাকাতেই দেখা গেল সাদা ধোয়ার মতো বাতাসে মিলিয়ে গেছে ওটা।

সেই জুলু বৃদ্ধের কথাগুলো মনে পড়ল ওর।

অর্ধেক পশু, অর্ধেক ভূত…

এত গরমের ভেতরেও খামিশির শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেল। গতি বাড়িয়ে দিল সে। সামনে থাকা জীববিজ্ঞানীর প্রায় বরাবর চলে এল খামিশি। আলগা ধূলো-বালু উড়ল ওর দৌড়ের চোটে। প্রায় উপরে উঠে এসেছে ওরা। জিপ আর মাত্র ত্রিশ মিটার দূরে।

হঠাৎ ভারসাম্য হারাল ড. মারশিয়া।

হাঁটুর ওপর আছড়ে পেছনে খামিশির সাথে ধাক্কা লাগল তার।

হকচকিয়ে যাওয়ায় খামিশিও নিজের ভারসাম্য হারিয়ে পেছনে আছড়ে পড়ল। ঢালের খাড়া ঢালু অংশ নিচের দিকে গড়িয়ে নিয়ে চলল ওকে। প্রায় অর্ধেক পথ এভাবে গড়িয়ে যাওয়ার পর রাইফেল বাট ও পায়ের সাহায্যে খামিশি নিজের পতনরোধ করল।

অবশ্য ড. মারশিয়া গড়াগড়ি খায়নি। সে যেখানে পড়েছিল ওখানেই আছে। উঠে বসেছে। বড় বড় চোখ করে নিচ দিকে তাকিয়ে আছে ও।

উঁহু, খামিশি নয়।

ওর দৃষ্টি জঙ্গলের দিকে।

খামিশি হাঁটুর ওপর ভর করে উঠতে যেতেই ওর গোড়ালিতে ব্যথা অনুভব করল। মচকে গেছে কিংবা ভেঙ্গে গেছে। সে-ও তাকাল কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না। তবে রাইফেল উঁচিয়ে ধরেছে।

‘যান!’ চিৎকার করল খামিশি। জিপে চাবি রেখেই এসেছে ও। ‘যান আপনি!

নরম মাটির দলা মাড়িয়ে ড. মারশিয়া উঠে দাঁড়াল।

আবার সেই চিৎকার শোনা গেল জঙ্গলের কিনারা থেকে।

কিছু না দেখেই ট্রিগার টেনে দিল খামিশি রাইফেলের শব্দে যেন এলাকা কেঁপে উঠল। চমকে উঠে ড. মারশিয়া চিৎকার করে উঠল। খামিশি আশা করল, রাইফেলের আওয়াজ ওই জানোয়ারকেও চমকে দেবে।

‘জিপে উঠে পড়ুন!’ নিচ থেকে চিৎকার করল খামিশি। ‘চলে যান! সময় নষ্ট করবেন না!’ উঠে দাঁড়াল ও। আহত গোড়ালির ওপরে ভর কম দিল। রাইফেল দিয়ে নিজের ভারসাম্য রক্ষা করছে। পুরো বন আবার সুনসান হয়ে গেছে।

ঢালের ওপরে পৌঁছে ড. মারশিয়া ডাকল, ‘খামিশি…’

‘জিপে উঠুন!

কাঁধের ওপর দিয়ে নিজের পেছনে ঝুঁকি নিয়ে তাকাল ও।

ঢাল ওঠা শেষ করে ড. ফেয়ারফিল্ড জিপের দিকে এগোচ্ছে। তার ওপরে থাকা বাওবাব গাছের ডাল খামিশির দৃষ্টি আকর্ষণ করল। গাছের কয়েকটি সাদা ফুল আস্তে করে দুলে উঠল।

অথচ এখানে কোনো বাতাস নেই।

‘মারশিয়া!’ গলা ফাটাল খামিশি। ‘না…!

খামিশির পেছনে হঠাৎ করে বুনো চিৎকার হলো। মারশিয়ার উদ্দেশে করা সতর্কবার্তা ঢাকা পড়ে গেল সেই চিৎকারের আড়ালে। তবে ড. ফেয়ারফিল্ড ঠিকই ওর দিকে এক পা বাড়িয়ে ছিল।

না…

বিশাল গাছের গভীর ছায়া থেকে ওটা লাফিয়ে নামল, অস্পষ্ট ফ্যাকাসে একটি অবয়ব। জীববিজ্ঞানীকে ধরে নিয়ে ওটা খামিশির চোখের আড়ালে চলে গেল। রক্ত হিম করা আর্তনাদ করে উঠল মারশিয়া, কিন্তু দুম করেই যেন সেটাকে থামিয়ে দেয়া হলো।

চারিদিকে আবার সুনসান নীরবতা।

জঙ্গলের দিকে তাকাল খামিশি।

ওপরেও মরণ, নিচেও মরণ।

খামিশির হাতে রাস্তা একটাই।

গোড়ালির ব্যথা উপেক্ষা করে দৌড় দিল ও।

খামিশি ঢালের নিচু অংশের দিকে নেমে যাচ্ছে।

মাধ্যাকর্ষণের ওপর নিজের শরীরের ভার তুলে নিয়ে গড়গড় করে নেমে গেল ও। তবে ব্যাপারটি এত সহজ নয়। ওকে সোজা করে রাখতে পা দুটো রীতিমতো হিমসিম খাচ্ছে। নিচে পৌঁছুতে পৌঁছুতে জঙ্গলের দিকে তাক করে দ্বিতীয় বারের মতো ওর ডাবল ব্যারেল থেকে গুলি ছুড়ল খামিশি।

বুম।

শিকার করা ওর লক্ষ্য নয়। ও স্রেফ নিজের জীবনের জন্য বাড়তি কিছু সময় জোগাড় করার চেষ্টা করছে। গুলির ফলে রাইফেলের পেছন দিকে ধাক্কা দেয়, সেই ধাক্কায় ওর বরং উপকারই হলো। না হলে হয়তো মুখ থুবড়ে পড়ত খামিশি! ওর গোড়ালিতে যেন আগুন ধরে গেছে, হৃদপিণ্ডটা লাফাচ্ছে তবুও দৌড় বন্ধ করল না।

জঙ্গলের প্রান্তে বেশ বড় কিছুর নড়াচড়া দেখল কিংবা অনুভব করল খামিশি। ফ্যাকাসে ধাচের ছায়া।

অর্ধেক জানোয়ার, অর্ধেক ভূত…

না দেখেও, সত্য জানতে ও।

উকুফা।

মৃত্যু।

আজ যেন ওটা না হয়… প্রার্থনা করল খামিশি… আজ যেন না হয়।

নল-খাগড়ার ভেতরে সেঁধে গেল ও…

… মাথা সামনে দিয়ে জলাধারে ঝাঁপ দিল।

.

সকাল ৯টা ৩২ মিনিট।
কোপেনহ্যাগেন, ডেনমার্ক।

ফিওনার চিৎকার অস্ত্রধারীর রাইফেল থেকে গুলি ছোঁড়ার কাজে একটু বাধা সৃষ্টি করল।

নিজেকে বাঁকিয়ে ফেলল গ্রে, মরণঘাতী আঘাত থেকে বাঁচার চেষ্টা আরকি। ও ঘুরতেই দোকানের ধোয়াময় জানালা ভেঙ্গে বড় একটা কিছু নামল বাইরে।

অস্ত্রধারীর চোখেও ব্যাপারটি ধরা পড়েছে তবে সেটা গ্রে দেখার আগেই। আর সেজন্য একটু হলেও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে সে।

বাঁ হাতের নিচ দিয়ে গরম বুলেট যাওয়ার তাপ অনুভব করল গ্রে।

ও একদম পয়েন্ট-ব্ল্যাংক রেঞ্জে ছিল, এরকম বিপজ্জনক অবস্থান থেকে নিজেকে বাঁচাতে আরও পাক খেল ও।

জানালা থেকে লাফ দেয়া অবয়বটি অবতরণ করল ডাস্টবিনের ওপর। সেখান থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ল অস্ত্রধারীর দিকে।

‘বারটেল!’ চিৎকার করল ফিওনা।

বুড়ো কুকুরটির চামড়া ভিজে গেছে। দাঁত দিয়ে অস্ত্রধারীর হাতের নিচের অংশ কামড়ে ধরেছে ও। এরকম আচমকা আক্রমণে লোকটি হকচকিয়ে গেল। ডাস্টবিনের পাশে তৈরি হওয়া ছায়ায় আছড়ে পড়ল সে। পাথুরে ফুটপাতে ঠকাস শব্দে তার রাইফেল পড়ে গেল।

অস্ত্রটি বাগানোর জন্য সামনে ঝুঁকল গ্রে।

একদম কাছেই কুকুর গোঙানির আওয়াজ হলো। গ্রে কিছু বুঝে ওঠার আগেই অনেক উঁচুতে লাফিয়ে উঠল আক্রমণকারী। গ্রে’র কাঁধে বুটের তলা দিয়ে লাথি মেরে একেবারে রাস্তায় ফেলে দিল। পালাল সে।

হাতে রাইফেল তুলে নিয়ে পলায়নরত লোকটির দিকে লক্ষ্য স্থির করল গ্রে। কিন্তু আক্রমণকারী হরিণের মতো দ্রুত গতিতে দৌড়ে একটি বাগানের বেড়া ডিঙিয়ে পগার পার হয়ে গেল। তার পরনে ছিল একটি কালো ট্রেঞ্চ কোট, দৌড়ানোর সময় উড়ছিল ওটা। গলি ধরে পালিয়ে যাওয়ার শব্দ শুনতে পেল গ্রে।

‘হারামজাদা…’

গ্রে’র দিকে ফিওনা দৌড়ে এলো। ওর হাতে একটি পিস্তল। অন্য লোকটি…’ নিজের পেছন দিক নির্দেশ করল ও। আমার মনে হয় সে মরে গেছে।

রাইফেল কাঁধে ঝুলিয়ে ফিওনার হাত থেকে পিস্তল নিল গ্রে। মেয়েটি কোনো আপত্তি করল না। ওর মনোযোগ অন্যদিকে।

‘বারটেল…’।

বেরিয়ে এলো কুকুরটি, খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাঁটছে, বেশ দুর্বল, একপাশ আগুনের তাপে ঝলসে গেছে ওর।

পুড়তে থাকা দোকানের দিকে তাকাল গ্রে। এই কুকুর ওখান থেকে বেঁচে বেরোল কীভাবে? সর্বশেষ কুকুরটিকে কী অবস্থায় দেখেছিল গ্রে সেটা মনে করার চেষ্টা করল : বিস্ফোরণের ধাক্কায় পেছনের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল বারটেল।

ফিওনা আহত ভেজা কুকুরটিকে জড়িয়ে ধরল।

কুকুরটি নিশ্চয়ই কোনো অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের নিচে পড়েছিল। তাই ভিজে গেছে।

কুকুরটির মুখ ধরে মুখোমুখি হলো ফিওনা। ‘লক্ষ্মী।

গ্রে-ও একমত হলো। ও বারটেলের কাছে ঋণী। যা খেতে চাও পাবে, বন্ধু, খুশি হয়ে বলল ও।

বারটেলের শরীর কাঁপতে লাগল। টলে পড়ল পাথুরে ফুটপাতের ওপর। শক্তি যা একটু বাকি ছিল সেটাও ফুরিয়ে গেছে বেচারার।

ওদের বাঁ দিক থেকে ড্যানিশ ভাষায় গলা ফাটানো আওয়াজ এলো। দ্রুতগতির পানির ফোয়ারা ছুটল ওপর দিকে। ফায়ার সার্ভিসের লোকজন দোকানের অন্যপাশের আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে দিয়েছে।

গ্রে আর এখানে থাকতে পারবে না।

‘আমাকে যেতে হবে।’

ফিওনা উঠে দাঁড়াল। একবার গ্রে আরেকবার কুকুরের দিকে তাকাল ও।

‘তুমি বারটেলের সাথে থাকো,’ এক কদম পিছিয়ে গিয়ে গ্রে বলল।‘ ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাও।

চোখ-মুখ শক্ত করে তাকাল ফিওনা। ‘তুমি চলে যাচ্ছ…’

‘আমি দুঃখিত।’ একটু আগে যেসব ভয়ঙ্কর কাণ্ড ঘটে গেছে সেগুলোর পর এরকম “দুঃখিত” বলা কেমন যেন খেলো শোনায়। ফিওনার নানুর খুন হয়ে যাওয়া, দোকান পুড়ে যাওয়া, কোনমতে জীবন বাঁচানো। কিন্তু “দুঃখিত” ছাড়া আর কী বলবে গ্রে সেটা খুঁজে পেল না। এছাড়া বিস্তারিত ব্যাখ্যা করার মতো সময়ও নেই ওর।

পেছনে থাকা বাগানের বেড়ার দিকে এগোল গ্রে।

‘হ্যাঁ, যাও, যাও, ভাগো!’ ফিওনা চিৎকার করল।

বেড়া ডিঙালো গ্রে। ওর মুখমণ্ডল জ্বালা করছে।

‘দাঁড়াও!’

গ্ৰে দাঁড়াল না। দ্রুত সরু গলিতে নেমে গেল। ফিওনাকে ওভাবে রেখে আসতে ওর ভাল লাগছিল না… কিন্তু আর কোনো উপায় নেই। ওকে একা রেখে আসাই ভাল হয়েছে। ওখানে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের লোকদের সাথে ও নিরাপদে থাকবে, আশ্রয় পাবে। গ্রে এখন যে জায়গায় যাচ্ছে ওখানে ১৫ বছর বয়সি মেয়ের কোনো স্থান নেই। এখনও গ্রের মুখ জ্বালাপোড়া করছে। যতই অজুহাত দিক না কেন, মনের গভীরে স্বার্থপরতার আঁচ পাচ্ছে ও। মেয়েটিকে একা রেখে আসতে পেরে ভার মুক্ত হয়েছে। বেঁচে গেছে দায়িত্ব নেয়া থেকে।

যা-ই হোক… যা হওয়ার হয়েছে।

সরু গলি দিয়ে দ্রুত এগোল ও। কোমরে পিস্তল গুঁজে রাইফেল থেকে সব গুলি বের করে ফেলল। তারপর রাইফেলটিকে একটা করাতকলের পেছনে ফেলে দিল গ্রে। এই অস্ত্র সাথে রাখা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। এগোতে এগোতে সোয়েটার খুলে নিল ও। হোটেল ছেড়ে দিয়ে নিজের পরিচয় বদলে ফেলতে হবে। এখানে ঘটে যাওয়া খুনোখুনির তদন্ত হবে সেটা বলাই বাহুল্য। “ড. সয়্যার”-এর জীবনের এখানে সমাপ্তি।

তবে তার আগে আরও একটি কাজ করতে হবে।

পেছনের পকেট থেকে সেল ফোন বের করে সেন্ট্রাল কমান্ডে ডায়াল করল গ্রে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে লাইনে পেল লোগান গ্রেগরিকে। গ্রেগরি ওর এই মিশনের নেতৃত্ব দিচ্ছে।

‘সমস্যা হয়েছে।’ বলল গ্রে।

‘কী সমস্যা?

‘আমরা যা ভেবেছিলাম তারচেয়েও অনেক বড় কিছু হতে যাচ্ছে। খুনোখুনি হওয়ার মতো বড়। সকালের ঘটনাটুকু বর্ণনা করল গ্রে।

লম্বা নীরবতা।

অবশেষে মুখ খুললেন লোগান। তার কণ্ঠে উদ্বেগ। ‘তাহলে মাঠপর্যায়ে আরও তথ্য ও জনবল না পাওয়া পর্যন্ত এই মিশন আপাতত স্থগিত রাখা হোক। সেটাই ভাল হবে।’

‘ব্যাকআপের জন্য অপেক্ষা করলে অনেক দেরি হয়ে যাবে। নিলাম শুরু হয়ে যাবে আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে।

‘তোমার কভার ভেস্তে গেছে, ছদ্মবেশ ফাঁস হয়ে গেছে, কমান্ডার পিয়ার্স।

‘কভার ভেস্তে গেছে কি-না সে-ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। এখানে আমি একজন আমেরিকান ক্রেতা, অনেক প্রশ্ন করে বেড়াচ্ছি, এই তো। ওরা এসব নিয়ে ঘাটবে বলে মনে হয় না। নিলাম অনুষ্ঠানে অনেক লোকজন আসবে, কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা আছে ওখানে। তবে আমি এখন হয়তো ওই জায়গাটুকু ভাল করে ঘুরে দেখে কে বা কারা এত বড় ঘটনা ঘটাচ্ছে সে-সম্পর্কে কোনো সূত্র পেয়ে যেতে পারি। তারপর নাহয় ব্যাকআপ আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করব।’

অন্যান্যের মতো গ্রে’র নিজেরও ওই বাইবেলটিকে হাতে নেয়ার অনেক ইচ্ছে আছে। অবশ্য শুধু পরীক্ষা করার জন্য, অন্য কিছু নয়।

‘আমার মনে হয়, ওতে খুব একটা ভাল হবে। সম্ভাব্য অর্জনের চেয়ে সম্ভাব্য ঝুঁকি বেশি হয়ে যায়। বিশেষ করে এরকম একা একা মিশনে থাকার ব্যাপারটা।’ বললেন লোগান।

উত্তেজিত হয়ে গেল গ্রে। ‘এই হারামজাদারা আমাকে এভাবে হেনস্থা করল… আর আপনি বলছেন আমি যাতে চুপ করে বসে থাকি?

‘কমান্ডার।

গ্রে’র আঙুলগুলো ফোনের গায়ে শক্ত করে চেপে বসল। সিগমায় কাগজপত্র চালাচালির কাজ অনেকদিন ধরে করে আসছেন লোগান। যে-কোনো রিসার্চ মিশনের জন্য লোগান একজন ভাল লিডার… কিন্তু এরকম একটি ঘটনা সংক্রান্ত মিশনে ততটা নয়। সিগমা ফোর্সের অপারেশন শাখার মান-সম্মানের প্রশ্ন এখানে। প্রয়োজন হলে গ্রে এই লোগানের চেয়েও যোগ্য লোকের নেতৃত্ব চাইবে।

‘আমাদের হয়তো ডিরেক্টর ক্রো’কে বিষয়টা জানানো উচিত। বলেই ফেলল গ্রে।

আবার নীরবতা। সম্ভবত কথাটা বলা ঠিক হয়নি। উপরন্তরের লোকের সাথে যোগাযোগ করতে চেয়ে ও কিন্তু আসলে লোগানকে অপমান করতে চায়নি। কিন্তু মাঝে মাঝে পরিস্থিতি এরকম আচরণ করতে বাধ্য করে।

‘এমুহূর্তে সেটা অসম্ভব বলে মনে করি, কমান্ডার পিয়ার্স।

‘কেন?

‘ডিরেক্টর ক্রো এখন নেপালে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আছেন।

ভ্রু কুঁচকালো গ্রে। ‘নেপালে? তিনি নেপালে কী করছেন?

‘কমান্ডার, তাঁকে তুমিই পাঠিয়েছ।

‘কী?

গ্রে এবার বুঝতে পারল।

এক পুরোনো বন্ধুর কাছ থেকে ফোন এসেছিল সপ্তাহখানেক আগে।

অতীতে ডুব দিল গ্রে। সিগমা ফোর্সে ওর প্রথম দিকের দিনগুলোর কথা মনে পড়ল। অন্য সিগমা এজেন্টের মতো গ্রে’রও স্পেশাল ফোর্স ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল। ১৮ বছর বয়সে আর্মিতে যোগ দেয়া, ২১ বছরে কমান্ডো হওয়া। কিন্তু ঊর্ধ্বতন অফিসারের সাথে গণ্ডগোল করায় কোর্ট-মার্শাল হয়েছিল ওর। তারপর ওখান থেকে সিগমা ফোর্সে যোগ দেয়। তবে এখনও আড় চোখে দেখা হয় ওকে। কিন্তু সেই অফিসারকে আঘাত করার পেছনে উপযুক্ত কারণ ছিল। অফিসারের অযোগ্যতার ফলে সে-বার বসনিয়ায় অযথা অনেক লোকের মৃত্যু হয়েছিল, অনেক শিশু মারা পড়েছিল। তবে গ্রে’র রাগের কারণ ছিল আরও গভীরে। যা-ই হোক, কর্তৃপক্ষের সাথে এই বিষয় নিয়ে সমস্যা হওয়ায় বাবার কাছে ফিরে গিয়েছিল গ্রে। অনেকদিন হয়ে যাওয়ার পরও যখন সমস্যার সমাধান হলো না যখন এক জ্ঞানী ব্যক্তি গ্রে’কে পথ বাতলে দিয়েছিলেন।

সেই ব্যক্তির নাম আং গেলু।

‘আপনি বলতে চাচ্ছেন, আমার বন্ধু বুদ্ধ সন্ন্যাসীর জন্য ডিরেক্টর ক্রো নেপালে গিয়েছেন?”

‘পেইন্টার ক্রো জানতেন বুদ্ধ সন্ন্যাসী তোমার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।’

হাঁটা বন্ধ করে ছায়ায় দাঁড়াল গ্রে।

সিগমার ট্রেইনিঙের পাশাপাশি আং গেলুর সাথে নেপালে চার মাস দীক্ষা নিয়েছিল ও। আং গেলুর মাধ্যমেই গ্রে ওর নিজের পড়ার জন্য দারুণ এক সিলেবাস তৈরি করে নিয়েছিল। জীবজিজ্ঞান ও পদার্থবিদ্যা, দুটো ডিগ্রি একসাথে নিয়েছিল গ্রে। ওকে মানসিক দীক্ষা দিয়েছিলেন আং গেলু। সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য খোঁজা শিখিয়ে ছিলেন তিনি। বিপরীত দুটো জিনিসের মধ্যকার মিল, দ্য Taoist yin অ্যান্ড yang, শূন্য ও এক ইত্যাদি।

এধরনের অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন জ্ঞান গ্রে’র অতীতকে মোকাবেলা করার জন্য সাহায্য করেছিল।

বয়স বাড়তে বাড়তে গ্ৰে বুঝতে পারল সে সবসময় বিপরীত জিনিসের মধ্যে আটকে যাচ্ছে। ওর মা এক ক্যাথলিক স্কুলে পড়াতেন। সেখান থেকে গ্রে’র জীবনে ধীরে ধীরে আধ্যাত্মিক বিশ্বাস গভীরভাবে শেকড় গেড়েছিল। জীববিজ্ঞানেও দখল ছিল ওর মা’র। ধর্মপ্রাণ মহিলা ছিলেন তিনি। বিবর্তনবাদও মানতেন। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিকে তিনি যতটা মন থেকে বিশ্বাস করতে ভক্তি করতেন, ধর্মকেও সেরকম ভক্তি করতেন।

অন্যদিকে গ্রে’র বাবা থাকতেন টেক্সাসে। পেশায় তেলকর্মী, স্বভাবে ঘাড় ত্যাড়া। মাঝ বয়সে এসে অচল হয়ে পড়েন তিনি। যার ফলে গৃহিণীর মতো ঘরে থাকতে হলো তাকে। আর এরকম একজন পুরুষ হয়ে ঘরে থাকতে গিয়ে তার মেজাজ খিটখিটে হয়ে গেল।

যেমন বাবা, তেমন ছেলে।

তবে ছেলে বদলে যায় আং গেলুর সংস্পর্শে আসার পর।

দুই বিপরীতের মধ্যে থাকা একটি পথ বাতলে দিয়েছিলেন তিনি। এ পথ ঘোট নয়। অতীত ও ভবিষ্যৎ দুদিকের মতো এই পথও বিশাল। গ্রে এখনও এই পথ বুঝে ওঠার জন্য সংগ্রাম করছে।

তবে আং গেলু গ্রে’কে এই পথে চলার জন্য প্রথম কয়েকটি পদক্ষেপ রাখতে সাহায্য করেছিলেন। এজন্য বুদ্ধ সন্ন্যাসীর কাছেও ঋণী। তাই এক সপ্তাহ আগে যখন ওর কাছে সাহায্য চেয়ে একটি ফোন এলো তখন সেটাকে অবজ্ঞা করতে পারল না গ্রে। আং গেলু জানিয়ে ছিলেন, চীন সীমান্তের কাছে অদ্ভুতভাবে মানুষ গায়েব হচ্ছে, অচেনা রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।

এই ব্যাপারগুলো কাকে জানালে ভাল হবে সেটা বুঝে উঠতে পারছিলেন না আং গেলু। তাঁর দেশের সরকার মাওবাদী বিদ্রোহীদের নিয়ে বেশি ব্যস্ত। আং গেলু জানতেন গ্রে একটি গোপন সংস্থার অপারেশন ডিপার্টমেন্টে কাজ করে। তাই ওর কাছেই সাহায্য চেয়ে ছিলেন। কিন্তু গ্রে বর্তমান মিশনে আগে থেকেই ব্যস্ত থাকায় আং গেলুর ডাকে সাড়া দিয়ে নেপালে আসা সম্ভব ছিল না। তাই ব্যাপারটা তখন পেইন্টার ক্রো’কে জানিয়েছিল ও।

ফাইল চালাচালির মতো হয়ে গিয়েছিল ব্যাপারটা…।

‘পেইন্টার ক্রো’কে জানিয়েছিলাম যাতে উনি একজন জুনিয়র এজেন্টকে পাঠিয়ে দেন,’ আমতা আমতা করল গ্রে। ‘নেপালে আসলে কী হচ্ছে সেটা…’

লোগান বাধা দিলেন। এখানে স্লো ছিল।

একটু গুঙিয়ে উঠল গ্রে। লোগানের সাংকেতিক ভাষা ও বুঝতে পেরেছে। গ্রে যেরকম বিশ্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে এরকম কিছুর পেছনে লেগে ডেনমার্কে চলে এসেছে তেমনি অন্য এজেন্টরাও বিভিন্ন জায়গায় ব্যস্ত আছে।

‘তাই বলে ক্রো নিজেই চলে গেলেন।

‘তুমি তো ডিরেক্টরকে চেনোই। হাতেনাতে কাজ করার জন্য মুখিয়ে থাকেন তিনি’। রেগে দীর্ঘশ্বাস ফেলল লোগান। ‘এখন সমস্যা হয়ে গেছে। ঝড়ের কারণে গত কয়েকদিন যাবত তার সাথে আমাদের যোগাযোগ বন্ধ। তখন থেকে এখন পর্যন্ত ডিরেক্টরের কাছ থেকে একটি আপডেটও পাইনি আমরা। তবে আমরা বিভিন্ন উৎস থেকে গুজব শুনতে পেরেছি। তোমার সন্ন্যাসী বন্ধুটির বলা কাহিনির সাথে মিল আছে ওগুলোর। অসুস্থতা, প্লেগ, মৃত্যু, বিদ্রোহীদের সম্ভাব্য হামলা ইত্যাদি। গুজব বেড়েই যাচ্ছে।’

লোগানের কণ্ঠের থমথমে ভাবটা কেন ছিল সেটা এবার বুঝতে পারল গ্রে।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, শুধু গ্রে’র মিশনই ভজকট হয়নি, অন্য মিশনও বেগতিক অবস্থায় পড়েছে।

বিপদ যখন আসে, সবদিক থেকেই আসে।

আমি তোমার কাছে মনককে পাঠাতে পারি,’ বললেন লোগান। সে আর ক্যাপ্টেন ব্রায়ান্ট রওনা হয়ে গেছে। আগামী ১০ ঘণ্টার মধ্যে মনক মাঠে নামবে। ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি শান্ত থাকো।

‘কিন্তু নিলাম তো শেষ হয়ে যাবে…’।

‘কমান্ডার পিয়ার্স, তোমাকে যা অর্ডার দেয়ার দেয়া হয়ে গেছে।

দ্রুত বলতে শুরু করল গ্রে, ওর কণ্ঠস্বর কঠিন, রূঢ়। “স্যার, আমি ইতোমধ্যে প্রবেশ-বাইর হওয়ার পথে ঘোট বোতাম ক্যামেরা বসিয়ে দিয়ে এসেছি। এখন যদি সরে যাই তাহলে ওগুলোকে অপচয় করা হবে।’

‘ঠিক আছে। নিরাপদ স্থান থেকে ক্যামেরা পর্যবেক্ষণ করো। রেকর্ড করো সবকিছু। কিন্তু এর বেশি কিছু নয়। বোঝা গেছে, কমান্ডার?

রাগ হচ্ছে গ্রে’র, কিন্তু লোগানের আর কিছু করার নেই। ভেরি গুড, স্যার। সৌজন্যবশত বলল ও।

‘নিলামের শেষে রিপোর্ট করবে।’ লোগান বললেন।

“জ্বী, স্যার।

সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।

কোপেনহ্যাগেনের রাস্তা ধরে আবার এগোতে শুরু করল গ্রে। চারিদিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখেছে। কিন্তু ওর মনে দুশ্চিন্তা খচ খচ করছে।

পেইন্টারের জন্য, আং গেলুর জন্য…

নেপালে হচ্ছেটা কী?

০৪. গোস্ট লাইটস্

০৪. গোস্ট লাইটস্

সকাল ১১টা ১৮ মিনিট।
হিমালয়।

‘তুমি নিশ্চিত আং গেলুকে খুন করা হয়েছে? উনি মারা গেছেন?’ পেছনে তাকিয়ে প্রশ্ন করল পেইন্টার।

ইতিবাচক মাথা নেড়ে জবাব দিল একজন।

লিসা কামিংস পুরো ঘটনা বলে শেষ করেছে। এভারেস্টে চড়ার একটি দল থেকে কী করে এই মঠের অসুস্থতা তদন্ত করতে এলো সব জানিয়েছে ও। কয়েকটি ভয়ঙ্কর বিষয়ের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে পেল লিসা। পাগলামো, বিস্ফোরণ, স্নাইপার।

মঠের ভূগর্ভস্থ সেলারে গোটা দুই গুতো খাওয়া মাথায় লিসার পুরো গল্প চিন্তা করে দেখল পেইন্টার। তবে এখানকার এই পাথুরে সরু গোলকধাঁধার মতো জায়গাটুকু ওর মতো উচ্চতাসম্পন্ন ব্যক্তির জন্য নয়। ওকে মাথা নিচু করে থাকতে হচ্ছে। তারপরও ওর মাথা ছুঁয়ে দিচ্ছে জুনিপারের ডালপালা। এই সুগন্ধময় ডালগুলোকে উপরের মন্দিরে বিভিন্ন বিশেষ দিনে পোড়ানোর জন্য ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তবে সেই মন্দির নিজেই এখন পুড়ছে, জ্বলে-পুড়ে আকাশের বুকে ধোয়া পাঠাচ্ছে।

নিরস্ত্র অবস্থায় আগুনের হাত থেকে বাঁচতে পালিয়ে এসে এই সেলারে আশ্রয় নিয়েছে ওরা। মাঝে একবার প্রথমে পোশাকের রুম থেকে গায়ে পরার জন্য একটি পনচো আর পায়ের জন্য একজোড়া লোমশ বুট নিয়েছে পেইন্টার। ওই পোশাকে ওকে পেকুয়োট ইন্ডিয়ানদের মতো দেখাচ্ছে। যদিও ওর শরীরে ভিন্ন দুটি জাতির রক্ত বইছে। যা-ই হোক, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো–ওর নিজের কাপড়-চোপড় কিংবা ব্যাকপ্যাক কোথায় আছে সেটা মনে করতে পারছে না।

তিন তিনটে দিন ওর জীবন থেকে গায়েব হয়ে গেছে।

সেই সাথে ওর শরীর থেকে খোয়া গেছে দশ কেজি ওজন।

একটু আগে গায়ে পনচো (আলখাল্লা) পরার সময় নিজের পাজরের অবনতি লক্ষ করেছে ও। এমনকী ওর কাধও চিকন হয়ে গেছে। এখানকার অসুখ থেকে ও রক্ষা পায়নি ঠিকই তবে ধীরে ধীরে শক্তি ফিরে পাচ্ছে, উন্নতির লক্ষণ।

এটার প্রয়োজন ছিল।

বিশেষ করে বাইরে যখন আততায়ী ঘুরে বেড়ায় তখন তো শক্তির প্রয়োজন পড়তেই পারে।

নিচে পালিয়ে আসার সময় থেমে থেমে বন্দুকের আওয়াজ হতে শুনেছে পেইন্টার। আগুন লাগা মঠ থেকে যে-ই বের হচ্ছিল না কেন তাকে মেরে ফেলেছে স্নাইপার। আক্রমণকারী সম্পর্কে বর্ণনা দিল ড. কামিংস। আক্রমণকারী একজনই। তবে তার সাথে নিশ্চয়ই আরও লোক আছে। ওরা কি মাওবাদী বিদ্রোহী? কিন্তু তাতে তো কিছুই মিলছে না। তারা এই হত্যাযজ্ঞ করে কী ফায়দা পাবে?

হাতে পেলাইট নিয়ে পথ দেখাল পেইন্টার।

ওর কাছাকাছি থেকে ড. কামিংসও পিছু পিছু এগোলো।

পেইন্টার জেনেছে লিসা আমেরিকান ডাক্তার এবং একটি পর্বতারোহণ দলের সদস্য। লিসার দিকে মাঝে মাঝে তাকিয়ে বুঝে নেয়ার চেষ্টা করছে ক্রো, মেপে নিচ্ছে। লম্বা লম্বা পা, অ্যাথলেটিক শরীর, পেছনে ঝুঁটি করে রাখা চুল, বাতাসের তোপে গোলাপি হয়ে যাওয়া গাল ইত্যাদি। তবে লিসা বেশ ভয় পেয়েছে। ক্রো’র কাছে কাছে থাকছে। উপর থেকে হঠাৎ হঠাৎ মটমট আওয়াজ আর আগুনের চিড়বিড় শব্দে লাফিয়ে উঠছে। তবে হ্যাঁ, যত যা-ই হোক এখনও একবারের জন্যও থামেনি বেচারি। কাঁদেনি, অভিযোগ করেনি। মনের জোর কাজে লাগিয়ে আতঙ্কের কাছে হার স্বীকার করছে না সে।

কিন্তু এভাবে কতক্ষণ?

মুখের ওপর থেকে ঘাস সরাতে গিয়ে দেখা গেল ওর আঙুলগুলো কাঁপছে। সামনে এগোচ্ছে ওরা দুজন। সেলারের গভীরে যেতেই ভেতরের বাতাস বিভিন্ন সুগন্ধী ভাল পালার গন্ধে ভারি হয়ে উঠল। রোজমেরি, আর্টেমিসিয়া, পাহাড়ি পুষ্প, খেনপা ইত্যাদি। এগুলোর সবকটা ধূপ কাঠি হিসেবে ব্যবহার করার জন্য একদম প্রস্তুত।

মঠের প্রধান, লামা খেসমার পেইন্টারকে ১০০ টি ঔষধি বিদ্যা শিখিয়েছিলেন। পরিশুদ্ধিকরণ থেকে শুরু করে স্বর্গীয় শক্তি লাভ, মনোযোগ ধরে রাখা, হাঁপানি ও সাধারণ সর্দি-ঠাণ্ডাজনিত সমস্যার সমাধান ছিল সেই বিদ্যায়। কিন্তু এখন ওই বিদ্যার কোনো দরকার নেই। পেইন্টার এই মুহূর্তে সেলারের পেছনের দরজায় যাওয়া সম্ভব সেটা মনে করার চেষ্টা করছে। সবকটা মঠের সাথে সংযোগ স্থাপন করেছে এই সেলার। শীতকালে যখন ভারি তুষারপাত হয় তখন সন্ন্যাসিগণ এই সেলার ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে যাতায়াত করতেন।

এছাড়াও এই সেলার ব্যবহার করে গোলাবাড়ি ও মাঠের প্রান্তদেশে পৌঁছুনো যায়। আগুনের আক্রমণ কিংবা কারও সরাসরি দেখে ফেলার ভয় নেই এদিকে।

যদি ওরা পৌঁছে যেতে পারে… তারপর ওখান থেকে নিচের গ্রামে গেলেই…

ক্রো’র সিগমা কমান্ডে যোগাযোগ করা দরকার।

সম্ভাবনায় ওর মন দুলে উঠল। সেইসাথে সেলারের রাস্তাও দুলে উঠল।

সেলারের দেয়ালে এক হাত ঠেস দিয়ে দাঁড়াল পেইন্টার, নিজেকে সামলে নিচ্ছে।

মাথা ঘোরাচ্ছে ওর।

‘তুমি ঠিক আছে তো?’ পেইন্টারের কাঁধের কাছে এগিয়ে গিয়ে লিসা জানতে চাইল। মাথা নাড়ার আগে কয়েকবার শ্বাস নিল ক্রো। জেগে ওঠার পর থেকেই আশেপাশের পরিস্থিতি ওকে শান্তি দেয়নি। যদিও খারাপ ঘটনাগুলো একটু বিরতি দিয়ে দিয়ে ঘটেছে… নাকি ভুল হলো?

‘আচ্ছা, উপরে আসলে কী হয়েছে? জানতে চাইল লিসা। ক্রো’র কাছ থেকে ও পেনলাইট নিয়ে নিল। আসলে এই পেনলাইটটি লিসার। ওর মেডিক্যাল কিটে ছিল। লাইট নিয়ে ক্রো’র চোখে ধরল লিসা।

‘আমি জানি… নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারব না… তবে আমাদের এগোতে হবে। থামলে চলবে না।

দেয়ালে ভর দিয়ে সরে আসার চেষ্টা করল ক্রো কিন্তু লিসা ওর বুকে একটি হাত রেখে থামিয়ে দিল। ক্রো’র চোখ পরীক্ষা করছে। prominent nystasmus দেখা যাচ্ছে।

‘কী?’

ঠাণ্ডার পানির বোতল ওর দিকে এগিয়ে দিয়ে ইশারায় নিচে থাকা খড়ের ওপর বসতে বলল লিসা। ক্রো কোনো আপত্তি করল না। খড় একদম সিমেন্টের মতো শক্ত হয়ে রয়েছে।

‘তোমার চোখে অনুভূমিক nystagmus এর লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। কেমন যেন টান পড়েছে চোখের মণিতে। মাথায় আঘাত পেয়েছিলে নাকি?”

“না মনে হয়। সিরিয়াস কিছু হয়েছে?

‘বলা কঠিন। তবে এটা তোমার চোখ কিংবা মস্তিষ্কের কোনো ক্ষতির ফলও হতে পারে। মাথায় একটা বাড়ি লাগা, কিংবা একাধিক শক্ত আঘাত থেকে এরকমটা হতে পারে। তোমাকে দেখে মনে হলো তোমার মাথা ঘোরাচ্ছিল, সে হিসেবে বলতে হয়, তোমার শরীরের ওপর দিয়ে বেশ ধকল গিয়েছে হয়তো। ক্ষতি হয়েছে কোথাও। হতে পারে কানের ভেতরের অংশে কিংবা নার্ভাস সিস্টেমে। তবে যা-ই হোক, খুব সম্ভবত সেটা স্থায়ী হবে না।’ শেষের শব্দগুলো কেমন যেন বিড়বিড় করে উচ্চারিত হলো।

‘খুব সম্ভব বলে তুমি কী বুঝাতে চাইছ, ডক্টর কামিংস?

‘আমাকে লিসা বলে ডাকো।’ বলল ও। ‘প্রসঙ্গ পরির্বতনের চেষ্টা।

‘ঠিক আছে। লিসা। তাহলে ওগুলো কী স্থায়ী হতে পারে?

অন্যদিকে তাকাল লিসা। ‘আরও কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। আগের ইতিহাস জানতে হবে। বলল ও। তোমার এসব কী করে হলো, বলো। এগুলো দিয়েই শুরু করা যাক।

বোতল থেকে পানি খেল ক্রো। সবকিছু মনে করতে গিয়ে ওর চোখের পেছনে কেমন একটা ব্যথা অনুভূত হলো। শেষ দিনগুলো ঝাপসা লাগছে।

‘এক প্রত্যন্ত গ্রামে ছিলাম আমি। মাঝ রাতে পাহাড়ের উপরে অদ্ভুত আলোর উদয় হয়েছিল। তবে আমি ওগুলো দেখিনি। ঘুম থেকে জেগে দেখি ওগুলো নেই। কিন্তু সকালে উঠে গ্রামের সবাই বলল, ওদের নাকি মাথাব্যথা হচ্ছে, বিতৃষ্ণা লাগছে। আমারও একই রকম লাগছিল। একজন বয়স্ক মানুষকে সেই আলোর কথা জিজ্ঞেস করলাম। সে বলল, এই আলো নাকি মাঝে মধ্যেই দেখা যায়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ওরা এটা দেখে আসছে। গোস্ট লাইট, ভূতুড়ে আলো। ওই আলো নাকি পাহাড়ের গভীরে থাকা খারাপ আত্মাদের প্রতীক।

খারাপ আত্মা?”

‘আলোগুলো যেখানে দেখা যায় ওদিকে নির্দেশ করে দেখিয়েছিল সে। পাহাড়ের এক দূবর্তী অঞ্চল ছিল ওটা। গভীর গিরি সঙ্কট, বরফ ঝরণা বিস্তৃত হয়ে চলে গেছে চীনের সীমান্ত পর্যন্ত। দুর্গম পথ। এই মঠের অবস্থান সেই জনমানব শূন্য অঞ্চলের কাছেই।

‘তার মানে এই মঠ সেই আলোগুলোর বেশ কাছে ছিল?

মাথা নাড়ল পেইন্টার। ‘২৪ ঘণ্টার মধ্যে সব ভেড়া মারা গেছে। কতগুলো যেখানে দাঁড়িয়েছিল ঠিক ওখানেই দুম করে মরে গেছে। আর বাকিরা ওদের মাথা ইকেছে পাথরের সাথে। নিজের ইচ্ছায় বারবার মাথা ঠুকেছে। পরদিন আমি এখানে আসি। লামা খেমসার আমাকে চা খেতে দিয়েছিলেন। আমার এই পর্যন্তই মনে আছে। আর কিছু মনে নেই।’

‘তোমার কপাল ভাল, বোতল ফিরিয়ে নিতে নিতে বলল লিসা।

‘কীভাবে?

দুহাত শক্ত করে আড়াআড়িভাবে রাখল লিসা। মঠ থেকে দূরে ছিলে সেজন্য। আলোর কাছে থাকার ফলে বিভিন্ন প্রাণীদের এখানে এরকম হাল হয়েছিল। উপরের দিকে চোখ মেলল ও, যেন দেয়াল ভেদ করে উপরের দৃশ্য দেখতে চাইছে। এটা হয়তো কোনো ধরনের রেডিয়েশন। তুমি বলেছিলে না, চীনের সীমান্ত বেশ কাছেই? হয়তো এটা কোনো নিউক্লিয়ার পরীক্ষণ।

পেইন্টারও ক’দিন ঠিক একই জিনিস ভেবেছিল।

তুমি মাথা ঝাঁকাচ্ছ কেন? প্রশ্ন করল লিসা।

পেইন্টার নিজেও জানে ওর মাথা ঝাঁকাচ্ছে। নিজের কপালে হাত রাখল ও।

লিসা ক্রু কুঁচকিয়ে বলল, মিস্টার ক্রো, তুমি এখানে ঠিক কী করছিলে সেটা কিন্তু এখনও বলেনি।

পেইন্টার বলে ডাকলেই হবে। লিসাকে বাকা হাসি উপহার দিয়ে বলল ও।

অবশ্য লিসা ওতে মুগ্ধ হয়নি কিংবা পটেও যায়নি।

কতখানি বলবে, কী বলবে সেটা নিয়ে দ্বিধায় ভুগল পেইন্টার। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সতোর পথ অবলম্বন করাই ভাল। অন্তত যতটুকু সৎ ও হতে পারে আরকি।

সরকারি চাকরি করি। DARPA নামের বিভাগে…।

আঙুল নাড়িয়ে ওকে থামিয়ে দিল লিসা। DARPA সম্পর্কে আমার ধারণা আছে। আমেরিকার মিলিটারি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট ডিভিশন। একবার তাদের সাথে রিসার্চে অংশ নিয়েছিলাম। তো এখানে তাদের কী কাজ?

বেশ। আং গেলু শুধু তোমাকেই ডেকে আনেননি, এক সপ্তাহ আগে তিনি আমাদের প্রতিষ্ঠানে যোগাযোগ করেছিলেন। এখানকার অদ্ভুত অসুখের ব্যাপারে তদন্ত করার জন্য। আমি মাত্রই পরিকল্পনা করছিলাম, এখানে কোন কোন বিশেষজ্ঞদের লাগতে পারে… ডাক্তার, ভূতাত্ত্বিক, মিলিটারি… কিন্তু ঝড় চলে এলো। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে এতদিন থাকতে হবে, এটা আমার ধারণা ছিল না।

কিছু বুঝে উঠতে পেরেছ?

প্রাথমিকভাবে যা বুঝলাম, মাওবাদী বিদ্রোহীরা হয়তো কোনো নিউক্লিয়ার বর্জ্যের নাগাল পেয়েছে। হয়তো কোনো বোমা বানানোর চেষ্টা করছে ওরা। চীনের সীমান্ত কাছে থাকলে এরকম ধারণা তো করাই যায়। তাই ঝড়ের সময়টুকুতে আমি বিভিন্ন রেডিয়েশন পরীক্ষা করে দেখেছি। অস্বাভাবিক কিছু পাইনি।

পেইন্টারের দিকে অদ্ভুতভাবে তাকাল লিসা। যেন ও একটা গুবরে পোকা।

তোমাকে যদি ল্যাবে নিয়ে যাওয়া যায়, স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল ও, তাহলে হয়তো কিছু উত্তর পাওয়া যাবে।

গুবরে পোকা নয়, লিসা ওকে গিনি পিগ হিসেবে দেখছিল!

যাক, বিবর্তন প্রক্রিয়ার একটু উপরের স্তরের প্রাণী হিসেবে ভাবছে।

আগে আমাদেরকে বাঁচতে হবে। লিসাকে বাস্তবতা মনে করিয়ে দিয়ে বলল ক্রো।

লিসা সেলারের সিলিঙের দিকে তাকাল। সর্বশেষ গুলির আওয়াজ হয়েছে অনেকক্ষণ হয়ে গেল। হয়তো ওরা ভাবছে, সবাই মরে গেছে। যদি আমরা এখানে থাকি…

পেইন্টার উঠে দাঁড়াল। তোমার কথা শুনে যা বুঝেছি, হামলা করা হয়েছে বেশ হিসেব করে। সবকিছু পূর্বপরিকল্পিত। ওরা এই টানেলের কথাও জানে হয়তো। একসময় এখানে সার্চও করতে আসবে। তবে আগুন নেভা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারে, এতটুকু আশা আমরা রাখতে পারি।

সিসা মাথা নাড়ল। তাহলে আমরা এগোই।

হ্যাঁ। আমরা এই জায়গা থেকে বেরিয়ে যাব। পারব আমরা। লিসাকে আশ্বস্ত করল ক্রো। দেয়ালে এক হাত রেখে নিজেকে সামলে নিল ও। আমরা পারব। লিসাকে নয় যেন নিজেকে শুনিয়ে বলল এবার।

রওনা হলো ওরা। কয়েক পা এগোতেই পেইন্টার কিছুটা শক্তি ফিরে পেল।

ভাল খবর।

এখান থেকে বেরোবার রাস্তা খুব একটা দূরে নয়।

করিডর দিয়ে হাওয়া বয়ে এসে ভেতরের শুকনো তৃণলতাকে দুলিয়ে দিয়ে সেটারই প্রমাণ দিল। মুখে ঠাণ্ডা লাগল ক্রোর। হঠাৎ করে জমে গেল ও। শিকারির সহজাত প্রবৃত্তি ওকে থামিয়ে দিয়েছে… এছাড়াও ওর ভেতরে স্পেশাল অপারেশন ট্রেইনিং তো আছেই। পেছনে লিসার কনুইতে হাত দিল ক্রো। চুপ করিয়ে দিল।

অফ করল পেনলাইট।

সামনে ভারি কিছু একটা মেঝেতে আঘাত করছে। ওটার প্রতিধ্বনি আসছে প্যাসেজে। বুট। একটি দরজা দড়াম করে বন্ধ হয়ে গেল। হাওয়াও গায়েব।

ওরা এখানে আর একা নয়।

.

গুটিসুটি মেরে ভূগর্ভস্থ সেলারে ঢুকল আততায়ী। সে জানে, এখানে ওরা আছে। কত জন? কাঁধ থেকে হেকলার অ্যান্ড কচ MK23 নামাল ও। আঙুলের অংশ কাটা পশমি গ্লোভস তার হাতে। নিজের পজিশনে, শুনছে।

হালকা দুপদাপ, ঘষটে যাওয়ার শব্দ।

পালাচ্ছে।

কমপক্ষে দুজন… তিনজনও হতে পারে।

উপরের গোলাঘরে যাওয়ার ট্রাপচোর বন্ধ করে দিল আততায়ী। ঠাণ্ডা বাতাস আসা বন্ধ হয়ে গেল, অন্ধকার নেমে এলো ওর ওপর। নাইট ভিশন গগলস চোখে পরল ও। কাঁধে থাকা আট্রা ভায়োলেট ল্যাম্প অন করে দিল। সামনে থাকা প্যাসেজটি জ্বলে উঠল ছায়াময় রুপোলি সবুজ আলোয়।

খুন করতে হবে, সবকটাকে।

এ-কাজে সে সিদ্ধহস্ত।

দ্য বেল খুব জোরে বেজে গিয়েছিল।

দুর্ঘটনা ছিল ওটা। পুরোনো বিভিন্ন দুর্ঘটনার মধ্যে একটি।

গত মাস থেকে সে দেখে আসছে Granitschloft আর অন্যদের মধ্যে বেশ জোর আলোচনা হচ্ছে। এমনকী দুর্ঘটনাটি ঘটার আগে থেকে চলছে এই আলোচনা। প্রাসাদে কিছু একটা হয়েছে। এখান থেকে বহু দূরে নিজের বাড়িতে বসেও সেটার আঁচ পাচ্ছিল সে। তবে বিষয়টিকে ও এড়িয়ে গিয়েছিল। ও এসব ভেবে কী করবে?

তারপর হলো সেই দুর্ঘটনা… ওটা সমস্যা হয়ে দাঁড়াল ওর। এবার ওকে তাদের সেই ভুলের দাগ পরিষ্কার করতে হবে।

টিকে থাকা শেষ Sonnekonige হিসেবে এটা তার দায়িত্ব।

ওর আজকের এখানকার দায়িত্ব প্রায় শেষের দিকে। সেলার অভিযান শেষ করে নিজেদের কুটিরে ফিরে যাবে ও। মঠে ঘটে যাওয়া সবকিছুর দোষ পড়বে মাওবাদীদের ওপর। ঈশ্বরহীন মাওবাদীরা ছাড়া মঠে আর কেইবা আক্রমণ করতে যাবে?

ঠিকভাবে ভাওতা দেয়ার জন্য, বিদ্রোহীদের সাথে মিলিয়ে গুলি এনেছে ও। এমনকী অস্ত্রও মিল রেখেছে।

অস্ত্র রেডি রেখে ওক গাছের খোলা পিপার পাশ দিয়ে এগোল সে। খাদ্যশস্য, রাই, আটা এবং শুকনো আপেল পর্যন্ত মজুদ করা আছে এখানে। সাবধানে এগোচ্ছে ও। যেকোন ধরনের আক্রমণের জন্য প্রস্তুত। সন্ন্যাসীরা সাধু হতে পারে, মনোবল ভেঙে যেতে পারে কিন্তু বিপদে পড়লে বিড়ালও বাঘের মতো আচরণ করে, সাবধান থাকা ভাল।

সামনে প্যাসেজ বাম দিকে মোড় নিয়েছে। ডান দিকের দেয়াল ধরে থামল। কান পাতল ও। পায়ের শব্দ শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে। কপালে তুলে নাইট-ভিশন গগলস।

আলকাতরার মতো কুচকুচে অন্ধকার।

চশমা আবার চোখে দিল সে। সামনের প্যাসেজ সবুজ আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠল। কেউ ওঁত পেতে থাকলে সেই ব্যক্তি দেখার আগেই তাকে দেখে ফেলবে ও। লকোনোর কোনো উপায় নেই। কেউ যদি পালাতে চায় তো ওকে পার হয়ে তবেই পালাতে পারবে।

একটু কোণা ঘেঁষে এগোল ও।

প্যাসেজে খড় ইতস্তত ছড়িয়ে রয়েছে। মনে হচ্ছে তাড়াহুড়োর ফলে পায়ের ধাক্কায় ছড়িয়ে গেছে ওগুলো। সেলারের ভেতরে সন্ধানী দৃষ্টি বুলাল আততায়ী। এখানে আরও ব্যারেল আছে। শুকনো ডালপালা ঝুলছে ছাদ থেকে।

কোনো নড়াচড়া নেই, শব্দ নেই।

খড়ের গায়ের ওপর দিয়ে সামনে এগোল ও।

মটমট শব্দে জুনিপারের ডাল ভাঙ্গল ওর বুটের নিচে।

চট করে নিচ দিকে তাকাল ও। পুরো মেঝে জুড়ে খড়ের পাশাপাশি ডালপালাও বিছানো রয়েছে।

ফাঁদ।

এখন?

উপরের দিকে চোখ তুলতেই ওর সামনের দুনিয়া যেন উজ্জ্বলতায় ঝলসে উঠল। গগলসের বর্ধিত সিস্টেমের কারণে আলোর মাত্রা অনেক বেড়ে ওর মস্তিষ্কে আঘাত করল, অন্ধ হয়ে গেল ও।

ক্যামেরার ফ্ল্যাশ লাইট।

সে মুহূর্তের মধ্যে গুলি ছুড়ল।

সরু সেলারে গুলির আওয়াজ যেন তালা লাগিয়ে দিল কানে। ওরা নিশ্চয়ই অন্ধকারে ঘাপটি মেরে শুয়ে ছিল। ডালে পা পড়ে মটমট শব্দ শোনার আগপর্যন্ত অপেক্ষা করেছে, একদম ওদের কাছে আসতে দিয়েছে ওকে, তারপর আক্রমণ চালিয়েছে। এক কদম পিছে হটল সে। খড়ের সাথে পা আটকে প্রায় হোঁচট খাচ্ছিল।

পিছু হটতে হটতে আরেকটি গুলি ছুড়ল ও।

ভুল করল।

সুযোগ পেয়ে কেউ একজন ওকে ব্যারেল দিয়ে নিচে আঘাত করল। পায়ে আঘাত হেনে খড়ের ওপর আছড়ে ফেলল ওকে। পাথুরে মেঝেতে পিঠ দিয়ে পড়ল ও। কিছু একটা ওর উরুর মাংসের ভেতরে ঢুকে পড়ল। হাঁটু ছুড়ল সে, ওকে যে আক্রমণ করেছে সে ঘোঘোত শব্দ করল।

যাও! ওর পিস্তল হাতে নিয়ে আক্রমণকারী চিৎকার করল। চলে যাও!

আক্রমণকারী ইংরেজিতে কথা বলছে। সন্ন্যাসী নয়।

দ্বিতীয় একজন উদয় হলো। ওদের দুজনের শরীরের ওপর দিয়ে লাফ দিল সে। ওর দৃষ্টিশক্তি এখন ধীরে ধীরে ফিরে আসছে। ও শুনল গোলাবাড়ি যাওয়ার সেই ট্রাপড়োরের দিকে এগোচ্ছে দ্বিতীয় ব্যক্তি।

scheifie বলল ও।

নিজের শরীর মুচড়িয়ে উপরে থেকে আক্রমণকারীকে কাপড়ের পুতুলের মতো ছুঁড়ে ফেলল ও। Sonnekonige রা অন্য সাধারণ মানুষদের মতো নয়। ওর ওপর যে আক্রমণ করেছিল সে দেয়ালের সাথে ধাক্কা খেল। একটু আগে যে পালিয়েছে তার মতো করে পালানোর চেষ্টা করল সে। কিন্তু ক্যামেরার ফ্ল্যাশের আলোয় হারানো দৃষ্টি শক্তি খুব দ্রুত ফিরে এসেছে। রেগে গিয়ে আক্রমণকারীর পায়ের গোড়ালি ধরে পেছনে টান দিল ও।

কিন্তু আক্রমণকারী তার আরেক পা দিয়ে লাথি কষাল ওকে।

গর্জে উঠে লোকটির পায়ের স্পর্শকাতর জায়গায় নিজের বুড়ো আঙুল চালাল ও। চিৎকার করে উঠল আক্রমণকারী। ও জানে লোকটি কতখানি ব্যথা অনুভব করছে। লোকটির মনে হচ্ছে, ওর গোড়ালি ভেঙে গেছে। পায়ের উপর উঠে দাঁড়িয়ে লোকটির মুখোমুখো হওয়ার চেষ্টা করল ও।

যেই উঠতে যাবে তখুনি ওর মাথা ঘুরে গেল। পুরো পৃথিবী যেন ঘুরছে। ওর সব শক্তি যেন ফাটা বেলুনের মতো বেরিয়ে গেছে। জ্বালা করছে উরুর উপরের অংশ। কী যেন ঢুকেছে ওখানে। নিচ দিকে তাকাল। না, ঢোকেনি। ফুটেছে। একটি সিরিঞ্জ এখনও ওর উরুর মাংস থেকে ঝুলে আছে। ওটার উঁচ ফুটেছে ওর উরুতে।

ড্রাগ দেয়া হয়েছে ওকে।

আক্রমণকারী ওর দুর্বল বন্ধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে পালাতে শুরু করল।

লোকটিকে পালাতে দেয়া যাবে না।

পিস্তল উঁচু করল ও… পাথরের মতো ভারী লাগছে ওটাকে। গুলি ছুড়ল। গুলি গিয়ে মেঝেতে বিধল। খুব দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ছে ও। আবার গুলি ছুড়ল… কিন্তু লোকটি ওর চোখের আড়ালে চলে গেছে।

ও শুনতে পেল আক্রমণকারী পালিয়ে যাচ্ছে।

শরীর ভারি হয়ে আসছে ওর। হৃদপিণ্ড লাফাচ্ছে বুকের ভেতর। ওর হৃদপিণ্ড স্বাভাবিক মানুষের চেয়ে আকারে প্রায় দ্বিগুণ তবে Sonnekonig হিসেবে ঠিকই আছে।

নিজেকে সামলে নিতে কয়েকবার বড় করে দম নিল ও।

Sonnekonig রা অন্য আট-দশটা সাধারণ মানুষের মতো নয়।

নিজের পা টান করল আস্তে করে।

ওর একটি কাজ শেষ করা বাকি আছে।

ওর জন্মই হয়েছে এর জন্য।

সেবা করার জন্য। কাজ করার জন্য।

দড়াম করে ট্রাপোর বন্ধ করল পেইন্টার।

আমাকে একটু সাহায্য করো তো, এক পা টেনে টেনে বলল ও। ওর পায়ে ব্যথা হচ্ছে। কয়েকটা বাক্স দেখিয়ে বলল, এগুলোকে ট্রাপড়োরের ওপর রাখতে হবে।

সবার ওপরে থাকা বাক্সটি টেনে নিল ক্রো। উঁচু করে নিতে গিয়ে দেখে বাক্স খুবই ভারি। তাই মেঝের সাথে ঘষটে ঘষটে দরজার কাছে টেনে নিল ও। ক্রো জানে না এই বাক্সগুলোর ভেতরে কী আছে, শুধু জানে এগুলো ভারী, অনেক ভারী।

ট্রাপড়োরের ওপরে নিয়ে বসালো বাক্সটি।

দ্বিতীয় বাক্স নিয়ে হিমশিম খাচ্ছিল লিসা। তৃতীয় বাক্স টানতে টানতে ক্রো ওকে সাহায্য করতে এগিয়ে গেল। দুজনে মিলে ভারী বাক্সগুলো দরজার ওপর রাখল।

আর একটা, বলল পেইন্টার।

দরজার ওপরে রাখা বাক্সগুলোর দিকে তাকাল লিসা। এগুলো ঠেলে কেউ বেরোতে পারবে না তো।

বললাম তো, আর একটা। জোর দিয়ে বলল ক্রো, হাঁপাচ্ছে। আমার ওপর আস্থা রাখো।

দুজন মিলে শেষ বাক্সটিকে জায়গামতো বসালো ওরা। এই বাক্সটিকে ওরা দুজনে মিলে উঁচু করে নিয়েছে। কারণ, তিনটি বাক্স রাখাতে ভরে গিয়েছে ট্রাপড়োরের নিচের অংশ।

যে ওষুধ দিয়েছি, ওতে সে এক ঘন্টার জন্য চুপ মেরে পড়ে থাকবে। বলল লিসা।

লিসার কথাকে ভুল প্রমাণিত করল একটি গুলির আওয়াজ। একটি রাইফেলের গুলি বোঝা চাপিয়ে দেয়া ট্রাপচোরকে ছিদ্র করে গোলাঘরের ছাদে থাকা কাঠের তক্তায় গিয়ে বিধল।

তোমার কথা মানতে পারলাম না, বলল ক্রো। লিসাকে দূরে টেনে নিয়ে গেল।

সিডেটিভে থাকা পদার্থের পুরোটা পুশ করেছিলে তো?

হ্যাঁ, করেছিলাম।

তাহলে কীভাবে…

আমি জানি, আর এখন ওটা জেনে কোনো লাভও হবে না।

গোলাঘরের খোলা দরজার দিয়ে ওকে নিয়ে এগোল ক্রো। বাইরে অস্ত্রধারী আর কেউ আছে কি-না সেটা দেখে নিয়ে ওখান থেকে বাইরে বেরোল ওরা। বাম দিকে আগুন আর ধোয়ার খেলা চলছে। আগুনের শিখা থেকে উৎপন্ন হওয়া ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠে যাচ্ছে আকাশে।

ধূসর মেঘরাজি পাহাড়ের ওপরের অংশকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে রেখেছে।

তাসকি ঠিক বলেছিলেন, পারকার হুড তুলতে তুলতে বিড়বিড় করল লিসা।

কে?

শেরপা গাইড। তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন আজকে আরেকটা ঝড় আঘাত হানতে পারে।

ধোয়ার গমন পথের দিকে তাকিয়ে দেখল ওরা প্যাচিয়ে প্যাচিয়ে মেঘের দিকে এগোচ্ছে। ভারি তুষার কণা নামছে আকাশ থেকে। ছাইয়ের কালো বৃষ্টির সাথে মিশে যাচ্ছে ওগুলো। আগুন ও বরফ। এই মঠে ডজনখানেক সন্ন্যাসী বাস করতেন যারা এখন শুধুই অতীত। এখানে তাদের জন্য স্মৃতিসৌধ হয়ে গেল।

এখানে যারা নিজেদের বাসস্থান গড়ে তুলেছিল তাদের ভুদ্র মুখগুলো মনে পড়ল পেইন্টারের। ওর বুকের ভেতর ক্রোধ টগবগ করে উঠল। কে বা কারা এই সন্ন্যাসীদেরকে নৃশংস, নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করল?

কে করেছে সেটার উত্তর ক্রোর জানা নেই, তবে ও জানে কেন করেছে।

এখানকার অসুখ।

কিছু একটা গণ্ডগোল হয়ে গেছে… আর এখন সেটাকে ধামাচাপা দিতে চাচ্ছে কেউ।

একটি বিস্ফোরণ ওর চিন্তার জাল ছিঁড়ে দিল। আগুন আর ধোঁয়া বেরিয়ে এল গোলাঘরের দরজা দিয়ে। উঠোনে একটি বাক্সের ঢাকনা ছিটকে এসে পড়ল।

লিসার হাত ধরল পেইন্টার।

নিজেকে উড়িয়ে দিল নাকি? লিসা প্রশ্ন করল, বিস্ময়ে গোলাঘরের দিকে তাকিয়ে আছে।

ওকে নিয়ে বরফ ঢাকা মাঠ দিয়ে এগোল ক্রো। ছাগল-ভেড়ার জমে যাওয়া লাশগুলোকে এড়িয়ে গেল ইচ্ছে করেই। বাইরের দরজার দিকে এগোচ্ছে ওরা।

তুষারপাত বাড়ছে। এর ফল ভাল এবং মন্দ, দুটোই। পেইন্টারের পরনে আছে একটি মোটা পশমি আলখাল্লা, পায়ে মোটা লোমঅলা বুট। মন্দ দিক, ভয়ঙ্কর তুষারঝড়কে মোকাবেলা করার মতো এগুলো তেমন কিছুই নয়। ভাল দিক, তুষারপাতের কারণে ওদের পদচিহ্ন ঢাকা পড়ে যাবে এবং দূর থেকে ওদেরকে কেউ দেখতেও পাবে না।

নিচের গ্রামের দিকে নেমে যাওয়া একটি পাহাড়ি রাস্তা ধরে এগোল ক্রো। কয়েকদিন আগে ও ওই গ্রাম থেকে এখানে এসেছিল।

দেখ!

নিচে ধোয়ার একটি কলাম আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে। মঠের ধোঁয়ার চেয়ে এই ধোয়া তুলনামূলক ছোট সাইজের।

গ্রামটা… হাতের মুঠো শক্ত করল পেইন্টার।

শুধু মঠই নয়, নিচের গ্রামে থাকা ছোট ছোট কুঁড়ে ঘরেও বোমা মারা হয়েছে। হামলাকারীরা কোনো সাক্ষী রাখছে না।

পাহাড়ি রাস্তা থেকে সরে গেল পেইন্টার। এই রাস্তা একদম উদোম, নগ্ন। রাস্তার ওপরে নিশ্চয়ই নজর রাখা হচ্ছে, হয়তো নিচে আছে হামলাকারীরা।

ক্রো ধূমায়িত মঠের দিকে পিছু হটতে শুরু করল।

আমরা কোথায় যাচ্ছি? জানতে চাইল লিসা।

আগুনের পেছনে থাকা জায়গা নির্দেশ করে পেইন্টার জবাব দিল, জনমানব শূন্য জায়গায়।

কিন্তু ওখানে তো…?

হ্যাঁ, ওখানে আলো দেখা যায়, বলল ক্রো। কিন্তু লুকোনোর জন্য ওই জায়গাটাই আমাদের ঠিক হবে। আশ্রয় খোঁজা যাবে ওখানে। ঝড় পার না হওয়া পর্যন্ত আমরা হয়তো ওখানে থাকতে পারব। এখানকার আগুন আর ধোঁয়ার ব্যাপারে কেউ তদন্ত করতে আসার আগপর্যন্ত অপেক্ষা করব আমরা।

পুরো মোটা ধোয়ার কলামের দিকে তাকাল পেইন্টার। যেন কালো রঙের ধোয়ার পিলার। কয়েক মাইল দূর থেকেও এটা চোখে পড়বে। ধোয়ার সংকেত, আমেরিকার পূর্বপুরুষেরা একসময় এরকম ধোয়া ব্যবহার করে সংকেত দিত। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এটা কী কারও চোখে পড়বে? আরও উপরে তাকাল ও, মেঘের দিকে দৃষ্টি দিল। মেঘ পেরিয়ে নিজের দৃষ্টিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল ও। এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারবে এমন একজনের কাছে প্রার্থনা করল ক্রো।

ততক্ষণ পর্যন্ত,..

ওর হাতে একটি রাস্তা খোলা আছে।

চলে, যাওয়া যাক।

.

রাত ১টা ২৫ মিনিট।
ওয়াশিংটন, ডি.সি.।

ক্যাটকে সাথে নিয়ে অন্ধকার ক্যাপিটল প্লাজা পেরোল মনক। ওরা দুজন একটু লম্বা লম্বা পা ফেলে এগোচ্ছে। তবে এত রাতে ডাকা হয়েছে বলে মোটেও বিরক্ত নয়।

আমি মনে করি আমাদের অপেক্ষা করা উচিত, বলল ক্যাট। একটু তাড়াহুড়ো হয়ে যাচ্ছে। যে-কোনো কিছুই হতে পারে।

ক্যাটের শরীর থেকে ভেসে আসা জেসমিনের সৌরভ পেল মনক। লোগান গ্রেগরির কাছ থেকে ফোন পেয়ে দুজন একসাথে চট করে গোসল সেরে রওনা হয়েছে ওরা। গরম পানিতে গোসল করার সময় একে অন্যকে আদর-সোহাগ করে ছুঁয়েছে, চুমো খেয়েছে। কিন্তু তারপর বাথরুম থেকে তোয়ালে প্যাচিয়ে আলাদা আলাদাভাবে বেরিয়েছে ওরা। পোশাক পরে নিজেদের ভালবাসার জগৎ থেকে বাস্তব জগতে ফিরে এসেছে। রাতের হিম শীতল ঠাণ্ডা বাড়ার সাথে নিজেদের কামনার আগুনকে নিভিয়ে ঠাণ্ডা করে ফেলেছে ওরা।

ক্যাটের দিকে তাকাল মনক।

নেভি ব্লু রঙের ট্রাউজার, সাদা ব্লাউজ আর আমেরিকান নৌ-বাহিনীর প্রতীক খচিত একটি উইন্ডব্রেকার রয়েছে ওর পরনে। বরাবরের মতোই এবার ক্যাটের পোশাক পরিচ্ছদে পেশাদারিত্বের ছাপ স্পষ্ট। অন্যদিকে মনকের পরনে আছে রিবকের কালো জিন্স, যবের গুঁড়ো রঙের একটি উঁচু গলাঅলা সোয়েটার। মাথায় পরেছে শিকাগো কাবস বেসবল দলের ক্যাপ।

আমি যতক্ষণ না নিশ্চিত হচ্ছি, বলল ক্যাট, ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের এই প্রেগনেন্সির ব্যাপারে চুপচাপ থাকাই ভাল।

আমি যতক্ষণ না নিশ্চিত হচ্ছি বলে তুমি কী বোঝাতে চাইছ? বাচ্চাটাকে রাখবে কি-না সেটার কথা বলছ? আমাদের ব্যাপারে তুমি নিশ্চিত কি-না সেটা?

ক্যাটের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে শুরু করে লোগানের অফিসের চত্বরে পৌঁছা পর্যন্ত তর্ক করল ওরা। রাতের বেলা হাঁটতে বেরিয়ে এই অল্প রাস্তাকে কেমন অন্তহীন বলে মনে হচ্ছে।

মনক…

মনক থামল। এক হাত বাড়িয়ে ক্যাটকে ধরল ও, তারপর ছেড়ে দিল। ক্যাটও দাঁড়িয়ে পড়ল।

ক্যাটের চোখে চোখ রেখে বলল, বলল, ক্যাট।

আমি এই প্রেগনেন্সির ব্যাপারটা নিশ্চিত হয়ে নিতে চাই… স্টিকগুলো… আমি জানি না। অন্য কাউকে জানানোর আগে আমি নিশ্চিত হতে চাচ্ছি। চাঁদের আলোতে ওর চোখ চিকচিক করে উঠল। কান্না করবে করবে ভাব।

বেবি, এজন্যই তো আমাদের উচিত সবাইকে বিষয়টা জানিয়ে দেয়া। ক্যাটের কাছে এসে এক হাত ওর পেটের ওপর রেখে বলল মনক। এখানে যেটা বড় হচ্ছে ওটার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সবাইকে ব্যাপারটা জানিয়ে দেয়া উচিত।

অন্যদিকে ঘুরল ক্যাট। মনকের হাত ক্যাটের পিঠের অল্প একটু অংশে ছুঁয়ে আছে।

হয়তো তুমিই ঠিক বলেছিলে। আমার ক্যারিয়ার… হয়তো এটা সঠিক সময় নয়।

মনক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সব বাচ্চা সঠিক সময়ে জন্ম নিলে পৃথিবীটাই অনেক ফাঁকা থেকে যেত।

মনক, তুমি অন্যায় করছ কিন্তু। এটা তোমার ক্যারিয়ার নয়।

কচু! আচ্ছা, তোমার কী মনে হয় না, একটা বাচ্চা আমার জীবন বদলে দিতে পারে। আমার সবকিছু বদলে যাবে তখন।

ঠিক। আর এই কারণেই আমি ভয় পাচ্ছি। মনকের দিকে পিঠ দিয়ে হেলান দিল ক্যাট। মনক ওকে দুহাতে জড়িয়ে নিল।

আমরা দুজনে মিলে বিষয়টা সামাল দেব, ফিসফিস করে বলল মনক। কথা দিলাম।

তারপরও আমার আরও কয়েকটা দিন চুপ থাকা উচিত। এখনও কোনো ডাক্তারের কাছে যাইনি। হয়তো প্রেগনেন্সি টেস্টে ভুল ছিল।

কয়বার টেস্ট করেছ?

মনকের মুখোমুখি হল ও।

বলো বলছি।

পাঁচবার। নিচুস্বরে বলল ক্যাট।

পাঁচবার! মনক ওর কণ্ঠ থেকে হাসির রেশটুকু লুকোতে ব্যর্থ হলো।

ওর বুকে ঘুষি মারল ক্যাট। ব্যথাও লাগল। অ্যাই! আমাকে নিয়ে মজা করবে না। ক্যাটের বলার ভঙ্গির আড়ালে থাকা হাসিটুকু মনকও টের পেল।

ক্যাটকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল ও। ঠিক আছে। আপাতত আমরা এটাকে গোপন রাখব।

মনককে জড়িয়ে ধরে চুমো খেল ক্যাট। আবেগে ভরা গভীর চুমো নয়, স্রেফ ধন্যবাদস্বরূপ। জড়িয়ে রাখা বাধন খুলল ওরা। তবে একে অন্যের আঙুল ধরে রইল। এগিয়ে চলল সামনে।

উজ্জ্বল আলোয় এসে পড়ল ওরা। স্মিথসোনিয়ান ক্যাসল, এখানেই ওদের আসার কথা। পাথুরে লাল ছাদ, টাওয়ার, টাওয়ারের চুড়ো এগুলো অন্ধকারের মধ্যে আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে রয়েছে। শহরের সেকেলে চেহারার পরিচয় বহন করছে এই ভবন। মূল ভবনটিকে স্মিথসোনিয়ান ইন্সটিটিউশন-এর ইনফরমেশন সেন্টার হিসেবে ব্যবহার করা হলেও ওটার ঠিক নিচেই সিগমা ফোর্সের সেন্ট্রাল কমান্ডের ঘটি। এর আগে নিচের এই অংশটিকে বোমা হামলার সময় মানুষজনের আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করা হতো। DARPAর গোপন মিলিটারি ফোর্সকে আড়াল করছে ভবনের এই অংশ। স্মিথসোনিয়ান-এর এই প্রাণকেন্দ্রে মিলিটারি বৈজ্ঞানিকরা ঘাঁটি গেড়ে বসে আছে।

ভবনের নিচতলায় পৌঁছুতেই মনকের হাত থেকে নিজের আঙুল ছাড়িয়ে নিল ক্যাট।

ওকে লক্ষ করল মনক, দুশ্চিন্তা এখনও ওর মনে খুঁতখুঁত করছে।

সবকিছু মিটমাট হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও এখনও ক্যাটের আচরণে একধরনের নিরাপত্তাহীনতাবোধ লক্ষ করছে ও। বাচ্চার চেয়েও বড় কোনো বিষয় আছে কী?

আমি যতক্ষণ না নিশ্চিত হচ্ছি।

কীসের নিশ্চিত?

বিষয়টি সিগমা কমান্ডের ভূগর্ভস্থ অফিসে যাওয়ার পথ জুড়ে মনকের মনে খচখচ করতে লাগল। তবে দুশ্চিন্তার নতুন বহর যোগ হলো লোগান গ্রেগরির বক্তব্য শোনার পর।

ওই এলাকা এখনও ঝড়ের কবলে ডুবে আছে। বজ্রসহ ঝড়ের তাণ্ডব চলছে পুরো বঙ্গোপসাগরে। একটি ডেস্কের পেছনে বসে লোগান ব্যাখ্যা করলেন। দেয়ালে একসারি এলসিডি কম্পিউটার স্ক্রিন শোভা পাচ্ছে। ওগুলোর মধ্যে দুটোতে তথ্য দেখাচ্ছে। এশিয়ার উপরে থাকা স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত ছবি সরাসরি দেখাচ্ছে এটা।

স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত একটি ফটো ক্যাটের কাছে দিল মনক।

আশা করা যায়, সূর্য উদয়ের আগেই আমরা আরও কিছু জানতে পারব। বললেন লোগান। ভোরের দিকে আং গেলু একজন মেডিক্যাল স্টাফকে নিয়ে মঠের দিকে রওনা করেছিলেন। ঝড় শুরু হওয়ার আগেই গিয়েছিল তারা। এখনও অনেক বেলা বাকি। ওখানে মাত্র দুপুর। তাই আশা করা যায়, শীঘ্রি আমরা আরও কিছু জানতে পারব।

ক্যাটের দিকে এক পলক তাকাল মনক। ডিরেক্টরের তদন্ত সম্পর্কে ব্রিফ করা হলো ওদের। বিগত তিন দিন যাবত পেইন্টার ক্রোর সাথে কমান্ডের কোনো যোগাযোগ নেই। লোগান সাহেবের চোখ-মুখের হাল দেখে বোঝা যাচ্ছে এই ব্যক্তি পুরোটা সময় জেগে কাটিয়ে দিয়েছে। বরাবরের মতো তার পরনে নীল স্যুট আছে, তবে কনুই আর হাঁটুর অংশটুকু একটু দুমড়ে গেছে ওটার। সিগমার সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে ব্যাপারটিকে একটু দৃষ্টিকটু বলা চলে। শুকনো সোনালি চুল আর পেটা শরীরে সবসময় তাঁকে তরুণ মনে হলেও আজ রাতে বোঝা যাচ্ছে তার বয়স চল্লিশেরও বেশি। ঘোলা চোখ, ফ্যাকাসে মুখ আর কুঁচকে থাকা চামড়ার কারণে তার বয়স ফুটে উঠেছে আজ।

গ্রের কী খবর? ক্যাট প্রশ্ন করল।

দৃঢ় টেপে মোড়া একটি ফাইলকে ডেস্কের ওপর রাখলেন লোগান। ভঙ্গিটা এমন, আগের প্রসঙ্গ নিয়ে তার আর কিছুই বলার নেই। দক্ষতার সাথে দ্বিতীয় আরেকটি ফাইল নিয়ে সেটা খুললেন লোগান। এক ঘণ্টা আগে কমান্ডার পিয়ার্সের জীবনের ওপর হামলা হয়েছিল।

কী? সামনে ঝুঁকল মনক, অনেকটা হঠাৎ করেই। তাহলে এসব আবহাওয়ার রিপোর্ট কীসের জন্য?

শান্ত হও। পিয়ার্স নিরাপদে আছে, ব্যাকআপের জন্য অপেক্ষা করছে। লোগান বললেন। কোপেনহ্যাগেনে ঘটে যাওয়া ঘটনার উল্লেখযোগ্য অংশগুলো শোনালেন তিনি। গ্রে কীভাবে বেঁচেছে সেটাও জানিয়ে দিলেন। মনক, আমি ঠিক করেছি, তুমি কমান্ডার পিয়ার্সের সাথে যোগ দেবে। ডালস-এ একটি জেট প্লেন তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। ৯২ মিনিট পর ফ্লাইট।

মনককে মানতেই হবে, লোগান সাহেব একজন দক্ষ লোক। মিনিট বলে দিলেন অথচ ঘড়ির দিকে একবার তাকানোরও প্রয়োজনবোধ করলেন না।

ক্যাপ্টেন ব্রায়ান্ট, ক্যাটের দিকে ফিরে বললেন লোগান। আর এই সময়টুকু তোমাকে এখানে চাই। আমরা এখান থেকে নেপালের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করব। কাঠমাণ্ডুতে আমাদের অ্যাম্বাসিতে ফোন করতে হবে। সেক্ষেত্রে তোমার আভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতা প্রয়োজন পড়বে।

অবশ্যই, স্যার।

দুশ্চিন্তা করার স্মিথসোনিয়ান ফয়ত্ব পালন

ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চে ক্যাটের পদবী উন্নতি হওয়ার কারণে মনক হঠাৎ তৃপ্তিবোধ করল। ক্যাট এরকম সঙ্কটপূর্ণ মুহূর্তে লোগানের ডান হাত হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে। বাইরে মাঠ পর্যায়ে কাজ করার চেয়ে স্মিথসোনিয়ান ক্যাসলের এই ভূগর্ভস্থ অফিসে নিরাপদে থাকবে ক্যাট। দুশ্চিন্তা করার একটি জায়গা কমল।

মনক দেখল ক্যাট ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ওর তাকানোর ভঙ্গিতে রাগের ছটা, মনে হচ্ছে ও মন্‌কের মন পড়তে পারছে। মনক নিজের চেহারা যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করল।

লোগান উঠে দাঁড়ালেন। তাহলে তোমরা দুজনে নিজেদের কাজ বুঝে নাও। অফিসের দরজা খুলে বিদেয় করলেন ওদের।

ওদের পেছনে দরজা বন্ধ হওয়া মাত্র ক্যাট মনকের হাত শক্ত করে প্যাচিয়ে ধরল। তুমি ডেনমার্কে যাচ্ছ?

হ্যাঁ, তো?

তাহলে ওটার…? ক্যাট ওকে মেয়েদের ওয়াশরুমে ওকে টেনে নিল। এত রাতে এখানে কেউ নেই। একদম ফাঁকা। বাচ্চার কী হবে?

আমি বুঝতে পারছি না। কীজন্য…?

যদি তোমার কিছু হয়ে যায়?

চোখ পিটপিট করে ক্যাটের দিকে তাকাল ও। কিছুই হবে না।

মনকের আরেক হাতের হাত সরিয়ে যান্ত্রিক হাত বের করে দেখাল ক্যাট। তুমি তো সুপারম্যান নও।

মনক নিজের হাত টেনে নিয়ে পেছনে আড়াল করল। ওর মুখ গরম হয়ে উঠেছে। মাছি মারার মতো সহজ অপারেশন এটা। গ্রে ওর কাজ করবে আমি ওকে সাহায্য করব। ওদিকে র‍্যাচেলও আসছে। ওদের দুজনের মাঝে আমাকে হয়তো কাবাব মে হাড়ি হতে হবে। আর তারপর দি। প্রথম ফ্লাইট ধরে আমরা ফিরে আসব, ব্যস।

অপারেশন যদি এত সহজই হয় তাহলে অন্য কেউ যাক। আমি লোগানকে বলব, এখানে তোমার সাহায্য লাগবে।

হ্যাঁ, তুমি বললেই তিনি শুনবে!

মনক…

আমি যাচ্ছি, ক্যাট। প্রেগনেন্সির ব্যাপারটা তুমিই গোপন রাখতে চাচ্ছ। আমি তো পুরো দুনিয়াকে জানিয়ে দিতে চাই। যা-ই হোক, আমাদের দুজনেরই ডিউটি আছে। তুমি তোমারটা করো, আমি আমারটা। বিশ্বাস রাখো, আমি বেপরোয়া কিছু করব না। ক্যাটের পেটের ওপর হাত রাখল মনক। আমাদের তিনজনের জন্য নিজেকে সাবধানে রাখব।

ক্যাট ওর হাতের ওপর হাত রেখে শ্বাস ফেলল। হুঁ।

হাসল মনক। ক্যাটও হাসল। কিন্তু ক্যাটের চোখে দুশ্চিন্তার ছায়া ঠিকই দেখতে পেল মনক। দুশ্চিন্তার বিপরীতে ওর কাছে মাত্র একটি জবাব আছে।

কাছে এগিয়ে এল ও। দুজোড়া ঠোঁট পরস্পরকে চুমো খেল। ফিসফিস করল ওরা। কথা দিলাম।

কীসের কথা দিলে? ক্যাট জানতে চাইল।

সবকিছু। জবাব দিল মনক। আরও গভীরভাবে চুমো খেল।

একদম মন থেকে কথা দিয়েছে ও।

তুমি এটা গ্রেকে জানাতে পারো, চুমো শেষ করে বলল ক্যাট। তবে হ্যাঁ, ওকে বলো আর কাউকে যেন না বলে।

সত্যি? মন্‌কের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। কিন্তু পরমুহূর্তেই সন্দেহে সরু হয়ে গেল ও দুটো। কেন?

ওর পেছনে গিয়ে আয়নামুখী হলো ক্যাট। মনকের পাছায় চাপড় মেরে বলল, যাতে সে-ও তোমার খেয়াল রাখে।

ঠিক আছে।

আয়নায় নিজের চেহারা দেখে নিল ক্যাট। আচ্ছা, এখন আমি তোমার সাথে কী

করব?

ওর কোমর জড়িয়ে ধরে মনক বলল, মিস্টার গ্রেগরি সাহেবের মতে আমার হাতে এখনও ৯২ মিনিট সময় আছে।

.

দুপুর ১২টা ১৫ মিনিট।
হিমালয়।

পেইন্টারের পর হামাগুড়ি দিল লিসা।

পাহাড়ি ছাগলের মতো দক্ষতা প্রদর্শন করে ঢাল ও বরফ শিলার ভেতর দিয়ে লিসাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল ক্রো। ভারি তুষারপাত হচ্ছে ওদের ওপর। মাথার ওপরে মেঘের স্কুপ থাকার কারণে আলো কমে গেছে, কয়েক ফুট পরে কী আছে দেখা যাচ্ছে না। দিনের বেলাতেই কীরকম অদ্ভুত ধূসর জ্যোৎস্নার মতো আলো। তবে ওরা অন্তত বরফঅলা দমকা বাতাসের কবল থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে। ওরা যে গিরিপথ ধরে নিচে নামছে বাতাস বইছে ঠিক তার উল্টো দিকে।

বাতাসের কবল থেকে বাঁচতে পারলেও এই হিমশীতল ঠাণ্ডা থেকে বাঁচার কোনো উপায় নেই। পারকা আর গ্লোভস থাকা সত্ত্বেও লিসা কাঁপছে। ওরা রওনা হয়েছে এক ঘন্টাও হয়নি। মঠে আগুন লাগায় ওখানকার তাপমাত্রা একটু গরম ছিল, তবে সেটা এখন অতীত। ওর মুখের কয়েক ইঞ্চি চামড়া বেরিয়ে আছে, ঠাণ্ডা বাতাস যেন ওইটুকু জায়গাতেই ঝামা ঘষে দিচ্ছে।

পেইন্টারের অবস্থা আরও খারাপ। এক জোড়া মোটা প্যান্ট, পশমি দস্তানা পরেছে ও। এক মৃত সন্ন্যাসীর শরীর থেকে খুলে নিয়েছে এগুলো। ওর মাথায় কোনো হুডও নেই। মুখের নিচের অংশে একটি স্কার্ফ বেঁধে রেখেছে, ব্যস। ঠাণ্ডা বাতাসের মধ্যে ওর শ্বাস সাদা ধোয়া হয়ে বেরোচ্ছে।

আশ্রয় খুঁজতে হবে ওদের।

দ্রুত।

লিসা ঢালে একটু পিছলে যেতেই ওর দিকে হাত বাড়িয়ে দিল ক্রো। ওরা গিরিপথের নিচে পৌঁছে গেছে। ঢালু দেয়াল দিয়ে ফ্রেমবন্দীর মতো হয়ে আছে জায়গাটি।

টাটকা তুষার জমেছে এখানে। ওগুলোব গভীরে পা ডুবে যাচ্ছে। স্নো-শু ছাড়া এই বরফ মাড়িয়ে যাওয়া অনেক কষ্টসাধ্য ব্যাপার।

লিসার উদ্বেগ আঁচ করতে পেরে একদিকের সরু অংশ দেখাল পেইন্টার। ঢালের একটি অংশ সামনে বেরিয়ে ঝুলে আছে। ওখানে গেলে এই বৈরি আবহাওয়ার প্রকোপ থেকে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে। পা টেনে টেনে ওটার দিকে এগোল ওরা।

ঝুলন্ত অংশের নিচে যাওয়ার পর পরিস্থিতি কিছুটা সহজ হয়ে গেল।

পেছনে তাকাল লিসা। ইতোমধ্যে তুষার এসে ওদের পায়ের ছাপ ঢেকে দিতে শুরু করেছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে কোনো পায়ের ছাপ আর দেখা যাবে না। কেউ ওদের খুঁজতে এলে, এই বিষয়টি ওদের সাহায্যই করবে। তারপরও লিসার কেমন যেন অস্বস্তি লাগল। মনে হলো, ওদের অস্তিত্বই যেন মুছে যাচ্ছে।

সামনে ঘুরল ও। আমরা কোথায় যাচ্ছি সে-সম্পর্কে তোমার কোনো ধারণা আছে? লিসা দেখল ওর গলার আওয়াজ ফিসফিসিয়ে বেরোচ্ছে। অবশ্য নিজেরা কোন অজানার উদ্দেশে যাচ্ছে সেই ভয়ে নয়, ঝড়ের ভয়ে আপনা আপনি ফিসফিস করে বলেছে ও।

খুব বেশি কিছু জানি না, বলল পেইন্টার। সীমান্তের এই অংশটুকু ম্যাপে ওভাবে চিহ্নিত করা নেই। এর অধিকাংশ জায়গায় এখনও মানুষের পা পড়েনি। হাত নেড়ে বলল ও। এখানে যখন প্রথম এসেছিলাম তখন স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত কিছু ছবিতে চোখ বুলিয়েছি। কিন্তু ওগুলো বাস্তব পরিস্থিতিতে তেমন কাজে আসবে না। এখানকার ভূমি খুব বেশি অসমতল। পর্যবেক্ষণ করা কঠিন।

ওরা চুপচাপ কয়েক পা সামনে এগোল।

ঘুরে লিসার দিকে তাকাল পেইন্টার। তুমি কী জানো ১৯৯৯ সালে এখানে ওরা সাংরি-লা আবিষ্কার করেছিল?

ক্রোকে খেয়াল করল ও। স্কার্ফে ঢাকা মুখের আড়ালে ক্রো হাসছে কি-না সেটা ও বুঝতে পারছে না। হয়তো লিসার ভয় দূর করার চেষ্টা করছে। সাংরি-লা… মানে হারানো দিগন্ত, লস্ট হরাইজন? একটি সিনেমা ও বইয়ের কথা মনে পড়ল ওর। হিমালয়ে অবস্থিত বরফে মোড়া উটোপিয়ান স্বর্গ, যেটা হারিয়ে গিয়েছিল।

লিসাকে বুঝাতে শুরু করল ক্রো। এখান থেকে কয়েকশ মাইল দক্ষিণে দুজন ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক অভিযাত্রী বিরাটাকার, গভীর গিরিসঙ্কট আবিষ্কার করেছিলেন। পাহাড়ের পার্শ্বদেশের নিচে ছিল ওটা। তাই স্যাটেলাইট ম্যাপে দেখা যেত না। ওটার তলায় একটা গ্রীষ্মমণ্ডলীয় স্বর্গ বিছানো ছিল। ঝরনা, দেবদারু ও পাইন গাছ, তৃণভূমি জুড়ে রডোডেনড্রন ফুলের ছড়াছড়ি, জলপ্রবাহের পাশে সারি সারি ফার ও চিরহরিৎ গাছপালা। সবমিলিয়ে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা একটা বুনো বাগান ছিল ওটা। প্রাণসম্পদে ভরপুর জায়গাটির চারদিকে ছিল তুষার আর বরফ।

সাংরি-লা?

শ্রাগ করল পেইন্টার। প্রকৃতি যেটাকে লুকোতে চায় সেটাকে স্যাটেলাইট দিয়ে বের করা সম্ভব না, সাংরিলা সেটা প্রমাণ করে দিয়েছে।

দাঁতে দাঁতে ঠোকাঠুকি লাগছে ওর। কথা বলার কারণে অযথা শ্বাস-প্রশ্বাস ও তাপের অপচয় হয়েছে। ওদের নিজেদের জন্য একটি সাংরি-লা খুঁজে বের করতে হবে।

চুপচাপ এগোল ওরা। তুষার পড়ার পরিমাণ বেড়ে গেছে।

আরও দশ মিনিট পর ওরা দেখল গিরিপথ একদিকে একেবেঁকে সরে গেছে। কোণায় পৌঁছুতেই ওদের মাথার ওপরে থাকা ঢালের ঝুলন্ত অংশ শেষ হয়ে আসছে।

থেমে আলাদা হয়ে তাকাল ওরা।

এখান থেকে ঢাল খুব খাড়াভাবে নিচে নেমে গেছে। প্রসারতাও বেড়েছে। এদের সামনে পর্দার মতো তুষার পড়ছে, যেন তুষারে ভরে যাচ্ছে পৃথিবী। দমকা বাতাস আর গভীর উপত্যকা দেখে যা মনে হলো এটা সাংরি-লা নয়।

বরফে ঢেকে যাওয়া খাঁজ কাটা পাহাড়ের সারি সামনে বিস্তৃত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রশি ছাড়া ওখানে পা দেয়া খুব কঠিন হবে, খুব ঢালু ওগুলো। এক সারি ঝরনা দেখা গেল–তবে ওগুলো বরফে জমে স্থবির হয়ে আছে।

তুষার আর বরফের ধোঁয়াশা যুক্ত একটি গভীর গিরিসঙ্কট চোখে পড়ল। মনে হচ্ছে ওটার কোনো তল নেই। ওটা দিয়ে পৃথিবীর শেষ মাথা পর্যন্ত যাওয়া যাবে।

আমরা নিচে গিয়ে কোনো একটা রাস্তা খুঁজে বের করব। বলল ক্রো। তুষার পাতের ভেতরে পা বাড়ল ও। তুষার জমতে জমতে এখন পায়ের গোড়ালি ছাড়িয়ে আরও উপরে উঠে এসেছে। লিসার জন্য পথ দেখাল ক্রো।

দাঁড়াও, বলল লিসা। ও জানে এখানে ক্রো আর বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারবে না। ওকে নিয়ে এতদূর এসেছে ঠিকই কিন্তু সামনে যাওয়ার মতো ওদের অবস্থা নেই, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও নেই।

এখানে…।

ক্রোকে একটি উপত্যকার দেয়ালের দিকে নিয়ে চলল ও। বাতাসের প্রকোপ থেকে জায়গাটি মুক্ত।

কোথায়…? ক্রো প্রশ্ন করতে চাইল কিন্তু ঠাণ্ডায় দাতে দাঁত বাড়ি লাগায় করতে পারল না।

উপর থেকে নেমে জমাট বাঁধা ঝরনাধারা দেখাল লিসা। তাসকি শেরপা ওদেরকে বেঁচে থাকার জন্য কিন্তু টেকনিক শিখিয়েছিলেন। আশ্রয় খোঁজার এই টেকনিকগুলো শেখা ছিল কঠোরভাবে বাধ্যতামূলক।

লিসা খুব ভাল করেই জানে কীভাবে সেরা জায়গাটিকে খুঁজে বের করতে হবে।

জমাট বাঁধা ঝরনাধারা ওদের যেখানে এসে পৌঁছেছে সেটা পেরিয়ে গেল লিসা। তাসকির শিখিয়ে দেয়া জ্ঞান অনুযায়ী, কালো পাথর কোথায় গিয়ে নীল-সাদা বরফের সাথে মিশেছে সেটা খুঁজতে লাগল ও। টেকনিক বলে, গ্রীষ্মকালে হিমালয়ে থাকা বরফ গলার ফলে এই ঝরনায় পানির প্রবাহ শুরু হয়। পাহাড়ের বিভিন্ন গভীর অংশের বরফও গলে পানিতে পরিণত হয় তখন। অন্যদিকে যখন ঠাণ্ডা পড়তে শুরু করে তখন চলমান ঝরনাধারা আস্তে আস্তে বরফ হয়ে জমাট বেধে যায়। আর মজার ব্যাপার হলো এই জমাট বাধা জলধারার পেছনে সবসময় ফাঁকা জায়গা থাকে।

লিসা স্বস্তির সাথে খেয়াল করল, এই ঝরনাও সেটার ব্যতিক্রম নয়। তাসকি আর তাঁর পূর্বপুরুষদেরকে মনে মনে ধন্যবাদ দিল ও। কনুই ব্যবহার করে বরফ আর পেছনের দেয়ালের মধ্যকার কালো ফাঁকা অংশ চওড়া করল ও। পেছনে একটি ছোট গুহার দেখা মিলল।

লিসার সাথে যোগ দিল ক্রো। দাঁড়াও দেখে আসি ভেতরটা নিরাপদ কি-না।

ফাঁকা জায়গা দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। কিছুক্ষণ পর ছোট্ট একটি আলো জ্বলে উঠল, আলোকিত হলো জমাট বাঁধা ঝরনাধারা।

লিসা ফাঁকা অংশ দিয়ে উঁকি দিল।

কয়েক পা দূরে পেইন্টার দাঁড়িয়ে আছে, হাতে পেলাইট। আলো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ছোট কোটর পরীক্ষা করছে ও। দেখে নিরাপদ মনে হচ্ছে। ঝড়ো আবহাওয়ার সময়টুকু আমরা এখানে কাটিয়ে দিতে পারব।

গুহায় ঢুকল লিসা। বাইরের বাতাস আর তুষারপাত এখানে নেই। এখনই বেশ উষ্ণবোধ হচ্ছে।

ক্রো পেনলাইট বন্ধ করে দিল। এখানে আলো জ্বালানোর কোনো প্রয়োজন নেই। বাইরে যে দিনের আলো আছে সেটাকে পুরোপুরি চুষে নিয়ে বর্ধিত করে জমাটবাধা ঝরনাধারা ভেতরের গুহাকে আলোকিত করে রেখেছে। আলোর বিকিরণ হচ্ছে বরফ থেকে।

লিসার দিকে তাকাল পেইন্টার। ওর চোখগুলো একদম নীল রঙের, জ্বলজ্বলে বরফের সাথে মিলে গেছে। ওর চেহারায় ফ্রস্টবাইট (বরফপচন)-এর লক্ষণ আছে কি না দেখল লিসা। বাতাসের তোপে ওর চামড়া একদম নীল হয়ে গেছে। ক্রোর চেহারার হাল দেখে বুঝল এই ব্যক্তি সত্যিই আমেরিকার আদিবাসী। খাঁটি আমেরিকান।

ধন্যবাদ, বলল পেইন্টার। এইমাত্র তুমি হয়তো আমাদের জীবন বাঁচালে।

শ্রাগ করল লিসা, অন্যদিকে তাকাল। তোমার কাছে আমি ঋণী ছিলাম।

মুখে যতই গম্ভীরভাবে জবাব দিক না কেন ক্রোর কথাগুলো ওর কাছে কেমন যেন উষ্ণ মনে হলো… ও যতখানি আশা করেনি তার চেয়েও বেশি ছুঁয়ে গেল কথাগুলো।

তুমি কীভাবে জানলে এভাবে খুঁজলে… বাক্য শেষ করতে পারল না সজোরে হাঁচি দিল ক্রো। ওউ।

লিসা নিজের প্যাক নামাল। প্রশ্ন পরে হবে। আমাদের দুজনের উষ্ণতা বাড়ানো দরকার।

মেডিক্যাল প্যাক খুলে একটি এমপিআই ইনস্যুলেটিং কম্বল বের করল ও। জিনিসটা পাতলা হলেও এর অ্যাসট্রলার কাপড় শরীর থেকে নির্গত তাপের নব্বই শতাংশ তাপমাত্রা ধরে রাখতে পারে। তবে লিসা অবশ্য শুধু নিজেদের শরীরের তাপমাত্রার ওপরেই নির্ভর করছে না।

ছোট একটি হিটার বের করল ও, পর্বতারোহণের জন্য এই জিনিস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বোসো, পেইন্টারকে নির্দেশ করল লিসা। ঠাণ্ডা পাথরের ওপর কম্বলটিকে বিছিয়ে দিল।

ঠাণ্ডায় পেইন্টারের অবস্থা শোচনীয়, কোনো আপত্তি করল না।

লিসাও ওর সাথে যোগ দিয়ে ওদের দুজনের ওপরে কম্বল টেনে নিল। কম্বলের ভেতরে বসেই কোলম্যান স্পোর্ট-ক্যাট হিটারের ইলেকট্রনিক সুইচ অন করল ও। বুটেন গ্যাসের ছোট্ট সিলিন্ডার দিয়ে চলবে এই হিটার। ১৪ ঘণ্টার মতো টিকবে। পরিমিত পরিমাণে ব্যবহার করলে এই সিলিন্ডার দিয়ে সামনের দুই/তিন দিন থাকতে পারবে ওরা।

হিটার গরম হচ্ছে। লিসার পাশে থাকা পেইন্টার কেঁপে উঠল।

জুতো আর গ্লোভস খোলো, ক্রোকে খুলতে বলে নিজেও খুলল। হিটারের গরমে হাতগুলোকে সেঁকে নাও, হাতের আঙুল, পায়ের আঙুল, নাক, কান ম্যাসাজ করো।

ফ্র… ফ্রস্টবাইট থেকে বাঁচার জন্য…

মাথা নাড়ল লিসা।

নিজের শরীর আর পাথরের মাঝে যতটা সম্ভব কাপড় রাখো, যাতে শরীরের তাপমাত্রা পাথরে চলে না যায়।

আস্তে আস্তে গুহার তাপমাত্রা সুন্দর উষ্ণ হতে লাগল।

আমার কাছে কয়েকটা পাওয়ারবার আছে, বলল লিসা। তুষার গলিয়ে পানি পেতে পারি আমরা।

একদম পাক্কা খেলোয়ার! বলল পেইন্টার। শরীর উষ্ণ হতেই কথায় জোর ফিরে পাচ্ছে।

কিন্তু এসবের কিছুই কিন্তু বুলেট ঠেকাতে পারবে না। লিসা বলল। পেইন্টারের দিকে তাকাল ও কম্বলের নিচে নাকের সাথে নাক ছুঁই ছুঁই অবস্থা।

শ্বাস ফেলে মাথা নাড়ল ক্রো। ওরা ঠাণ্ডার প্রকোপ থেকে রক্ষা পেলেও বিপদ থেকে এখনও উদ্ধার পায়নি। কিন্তু কীভাবে কী করবে? যোগাযোগ করার কোনো রাস্ত ইি নেই ওদের। হাতে কোনো অস্ত্রও নেই।

আমরা লুকিয়ে থাকব, বলল পেইন্টার। মঠে যারা বোমা মেরে আগুন ধরিয়েছে ওরা আমাদেরকে এতদূর পর্যন্ত খুঁজে বের করতে পারবে না। ঝড় কেটে গেলে উদ্ধারকারীরা আসবে। আশা করা যায় হেলিকপ্টার থাকবে তাদের সাথে। রোড ফ্লেয়ার দিয়ে আমরা তাদেরকে সংকেত দিতে পারব। তোমার ইমার্জেন্সি প্যাকে রোড ফ্লেয়ার আছে, আমি দেখেছি।

কামনা করি, অন্যরা আসার আগেই যেন উদ্ধারকারীরা এখানে পৌঁছায়।

লিসার হাঁটুতে হাত রাখল ক্রো। লিসা ওর এই আচরণে খুশি। ক্রো ওকে অন্তত কোনো মিথ্যে আশ্বাস দেয়ার চেষ্টা করেনি। ওরা ফুলশয্যায় নেই, ঘোর বিপদে আছে। ক্রোর হাত ধরল লিসা, শক্ত করে। আশ্বাস দেয়ার চেষ্টা।

চুপচাপ রইল ওরা, যে যার নিজস্ব চিন্তায় ডুবে গেছে।

তোমার কী মনে হেয়, ওরা কারা? নরম স্বরে জানতে চাইল লিসা।

জানি না। তবে ওই লোকটিকে শুইয়ে ফেলার সময় শুনলাম সে জার্মান ভাষায় কী যেন শপথ করল।

জার্মান? তুমি নিশ্চিত?

আমি কোনো কিছুতেই নিশ্চিত নই। তবে লোকটা হয়তো ভাড়া করা সৈনিক। অবশ্যই ওর কিছু মিলিটারি ট্রেইনিং নেয়া ছিল।

দাঁড়াও, লিসা বলল। নিজের প্যাক নাড়াচাড়া করল ও। আমার ক্যামেরা।

ক্রো সোজা হয়ে বসে রইল। কম্বলের এক অংশ সরে যাওয়ায় কাঁপছে। কম্বল টেনে নিয়ে লিসার আরেকটু কাছ ঘেঁষে বসল। যাতে কম্বল দিয়ে দুজনেই নিশ্চিন্তভাবে ঢেকে থাকা যায়। তোমার কী মনে হয়, তুমি ওর কোনো ছবি তুলেছ?

ঘন ঘন ফ্ল্যাশ করার জন্য আমি ক্যামেরাকে একের পর এক ছবি ভোলার অপশনে সেট করেছিলাম। ওই মোডে ডিজিটাল এসএলআর ক্যামেরা প্রতি সেকেন্ডে ৫টা করে ফ্রেম তোলে। জানি না, কী উঠেছে। ক্যামেরা ঠিকঠাক করতে করতে বলল ও।

ওদের দুজনের কাঁধের সাথে কাঁধ ঠেকে আছে। ক্যামেরা এলসিডি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে ওরা। লিসা শেষ ছবিগুলো ওপেন করল, অধিকাংশই অস্পষ্ট। ছবিগুলো একের পর এক দেখে যাওয়ার ফলে মনে হলো ওরা ওদের পালানোর স্লো-মোশন ভিডিও দেখছে। বিস্মিত আক্রমণকারী ফ্ল্যাশের আলো থেকে নিজের চোখ বাঁচানোর জন্য নিজের হাত তুলল, ব্যারেলের আড়ালে লিসা লুকিয়ে পড়তেই গুলি ছুড়ল সে, পেইন্টার ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর।

কয়েকটি ছবিতে লোকটির চেহারার অংশ বিশেষ উঠেছে। ওগুলোকে জোড়া দিয়ে মোটামুটি যে চেহারা পাওয়া গেল: সোনালি-সাদা চুল, কপালটা দেখতে পাশবিক, চোয়াল উন্নত। আক্রমণকারী আর পেইন্টার যখন শুয়ে ধস্তাধস্তি করছিল শেষ কয়েকটি ছবি সম্ভবত তখন উঠে যায়। লোকটির চোখের ক্লোজ-আপ ছবি পেল লিসা। নাইট ভিশন চশমা কানের উপরে সরে গেছে। রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে লাল চোখ তাকিয়ে আছে ক্যামেরা ফ্ল্যাশের দিকে।

আং গেলুকে বড় কাস্তে নিয়ে আক্রমণ করা রেলু নাআর কথা মনে পড়ল লিসার। সেই পাগল সন্ন্যাসীর চোখেও এই একই অবস্থা দেখেছিল ও। ঠাণ্ডা শিরশিরে স্রোত বয়ে গেল ওর অনাবৃত চামড়া দিয়ে।

লোকটির অন্য চোখ লক্ষ করল লিসা। দুটো চোখ দুরকম।

একটির মণি নীল।

অন্যটি ধবধবে সাদা।

হয়তো ক্যামেরার ফ্ল্যাশের জন্য এটা কেমন দেখাচ্ছে।

শুরুর দিকে ভোলা ছবিগুলোর দিকে এগোল লিসা।

ভূগর্ভস্থ সেলারের ছবিগুলোর আগে তোলা সর্বশেষ ছবি এটা। রক্ত দিয়ে লেখা একটি দেয়ালের ছবি। ও এই ছবিটির কথা ভুলেই গিয়েছিল।

কী এটা? জানতে চাইল ক্রো।

লামা খেমসারের দুঃখজনক ঘটনা ইতোমধ্যে ওকে জানিয়েছে লিসা। বৃদ্ধ সন্ন্যাসী এগুলো দেয়ালে লিখেছিলেন। কয়েকটি চিহ্নকে বারবার ব্যবহার করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

পেইন্টার একটু সামনে ঝুঁকল। জুম করো তো।

লিসা জুম করল।

ভ্রু কুঁচকালো পেইন্টার। এটা তিব্বতিয়ান কিংবা নেপালি অক্ষর নয়। চিহ্নগুলো কেমন যেন আড়ষ্ট। দেখে মনে হচ্ছে স্ক্যান্ডেনেভিয়ান প্রাচীন বর্ণ কিংবা ওরকম কিছু একটা হতে পারে।

তোমার তা-ই মনে হয়?

বললাম তো, হতে পারে। ক্লান্ত হয়ে পিঠ টান দিল ক্রো। তাছাড়া, হয়তো লামা খেমসার যা জানতে চেয়েছিলেন তার চেয়েও বেশি জানতেন।

পেইন্টারকে একটি ব্যাপার জানাতে ভুলে গিয়েছিল ও। বৃদ্ধ সন্ন্যাসী নিজের গলা কেটে ফেলার পর আমরা তার বুকে একটি অঙ্কিত চিহ্ন দেখেছিলাম। পাগলামী কিংবা কাকতালীয় ভেবে আমি ওটাকে গুরুত্ব দেইনি কিন্তু এখন মনে হচ্ছে…

ওটা দেখতে কেমন ছিল? এঁকে দেখাতে পারবে?

অত কিছুর দরকার হবে না। স্বস্তিকা চিহ্ন ছিল।

ভ্রু উঁচু করল পেইন্টার। স্বস্তিকা?

তাই তো দেখলাম। এমনও তো হতে পারে তিনি অতীত রোমন্থন করছিলেন। যে জিনিসটা ভয় পাইয়ে দিয়েছিল সেটা প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছিলেন, হতে পারে না?

আং গেলুর আত্মীয় রেলু নাআর কাহিনি শুনাল লিসা। মাওবাদী বিদ্রোহীদের কাছ থেকে কীভাবে পালিয়েছিল, নিরপরাধ চাষীদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে নিয়েছিল তারা, রেল তাদের বর্বরতা মেনে নিতে পারেনি। অথচ পরবর্তী রে নাআ সেই কাজই করেছিল। মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে অপ্রকৃতিস্থের মতো আচরণ করেছিল সে।

লিসার বলা শেষ হলে ভ্রু কুঁচকে রইল পেইন্টার। লামা খেমসারের বয়স আনুমানিক ৭৫ বছর হবে। সে হিসেবে ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি কিশোর ছিলেন। ওদিক দিয়ে বিচার করলে স্বস্তিকার ব্যাপারটা ঠিকই আছে। নাৎসিরা হিমালয়ে রিসার্চ অভিযান চালিয়েছিল।

এখানে? কেন?

শ্রাগ করল পেইন্টার। হেনরিক হিমল্যারকে দিয়ে কাহিনি শুরু করতে হবে। এসএস এর প্রধান, গুপ্ত কিছুর ব্যাপারে বদ্ধপরিকর ছিল সে। হাজার বছরের পুরোনো লিপি ঘেটে জেনেছিল এটা আর্যদের জন্মস্থান। সেই বিশ্বাস নিয়ে হারামজাদা নাসি এখানে অভিযান পাঠালো, প্রমাণ সংগ্রহ করবে। ঘোড়ার ডিম ছাড়া আর কিছু পায়নি সেটা বলাই বাহুল্য।

হাসল লিসা। হয়তো বৃদ্ধ লামা তখন সেই অভিযানের সাথে কোনোভাবে জড়িত। ছিলেন। হয়তো গাইড হিসেবে কাজ করেছিলেন কিংবা অন্যকিছু।

হতে পারে। কিন্তু আমরা আর সেটা জানতে পারব না। গোপন যা-ই কিছু হয়ে থাক, তিনি মারা যাওয়ার সাথে সাথে সেগুলোও হারিয়ে গেছে।

হয়তো না। হয়তো তিনি তার রুমে কিছু একটা করার চেষ্টা করছিলেন। তার কিছু। হতে পারে তার অজ্ঞাতেই তার মন তাকে দিয়ে গোপন কিছু প্রকাশ করতে চাচ্ছিল।

অনেক হয়তো রয়ে যাচ্ছে, কপালে হাত বুলাল ক্রো। আমি আরও একটা হয়তো যোগ করি। হয়তো এগুলোর সবই স্রেফ পাগলামী।

এর বিপরীতে আপত্তি তোলার মতো কিছু পেল না লিসা। শ্বাস ফেলে প্রসঙ্গ : পরিবর্তন করার চেষ্টা করল। যথেষ্ট গরম হয়েছ তো?

হ্যাঁ, ধন্যবাদ।

হিটার বন্ধ করল ও। বুটেন গ্যাস অপচয় করা যাবে না।

মাথা নাড়ল ক্রো, হাই উঠছিল ওর, ঠেকানো চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো।

আমরা বরং একটু ঘুমিয়ে নিই, বলল লিসা। পালা করে ঘুমাব।

.

কয়েক ঘণ্টা পর উঠল পেইন্টার। কেউ একজন ওর কাধ ধরে ঝাঁকাচ্ছে। দেয়ালের। সাথে ঠেস দিয়ে ঘুমিয়েছিল, সোজা হয়ে বসল এখন। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। সামনে থাকা বরফের দেয়ালে যেন আলকাতরা মেখে দেয়া হয়েছে।

তবে ঝড় মনে হয় থেমে গেছে।

কী সমস্যা? ক্রো প্রশ্ন করল।

কম্বলের এক অংশ ফেলে দিল লিসা।

এক হাত দিয়ে ইশারা করে ফিসফিস করে বলল, দাঁড়াও।

ঘুম তাড়িয়ে লিসার আরও কাছে ঘেঁষল ও। আধা মিনিট অপেক্ষা করল। ঝড় থেমে গেছে, নিশ্চিত। বাতাসের গর্জনও নেই। গুহার বাইরে পর্বত আর উপত্যকা জুড়ে সুনসান নীরবতা। সন্দেহজনক কোনো কিছু শোনার জন্য কান খাড়া করল ও।

নিশ্চয়ই কিছু একটা লিসাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছে।

ক্রো ওর মনের ভয় অনুভব করতে পারল। কারণ লিসা ভয়ে রীতিমতো কাঁপছে।

লিসা, কী হয়েছে…

হঠাৎ করে বরফের দেয়াল উজ্জ্বল আলোয় জ্বলে উঠল। মনে হলো বাইরের আকাশে আতশবাজির খেলা হচ্ছে। তবে কোনো আওয়াজ নেই। আমোর ঝালর কিছুক্ষণ থেকে তারপর বিলীন হয়ে গেল। সব আবার অন্ধকার।

ভূতুড়ে আলো… ফিসফিস করল লিসা। তাকাল ক্রোর দিকে।

তিন রাত আগের কথা ভাবল ক্রো। তখন থেকেই তো শুরু। গ্রামের অসুস্থতা, মঠে পাগলামী। লিসার অনুমানের কথা মনে পড়ল ওর। এই আলোর সাথে অসুস্থতার লক্ষণের সরাসরি সম্পর্ক আছে।

আর এখন ওরা সেই অভিশপ্ত ভূমিতেই অবস্থান করছে।

একদম কাছে।

পেইন্টার দেখল চোখ ধাঁধানো উজ্জ্বলতায় বরফ জমা ঝরনাধারা আবার প্রজ্জ্বলিত হলো। ভূতুড়ে আলো ফিরে এসেছে।

০৫. সামথিং রটেন

০৫. সামথিং রটেন

সন্ধ্যা ৬টা ১২ মিনিট।
কোপেনহাগেন, ডেনমার্ক।

ইউরোপে কোনো কিছুই কী সঠিক সময়ে শুরু হয় না?

হাতঘড়ি দেখল গ্রে।

নিলাম শুরু হওয়ার কথা ৫ টায়।

এখানে বাস, ট্রেন বেশ ভালই পাওয়া যায় কিন্তু যদি ঠিক সময়ে কোনো অনুষ্ঠানের প্রসঙ্গ আসে তখন ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। এক ঘণ্টা লেট। ৬টারও বেশি বাজে এখন। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, অনুষ্ঠান শুরু হবে সাড়ে ৬টায়। উত্তর সাগরে ঝড় হওয়ার কারণে অনেকে দেরি করে আসছে। সাগরের বৈরি আবহাওয়ার কারণে কোপেনহ্যাগেনে আসতে দেরি হয়েছে প্লেনগুলোর।

নিলামে অংশগ্রহণকারী বিডাররা (ক্রেতা) এখনও আসছে ধীরে ধীরে।

সূর্য কোপেনহ্যাগেনের আকাশ থেকে বিদেয় নিতেই স্ক্যানডিক হোটেল ওয়েবারস-এর তিনতলার বারান্দায় এসে দাঁড়াল গ্রে। Ergenschein Auction House এর রাস্তার অপর পাশেই এটার অবস্থান। চার তলা ভবনের এই নিলাম অফিসটিকে আর্ট গ্যালারি বলে মনে হয়। আধুনিক ডেনিশ ছিমছাম স্টাইল, সবকিছু গ্লাস আর সাদা রঙের কাঠ দিয়ে সাজানো। চার তলা ভবনের নিচতলায় নিলাম অনুষ্ঠিত হবে।

শীঘ্রি শুরু হবে, আশা করা যায়।

হাই তুলে আড়মোড়া ভাঙল গ্রে।

কিছুক্ষণ আগে ওর আগের হোটেলে গিয়ে নজরদারির জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নিয়ে এসেছে। আসার সময় চেক-আউট করেছে হোটেল থেকে। তারপর নতুন নাম আর মাস্টারকার্ড নিয়ে এই হোটেলে রুম বুক করেছে ও। এই রুম থেকে কোপেনহ্যাগেনের সিটি স্কয়ারের বিস্তৃত দৃশ্য দেখা যায়। পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো পার্কগুলোর মধ্যে অন্যতম টিভলি গার্ডেনস এই হোটেল থেকে খুব বেশি দূরে নয়। ওখান থেকে ভেসে আসা গান ও হাসাহাসি শোনা যায় ওর বারান্দা থেকে।

রাস্তার পাশের দোকান থেকে একটি হট ডগ কিনে এনেছিল গ্রে। খোলা ল্যাপটপের পাশে ওটা আধ-খাওয়া অবস্থায় পড়ে আছে। সারাদিনে এই হট ডগ ছাড়া আর কিছু খায়নি ও। মানুষ মনে করে, ওর মতো এজেন্টরা বিভিন্ন অভিজাত ক্যাসিনো ঘুরে বেড়ায় আর রেস্টুরেন্টে খাওয়া-দাওয়া করে। ভুল। ওগুলো স্রেফ গুজব। হট ডগ কিনতে গিয়ে আমেরিকান ডলারে ওর খরচ হয়েছে ৫ ডলার। গলা কাটা দাম নিলেও খেতে ভালই ছিল।

মোশন সেনসেটিভ ক্যামেরা দ্রুত কয়েকটি ছবি তুলতেই ল্যাপটপের স্ক্রিন কেঁপে উঠল। নিলামে অংশগ্রহণকারী প্রায় দুই ডজন ব্যক্তির ছবি ও ইতোমধ্যে তুলে ফেলেছে। যেমন : ব্যাংকার, হাস্যউজ্জ্বল ইউরোপীয়, চকচকে স্যুট পরা তিন জন ভদ্রলোক–দেখেই বোঝা গেল এরা মাফিয়া, এক বেটে-খাটো মহিলা-অধ্যাপিকা হবে হয়তো এবং সাদা রঙের দামি পোশাক পরা চার জোড়া ব্যক্তি–ওদের প্রত্যেকের মাথায় নাবিকদের মতো ক্যাপ আছে। শেষের কয়েকজন আমেরিকান ভাষায় কথা বলল। বেশ উচ্চস্বরে।

গ্রে মাথা নাড়ল।

সম্ভবত লোকজন যা আসার এসে পড়েছে। আর খুব একটা বাকি নেই।

নিলাম ভবনের সামনে একটি লম্বা লিমুজিন এসে থামল। নামল দুজন। দুজনই হালকা-পাতলা, বেশ লম্বা। ম্যাচিং করে দুজন আরমানি কালো স্যুট পরেছে। একজন পুরুষ অন্যজন নারী। পুরুষটি রবিন পাখির ডিমের ছবিঅলা নীল টাই পরে আছে। অন্যদিকে তার সঙ্গিণীর পরনে আছে সিল্কের রাউজ, ওটাও নীল। দুজনের বয়সই কম, ঊর্ধ্বে ২৫ বছর হবে। কিন্তু তাদের হাবভাব দেখে মনে হলো তারা নিজেদেরকে তারচেয়েও বেশি বয়স্ক হিসেবে উপস্থাপন করতে চাচ্ছে। ওদের দেখতে নির্বাক যুগের সিনেমার তারকার মতো লাগল। টগবগে বয়স। মুখে কোনো হাসি নেই, আবার গম্ভীর করেও রাখেনি। ছবিতে দেখা গেল তাদের চোখে স্বাভাবিক সৌহার্দ্যপূর্ণ ছাপ আছে।

ডোরম্যান ওদের জন্য দরজা টেনে ধরল।

ডোরম্যানকে মাথা ঝাঁকিয়ে ধন্যবাদ দিল ওরা… পরিমিত ভঙ্গিতে, কোনোরকম আদিখ্যেতা ছাড়া। ভেতরে ঢুকল ওরা। ওদের পেছন পেছন ডোরম্যানও ঢুকে পড়ল। বোঝা গেল, এই দম্পতির পর আর কেউ আসবে না। এমনও হতে পারে, এদের জন্যই নিলাম অনুষ্ঠান এতক্ষণ দেরি করা হয়েছে।

এরা কারা?

কৌতূহল দমন করল গ্রে। লোগান গ্রেগরি মানা করেছেন।

গ্রে ভোলা ছবিগুলো আবার চেক করল। দেখে নিল অংশগ্রহণকারী সবার চেহারা স্পষ্টভাবে উঠেছে কি-না। সন্তুষ্ট হয়ে ফাইলগুলো একটি পেন-ড্রাইভে নিয়ে ওটা পকেটে রেখে দিল। এখন ওকে এই নিলাম অনুষ্ঠান শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। যেসব জিনিস বিক্রি হয়ে যাবে সেগুলোর নাম ও ক্রেতার তালিকা যোগাড় করার ব্যবস্থা লোগান করে রেখেছেন। ওর মধ্যে কয়েকটি ছদ্মনাম থাকবে, বলাই বাহুল্য। তবে এই তথ্যগুলো ইউ.এস টাস্ক ফোর্স ও প্রয়োজনে ইউরোপোল ও ইন্টারপোলকে দেয়া হবে। এখানকার আসল ঘটনা হয়তো গ্রের আর কখনও জানা হবে না।

যেমন : কেন ওকে আক্রমণ করা হয়েছিল? গ্রিট্টি নেয়াল কেন খুন হয়ে গেলেন?

নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করেছিল গ্রে। পুরো বিকেল লেগে গেল এই কাজে, কিন্তু মনের অস্থিরতা কমল। লোগান ওকে শান্ত থাকতে বলেছেন, বিষয়টি মেনে নিতে শুরু করল ও। এখানে কী হতে যাচ্ছে সে সম্পর্কে ওর কোনো ধারণা নেই। অন্ধের মতো কিছু করতে গেলে হয়তো আরও লোকজন মারা পড়বে।

কিন্তু তবুও একটা অপরাধবোধ ওকে ভোগাচ্ছে, শান্ত-স্থির হতে দিচ্ছে না। বিকেলের অধিকাংশ সময় নিজের রুমে হাঁটাহাঁটি করে কাটিয়েছে ও। বিগত দিনগুলো বারবার ওর মানসপটে ফুটে উঠেছে। শুরু থেকেই আরও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল… আর সাবধানতা অবলম্বন…।

পকেটে গ্রের সেল ফোন কেঁপে উঠল। বের করে নাম্বার চেক করল ও। বাঁচা গেল। ফোন রিসিভ করে বারান্দার রেইলিঙের কাছে গেল ও।

র‍্যাচেল… তুমি ফোন করেছ দেখে খুশি হয়েছি।

তোমার মেসেজ দেখলাম। তুমি ঠিক আছে তো?

র‍্যাচেলের কণ্ঠে ব্যক্তিগত ও পেশাদার দুটো বিষয় নিয়েই আগ্রহের সুর পেল ও। মেসেজে লিখেছিল, ওদের হয়তো সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য দেখা হবে। বিস্তারিত কিছু লেখেনি। যতই প্রেম করুক, পেশাদারিত্বের খাতিরে নিরাপত্তাজনিত কিছু জিনিস মেনে চলতেই হয়।

আমি ভাল আছি। কিন্তু কথা হলো, মনক আসছে। মাঝরাতের পর পর এখানে এসে পৌঁছুবে।

আমি এইমাত্র ফ্রান্কফ্রুটে এলাম, বলল র‍্যাচেল। কোপেনহ্যাগেনে ল্যান্ড করেই মেসেজ চেক করেছি।

আমি সত্যিই দুঃখিত…।

তাহলে আমি ফিরে যাব?

র‍্যাচেলকে কোনোভাবেই এখানে জড়ানো যাবে না। সেটাই ভাল হবে। আমরা নাহয় অন্য কোনো সময় দেখা করব। এখানকার পরিস্থিতি ঠাণ্ডা হোক। আচ্ছা, ফেরার পথে আমিই নাহয় একবার রোমে নামব। তোমার সাথে দেখা করব তখন।

খুশি হব।

র‍্যাচেলের কণ্ঠে হতাশার সুর পরিষ্কার টের পেল গ্রে।

কথা দিলাম… দেখা করব, গ্রে বলল। মনে মনে আশা করল, এই প্রতিজ্ঞা যেন, সে রাখতে পারে।

দীর্ঘশ্বাস ফেলল র‍্যাচেল, বিরক্তিতে নয়, পরিস্থিতি মেনে নিয়ে। ওদের সম্পর্কটা বেশ দূরের। দুজন দুই দেশে থাকে, দুটো ভিন্ন ক্যারিয়ার। কিন্তু তবুও ওরা সম্পর্কটা চালিয়ে যেতে চায়। দেখতে চায়… এই সম্পর্ক কোথায় নিয়ে যায় ওদের।

আমি ভেবেছিলাম আমরা একটু কথা বলার সুযোগ পাব, র‍্যাচেল বলল।

র‍্যাচেলের এই শব্দগুলোর পেছনে থাকা গভীর অর্থ গ্রে অনুধাবন করতে পারল। ওরা দুজন একে অন্যের বেশ কাছাকাছি সময় কাটিয়েছে, দুজন দুজনার ভাল দিক, মন্দ দিক সম্পর্কে জানে। তবে দূরতুযুক্ত এই রোমান্টিক সম্পর্কে কেউ আগবাড়িয়ে নিজের মনের আসল কথা বলতে রাজি নয়। ওরা দুজনই জানে পরবর্তী ধাপ নিয়ে ওদের আলোচনা করা উচিত।

আলোচনা ওদের এই দূরত্ব কমিয়ে আনতে পারে।

ওদের সর্বশেষ দেখা হয়েছে অনেক দিন আগে, মাঝের এতদিনের দেখা না হওয়াটাই হয়তো এই ধরনের আড়ষ্টতার জন্য দায়ী। কিছু না বলা কথা নিয়ে ওরা দুজনই ভেবেছে। এখন সময় এসেছে, এগুলো জানাতে হবে।

আরও সামনে এগোবে নাকি এগোবে না।

আচ্ছা, গ্রে নিজের উত্তর জানে তো? র‍্যাচেলও ভালবাসে। ওকে নিয়ে জীবন শুরু করতে একদম প্রস্তুত। এমনকী ওরা বাচ্চা নিয়েও কথা বলেছে। কিন্তু তবুও… কী যেন ওকে বাগড়া দিচ্ছে। মনে হচ্ছে, ওদের আর এসবের সময় নেই, দেরি হয়েছে। অনুভূতিটা কেমন যেন অদ্ভুত, আলাদা। পার্থিব অন্য অনুভূতির সাথে একদমই মেলে না।

হয়তো ওদের দুজনের কথা বলা উচিত।

রোমে আসব, বলল গ্রে। প্রমিস করলাম।

ঠিক আছে, আমি কিন্তু তোমার জন্য চুলোয় রান্না তুলে দিয়ে অপেক্ষা করব! গ্রে টের পেল র‍্যাচেলের কণ্ঠ থেকে দুশ্চিন্তার সুর মিলিয়ে যাচ্ছে। আমি তোমাকে মিস করি গ্রে। আমরা…।

গাড়ির কর্কশ হর্নের কারণে ওর কথার বাকি অংশ গ্রে শুনতে পেল না।

নিচের রাস্তার দিকে তাকাল গ্রে। একজন নারী চলমান গাড়ির ভেতর দিয়ে দুই লেন দৌড়ে পার হচ্ছে। পরনে কাশিরী জ্যাকেট ও পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ঝুলে থাকা পোশাক। চুল খোঁপা করা। গ্রে প্রায় চিনতেই পারছিল না। কিন্তু হর্ন বাজানো ড্রাইভারের দিকে ঘুরে তাকাতেই চিনতে পারল।

ফিওনা।

এই মেয়ে এখানে কী করছে?

গ্রে…? র‍্যাচেল ফোনে বলল।

হড়বড় করে জবাব দিল গ্রে। আমি দুঃখিত… র‍্যাচেল… আমাকে যেতে হচ্ছে।

ফোন কেটে দিয়ে পকেটে ভরল।

নিচে ফিওনা নিলাম ভবনের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। নিজের ল্যাপটপের কাছে ফিরল গ্রে। ওর ক্যামেরা মেয়েটির ছবি তুলে নিয়েছে। দেখা যাচ্ছে, ভেতরে ডোরম্যানের সাথে তর্ক করছে ফিওনা। ডোরম্যানের হাতে একটি কাগজ ধরিয়ে দিল সে। লোকটি কাগজ পরীক্ষা করল, উঁকুটি করে ভেতরে যাওয়ার জন্য ইশারা করল ওকে।

ডোরম্যানকে পেরিয়ে ঝড়ের বেগে ভেতরে অদৃশ্য হয়ে গেল ফিওনা। তারপর ক্যামেরায় সব অন্ধকার।

একবার ল্যাপটপ আরেকবার রাস্তার দিকে তাকাল গ্রে।

ধেৎ..

আচ্ছা, পেইন্টার ক্রো হলে কী করতেন?

ভেতরে ঢুকে নিজের পোশাক বের করল ও। ওর স্যুট জ্যাকেট বিছানায় রাখা আছে। জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহার করার জন্য রেখে দিয়েছিল।

এরকম পরিস্থিতিতে পেইন্টার নিশ্চয়ই চুপচাপ হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতেন না।

.

সকাল ১০টা ২২ মিনিট।
হিমালয়।

আমাদেরকে শান্ত থাকতে হবে, বলল পেইন্টার। চুপ করে বসে থাকো।

ওদের সামনে ভূতুড়ে আলো উদয় হলো… আবার নিভে গেল। জমাট বাঁধা ঝরনাধারাকে প্রবল আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে আবার ঢেকে দিল ঘন কালো অন্ধকারে। চারদিকে ঠাণ্ডা, সুনসান নীরবতা।

পেইন্টারের আরও কাছে ঘেঁষল লিসা। হাত ধরল ক্রোর। এতটাই শক্ত করে ধরল যে ক্রোর হাতের তালুতে রক্ত চলাচলে বিঘ্ন ঘটল।

ভাবনার কিছু নেই, আমাদেরকে ওরা খুঁজবে না, ভয়ে ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারছে না লিসা। ফিসফিস করে বলল, এই ঝড়ের ভেতরে কেন আমাদের খুঁজতে আসবে? ওই ভয়ঙ্কর আলো দিয়েই তো আমাদেরকে শেষ করে দিতে পারবে। আলো থেকে তো আর আমরা বাঁচতে পারব না।

পেইন্টার বুঝল, লিসা ঠিকই বলেছে। ওরা কোনোভাবেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে না। আর এরকম বিরান অঞ্চলে চাপ আর প্রাণঘাতী ঠাণ্ডায় ওরা এমনিতেও মারা যাবে। স্নাইপারের গুলি খেলেও মরতো, এখানেও মরবে।

কিন্তু পেইন্টার আশা ছাড়তে রাজি নয়।

পাগলামো শুরু হতে দুই ঘণ্টা সময় লাগে। যদি ও সেই দুই ঘণ্টা নষ্ট না করতো। যদি সময়মতো সাহায্যের ব্যবস্থা করা যেত তাহলে হয়তো কাজ হতো।

আমরা এটার ভেতর দিয়ে যাব। হালকা স্বরে বলল পেইন্টার।

লিসা বিরক্ত হলো।

কীভাবে?

ভূতুড়ে আলো আবার উদয় হতেই ক্রোর দিকে তাকাল ও। আলোর উজ্জ্বলতায় গুহা একদম হীরের মতো জ্বলে উঠল। ক্রো যতটা আংশকা করেছিল লিসার চোখে ঠিক ততটা ভয়ের ছাপ ছিল না। তবে লিসা ভয় পেয়েছে কোনো সন্দেহ নেই… বেশ ভালই ভয় পেয়েছে… শক্ত করে তাকিয়ে আছে।

আমাকে মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে কথা বলবে না, বলে দিলাম। ক্রোর হাত থেকে হাত ছাড়িয়ে নিল লিসা।

ক্রো মাথা নাড়ল। যদি তাদের বিশ্বাস মতে, এই আলো আমাদের না মেরে ফেলে… তাহলে হয়তো আশা আছে। আর ওরা হয়তো ওই দেয়াল থেকে এই পাহাড়ের ওপর নজর রাখছে না। ঝড় শেষ হয়ে গেলে আমরা হয়তো…

হঠাৎ বন্দুকের শব্দে শীতের সুনসান নীরবতা খান খান হয়ে গেল।

লিসার চোখে চোখ পড়ল ওর।

শব্দটা বেশ কাছ থেকেই এসেছে।

সেটার প্রমাণস্বরূপ কয়েকটি গুলি এসে বরফের দেয়ালে হুমড়ি খেল। কম্বল ছেড়ে পিছু হটল ওরা। গুহার পেছন দিকে এগোল। কিন্তু পালানোর কোনো রাস্তা নেই।

এবার পেইন্টার একটি জিনিস খেয়াল করল।

অন্যবারের মতো ভূতুড়ে আলো এবার আর নিভে যায়নি। চোখ ধাঁধানো উজ্জ্বলতা নিয়ে জমাট বাঁধা ঝরনাধারা দীপ্তি ছড়াচ্ছে। স্থির করে আলো ধরা আছে ওদের দিকে।

বুলহর্ন (হ্যান্ড মাইক) থেকে আওয়াজ ভেসে এলো। পেইন্টার ক্রো! আমরা জানি আপনি আর সেই মহিলা ওখানে লুকিয়ে আছেন! নারীকণ্ঠ থেকে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে। উচ্চারণে বিদেশি টান।

হাত উঁচু করে বেরিয়ে আসুন।

লিসার কাঁধে চাপ দিয়ে যতটুকু সম্ভব ভরসা দেয়ার চেষ্টা করল পেইন্টার এখানেই থাকো।

খুলে রাখা পোশাকের দিকে ইশারা করে দেখাল ও, পোশাক পরে নিতে বলল লিসাকে। ক্রো নিজের জুতো পরে বরফের দেয়ালের ভাঙ্গা অংশ দিয়ে মাথা বের করল।

পাহাড়ি অঞ্চলে যেমনটা হয়ে থাকে, ঝড় এই হামলে পড়ে আবার এই নেই! এখানেও একই অবস্থা। কালো আকাশে যেন তারার হাট বসেছে।

রাতের অন্ধকারকে ঝেটিয়ে বিদেয় করেছে হাতের কাছে থাকা একটি স্পটলাইট। জমাট বাঁধা বরফের দেয়ালের ঠিক মাঝ বরাবর ওটাকে তাক করে রাখা হয়েছে। ১৫০ ফুট দূরে একটি নিচু উপত্যকায় স্নোয়মাবাইলের (বরফের ওপর দিয়ে চলাচলের জন্য বিশেষ বাহন, অনেকটা জেট স্কির মতো) উপরে একটি অবয়ব বসে আছে। সার্চলাইট চালাচ্ছে সে। একদম সাধারণ লাইট। তবে এর তীব্রতা আর আভা দেখে মনে হয় গ্যাস ব্যবহার করে এটাকে জ্বালানো হয়।

এটা কোনো রহস্যময় ভূতুড়ে আলো নয়।

স্বস্তির পরশ পেল পেইন্টার। এই আলোই তো জ্বলত সবসময়, বাহনগুলো আসার জন্য সংকেত দিন? ৫টি বাহন আছে, গুনল ও। সাদা পারকা পরা লোকজনগুলোকেও শুনে ফেলল। দুপাশেই ছড়িয়ে সবাই। সবার হাতে রাইফেল।

কোনো উপায় না দেখে… নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও পেইন্টার গুহা থেকে হাত উঁচু করে বেরিয়ে এলো। কাছে থাকা রাইফেলধারী লোকটি রীতিমতো দৈত্যাকার। অস্ত্র তাক করে ওর দিকে এগিয়ে এলো। আলোর ছোট্ট বিম এসে পড়ল পেইন্টারের বুকে। লেজার লাইট, গুলি ছুড়লে ওখানে এসেই লাগবে।

পেইন্টার নিরস্ত্র অবস্থায় এদের সাথে পেরে উঠতে পারবে না। রাইফেলধারী ব্যক্তিকে মনে মনে মেপে নিল ও।

না, সুবিধে হলো না।

লোকটির চোখে চোখ পড়ল ওর।

এক চোখ বরফ নীল, অন্য চোখ ধবধবে সাদা।

মঠের সেই আক্রমণকারী!

এই লোকের গায়ে অসুরিক শক্তি আছে, ওর মনে পড়ল। না, এরকম অস্বাভাবিক ঘটনা তো ভাল নয়। তার ওপর এরা সংখ্যায় অনেক বেশি। সফল হওয়া তো দূরে থাক পেইন্টারের কিছু করারই সুযোগ নেই।

লোকটির পেছন থেকে একজন সামনে এগিয়ে এল। মহিলা। হয়তো ইনিই একটু আগে বুলহর্নে কথা বলেছিলেন। সামনে এগিয়ে মাত্র এক আঙুল ব্যবহার করে রাইফেলকে নিচু করে দিলেন তিনি। মহিলার এরকম ক্ষমতা দেখে পেইন্টার অবাক হলো।

তিনি সামনে এগিয়ে এলেন, পেইন্টার তাকে স্পটলাইটের তীব্র আলোতেই দেখে নিল। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। কালো চুল, বব-কাট দেয়া, চোখগুলো সবুজ। পশমি হুডঅলা ভারী পারকা পরে আছেন তিনি। পোশাকের কারণে তার শারীরিক অবয়ব ঢাকা পড়ে গেছে তবে তার চলন দেখে মনে হলো তিনি বেশ সুতী ও সাবলীল।

ডক্টর অ্যানা স্পোরেনবার্গ, এক হাত বাড়িয়ে দিয়ে পরিচয় দিলেন তিনি। তাঁর গ্লোভস পরা হাতের দিকে তাকাল ক্রো। এই মহিলাকে টান দিয়ে এর যদি গলায় হাত প্যাচিয়ে ধরি, একে জিম্মি করে ফায়দা,…

কিন্তু মহিলার পেছনে দাঁড়ানো আততায়ীর চোখের দিকে তাকিয়ে আর কিছু ভাবল না ও। মহিলার সাথে হাত মেলাল। যত যা-ই হোক, ওরা এখনও তো ওকে গুলি করেনি, ভদ্রতা করা যেতেই পারে। যতক্ষণ বেঁচে থাকতে পারবে এই খেলা চালিয়ে যাবে ও। শুধু তাই নয়, লিসার কথাও ওকে ভাবতে হবে।

ডিরেক্টর ক্রো, বললেন অ্যানা। আপনি কোথায় আছেন, কেমন আছেন এটা নিয়ে বিগত কয়েক ঘণ্টায় সেটা নিয়ে আন্তর্জাতিক ইন্টেলিজেন্স চ্যানেলগুলোতে বেশ হইচই হয়ে গেছে।

নিজের চেহারা যতদূর সম্ভব স্বাভাবিক রাখল ক্রো। নিজের পরিচয় অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই ওর। হয়তো এই পরিচয়কে ব্যবহার করে সুবিধা আদায় করা যাবে। তাহলে তো আপনি জানেন, আমাকে ওরা কীভাবে খুঁজে বের করবে।

Natiarlich, মাথা নাড়লেন তিনি। ভুলে জার্মান বলে ফেলেছেন। কিন্তু তারা সফল হবে বলে আমি মনে করি না। আমি বলব, আপনি আর সেই মহিলা যেন আমার সাথে যোগ দেন।

পেইন্টার এক পা পিছু হটল। ডক্টর কামিংসের সাথে আমার কোনো লেনদেন নেই। তিনি এখানকার অসুস্থতার চিকিৎসা করতে এসেছিলেন, ব্যস। এর বাইরে আর কিছুই জানেন না।

ওটা সত্য নাকি মিথ্যা সেটা আমরা খুব শীঘ্রি বের করে ফেলব।

ও আচ্ছা, তাহলে এই ব্যাপার। ওদেরকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে ওদের সন্দেহজনক জ্ঞানের কারণে। হয়তো রক্ত আর কষ্টের মাধ্যমে সেই জ্ঞান বের করে নেয়া হবে। পেইন্টার এই মুহূর্তে কিছু একটা করার তাগিদ অনুভব করল। ধুকে ধুকে যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুর চেয়ে তাৎক্ষণিক মৃত্যু ভাল। টর্চার সহ্য করার ব্যাপারে ও খুব স্পর্শকাতর।

কিন্তু ও তো এখানে একা নয়। লিসার কথা মনে পড়ল, ওর হাতের সাথে লিসার হাত লেগে উষ্ণ হওয়ার কথা মনে পড়ল। যতক্ষণ ওরা বাঁচবে ততক্ষণ আশাও থাকবে।

আরও গার্ড যোগ হয়ে গুহা থেকে লিসাকে অস্ত্রের মুখে জোরপূর্বক বের করে নিয়ে এলো। স্নোমোবাইলের দিকে এগোল ওরা।

ক্রোর চোখে চোখ পড়ল লিসার, ওর চোখ ভয়ে জ্বলজ্বল করছে।

পেইন্টার সিদ্ধান্ত নিল, নিজের ক্ষমতার সর্বোচ্চটা দিয়ে লিসাকে রক্ষা করবে।

রওনা হওয়ার আগমুহূর্তে অ্যানা পোরেনবার্গ এলো ওদের কাছে। রওনা হওয়ার আগে কিছু কথা বলে রাখি। আমরা কিন্তু আপনাদেরকে ছেড়ে দেব না। আশা করি, আপনার বিষয়টা বুঝতে পারবেন। আমি কোনো মিথ্যা আশ্বাস দিতে পারব না। তবে আমি এতটুকু কথা দিতে পারি ব্যথাহীন, শান্তিতে আপনাদেরকে পরপারে পাঠানো হবে।

সন্ন্যাসীদের মতে, কর্কশ কণ্ঠে বলল লিসা। আপনাদের দয়ার নমুনা আমরা দেখেছি।

লিসার চোখে চোখ রাখার চেষ্টা করল পেইন্টার। এখন এদের সাথে দ্বন্দ্ব করা ঠিক হবে না। মানুষ মারতে এই হারামিদের কোনো বিবেকবোধ হয় নাকি। এখন ওদের দুজনকে বাধ্য বন্দীর মতো আচরণ করে যেতে হবে।

কিন্তু দেরি হয়ে গেছে।

অ্যানা এই প্রথম লিসাকে সামনাসামনি দেখলেন। ওর দিকে ঘুরলেন তিনি। তার কণ্ঠে উত্তাপের আঁচ সুস্পষ্ট। হ্যাঁ, দয়াই করা হয়েছে, ড. কামিংস। রাইফেলধারী লোকটির দিকে এক পলক তাকালেন। মঠে কীরকম রোগ হয়েছিল সেসম্পর্কে আপনি কিছুই জানেন না। সন্ন্যাসীদের জন্য যে কী ভয়াবহ পরিস্থিতি অপেক্ষা করছিল সেটাও জানেন না। কিন্তু আমরা জানি। ওদের মৃত্যুকে খুন বলা যাবে না। ওগুলো স্রেফ যন্ত্রণাহীন মৃত্যু।

আপনাকে সেটা করার অধিকার কে দিয়েছে? লিসা প্রশ্ন ছুড়ল।

লিসার কাছে এগোল পেইন্টার। লিসা, হয়তো…।

না, মিস্টার ক্রো। অ্যানাও লিসার কাছে এগোল। কীসের অধিকার, তাই না? অভিজ্ঞতা, ড. কামিংস, অভিজ্ঞতা। বিশ্বাস করুন, যখন আমি আপনাকে বলব… তখন বুঝবেন ওখানকার মৃত্যুগুলো দয়া ছিল, নিষ্ঠুরতা নয়।

হেলিকপ্টারে চড়ে আমার সাথে যে সন্ন্যাসী এসেছিলেন, তাঁর বেলায়? ওটাও দয়া ছিল নাকি?

শ্বাস ফেললেন অ্যানা, শব্দ গুছিয়ে নেয়ার চেষ্টা করলেন। সিদ্ধান্তটা কঠিন ছিল তবুও নিতে হয়েছে। আমাদের কাজটা বেশি জরুরি ছিল।

আর আমরা? অ্যানা পিঠ ফিরিয়ে ঘুরতেই লিসা প্রশ্ন করল। আমরা চুপচাপ সব মেনে নিয়ে আপনার সাথে গেলে যন্ত্রণাহীন মৃত্যু। আচ্ছা, যদি আমরা না যেতে চাই, আপস না করি তাহলে?

স্নোমোবাইলের দিকে এগোলেন অ্যানা। আপনি যেমনটা ভাবছেন, আমরা আপনাদের কোনো নির্যাতন করব না। স্রেফ ড্রাগ দেব। আমরা বারবারিয়ানদের মতো নিষ্ঠুর নই, ড. কামিংস।

না, আপনারা তো নাৎসি! হিসিয়ে উঠল লিসা। আমরা স্বস্তিকা দেখেছি!

বোকার মতো কথা বলবেন না। আমরা নাৎসি নয়। সোমোবাইলে পা তুলে দিয়ে শান্ত চোখে তাকালেন তিনি। আমরা আর নাৎসি নই।

.

সন্ধ্যা ৬টা ৩৮ মিনিট।
কোপেনহ্যাগেন, ডেনমার্ক।

রাস্তা পার হয়ে দ্রুত নিলাম ভবনের দিকে এগোল গ্রে।

ফিওনা এখানে কী মনে এসেছে? ডোরম্যানের সাথে রফা করার পর কী হলো?

মেয়েটির নিরাপত্তা নিয়ে ভাবল ও। অবশ্য এটাও স্বীকার করতে হবে ফিওনার কারণেই ও এখানে সশরীরে ঢোকার একটি অজুহাত পেয়েছে। দোকানে বোমা হামলা, গ্রিট্টি নেয়ালকে খুন এবং গ্রেকে খুন করার চেষ্টা যে বা যারা করে থাকুক না কেন… সূত্র ধরে তারা এখানেও আসবে।

ফুটপাতে পৌঁছে গতি কমাল গ্রে। সূর্যের তির্যকরশ্মি নিলাম ভবনের দরজায় পড়ে ওটাকে রুপোলি আয়নায় পরিণত করেছে। সেই আয়নায় গ্রে নিজের সুন্দর পরিপাটি পোশাক আরেকবার দেখে নিল। ওকে সরু লম্বা চেকঅলা আরমানি স্যুটে বেশ ভাল মানিয়েছে। কিন্তু কলারের কাছে আঁটোসাঁটো হয়ে আছে সাদা শার্ট। গ্রে ওর হালকা হলুদ রঙের টাই-টা একটু ঠিক করে নিল।

নিজেকে লুকিয়ে রাখা চলবে না। ওকে একজন বিত্তশালী আমেরিকান ধনী ব্যক্তির চরিত্রে অভিনয় করতে হবে।

ও নিলাম ভবনের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। লবির পুরোটা স্ক্যান্ডেনেভিয়ান ডিজাইনে সাজানো। এখানে সাদা রঙের কাঠ, গ্লাস দেয়া পার্টিশনসহ বিভিন্ন জিনিসের ঘাটতি আছে। লবির ভেতরে আসবাবপত্র বলতে ভাস্কর্য সাইজের একটি টেবিলের পাশে ডাকটিকেট সাইজের এই চেয়ার! ব্যস, এতটুকুই। টেবিলের ওপরে একটি অচিড় গাছের পট রাখা আছে।

হাতে থাকা সিগারেটটিকে পটে ঠেসে ধরে নিভাল ডোরম্যান, মুখ বেজার করে গ্রের দিকে এগোল। ওতে উল্লেখ করা হয়েছে ভবনের ফান্ডে ২.৫ মিলিয়ন ডলার পাঠিয়ে নিশ্চিত করা হয়েছে–এরকম একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে এই ক্রেতা উপস্থিত হওয়ার মতো সামর্থ্য রাখেন।

আমন্ত্রণপত্র পরীক্ষা করে মাথা নাড়ল ডোরম্যান। লম্বা লম্বা পা ফেলে মখমলের ফিতার দিকে এগোল। ওই ফিতা নিচ তলায় যাওয়ার জন্য চওড়া সিঁড়িকে বন্ধ করে রেখেছে। ডোরম্যান ফিতা সরিয়ে গ্রেকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য ইশারা করল।

সিঁড়ির নিচে এক সেট সুইংভোর ওকে নিলাম অনুষ্ঠানের মূল ফ্লোরে পৌঁছে দিল। দুজন গার্ড প্রবেশমুখের দুপাশে দাঁড়িয়ে আছে। একজনের হাতে মেটাল ডিটেকটর। হাত উঁচু করে নিজেকে সার্চ করতে দিল গ্রে। ও খেয়াল করল দরজার দুপাশে ভিডিও ক্যামেরা সংযুক্ত আছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা বেশ ভাল। ওকে সার্চ করা শেষ হতেই সুইচ টিপে সামনের দরজা খুলে দিল অন্য গার্ডটি।

বিভিন্ন রকম গুঞ্জন শুনতে পেল ও। ভাষাগুলো চিনতেও পারল : ইটালিয়ান, ডাচ, ফ্রেন্স, আরবি ও ইংলিশ। দেখে মনে হচ্ছে এই নিলামে অংশ নিতে পুরো দুনিয়া হাজির হয়ে গেছে।

ভেতরে ঢুকল গ্রে। ওর দিকে তাকাল কয়েকজন। তবে অধিকাংশেরই নজর দেয়ালের পাশে লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে রাখা কাঁচের কেসগুলোর দিকে। নিলাম ভবনের স্টাফরা সবাই কালো রঙের পোশাক পরে জুয়েলারি দোকানের মতো কাউন্টারের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের হাতে সাদা গ্লোভস পরা। নিলামের জন্য ভোলা বিভিন্ন জিনিসকে ভাল করে ধরে ক্রেতাদের সামনে উপস্থাপন করছে।

এক কোণায় দুটো বেহালা বাজছে আলতো সুরে। কয়েকজন স্টাফ ঘুরে ঘুরে অতিথির মাঝে লম্বা গ্লাসে করে শ্যাম্পেন পরিবেশন করছে।

পাশে থাকা ডেস্কের দিকে তাকাল গ্রে। ওখানে বিভিন্ন সংখ্যাযুক্ত প্যাডেল রাখা আছে। আরও ভেতরে এগোল ও আগতদের অনেকই আসগ্রহণ করেছে। নিলাম অনুষ্ঠানকে থামিয়ে রেখে দেরি করে আসা নির্বাক সিনেমার সেই দুই সুপারস্টারকে দেখল গ্রে। একদম প্রথম সারিতে বসে আছে তারা। ওই মহিলার কোলে একটি প্যাডেল পড়ে আছে। সঙ্গিণীর দিকে ঝুঁকে কানে কানে কী যেন বলছে পুরুষটি। দৃশ্যটি দেখতে কেমন যেন একটু অন্তরঙ্গ অশালীন বলে মনে হলো। হয়তো মহিলার ঘাড় বাঁকা থাকার কারণেই এমন লাগছে। দেখে মনে হচ্ছে, বোধহয় একটি চুমো পাওয়ার আশা করছে সে।

গ্রে আসনগুলোর মাঝখানের সারির দিকে এগোতেই মহিলাটি ওর দিকে তাকাল। তার চোখ ওর ওপর দিয়ে দৃষ্টি বুলিয়ে সরে গেল অন্যদিকে।

চিনতে পারেনি।

গ্রে নিজের অনুসন্ধান চালিয়ে গেল। মঞ্চের সামনের রুমে পৌঁছে গেল ও। ঘুরতে লাগল আস্তে আস্তে। কোনো বাহ্যিক হুমকির আশংকা দেখল না ও।

ফিওনারও দেখা পেল না।

মেয়েটি গেল কোথায়?

কাঁচের কেসের পাশ দিয়ে এগোল ও। অপরপ্রান্তের নিচের অংশে চোখ রাখল। আশেপাশে হওয়া কথাবার্তার জন্য ও কানে স্বাভাবিকের চেয়ে অর্ধেক কম শুনতে পারছে। এক স্টাফের পাশ দিয়ে এগোল ও। এক ভদ্রলোককে একটি চামড়ায় মোড়া বই দেখাচ্ছে সে। ভদ্রলোক নাকের ওপর চশমা রেখে সামনে ঝুঁকলেন।

বইটি খেয়াল করল গ্রে। প্রজাপতির ওপর হাতে লেখা ১৮৮৮ সালের একটি গবেষণামূলক গ্রন্থ।

আসনের সারির নিচের অংশের দিকে এগোল ও। দরজার সামনে আবার হাজির হতেই সেই বেঁটে-খাটো মহিলার মুখোমুখি হলো। এই মহিলার ছবি সে ল্যাপটপে দেখে এসেছে। মহিলার হাতে একটি ছোট খাম। ওটা গ্রের দিকে এগিয়ে দিল। খাম হাতে নিয়ে গ্ৰে ভাবল, কী আছে এর ভেতর? মহিলার এই বিষয়ে কোনো আগ্রহই নেই, সে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে।

খামের সাথে একধরনের সুগন্ধীর ঘ্রাণ পেল গ্রে।

আজব।

বুড়ো আঙুলের নখ দিয়ে খামের সিল ভেঙে একটি ভাঁজ করা জিনিস বের করে আনল। এর ওয়াটারমার্ক বেশ মূল্যবান। পরিষ্কার হস্তাক্ষরে একটি ছোট্ট নোট লেখা আছে।

এমনকি গিলড পর্যন্ত জানে এই আগুনের ধারে কাছে না এসে ঘুরে ঘুরে দেখা উত্তম। সাবধানে থেকো।

চুমো রইল।

নোটে কোনো স্বাক্ষর নেই। তবে একদম নিচে গাঢ় টকটকে লাল কালি দিয়ে একটি ছোট কোঁকড়ানো ড্রাগনের প্রতীক আঁকা আছে। গ্রের আরেক হাত ওর গলায় চলে গেল। এই একইরকম দেখতে একটি রুপোলি ড্রাগন ঝুলছে ওখানে। ওর এক প্রতিযোগীর কাছ থেকে পাওয়া উপহার।

শিচ্যান।

মেয়েটি গিলড-এর হয়ে কাজ করে। সন্ত্রাসীদের মদদ যোগায় গিলড; একটি ছায়াময় সংগঠন। অতীতে সিগমা ফোর্সের সাথে ওর মোকাবেলা হয়েছিল। গ্রে টের পেল ওর ঘাড়ের চুলগুলো দাঁড়িয়ে গেছে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে পুরো রুম খুঁজল ও। সেই মহিলা ওকে নোট ধরিয়ে উধাও হয়ে গেছে।

গ্রে আবার নোটটির ওপর চোখ বুলাল।

সতর্কবাণী।

দেরিতে হলেও এই-ই বেশি…

গিলড অন্তত এখানে আছে। তারমানে, যদি শিচ্যান বিশ্বাস করে…

আসলে শিচ্যানের কথা মেনে নিতে গ্রে রাজি।

যেহেতু ওরা দুজনই এখানে চোর, তাই চোর হয়ে চোরকে সম্মান দেখানো যেতেই পারে।

একটু হৈচৈ হওয়ায় রুমের পেছন দিকে তাকাল গ্রে।

পেছনের দরজা দিয়ে একজন লম্বা ব্যক্তি নিলাম অনুষ্ঠানে প্রবেশ করলেন। ডিনার জ্যাকেটে তাঁকে দারুণ দেখাচ্ছে। ইনি মিস্টার ইরগেনচেইন, নিলামদার। তেল দেয়া কালো চুলে হাত বুলালেন তিনি, কলপ দেয়া চুল, বোঝাই যাচ্ছে। একটি বইয়ের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তার শুকনো মুখে ছোট্ট করে হাসি ফুটল।

মুখ শুকনো থাকার কারণ তার পিছু পিছু উদয় হলো। গার্ড একটি মেয়ের হাতের উপরের অংশ ধরে এদিকে নিয়ে আসছে।

ফিওনা।

ওর চেহারায় রাগ ফুটে উঠেছে। চেপে ধরেছে ঠোঁট, লাল হয়ে গেছে ওগুলো।

বেশ ক্ষিপ্ত।

গ্রে ওদের দিকে এগোল।

একদিকে সরে গেলেন ইরগেনচেইন। নরম কাপড়ে প্যাচিয়ে কী যেন নিচ্ছেন তিনি। প্রধান ডিসপ্লে কেসের সামনে গেলেন তিনি। এই কেস এতক্ষণ খালি ছিল। একজন স্টাফ কেবিনেটের লক খুলে ফেলল। ইরগেনচেইন খুব আলতোভাবে প্যাচানো কাপড় খুলে জিনিসটিকে কেসে রাখলেন।

গ্রেকে এগোতে দেখে দুহাত একসাথে করে সামনে এগোলেন তিনি। গ্রের সামনে এসেও হাত জড়ো করে রইলেন, যেন প্রার্থনা করছেন। স্টাফ তার পেছনের কেসটিকে তালাবন্ধ করে দিল।

কেসের বস্তুটিকে খেয়াল করল গ্রে।

দ্য ডারউইন বাইবেল।

গ্রেকে দেখতে পেয়ে ফিওনার চোখ বড় বড় হয়ে গেল।

ওকে না দেখার ভান করে নিলামদারের সাথে কথা বলল গ্রে। কোনো সমস্যা?

না, স্যার, একদমই না। এই তুরুণীকে বাইরে রেখে আসা হচ্ছে, এই আরকী। ওর কাছে কোনো নিমন্ত্রণপত্র নেই তো, তাই।

নিজের কার্ড বের করে দেখাল গ্রে। আশা করি, আমি এখানে একজন গেস্টকে সাথে রাখতে পারব। আরেক হাত ফিওনার দিকে বাড়িয়ে দিল ও। ও এখানে আগেভাগে চলে এসেছে দেখে আমি খুশি হয়েছি। আমার এক ক্রেতার সাথে কনফারেন্স কল করতে গিয়ে আটকে পড়েছিলাম। আমি এই মিস, নেয়ালের সাথে আজ একটি জিনিস ব্যক্তিগতভাবে কেনা-বেচার ব্যাপারে কথা বলে এসেছি।

গ্রে মাথা নেড়ে ডারউইন বাইবেল দেখাল।

পুরো শরীর দিয়ে নিজের হতাশা প্রকাশ করলেন ইরগেনচেইন, ঠিক প্রকাশ নয়, বলা যায় প্রকাশের ভান করলেন। দুঃখজনক ঘটনা। আগুন লেগে গিয়েছিল। তবে গ্রিট্টি নেয়াল তার নিজের লটের জন্য নিলাম ভবনের সাথে চুক্তি করেছিলেন। তাঁর পক্ষের ব্যারিস্টার যদি না আসে তাহলে এই বাইবেল নিলামে উঠবেই উঠবে, আইন তো সেটাই বলে।

গার্ডের হাতে ধরা থাকা অবস্থায় হেঁচকা টান মারল ফিওনা, খুনের নেশা ওর চোখে।

ইরগেনচেইন যেন ফিওনাকে দেখতেই পাচ্ছেন না। স্যার, ওটা কিনতে হলে আপনাকে নিলামে অংশগ্রহণ করতে হবে, দুঃখিত, আমার হাত বাধা।

তাহলে সেক্ষেত্রে মিস, নেয়াল যদি আমার সাথে থেকে নিলামে অংশগ্রহণ করেন তাহলে নিশ্চয়ই আপনার আপত্তি থাকবে না?

আপনার যেমন মর্জি। ফাটা হাসি দিলেন নিলামদার। ইশারা করে গার্ডকে ছেড়ে দিতে বললেন। তবে সে যেন সবসময় আপনার সাথে থাকে। যেহেতু সে আপনার গেস্ট, সেহেতু তার দায়-দায়িত্ব আপনার।

ফিওনাকে ছেড়ে দেয়া হলো। গ্রে ওকে নিয়ে পেছনে ফিরতে গিয়ে খেয়াল করল গার্ডটিও ওদের সাথে আসছে। দেখে মনে হলো ওরা যেন ব্যক্তিগত বডিগার্ড পেয়ে গেছে!

শেষ সারিতে গিয়ে বসল ওরা। এমন সময় ঘোষণা এলো, আর এক মিনিটের মধ্যে নিলাম অনুষ্ঠান শুরু হতে যাচ্ছে। আসনগুলোতে লোকজন বসতে শুরু করল, অধিকাংশই বসল সামনের অংশের কাছাকাছি। গ্রে আর ফিওনা পেছনের সারিতেই বসে রইল।

তুমি এখানে কী করছ? ফিসফিস করে বলল গ্রে।

আমার বাইবেল ফেরত নিতে এসেছি, তাচ্ছিল্যের সাথে ফিওনা জবাব দিল। কিংবা অন্তত চেষ্টা করে দেখছি।

সিটের পেছনে ধপ করে হেলান দিল ও, চামড়ার পার্সের ওপরে ওর হাত দুটো আড়াআড়ি করে রাখা।

সামনে থাকা মঞ্চে উঠে কিছু সাধারণ নিয়মাবলি ঘোষণা করছেন ইরগেনচেইন। পুরো নিলাম অনুষ্ঠান ইংরেজিতে পরিচালিত হবে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা উপস্থিত আছেন তাই সবার সুবিধার্থে ইংরেজি ভাষা ব্যবহৃত হবে। নিলামে দর হাঁকার নিয়ম বর্ণনা করলেন তিনি। নিলাম ভবনের বিভিন্ন চার্জ থেকে শুরু করে কিছু আদব-কায়দাও শিখিয়ে দিলেন। নিলামে অংশ নেয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়মটি হলো একজন। ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বার দর হাঁকতে পারবে। আর ভবনের ডিপোজিটে যে পরিমাণ অর্থ। জমা রেখেছে সেটাই হবে তাঁর দর হাঁকার সর্বোচ্চ সীমা, অর্থাৎ এর ওপরে আর সে কোনো দর হাঁকতে পারবে না।

এত নিয়ম-কানুন শোনায় কান দিল না গ্রে। ফিওনার সাথে কথা বলতে লাগল, সামনের সারি থেকে কয়েকজন অসন্তুষ্টি নিয়ে তাকাল ওদের দিকে।

তুমি বাইবেলের জন্য এখানে এসেছ? কেন?

জবাব না দিয়ে ফিওনা হাত শক্ত করল।

ফিওনা…

রাগে চোখ-মুখ শক্ত করে গ্রের দিকে তাকাল ফিওনা। কারণ ওটা মাট্টির জিনিস! ওর চোখ ছলছল করতে লাগল। এটার জন্য ওরা ওকে খুন করেছে। আমি ওটা ওদের হাতে যেতে দেব না।

কারা খুন করেছে?

হাত নাড়ল ও। যারাই খুন করে থাকুক, আমি ওটা নেব এবং পুড়িয়ে ফেলব।

শ্বাস ফেলে পেছনে হেলান দিল গ্রে। ফিওনা ওর নিজের সাধ্যমতো প্রতিশোধ নেয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। ও তাদেরকে আঘাত করতে চায়। অবশ্য গ্রে ফিওনাকে দোষও দিতে পারছে না… কিন্তু এভাবে বেপরোয়া আচরণ করলে তো এই বেচারিও মারা পড়বে।

বাইবেল আমাদের। আমি ওটা নিয়ে নেব। বলতে বলতে গলা ভেঙে গেল ওর। মাথা নেড়ে নাক মুছল।

গ্রে ওকে এক হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল।

ফিওনা একটু সংকোচ করলেও গ্রের হাত সরিয়ে দিল না।

সামনে নিলাম শুরু হয়ে গেছে। প্যাডেল উঠছে, নামছে। যে সেরা দাম হাঁকবে সেই জিতবে। গ্রে খেয়াল করে রাখল কে কোন জিনিস কিনে নিচ্ছে। বিশেষ করে ওর নোটবুকে যে জিনিসগুলোর কথা লেখা আছে ওগুলো কারা কিনে নিচ্ছে সেদিকে বাড়তি নজর রাখল। মেন্ডেল-এর জেনেটিক্স পেপার, ফিজিক্সের ওপর লেখা ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কসের বই এবং হিউগো ডি ভ্রিসেস-এর উদ্ভিদ রূপান্তরের ওপর লেখা ডায়েরি।

এইসব জিনিসের ক্রেতা হলো সেই নির্বাক যুগের দুই জন তারকা।

তাদের পরিচয় এখনও অজানা। আশেপাশে বসা অংশগ্রহণকারীদের ফিসফিসানি শুনল গ্রে। না, কেউ-ই তাদের পরিচয় জানে না। প্যাডেল নাম্বার দিয়েই তাদের পরিচয়।

নাম্বার ০০২।

ফিওনার দিকে ঝুঁকল গ্রে। তুমি ওই দুইজনকে চেনো? তোমাদের দোকানে কখনো গিয়েছিল?

নিজের সিটে সোজা হয়ে বসে পুরো মিনিট ধরে পর্যবেক্ষণ করল ফিওনা, তারপর আবার হেলান দিল। না।

এখানকার অন্য কাউকে চেনো?

শ্রাগ করল ও।

তুমি শিওর তো?

হ্যাঁ, কটমট করে বলল ও। শিওর, শিওর, ধেৎ!

ওদের আওয়াজ শুনে সামনে থেকে কয়েকজন পেছনের দিকে ফিরে তাকাল।

অবশেষে সর্বশেষ জিনিসটি নিলামে উঠল। তালাবন্ধ কেস থেকে ডারউইন বাইবেলটিকে রীতিমতো ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্যের সাথে বিশেষ হ্যালোজেন স্পটের নিচে রাখা হলো।

ঢাউস সাইজের গ্রন্থটি দেখতে মোটেও ভাল নয়। কভার হিসেবে থাকা কালো চামড়ার অংশটুকু কীরকম ছিঁড়ে, মলিন হয়ে গেছে। এতে কোনো কিছু লেখাও নেই। এটা যেকোন পুরাতন জার্নালও হতে পারে।

ফিওনা সোজা হয়ে বসল। এই জিনিসের জন্যই তো ও এতক্ষণ বসে আছে। গ্রের কব্জি ধরল ও। তুমি কী ওটার জন্য সত্যিই নিলামে অংশগ্রহণ করবে? প্রশ্ন করল, ওর চোখে আশা।

ভ্রু কুঁচকে তাকাল গ্রে… আইডিয়া তো অত খারাপ নয়। যদি অন্য কেউ এটাকে হাতিয়ে নিতে চায় তাহলে হয়তো কিছু সূত্র পাওয়া যাবে। অন্যদিকে, এই বাইবেলে চোখ বুলানোর জন্য গ্ৰে খুব মুখিয়ে আছে। এছাড়া, সিগমা ফোর্স এই ভবনের ডিপোজিটে ২.৫ মিলিয়ন ডলার দিয়ে রেখেছে, যার মানে গ্রে সর্বোচ্চ ২.৫ মিলিয়ন পর্যন্ত দর হাঁকতে পারবে। ২.৫ মিলিয়ন; বাইবেলের সর্বোচ্চ মূল্যের চেয়েও দ্বিগুণ। যদি ও জেতে তাহলে জিনিসটিকে হাতে নিয়ে পরীক্ষা করে দেখতে পারবে।

লোগান গ্রেগরির হুঁশিয়ারি আদেশ ওর এখনও মনে আছে। কিন্তু ফিওনাকে অনুসরণ করে এখানে ঢুকে সেই আদেশ অনেক আগেই ভঙ্গ করেছে ও। গ্রে এরচেয়ে আর বেশি বাড়াবাড়ি করার দুঃসাহস দেখাতে চায় না।

ও বুঝতে পারল ফিওনা ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে।

দর হাঁকতে শুরু করলেই ওদের জীবন হুমকির মধ্যে পড়ে যাবে। নিজেদের কপালে নিজেরাই ওয়ান্টেড সিল মারা হবে। আর যদি হেরে যায়? তাহলে এই ঝুঁকি নেয়া সম্পূর্ণ বৃথা। গ্রে আজ যথেষ্ট বোকামি করেছে, আরও করবে নাকি?

সুধীবৃন্দ, আজকের এই সর্বশেষ আইটেমের জন্য কত দাম দিয়ে নিলাম শুরু করা যায় বলুন তো? চমৎকারভাবে বললেন ইরগেনচেইন। এক লাখ ডলার দিয়েই শুরু করি? হ্যাঁ, শুরু হয়ে গেছে… নতুন একজন দর হেঁকেছেন। নাম্বার ১৪৪।

প্যাডেল নামাল গ্রে, সবাই ওর দিকে তাকিয়ে আছে, কী যেন বলাবলি করছে ওরা।

ওর পাশে বসে চওড়া হাসি দিল ফিওনা।

দ্বিগুণ দর, বললেন ইরগেনচেইন। দুই লাখ ডলার, নাম্বার ০০২!

এবার তারকা যুগল দর হেঁকেছে।

গ্ৰে অনুভব করল ওই দুইজনসহ পুরো রুমসুদ্ধ লোক এবার ওর দিকে তাকিয়ে আছে। এখন আর পিছিয়ে আসা চলবে না, দেরি হয়েছে গেছে। গ্রে প্যাডেল উঁচু করল।

পরবর্তী আরও ১০ মিনিট ধরে টানটান উত্তেজনাপূর্ণভাবে দর হাঁকা-হাকি চলল। নিলাম রুম থেকে কেউ চলে যায়নি। সবাই বসে আছে। ডারউইন বাইবেল কে নেয় সেটা দেখার জন্য অপেক্ষা করছে সবাই। গ্রের জন্য কিছু অপ্রত্যাশিত সাহায্য চলে এলো। দর হাঁকতে যাওয়া আরও বেশ কয়েকজনকে হারিয়ে বীরদর্পে নিলামে টিকে রইল ০০২ ধারী দুজন। অর্থের পরিমাণ ইতোমধ্যে ২০ লাখ অর্থাৎ ২ মিলিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। বাইবেলের সর্বোচ্চ মূল্যকে ছাপিয়ে দর বেড়ে যাওয়া গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল রুমের মধ্যে।

মাঝখানে হঠাৎ করে একজন দর হেঁকে বাজিমাৎ করার চেষ্টা করলেও নাম্বার ০০২ তাকেও উড়িয়ে দেয়। মজার ব্যাপার হলো, সেই ব্যক্তি আর দর হাঁকার সাহস করেনি।

তবে গ্রে হাঁকল। ২.৩ মিলিয়ন। ওর হাতের তালু ঘেমে যাচ্ছে।

২.৪ মিলিয়ন হাঁকলেন… নাম্বার ০০২! সুধীবৃন্দ সবাই যার যার আসনে বসে থাকুন।

আবার প্যাডেল তুলল গ্রে।

২.৫ মিলিয়ন।

গ্রে জানে ওর দম শেষ। এবার ০০২ আবার প্যাডেল তুলবে আর ও সেটা চেয়ে চেয়ে দেখবে। ০০২ একদম অপ্রতিরোধ্য।

তিন মিলিয়ন, যুগল থেকে পুরুষটি ঘোষণা করল, উঠে দাঁড়িয়ে গ্রের দিকে তাকাল সে। যেন চ্যালেঞ্জ করছে।

নিজেও সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে গেছে গ্রে। চাইলেও আর দর হাঁকতে পারবে না। প্যাডেল নিচু রেখে মাথা নাড়ল ও। হার স্বীকার করে নিল।

বাউ করল অপরজন, প্রতিপক্ষের প্রতি সৌজন্যতা আরকী। একটি কাল্পনিক হ্যাঁটে হাত ছোঁয়াল সে। গ্রে খেয়াল করল তার ডান হাতের বুড়ো আঙুল আর তর্জনীর মাঝখানে জালের মতো জড়িয়ে থাকা নীল রঙের একটি দাগ আছে। ট্যাটু। এখন পুরুষের সাথে সাথা সঙ্গিণীটির সম্পর্কেও গ্রে ধারণা পেল। হয়তো এরা দুই ভাই-বোন, এমনকী যমজও হতে পারে, এই একই চিহ্ন মেয়েটির বাম হাতে আছে।

গ্রে ট্যাটুটি মনের মধ্যে গেঁথে নিল। হয়তো তাদের পরিচয়ের ব্যাপারে এটা একটা সূত্র হিসেবে কাজে আসবে।

নিলামদারের কথায় ওর মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হলো।

দেখা যাচ্ছে নাম্বার ১৪৪-এর দৌড় শেষ! বললেন ইরগেনচেইন। আর কেউ দর হাঁকবেন? এক, দুই, তিন। হাতুড়ি তুলে নিয়ে কয়েক মুহূর্ত ধরে রাখার পর বাড়ি মারলেন তিনি। নিলাম শেষ!

সৌজন্যবশত হাততালি দিলো সবাই।

গ্রে জানে, ও যদি জিততো তাহলে হাততালি আরও জোরে হতো। তবে পাশ থেকে একজনকে হাততালি দিতে দেখে যারপরনাই অবাক হলো ও।

ফিওনা।

দাঁত বের করে হাসল মেয়েটি। চলো, এখান থেকে বের হই।

অন্য সবার সাথে দরজার দিকে পা বাড়াল ওরা। বেরোতে বেরোতে কয়েকজন ব্যর্থ ক্রেতা ওকে সান্তনা দিল। রাস্তায় পৌঁছে গেল সবাই। যে যার গন্তব্যে রওনা হলো।

ফিওনা ওকে টেনে নিয়ে কয়েক দোকান পেছনে থাকা একটি পেস্ট্রি শপে গেল। এখানে লোহার টেবিল আর পর্দার সুব্যবস্থা আছে। গ্রেকে নিয়ে সুস্বাদু লোভনীয় চকলেটের ডিসপ্লের সামনে দাঁড়াল ফিওনা। চকলেটের পাশাপাশি এখানে ডেনিশ স্যান্ডউইচও আছে।

তবে ফিওনা এসবের দিকে কোনো নজর দিল না। ওর ভেতরে অদ্ভুত উল্লাস খেলা করছে।

তুমি এত খুশি কেন? গ্রে অবশেষে প্রশ্ন করল। আমরা তো নিলামে হেরে গেছি।

জানালার দিকে তাকিয়ে আছে গ্রে। নিজের পেছন দিকটার প্রতি নজর রাখা দরকার। তবে যেহেতু বাইবেল বিক্রি হয়ে গেছে সে হিসেবে বিপদ হয়তো আগের মতো নেই, গ্রে ভাবল।

আমরা ওদেরকে ভুগিয়েছি! বলল ফিওনা। দাম তুলে দিয়েছি ৩ মিলিয়ন পর্যন্ত। ফাটাফাটি!

আমার তো মনে হয়, টাকা-পয়সা ওদের কাছে তেমন কোনো ব্যাপার না।

ফিওনা খোঁপা থেকে পিন বের করে চুলগুলো ছেড়ে দিল। ঝপ করে অনেকখানি বয়স কমে গেল ওর। চোখগুলো উজ্জ্বল, খুব খুশি, তবে ওই উজ্জ্বলতার মাঝে একটু বিদ্বেষেরও ছাপ দেখা গেল।

ওর এরকম আচরণ দেখতে দেখতে হঠাৎ পেটের ভেতরে কী যেন মোচড় দিয়ে উঠল গ্রের।

ফিওনা, কী কাণ্ড করেছ তুমি?

নিজের পার্স খুলে গ্রের দিকে কাত করে ধরল। উঁকি দিল গ্রে।

ও খোদা! ফিওনা… তুমি…

চামড়ায় মোড়ানো পুরোনো একটি গ্রন্থ ওর পার্সে জায়গা করে নিয়েছে।

ঠিক একই রকম দেখতে একটি ডারউইন বাইবেল মাত্র বিক্রি হয়ে গেল।

এটা আসলটা? প্রশ্ন করল গ্রে।

যখন পেছনের রুমে ছিলাম তখন ওই ব্যাটা কানা নিলামদারের নাকের নিচ দিয়ে এটা নিয়ে নিয়েছি।

কীভাবে…?

টোপ ফেলে মাছ ধরার মতো ব্যাপার। বাইবেলের সঠিক মাপ ঠিক করে নিতে আমার প্রায় সারাদিন লেগেছিল। পরে অবশ্য ওটাকে একটু ঘষা-মাজা করেছি। তারপর কেঁদে বুক ভাসিয়ে, চিৎকার চেঁচামেচি আর একটু আনাড়িপনা দেখিয়েছি… শ্রাগ করল ও। ব্যস, কাজ হয়ে গেল।

তোমার কাছে যেহেতু বাইবেল ছিলই তাহলে কেন আমাকে দিয়ে দর হাঁকালে…? গ্রে ব্যাপারটা অনুধাবন করল। তুমি আমাকে ব্যবহার করেছ। খেলেছ আমার সাথে।

আরে না। দুই পেন্স দামের ভুয়া জিনিসের জন্য ওই বেজন্মাগুলোর পকেট থেকে তিন মিলিয়ন ডলার খসিয়ে দেয়ার জন্য করেছি!

খুব শীঘ্রি ওরা টের পাবে ওটা আসল জিনিস নয়, বলল গ্রে, কণ্ঠে ভয়।

জানি। কিন্তু ততক্ষণে আমিও পগার পার হয়ে যাব।

কোথায়?

তোমার সাথে। ফিওনা পার্স বন্ধ করল।

জ্বী, না।

তোমার মনে আছে, মাটি তোমাকে একটা ভেঙ্গে দেয়া লাইব্রেরির কথা বলেছিল?

গ্রে জানে ফিওনা কী বলতে চাইছে। গ্রিট্টি নেয়াল ওকে আভাস দিয়েছিলেন কে বা কারা যেন পুরো বিজ্ঞানীদের লাইব্রেরিকে নতুন করে গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। তিনি ওকে বিলের আসল কপি দেখাতে যাবেন এমন সময় হামলাটা হলো, সব নষ্ট হয়ে গেল

কপালে হাত দিল ফিওনা। আমার কাছে সব ঠিকানা লিখে রাখা আছে। ও এক হাত সামনে বাড়িয়ে দিল। তাহলে?

ভ্রু কুঁচকে হ্যান্ডশেক করতে যাচ্ছিল গ্রে।

মুখ হাঁড়ি করে ফিওনা হাত সরিয়ে নিল। তার আগে, আবার হাত বাড়িয়ে দিল ও, হাতের তালু পেতে দিয়েছে। আমি তোমার আসল পাসপোর্ট দেখতে চাই। তোমার কী মনে হয়, ভুয়া পাসপোর্ট আমি চিনি না?

ওর দিকে তাকাল গ্রে। এই মেয়ে এর আগে ওর পাসপোর্ট চুরি করেছিল। এখন হাবভাব দেখে সুবিধের মনে হচ্ছে না, একদম নাছোড়বান্দা। ভ্রু কুঁচকে স্যুটের গোপন পকেট থেকে আসল পাসপোর্ট বের করল গ্রে।

ফিওনা পড়ল। গ্রেসন পিয়ার্স। রেখে দিল টেবিলে। অবশেষে… নাইস টু মিট

পাসপোর্ট ফেরত নিল গ্রে। এখন বলল, বাইবেলটা এলো কোথা থেকে?

বলব, যদি তুমি আমাকে তোমার সাথে নাও।

ঠাট্টা কোরো না। তুমি একটা বাচ্চা মেয়ে, আমার সাথে আসতে পারো না।

বাচ্চা মেয়ে, সাথে কিন্তু ডারউইনের বাইবেলও আছে।

ফিওনার ব্ল্যাকমেইল দেখে গ্রে বিরক্ত হলো। ওর কাছ থেকে এই বাইবেল ছিনিয়ে নেয়া গ্রের বাঁ হাতের খেলা কিন্তু তথ্য তো আর ওভাবে আদায় করা যাবে না।

ফিওনা, এটা কিন্তু কোনো ছেলেখেলা নয়।

শক্ত করে ওর দিকে তাকাল ফিওনা। তুমি কি ভেবেছ, আমি সেটা বুঝি না? শীতল গলায় বলল ও। আমার মাট্টিকে যখন ব্যাগে করে নিয়ে যাচ্ছিল তখন তুমি কোথায় ছিলে? ব্যাগে করে নিচ্ছিল ওরা।

চোখ বন্ধ করল গ্রে। মেয়েটা ওর নার্ডে আঘাত করেছে তবে ও নরম হলো না। ফিওনা, আমি দুঃখিত। টানটান গলায় বলল ও। কিন্তু তুমি যেটা বলছ সেটা সম্ভব নয়। আমি পারব না…।

বিস্ফোরণের ধাক্কায় ভূমিকম্পের মতো দোকান দুলে উঠল। ঝনঝন করে উঠল সামনের গ্লাসগুলো। গ্রে আর ফিওনা উঠে গিয়ে দাঁড়াল জানালার কাছে। রাস্তা ধোয়ায় ছেয়ে গেছে। ধোয়ার কিছু অংশ যাত্রা শুরু করেছে ঝাপসা আকাশের দিকে।

গ্রের দিকে তাকাল ফিওনা। দাঁড়াও আমি আন্দাজ করে বলছি, কোথায় হয়েছে।

আমার হোটেল রুম, গ্রে স্বীকার করল।

শুরু হিসেবে ধাক্কাটা একটু বেশিই হয়ে গেছে।

.

রাত ১১টা ৪৭ মিনিট।
হিমালয়।

জার্মানদের হাতে বন্দি হয়েছে লিসা ও পেইন্টার। ওদের দুজনকে একটি স্লেজে বসিয়ে সেটাকে আরেক সোমোবাইল দিয়ে টেনে নেয়া হচ্ছে। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে চলছে ওরা। প্লাস্টিক স্ট্রীপ দিয়ে ওদের দুজনকে একসাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। পেছনে পেইন্টার, সামনে লিসা।

এরকম অবস্থাতেও লিসার দিকে কুঁজো হয়ে ঝুঁকে আছে পেইন্টার, নিজের শরীর দিয়ে যতদূর সম্ভব লিসাকে সাহায্য করছে। ওর দিকে পিঠ দিয়ে হেলান দিয়ে রয়েছে লিসা। দুপাশের দণ্ডে সাথে ওদের দুই জোড়া হাত বাঁধা।

সামনে থাকা সোমোবাইলের পেছনের সিটে বসেছে সেই আক্রমণকারী। ওদের দিকে মুখ করে আছে, হাতে রাইফেল, ওটাও ওদের দিকে তাক করা। তার ভিন্ন চোখ দুটো একবারও ওদের ওপর থেকে সরছে না। ওই সোমোবাইল চালাচ্ছেন অ্যানা স্পোরেনবার্গ, এই দলের নেত্রী।

এই দলটি সাবেক নাৎসি।

কিংবা নাসির সংস্কার ভার্শন।

অথবা যা-ই হোক…

এই প্রসঙ্গ একপাশে সরিয়ে রাখল পেইন্টার। এই মুহূর্তে এরচেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে ওকে মাথা ঘামাতে হবে।

বাঁচতে হবে।

পথে যেতে যেতে পেইন্টার বুঝতে পারল, গুহায় লুকিয়ে থাকা সত্ত্বেও কীভাবে ধরা পড়েছিল ওরা। সব ইনফ্রারেডের কেরামতি। এরকম ঠাণ্ডা অঞ্চলে ওদের শরীর থেকে বেরিয়ে যাওয়া তাপমাত্রার চিহ্ন দেখে দেখে সহজেই গুহা আবিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে।

ওই পদ্ধতি ব্যবহার করলে এই অঞ্চলের কোথাও লুকিয়ে থাকা প্রায় অসম্ভব।

চিন্তা-ভাবনা চালিয়ে যেতে থাকল ও। মনকে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে স্থির করে রেখেছে।

পালাতে হবে।

গত এক ঘণ্টা যাবত শীতের রাত কেটে স্নোমোবাইলের এই কাফেলা সুন্দরভাবে ছুটে চলেছে। ইলেকট্রিক মোটর দিয়ে চলছে এগুলো, প্রায় নিঃশব্দে এগোচ্ছে। এই ৫টি স্নোমোবাইল এই গোলকধাঁধার মতো অঞ্চল দেদারছে পাড়ি দিয়ে সামনে এগোচ্ছে, একদম নীরবে। কখনও খাড়া পাহাড় থেকে পিছলে নামছে, কখনও নেমে যাচ্ছে গভীর উপত্যকায়, আবার কখনও বরফের সেতু পার হচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে, সবকিছু এই দলের চেনা পরিচিত।

পেইন্টার এই রাস্তা মনে গেঁথে নেয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করল। কিন্তু শান্তি আর গোলকধাঁধাময় রাস্তার জটিলতার কাছে হার স্বীকার করতে ব্যর্থ হলো ও। মাথা আবার দপদপ করছে, ঝিমঝিম করছে। মাথা ঘোরাচ্ছে। পেইন্টার মেনে নিল, সেই লক্ষণগুলো এখনও ওর শরীর থেকে চলে যায়নি। এটাও স্বীকার করে নিল, ও একদম হেরে গেছে।

ঘাড় বাঁকিয়ে রাতের আকাশের দিকে তাকাল ও।

আকাশে তারাগুলো ঠাণ্ডা আলো ছড়াচ্ছে।

হয়তো তাঁর অবস্থান নির্ণয় করে ও কোন জায়গায় আছে সে-সম্পর্কে ধারণা করতে পারবে।

ওপরের দিকে তাকিয়ে তারাগুলোকে ভাল করে লক্ষ করতে যাবে এমন সময় চোখ সরিয়ে নিল ও। চোখের পেছন দিকটা প্রচণ্ড ব্যথা করছে।

তুমি ঠিক আছে তো? ওর দিকে পেছন ফিরে ফিসফিস করল লিসা।

বিড়বিড় করে অসন্তোষ প্রকাশ করল পেইন্টার। কথা বলতে গেলে বমি হয়ে যেতে পারে।

তোমার চোখ ব্যথা করছে? লিসা অনুমান করল।

কর্কশভাবে ঘোঁতঘোঁত করে চোখ সাদা লোকটি ওদেরকে চুপ করিয়ে দিল। খুশি হলো পেইন্টার। চোখ বন্ধ করে গভীরভাবে দম নিল ও। এই মুহূর্তটুকু কেটে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে।

সময় কেটে গেল একসময়।

একটি পাথুরে পাহাড়ের চূড়োয় উঠে যখন স্নোমোবাইলগুলো আস্তে আস্তে থামছে, এমন সময় চোখ খুলল ও। চারিদিকে চোখ বুলাল পেইন্টার ক্রো। এখানে তো কিছুই নেই। একটি বরফআচ্ছাদিত পাহাড়ের খাড়া অংশ পাথুরে পাহাড়ের ডান দিকে ভেঙ্গে পড়ে আছে। এতক্ষণ তুষার পড়ছিল না, এখন পড়তে শুরু করল।

এরা এখানে থামল কেন?

সামনের স্নোমোবাইল থেকে নামল আক্রমণকারী।

অ্যানাও নামলেন। বিশালদেহী লোকটি অ্যানার সাথে জার্মান ভাষায় কথা বলছে।

সোজা হয়ে কথাগুলো শোনার চেষ্টা করতেই লোকটির শেষ কয়েকটি শব্দ শুনতে পেল ক্রো।

… ওদের মেরে ফেললেই তো হয়।

রাগ কিংবা প্রতিহিংসা নিয়ে বলেনি, একদম ঠাণ্ডা মাথায় শব্দগুলো উচ্চারণ করেছে।

অ্যানা ভ্রু কুঁচকালেন। গানথার, আমাদেরকে আরও কিছু জেনে নিতে হবে। পেইন্টারের দিকে তাকালেন তিনি। তুমি ভো জানোই, আমাদের এখানে বিভিন্ন রকম সমস্যা দেখা দিচ্ছে। যদি তাকে এখানে পাঠানো হয়ে থাকে… যদি সে এমন কিছু জানে যেটা এই ব্যাপারগুলো বন্ধ করতে পারে?

ওরা কী নিয়ে কথা বলছে পেইন্টার সেটার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝল না। তবে ওদেরকে ওদের মতো করে উল্টাপাল্টা ভাবতে দিল। উল্টাপাল্টা ভাবতে দিয়ে যদি বেঁচে থাকা যায় তাহলে ওটাই ভাল।

মাথা নাড়ল গানথার। ও একটা সমস্যা। আমি বুঝতে পারছি। অন্যদিকে ঘুরল ও। আর কথা বলবে না।

অ্যানা ওর গালে আলতো করে হাত দিয়ে থামালেন। স্নেহ, মমতা, কৃতজ্ঞতা নাকি তারচে বেশি কিছু…? Danke, গানথার।

মানল না সে। পেইন্টার ওর চোখে একধরনের যন্ত্রণার ছাপ দেখতে পেল। পা টেনে টেনে খাড়া ভাঙ্গা পাহাড়ের দিকে গেল সে। দেয়ালের একটি ফাটলের ভেতরে অদৃশ্য হয়ে গেল। একটু পর ওদিক দিয়ে বেরিয়ে মিলিয়ে গেল ধোয়ার মেঘ।

একটা দরজা খুলে আবার বন্ধ হলো।

বিড়বিড় করে উপহাসমূলক একটি শব্দ উচ্চারণ করল পেছনে থাকা একজন গার্ড। অপমানজনক শব্দটা ওই গার্ডের কাছে যারা আছে তারা ছাড়া আরও কেউ শুনতে পায়নি।

Leprakonige

কুষ্ঠরোগী। পেইন্টার খেয়াল করল বিশালদেহী গানথার যতক্ষণ পর্যন্ত দৃষ্টিসীমার ভেতরে ছিল ততক্ষণ গার্ড কিছু বলেনি। গানথারের মুখের ওপর বলার সাহস নেই ওর। তবে গানখারের ঝুলে যাওয়া কাঁধ আর বদমেজাজি স্বভাব দেখে ক্রো আন্দাজ করল, সে এই কথা এর আগেও শুনেছে।

স্নোমোবাইলে চড়ে বসলেন অ্যানা। গানখারের সিটে এক নতুন গার্ড বসল। এর হাতেও রাইফেল আছে, ওদের দিকে তাক করা। আবার রওনা হলো সবাই।

একটু ঘুরে উঠে আরও গভীর গিরিসঙ্কটের দিকে যাত্রা করল ওরা। সামনের রাস্তা জুড়ে বরফ আচ্ছাদিত কুয়াশায় ভরা, নিচে কী আছে ঠিকমতো দেখা যায় না। কুয়াশার উপরে একটি পাহাড়ের ভারী শৃঙ্গ এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে দেখে মনে হচ্ছে, এই কুয়াশাকে আগুন ভেবে হাত সেঁকছে কেউ।

কুয়াশার সমুদ্রে ডুব দিল ওরা। হেডলাইট জ্বালিয়ে দিয়েছে।

কয়েক ফুটে নেমে এসেছে দৃষ্টিসীমা। তারাগুলো আর দেখা যাচ্ছে না।

তারপর হঠাৎ করে ওরা গভীর অন্ধকারে তলিয়ে গেল। মনে হলো, ওদের মাথার উপরে ছায়ার সামিয়ানা ঝুলছে। কিন্তু মজার বিষয় হলো, এরকম অবস্থায় ঠাণ্ডার প্রকোপ না বেড়ে বরং কমতে শুরু করল। সামনে এগোতে গিয়ে দেখা গেল পাথুরে পাহাড়ের গায়ে আর বরফ নেই। বড় বড় পাথরের পাশ দিয়ে বরফগলা পানি গড়াচ্ছে।

পেইন্টার বুঝতে পারল ওরা কোনো এক প্রাকৃতিক উষ্ণ এলাকায় চলে এসেছে। উত্তাপের প্রাকৃতিক উৎস আছে এখানে। হিমালয়ের ভেতরে থাকা গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বসন্তের কথা এখানকার খুব কম মানুষই জানে। ভারতীয় উপমহাদেশের ভূখণ্ডের নিচে থাকা প্লেটের চাপে এরকম প্রাকৃতিক উষ্ণ অঞ্চল তৈরি হয়ে থাকে। মনে করা হয়, এরকম অঞ্চল থেকেই সাংরি-লা পৌরাণিক কাহিনির জন্ম।

তুষার কমে যেতে থাকায় সোমোবাইল রেখে দিতে বাধ্য হলো ওরা। ওগুলো পার্ক করার পর লিসা আর পেইন্টারকে স্লেজ গাড়ি থেকে মুক্ত করে কব্জিতে হাতকড়া পরিয়ে দেয়া হলো। হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো ওদের। লিসার কাছাকাছি থাকল ক্রো। দুজনের চোখেই দুশ্চিন্তা।

কোথায় ওরা? এটা কোন জায়গা?

রাইফেল আর পারকাঅলা গার্ড দ্বারা বেষ্টিত হয়ে বাকি পথ এগোল ওরা। তুষারের বদলে ওদের পায়ের নিচে ভেজা পাথর উদয় হলো। পাথর কেটে সিঁড়ি তৈরি করা হয়েছে, বরফ গলা পানি গড়াচ্ছে এখানে। সামনে আর আগের মতো পুরু কুয়াশার চাদর নেই।

কয়েক পা এগোতেই সামনের আঘো অন্ধকারে একটি খাড়া পাহাড়ের মুখ দেখা গেল। পর্বতের আশ্রয়ে ওটার অবস্থান। প্রাকৃতিকভাবে তৈরি একটি গভীর গুহা। এটা কোনো স্বর্গউদ্যান নয়… জায়গাটি কালো গ্রানাইটে ভরপুর, গরমে ঘামছে ওগুলো।

সাংরি-লার চেয়েও বেশি গরম এখানে।

ক্রোর পাশে হোঁচট খেল লিসা। হাত বাঁধা থাকার পরও ক্রো যতদূর সম্ভব ওকে ধরে রাখার চেষ্টা করল। তবে ও বুঝতে পারল লিসা দুর্বলভাবে পা ফেলছে।

সামনে জলীয় বাষ্পের পর্দা ফুড়ে একটি ক্যাসলের (অট্টালিকা) উদয় হলো।

ঠিক পুরো না, তবে আধা ক্যাসল বলা যায়।

কাছে এগোতেই পেইন্টার বুঝতে পারল এটা অট্টলিকার সম্মুখভাগ। চলে গেছে একদম গুহার শেষ অংশ পর্যন্ত। কামান-গোলা নিক্ষেপের জন্য ছিদ্রবিশিষ্ট দুটো বড় টাওয়ার দাঁড়িয়ে আছে দুপাশে। মোটা কাঁচের জানালার পেছন থেকে আলো আসছে।

GranitschloB, ঘোষণা করলেন আনা। ওদের সবাইকে নিয়ে প্রবেশ পথের দিকে এগোলেন। তার চেয়ে দ্বিগুণ উচ্চতার গ্রানাইট বীরগণ প্রবেশ পথে দাঁড়িয়ে আছে।

কালো লোহার পাত দিয়ে মোড়ানো ভারী ওক কাঠের একটি দরজা প্রবেশপথ আগলে দাঁড়িয়ে আছে। দলটি এগোতেই কপিকল উপরে উঠতে শুরু করে প্রবেশদ্বার খুলে দিল।

বড় বড় পা ফেলে এগোলেন অ্যানা। চলো সবাই। অনেক রাত হয়ে গেল।

অস্ত্রের মুখে প্রবেশদ্বারে ঢুকল লিসা ও ক্রো। গুহার ছাদ, কিনারা, পাঁচিল ও ধনুকাকৃতির জানালাগুলো পর্যবেক্ষণ করল পেইন্টার। পুরো মেঝেতে থাকা গ্রানাইট ঘেমে ভিজে উঠেছে। কালো তেলের মতো পানি গড়াচ্ছে। মনে হলো, এই ক্যাসল বোধহয় চোখের সামনে গলে কালো পাথুরে চেহারায় ফিরে যাচ্ছে।

কয়েকটি জানালা থেকে বের হওয়া আলো ক্যাসলের মেঝেকে নরকের মতো উজ্জ্বল করে তুলেছে। এই দৃশ্য দেখে ক্রোর হিরনিমাস বস-এর পেইন্টিঙের কথা মনে পড়ে গেল। পঞ্চদশ শতাব্দীতে এই শিল্পী নরকের বিভিন্ন ছবি আঁকার ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ ছিলেন। যদি বসক-কে আন্ডারওয়ার্ল্ডের গেইটের ভাস্কর্য করতে দেয়া হতো তাহলে এই ক্যাসলের মতো করতেন তিনি।

অ্যানার পিছু পিছু ক্রো বাধ্য হয়ে এগোল। ক্যাসলের ধনুকাকৃতির প্রবেশদ্বারের নিচ দিয়ে প্রবেশ করল ওরা। উপরের দিকে তাকাল ক্রো। আন্ডারওয়ার্ল্ডের গেইটে থাকা দান্তের কথাগুলো হয়তো এখানে লেখা থাকতে পারে।

এখানে যে ঢুকবে তার আর কোনো আশা নেই।

কিন্তু কথাগুলো লেখা নেই এখানে… তবে এখানে কোনো আশাও নেই।

কোনো আশা নেই…

এই ক্যাসলে যে ঢুকবে তাদের আর কোনো আশা নেই।

.

রাত ৮টা ১৫ মিনিট।
কোপেনহ্যাগেন, ডেনমার্ক।

হোটেলে বিস্ফোরণের শব্দ মিলিয়ে যেতেই ফিওনার হাত ধরে দোকানের বাইরে বেরিয়ে এলো গ্রে। উৎসাহী জনতার ভিড় ঠেলে পাশের গলির দিকে রওনা হলো।

সাইরেনের আওয়াজ ভেসে এলো দূর থেকে।

আজ সারাদিনে কোপেনহ্যাগেনের দমকল কর্মীদের অনেক দৌড়াতে হলো।

গলির কোণায় গিয়ে পৌঁছাল গ্রে। ধোঁয়া আর মানুষের হল্লা থেকে দূরে চলে এসেছে। ফিওনাকেও টেনে নিয়ে এসেছে সাথে করে। অস্ত্রধারীকে খুঁজছে।

পেয়েও গেল। একজন নারী।

কাছেই আছে। রাস্তার ওপাশে আধ-ব্লক পেছনে।

এই সাদা চুলঅলি মহিলা নিলাম অনুষ্ঠানেও ছিল। তার পরনে শোভা পাচ্ছে আঁটোসাটো কালো স্যুট, দৌড়-ঝাঁপের জন্য এরকম পোশাক খুবই উপযোগী। হাতে সাইলেন্সর লাগানো পিস্তল। হাঁটুর কাছে ওটা নামিয়ে ওদের দিকে বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে আসছে। এক হাত রেখেছে কানে, ঠোঁট নড়ছে।

রেডিও।

ল্যাম্পপোস্টের নিচ দিয়ে তাকে এগোতে দেখেই গ্রে বুঝতে পারল, ও ভুল করেছে। এই মহিলা নিলাম অনুষ্ঠানে ছিল না। সেই মহিলার চুল আরও বড় ছিল, চেহারা আরেকটু রোগা ছিল।

হয়তো তার বড় বোন।

অন্যদিকে ঘুরল গ্রে।

ও আশা করছিল ফিওনা এতক্ষণে দৌড়ে গলির অর্ধেকে চলে গেছে। কিন্তু দেখা গেল, মাত্র ১৫ ফুট দূরে একটি মরচে ধরা সবুজ রঙের ভেসপা স্কুটারের দুপাশে পা দিয়ে কী যেন করছে সে।

কী করছ তু…?

দেখি চড়া যায় কি-না। পার্স খুলে একটি ক্রু-ড্রাইভার বের করে স্কুটারের পেছনে রাখল।

জলদি ওর পাশে গেল গ্রে। এটার ওপর চুরিবিদ্যা ফলানোর মতো সময় নেই। কিন্তু।

কাঁধের ওপর দিয়ে গ্রের দিকে তাকাল ফিওনা। স্কুটারকে স্টার্ট দেয়ার জন্য অন্ধের মতো বিভিন্ন তারের মধ্যে ওর আঙুলগুলো হাতড়ে বেড়াচ্ছে। দুটো তার দিয়ে চেষ্টা করল। কেশে উঠে, চিৎকার দিয়ে থেমে গেল ইঞ্জিন।

ধেৎ…

ফিওনা বেশ ভালই চেষ্টা করছিল…. কিন্তু ওর ওপরে আর ভরসা করা যাচ্ছে না।

গ্রে ওকে পেছনে যাওয়ার ইশারা করল। আমি চালাব।

শ্রাগ করে পেছনের সিটে গেল ফিওনা। স্কুটারে চড়ে গ্রে ওটার স্টার্টারে লাথি মেরে ইঞ্জিন চালু করার চেষ্টা করল। হেডলাইট অফ করে অন্ধকার গলিতে নেমে গেল ও। ঠিক নেমে যাওয়া বলা যায় না, স্কুটারকে টেনে-টুনে নিয়ে গেল আরকী।

চালু হ রে বাবা, বলল গ্রে।

দুই নম্বর গিয়ারে তুলে দাও, ফিওনা বলল। এই বুড়ো জিনিসের ভেতর থেকে শক্তি বের করতে হলে কৌশল খাটাতে হবে।

পেছনের সিটে বসা কোনো মাতব্বরকে আমার প্রয়োজন নেই।

মুখে বললেও গ্রে ঠিকই ফিওনার কথা শুনে ক্লাস চেপে গিয়ার বদলাল। চমকে ওঠা বাচ্চা ঘোড়ার মতো লাফ দিল স্কুটার। গলির ভেতর দিয়ে দ্রুত এগোল ওরা। স্তূপ আর ডাস্টবিনের বিভিন্ন ময়লার ওপর দিয়ে ঝাঁকি খেতে খেতে এগোল।

সাইরেনের আওয়াজ হলো ওদের পেছনে। গ্রে পেছনে তাকাল। দমকলের গাড়ি গলিমুখে এসে দাঁড়িয়েছে, ওটার আলো ঝিকমিক ঝিকমিক করছে, বিস্ফোরণের আগুন নেভাতে হাজির হয়েছে। ঘাড় ফেরাবার আগেই ল্যাম্পপোস্টের আলোতে একটি শরীরে অবয়ব দেখল গ্রে।

শুটার।

গ্রে গতি বাড়িয়ে দিল। স্কুটারকে একটি লম্বা কন্সট্রাকশন বিমের পাশে নিয়ে শুটারের কাছ থেকে নিজেদের আড়াল করল ও। দেয়ালের পাশ ঘেঁষে এগোলে গলির মাথা থেকে সোজা গুলি খেতে হতো।

ওদের সামনে বড় রাস্তার আলো দেখা যাচ্ছে। ওটাই ওদের একমাত্র ভরসা।

সামনে খেয়াল রাখতে রাখতে গ্ৰে দেখল দ্বিতীয় আরেকটি অবয়ব হাজির। পাশ দিয়ে একটি গাড়ি যেতেই ওটার হেডলাইটের আলোতে তার সাদা চুলগুলো রুপোলি দেখাল। পুরুষ। পরনে কালো লম্বা ডাস্টার জ্যাকেট। পেছনের জনের জাত ভাই হাজির। কোট সরিয়ে একটি শটগান বের করল সে।

ওই মহিলা নিশ্চয়ই একে রেডিওতে বলে অ্যামবুশ করার জন্য সেট করেছে।

শক্ত করে ধরে থাকো! গ্রে হাঁক ছাড়ল।

এক হাত শটগান উঁচিয়ে ধরতেই গ্রে খেয়াল করল এই ব্যক্তির অন্য হাত ব্যান্ডেজ করা। কব্জি থেকে কনুই পর্যন্ত। যদিও তার চেহারায় ছায়া ঢাকা রয়েছে, তবুও গ্রে বুঝতে পারল লোকটা কে।

এই ব্যক্তি গ্রিট্টি নেয়ালকে খুন করেছিল।

বারটেলের আক্রমণের স্বীকার হওয়ার পর সেগুলোর জঘমে এখন ব্যান্ডেজ করে এসেছে।

শটগান গ্রের দিকে তাক করা হলো।

হাতে সময় নেই।

হাতল ঘুরিয়ে স্কুটারটিকে লোকটার দিকে হেঁচড়ে স্কিড করাল গ্রে।

ঝলসে উঠল শটগান। পাশের বাড়ির দরজায় ছররা গুলি হামলে পড়ল।

প্রচণ্ড ভয়ে চিৎকার করে উঠল ফিওনা।

তবে গুলি ছোঁড়া হয়েছে ওই একবারই। স্কুটারকে ছুটে আসতে দেখে শুটার একপাশে সরে গেছে। গলির সামনের অংশ ফাঁকা হওয়ার পর স্কুটার তুলল গ্রে। সিমেন্টের রাস্তার ওপর রাবারের টায়ার আর্তনাদ করে উঠল। রাস্তায় ওঠার সময় একটি অডি গাড়ির ড্রাইভার কয়েকবার হর্ন দিয়ে সতর্ক করল ওকে।

গ্রে রওনা হলো।

হাতের মুঠো ঢিলা দিল ফিওনা।

ধীর গতিতে এগোনো গাড়ির ভেতর দিয়ে চলল ওরা, রাস্তা ঢালু হয়ে নেমে যেতেই ওদের গতি বাড়তে শুরু করল। নিচে এই রাস্তা দিয়ে একটি ক্রসরোডের সাথে গিয়ে শেষ হয়েছে। তীক্ষ্ণ বাঁক নেয়ার জন্য ব্রেক চাপল গ্রে। একটি ক্যাবল স্কুটারের পেছনের টায়ারের পাশ থেকে লাফিয়ে উঠল।

ব্রেকের ক্যাবল।

স্কুটার যখন হেঁচড়ে যাচ্ছিল তখন নিশ্চয়ই এটা খুলে গেছে।

গতি কমাও? গ্রের কানের কাছে চিৎকার করল ফিওনা।

ব্রেক নেই! গ্রে জবাব দিল। সাবধান!

ইঞ্জিন বন্ধ করে স্কুটারকে এদিক-ওদিক দুলিয়ে, ঘুরিয়ে গতি কমানোর চেষ্টা করল ও। পেছনের চাকাটিকে একটু ঘষটে নিয়ে আসার চেষ্টা করতেই রাবার থেকে ধোঁয়া বেরোল।

ক্রসরোডের মাথায় পৌঁছে গেছে, খুব দ্রুত এগোচ্ছে ওরা।

একপাশে কাত করে স্কুটারের গতি কমানোর চেষ্টা করল গ্রে। ওটার ধাতব শরীর থেকে স্ফুলিঙ্গ বেরোল। রাস্তাগুলোর সংযোগস্থল পর্যন্ত হেঁচড়ে এগোল ওরা। একটি ট্রাকের সামনে দিয়ে অপর রাস্তায় গিয়ে উঠল। গর্জে উঠল হর্ন। ব্রেক কষার তীব্র আওয়াজ শোনা গেল।

রাস্তার এক পাশে গিয়ে ধাক্কা লাগল ওদের স্কুটার। ছিটকে গেল গ্রে ও ফিওনা।

রাস্তার পাশে থাকা একটি বেড়া ওদের এই সংঘর্ষের ফলে ভেঙ্গে গেল। তবে গড়ানি খেয়ে কোনোমতে ফুটপাটে উঠে দাঁড়াতে সক্ষম হলো ওরা। গ্রে উঠে দাঁড়িয়ে ফিওনার কাছে গিয়ে বলল, তুমি ঠিক আছে তো?

ফিওনাও উঠে দাঁড়িয়েছে। ব্যথা কম ওর রাগ হচ্ছে বেশি। দুই শ ইউরো দিয়ে এই স্কার্ট কিনেছিলাম। ওর পোশাকের একপাশ লম্বালম্বি আকারে ছিঁড়ে গেছে। এক হাত দিয়ে ছিঁড়ে যাওয়া ফাঁকা অংশটুকু বন্ধ করতে করতে আরেক হাত বাড়িয়ে নিজের পার্স তুলে নিল।

গ্রের আরমানি স্যুটের অবস্থা আরও খারাপ। ওর এক হাঁটু বেরিয়ে পড়েছে, জ্যাকেটের এক হাতা দেখে মনে হচ্ছে ঝামা দিয়ে ঘষা হয়েছে ওটাকে। তবে এসব কাটাছেঁড়া আর সামান্য আঘাত ছাড়া ওরা প্রায় অক্ষত আছে।

অন্যান্য গাড়িঘোড়া চলে যাচ্ছে দুর্ঘটনাস্থলের পাশ দিয়ে।

হাঁটা ধরল ফিওনা। এখানে ভ্যাসপার দুর্ঘটনা প্রায়ই হয়। যখন তখন চুরিও হয় এগুলো। কোপেনহ্যাগেনের সকল স্কুটার হলো অনেকটা সরকারি জিনিসের মতো। দরকার পড়েছে? হাতের কাছে যেটা আছে নিয়ে ছুট লাগাও। কাজ শেষে? যেখানে খুশি ফেলে যাও। ওটা আবার অন্য কেউ ব্যবহার করবে। ভ্যাসপা নিয়ে এখানে কেউ মাথা ঘামায় না।

কিন্তু এবার ঘামাল।

একজোড়া নতুন চাকা দৃষ্টি আকর্ষণ করল ওদের। দুই ব্লক পেছনে একটি ব্ল্যাক সেডান রাস্তা দিয়ে ওদের দিকে ধেয়ে আসছে। হেডলাইটের উজ্জ্বল আলো থাকায় ভেতরে থাকা আরোহীদেরকে চেনা গেল না।

ফিওনাকে নিয়ে ফুটপাতে হাঁটতে শুরু করল গ্রে, গভীর ছায়া খুঁজছে। এখানকার একপাশে ইটের লম্বা দেয়াল ছাড়া আর কিছু নেই। কোনো গলি, বিল্ডিং, কিছু নেই। স্রেফ একটি উঁচু দেয়াল। দেয়ালের পেছন থেকে হালকা সুরে বাঁশির আওয়াজ ভেসে আসছে।

ওদের পেছনে থাকা স্কুটারের পেছনে এসে সেডানের গতি কমল।

বোঝাই যাচ্ছে ওদের স্কুটারে পালানোর খবর রিপোর্ট করা হয়েছে।

এদিকে! বলল ফিওনা।

কাঁধে পার্স ঝুলিয়ে ছায়ায় থাকা একটি পার্ক বেঞ্চের ওপর চড়ল ও। তারপর ওটার হেলান দেয়া অংশটুকু ব্যবহার করে লাফিয়ে উঠে উপরে ঝুলতে থাকা একটি গাছের ডাল ধরল। গাছের ডালের ওপর তুলে দিল দুই পা।

কী করছ?

রাস্তার ছেলেরা এই কাজ সবসময়ই করে। ফ্রি প্রবেশ।

কী?

আরে আসো।

হাতের সাহায্যে গাছের মোটা ডাল ধরে এগোল ফিওনা। ইটের দেয়ালের ওপাশে লাফ দিয়ে নামল।

ধেৎ।

সেডান আবার রাস্তায় চলতে শুরু করেছে।

কোনো উপায় না দেখে গ্রে-ও ফিওনার পথ অনুসরণ করল। বেঞ্চে লাফিয়ে উঠল। গ্রে। দেয়ালের ওপাশ থেকে আলতো করে সুর ভেসে আসছে। মাথা নিচ দিকে ঝুলিয়ে দেয়ালের ওপর দিয়ে কিছু অংশ গেল ও।

ওপাশে জ্বলজ্বলে হারিকেনে সুন্দর একটি ওয়ান্ডারল্যান্ড দেখা যাচ্ছে, খুদে অট্টালিকা আর রাইডের জন্য বিভিন্ন পাকানো রেল।

টিভোলি গার্ডেনস।

এই পার্ক কোপেনহ্যাগেনের কেন্দ্রে অবস্থিত। দেয়ালের এই উচ্চতায় দাঁড়িয়ে গ্রে পার্কের সেন্ট্রাল লেকটা দেখতে পেল। লেকের পানিতে হাজার হাজার হারিকেন আর লাইটের উজ্জ্বল আলো প্রতিফলিত হচ্ছে। দুপাশে ফুল দিয়ে সাজানো পথ কাঠের রোলার কোস্টার, পানোৎসব আর ফেরিস হুইলের দিকে চলে গেছে। তথ্য-প্রযুক্তির দিক দিয়ে ডিজনির চেয়ে পিছিয়ে থাকলেও এই পুরোনো পার্কটি বেশ জীবন ঘনিষ্ঠ।

ওয়ালের ওপর দিয়ে গাছের ডাল ধরে পার্কের আরও একটু ভেতরে এগোল গ্রে।

একটু দূরে, ফিওনা ওর জন্য অপেক্ষা করছিল, ওকে দেখে ইশারা করল। বাগানের শেডের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল ও।

এখন পা ছেড়ে দিয়ে গাছের ডাল ধরে ঝুলছে গ্রে।

ডান হাতের পাশে কীসের যেন শব্দ হওয়ায় গ্রে একদম চমকে উঠল। গাছের ডাল ছেড়ে দিল ও। হাত ছুঁড়ে নিজের ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করল। অনেক ফুলের ওপর বেশ সজোরে আছড়ে পড়ল গ্রে। এক হাঁটুত বেশি চাপ লেগেছে। তবে বাগানের দো আঁশ মাটি ওকে একটু আরাম দিল। দেয়ালের পেছনে গর্জে উঠল ইঞ্জিন, দরজা বন্ধ করার আওয়াজ পাওয়া গেল।

ওদেরকে দেখে ফেলেছে।

মুখবিকৃত করে ফিওনার সাথে যোগ দিল গ্রে। বেচারির চোখ বড় বড় হয়ে গেছে। গুলি হওয়ার আওয়াজ শুনেছে ও। কোনো কথা না বলে টিভোলি গার্ডেনস-এর ভেতরে ছুটল ওরা।

০৬. আগলি ডাকলিং

রাত ১টা ২২ মিনিট।
হিমালয়।

মাঝরাত পার হয়ে গেছে, প্রাকৃতিকভাবে গরম হওয়া মিনারেল পানিতে গোসল করছে লিসা। ও চাইলে চোখ বন্ধ করে নিজেকে ইউরোপের কোনো একটি বিলাস বহুল স্পা তে আছে বলে কল্পনা করতে পারে। রুমের সরঞ্জামাদি চটকদার। পুরু ইজিপশিয়ান কটন তোয়ালে ও আলখাল্লা, চার জনের জন্য থাকা বিশাল খাট, তাতে কম্বল রাখা আর বিছানা তুলতুলে নরম। দেয়াল থেকে ঝুলছে মধ্যযুগীয় চিত্রকলা, পাথুরে মেঝের ওপর। পায়ের নিচে বিছানো আছে তুর্কী গালিচা।

পেইন্টার আছে বাইরের রুমে। ওদের ছোট ফায়ারপ্লেসে কাঠ দিচ্ছে।

ছোট্ট একটি প্রিজন সেলে (জেলখানার কামরা) আছে ওরা।

পেইন্টার অ্যানা পোরেনবার্গকে বলেছিল, ওরা দুজনে একটু পূর্ব পরিচিত। মিথ্যে কথা। আসলে দুজন যেন একসাথে থাকতে পারে তাই চালাকি করে কথাটা বলেছে।

লিসাও আপত্তি করেনি।

ও এখানে একা থাকতে চায় না।

এখানকার পানির তাপমাত্রা অস্বস্তিকর গরমের চেয়ে কয়েক ডিগ্রি কম। গরম পানির কারণে লিসার শরীর কেঁপে উঠল। নিজে ডাক্তার হওয়ায় লিসা ওর শরীরের শক পাওয়া চিহ্নগুলো বুঝতে পারল। আর একটু হলেই ওখানে জার্মান মহিলাটির সাথে ওর হাতাহাতি লেগে যেত। ওর এই আচরণের কারণে পেইন্টারসহ ওকেও হয়তো মরতে হতো গুলি খেয়ে।

পেইন্টার বরাবরই শান্ত-শিষ্ট। এমনকি এখনও ও শুনতে পাচ্ছে, ধীরচিত্তে ফায়ারপ্লেসে কাঠ দিয়ে যাচ্ছে পেইন্টার। সুন্দর সাবলীলভাবে আছে সে। তবে ও নিশ্চয়ই একদম খালি হয়ে গেছে। একটু আগে গোসল সেরেছে পেইন্টার। না পরিষ্কার হওয়ার জন্য নয় বরং ফ্রস্টবাইট থেকে বাঁচার জন্য ওকে গোসল করতে হয়েছে। ওর কানের লতিতে সাদা সাদা দাগ দেখে লিসা-ই ওকে আগে গোসল করতে পাঠিয়েছিল।

গরম কাপড়ে বেশ ভাল অবস্থাতেই ছিল লিসা।

এই মুহূর্তে লিসা নিজেকে সম্পূর্ণভাবে বাথটাবে ডুবিয়ে রেখেছে। পানির নিচে ওর মাথা, চুলগুলো আলগোছে পানিতে ভাসছে। পানির তাপমাত্রা ওর শরীরের প্রত্যেকটি কোষে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ল। বিস্তৃত হলো ওর অনুভূতি। এখন ওকে শুধু একটি কাজ করতে হবে-~~-পানির নিচে নিঃশ্বাস নিতে হবে। ব্যস, তাহলেই সব শেষ। কয়েক মুহূর্ত ছটফট করে সবকিছু চিরতরে শেষ হয়ে যাবে। এত ভয়, দুশ্চিন্তা সব। নিজের ভাগ্যকে নিজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে লিসা… ওকে যারা বন্দি করে রেখেছে এভাবে তাদের কাছ থেকে নিজের মুক্তি আদায় করে নিতে পারবে।

দরকার শুধু একবার নিঃশ্বাস নেয়া…

তোমার গোসল কী প্রায় শেষ? পানির ভেতরে কথাগুলো শুনতে পেল ও, মনে হলো শব্দগুলো অনেক দূর থেকে আসছে। ওরা আমাদের জন্য গভীর রাতের খাবার এনে দিয়েছে।

পানির নিচ থেকে উঠল লিসা, ওর চুল, মুখ বেয়ে পানি চোয়াচ্ছে। আর এক মিনিট।

ঠিক আছে, তাড়াহুড়ো নেই, সময় নাও। মেইন রুম থেকে বলল পেইন্টার।

লিসা শুনতে পেল পেইন্টার আরেকটি কাঠ আগুনের ভেতরে দিয়ে দিল।

পেইন্টার এখন নড়ছে কীভাবে? বিছানায় পড়ে ছিল তিন দিন, ভূগর্ভস্থ সেলারের হাতাহাতি, বরফের ভেতর দিয়ে এপর্যন্ত আসা… তারপরও ওর ভেতরে কোনো ক্লান্তি নেই। ব্যাপারটা লিসার মনে আশা যোগাল। হয়তো এটা স্রেফ বেপরোয়া ভাব তবে ও ঠিকই পেইন্টারের ভেতরে একটি মজবুত শক্তির ছাপ দেখতে পেল, যেটা শারীরিক শক্তির চেয়ে বেশি কিছু।

ওর কথা ভাবতে ভাবতে লিসার কাঁপুনি কমে এলো।

বাথটাব থেকে উঠে দাঁড়াল ও, গায়ে পানি ঢেলে ভোয়ালে জড়িয়ে নিল। হুক থেকে একটি পুরু আলখাল্লা ঝুলছিল, কিন্তু আপাতত ওটা নিল না ও। পুরোনো বেসিনের পাশে মেঝের দৈর্ঘ্য বরাবর আয়না আছে, আয়নার তল একটু ঘোলা হয়ে গেলেও ওর নগ্ন শরীর ঠিকই দেখা যাচ্ছে ওতে। পা নড়াল ও। আত্মঅনুভূতি কিংবা তৃপ্তির জন্য নয়, কোথায় কোথায় আঁচড় লেগেছে সেটা দেখল। ওর জরায়ুর ভেতরে একটু গভীর ব্যথা ওকে জরুরি কিছু একটা মনে করিয়ে দিল।

ও এখনও বেঁচে আছে।

টাবের দিকে তাকাল।

ও ওদেরকে তৃপ্তি পেতে দেবে না। ব্যাপারটার মোকাবেলা করবে।

আলখাল্লা গায়ে চড়িয়ে নিল। কোমড়ের অংশে ফিতে টাইট করে বাঁধার পর বাথরুমের ভারী ছিটকানি খুলে বাইরে বেরোল। পাশের রুম আরও বেশি গরম। গরম বাস্প রুমকে উষ্ণ করে রেখেছে। তবে ফায়ারপ্লেসে আগুন দেয়ায় আরও সুন্দর হয়েছে রুমের তাপমাত্রা। ফায়ারপ্লেসে ঘোট ঘোট আগুনের শিখা লাফাচ্ছে, পট পট শব্দ হচ্ছে, রুমে একধরনের উজ্জ্বলতা এনে দিয়েছে ওটা। বিছানার পাশে থাকা কয়েকটি মোমবাতি এই প্রিজন সেলারে একধরনের ঘরোয়া পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। যোগ হয়েছে। বাড়তি আলো।

এই রুমে কোনো কারেন্ট নেই।

এখানে ওদের পুরে রাখার সময় অ্যানা পোরেনবার্গ বেশ গর্বের সাথে ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিয়েছিল কীভাবে এখানে ১০০ বছর পুরোনো রুডলফ ডিজেলের তৈরি জেনারেটর থেকে তাপমাত্রার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। রুডলফ ডিজেল একজন ফরাসী বিজ্ঞানী ছিলেন, ডিজেল ইঞ্জিনের আবিষ্কারকর্তা তিনিই। তবে এখানে বিদ্যুৎ অপচয় করা হয় না। ক্যাসলের শুধু নির্দিষ্ট কিছু অংশে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা আছে।

এখানে নেই।

রুমে লিসা ঢুকতেই পেইন্টার ওর দিকে ফিরল। লিসা খেয়াল করল পেইন্টারের চুলগুলো শুকিয়ে এলোমেলো হয়ে গেছে। একটু লম্পট ছোকরার মতো লাগছে ওকে। পা নগ্ন আর গায়ে একটি আলখাল্লা পরে আছে পেইন্টার। দুটো পাথরের মগে করে ধোঁয়া ওঠা চা নিয়ে এলো।

জেসমিন চা, লিসাকে ফায়ারপ্লেসের সামনে থাকা একটি ছোট সোফায় বসার ইঙ্গিত করল ও।

নিচু টেবিলে কিছু খাবার রাখা আছে। শক্ত পনির, পাউরুটি, রোস্ট করা গরুর মাংস, সরিষা ও এক বাটি ব্ল্যাকবেরি। সাথে ঘোট এক বাটি ক্রিম।

আমাদের জীবনের শেষ খাওয়া? একটু হালকাভাবে কথাটা বলতে চেয়েছিল লিসা কিন্তু পারল না, ভারী-ই হয়ে গেল। সকাল হতেই ওদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হবে।

পাশে থাকা জায়গায় বসল পেইন্টার।

লিসাও বসল।

পেইন্টার পাউরুটি কাটছে, এই ফাঁকে এক খণ্ড পনির তুলে নিল লিসা। নাক কুঁচকে আবার রেখে দিল। ক্ষিধে নেই।

খাওয়া উচিত। বলল পেইন্টার।

কেন খাব? যাতে ওরা যখন আমাকে ড্রাগ দেবে তখন শক্ত হয়ে থাকতে পারি?

এক টুকরো মাংস মুড়িয়ে মুখে পুরল ক্রো। ওটা চিবুতে চিবুতে বলল, কোনো কিছুই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে হ্যাঁ, আমি যদি জীবনে কিছু শিখে থাকি অন্তত এটা শিখেছি।

লিসা পটেনি। মাথা নাড়ল। তাহলে তুমি কী বলছ? ভাল কিছু হবে এই আশায় বসে থাকবে?

ব্যক্তিগতভাবে আমার প্ল্যান পছন্দ।

ওর দিকে তাকাল লিসা। কোনো প্ল্যান আছে তোমার?

সাদা-সিধে একটা আছে। গোলাগুলি করে, বোমা-টোমা মেরে হুলস্থুল কারবার করব না। একদম সহজ।

কী সেটা?

মাংসটুকু গিলে লিসার দিকে ফিরল পেইন্টার ক্রো। আমি এমন একটা জিনিস খুঁজে পেয়েছি যেটা অনেক সময় যোগাতে কাজে দেয়।

উত্তরের জন্য অপেক্ষা করে আবার প্রশ্ন করল লিসা। কী?

সততা।

১৪৫

লিসা কাঁধ ঝুলিয়ে ধপ করে পেছনে হেলান দিল। দারুণ।

একটি পাউরুটির টুকরো তুলে ওতে একটু সরষে, এক খণ্ড মাংস আর পনির দিয়ে লিসার দিকে এগিয়ে ধরল ক্রো। খাও।

শুধু ক্রোকে খুশি করার জন্য শ্বাস ফেলে লিসা খাবার হাতে নিল।

একই জিনিস নিজের জন্যেও বানাল ক্রো। ধরো, আমি তো ডারপার অধীনে থাকা সিগমা ডিভিশনের ডিরেক্টর। আমেরিকার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে এরকম বিষয় নিয়ে আমরা গবেষণা করি। সাবেক স্পেশাল ফোর্সের সৈন্যরা আমাদের হয়ে কাজ করে। ডারপার সবচেয়ে শক্তিশালী ক্ষেত্র হলো সিগমা ফোর্স যেটা সরোজমিনে কাজ করে থাকে।

পাউরুটির এক প্রান্তে একটু কামড় দিয়ে একটু সরষে মুখে পুরল লিসা। তো আমরা কী সেই সৈন্যদের দ্বারা উদ্ধার হওয়ার কোনো আশা করতে পারি?

নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। আমাদের হাতে যতটুকু সময় আছে এতে হবে না। আমার লাশ যে ওই মঠের ধ্বংসস্তূপের ভেতরে নেই সেটা ওদের বের করতে কয়েকদিন লেগে যাবে।

তাহলে আমি তো কোনো আশা দেখতে পা…।

হাত উঁচু করল ক্রো। পাউরুটি মুখে নিয়ে চিবুতে চিবুতে বলল, সততাই সব। খোলামেলাভাবে সৎ হতে হবে। তারপর দেখা যাক, কী হয়। এখানকার অদ্ভুত ঘটনাগুলোর ওপর সিগমার নজরে পড়েছে। অসুখের খবরটা ওখানে পৌঁছে গেছে অনেক আগেই। পাহাড়ের ভেতরে এতগুলো বছর ধরে সবকিছু গোপনে চলতে চলতে হঠাৎ গত কয়েকমাস ধরে এসব গড়বড় কেন শুরু হলো? আমি এই ঘটনাগুলোকে কাকতালীয় মানতে রাজি নই। অ্যানা সেই সৈন্যকে কী বলছিল সেটা আমি শুনেছি। কোনো একটা সমস্যার কথা বলছিল অ্যানা। সমস্যাটা ওদের ভোগাচ্ছে। আমার মনে হয়, আমাদের দুই পক্ষের লক্ষ্য এক ও অভিন্নই হবে। তাতে আমরা একে অপরকে সাহায্য করতে পারব।

সেই সাথে আমাদেরকে যদি বাঁচতে দেয়? একটু অবহেলা করে বলল লিসা, যদিও মনে মনে আশা ছাড়েনি। নিজের বোকামি ঢাকার জন্য একটু পাউরুটি মুখে পুরল।

তা বলতে পারছি না, সত্তাবে বলল ক্রো। আমরা যতক্ষণ আমাদেরকে উপকারী ও কার্যকরী হিসেবে প্রমাণ করতে পারব ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের হাতে সময় থাকবে। যদি কয়েকটা দিন বাড়িয়ে নিতে পারি… তাহলে সেটা আমাদের উদ্ধার কিংবা এখানকার পরিস্থিতি বদলে দেয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেবে।

গভীর চিন্তা করতে করতে খাবার চিবুচ্ছে লিসা। ও টেরই পেল না ওর হাত ফাঁকা হয়ে গেছে। অথচ ওর ক্ষিধে শেষ হয়নি। ব্ল্যাকবেরির ওপরে ক্রিম ঢেলে দিয়ে ওরা দুজনে ভাগাভাগি করে খেলো।

পেইন্টারের দিকে নতুন দৃষ্টিতে তাকাল লিসা। এই ব্যক্তির অদম্য জেদ। ওই নীল চোখগুলোর পেছনে বুদ্ধির ঝিলিক আর সাধারণ জ্ঞানে ভরপুর। লিসার নিরীক্ষা বুঝতে পেরেই হয়তো পেইন্টার ওর দিকে তাকাল। চট করে দৃষ্টি ঘুরিয়ে খাবারের ওপর বসাল লিসা।

চুপচাপ খাবার শেষ করে ওরা চায়ে চুমুক দিল। পেটে খাবার পরার পর পরম প্রশান্তি ওদের ওপর ভর করল। কথা বলতেও ইচ্ছে হলো না ওদের। পেইন্টারের পাশে চুপচাপ বসে থাকতেই লিসার ভাল লাগছে। ক্রোর শ্বাস-প্রশ্বাসের আওয়াজ শুনতে পেল ও। সদ্য গোসল করে আসা একটু ভেজা ত্বকের ঘ্রাণও পাচ্ছে।

চা শেষ করে লিসা খেয়াল করল ক্রো কপালের এক অংশ ডলছে, বাঁকা হয়ে গেছে এক চোখ। ওর মাথাব্যথা আবার বাড়তে শুরু করেছে। ডাক্তারি করে ক্রোকে দুশ্চিন্তায় ফেলতে চায় না লিসা। চুপচাপ ওর আচরণ খেয়াল করল। কেঁপে উঠল আরেক হাতের আঙুলগুলো। প্রায় নিভে আসা আগুনের দিকে ও চোখ মেলতেই দেখা গেল ওর চোখের পাতা একটু একটু কাঁপছে।

পেইন্টার সতোর ব্যাপারে কথা বলল। কিন্তু সে কি নিজের অবস্থার ব্যাপারে সঠিক তথ্যটুকু জানতে চায়? মাথাব্যথা তো দেখা যাচ্ছে বেশ ঘনঘন ফিরে আসছে। লিসার ভেতরের একটি অংশ স্বার্থপরের মতো ভয় পেল। না, ক্রোর স্বাস্থ্যের কথা ভেবে নয়, ক্রোর কিছু হয়ে গেলে বাঁচার যে ক্ষীণ আশাটুকু আছে ওটা নিভে যাবে, সেই কারণে। ক্রোকে ওর প্রয়োজন।

উঠল লিসা। আমাদের একটু ঘুমিয়ে নেয়া উচিত। ভোর হতে খুব বেশি দেরি নেই।

একটু গোঙাল পেইন্টার, মাথা নেড়ে উঠে দাঁড়াল। একটু টলমল করে উঠতেই ওর কনুই ধরল লিসা।

আমি ঠিক আছি। বলল পেইন্টার।

এই হচ্ছে সতোর নমুনা।

লিসা ওকে বিছানা পর্যন্ত নিয়ে কম্বল ঠিক করে দিল।

আমি সোফায় ঘুমিয়ে নেব। বাধা দিয়ে বলল ক্রো।

ঢং বাদ দাও। বিছানায় ওঠো। এখন এসব করতে হবে না। আমরা নাৎসিদের খপ্পরে আছি।

সাবেক নাৎসি।

হ্যাঁ, ওটা খুবই খুশির সংবাদ।

অগত্যা বিছানায় উঠল ক্রো। বিছানার পাশ ঘুরে গিয়ে লিসাও উঠল। নিভিয়ে দিল মোমবাতিগুলো। অন্ধকার হয়ে গেলেও ফায়ারপ্লেসের নিভু নিভু আলো রুমকে একটু আসোময় করে রাখল। লিসা এই যাবতীয় অন্ধকার একা সামাল দিতে পারত কিনা সে-ব্যাপারে ওর নিজেরই সন্দেহ আছে।

কম্বলের নিচে ঢুকে ওটাকে থুতনি পর্যন্ত টেনে নিল লিসা। দুজনের মাঝখানে একটু জায়গা ফাঁকা রেখেছে ও। পেইন্টার ওর দিকে পিছ দিয়ে আছে। ক্রো হয়তো ওর ভয় অনুভব করতে পেরে এদিক ঘুরল।

যদি আমরা মারা যাই, বিড়বিড় করল ক্রো, তাহলে আমরা একসাথে মরব।

লিসা ঢোঁক গিলল। পেইন্টারের কাছ থেকে এরকম কিছু শুনবে বলে মোটেও আশা করেনি। তবে একটু ভড়কে গেলেও অদ্ভুত স্বস্তি পেল। কথা বলার ভেতরে একধরনের সুর ছিল, ওতে থাকা সততা, প্রতিজ্ঞা লিসাকে মুগ্ধ করল। নিজেদের বাঁচানোর জন্য বলা দুর্বল যুক্তিগুলোর চেয়ে এই কথাটি মন ছুঁয়ে গেল লিসার।

পেইন্টারকে বিশ্বাস করল ও।

একটু কাছাকাছি এসে ক্রোর হাত ধরল। একে অপরকে জড়িয়ে ধরল দুজনের। আঙুলগুলো। কোনো যৌনতা নয়, স্রেফ দুজন মানুষের ছোঁয়া। পেইন্টারের এক হাত নিজের শরীরের ওপর টেনে নিল লিসা।

ক্রো লিসার হাতে চাপ দিয়ে ভরসা দেয়ার চেষ্টা করল।

ওর আরও কাছে চলে গেল লিসা। ক্রো ওকে ভাল করে জড়িয়ে ধরার জন্য আরও একটু এদিকে ঘুরল।

চোখ বুজল লিসা। ঘুমানোর কোনো আশা নেই।

কিন্তু ক্রোর বাহুডোরে ও ঠিকই ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ল।

.

রাত ১০টা ৩৯ মিনিট।
কোপেনহ্যাগেন, ডেনমার্ক।

ঘড়ি দেখল গ্রে।

দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ওরা গা ঢাকা দিয়ে আছে। মাইন নামের রাইডের একটি সার্ভিস শ্যাফটের ভেতরে লুকিয়ে আছে ওরা। একধরনের ভূগর্ভস্থ খনির ভেতর দিয়ে এই আদিকালের রাইড ঘুরে বেড়ায়। আশেপাশে বিভিন্ন কার্টুনের মজাদার অবয়ব থাকে। একই মিউজিক বারবার বাজতে বাজতে রাইড এগিয়ে চলে। এই মিউজিক কানের জন্য বেশ বেদনাদায়ক, অনেকটা চীনা ওয়াটার টর্চারের কাছাকাছি।

টিভোলি গার্ডেনসের লোকজনের ভেতরে ঢুকেই গ্রে আর ফিওনা পুরোনো এই রাইডে চড়ে বাবা-মেয়ে সেজেছে। কিন্তু প্রথম বাক আসামাত্র রাইডের কার থেকে নেমে বিদ্যুৎসংযোজক বিপজ্জনক চিহ্ন দেয়া একটি সার্ভিস দরজার পেছনে চলে গেল। রাইড শেষ না করেই গ্রে কল্পনা করল রাইডের শেষ অংশে কী থাকতে পারে : ফুসফুসের রোগে ভুগে হাসপাতালের বেডে শুইয়ে আছে কার্টুনগুলো।

ভাবল গ্রে।

ডাচ ভাষায় সেই একঘেঁয়ে মিউজিক হাজারবার পুনরাবৃত্তি করে বেজেই চলেছে। ডিজনিল্যান্ডের ইটস-অ্যা-স্মল-ওয়াল্ড রাইডের মিউজিকের মতো অত খারাপ না। হলেও কাছাকাছি আরকী।

ভেতরে ঢুকে ডারউইন বাইবেলটিকে নিজের কোলের ওপর খুলল গ্রে। পেনলাইট জ্বেলে এক এক করে পৃষ্ঠা ওল্টাচ্ছে ও, যদি কোনো কু পাওয়া যায়। মিউজিকের শব্দে ওর মাথা দপদপ করছে।

তোমার কাছে অস্ত্র আছে? এক কোণায় গুটিসুটি মেরে জিজ্ঞেস করল ফিওনা। থাকলে আমাকে এখনি গুলি করে দাও।

শ্বাস ফেলল গ্রে। আমাদের হাতে মাত্র ১ ঘণ্টা সময় আছে।

আমি পারব না। আমার দ্বারা হবে না।

প্ল্যান হলো, পার্ক বন্ধ হওয়া পর্যন্ত ওরা অপেক্ষা করবে। এই পার্ক থেকে বের হওয়ার জন্য অফিসিয়াল গেইট আছে মাত্র একটি। তবে গ্রে জানে পার্কের সব গেইটেই এখন নজরদারি করা হচ্ছে। গভীর রাতে যখন পার্কের ময়লা সরাতে গাড়ি আসবে শুধু তখনই পালানো সম্ভব। মনক কোপেনহ্যাগেন এয়ারপোর্টে এসে পৌঁছেছে কি-না সেটা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করল গ্রে কিন্তু লোহা আর তামার এই পুরোনো স্থাপনা ওর ফোনের নেটওয়ার্কের দফারফা করে দিয়েছে। ওদেরকে এয়ারপোর্ট যেতে হবে।

বাইবেল থেকে কিছু জানতে পারলে? ফিওনা জানতে চাইল।

মাথা নাড়ল গ্রে। ডারউইন পরিবারের বংশক্রম সুন্দর করে একদম সামনের কভারে দেয়া আছে। দারুণ লাগছে দেখতে। কিন্তু তারপর অনেক পৃষ্ঠা উল্টে যাওয়ার পরও ওগুলো থেকে তেমন কোনো কু পাওয়া গেল না। যা পেল সবই হিজিবিজি রেখা। একই চিহ্ন বারবার এদিক ওদিক করে ব্যবহার করা হয়েছে।

চিহ্নগুলোকে নিজের নোটপ্যাডে টুকে নিল গ্রে। বাইবেলের মার্জিন অংশে ওগুলো লেখা আছে। হয়তো ওগুলো চার্লস ডারউইন নিজে লিখে গেছেন কিংবা পরবর্তীতে কেউ লিখেছে। কিন্তু কে লিখেছে সেটা তো আর গ্রে জানে না।

ঘে ফিওনাকে নোটপ্যাড দেখাল।

পরিচিত মনে হচ্ছে?

সামনে বুকল ফিওনা। চিহ্নগুলোকে ভালভাবে দেখল।

ҚА УКУТ Күн

পাখির আঁচড়, বলল ও। এরজন্য খুনোখুনি কেন হলো বুঝলাম না।

গ্রে নিজের চোখ চালু রাখলেও মুখ বন্ধ রাখল। ফিওনার মুড অফ হয়ে গেছে। ওর সেই প্রতিহিংসাপরায়ণ, রাগী স্বভাবটাই বরং ভাল ছিল। এখানে ঢোকার পর থেকে মেয়েটির মন-মেজাজ অন্যরকম হয়ে গেছে। গ্রে সন্দেহ করল, এই মেয়ের যাবতীয় ঘৃণা, রাগ, জেদ ছিল বাইবেলটিকে হাত করা পর্যন্ত। ওর নানুর মৃত্যুর প্রতিশোধ নেয়া, এইটুকুই। আর এখন এই অন্ধকারে ফিওনার মনের আসল অবস্থা দেখা যাচ্ছে।

গ্রের কী করার আছে?

কাগজ, কলম তুলে নিয়ে বেচারির মনোযোগ এদিকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করল ও। আরেকটি চিহ্ন আঁকল ও। নিলামে অংশ নেয়া সেই পুরুষ লোকটির হাতে থাকা ট্যাটু।

ও দিকে এগিয়ে দিল গ্রে। এটা পরিচিত মনে হয়?

আগের চেয়েও নাটকীয় ভঙ্গিতে সামনে ঝুঁকল ফিওনা। মাথা নাড়ল। চার পাতা। না, জানি না। কী হতে পারে…. দাঁড়াও… নোটপ্যাড হাতে তুলে নিয়ে আরও কাছ থেকে দেখল। বড় বড় হয়ে গেল ওর চোখজোড়া। এর আগে আমি এটা দেখেছি!

কোথায়?

একটা বিজনেস কার্ডে, বলল ফিওনা। ওটা অবশ্য এরকম ভরাট করা ছিল না। স্রেফ আউটলাইন আঁকা ছিল। গ্রের হাত থেকে কলম নিয়ে আঁকতে শুরু করল ও।

কার বিজনেস কার্ড?

ওই যে দুই মাস আগে এক বজ্জাত এসে আমাদের বিভিন্ন রেকর্ড ঘাঁটাঘাঁটি করে গিয়েছিল তার কার্ডে দেখেছিলাম। ব্যাটা আমাদেরকে ভুয়া ক্রেডিট কার্ড দিয়েছিল। ফিওনা আঁকছে। তুমি এই জিনিস কোথায় দেখলে?

যে লোক বাইবেলের নিলামে জিতেছিল, তার হাতে দেখেছি।

গর্জে উঠল ফিওনা। আমি জানতাম! তাহলে এই সবকিছুর পেছনে এক হারামি কলকাঠি নেড়ে আসছে। প্রথমে চুরি করার চেষ্টা করেছিল। তারপর নিজের কৃতি আড়াল করার জন্য মাটিকে খুন করে দোকান পুড়িয়ে ছাই করে দিল।

বিজনেস কার্ডের নাম মনে আছে? প্রশ্ন করল গ্রে।

ফিওনা মাথা নাড়ল। শুধু চিহ্ন-ই মনে আছে। কারণ এটা আমার পরিচিত।

এতক্ষণ ধরে আঁকা ছবিটি গ্রের দিকে এগিয়ে দিল ও। ট্যাটুর চেয়ে আরও বিস্তারিত রেখার মাধ্যমে আঁকা হয়েছে এখানে। কোথায় কোথায় কীভাবে মোচড় খেয়েছে সেটা। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।

৯ বি?

পৃষ্ঠায় টোকা দিল এ। তুমি এটা চিনতে পেরেছ? তোমার পরিচিত?

মাথা নাড়ল ফিওনা। আমি পিন সংগ্রহ করি। যদিও এই পোশাকের সাথে পরতে পারিনি।

হুডঅলা জ্যাকেটের কথা মনে পড়ল গ্রের। তখন মেয়েটিকে চোখে পড়েছিল। প্রতিটি বোতামে বিভিন্ন সাইজের এটা সেটা লাগানো ছিল তখন।

কেলটেক, বলল ফিওনা। আমি এই শুধু এই ব্যান্ডের গান-ই শুনি। আমার অধিকাংশ পিন কেলটেক ডিজাইনের।

আর এই চিহ্ন?

এটাকে আর্থ স্কয়ার কিংবা সেইন্ট হেন্স ক্রস বলা হয়ে থাকে। এটা একধরনের রক্ষাকবচ। পৃথিবীর চার কোণা থেকে শক্তি আনে, এই আরকী। ফিওনা চার পাতার বৃত্তগুলোতে টোকা দিল। সেজন্য এগুলোকে রক্ষাকারী বাঁধনও বলা হয়। ব্যক্তিকে রক্ষা করে।

গ্রে বেশ মন দিয়ে শুনলেও প্রয়োজনীয় কোনো ক্লু পেল না।

এজন্যই আমি মাঠিকে বলেছিলাম ওই বজ্জাতকে যেন বিশ্বাস করে, ফিওনা বলল। একটু পেছনে হেলল ও। একদম খাদে নামিয়ে ফেলল গলা। যেন কথা বলতে ভয় পাচ্ছে। নানু লোকটাকে প্রথমে পছন্দ করছিল না। কিন্তু আমি যখন তার কার্ডে ওই চিহ্ন দেখলাম, ভাবলাম লোকটা ভালই হবে।

তুমি তো আর জানতে না।

মাট্টি জানতো, চট করে বলল ফিওনা। আমার জন্যই ও মারা গেছে। ওর শব্দগুলোতে অপরাধবোধ আর যন্ত্রণা ফুটে উঠল।

বাজে কথা। ফিওনার কাছে গিয়ে এক হাত দিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরল গ্রে। এরা যে-ই হোক না কেন প্রথম থেকে কাছা দিয়েই মাঠে নেমেছিল। তুমিও তো জানোনা। তোমাদের দোকানে ঢুকে তথ্য বের করার কোনো না কোনো রাস্তা ওরা বের করে ফেলতই। রেকর্ড দেখানোর ব্যাপারটায় নানুকে যদি তুমি না রাজি করাতে তাহলে হয়তো তোমাদের দুজনকে ওরা তখুনি মেরে ফেলত।

ওর দিকে ঝুঁকল ফিওনা।

তোমার নানু…

ও আমার নানু ছিল না, ফিওনা ফাপা কণ্ঠে বাধা দিল।

এটা আগেই বুঝতে পেরেছিল গ্রে, তবে কিছু বলল না। ফিওনাকে বলতে দিল।

আমি ওঁর দোকান থেকে কিছু জিনিস চুরি করছিলাম তখন ওঁর হাতে ধরা পড়ি। কিন্তু নানু পুলিশকে খবর না দিয়ে উল্টো আমাকে স্যুপ খেতে দিল। চিকেন বার্লি।

কথাটা বলতে গিয়ে হেসে ফেলল ফিওনা। অন্ধকারে ওর দিকে না তাকিয়েও গ্রে সেটা বুঝতে পারল।

ও ওইরকম-ই। পথশিশুদের সাহায্য করত। আশ্রয় দিত।

বার্টেল।

সাথে আমাকেও। বলে অনেকক্ষণ চুপ মেরে রইল ও। একটি গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে আমার বাবা-মা মারা গিয়েছিল। পাকিস্তানি ছিল তারা। পাঞ্জাবি। লন্ডনের ওয়ালম ফরেস্টে আমাদের একটা ছোট বাড়ি ছিল, বাগান ছিল। আমরা একটা কুকুর পোষার কথা ভাবছিলাম। কিছু ওরা… ওরা মরে গেল।

আমি দুঃখিত, ফিওনা।

খালা-খালু আমার দায়িত্ব নিল… ওরা অল্পকিছু দিন হলো পাঞ্জাব থেকে এখানে শিফট হয়েছিল। আবার নীরবতা। এক মাস পর থেকে খালু আমার কাছে আসতে শুরু করল, রাতে।

চোখ বন্ধ করল গ্রে। হায় খোদা…

তাই আমি পালালাম… প্রায় দুই বছর লন্ডনের রাস্তাঘাটে জীবন কাটিয়েছি। তারপর খারাপ মানুষদের খপ্পরে পড়ে আবার পালালাম। ইংল্যান্ড ছেড়ে চলে এলাম ইউরোপে। তারপর তো এই যে, এখানে।

গ্রিট্টি তোমাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন।

হ্যাঁ, সে-ও নেই। কণ্ঠে অপরাধবোধের শ্লেষ। আমি হয়তো পোড়া কপালি।

ফিওনাকে আরও কাছে টেনে নিল গ্রে। আমি দেখেছি তিনি তোমার খেয়াল কীভাবে রাখতেন। তুমি তার জীবনে খারাপ কিছু আনননি। তোমাকে তো তিনি ভালবাসতেন।

আ… আমি জানি। অন্যদিকে মুখ ঘোরাল ফিওনা। ফোঁপাতেই ওর কাঁধ কেঁপে উঠল।

ওকে ধরে রইল গ্রে। আস্তে করে ঘুরে গ্রের কাঁধে ফিওনা মাথা রাখল। এবার গ্রের অপরাধবোধে ভোগার পালা। গ্রিট্টি একজন দারুণ মহিলা ছিলেন। শিশুদের ভালবাসতে, মনে দয়া-মায়া ছিল। অথচ আজ তিনি বেঁচে নেই। এই ব্যাপারে গ্রে নিজেই শাস্তিযোগ্য। যদি ও আরও সতর্কতা অবলম্বন করত… এত বেপরোয়াভাবে তদন্ত না চালাতে…

ওর খামখেয়ালিপনার কারণেই আজ এই অবস্থা।

ফিওনা ফুঁপিয়ে চলেছে। যদিও এই খুনোখুনি আর আগুন লাগার বিষয় দুটো গ্রের তদন্ত শুরু করার আগেই পরিকল্পনা করে রাখা হয়েছিল তারপরও কথা থেকে যায়। আগুন লাগার পর ঘটনাস্থলে ফিওনাকে একা ফেলে চলে গিয়েছিল গ্রে। ওর মনে পড়ল, মেয়েটি প্রথমে… রাগ করে ডাকলেও পরে অনুনয় করেছিল।

কিন্তু গ্রে পাত্তা দেয়নি।

আমার আর এখন কেউ নেই, গ্রের স্যুটে মাথা রেখে আস্তে আস্তে কাঁদছে ফিওনা।

আমি আছি তো।

ভেজা চোখে মুখ তুলল ও। কিন্তু তুমিও তো চলে যাচ্ছো।

হুঁ, তুমিও আমার সাথে যাচ্ছ।

কিন্তু তুমি তো বলেছিলে…

যা বলেছিলাম ভুলে যাও। গ্রে জানে এই মেয়ে আর এখানে নিরাপদ নয়। একেও পরপারে পাঠিয়ে দেয়া হবে। বাইবেল পাক বা না পাক মেয়েটিকে চিরতরে চুপ করিয়ে ওরা দেবেই। এই মেয়ে অনেক বেশি জানে। যেমন… তুমি বলেছিলে বাইবেলের বিলে থাকা ঠিকানাটা জানোবা।

সন্দেহ নিয়ে গ্রের দিকে তাকাল ও। ফোঁপানো বন্ধ হয়ে গেছে। বিবেচনা করে দেখছে ওর প্রতি গ্রের সহানুভূতি কী এই তথ্যের জন্য জেগেছে নাকি অন্য কিছু। গ্রে ও ফিওনার মনের ভেতরে চলা চিন্তা অনুভব করতে পারল, পথশিশুদের চিন্তাধারা এরকমই হয়।

তবে গ্রে পরিস্থিতিকে খুব ভালভাবে পরিচালনা করতে জানে। প্রাইভেট জেটে করে আমার এক বন্ধু আজ মাঝরাতে এখানে আসছে। আমরা ওর সাথে যোগ দিয়ে যে-কোনো জায়গায় চলে যেতে পারি। আমরা জেট প্লেনে ওঠার পর তুমি ঠিকানা বোলো ডিল ফাইনাল করার জন্য এক হাত বাড়িয়ে দিলে গ্রে।

এক চোখ বাঁকা করে ফিওনা কিছুক্ষণ সন্দেহ করল। তারপর হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ওকে, ডিল।

গ্রে গতকাল যে ভুলগুলো করেছে সেগুলোর একটা প্রায়চিত্ত হলো মাত্র। সামনে আরও করতে হবে। জেট প্লেনে তুলে দিতে পারলেই এই মেয়ের বিপদ থেকে রক্ষা করা সম্ভব। এখান থেকে চলে গেলে ও নিরাপত্তার মধ্যে থাকবে। অন্যদিকে এখানে কোনো পিছুটান ছাড়া আরও তদন্ত চালিয়ে যেতে পারবে গ্রে আর মনক।

গ্রের নোটবুক গ্রে-কে ফেরত দিল ফিওনা। তোমাকে জানিয়ে রাখছি… আমাদেরকে সেন্ট্রাল জার্মানির প্যাডেরবর্ন-এ যেতে হবে। জায়গামতে গিয়ে আমি তোমাকে বিস্তারিত ঠিকানা দেব।

গ্রে বুঝতে পারল মেয়েটি ওকে একটু হলেও বিশ্বাস করেছে। ঠিক আছে। চলবে।

মাথা নাড়ল ফিওনা।

ডিল মজবুত হয়ে গেছে।

এখন এই মাথা ধরে যাওয়া মিউজিকটাকে বন্ধ করা যায় কি-না দেখ, কাতর কণ্ঠে জানাল ও।

ফিওনার কথা শুনতে পেয়েই যেন বিভিন্ন মেশিনের গুঞ্জন আর সেই মিউজিক দুম করে থেমে গেল। হঠাৎ করে নীরবতা নেমে এলো চারিদিকে। সরু দরজার এদিকে কে যেন আসছে।

গ্রে উঠে দাঁড়াল। আমার পেছনে থাকো, ফিসফিস করে বলল ও।

বাইবেল তুলে নিয়ে নিজের পার্সে ভরল ফিওনা।

একটু আগে একটি রিবার পেয়েছিল গ্রে, ওটাকেই হাতে তুলে নিল।

দরজা খুলে যেতে উজ্জ্বল আলো এসে পড়ল ওদের চোখে।

লোকটি চমকে গেছে। ডেনিশ ভাষায় বলল, তোমরা দুইজন এখানে কী করছ?

সোজা হয়ে হাতের দণ্ডকে নিচু করল গ্রে। আর একটু হলেই মেইনটেন্যান্স ইউনিফর্ম পরা এই লোকটিকে আঘাত করে ফেলতো।

রাইড শেষ, ভেতরে ঢুকল সে। সিকিউরিটিকে ডাকার আগে এখান থেকে বেরিয়ে যাও!

নির্দেশ পালন করল গ্রে। ওকে পাশ দিয়ে যেতে দেখে–কুটি করল লোকটি। গ্রে জানে ব্যাপারটা একটু অন্যরকম দেখাচ্ছে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক লোকের সাথে একটি টিনেজ মেয়ে পার্কের এরকম একটা ছোট রুমে…

মা, তুমি ঠিক আছে তো? লোকটি প্রশ্ন করল। ফিওনার ফোলা ফোলা চোখ আর ছিঁড়ে যাওয়া স্কার্ট নিশ্চয়ই লোকটির চোখে পড়েছে।

আমরা একদম ঠিক আছি। গ্রের এক হাত জড়িয়ে ধরে একটু পা ফাঁক করল ফিওনা। এই রাইডের জন্য ইনি আমাকে বাড়তি পয়সা দিয়েছেন।

মুখ বিকৃত করল লোকটি। পেছনের দরজা ওদিকে। বাইর লেখা একটি নিয়ন সাইন দেখাল সে। এখানে যেন আর কখনও না দেখি। এখানে ঢোকা বিপজ্জনক।

বাইরের অবস্থা তো আরও বিপজ্জনক। ফিওনাকে নিয়ে দরজার দিকে এগোল গ্রে। ঘড়ি দেখল। পার্ক বন্ধ হতে আরও ১ ঘন্টা লাগবে। একবার বাইরে বেরোনোর চেষ্টা করা যেতে পারে।

রাইড ভবনের এক কোণা আসার পর ওরা দেখল পার্কের এই অংশ প্রায় জনমানব শূন্য হয়ে গেছে। রাইড চলা শেষ। সব বন্ধ।

পার্কের লেকের ওদিক থেকে আসা মিউজিকের আওয়াজ শুনতে পেল গ্রে।

ইলেকট্রিক্যাল কুচকাওয়াজের জন্য জড়ো হচ্ছে সবাই। ফিওনা বলল। আতসবাজি ফুটিয়ে পার্ক বন্ধ করা হবে।

গ্রে প্রার্থনা করল আজকের আতসবাজি যেন ভালই ভালই শেষ হয়ে যায়। কোনো রক্তারক্তি যেন না ঘটে। পার্কের ভূমিতে নজর দিল গ্রে। হারিকেন রাতের আলোকে দূর করার চেষ্টা করছে। ফুল বাগানে টিউলিপ ফুলের বহর। ওদের যে রাস্তা ধরে এগোতে হবে ওতে কোনো লোকজন নেই। একদম উদোম, ফাঁকা।

দুজন সিকিউরিটি গার্ডকে একটু তাড়াহুড়ো করে এদিকে আসতে দেখল গ্রে। ওই লোক গিয়ে সিকিউরিটিদের সতর্ক করে দিয়েছে নাকি?

আবার হারিয়ে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। গ্রে বলল। ফিওনাকে নিয়ে গার্ডদের ঠিক বিপরীত দিকে রওনা হয়ে গেল ও। লোকজন যেখানে কুচকাওয়াজের জন্য জড়ো হচ্ছে ওরা সেদিকেই যাচ্ছে। গাছের ছায়ার ভেতর দিয়ে দ্রুত এগোল ওরা। কুচকাওয়াজ দেখতে দর্শনার্থী বলতে শুধু ওরা দুজন।

বাগানের পথ পেরিয়ে সেন্ট্রাল প্লাজায় ঢুকল ওরা। বিভিন্ন লাইট আর হারিকেনের আলোতে এখানটা বেশ আলোকিত হয়ে আছে। প্লাজার ভেতরে কুচকাওয়াজের প্রথম দল ঢুকতেই একটু সমস্বরে হওয়া হই হই আওয়াজ ভেসে এলো। প্লাজা ৩ তলা। পাথরে একটি মৎস্যকন্যা আঁকা আছে। পান্না ও উজ্জ্বল নীল আলো দিয়ে অলংকার করা হয়েছে ওটার। একটি হাত স্বাগতম জানাচ্ছে। ওটার পেছন দিয়ে যাচ্ছে অন্যরা। মনোরম সুরে বাঁশি বাজছে, ড্রাম বাজছে।

দ্য হ্যানস ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসেন প্যারেড, বলল ফিওনা। এই লেখকের ২০০-তম জন্মবার্ষিকী পালন করা হচ্ছে এখানে। এই শহরের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন তিনি।

সেন্ট্রাল লেকের পাশ দিকে এগোনোলোকদের দিকে এগোল গ্রে। লেকের পানিতে প্রতিফলন ফেলে একটি বড় আতসবাজি আকাশে বিস্ফোরিত হলো। রাতের আকাশ জুড়ে আতসবাজির বিভিন্ন উজ্জ্বল শিখা দাপাদাপি করে হুটোপুটি খেল।

কুচকাওয়াজে অংশগ্রহণ করা লোকদের কাছাকাছি থাকলেও চারদিকে নজর বুলাচ্ছে গ্রে। কালো পোশাক পরিহিত ফ্যাকাসে চেহারা খুঁজছে ও। কিন্তু এই কোপেহ্যাগেনে প্রতি ৫ জনে ১ জনের চুল সাদা। আর ডেনমার্কে তো এখন কালো পোশাক পরা হালের ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ড্রামের তালে তালে গ্রের বুকও লাফাচ্ছে। উত্তেজনায় তালা লেগে গেছে ওর কানে। অবশেষে ওরা লোকজনের কাছে পৌঁছুল।

ওদের মাথার ঠিক ওপরেই আতসবাজি ফুটলো। আগুনের শিখায় উজ্জ্বল হলো রাতের আকাশ, ফটফট করে শব্দ হলো।

হোঁচট খেল ফিওনা।

গ্রে ওকে ধরে ফেলল, ওর কানে ভোঁ ভোঁ আওয়াজ হচ্ছে।

আতসবাজির বিস্ফোরণ মিলিয়ে যেতে ওর দিকে তাকাল ফিওনা, চমকে গেছে। এক হাত বের করে গ্রেকে দেখাল ও।

ওর হাত রক্তে লাল হয়ে গেছে।

.

ভোর ৪টা ০২ মিনিট।
হিমালয়।

অন্ধকারে জেগে উঠল ক্রো। আগুন নিভে গেছে। কতক্ষণ ঘুমিয়েছে ও? জানালা নেই, সময়ও বুঝতে পারছে না। কিন্তু ওর মন বলছে বেশিক্ষণ হয়নি।

কিছু একটা ওকে জাগিয়ে দিয়েছে।

কনুইয়ে ভর দিয়ে উঠল ও।

বিছানার অপর পাশে লিসাও জেগে গেছে, দৃষ্টি দরজার দিকে। তুমি টের পেয়েছ…?

বেশ ভয়াবহভাবে রুম কেঁপে উঠল। দূর থেকে গুরুগম্ভীর ভারী শব্দ এসে পৌঁছুল ওদের কাছে।

কম্বল সরিয়ে ফেলল ক্রো। বিপদ।

জার্মানদের দেয়া কয়েকটি পরিষ্কার পোশাকের দিকে ইঙ্গিত করল ও। চটপট পরে নিল ওরা: লম্বা আন্ডারওয়্যার, ভারী জিন্স আর মোটা সোয়েটার।

রুমের অন্যপাশে মোমবাতিগুলো জ্বালাল লিসা। গাট্টাগাট্টো এক জোড়া লেদার বুট পায়ে দিল, যদিও এটা ছেলেদের জন্য। চুপচাপ অপেক্ষা করল ওরা… প্রায় ২০ মিনিট। আওয়াজ ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে।

ওরা দুজন আবার বিছানায় গেল। তোমার কী মনে হয়, কী হলো? ফিসফিস করে বলল লিসা।

হাঁক-ডাকের আওয়াজ শোনা গেল।

জানি না… তবে আমরা বোধহয় জেনে যাব।

পুরু ওক কাঠের দরজার ওপাশ থেকে পাথুরে প্যাসেজ ধরে বুটের শব্দ ভেসে আসছে। উঠে দাঁড়াল ক্রো। কান সজাগ।

এদিকেই আসছে। বলল ও।

ওর কথা সত্য প্রমাণ করতে দরজায় কড়া আওয়াজ হলো। এক হাত উঁচু করে লিসাকে পেছনে থাকতে বলল ক্রো। নিজেও পেছালো এক কদম। দরজার বাইরে থাকা একটি ভারী লোহার দণ্ডের খসখসে আওয়াজ শোনা গেল।

খুলে গেল দরজা। চারজন অস্ত্রধারী রুমে ঢুকল, অস্ত্রগুলো ওদের দুজনের দিকে তাক করা। পাঁচ নম্বর ব্যক্তি ঢুকল এখন। এই ব্যক্তিকে দেখতে অনেকটা গানথারের মতোবিশাল দেহ, মোটা ঘাড়, হাল ধূসর রঙের চুলগুলো খাটো খাটো। পরনে বাদামি প্যান্ট, কালো বুট আর প্যান্টের সাথে ম্যাচ করা বাদামি শার্ট।

কালো অস্ত্র আর স্বস্তিকা ছাড়া তাকে দেখতে নাৎসি স্ট্রম ট্রুপারের মতো লাগছে।

কিংবা সাবেক নাৎসি স্ট্রম ট্রুপারও বলা যেতে পারে।

গানথারের মতো এর চেহারাও ফাঁকাসে, তবে একটু সমস্যা আছে। স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীর মতো তার চেহারা বাম পাশ একটু গেছে, দরজার দিকে সে তার বাম হাত তুলে দেখাতেই ওটা কেমন যেন কেঁপে উঠল।

Kommen mit mir! বলল সে।

ওদেরকে রুম থেকে বেরোনোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিশালদেহি লোকটি নির্দেশ দিয়ে ঘুরে চলে গেল। সে জানে, তার আদেশ অমান্য করার মতো পরিস্থিতি নেই। তার ওপর রাইফেলের ব্যবস্থা তো আছেই।

লিসার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল ক্রো। সবাই বেরোল রুম থেকে। হলওয়ে বেশ সরু, দুজন মানুষ একসাথে যাওয়া কঠিন। গার্ডদের অস্ত্রের সাথে থাকা ফ্ল্যাশলাইটের আলোয় পথ দেখে এগোল ওরা। রুমের চেয়ে এই হলওয়েতে বেশি ঠাণ্ডা। তবে সেটা হিমশীতল নয়।

ওদেরকে বেশিদূর নেয়া হবে না। পেইন্টার ক্রো আন্দাজ করল ওদেরকে হয়তো ক্যাসলের সামনের অংশে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ওর ধারণাই সত্য। বাতাসের হিস হিস আওয়াজও শুনতে পেল ও। বাইরে নিশ্চয়ই ঝড় আবার হামলা করেছে।

সামনে থাকা গার্ড কাঠের দরজায় নক করল। চাপা শব্দে অনুমতি দেয়া হলো ভেতর থেকে। উষ্ণ আলোয় হল আলোকিত হলো, উষ্ণ হাওয়াও এলো সাথে।

গার্ড ভেতরে ঢুকে দরজা ধরে রইল।

লিসাকে নিয়ে এগোল পেইন্টার রুমে চোখ বুলাল। লাইব্রেরি আর স্টাডি রুম বলে মনে হচ্ছে। দোতলা, চার দেয়ালে খোলা বুকশেলফ। উপরের তলার পুরোটা লোহার বেলকুনি দিয়ে ঘেরা, বেশ ভারী, তবে সাজ-সজ্জা নেই। উপরে যেতে হলে মই ছাড়া গতি নেই।

রুমের এক পাশে বড় ফায়ারপ্লেস আছে, উষ্ণতার উৎস ওটা। ওখানে ছোটখাটো দাবানল জ্বলছে। জার্মান ইউনিফর্ম পরা এক ব্যক্তির ওয়েল পেইন্টিং তাকিয়ে আছে ওদের দিকে।

আমার দাদু, বললেন অ্যানা পোরেনবার্গ। পেইন্টারকে সেভাবে উদ্দেশ্য করে বলেননি। একটি বিরাট ডেস্কের পেছন থেকে উঠে এলেন তিনি। তার পরনেও কালো জিন্স আর সোয়েটার। এটাই এই ক্যাসলের ড্রেস-কোড। যুদ্ধের পর তিনি এই ক্যাসল অধিকার করে নিয়েছিলেন।

ফায়ারপ্লেসের সামনে গোল করে বসানো চেয়ারে বসতে ইশারা করলেন তিনি। পেইন্টার তার চোখ খেয়াল করে দেখল ওখানে কালি জমেছে। মনে হচ্ছে তিনি একটুও ঘুমাননি। তার শরীর থেকে একধরনের সুগন্ধি বেরোচ্ছে।

ইন্টারেস্টিং।

তিনি ভারী চেয়ারের দিকে এগোতেই পেইন্টারের সাথে তাঁর চোখাচোখি হলো। ঘাড়ের পেছনে থাকা ছোট ছোট চুলগুলো দাঁড়িয়ে গেল ক্রোর। চোখের নিচে কালি জমলেও অ্যানার চোখ দুটো বেশ উজ্জ্বল ও তীক্ষ্ণ। পেইন্টার তার চোখে ধূর্ত, দানবীয় ও হিসেবি দীপ্তি দেখতে পেল। ওকে খুব কাছ থেকে দেখে তিনি কী যেন হিসেব করছেন।

হচ্ছেটা কী?

setzen Sie, bitte মাথা নেড়ে চেয়ারগুলো দেখালেন তিনি। বসতে বলছেন।

পাশে থাকা দুটো চেয়ারে বসল লিসা ও ক্রো। অ্যানা ওদের বিপরীতে বসলেন। গার্ডটি দরজা বন্ধ করে দিয়ে ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে। হাত দুটো আড়াআড়িভাবে রাখা। পেইন্টার জানে বাকি গার্ডগুলো দাঁড়িয়ে আছে দরজার বাইরে। এই রুম থেকে পালানোর পথ খুঁজল গ্রে। পুরু কাঁচের এক জানালা ছাড়া এখান থেকে পালানোর আর কোনো উপায় নেই। ঠাণ্ডার কারণে কাঁচ ঘোলা হয়ে রয়েছে, এছাড়াও পুরো জানালায় লোহার দণ্ড দিয়ে গ্রিল দেয়া।

এদিক দিয়ে পালানো চলবে না।

অ্যানার দিকে মনোযোগ দিল ক্রো। হয়তো অন্য কোনো উপায় আছে। অ্যানার ভাবভঙ্গি একটু বিপজ্জনক হলেও ওদেরকে তো একটি কারণে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে। ক্রো এখান থেকে যত সম্ভব তথ্য জেনে নিতে চায়। তবে ওকে খুব চতুরভাবে পা ফেলতে হবে। অ্যানার পরিবারের এক ব্যক্তিকে তো ও ওয়েল পেইন্টিং থেকে দেখে নিয়েছে। এটা দিয়েই শুরু করা যাক।

আপনি বললেন, আপনার দাদু এই ক্যাসল অধিকার করে নিয়েছিলেন, বলল পেইন্টার। মনে মনে জবাব আশা করছে। পা ফেলছে নিরাপদে। এই ক্যাসল তার আগে কার দখলে ছিল?

চেয়ারের পেছনে হেলান দিলেন অ্যানা। আগুনের সামনে বসে একটু রিল্যাক্স করা যেতে পারে। তবে তার দৃষ্টি এখনও তীক্ষ্ণ, হাত দুটো কোলের ওপর রাখা, লিসার ওপর দিয়ে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে ক্রোর ওপর থামলেন। GranitschloB–এর এক লম্বা অন্ধকার ইতিহাস আছে, মিস্টার ক্রো। আচ্ছা, আপনি হেনরিক হিমল্যারের নাম শুনেছেন?

হিটলারের সেকেন্ড ইন কমান্ড?

হ্যাঁ। এসএস-এর প্রধান। সেইসাথে কসাই ও উন্মাদ।

এরকম শব্দে ভূষিত করায় পেইন্টার বিস্মিত হলো। এটা কী কোনো ছলনা? খেলা শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু কীভাবে পা ফেলে খেলতে হবে সেটা ও জানে… অন্তত এখনও পর্যন্ত জানতে পারেনি।

বলছেন অ্যানা, হিমল্যার নিজেকে রাজা হেইনরিচ-এর পুনর্জন্ম ব্যক্তি হিসেবে বিশ্বাস করতেন। দশম শতাব্দীতে স্যাক্সন অঞ্চলের রাজা ছিলেন হেইনরিচ। এমনকি তার ধারণা ছিল তিনি নাকি হেইনরিচের কাছ থেকে দৈববাণী পেতেন!

মাথা নাড়ল পেইন্টার। আমি শুনেছিলাম অতিপ্রাকৃত ব্যাপার-স্যাপারে বিশ্বাসী ছিলেন তিনি।

একদম অন্ধ ছিলেন তিনি। পুরোপুরি বদ্ধমূল ধারণা ছিল তার। শ্রাগ করলেন অ্যানা। অনেক জার্মানির অনুরাগ ছিল এটার ওপর। ম্যাডাম বালাভাস্কি থেকে শুরু করি… আর্যজাতি নিয়ে তিনি সর্বপ্রথম হুজুগ তুলেছিলেন। দাবি করলেন, বুদ্ধ মঠে দীক্ষা লাভ করতে গিয়ে তিনি নাকি কোনো এক গোপনবিদ্যা অর্জন করেছেন। গোপন গুরু তাকে জানিয়েছেন কীভাবে মানবজাতি ধীরে ধীরে এত উন্নত হয়েছে এবং একদিন অবনতিও হবে।

প্রচলিত ধারণা, বলল পেইন্টার।

একদম। ঠিক তার ১০০ বছর পর, গুইডো ভন লিস্ট নামের একজন ম্যাডামের সেই বিশ্বাসের সাথে জার্মান মিথলজিকে মিশিয়ে একটু পরিমার্জন উত্তরদেশীয়দের পূর্বপুরুষ হিসেবে এই কাল্পনিক আর্যজাতিকে উপস্থাপন করেন।

তারপর জার্মানের লোজন সেই গল্পে একদম মজে গেল। একটি টোপ ফেলল ক্রো।

তা তো মজবেই। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আমাদের হারের পর এরকম একটা ধারণা খুব জনপ্রিয়তা পেয়ে গেল। পুরো ব্যাপারটা জার্মানির অতিপ্রাকৃত বিভিন্ন কেন্দ্রে গিয়ে ঠাই পেল। দ্য গুলি সোসাইটি, দ্য ড্রিল সোসাইটি, দ্য অর্ডার অফ দ্য নিউ টেম্পলারস… ইত্যাদি।

আর আমার যতদূর মনে পড়ে, হিমল্যার নিজে খুলি সোসাইটিতে যুক্ত ছিলেন।

হ্যাঁ, তিনি এই মিথলজি পুরোপুরি বিশ্বাস করতেন। এমনকি স্ক্যান্ডেনেভিয়ানদের প্রাচীন অক্ষরগুলোর জাদুতেও তার বিশ্বাস ছিল। সেজন্য ডাবল sig প্রাচীন অক্ষর আর জোড়া বজ্রপাত ব্যবহার করে তিনি তাঁর নিজের যোদ্ধা যাজকদের পরিচয় তুলে ধরতেন, দ্য Schutzstafel, দ্য SS। ম্যাডাম বালাভাস্কির কাজ পর্যালোচনা করে তিনি নিশ্চিত হয়েছিলেন, এই হিমালয় থেকে আর্যজাতিদের যাত্রা শুরু হয়েছিল আর ঠিক এখান থেকেই তাদের পুনরুত্থান হবে।

প্রথমবারের মতো মুখ খুলল লিসা। তাই হিমল্যার হিমালয়ে অভিযান পাঠিয়ে ছিলেন। একটু পেইন্টারের দিকে তাকাল ও। এই বিষয়টি নিয়ে ওরা আগে কথা বলেছে। দেখা যাচ্ছে ওদের চিন্তা-ধারায়ও খুব বেশি ভুল ছিল না। তবে পেইন্টার এখনও অ্যানার সেই দুর্বোধ্য কথার মর্মার্থ খুঁজে বেড়াচ্ছে।

আমরা নাৎসি না। আমরা আর নাৎসি নেই।

কিছু একটা ঠিক করে রাখা হয়েছে, ক্রো টের পেল ঠিকই কিন্তু ওটা যে ওদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে বুঝতে পারল না। এরকম অন্ধকারে থাকা ওর মোটেও পছন্দ নয় তবে সেটা সামনাসামনি প্রকাশ করল না।

আচ্ছা, হিমল্যার এখানে কী খুঁজছিলেন? প্রশ্ন করল ক্রো। আর্যদের কোনো হারানো গোত্র? শুভ্র-সাদা সাংরি-লা?

না ঠিক তা নয়। নৃ-তাত্ত্বিক ও প্রাণিবিজ্ঞান সম্পর্কিত গবেষণার মোড়কে তিনি এখানে তার এসএস সদস্যদের পাঠিয়ে ছিলেন। অনেক বছর আগে হারিয়ে যাওয়া আর্যদের শেকড়ের সন্ধান করছিলেন তিনি। প্রমাণ খুঁজছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল তিনি এখান থেকে সূত্র পাবেনই। কিন্তু কিছু না পেয়ে আরও বেশি আগ্রহী হয়ে পড়েছিলেন। বেপরোয়া পাগলামো যাকে বলে! জার্মানি এসএস-এর জন্য উইউইলসবার্গ নামের একটি দুর্ভেদ্য দুর্গ নির্মাণের সময় ঠিক ওটার মতো দেখতে আরেকটি দুর্গ এখানেও নির্মাণ করতে শুরু করেন। জার্মান থাকা হাজার খানেক যুদ্ধবন্দীকে এই হিমালয়ে উড়িয়ে নিয়ে এসে শ্রমিকের কাজে লাগিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। এক মেট্রিক টন সোনার বার এনেছিলেন জাহাজে করে। নিজেদের জন্য যথেষ্ট রসদ জুগিয়েছিলেন তিনি। বেশ ভাল বিনিয়োগ ছিল ওটা।

কিন্তু এখানে কেন নির্মাণ করতে গেলেন? লিসা জানতে চাইল।

কিছুটা আন্দাজ করতে পারছিল পেইন্টার। তার বিশ্বাস ছিল এই পর্বতমালা থেকে আর্যদের আবার পুনরুত্থান ঘটবে। সেই আর্যদের কথা ভেবেই এই দুর্গ তৈরি করছিলেন।

মাথা নেড়ে সায় দিলেন অ্যানা। গোপন গুরুদেরকেও বিশ্বাস করতেন তিনি, গুরুগণ তাকে জানিয়েছিল, ম্যাডাম বালাভাস্কি এখনও বেঁচে আছে। তাদের সবার জন্য দুর্ভেদ্য দুর্গ নির্মাণ করছিলেন। যাবতীয় জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্রীভূত করার ইচ্ছে ছিল তার।

গোপন শুরু কী কখনও দেখা দিয়েছিলেন? ক্রো মজা করে জানতে চাইল।

না। তবে আমার দাদা যুদ্ধের শেষে একটা জিনিস করে দেখিয়েছিলেন। এমন এক অলৌলিক কাজ করেছিলেন যেটা হিমল্যারের স্বপ্নকে বাস্তবে আনতে সক্ষম ছিল।

কী সেটা? পেইন্টারের প্রশ্ন।

মাথা নাড়লেন না। ওদিকে কথা বলার আগে আমি আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে চাই। আশা করি আপনি মিথ্যা বলবেন না।

হঠাৎ করে কথার মোড় ঘুরতে দেখে ক্রো ভ্রু কুঁচকাল। আমি কোনো কথা দিতে পারব না, সেটা আপনি ভাল করেই জানেন।

প্রথমবারের মতো অ্যানার মুখে হাসি দেখা গেল। যাক, মিস্টার ক্রো, আপনি এতটুকু তো সত্য বলেছেন?

আপনার প্রশ্নটা শুনি। বেশ আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইল ক্রো। আসল ঘটনা হয়তো এবার বোঝা যাবে।

ওর দিকে তাকালেন অ্যানা। আপনি কী অসুস্থ? আমি অনেক কিছুই শুনতে পেরেছি। তবে আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনার মাথা বেশ পরিষ্কার।

ক্রোর চোখ বড় বড় হয়ে গেল। এরকম প্রশ্ন সে আশা করেনি।

পেইন্টার কিছু বলার আগেই লিসা জবাব দিল, হ্যাঁ। ও অসুস্থ।

লিসা…ক্রো বাধা দিতে চাইল।

তিনি এটা কোনো না কোনোভাবে ঠিকই বুঝতে পারতেন। তোমার অসুখ হয়েছে। এটা বোঝার জন্য কোনো মেডিক্যাল ডিগ্রি নেয়ার প্রয়োজন নেই।

অ্যানার দিকে ফিরল লিসা। চোখের সমস্যাসহ কয়েকটি জিনিসে ভুগছে ও।

প্রচণ্ড মাথাব্যথার সাথে চোখের সামনে আলোর দপদপানি আছে?

লিসা মাথা নেড়ে সায় দিল।

আমিও এরকমটাই ভেবেছিলাম। পেছনে হেলান দিলেন অ্যানা। তথ্যগুলো তাকে নিশ্চিত করল।

ভ্রু কুঁচকাল পেইন্টার। কেন?

লিসা কথা বের করতে চাইল। কী হয়েছে ওর? আমার মনে হয়, আমরা… মানে ওর সেটা জানার অধিকার আছে।

ওটা জানতে হলে আরও আলোচনা করতে হবে। তবে আমি আপনাকে তার সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে জানাতে পারি।

কী সেটা?

আগামী তিন দিনের মধ্যে সে মারা যাবে। মৃত্যুটা হবে খুব ভয়াবহ।

কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখানোর জন্য নিজের সাথে রীতিমতো যুদ্ধ করল ক্রো।

লিসাও বেশ স্বাভাবিক রইল, নিরপেক্ষ কণ্ঠে বলল, এর কোনো চিকিৎসা আছে?

না।

.

রাত ১১ টা ১৮ মিনিট।
কোপেনহ্যাগেন, ডেনমার্ক।

ফিওনাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। জখমের স্থান থেকে রক্ত গড়িয়ে বেচারির শার্ট ভিজে যাচ্ছে, টের পেল গ্রে। ওর নিচে হাত দিয়ে সাহায্য করল।

ওদের দুজনের চারদিকে অনেক লোকজন। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ দেখতে দেখতে গ্রে বিরক্ত হয়ে গেল। মিউজিক ও গান বন্ধ হয়ে গেল ওদের পাশ দিয়ে কুচকাওয়াজ চলে যেতেই। সচল বিশালাকৃতির পুতুলগুলো লোকজনের মাথার ওপর দিয়ে ইচ্ছেমতো নড়াচড়া করছে, মাথা নাড়ছে।

লেকের উপরের আকাশে আতসবাজি ফুটছে এখনও। গ্রে এসব কিছু এড়িয়ে গেল। ফিওনাকে যে গুলি করেছে তাকে খুঁজছে ও।

গ্রে ফিওনার জখমস্থান চট করে দেখে নিল। স্রেফ ছড়ে গেছে, চামড়া পুড়েছে একটু, রক্ত বেরোচ্ছে, গুলিবিদ্ধ না হলেও ওকে ডাক্তার দেখানো দরকার। ব্যথায় বেচারির মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে।

গুলি ছোঁড়া হয়েছে পেছন থেকে। অর্থাৎ স্নাইপার গাছ আর ঝোঁপঝাড়ের ভেতরে পজিশন নিয়েছিল। কপাল ভাল ওরা দুজন লোকজনের ভেতরে পৌঁছুতে পেরেছে। যেহেতু ওদেরকে এখানে দেখে ফেলে… শত্রুপক্ষ হয়তো এতক্ষণে কাছাকাছি চলেও এসেছে। এই লোকজনের ভেতরেই কোথায় ঘাপটি মেরে আছে তারা।

গ্রে ঘড়ি দেখল। পার্ক বন্ধ হতে আর ৪৫ মিনিট বাকি।

প্ল্যান দরকার… নতুন প্ল্যান। এই লোকগুলো মাঝরাতে পার্ক থেকে বেরোবে। কিন্তু ওদের তো অতক্ষণ পর্যন্ত অপেক্ষা করা যাবে না। মাঝরাতের আগেই ওরা শত্রুপক্ষের হাতে ধরা পড়ে যাবে। এখুনি কেটে পড়তে হবে ওদের।

কিন্তু পার্কের বের হওয়ার পথ থেকে এই কুচকাওয়াজের মাঠে অবস্থা একদম জনশূন্য মরুভূমির মতো। কারণ সব অতিথিরা লেকের চারপাশে ভিড় করেছে। তাই এদিকটা ফাঁকা। যদি ওরা দুজন এ-পথ দিয়ে পালানোর চেষ্টা করে তাহলে ফাঁকা অংশে নির্ঘাত চোখে পড়ে যাবে। আর পার্কের গেইটও নিশ্চয়ই শত্রুপক্ষের নজরদারিতে আছে।

নিজের জখমস্থানকে এক হাত দিয়ে চেপে ধরে রেখেছে ফিওনা। রক্ত চুঁইয়ে বেরোচ্ছে ওর আঙুলের ফাঁক দিয়ে। গ্রের চোখে চোখ পড়ল ওর, আতঙ্কিত।

ফিসফিস করে বলল, আমরা কী করতে যাচ্ছি?

ওকে সাথে নিয়ে গ্রে লোকজনের ভেতরে এগোচ্ছে। একটা উপায় পেয়েছে ও, যদিও সেটা বুঝুঁকিপূর্ণ তবে সাবধানতা অবলম্বন করার কারণে ওরা পার্ক থেকে বেরোতে পারবে না। ফিওনাকে নিজের সামনে নিল গ্রে।

আমার হাতে রক্ত মাখাতে হবে।

কী?

গ্রে ফিওনার শার্টের দিকে ইঙ্গিত করল।

ভ্রু কুঁচকে ব্লাউজের কিনারা উঁচু করল ফিওনা। সাবধানে…

জখম থেকে নেমে আসা রক্তধারাটুকু গ্রে সাবধানে মুছে নিল। ব্যথায় কুঁচকে উঠে ছোট্ট করে শ্বাস ফেলল ফিওনা।

দুঃখিত, গ্রে বলল।

তোমার আঙুল তো অনেক ঠাণ্ডা, বিড়বিড় করল ফিওনা।

তুমি ঠিক আছে তো?

আমি বাঁচব।

হা, ওটাই তো লক্ষ্য।

একটু পরেই তোমাকে তুলে নেব… বলে গ্রে উঠে দাঁড়াল।

তুমি কোথায়… কী…?

আমি যখনই বলব সাথে সাথে চিৎকার দেবে। রেডি থাকো।

কিছুই বুঝতে না পেরে নাক কুঁচকাল ফিওনা। তবে হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।

সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করল গ্রে। দূরে বাঁশি আর ড্রামের আওয়াজ শুরু হলো। ফিওনাকে পাশ কাটিয়ে মেইন গেইটের দিকে এগোল ও। স্কুল ছাত্রদের মাথার ওপর দিয়ে গ্ৰে দেখল, একজন লোকের পরনে ট্রেঞ্চ কোট, তার এক হাত ঝোলানো অবস্থায় আছে। গ্রিট্টির খুনি।

ছোটবাচ্চাদের ভেতর দিয়ে অনেক কষ্টে এগোচ্ছে সে, চোখ বুলাচ্ছে চারিদিকে।

বাঁশি আর ড্রামের তালে তালে প্রাচীন গান গেয়ে ওঠা একদল জার্মানদের ভেতরে ভিড়ে ফিওনার কাছে ফিরে এলো গ্রে। গান শেষ হওয়ার পর আতসবাজির বিস্ফোরণের শব্দও বন্ধ হলো।

এবার… বলল গ্রে, নিচু হয়ে ঝুঁকেছে। সারামুখে রক্তের প্রলেপ মেখে ফিওনাকে নিজের দুহাতে তুলে নিল। ডেনিশ ভাষায় চিৎকার করে বলল, বোম!

আতসবাজি বিস্ফোরণের শব্দ এখনও বাতাসে পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি, তাই ওর চিৎকার সেভাবে কাজে এলো না।

চিৎকার করো, ফিসফিস করে ফিওনাকে বলল ও।

রক্তের প্রলেপ দেয়া নিজের মুখখানা উপরে মেলে ধরল গ্রে। ফিওনা ওর হাতের উপরে থেকে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল।

বোম! আবার গলা ফাটাল গ্রে।

অনেক মুখ ঘুরল ওর দিকে। আকাশে আবার আতসবাজি তার যাত্রা শুরু করেছে। তাজা রক্তে গ্রের গাল চিকচিক করছে। প্রথমে কেউ-ই নড়ল না। কিন্তু তারপর জলোচ্ছ্বাসের মতো সবাই মেইন গেইটের দিকে যাত্রা শুরু করল। একজন আরেকজনকে ধাক্কা মারছে, ঠেলা দিচ্ছে। ভয় পেয়ে অনেকেই চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করায় লোকের চল আরও বেড়ে গেল।

যারা পালিয়ে যাচ্ছে তাদের ঠিক পেছনেই আছে গ্রে। ওর আশেপাশে যারা আছে এরা সবাই খুবই আতঙ্কিত।

তীক্ষ্ণস্বরে চিৎকার করছে ফিওনা। এক হাত নাড়াল, আঙুলে রক্ত চোয়াচ্ছে।

দাবানলের মতো আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। লন্ডনে আর স্পেনে আক্রমণ হয়ে যাওয়ায় গ্রের চিৎকার বেশ কাজে লাগল। অনেকেই বোম বলে চিৎকার করছে। একজন আরেকজনের কাছ থেকে শুনে নিজেও চেঁচাচ্ছে।

তাড়া খাওয়া পশুপালের মতো একে অন্যকে ঠেলা-ধাক্কা মেরে এগোচ্ছে সবাই। ওরা এই আবদ্ধস্থান থেকে বেরিয়ে যেতে মরিয়া। আকাশে ওঠা আতসবাজির দম ফুরিয়েছে। এখানকার আতঙ্ক এবার প্যারেড গ্রাউন্ডেও গিয়ে পৌঁছুল। একজন দৌড় দিলে তার দেখাদেখি আর দুইজন দৌড়ায়। এভাবে বেড়েই চলেছে। কত পায়ের থপথপানি চলছে পার্কের পথের ওপর দিয়ে। বাহির-এর দিকে ছুটছে সবাই।

একটি কৌশল রীতিমতো জনতার ঢলে পরিণত হলো।

বের হওয়ার জন্য ছুটছে সবাই।

এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এগোল গ্রে। ফিওনা আছে ওর হাতে। গ্রে প্রার্থনা করল কেউ যেন কারও পায়ের নিচে চাপা না পড়ে। তবে এই ঢলে শুধু নিখাদ আতঙ্ক নয়, আতসবাজির শব্দ মিলিয়ে যেতেই সেটা ভয়ঙ্কর বিষয়ে পরিণত হলো। লোকজনের ঢল ছুটে চলেছে মেইন গেইটের দিকে।

ফিওনাকে নিজের হাত থেকে নামিয়ে দিল গ্রে। আরমানি জ্যাকেটের হাতায় নিজের রক্তমাখা চেহারা মুছল। গ্রের বেল্টে এক হাত দিয়ে নিজের ভারসাম্য বজায় রেখে দাঁড়াল ফিওনা।

সামনে গেইট উদয় হলো।

মাথা নেড়ে এগোল গ্রে। যদি কোনো কিছু হয়ে যায়… দৌড়াবে। থামবে না, যেতেই থাকবে।

আমি জানি না, পারব কিনা। এপাশটা খুব হারামির মতো ব্যথা করছে।

খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে ফিওনা। একটু ভর দিয়েছে গ্রের ওপর।

সামনে, জনতার ঢল সামলাতে ব্যস্ত সিকিউরিটি গার্ডরা। কেউ যেন কারও গায়ের ওপর গিয়ে না পড়ে সেদিকে নজর রাখছে তারা। ওদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে গ্রে খেয়াল করল দুজন গার্ড একটু তফাতে দাঁড়িয়ে আছে। জনতা সামলাচ্ছে না ওরা, সন্দেহজনক। একজন পুরুষ, আরেকজন নারী। দুজনের চামড়া সাদা। নিলাম ভবনে এরাই জিতেছিল। এখন গার্ডের ছদ্মবেশ ধরে গেইটে দাঁড়িয়ে আছে। পিস্তল শোভা পাচ্ছে দুজনের হাতেই।

এক মুহূর্তের জন্য গ্রের দিকে চোখ পড়ল নারী গার্ডের।

কিন্তু স্রেফ চোখ বুলিয়ে দৃষ্টি সরে গেল।

ফিরল আবার।

চিনতে পেরেছে।

জনতার স্রোতের উল্টো দিকে রওনা হলো যে! একদম উজান পাড়ি দিচ্ছে।

কী? ফিওনা প্রশ্ন করল।

ফিরে চল। অন্যকোনো রাস্তা দেখতে হবে।

কীভাবে?

জনতার ভিড় ঠেলে একটু পাশে সরল গ্রে। সোজাভাবে এরকম উজান পাড়ি দেয়া অনেক কঠিন। একটু পরে পরিবেশ একটু হালকা হলো। বড় স্রোত চলে গেছে, অল্পকিছু লোক আছে এখন।

তবে ওদের লুকোনোর জায়গা দরকার।

যে দেখল ওরা জনশূন্য প্যারেড গ্রাউন্ডে চলে এসেছে। কোনো কুচকাওয়াজের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না এখানে। মিউজিকও নেই, তবে আলো জ্বলছে। কুচকাওয়াজে অংশ নেয়া বিভিন্ন রথ পড়ে আছে মাটিতে। রথ ফেলে চালকেরা জান নিয়ে পালিয়েছে যে যার মতো। এমনকী এখানকার সিকিউরিটি গার্ডরাও গেইটের দিকে চলে গেছে।

রথের ভেতরে থাকা একটি ক্যাবের দরজা খোলা দেখে ওদিকে এগোল গ্রে।

চলো।

ফিওনাকে প্রায় টেনে নিয়ে ক্যাবের কাছে গেল ও। ক্যাবের উপরে খেলনা হাঁসের একটি বিশালাকৃতির মাথা শোভা যাচ্ছে। যে চিনতে পারল। হ্যানস ক্রিস্টিয়ান অ্যান্ডেরসেন-এর রূপকথার গল্প দ্য আগলি ডাকলিং অবলম্বনে এটা তৈরি করা হয়েছে।

হাসের খোলা পাখনার নিচ দিয়ে এগোল গ্রে। পাখনায় আলো জ্বলছে। খেলনা হলেও এই পাখনা ডানার মতো ঝাপটাতে পারে। যে ফিওনাকে ক্যাবে উঠতে সাহায্য করল। মনে মনে ভাবছে, এই বুঝি পেছন থেকে গুলি লাগল। ফিওনার পর নিজেও ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। দরজা বন্ধ করার সময় যতটুকু সম্ভব শব্দ না করার চেষ্টা করল ও।

উইনশিন্ড (যানবাহনের সামনের কাঁচ) দিয়ে সামনে তাকাতেই বুঝল ওর সতর্কতা। মাঠে মারা যায়নি।

জনতার ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে আসছে একজন। গ্রিট্টির খুনি। কাছে থাকা শটগান লুকোনোর কোনো চেষ্টাই করছে না সে। সবাই পার্কের সামনের দিকে ব্যস্ত। লেক আর প্যারেড সার্কিটের দিকে কারও নজর নেই।

ফিওনাকে সাথে নিয়ে মাথা নিচু করল গ্রে।

কয়েক ফুট দূর দিয়ে গেল লোকটা। পড়ে থাকা রথগুলোর পাশ দিয়ে এগোচ্ছে।

আর একটু হলেই হয়েছিল, ফিওনা ফিসফিস করল। আমাদের উচিত…

শশশ। গ্রে ফিওনার ঠোঁটের ওপর আঙুল চেপে ধরল। এই কাজ করতে গিয়ে একটি লিভারে ছুঁয়ে গেল ওর কনুই। ড্যাশবোর্ডে কীসের যেন ক্লিক শব্দ হলো।

এই সেরেছে!

ক্যাবের ওপরে থাকা ঢাউস মাথার ভেতরে স্পিকার বসানো আছে।

… কোয়াক, কোয়াক, কোয়াক… কোয়াক, কোয়াক, কোয়াক…

জেগে উঠেছে আগলি ডাকলিং।

সবাই জেনে গেল ব্যাপারটা।

সোজা হলে গ্রে। ৯০ ফুট দূরে শটগানধারী পাক খেয়ে ঘুরে দাঁড়াল।

লুকোচুরি শেষ।

হঠাৎ ক্যাবের ইঞ্জিন গর্জে উঠল। গ্রে তাকিয়ে দেখে, ফিওনা ক্লাচ নাড়াচাড়া করছে।

চাবি দেয়াই ছিল, গিয়ার বদলাতে বদলাতে বলল ফিওনা। লাইন ছেড়ে রথ সামনে এগোল।

ফিওনা, আমাকে দাও…

শেষবার তুমি চালিয়েছিলে। দেখো, কোথায় এনে ফেলেছ আমাদের। শটগানধারী লোকটির দিকে ক্যাব তাক করল ও। তাছাড়া, এই হারামজাদার সাথে আমার বোঝাপড়া আছে।

আচ্ছা, তাহলে সে-ও আততায়ীকে চিনতে পেরেছে। এই লোক ওর নানুকে খুন করেছিল। ২ নম্বর গিয়ার দিল ও, ওদিকে শটগানধারী অস্ত্র উঁচিয়েছে। কোনো পরোয়া না করে আগলি ডাকলিং-কে তার দিকে নিয়ে চলল ও।

কিছু একটা করতে চাইল গ্রে, ক্যাবের ভেতরে হাতড়াল।

এত এত লিভার…

গুলি করল শটগানধারী।

নিজেকে গুটিয়ে নিল গ্রে, তবে ফিওনা ইতোমধ্যে ক্যাবের হুইল ঘুরিয়ে নিয়েছে। উইনশীল্ডের এক কোণায় মাকড়সার জালের মতো জখম তৈরি হলো। হুইল আবার ঘুরাচ্ছে ফিওনা, আততায়ীকে পিষে ফেলতে চায়।

হঠাৎ করে দিক পরিবর্তন করে হুইল ঘোরানোয় ক্যাব দুই চাকার ওপর উঠে এলো।

ধরে থাকো! চিৎকার করল ফিওনা।

চার চাকায় অবতরণ করল ক্যাব। কিন্তু এই সুযোগে আততায়ী বাড়তি কিছু সময় পেয়ে গেল। বাম দিকে সরে গেল সে। লোকটার হাত খুব চালু। আবার গুলি ছোঁড়ার জন্য ইতোমধ্যে শটগান রেডি করতে শুরু করেছে। এবার তার মতলব, ক্যাব যখন ওর পাশ দিয়ে যাবে তখন জানালায় একদম পয়েন্ট ব্ল্যাক রেঞ্জ (একেবারে কাছ থেকে, প্রায় কোনো দূরত্ব ছাড়া) থেকে গুলি করবে ও।

ফিওনা এবার আর কোনো দিক পরিবর্তন করার কোনো সুযোগ পেল না।

সারি সারি লিভারগুলোর দিকে তাকিয়ে থেকে একদম বাম পাশের লিভারে হাত দিল গ্রে। অনেকটা আন্দাজেই করল কাজটা। লিভার নিচে নামাল। একটু আগে ডাকলিঙের বাম পাখনা উপরে তোলা ছিল ওটা এখন ঝাপটা মেরে নিচে নেমে এসেছে। আততায়ীর গলায় গিয়ে আঘাত করল ওটা। লোকটির কশেরুকায় আঘাত করে একদম উড়িয়ে নিয়ে একপাশে ফেলে দিলো।

গেইটের দিকে চলল! তাগাদা দিল গ্রে।

দ্য আগলি ডাকলিং প্রথমবারের মতো রক্তের স্বাদ পেয়েছে।

… কোয়াক, কোয়াক, কোয়াক… কোয়াক, কোয়াক, কোয়াক…

সাইরেনের মতো ডাকাডাকি করে রাস্তা পরিষ্কার করল ডাকলিং। সামনে থাকা লোকজন ভড়কে গিয়ে জায়গা করে দিতে বাধ্য হলো। জনতার ঢলের তোপে রীতিমতো নাকানি-চুবানি খেলো গার্ডরা। ছদ্মবেশি দুই গার্ডও বাদ গেল না। লোকজনের ধাক্কায় একটু আগে মেইন গেইটের পাল্লা বড় করে খুলে দেয়া হয়েছে। জনতা ছুটে বেরিয়ে যাচ্ছে ওটা দিয়ে।

ফিওনাও ওটার দিকে লক্ষ্য স্থির করল।

ক্ষত-বিক্ষত বাম পাখনা নিয়ে ছুটল ডাকলিং। ঝাঁকি খেয়ে রাস্তায় উঠল ওরা। ফিওনা ডাকলিং চালিয়ে গেল।

প্রথম কোণায় চলল, হাত দিয়ে দেখিয়ে দিল গ্রে।

ফিওনা দক্ষ পেশাদারদের মতো গিয়ার নামিয়ে গ্রের আদেশ পালন করল। কোণার দিকে এগোল ডাকলিং। দুই মোড় পার হওয়ার পর গ্রে ক্যাব থামাতে বলল।

আমরা এই জিনিস আর চালিয়ে নিতে পারি না, বলল ও। এটা দেখতে অদ্ভুত দেখায়। দৃষ্টিআকর্ষণ করে সবার।

তোমার তা-ই মনে হয়? রেগে মাথা নাড়ল ফিওনা।

টুল কিটের ভেতরে গ্রে একটি লম্বা রেঞ্জ পেল। রাস্তার পাশে পাহাড়ের চূড়োয় ক্যাব থামিয়ে ফিওনাকে নামিয়ে দিল ও। গিয়ার বাড়িয়ে ক্লাচ সরাল গ্রে, অ্যাক্সেলেটরের উপরে রেঞ্জ দিয়ে চাপ দিয়ে রেখে আটকে দেয়ার পর ক্যাব থেকে লাফ দিলো।

পাখনায় আলো নিয়ে পাহাড়ের নিচের দিকে রওনা হলো আগলি ডাকলিং। যেখানে গিয়ে এটা ক্রাশ (দুর্ঘটনা, দুমড়ে যাওয়া) করবে সবার দৃষ্টি ওদিকে থাকায় একটু সুবিধে পাবে ওরা।

এখান থেকে ঠিক উল্টো দিকে এগোল গ্রে। আপাতত কয়েক ঘন্টার জন্য নিরাপদ। ঘড়ি দেখল ও এয়ারপোর্টে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট সময় আছে। মনক-ও খুব শীঘ্রিই পৌঁছে যাবে।

খুঁড়িয়ে এগোতে এগোতে পেছনে ফিরে তাকাল ফিওনা। ওদের পেছনে ডাকলিং ডেকে চলেছে।

… কোয়াক, কোয়াক, কোয়াক… কোয়াক, কোয়াক, কোয়াক…

আমি ওকে মিস করব। ফিওনা বলল।

আমিও।

.

ভোর ৪ টা ৩৫ মিনিট।
হিমালয়।

ফায়ারপ্লেসের পাশে দাঁড়িয়ে আছে পেইন্টার। নিজের মৃত্যুদণ্ডের সংবাদ শুনে চেয়ার থেকে উঠে পড়েছে।

ওকে উঠতে দেখে বিশালদেহি এক গার্ড তিন পা এগিয়ে এসেছিল। কিন্তু অ্যানা এক হাত তুলে তাকে থামিয়ে দেন। Nein, Klaus. Alles 1st ganz recht.

কালাউস নামের গার্ডটি তার নিজের পজিশনে ফিরে যাওয়ার আগপর্যন্ত পেইন্টার অপেক্ষা করল।

তাহলে এই রোগের কোনো চিকিৎসা নেই?

মাথা নাড়লেন অ্যানা। যেটা সত্য সেটাই বলেছি।

তাহলে সন্ন্যাসীরা যেরকম পাগলামো করছিল পেইন্টার ওরকম করছে না কেন? লিসা প্রশ্ন করল।

পেইন্টারের দিকে তাকালেন না। আপনি মঠ থেকে দূরে ছিলেন, তাই তো? গ্রামে থাকার ফলে তুলনামূলক কম আক্রান্ত হয়েছেন। দ্রুত স্নায়বিক অধঃপতনের বদলে আপনার শরীর ধীরে ধীরে খারাপের দিকে এগোচ্ছে। তবে এটারও শেষ পরিণতি হলো-মৃত্যু।

অ্যানা নিশ্চয়ই পেইন্টারের চেহারা দেখে কিছু একটা বুঝতে পেরেছিলেন।

চিকিৎসা না থাকলেও অবস্থার অবনতির গতিকে ধীর করার আশা আছে। কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন প্রাণীর ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে আমরা কিছু মডেল উদ্ভাবন করেছি যেগুলো বেশ আশাব্যঞ্জক। আমরা আপনার জীবন দীর্ঘায়িত করতে পারি। মানে পারতাম আরকী।

মানে কী? লিসা প্রশ্ন করল।

উঠে দাঁড়ালেন অ্যানা। এজন্যই আপনাদেরকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে। দেখাব আপনাদের। কালাউসের দিকে মাথা নাড়লেন তিনি, সে দরজা খুলে দিল। আমার সাথে আসুন। হয়তো আমরা একে অপরকে সাহায্য করার রাস্তা পেয়ে যাব।

অ্যানা সামনে পা বাড়ানোর পর লিসার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল পেইন্টার। কৌতূহলে মরে যাচ্ছে ও। একই সাথে ফাঁদ এবং আশার আলো দেখতে পাচ্ছে।

টোপটা কী?

লিসা উঠে দাঁড়িয়ে পেইন্টারের দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে জিজ্ঞাস করল, কী হচ্ছে এসব?

আমি ঠিক জানি না। কালাউসের সাথে কথাবলায়রত অ্যানার দিকে তাকাল ও।

হয়তো আমরা একে অপরকে সাহায্য করার রাস্তা পেয়ে যাব।

পেইন্টার নিজেও অ্যানাকে এইরকম কিছু বলে প্রস্তাব দেবে বলে ভাবছিল। এমনকি ব্যাপারটি নিয়ে কথাও বলেছিল লিসার সাথে। নিজের জীবন নিয়ে কীভাবে দর কষাকষি করা যায়, কিছু সময় পাওয়া যায়… এসব। ওদের কথাগুলো কী কেউ আড়িপেতে শুনে ফেলেছে? নাকি রুমে ছাড়পোকা (গোপনে কথা পাচার করার ইলেকট্রনিক ডিভাইস) ছিল? নাকি এখানকার ঘটনা আসলেই খুব খারাপ, ওদের সাহায্য সত্যি সত্যিই প্রয়োজন আছে?

দুশ্চিন্তায় পড়ল ক্রো।

আমরা যে বিস্ফোরণের আওয়াজ শুনেছি, ওটা নিয়েই কিছু একটা হবে হয়তো, লিসা বলল।

মাথা নাড়ল ক্রো। ওর আরও তথ্য প্রয়োজন। কিন্তু আপাতত ওর শারীরিক অবস্থার বিষয়টি প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার ব্যথা শুরু হয়েছে চোখের পেছনে। ওর মাঢ়ির পেছনের অংশেও ব্যথা পৌঁছে গিয়ে জানিয়ে দিল ক্রো আসলেই অসুস্থ।

ওদের দিকে তাকিয়ে চোখ বুলালেন অ্যানা। পিছু হটল কালাউস। তার মুখ গোমড়া হয়ে আছে। অবশ্য পেইন্টার এখনও এই ব্যক্তিকে খুশি হতে দেখেনি। দেখতে চায়ও না। কারণ এই লোকের খুশির সাথে আর্তনাদ আর রক্তারক্তির সম্পর্ক আছে।

আসুন আমার সাথে, ঠাণ্ডা ভদ্রস্বরে বললেন অ্যানা। দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলেন, তার সাথে সাথে দুজন গার্ডও এগোল। কালাউস রইল পেইন্টার আর লিসার পেছনে। ওর সাথেও দুজন গার্ড আছে।

প্রিজন সেল থেকে ভিন্ন দিকে এগোল ওরা। কয়েক বাঁক পার হওয়ার পর সোজা টানেল উদয় হলো। পাহাড়ের ভেতরে থাকা বিভিন্ন টানেলের চেয়ে এই টানেল বেশি চওড়া। একসারি ইলেক্ট্রিক বা দিয়ে টানেলের ভেতরে আলোর ব্যবস্থা করা আছে। তারের খাঁচা চলে গেছে দেয়ালের গা বেয়ে। এগুলোর মাধ্যমে এখানে এই প্রথম আধুনিকতার নিদর্শন মিলল।

করিডোর ধরে এগোচ্ছে ওরা।

পেইন্টার খেয়াল করে দেখল ওরা যত সামনে এগোচ্ছে বাতাসে ঘন বাস্পের পরিমাণ তত বাড়ছে। তবে বাষ্প ছেড়ে ও আবার অ্যানার দিকে মনোযোগ দিল।

তাহলে আপনি জানেন, কোন জিনিসটা আমাকে অসুস্থ করেছে, বলল ক্রো।

আগেই বলেছি, ওটা একটা দুর্ঘটনা ছিল।

কীসের দুর্ঘটনা? একটু জোর করল ও।

উত্তরটা খুব সহজ নয়। এর ইতিহাস জড়িয়ে আছে।

ওর দিকে তাকালেন অ্যানা। এই পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তির ইতিহাস থেকে শুরু করে…

তাই নাকি? ক্রো বলল। তো এই কাহিনি কত লম্বা? মনে রাখা ভাল, আমার হাতে মাত্র তিন দিন সময় আছে।

ওর দিকে তাকিয়ে হাসলেন অ্যানা। সেক্ষেত্রে আমি আমার দাদুর ইতিহাস থেকে শুরু করতে পারি। যুদ্ধ শেষে উনি GranitschloB–এ প্রথমবারের মতো এসেছিলেন। ওই সময়ের গণ্ডগোল সম্পর্কে আপনার জানা আছে। জার্মানির পতন হতেই ইউরোপে যে তুলকালাম শুরু হয়েছিল?

সবকিছু যে যার মতো লুটেছে তখন।

শুধু জার্মানির ভূখণ্ড আর সম্পদ নয়, আমাদের গবেষণা-রিসার্চও লুট হয়েছিল। মিত্রপক্ষ থেকে বিজ্ঞানী ও সৈনিকের দল পাঠিয়ে জার্মান ভূখণ্ডে থাকা গোপন টেকনোলজিগুলো লুট করা হয়েছিল তখন। একদম বিনে পয়সায় সবাই তখন ওসব বাগিয়ে নিয়ে গেছে। ভ্রু কুঁচকে ওদের দিকে তাকালেন অ্যানা। ঠিক বললাম তত?

লিসা ও ক্রো দুজনই মাথা নেড়ে সায় দিল।

টি-ফোর্স কোড নাম দিয়ে ৫ হাজার সৈনিক ও সিভিলিয়ানকে পাঠিয়েছিল ব্রিটেন। টি-ফোর্স মানে, টেকনোলজি ফোর্স। তাদের কাজ ছিল জার্মানির বুকে থাকা বিভিন্ন তথ্য-প্রযুক্তির হদিস বের করা ও সেগুলো লুটে নেয়া। তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল আমেরিকান, ফ্রেন্স আর রাশিয়ানরা। আচ্ছা আপনি জানেন ব্রিটিশ টি-ফোর্সের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিল?

মাথা নাড়ল পেইন্টার, জানে না। নিজের সিগমা ফোর্সের সাথে ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার তথ্য-প্রযুক্তি লুটকারী একটি দলের সাথে কোনোভাবেই তুলনা করতে পারছে না ও। এই ব্যাপারে সিগমা ফোর্সের প্রতিষ্ঠাতা শ্যেন ম্যাকনাইট-এর সাথে আলাপ করা যেতে পারে। যদি ও অতদিন পর্যন্ত বেঁচে থাকে আরকি।

প্রতিষ্ঠাতা কে ছিল? লিসা জানতে চাইল।

ভদ্রলোকের নাম কমান্ডার ইয়ান ফ্লেমিং।

নাক দিয়ে ঘোঁতঘোত করল লিসা। জেমস বন্ডের রচয়িতা?

হ্যাঁ। বলা হয়ে থাকে, তিনি তার সেই ফোর্সের কিছু চরিত্রের ওপর ভিত্তি করে জেমস বন্ডের স্বভাব-চরিত্র তৈরি করেছিলেন। জেমস বন্ড পড়া থাকলে তাদের সুট পাট করার তেজ, সাহস আর বেপরোয়াপূর্ণ আচরণ সম্পর্কে কিছু ধারণা পাবেন।

যুদ্ধে জয়ী পক্ষ সব লুটে নেয়, শ্রাগ করে বলল পেইন্টার।

হয়তো। তবে আমার দাদুর দায়িত্ব ছিল যতদূর সম্ভব নিজেদের টেকনোলজিগুলো রক্ষা করা। sicherheitsdienst–এর অফিসার ছিলেন তিনি। অ্যানা পেইন্টারের দিকে তাকালেন, পরীক্ষা করে দেখছেন।

তাহলে দেখা যাচ্ছে খেলা শেষ হয়নি। ওকে চ্যালেঞ্জ নিতে হবে।

দ্য sicherheitsdienst ছিল এসএস কমান্ডোর একটি দল। জার্মানের গুপ্তধন যেমন : শিল্প, সোনা, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও টেকনোলজি ইত্যাদি রক্ষা করাই ছিল তাদের কাজ।

সায় দিয়ে মাথা নাড়লেন অ্যানা। যুদ্ধের শেষ দিনগুলোতে পূর্বাঞ্চল দিয়ে রাশিয়ানরা যখন এগোচ্ছিল তখন আমার দাদুকে একটি দায়িত্ব দেয়া হয়। যেটাকে আপনারা আমেরিকানরা ডিপ ব্ল্যাক মিশন বলে থাকেন। জবরপযংভবৎ ধরা পড়ে আত্মহত্যা করার আগে সরাসরি হেনরিক হিমল্যারের কাছ থেকে নির্দেশ পেয়েছিলেন তিনি।

তার দায়িত্ব কী ছিল? পেইন্টার জানতে চাইল।

কোড নেম ক্রোনস নামের একটি প্রজেক্টের যাবতীয় তথ্য-প্রমাণ ধ্বংস করে দিতে হবে। die Glocke নামের একটি ডিভাইস বানানোর প্রজেক্ট ছিল সেটা। ওটার আরও একটা নামও আছে : দ্য বেল। সাডেটেন পাহাড়ের কোনো এক পরিত্যক্ত খনিতে রিসার্চ ল্যাবটাকে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। এই প্রজেক্টের উদ্দেশ্য সম্পর্কে দাদুর কোনো ধারণাই ছিল না। পরে হয়েছিল হয়তো। সবকিছু তিনি প্রায় নষ্টই করে ফেলেছিলেন… কিন্তু দায়িত্ব তো দায়িত্বই।

তাহলে দ্য বেল নিয়ে পালালেন। কীভাবে?

তার হাতে দুটো পরিকল্পনা ছিল। এক, নরওয়ে হয়ে উত্তরদিকে চলে যাওয়া। দুই. অ্যাড্রিয়াটিক হয়ে দক্ষিণে। দুই পথেই তাকে সাহায্য করার জন্য এজেন্টরা তৈরি ছিল। আমার দাদু উত্তর দিকে রওনা হলেন। সম্পর্কে হিমল্যার তাকে জানিয়ে ছিলেন। এক দল নাসি বিজ্ঞানী আর কিছু ইতিহাস নিয়ে পালালেন তিনি। লুকোনোর দরকার ছিল। তার ওপর দাদু একটা প্রজেক্ট শুরু করলেন, যেটা থেকে লোভ-সংবরণ করা বিজ্ঞানীদের জন্য কঠিন ছিল।

দ্য বেল, বলল পেইন্টার।

একদম। ওই সময়ের অধিকাংশ বিজ্ঞানীর মনের চাওয়া পূরণ করেছিল সেটা।

কী?

শ্বাস ফেলে কালাউসের দিকে পেছন ফিরে তাকালেন অ্যানা। পারফেকশন। নিখুঁত, সর্বোৎকৃষ্ট। কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন তিনি। ব্যক্তিগত দুঃখে ডুবে গেছেন।

সামনের প্যাসেজ অবশেষে শেষ হলো। লোহা ও কাঠ দিয়ে তৈরি এক জোড়া বিশালাকার দরজা উদয় হলো সামনে। দরজার ওপাশে একটি বেহালদশাঅলা সিঁড়ি প্যাচিয়ে প্যাচিয়ে পাহাড়ের আরও গভীরে নেমে গেছে। সিঁড়িটি পাথর কেটে বানানো হলেও গাছের গুঁড়ির মতো মোটা স্টিলের একটি পিলারকে কেন্দ্র করে নেমে গেছে। নিচে। এই সিঁড়ি দিয়েই ওদের নামতে হবে।

উপরে তাকাল পেইন্টার। পিলারটি ছাদ পর্যন্ত ওঠার পর সেটা ছাড়িয়ে আর উপরে চলে গেছে… পাহাড় ফুড়ে গেছে সম্ভবত। বজ্রনিরোধক রঙ, ভাবল পেইন্টার। ও অনুভব করল বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ বেড়ে গেছে। ধোয়ার চেয়ে এখন অক্সিজেন বেশি।

পেইন্টারকে তাকাতে দেখে বললেন অ্যানা, প্রয়োজনের অতিরিক্ত এনার্জী আমরা এই শ্যাফট দিয়ে পাহাড়ের বাইরে পাঠিয়ে দেই। উপরের দিকে নির্দেশ করে দেখালেন।

ঘাড় বাঁকিয়ে তাকাল পেইন্টার। এই অঞ্চল থেকে ভূতুড়ে আলো আকাশে ওঠে। এটা কী সেই আলোর উৎস? আলো আর অসুস্থতা হয়তো এই একই উৎস থেকে নির্গত হয়েছে?

নিজের রাগে লাগাম টেনে সিঁড়ির দিকে মনোযোগ দিল পেইন্টার। ওর মাখার ভেতরে আবার দপদপ করে শুরু করায় কেমন যেন দুলে উঠতে চাইল সবকিছু। মনোযোগ অন্যদিকে সরাতে ও কথা বলতে শুরু করল। দ্য বেল-এর কাহিনিতে ফিরে যাই। তারপর?

চিন্তা থেকে বেরিয়ে এলেন অ্যানা। প্রথমে কেউ কিছুই জানত না। রিসার্চের মাধ্যমে বেরিয়ে এলো এটা একধরনের এনার্জী সোর্স। কেউ কেউ ভাবল এটা হয়তো কোনো একধরনের টাইম মেশিন হবে। আর সেজন্যই হয়তো এটার কোড নেম দেয়া হয়েছিল ক্রোনস।

টাইম ট্রাভেল? প্রশ্ন করল পেইন্টার।

আপনাকে মনে রাখতে হবে, অ্যানা বললেন, তথ্য-প্রযুক্তির দিক দিয়ে নাৎসিরা অন্য সব জাতি থেকে অনেক এগিয়ে ছিল। আর সেকারণেই জার্মানি থেকে পাইকারী হারে টেকনোলজি চুরির হিড়িক পড়েছিল যুদ্ধের পর। একটু পেছন থেকে বলি… শতাব্দীর শুরুর দিকে দুটো তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে বেশ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল। এক, দ্য থিওরি অব রিলেটিভিটি অর্থাৎ আপেক্ষিক তত্ত্ব। দুই, দ্য কোয়ান্টাম থিওরি। শুরু হয়ে গেল এই দুই থিওরি নিয়ে ঠেলাঠেলি। এমনকি আপেক্ষিক তত্ত্বের জনক আইনস্টাইন স্বয়ং বলেছিলেন, এই দুই থিওরি পরস্পরবিরোধী। থিওরি দুটো পুরো বিজ্ঞান জগৎকে দুই ভাগে ভাগ করে দেয়। আর আপনি খুব ভাল করেই জানেন পশ্চিমা বিশ্ব কোন থিওরিকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছিল।

আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব।

অ্যানা মাথা নাড়লেন। সেই থিওরি থেকে অ্যাটম বোম্ব ও নিউক্লিয়ার এনার্জীর মতো জিনিসের জন্ম হয়েছিল। ম্যানহ্যাটেন প্রজেক্ট-এ পরিণত হয়ে গেল পুরো পৃথিবী। সবকিছুর পেছনে ছিল আইনস্টাইনের সেই থিওরি। এদিকে ভিন্ন পথ বেছে নিল নাসিরা। তাঁরাও তাদের নিজস্ব ম্যানহ্যাটেন প্রজেক্ট তৈরি করল। তবে সেটার ভিত্তি হলো কোয়ান্টাম থিওরি।

ভিন্ন পথ, ভিন্ন থিওরি বেছে নেয়ার কারণ জানতে চাইল লিসা।

খুব সহজ কারণ। অ্যানা ওর দিকে ফিরলেন। কারণ আইনস্টাইন ইহুদি ছিলেন।

কী?

ওই সময়কার পরিস্থিতির কথা মনে করে দেখুন। আইনস্টাইন ইহুদি ছিলেন। তাই নাৎসিদের চোখে তার আবিষ্কারের গুরুত্বও ছিল কম। আর সেজন্য নাৎসিরা একজন খাঁটি জার্মান বিজ্ঞানীর কাজের কদর করতে শুরু করল। জার্মান বিজ্ঞানীর আবিষ্কার অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাদের কাছে। ওয়ার্নার হেইন্সবার্গ ও এরউইন স্করডইঙ্গার-এর মতো বিজ্ঞানীদের কর্মের দিকে মনোযোগ দিল। বিশেষ করে নজর দিল ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক-এর দিকে। কারণ ম্যাক্স হলেন কোয়ান্টাম থিওরির জনক। তো নাৎসিরা কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ওপর ভিত্তি করে হাতে-কলমে কাজ করতে শুরু করল, তাদের কাজ এই আজকের দিনে এসেও ব্যাপক মর্যাদা লাভ করেছে। নাৎসি বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস ছিল কোয়ান্টাম মডেল ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে শক্তির উৎসের মুখে ছিপি আটকে দেয়া সম্ভব। আর তাদের সেই চিন্তাধারা সবেমাত্র কিছুদিন হলো মানুষজন অনুধাবন করতে পারছে। আজকের আধুনিক বিজ্ঞান ওটার নাম দিয়েছে জিরো পয়েন্ট এনার্জী।

জিরো পয়েন্ট পেইন্টারের দিকে তাকাল লিসা।

মাথা নেড়ে সায় দিল পেইন্টার। বিজ্ঞানের এই অংশ ওর জানা আছে। যখন কোনো বস্তুকে শূন্য ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের চেয়ে আর ৩ হাজার ডিগ্রি নিচে ঠাণ্ডা করা হয়, ওটার ভেতরে থাকা সকল পরমাণুর নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যায় তখন। সবকিছু একদম স্থির। দ্য জিরো পয়েন্ট অব নেচার। কিন্তু তখনও এনার্জী বা শক্তি থাকে। একটা ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন থাকে যেটা থাকার কথা নয়। প্রচলিত থিওরিগুলো দিয়ে ওই এনার্জীর উপস্থিতির ব্যাখ্যা দেয়া অসম্ভব।

কিন্তু কোয়ান্টাম থিওরি দিয়ে সম্ভব, দৃঢ় কণ্ঠে বললেন না। পরমাণুগুলোকে এই থিওরি নড়াচড়া করতে দেয়, এমনকি একদম ঠাণ্ডা স্থবির তাপমাত্রাতেও।

সেটা কীভাবে সম্ভব? লিসা জানতে চাইল।

অ্যাবসুলেট জিরো অর্থাৎ পরম শূন্য তাপমাত্রায় পরমাণুগুলো উপরে, নিচে, ডানে কিংবা বামে নড়তে পারে না ঠিকই কিন্তু কোয়ান্টাম মেকানিক্স অনুসারে ওগুলো নিজ অবস্থানে থেকে গায়েব হয়ে গিয়ে এনার্জী বিকিরণ করতে পারে। ওটাকে জিরো পয়েন্ট এনার্জী বলা হয়।

গায়েব হয়ে গিয়ে এনার্জী বিকিরণ করতে পারে? মনে হচ্ছে লিসা একটু সন্তুষ্ট।

বলার দায়িত্ব নিল পেইন্টার। কোয়ান্টাম ফিজিক্স একটু উদ্ভট গোছের। সাদা চোখে এটাকে পাগলামো বলে মনে হলেও এনার্জী কিন্তু সত্যি সত্যিই পাওয়া যায়। ল্যাবে রেকর্ডও করা হয়েছে। পুরো পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা সবকিছুর ভেতরে এই এনার্জীর উৎস বসাবার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এটার মাধ্যমে অফুরন্ত, অসীম শক্তি বা পাওয়ার পাওয়া যেতে পারে।

মাথা নাড়লেন অ্যানা। আর নাৎসিরা আপনাদের ম্যানহ্যাটেন প্রজেক্টের বিপরীতে এই এনার্জী নিয়েই কাজ করতো।

লিসার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। শক্তির অফুরন্ত উৎস। যদি এটা আবিষ্কার করা। সম্ভব হলে তো তাহলে যুদ্ধের মোড়ই ঘুরে যেত।

এক হাত উঁচু করে লিসাকে শুধরে দিলেন অ্যানা। কে বলল তারা সেটা আবিষ্কার করতে পারেনি? ইতিহাসে আছে যুদ্ধের শেষ কয়েক মাসে নাৎসিরা বেশ ভাল এগোচ্ছিল। তাদের দুটো প্রজেক্ট ছিল। নাম : Feuerball আর Kuselblitz, এগুলো সম্পর্কে বিশ্লেষণধর্মী রেকর্ড ব্রিটিশ টি-ফোর্সে পাওয়া যেতে পারে। তবে আবিষ্কারটা হতে দেরি হয়ে গিয়েছিল। ফ্যাসিলিতে বোমা হামলা, বিজ্ঞানীদের খুন, রিসার্চ চুরিসহ নানান ঘটনার পর যতটুকু বাকি ছিল সেগুলো বিভিন্ন জাতির ডিপ ব্ল্যাক প্রজেক্টের করাল গ্রাসে হারিয়ে গেছে।

কিন্তু দ্য বেল তো হারায়নি, বলল পেইন্টার। আলোচনাকে মূল প্রসঙ্গে ফিরিয়ে নিয়ে এলো। ও এই কথাবার্তাকে অযথা ভিন্ন প্রসঙ্গে যেতে দেবে না।

ঠিক, দ্য বেল হারায়নি। অ্যানা সায় দিলেন। আমার দাদু ক্রোনস প্রজেক্টের মূল জিনিস নিয়ে পালাতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি প্রজেক্টের নতুন নাম রেখেছিলেন: Schwarze Sonne.

অর্থাৎ-কালো সূর্য, জার্মান থেকে অনুবাদ করল পেইন্টার।

Sehr gut.

কিন্তু এই বেল জিনিসটা কী? ক্রো জানতে চাইল। কী করে এটা?

এটাই আপনাকে অসুস্থ করে দিয়েছে, বললেন না। আপনার কোয়ান্টাম লেভেলে ক্ষতিসাধন করেছে ফলে কোনো ওষুধ আর ওখানে পৌঁছে আরোগ্য এনে দিতে পারবে না।

আর একটু হলেই হোঁচট খাচ্ছিল পেইন্টার। কথাটুকু হজম করতে কিছু সময় দরকার। কোয়ান্টাম লেভেলে ক্ষতিসাধন করেছে। এর মানে কী?

সিঁড়ির শেষ ধাপে চলে এসেছে ওরা। কড়িকাঠ দিয়ে বেষ্টনী দেয়া। এছাড়াও দুজন রাইফেলধারী গার্ডও আছে। অবাক হয়ে ক্রো খেয়াল করল, ছাদের দিকে থাকা সর্বশেষ বাঁকের পাথর কেমন যেন দগ্ধ হয়ে রয়েছে।

গুহার মতো দেখতে ভল্টের পেছনের একদম শেষ পর্যন্ত পেইন্টারের দৃষ্টি পৌঁছুল না তবে ও ঠিকই তাপমাত্রা অনুভব করতে পারল। এখানকার প্রত্যেকটি তল কেমন যেন কালচে হয়ে আছে। একসারি বকানন-কুঁজানো দেহ ঢেকে রাখা হয়েছে তেরপল দিয়ে। সবকটি মৃত।

একটু আগে হয়ে যাওয়া বিস্ফোরণ তাহলে এখানেই হয়েছিল।

বিস্ফোরণ এলাকার ভেতর থেকে ছাইয়ে কালো হয়ে যাওয়া একজনকে এগিয়ে আসতে দেখা গেল। কালো হয়ে গেলেও তাকে বেশ ভাল করেই চেনা যাচ্ছে। গানথার। এই বিশালদেহি লোক সন্ন্যাসীদের মঠে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল। এখন দেখা যাচ্ছে তারা তাদের কর্ম ফল পেতে শুরু করেছে।

বিস্ফোরণের বদলে বিস্ফোরণ।

বেষ্টনী পার হলো গানথার। অ্যানা ও কালাউস ওর সাথে যোগ দিল। গানথার আর কালাউসকে পাশাপাশি দেখে এই দুই বিশালদেহির মধ্যে মিল খুঁজে পেল পেইন্টার। শারীরিক মিল নয়, দুজনের কঠিন মনোভাব আর বিদেশিভাবে মিল আছে।

কালাউসের দিকে মাথা নাড়ল গানথার।

কিন্তু কালাউস কোনো পাত্তা দিল না।

গানখারের দিকে মাথা ঝুঁকিয়ে হড়বড় করে জার্মান ভাষায় কথা বলছেন অ্যানা। পেইন্টার অতগুলো কথার ভেতর থেকে মাত্র একটি শব্দ বুঝতে পারল। জার্মান আর ইংরেজিতে শব্দটির মানে একই।

স্যাবোটাজ।

আচ্ছা, তাহলে এই ক্যাসলের সবকিছু ঠিকঠাকভাবে চলছে না। কোনো বিশ্বাসঘাতক আছে নাকি? যদি থাকে তাহলে কে সে? কী চায়? উদ্দেশ্য কী? সে কী ওদের বন্ধু নাকি শত্রু?

পেইন্টারের দিকে তাকাল গানথার। তার ঠোঁট নড়ছে, কিন্তু ও কী বলছে সেটা পেইন্টার ধরতে পারল না। মাথা নাড়লেন অ্যানা, গানরের কথার সাথে একমত নন। গানথার চোখ সরু করলেও শেষমেশ মাথা ঝাঁকাল।

পেইন্টার জানে, ওকে আশ্বাস দেয়া হচ্ছে।

শেষবারের মতো ক্রোর ওপর একবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করে যেদিক থেকে এসেছিল আবার সেদিকে চলে গেল গানথার।

আমি আপনাদেরকে এটাই দেখানোর জন্য নিয়ে এসেছি। ধ্বংসলীলার দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন অ্যানা।

দ্য বেল, ক্রো বলল।

ধ্বংস হয়ে গেছে। স্যাবোটাজ করে ধ্বংস করে দিয়েছে।

ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকাল লিসা। এই বেল-ই তাহলে পেইন্টারকে অসুস্থ করেছে।

এবং সেই অসুস্থ থেকে সুস্থ হওয়ার একমাত্র উপায় ছিল এটা।

পেইন্টার ধ্বংসস্তূপ পর্যবেক্ষণ করল।

আপনাদের কাছে বেল-এর কোনো প্রতিলিপি কিংবা কপি আছে? জানতে চাইল লিসা। কিংবা আপনারা কি আরেকটা বেল বানাতে পারবেন?

অ্যানা মাথা নাড়লেন। গুরুত্বপূর্ণ একটা উপাদানের কোনো কপি পাওয়া সম্ভব নয়। জেরাম-৫২৫। আজ এই ৬০ বছর পর এসেও আমরা ওটার কোনো কপি কিংবা নতুন করে তৈরি করতে পারিনি।

তাহলে বেল নেই তো চিকিৎসাও নেই, বলল ক্রো।

কিন্তু একটা সুযোগ হয়তো আছে… যদি আমরা একে অপরকে সাহায্য করি। অ্যানা তার একটি হাত বাড়িয়ে দিলেন। আমরা যদি একসাথে কাজ করি… তাহলে আমি প্রতিশ্রুতি রাখব।

ক্রো তার সাথে হাত মেলালেও এখন মনে মনে দ্বিধায় ভুগছে। এখানে কেমন যেন একধরনের কৌশল, চাতুরীর গন্ধ পাচ্ছে ও। কিছু একটা আছে যেটা অ্যানা ওকে এখনও বলেনি। তার সব কথা… ব্যাখ্যাগুলো যেন ওদের ভুল দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ভ্রান্ত করছে। আর ওকে-ই বা এখন ডিল করার জন্য প্রস্তাব দেয়া হলো কেন?

তারপর মনে পড়ল ওর।

ও জানে।

দুর্ঘটনা… বলল ক্রো।

ওর হাতের ভেতরে থাকা অ্যানার আঙুল কেঁপে উঠল।

ওটা তাহলে দুর্ঘটনা ছিল না, তাই তো? মাথার ভেতরে ঘুরতে থাকা কথাগুলো মনে করল ক্রো।

স্যাবোটাজও ছিল। মাথা নাড়লেন অ্যানা। প্রথমে আমরা ভেবেছিলাম ব্যাপারটা দুর্ঘটনা। আমরা বিভিন্ন সময় তরঙ্গ সম্পর্কিত সমস্যায় পড়ে থাকি। বেল-এর আউটপুট হিসেবে সেগুলোকে বের করে দেই। খুব বড় কিছু নয়। এনার্জী বাইরে বের করে দেয়ার ফলে কিছু রোগ হয়। কিছু মৃত্যু হয়, এই তো।

মাথা নেড়ে প্রতিবাদ করতে যাচ্ছিল পেইন্টার, কিন্তু নিজেকে সামলে নিল। তেমন কিছু নয়। রোগ আর মৃত্যুগুলোর কারণে আং গেলু আন্তর্জান্তিক পরিমণ্ডলে ফোন করেছিলেন, যার ফলে পেইন্টার আজ এখানে।

অ্যানা বলে যাচ্ছেন, কিন্তু কয়েক রাত আগে কেউ একজন আমাদের রুটিন সেটিংস বদলে বেল-এর আউটপুটের মান অনেক বাড়িয়ে দেয়।

আর সেটার প্রভাব পড়ে মঠ ও গ্রামের ওপর।

ঠিক বলেছেন।

অ্যানার হাত শক্ত করে ধরল ক্রো। মনে হলো তিনি বোধহয় হাত ছাড়িয়ে নিতে চাচ্ছেন। কিন্তু পেইন্টার ছেড়ে দেয়ার পাত্র নয়। অ্যানা পুরো বিষয়টি খোলাসা করা এড়িয়ে যেতে চাইছেন। কিন্তু পেইন্টারও জানে আসল ঘটনা ওকে জানতেই হবে। তাহলে একে অপরকে সাহায্য করার প্রস্তাবটি সম্পর্কেও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।

মঠের সন্ন্যাসী আর গ্রামবাসীরাই শুধু আক্রান্ত হয়নি, বলল পেইন্টার। তাদের সাথে এখানকার সবাই আক্রান্ত হয়েছে। আপনারা সবাই আমার মতো অসুস্থ। মঠের মতো অত গভীর লক্ষণ প্রকাশ পায়নি, তবে আপনারাও আমার মতো ধীরে ধীরে মৃত্যুর পথে এগোচ্ছেন।

চোখ সরু করলেন না। ক্রোকে পর্যবেক্ষণ করে মেপে নিলেন কতখানি বলবেন… অবশেষে মাথা নাড়লেন তিনি। আমরা এখানে… কোনমতে নিরাপদ আছি। বেল-এর ক্ষতিকারক রেডিয়েশনের অধিকাংশই শ্যাফট দিয়ে উপরে পাঠিয়ে বাইরে বের করে দেয়া হয়েছে।

পাহাড়ের উপরে ভূতুড়ে আলোর কথা মনে পড়ল পেইন্টারের। নিজেদেরকে বাঁচানোর জন্য জার্মানিরা বিপজ্জনক রেডিয়েশন পুরো এলাকায় ছড়িয়ে দিয়েছে। যদিও এখানকার বিজ্ঞানীরা এত চেষ্টা করেও পুরোপুরি রক্ষা পায়নি।

কোনোরকম কুণ্ঠা ও অপরাধবোধে না ভুগে অ্যানা বললেন। আমরা সবাই এখন একই মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত।

হাতে অন্যকোনো রাস্তা খোলা আছে কিনা ভাবল পেইন্টার। নেই। দুই পক্ষের কেউই কাউকে বিশ্বাস করছে না, কিন্তু দুই পক্ষ এখন একই নৌকার যাত্রী। সে হিসেবে মিলেমিশে থাকাই ভাল। অ্যানার হাত ঝাঁকিয়ে দিয়ে ডিল পাকা করল ক্রো। সিগমা ও নাৎসি এখন একদল।

০৭. ব্ল্যাক মাম্বা

দ্বিতীয় খণ্ড

০৭. ব্ল্যাক মাম্বা

ভোর ৫ টা ৪৫ মিনিট।
হুলুহুলুই-আমফলোজি প্রিজার্ভ
জুলুল্যান্ড, সাউথ আফ্রিকা।

প্রধান ওয়ার্ডেনের ডেস্কের সামনে দাঁড়িয়ে আছে খামিশি টেইলর। ওয়ার্ডেন জেরাল্ড কেলজ ওর দেয়া গতকালের রিপোর্ট পড়ে শেষ করা পর্যন্ত মেরুদণ্ড শক্ত করে অপেক্ষা করল। মাথার ওপরে ঘুরতে থাকা ফ্যান থেকে বেরোনো আওয়াজ ছাড়া রুমে কোনো আওয়াজ নেই।

ধার করা পোশাক পরে আছে খামিশি। প্যান্ট খুব বেশি লম্বা আর শার্ট বেশ টাইট হয়েছে। তবে ওগুলো শুকনো। গতকাল সারাদিন-রাত কাদাপানিতে শরীর ডুবিয়ে রাইফেল হাতে তৈরি হয়ে ছিল ও। ডাঙায় উঠে এখন এই শুকনো কাপড়-চোপড়ের মূল্য বুঝতে পারছে।

দিনের আলো যে কতখানি জরুরি সেটাও বুঝতে পারছে ও। অফিসের পেছনের জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে ভোরের সূর্য গোলাপি আভা ফোঁটাচ্ছে আকাশে। ছায়া থেকে বেরিয়ে আসছে পৃথিবী।

বেঁচে ফিরেছে খামিশি। বেঁচে আছে।

নিজেকে বাঁচানো ছাড়া কিছু করার ছিল না ওর।

ওর মাথায় এখনও উকুফার চিৎকার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

রিপোর্ট পড়তে পড়তে প্রধান ওয়ার্ডেন জেরাল্ড কেলজ তার গোঁফ মোচড়ালেন। ভোরের আলো এসে তার চকচকে টাকঅলা মাথায় পড়ে সেটাকে তেলতেলে উজ্জ্বল করে তুলল। নাকের ডগায় অর্ধচন্দ্রাকৃতির রিডিংগ্লাস নিয়ে অবশেষে মুখ তুললেন তিনি।

মিস্টার টেইলর, আপনি চান আমি এই রিপোর্ট ফাইল করে রাখি? রিপোর্টের হলদে কাগজের ওপর এক আঙুল চালিয়ে দেখালেন। একটা অজ্ঞাত জানোয়ার। ড. ফেয়ারফিল্ডকে টেনে নিয়ে গিয়ে খুন করেছে একটা অজ্ঞাত জানোয়ার। আপনি আর জিনিস খুঁজে পেলেন না?

স্যার, আমি প্রাণীটাকে ভালভাবে দেখতে পাইনি। কেমন যেন বিশাল সাদা। লোমশঅলা। রিপোর্টে লিখেছি, স্যার।

সিংহী হবে হয়তো। বললেন জেরাল্ড।

না, স্যার… কোনো সিংহ-টিংহ নয়।

কীভাবে নিশ্চিত হচ্ছেন? একটু আগেই না বললেন, প্রাণীটাকে আপনি ভালভাবে দেখতে পাননি?

জ্বী, স্যার… মানে ইয়ে… স্যার… আমি পরিচিত কোনো প্রাণীর সাথে ওটার কোনো মিল পাইনি।

তাহলে কী পেয়েছেন?

চুপ মেরে গেল খামিশি। ও জানে উকুফার নাম উচ্চারণ করলেই ল্যাঠা চুকে যাবে। কিন্তু সাদামাটা রৌদ্রউজ্জ্বল দিয়ে উকুফার কথা বললে হাসির পাত্র হতে হবে ওকে। খামিশি আফ্রিকার উপজাতির বংশধর হওয়ায় কুসংস্কারে আক্রান্ত বলে সবাই পরিহাস করবে।

কোনো একটা জানোয়ার ড. ফেয়ারফিল্ডকে আক্রমণ করে টেনে নিয়ে যায়। আপনি ওটাকে কাছ দেখে দেখতে পারেননি যে চিনে ফেলবেন…

ধীরে ধীরে খামিশি মাথা নাড়ল।

… আর তারপর আপনি কী করলেন? কাদা-পানির ভেতরে গিয়ে লুকালেন? চাপ দিয়ে রিপোর্ট ভাজ করে ফেললেন জেরাল্ড। আপনার কী মনে হয়, এই রিপোর্ট আমাদের সার্ভিসের মানের ওপর প্রশ্ন সৃষ্টি করবে না? আমাদের একজন ওয়ার্ডেন একজন ৬০ বছর বয়স্কা নারীকে মরতে দিয়ে নিজে পালিয়ে জীবন বাঁচিয়েছে! কোন প্রাণী এসে আক্রমণ করেছে সেটা খোঁজার চেষ্টা পর্যন্ত করেনি!

স্যার, বিষয়টা ওরকম না…

কীসের ওরকম না? গর্জে উঠলেন জেরাল্ড। এতটাই জোরে যে রুমের বাইরেও তার গলার আওয়াজ শোনা গেল। রুমের বাইরে সকল স্টাফকে জরুরি তলব করে ডেকে আনা হয়েছে। ড, ফেয়ারফিল্ডের আত্মীয়-স্বজনদের সাথে যোগাযোগ করে আমি কী বলব? বলব… তাদের মা কিংবা দাদুনানুকে কোনো এক প্রাণী আক্রমণ করে টেনে নিয়ে গেছে আর আমার এক ওয়ার্ডেন… অস্ত্রধারী ওয়ার্ডেন পালিয়ে নিজের জান বাঁচিয়ে গুষ্ঠী উদ্ধার করেছে?

আমার তখন কিছুই করার ছিল না।

শুধু নিজের… চামড়া বাঁচানো ছাড়া।

বাক্যের মধ্যে অনুচ্চারিত শব্দটিও খামিশি শুনতে পেল।

শুধু নিজের কালাচামড়া বাঁচানো ছাড়া।

খামিশিকে চাকরি করতে দেখে জেরাল্ড মোটও অবাক হননি। খামিশির পরিবারের সাথে পুরো আফ্রিকানের সরকারের সাথে সম্পর্ক আছে। আর সেই যোগসূত্র ধরেই এই পদে অধিষ্ঠিত হতে পেরেছে খামিশি। এমনকি সে এখনও ওলডাভি কান্ট্রি ক্লাবের সদস্য, যেখানে কি-না সবসময় অভিজাত সাদা চামড়াধারী বিত্তশালীদের আড্ডা বসে। তবে নতুন আইন পাস হওয়ার পর থেকে অনেক জাত-ভেদ, বাধা-বিঘ্ন কমে গেছে। এখনও সাউথ আফ্রিকায় ব্যবসা বলতে ব্যবসা-কেই বোঝায়। কোনোপ্রকার গণ্ডগোল নেই। ডি বিয়ার্সেস-রা তাঁদের হীরের খনি এখনও ধরে রেখেছে অন্যদিকে বাকি সবকিছু আছে ওয়ালেনবার্গ-এর দখলে।

পরিবর্তন আসবে, তবে সেটা আসবে ধীরে ধীরে।

খামিশির এই পদে যোগদান হলো একটি ছোট পদক্ষেপ মাত্র। ওর এই চাকরির মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য বেশ সুবিধে করে দিয়ে যেতে পারবে। নিজের ও পরবর্তী প্রজন্মের কথা মাথায় রেখে কণ্ঠস্বর শান্ত রাখল খামিশি। যদি তদন্তকারিগণ ঘটনাস্থল পরীক্ষা করে আসেন, তাহলে আমি নিশ্চিত আমার কৃতকর্মের পক্ষেই রায় দেবেন তাঁরা।

তাই নাকি, মিস্টার টেইলর? মাঝরাতে হেলিকপ্টার আপনাকে কাদা-পানির ভেতর থেকে উদ্ধার করে আনার ১ ঘণ্টা পরেই আমি এক ডজন লোক পাঠিয়েছিলাম। ১৫ মিনিট আগে তারা রিপোর্ট দিয়েছে। শিয়াল আর হায়নার তাণ্ডবে প্রায় ছিঁড়ে-খুঁড়ে যাওয়া রাইনোর লাশ পেলেও আপনার রিপোর্টে থাকা বাচ্চা রাইনোর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। তারচেয়েও বড় কথা ড. মারশিয়া ফেয়ারফিল্ডেরও কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি।

মাথা নাড়ল খামিশি। এই অভিযোগগুলো থেকে নিজেকে মুক্ত করার পথ খুঁজছে। রাতের কথা মনে করল ও। দিন তো মনে হচ্ছিল ফুরোবে না, কিন্তু রাত নামার পর অবস্থা আরও জঘন্য হয়েছিল। সূর্য ডোবার পর থেকে হামলায় আক্রান্ত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল খামিশি। কিন্তু হায়নার ইয়েপ-ইয়েপ-ইয়েপ ডাক, শিয়ালের হুক্কা-হুঁয়া আর বিভিন্ন পশুপাখির ডাক ছাড়া আর কিছুই শুনতে পায়নি।

পশুপাখিদের ডাক শুনে ও তখন ভেবেছিল এখন জিপের দিকে দৌড় দেয়া নিরাপদ হবে। যেহেতু স্বাভাবিকভাবে শিয়াল আর হায়না এখানে উপস্থিত হয়েছে, তার মানে দাঁড়াল, চলে গেছে উকুফা।

কিন্তু খামিশি তবুও নড়ল না।

ওর মনে তখনও ড. মারশিয়ার আক্রান্ত হবার দৃশ্য তাজা ছিল। সাহস হলো না।

ওই প্রাণীর পায়ের ছাপ নিশ্চয়ই অন্যরকম হবে, বলল ও। ওখানে… একটু আশান্বিত হয়ে ভাবল খামিশি। যদি ওর কাছে প্রমাণ থাকত…

সিংহের পায়ের ছাপ পাওয়া গেছে। বললেন জেরাল্ড। একটু আগে আমি সেটাই বলছিলাম।

সিংহ?

হ্যাঁ। আমার মনে হয় আমাদের কাছে সেই উদ্ভট প্রাণীর কিছু ছবিও আছে। আপনি বরং সেগুলো ভালভাবে দেখে রাখুন, যাতে ভবিষ্যতে দেখলে চিনতে পারেন। আপনার হাতে তো সামনে অঢেল সময়, সময়গুলোকে এই কাজে লাগাবেন।

স্যার?

মিস্টার টেইলর, আপনাকে বরখাস্ত করা হলো।

এই ধাক্কা লুকোতে ব্যর্থ হলো খামিশির চেহারা। ও জানে, এখানে ওর জায়গায় যদি অন্য কোনো ওয়ার্ডেন হতো… সাদা চামড়ার কেউ… তাহলে এই সিদ্ধান্ত হতো না। আরেকটু বিবেচনা করে দেখা হতো। কিন্তু ওর গায়ে যখন উপজাতির কালো চামড়া আছে সেহেতু ও সেই বিবেচনা পাবে না। এই বিষয় নিয়ে খামিশি তর্কে যেতে চায় না। তর্কে গেলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যাবে।

আপনাকে কোনো টাকাও দেয়া হবে না। আগে পুরো তদন্ত শেষ হোক, তারপর পাবেন।

পুরো তদন্ত। খামিশি জানে সেই তদন্ত কীভাবে শেষ হবে।

পুলিশ বলেছে আপনি এই অঞ্চল ছেড়ে কোথাও যেতে পারবেন না। দায়িত্বের বিষয়টা ছাড়াও ক্রিমিনাল ব্যাপার-স্যাপার আছে।

খামিশি চোখ বন্ধ করল।

সূর্য উঠলেও কাল রাতের আঁধার এখনও কাটেনি।

.

দশ মিনিট পর।

জেরাল্ড কেলজ তাঁর ডেস্কে বসে আছেন। অফিস রুম এখন ফাঁকা। ঘেমে যাওয়া হাতের তালু দিয়ে নিজের আপেলের মতো চকচকে মাথায় হাত বুলাচ্ছেন তিনি। ঠোঁট বাঁকিয়ে বসে আছেন, স্বস্তি পাচ্ছেন না। রাতের ঘটনাটি তো আর মুছে ফেলা যাবে না, অনেক ঝক্কি সামলাতে হবে এবার। হাজারটা জিনিসের দিকে নজর রাখতে হবে তাকে। মিডিয়াকে সামলাতে হবে, ড, ফেয়ারফিল্ডের পরিবার ও পার্টনারের মুখোমুখি হতে হবে।

শেষ বিষয়টি চিন্তা করতে গিয়ে মাথা নাড়লেন জেরাল্ড। সামনের দিকে ড. পলা কেইন খুব বড় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াবেন, বোঝা যাচ্ছে। জেরাল্ড জানেন, এই দুই বয়স্কা নারীর পার্টনারশিপ রিসার্চ ক্ষেত্র ছাড়িয়ে ব্যক্তিগত পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। ড. পলা কেইন-ই গতকাল রাতে ড. মারশিয়াকে বাড়ি ফিরতে না দেখে হেলিকপ্টার নিয়ে সার্চ পার্টি পাঠানোর জন্য তোড়জোর শুরু করেছিলেন।

মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে বিষয়টি ভেবেছিলেন জেরাল্ড। বিভিন্ন গবেষক প্রায়ই জঙ্গলে রাত কাটিয়ে থাকেন, সেটা কোনো ব্যতিক্রম ব্যাপার নয়। কিন্তু যখন তিনি শুনলেন ড. মারশিয়া আর ওয়ার্ডেন ওয়ালেনবার্গ প্রাইভেট স্টেট অ্যান্ড প্রিজার্ভের কাছে থাকা পার্কের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে গেছেন, তখন আর বিছানা থেকে না নেমে থাকতে পারেননি।

তার নেতৃত্বে একটি জরুরি অভিযান শুরু করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়ে গিয়েছিল। রাতের নির্জনতাকে নষ্ট করে কোলাহল করে অভিযান পরিচালনাও করা হয়েছিল কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। জিন তার বোতলে ফিরে গেছে।

তবে এখনও একটি কাজ করা বাকি।

কাজ ঝুলিয়ে রাখার কোনো মানে হয় না।

ফোন তুলে একটি প্রাইভেট নাম্বারে ডায়াল করলেন তিনি। নোটপ্যাডে কলম দিয়ে দাগাতে দাগাতে ওপাশে ফোন ধরার জন্য অপেক্ষা করছেন।

রিপোর্ট, ওপাশ থেকে কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।

এইমাত্র তার সাথে ইন্টারভিউ শেষ করলাম।

তারপর?

সে কিছুই দেখেনি… ঠিকভাবে কিছুই দেখতে পায়নি।

মানে কী?

এক ঝলক দেখে আরকি। কিন্তু চিনতে পারেনি।

একটু দীর্ঘ নীরবতা।

নার্ভাস হয়ে পড়লেন জেরাল্ড। তার দেয়া রিপোর্ট সম্পাদনা করে দেয়া হবে। সিংহ। এটাই লেখা থাকবে রিপোর্টে। আমরা আরও কয়েকটা গুলি করে এই ব্যাপারটা এখানেই দুই-একদিনের মধ্যে শেষ করে দেব। আর এই লোকটাকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

ভেরি গুড। কী করতে হবে জানা আছে তো?

কেলজ একটু আপত্তি তুললেন। তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এই বিষয়ে আর ঘাটাতে সাহস পাবে না। খুব ভাল করে ভয় পাইয়ে দিয়েছি। আমার মনে হয় না…

রাইট। কিছু মনে করতে হবে না। যা নির্দেশ দেয়ার দিয়েছি। ব্যাপারটা দুর্ঘটনার মতো করে সাজাবে।

লাইন কেটে গেল।

ক্রাড়লে রিসিভার নামিয়ে রাখলেন কেলজ। রুমের ভেতরে ফ্যান চলার পরেও তার শ্বাস নিতে কষ্ট হতে লাগল। দিন বাড়ার সাথে গরমও বাড়ছে। ফ্যানে কিছু হচ্ছে না।

অবশ্য এই গরমের ফলে তার কপাল থেকে ঘাম ঝরল না। ঘাম ঝরার অন্য কারণ আছে।

যা নির্দেশ দেয়ার দিয়েছি।

আর কেলজ ভাল করেই জানেন, নির্দেশ অমান্য করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।

ডেস্কে থাকা নোটপ্যাডের দিকে তাকালেন তিনি। আনমনে এই চিত্রকর্ম এঁকে বসে আছেন। মনের অজান্তে মনের ভেতরে থাকা ভয়ের প্রতিচ্ছবি নোটপ্যাডে উঠে এসেছে।

জেরাল্ড পৃষ্ঠাটি দ্রুত ছিঁড়ে ফেললেন। ছিঁড়ে কুটিকুটি করলেন, কোনো প্রমাণ রাখলেন না। রাখা চলবেও না। এটাই নিয়ম।

তাকে নির্দেশ দেয়া আছে।

ব্যাপারটা দুর্ঘটনার মতো করে সাজাবে।

.

ভোর ৪টা ৫০ মিনিট।
৩৭ হাজার ফুট উঁচুতে, জার্মানি।

এক ঘন্টার মধ্যে আমরা ল্যান্ড করব, বলল মনক। তুমি আরেকবার ঘুমিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে দেখতে পারো।

টানটান হলো গ্রে। চ্যালেঞ্জার ৬০০ জেট-এর মৃদু গুঞ্জন ওকে স্বস্তি দিলেও ওর মনে ভেসে উঠছে গতকালের ঘটনাগুলো। ধাঁধা মেলানোর চেষ্টা করছে ও। চোখের সামনে ডারউইন বাইবেল খুলে বসে আছে।

ফিওনার কী অবস্থা?

মাথা নেড়ে প্লেনের পেছনের সোফার দিকে তাকাল মনক। কম্বলের নিচে শুয়ে আছে সে। অবশেষে শুয়েছে। ব্যথার ওষুধ দেয়াতে থেমেছে… বাচ্চারা কখনও মুখ বন্ধ রাখতে চায় না। বকর বকর করতেই থাকে।

কোপেনহ্যাগেন এয়ারপোর্ট থেকে একটানা বক বক করে এসেছে ফিওনা। গ্রে মনকে ফোন করে সতর্ক করে দিয়েছিল। গ্রের কথা অনুযায়ী একটি প্রাইভেট কার এসে ওদের দুজনকে অপেক্ষমাণ জেটের কাছে এনে পৌঁছে দিয়ে গেছে। রিফিউলিং (জ্বালানি) ভরা হচ্ছিল জেটে। ভিসা আর কূটনীতিক বিষয়গুলো সামাল দিয়েছেন লোগান।

তবে চ্যালেঞ্জার আকাশে উড্ডয়ন না করা পর্যন্ত গ্রে স্বস্তি পাচ্ছিল না।

গুলির আঘাতের কী খবর?

শ্রাগ করে পাশের চেয়ারে লুটিয়ে পড়ল মনক। গুলি বিদ্ধ হয়নি। জাস্ট ছুঁয়ে গেছে। তবে গভীর জখম হয়েছে কয়েকটা। সামনের কয়েকটা দিন ওকে ওগুলো বেশ ভালই যন্ত্রণা দেবে। তবে অ্যান্টিসেপটিক, লিকুইড স্কিন সিলেন্ট আর ব্যান্ডেজ দিলে আরও দুই দিন লাগবে সব সেরে যেতে। তারপর আরও লোকজনের পকেট মারবে।

ওর ওয়ালেট ঠিক জায়গায় আছে কি-না নিজের পকেট হাতড়ে দেখল মনক।

হ্যালো বলার জন্য ও পকেট মেরে থাকে।, বলল গ্রে। ক্লান্ত হাসি লুকোল ও। গ্রিট্টি নেয়াল ওকে এরকম একটি কথা গতকাল বলেছিলেন। ও খোদা, মাত্র গতকালের কথা! গতকাল?

মনকে ফিওনার সেবায় রেখে লোগানের কাছে রিপোর্ট করেছিল গ্রে। নিলাম অনুষ্ঠানে গ্রের কর্মকাণ্ড শুনে সিগমার ভারপ্রাপ্ত ডিরেক্টর মোটেও খুশি হননি। কারণ গ্রের ওখানে যাওয়ারই কথা ছিল না। ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে। কপাল ভাল, নিলামে অংশগ্রহণকারীদের ছবি ওর পেনড্রাইভে রাখা ছিল। ওই দুই নারী-পুরুষের ছবিও আছে। সবগুলো ছবি লোগানের কাছে পাঠিয়ে দিল গ্রে। সেই সাথে বাইবেলের কিছু পৃষ্ঠা ও ওর নোটে আঁকা বিভিন্ন ছবি ফ্যাক্স করে দিল।

লোগান ও ক্যাট এসব নিয়ে কাজ করে বের করবে এগুলোর পেছনে কার হাত আছে।

লোগান ইতোমধ্যে কোপেনহ্যাগের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ সেরে ফেলেছেন। না, পার্কে কোনো মানুষ মারা যাওয়ার রিপোর্ট পাওয়া যায়নি। তাহলে দেখা যাচ্ছে ওদের সেই আততায়ীর লাশ স্রেফ গায়েব হয়ে গেছে। আতঙ্কিত দর্শনার্থীদেরকে ভড়কে দিয়ে ওদের পার্ক থেকে বেরিয়ে আসাটা অল্পের ভেতরে দিয়েই কেটে গেছে। কেউ কোনো গুরুতর আঘাত পায়নি… তবে আগলি ডাকলিং-এর কথা ভিন্ন।

মনকের বুক পকেটের দিকে গ্রে তাকিয়ে আছে।

আংটি এখনও আছে ওখানে? বলল ও। বন্ধুকে খোঁচা মারল আরকি।

ওর তো এটাও চুরি করার কোনো দরকার নেই।

ফিওনার চুরিবিদ্যার তারিফ করতেই হয়, ভাবল গ্রে। হাত খুব চালু।

আংটির বক্স সম্পর্কে বলো। কাহিনি কী? ডারউইন বাইবেল বন্ধ করে প্রশ্ন করল গ্রে।

আমি তোমাকে এটা দিয়ে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম।

মনক, অত ঢং করতে হবে না।

আরে থামো। মানে, আমি তোমাকে ব্যাপারটা আমার সুবিধামতো সময়ে জানাতাম।

পেছনে হেলান দিল গ্রে। মনকের দিকে তাকিয়ে হাত দুটো আড়াআড়ি করে রাখল। প্রশ্ন এড়িয়ে যাচ্ছে। মিসেস মনককে চিনি না আমি। তাই সে তো আর এটা জানতে পারবে না।

কচু। আমি এই জিনিস গত দুই মাস আগে কিনে বয়ে বেড়াচ্ছি। ওকে দেয়ার মতো উপযুক্ত সময়ই পাচ্ছি না।

সময় না। বলল, সাহস পাচ্ছে না।

হ্যাঁ, সেটাও হতে পারে।

মনকের কাছে গিয়ে হাঁটু চাপড়ে দিল গ্রে। সে তোমাকে ভালবাসে, মনক। দুশ্চিন্তাও করে।

মনক বাচ্চা ছেলেদের মতো হাসল। এই হাসিতে ওকে ভাল না লাগলেও ওর দুই চোখে গভীর ভালবাসা দেখতে পেল গ্রে। নিজের কৃত্রিম হাতের কব্জিতে হাত বুলাল ও। যতই সাহসী হোক, গত বছরের দুর্ঘটনা মনককে অনেক বড় ধাক্কা দিয়েছিল। ওকে সুস্থ করে তুলতে প্রায় পাগল হয়ে গেছিল ক্যাট ব্রায়ান্ট। ডাক্তারদের চেয়ে ক্যাট ই বেশি পরিশ্রম করেছে, সেবা করেছে। তারপরও মনকের মনে শংকা কাটেনি। ক্যাটের ব্যাপারে ও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে।

একটি কালো মখমলের বক্স খুলল মনক। ওর ভেতরে তিন ক্যারেটের অ্যাঙ্গেজমেন্ট রিং আছে। হয়তো আরেকটু বড় হীরা কেনা দরকার ছিল… বিশেষ করে এখনকার জন্য।

মানে?

গ্রের দিকে তাকাল মনক। ওর চেহারায় নতুন এক অভিব্যক্তি ফুটে উঠল। ক্যাট প্রেগন্যান্ট।

গ্ৰে অবাক হয়ে গেছে। কী? কীভাবে হলো?

আমার তো মনে হয় তুমি জানো, কীভাবে মেয়েরা প্রেগন্যান্ট হয়। মনক জবাব দিল।

ক্রাইস্ট… কনগ্রাচুলেশনস, বোকার মতো কথা বলে সেটা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে গ্রে। তবে এখন একটা কাজের প্রশ্ন করল। তার মানে, তোমরা বাবুটাকে রাখবে।

এক চোখের ভ্রু উঁচু করল মনক।

অবশ্যই রাখবে, আবার বোকার মতো কথা বলে মাথা নাড়ল ও।

এখনও বেশিদিন হয়নি, মনক জানাল। ক্যাট চায় না ব্যাপারটা অন্য কেউ জানুক… তবে বলেছে তুমি জানলে কোনো সমস্যা নেই।

মাথা নাড়ল গ্রে। এরকম একটা খবর পেয়ে ধাতস্থ হওয়ার চেষ্টা করছে। মনককে বাবা হিসেবে কল্পনা করতে গিয়ে খেয়াল করল মনক বেশ সুন্দরভাবে বাবা হতে পারবে! বাবা হিসেবে মনক বেশ ভাল মানিয়ে যায়।

ও খোদা, দারুণ ব্যাপার।

আংটির বক্স বন্ধ করল মনক। এবার তোমার খবর বলো?

গ্রে ভ্রু কুঁচকাল। আমার খবর?

র‍্যাচেল আর তুমি। টিভোলি গার্ডেনস-এর কাহিনি ওকে বলার পর সে কী বলল?

গ্রের কপালে ভাঁজ পড়ল।

গ্রে…

কী?

তুমি এখনও তাকে ফোন করোনি, তাই না?

আমার মনে হয় না…

সে যেহেতু কাছাকাছি ছিল তাই কোপেনহ্যাগেনে সংগঠিত সম্ভাব্য সকল সন্ত্রাসী হামলার খবর সে জানে। আর কেউ যদি বোম! বলে চিৎকার করে কোনো ঘটনার সৃষ্টি করে, আগলি ডাকলিং-এ চড়ে পার্ক থেকে বের হয়ে তুলকালাম বাধিয়ে দেয় তাহলে তো কথাই নেই। তোমার ওকে পুরো বিষয়টা খুলে জানানো উচিত।

মনক ঠিকই বলেছে। র‍্যাচেলকে ফোন করে জানানো উচিত ছিল।

গ্রেসন পিয়ার্স, আপনাকে দিয়ে জাতি কী করবে? হতাশায় মাথা দোলাল মনক। বলেন, মেয়েটাকে কবে ছেড়ে দিচ্ছেন?

কী বলছ?

ঢং করো না। তুমি আর র‍্যাচেল রিলেশন করছ, ভাল কথা। কিন্তু রিলেশনটা কী আদৌ ঠিকভাবে হচ্ছে?

গ্রে রেগে গেল। সেটা তোমাকে ভাবতে হবে না। তবে আমরা এসব নিয়েই আজকে কথা বলার জন্য প্ল্যান করেছিলাম। কিন্তু সব তো ভজকট হয়ে গেল।

তোমার জন্য ভালই হয়েছে। রিলেশনের ভেজালে জড়াতে হবে না। বেঁচে গেলে।

শোন, দুই মাস ধরে পকেটে অ্যাঙ্গেজমেন্টের আংটি বয়ে বেড়াচ্ছ বলে এই না যে তুমি লাভ শুরু হয়ে গেছ!

দুই হাত জড়ো করে ক্ষমা প্রার্থনা করল মনক। ঠিক আছে ভাই, মাফ চাই… আমি জাস্ট বলছিলাম…

গ্রে এত সহজে ছেড়ে দেয়ার পাত্র নয়। কী?

তুমি আসলে সত্যি সত্যি কোনো রিলেশনশিপ চাও না।

কথার আঘাতে হতভম্ব হয়ে গেল গ্রে। কী বলছ তুমি? আমি আর র‍্যাচেল দুজনই এটাকে সামনে এগিয়ে নেয়ার ব্যাপারে আন্তরিক। আমি র‍্যাচেলকে ভালবাসি। তুমি তো সেটা জানোই।

জানি। ভালবাসো, ওটা ঠিক আছে। কিন্তু তুমি ওর সাথে আসল সম্পর্কে জড়াতে চাও না। হাতের তিন আঙুল বের করে বলল মনক। যেমন : স্ত্রী, বন্ধন, বাচ্চা কাচ্চা।

গ্রে কিছু বলল না। স্রেফ মাথা নাড়ল।

তুমি র‍্যাচেলের সাথে জাস্ট ডেটিং করার জন্য রিলেশন করছ।

কিছু একটা বলে মোক্ষম জবাব দিতে চাচ্ছিল গ্রে। কিন্তু মনক তো একেবারে ভুল বলেনি। গ্রে আর র‍্যাচেলের যখনই দেখা হয় তখন একটুও রোমান্টিক সময় কাটাতে পারে না ওরা। বিছানায় যাওয়া এক ব্যাপার, সেটার আগে একটু ডেটিং করারও দরকার আছে। আর ঘাটতিটা সেখানেই।

তোমাকে আমি কতদিন ধরে চিনি? মনক প্রশ্ন করল।

প্রশ্নকে পাত্তাই দিল না গ্রে।

তখন থেকে এপর্যন্ত কতগুলো সিরিয়াস গার্লফ্রেন্ড হয়েছে তোমার? হাত দিয়ে বড় করে শূন্য এঁকে দেখাল মনক। এটা তোমার প্রথম সিরিয়াস গার্লফ্রেন্ড। আর এর সাথে তোমার আচরণের এরকম দশা। কার সাথে রিলেশন করছ তুমি, দেখেছ একবারও?

র‍্যাচেল তো খুব ভাল মেয়ে।

হোক। যাক, অবশেষে মুখ খুলছ দেখে ভাল লাগছে। কিন্তু বন্ধু, এরকম অসম্ভব পরিস্থিতি আর বাধায় থেকে কী ভালবাসা হয়?

কীসের বাধা?

আটলান্টিক সাগরটাই ধরো। তোমার আর তোমার রিলেশনের মাঝে দূরত্ব তৈরি করে বসে আছে। আবার তিন আঙুল দেখাল মনক। স্ত্রী, বন্ধন আর বাচ্চা।

তুমি প্রস্তুত নও, বলল মনক। আমি যখন ক্যাটের প্রেগন্যান্ট হবার কথাটা বললাম তখন তোমার চেহারার ভাব খেয়াল করেছি। ওখানে আতঙ্ক আর ভয় ছিল। যদিও বাচ্চাটা আমার। কিন্তু ভয়ে তুমি অস্থির।

গ্রের হৃদপিণ্ড একদম গলার কাছে এসে লাফাতে লাগল। ওর নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। আঘাত পেয়েছে একদম মোক্ষম জায়গায়।

দীর্ঘশ্বাস ফেলল মনক। তোমার সমস্যা আছে, বন্ধু। ওগুলো নিয়ে একটু কাজ করো। কীভাবে করবে সেটা তুমি জানো।

জেটের ইন্টারকম বেজে ওঠায় কিছু বলা থেকে বেঁচে গেল গ্রে।

আমরা আর আধা ঘণ্টা পর ল্যান্ড করব। পাইলট জানাল।

ল্যান্ড করার আগপর্যন্ত আমি এগুলো নিয়ে একটু ভে, জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বিড়বিড় করল গ্রে।

শুনে ভাল লাগল।

মনকের দিকে ফিরল ও। মনককে কড়া করে কিছু একটা বলতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, আমি র‍্যাচেলকে ভালবাসি।

সিটে হেলান দিল মনক। ঘোঁতঘোঁত করে বলল জানি তো। আর সেজন্যই ব্যাপারটা কঠিন।

.

সকাল ৭টা ০৫ মিনিট।
হুলুহুলুই-আমফলোজি প্রিজার্ভ।

চায়ে চুমুক দিল খামিশি টেইলর। যদিও চা-টায় মধু মেশানোয় বেশ সুস্বাদু হয়েছে। কিন্তু ও কোনো স্বাদ পেল না।

তাহলে মারসিয়ার বেঁচে থাকার কোনো সম্ভাবনা নেই? পলা কেইন প্রশ্ন করলেন।

মাথা নাড়ল খামিশি। যা সত্য সেটা বলাই ভাল। প্রধান ওয়ার্ডেন ওকে বরখাস্ত করেছে বলে ও এখানে আসেনি। প্রিজার্ভের এক প্রান্তে থাকা নিজের এক রুমের বাসা থেকে জিনিসপত্র সরিয়ে নেয়ার জন্য এসেছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত ওয়ার্ডেনদের জন্য ওরকম ঘোট ঘোট বাসা বানিয়ে রাখা আছে এখানে। বরখাস্ত হয়েছে, তারপর যখন চাকরি একেবারে চলে যাবে তখন তো আর এখানেও থাকতে পারবে না। চাকরি চলে যাওয়া এখন সময়ের ব্যাপার।

তবে সরাসরি বাসায় না ফিরে পলা কেইনের বাসায় এসে হাজির হয়েছে খামিশি। পার্কে যাওয়ার অর্ধেক রাস্তায় গবেষকদের জন্য নির্মিত অস্থায়ী বাসস্থান পাওয়া যায়। অর্থ যতদিন পর্যন্ত শেষ না হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত এখানে থাকবে গবেষকরা।

খামিশি বেশ কয়েকবার এই দোতলা বাসায় এসেছে। এখানে থাকা দুইজন গবেষকের কখনও অর্থাভাব হয়নি। আগেরবার পলা কেইনের এই বাসায় থাকার ১০ম বর্ষপূর্তি উদযাপনের জন্য এখানে এসেছিল খামিশি। হুলুহুলুই-আমলোজি-র বিজ্ঞান কমিউনিটিতে এই জন একদম চেনা মুখ ছিলেন।

কিন্তু এখন আছেন মাত্র একজন।

নিচু টেবিলের অপরপাশে থাকা ছোট্ট আসনে বসেছেন ড. পলা কেইন। তার চোখ ছলছল করলেও গাল এখনও শুকনো আছে।

ঠিক আছে। বললেন তিনি। দেয়ালে থাকা ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে সুখী জীবনের স্মৃতিগুলোর ওপরে চোখ বুলালেন। খামিশি জানে এরা দুজন অক্সফোর্ড থেকে পরিচিত। আমি খুব একটা আশা রাখিনি।

ছোটখাটো আকৃতির এই পলা কেইনের শরীর স্বাস্থ্য বেশ হালকা। চুলগুলো কালো, স্কয়ার কাট দিয়ে কাঁধ পর্যন্ত রাখা। খামিশি জানে এই মহিলার বয়স প্রায় ৬০ ছুঁই ছুঁই করছে, কিন্তু তাকে দেখতে আরও ১০ বছর কম মনে হয়। তার চেহারায় অন্যরকম সৌন্দর্য আছে, যেটা মেকি মেক-আপ দেয়া চেহারাগুলোকেও হার মানায়। কিন্তু আজ সকালে তার ভিন্ন চেহারা। নিজের ভূতুড়ে সংস্করণে হাজির হয়েছেন, চেহারা থেকে কিছু একটা চলে গেছে। দেখে মনে হচ্ছে এই খাকি প্যান্ট আর ঢোলা সাদা ব্লাউজ পরেই ঘুমিয়েছিলেন তিনি।

তার মনের বেদনা দূর করার জন্য খামিশি কোনো উপযুক্ত শব্দ পেল না। শুধু সমবেদনা জানিয়ে বলল, আমি দুঃখিত।

ওর দিকে তাকালেন পলা। আমি জানি, আপনি আপনার সাধ্যমত চেষ্টা করেছেন। বাইরের আওয়াজ আমার কানে এসেছে। সাদা চামড়ার নারী মারা গেছে, কালো মানুষ বেঁচে আছে। এখানে বিষয়টা খুব একটা ভাল চোখে দেখা হবে না।

খামিশি বুঝতে পারল তিনি প্রধান ওয়ার্ডেন-এর কথা বলছেন। ওই লোকটির সাথে পলা ও মারসিয়ার বেশ কয়েকবার সাক্ষাৎ হয়েছে। ওয়ার্ডেনের ব্যাকগ্রাউন্ড, জানাশোনা সম্পর্কে অন্যদের মতো তিনিও জানেন। তবে এখানে বর্ণবৈষম্য করলেও বনের ভেতরে তো আর সেটা চলে না। ওখানে সবাই সমান।

ওঁর মৃত্যুতে আপনার কোনো দোষ নেই। খামিশির চেহারার অভিব্যক্তি দেখে বললেন পলা।

খামিশি অন্যদিকে তাকাল। উনি ওকে বুঝতে পেরেছে ভেবে ওর ভাল লাগছে কিন্তু একই সাথে ওয়ার্ডেনের অভিযোগও দগ্ধ করছে ওকে। যৌক্তিকভাবে বিবেচনা করলে, ড. ফেয়ারফিল্ডকে বাঁচানোর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা ও করেছে। কিন্তু ঘটনা হলো, জঙ্গল থেকে ও বেঁচে ফিরতে পারলেও ফেয়ারফিল্ড পারেননি। আর সমস্যা এখানেই।

খামিশি উঠে দাঁড়াল। এখানে আর বেশিক্ষণ বিরক্ত করতে চাচ্ছে না। ড, কেইনকে ব্যক্তিগতভাবে কিছু জানানোর প্রয়োজন ছিল তাই এসেছিল। কাজ শেষ।

আমি যাচ্ছি তাহলে।

পলা উঠে ওকে স্ক্রিন ডোর পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। খামিশি বেরোতে যাবে এমন সময় ওকে ধরে থামালেন তিনি। আপনার কী মনে হয়, কী ছিল ওটা?

তার দিকে ঘুরল ও।

ওকে কীসে মেরে ফেলল? পলা জানতে চাইলেন।

সূর্যের আলো দেখল খামিশি। এরকম ঝকঝকে সকালে দানব নিয়ে কথা বলাটা মানাবে না। তাছাড়া এব্যাপারে কথা বলা নিষেধ আছে। চাকরিটা তো এখনও একেবারে চলে যায়নি।

পলার দিকে তাকিয়ে মিথ্যা এড়াল ও।

ওটা সিংহ ছিল না।

তাহলে কী…?

আমি সেটা খুঁজে বের করতে যাচ্ছি।

স্ক্রিন ডোর ঠেলে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামল ও। সূর্যের তাপে ওর মরিচাধরা পিকআপ সেদ্ধ হচ্ছে। ওতে চড়ে বাসার পথ ধরল খামিশি।

এই নিয়ে আজ সকালে একশ বারের মতো গতকালের ভয়ঙ্কর ঘটনা মনে পড়ল। উকুফার সেই চিৎকার এখনও ওর কানে বাজছে… সেই চিৎকারের দাপটে ইঞ্জিনের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে না ও। সিংহ নয়। ওটা সিংহ, খামিশি সেটা জীবনেও বিশ্বাস করবে না।

ওয়ার্ডেনদের জন্য নির্মিত সারি সারি বাসাগুলোর কাছে পৌঁছে গেল ও। লাল ধুলো উড়িয়ে উঠোনে সামনের গেইটে গিয়ে থামল।

খুব ক্লান্ত। কয়েক ঘণ্টার বিশ্রাম প্রয়োজন।

তারপর সত্য অনুসন্ধান করতে নামবে।

ইতোমধ্যে ও জেনে গেছে কোথা থেকে তদন্ত শুরু করতে হবে। কিন্তু সেটার জন্য অপেক্ষা করতে হবে ওকে।

উঠোনের বেড়ার দিকে এগোতে গিয়ে দেখল, গেইট একটু খোলা রয়েছে। প্রতিদিন বেরোনোর আগে সবসময় গেইটের ছিটকানি লাগিয়ে যায়। তবে হ্যাঁ, গতরাতে ওকে যখন পাওয়া যাচ্ছিল না তখন হয়তো কেউ এসে খোঁজ নিয়ে গিয়ে থাকতে পারে।

তবে খামিশির ইন্দ্রিয়জ্ঞান এখনও কমেনি… জঙ্গলে সেই প্রথম চিৎকার শোনার পর থেকে ওর ইন্দ্রিয়গুলো খুব সতর্ক হয়ে আছে। ওর সন্দেহ আছে, আর কখনও স্বাভাবিক হতে পারবে কি-না।

গেইট দিয়ে ভেতরে ঢুকল ও। ওর সামনের দরজা তো বন্ধই মনে হচ্ছে। চিঠির বক্সে থাকা চিঠিগুলোও বেশ ঠিকঠাকভাবে আছে। কেউ হাত লাগায়নি। সিঁড়িতে এক পা ফেলে ফেলে এগোল ও।

উঠতে উঠতে ভাবল, এখন সাথে একটা অস্ত্র থাকলে সুবিধে হতো।

গুঙিয়ে উঠল মেঝেরবোর্ড। আওয়াজটা ওর পায়ের নিচ থেকে আসেনি… বাসার ভেতর থেকে এসেছে।

খামিশির মন ওকে পালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রলুব্ধ করল।

কিন্তু না। এবার আর পালাবে না। একই ভুল দুইবার করবে না ও।

বারান্দায় উঠে একপাশে দাঁড়িয়ে দরজার হাতল ঘুরিয়ে চেক করল।

খোলা।

দরজা ঠেলে খুলল ও। মেঝেরবোর্ড আবার গুঙিয়ে উঠল বাসার পেছন দিক থেকে।

কে? কে ওখানে? খামিশি হাঁক ছাড়ল।

.

সকাল ৮টা ৫২ মিনিট।
হিমালয়।

এটা দেখো।

হঠাৎ চমকে জেগে উঠল পেইন্টার। ওর দুই চোখের মাঝ অংশ মাথাব্যথায় দপদপ করছে। বিছানা গড়িয়ে উঠল ও, শরীরে পুরোপুরি পোশাক পরা আছে। কখন ঘুমিয়ে পড়েছে বুঝতেও পারেনি। ঘণ্টা দুই আগে গার্ডদের পাহারায় রুমে ফিরেছে ও আর লিসা। অ্যানা তার কিছু কাজ সারতে আর পেইন্টারের অনুরোধে কিছু জিনিস আনতে গেছেন।

কতক্ষণ ঘুমালাম? প্রশ্ন করল পেইন্টার। মাথাব্যথা ধীরে ধীরে কমছে।

জানি না। আমি তো বুঝতেই পারিনি তুমি ঘুমিয়ে পড়েছ। ফায়ারপ্লেসের সামনে থাকা টেবিলের পাশে আড়াআড়ি পা রেখে লিসা বসে আছে। কিছু কাগজ রাখা আছে টেবিলে। তবে মিনিট ১৫ হতে পারে… কিংবা ২০। বাদ দাও, এগুলো দেখ।

পেইন্টার উঠে দাঁড়াল। লাটিমের মতো চক্কর দিয়ে উঠল পুরো রুম, তারপর আবার স্থির হলো। ওর অবস্থা ভাল নয়। এগিয়ে গিয়ে লিসার পাশে বসল ও।

ক্রো দেখল, কয়েকটি কাগজের ওপর লিসার ক্যামেরা বসে আছে। সহযোগিতার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে অ্যানাকে নিকন ক্যামেরা ফেরত দেয়ার জন্য বলেছিল লিসা।

ক্রোর দিকে একটি কাগজ এগিয়ে দিয়ে বলল, দেখ।

কাগজে কিছু চিহ্ন এঁকেছে সে। পেইন্টার ওগুলোকে চিনতে পারল। লামা খেমসার দেয়ালে এসব এঁকেছিলেন। লিসা নিশ্চয়ই ক্যামেরায় থাকা ছবিগুলো দেখে দেখে এগুলো এঁকেছে। কাগজে প্রত্যেকটি চিহ্নের নিচে সঙ্গতিপূর্ণ অক্ষরও লেখা আছে।

SENPINAMENSGM SCHWARZESONNE

খুব সাধারণ কোড। প্রত্যেকটা চিহ্ন একটা করে বর্ণ বোঝাচ্ছে। তবে একটু এদিক ওদিক করে নিতে হয়েছে, এই আরকি।

schwarze Sonne শব্দ করে পড়ল ক্রো।

কালো সূর্য। এখানকার প্রজেক্টের নাম।

আচ্ছা, তাহলে লামা খেমসার এই প্রজেক্ট সম্পর্কে জানতেন। ক্রো মাথা নেড়ে বলল। সন্ন্যাসী এখানে জড়িত হয়েছিলেন হয়তো।

আর সেটা আঘাতও করেছে। ক্রোর কাছ থেকে লিসা কাগজ নিয়ে নিল। পাগমলামোর ফলে হয়তো তার ভেতরে থাকা পুরোনো ক্ষত জেগে উঠেছিল। অতীতে ফিরে গিয়েছিলেন।

কিংবা এমনও হতে পারে, এই ক্যাসলের সাথে সমঝোতা করে এতদিন চলছিলেন তাঁরা।

যদি তা-ই হয়ে থাকে… তাহলে দেখ, সমঝোতা করার বিনিময়ে তারা কী পেয়েছেন। বলল লিসা। আমরাও কী তাহলে এরকম প্রতিদান পাব?

আমাদের হাতে আর কোনো উপায় নেই। বেঁচে থাকতে হলে এভাবেই বাঁচতে হবে। নিজেদেরকে তুলে ধরতে হবে দরকারি হিসেবে।

আর তারপর? আমাদের যখন আর দরকার থাকবে না তখন?

পেইন্টার কোনো ছল করল না। আমাদের মেরে ফেলবে। সহযোগিতা করে আমরা আমাদের আয়ু একটু বাড়াচ্ছি, এই তো।

ও খেয়াল করে দেখল লিসা এই কঠিন সত্য শুনে ভয় পেল না, মনও খারাপ করল না। বরং এটা থেকে শক্তি অর্জন করল।

তাহলে আমরা প্রথমে কী করব? লিসা জানতে চাইল।

কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নামার আগে প্রথমে জানাশোনা থাকা দরকার।

কীরকম?

শত্রুটা কে, সেটা আগে জানতে হবে।

মনে হয় অ্যানা আর তার সাঙ্গপাঙ্গ সম্পর্কে আমি যথেষ্ট জানি।

না। সেটা না। আমি বলতে চেয়েছি, এখানকার বিস্ফোরণের পেছনে কার হাত আছে। স্যাবোটাজটা কে করল… কে বা কারা করাল কাজটা। এখানে বেশ বড় কিছু হচ্ছে। স্যাবোটাজের ব্যাপারগুলো… বেল-এর সেফটি কন্ট্রোলে গোলমাল, অসুখ বিসুখ… এসব করে আমাদেরকে টেনে আনা হয়েছে। অদ্ভুত অসুখ-বিসুখের টোপ দেখিয়ে, ধোঁয়া উড়িয়ে আনা হয়েছে আমাদের।

কিন্তু ওরা সেটা কেন করতে যাবে?

যাতে অ্যানার দলবলের কথা ফাঁস হয়ে যায়। ওরা যা করছে সেটা যেন বন্ধ হয়। দ্য বেল… আমাদের এখানে আসার পর ওটা ধ্বংস করে দেয়া হলো। বিষয়টা তোমার কাছে আশ্চর্য লাগেনি? ঘটনাটা দিয়ে আসলে কী বোঝায়?

তারা চাচ্ছিল অ্যানার প্রজেক্ট বন্ধ হোক এবং সেইসাথে বেল-এর প্রযুক্তি যেন অন্য কারও হাতে না পড়ে?

মাথা নাড়ল ক্রো। ঘটনা হয়তো তারচেয়ে ভয়াবহ। এসবই হয়তো ভুল দিকে প্রলুব্ধ করছে। হাতের কারিশমা দেখাচ্ছে কেউ। হয়তো এদিকে ব্যস্ত রেখে আসল কৌশল খাটাচ্ছে অন্য কোথাও। কিন্তু এত কৌশলের পেছনে থাকা সেই জাদুকরটা কে? সে কী চায়? কী উদ্দেশ্য? আমাদেরকে সেটাই খুঁজে বের করতে হবে।

আর তুমি অ্যানার কাছে যে জিনিসগুলোর জন্য অনুরোধ করেছ, ওগুলো?

ওগুলো দিয়ে হয়তো আমরা এই ঘোরর পরিস্থিতিতে কিছু সুবিধা করতে পারব। যদি আমরা স্যাবোটাজকারীকে ফাঁদে ফেলতে পারি তাহলে হয়তো কিছু প্রশ্নের উত্তর মিলবে। হয়তো জানা যাবে, এসবের পেছনে কার হাত আছে।

দরজায় টোকা পড়ায় ওরা দুজনই চমকে উঠল।

দরজা খুলে যেতে যেতে উঠে দাঁড়াল ক্রো।

গানথারকে পাশে নিয়ে অ্যানা হাজির। শেষবার যখন গানথারকে দেখেছিল তখন বেশ নোংরা দেখালেও এখন পরিষ্কার হয়ে এসেছে। ওদের দুজনকে ভয় দেখানোর জন্য সাথে করে গার্ড আনেনি। এমনকী ওর নিজের কাছেও কোনো অস্ত্র নেই।

আমাদের সাথে সকালের নাস্তা করতে আশা করি আপনাদের আপত্তি নেই, বললেন না। নাস্তা শেষ করে আপনাদের চাহিদা মোতাবেক জিনিসপত্র সরবরাহ করা হবে।

সব? কীভাবে? কোত্থেকে পেলেন?

কাঠমাণ্ডু। পাহাড়ের আরেক পাশে আমাদের একটা হেলিপ্যাড আছে।

সত্যি? হেলিপ্যাড আছে অথচ সেটা কখনও কারো চোখে পড়েনি?

শ্রাগ করলেন অ্যানা। প্রতিদিন গড়ে ১২ বার করে সাইট দেখার টুর আর পর্বতারোহীদের নিয়ে আমাদের হেলিকপ্টার চলাচল করে। যা-ই হোক, ১ ঘন্টার মাঝে পাইলট ফিরবে।

মাথা নাড়ল পেইন্টার। এই ১ ঘণ্টার সর্বোত্তম ব্যবহার করতে হবে ওকে।

সবকিছু জানতে হবে।

প্রত্যেকটা সমস্যারই সমাধান থাকে। আশা করতে দোষ কী।

রুম থেকে বেরোল ওরা। হলওয়েতে আজ বেশ লোকজনের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে। ওদের কথা জেনে গেছে সবাই। তাই এক নজর দেখতে এসেছে। কেউ কেউ রেগেও আছে। মনে হচ্ছে… স্যাবোটাজের জন্য পেইন্টার আর লিসা-ই দায়ী। তবে ওদের কেউ খুব কাছে ঘেঁষল না। কারণ সামনে পথ ফাঁকা করতে করতে গানথার এগোচ্ছে। যাদের হাতে বন্দী হয়েছিল তারাই রক্ষকের ভূমিকা পালন করছে এখন।

অ্যানার স্টাডি রুমে পৌঁছুল ওরা।

ফায়ারপ্লেসের সামনে থাকা টেবিলের ওপর একগাদা খাবার সাজানো আছে। সসেজ, পাউরুটি, সেদ্ধ করা খাবার, পরিজ, পনির আর ফল-ফলাদির মধ্যে আছে কালো জাম, তরমুজ ও আলুবোখারা।

আমাদের সাথে পুরো ব্যাটেলিয়নও খেতে বসবে নাকি? খাবারের এত বাহার দেখে পেইন্টার জানতে চাইল।

শীতপ্রধান এলাকায় পর্যাপ্ত পরিমাণে খাবার থাকা খুবই জরুরি বিষয়। এতে দেহ, মন দুটোই ভাল থাকে। বললেন অ্যানা।

বসল ওরা। সবাইকে খাবার পরিবেশন করা হলো। এ যেন বড় এক পরিবার।

যদি চিকিৎসা করার কোনো উপায় থাকে, বলল লিসা, সেক্ষেত্রে আমরা আপনাদের এই বেল সম্পর্কে জানতে আগ্রহী। বেল-এর ইতিহাস… কীভাবে কাজ করতো… এসব জানতে চাই।

হেঁটে আসার পর অ্যানার মন একটু খারাপ থাকলেও এখন বেশ ভাল লাগছে। তাদের এই আবিষ্কার সম্পর্কে আলোচনা করার জন্য দুনিয়ার সব গবেষক-ই আগ্রহ প্রকাশ করবে। এটাই স্বাভাবিক।

এনার্জী জেনারেটর হিসেবে পরীক্ষার মাধ্যমে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল, অ্যানা বলতে শুরু করলেন। একটা নতুন ইঞ্জিন। এর নাম বেল হয়েছিল ঘণ্টা আকৃতির বহিঃস্থ জারের কারণে। সিরামিকের তৈরি জারের আকার ছিল একশ গ্যালন ড্রামের সমান। সীসা দিয়ে লাইন করাছিল। ইঞ্জিনের ভেতরে ছিল দুটো ধাতব সিলিন্ডার। একটা সিলিন্ডারের ভেতরে আরেকটা ঢোকানো ছিল। দুটো পরস্পর বিপরীত দিকে ঘুরতো।

অ্যানা হাত নেড়ে বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করলেন।

পুরো জিনিসটায় তেল দিয়ে বেল-এর ভেতরে মারকারির মতো তরল ধাতু দিয়ে ভরে দেয়া হতো। সেই তরল ধাতুর নাম : জেরাম-৫২৫।

নামটা চিনতে পারল ক্রো। এই জিনিসের কথা আপনি আগেই বলেছিলেন। এটা আপনারা পুনরায় উৎপাদন করতে পারছেন না।

মাথা নেড়ে সায় দিলেন অ্যানা। আমরা বছরের পর বছর ধরে চেষ্টা করে আসছি। তরল ধাতুর ভেতরের কী কী উপাদান আছে সেটা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষাও চালিয়েছি অনেক। সেখান থেকে আমরা জেনেছি এতে থরিয়াম আর বেরিলিয়াম পেয়োক্সাইডস আছে। ব্যস এটুকুই, আর কিছু জানা সম্ভব হয়নি। অথচ জেরাম-৫২৫ হলো নাৎসদের জিরো পয়েন্ট এনার্জী প্রজেক্টের একদম প্রধান উপাদান। জেরাম-৫২৫ ছাড়া কোনোভাবেই চলবে না। যে ল্যাবে এটা তৈরি করা হতো যুদ্ধের পর পর সেটাকে ধ্বংস করে দেয়া হয়।

আর তারপর থেকে আজ পর্যন্ত আপনারা ওটা উৎপাদন করতে সক্ষম হননি? পেইন্টার প্রশ্ন করল।

মাথা নাড়লেন অ্যানা।

আচ্ছা, কিন্তু বেল আসলে কী করত? লিসা জানতে চাইল।

আমি আগেই বলেছি, এটা ছিল স্রেফ একধনের এক্সপেরিমেন্ট। অফুরন্ত জিরো পয়েন্ট এনার্জীকে বাগে আনার চেষ্টা। নাৎসিরা যখন এই প্রজেক্ট চালু করেছিল, তখন থেকেই বিভিন্ন পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে শুরু করে। ফ্যাকাসে উজ্জ্বলতা বিচ্ছুরণ করে বেল! ইলেকট্রিক্যাল যন্ত্রপাতিতে বড় ধরনের শর্ট সার্কিট হয়। মারাও যায় অনেকে। এভাবে একের পর এক এক্সপেরিমেন্ট চালাতে চালাতে তারা ডিভাইসটাকে উন্নত করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। একটা পরিত্যক্ত খনিতে এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছিল তখন। এরপর থেকে আর কেউ মারা যায়নি। তবে এক কিলোমিটার দূরে থাকা গ্রামের লোকদের মাঝে নিদ্রাহীনতা, মাখা ঘোরা, খিচুনিসহ নানার উপসর্গ দেখা দেয়। বেল থেকে রেডিয়েশনের মাধ্যমে কিছু একটা ছড়াচ্ছিল। বিষয়টা কর্তৃপক্ষের নজর কাড়ল।

অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার সম্ভাবনা, তাই তো? আন্দাজ করল পেইন্টার।

তা জানি না। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান গবেষক অনেক রেকর্ড ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। তবে সেই দলে থাকা বাকিদের কাছ থেকে বেল-এর কার্যপরিধি সম্পর্কে জানা গিয়েছিল। ফার্ন গাছ, ছত্রাক, ডিম, মাংস, দুধসহ পুরো প্রাণীজগতে জুড়ে বিস্তার ছিল বেল। মেরুদণ্ডী, অমেরুদণ্ডী প্রাণী; সব। তেলাপোকা, শামুক, গিরগিটি, ব্যাঙ, ইঁদুর, বিড়াল… সব।

আর এদের সবার উপরে থাকা প্রাণী? মানুষ? এই মানুষের কী অবস্থা?

অ্যানা মাথা নাড়লেন। হু, হতে পারে। উন্নতির পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো-বেশি নীতি মেনে চলা।

তো এক্সপেরিমেন্টের সময় কী হয়েছিল? লিসা প্রশ্ন করল। প্লেটে থাকা খাবারের প্রতি ওর কোনো আগ্রহ নেই। খাবার যে মজা হয়নি, সেটা না। এই প্রসঙ্গ ওকে আগ্রহী করে তুলেছে।

ওর দিকে ফিরলেন অ্যানা। এবারের প্রতিক্রিয়াগুলোও ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। গাছপালা থেকে ক্লোরোফিল গায়েব হয়ে সব সাদা হয়ে যাওয়া, কয়েক ঘন্টার মধ্যে পুরো গাছ তেল তেলে কাদায় পরিণত হওয়া ইত্যাদি। এছাড়াও অন্যান্য প্রাণী স্রেফ জেলিতে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। টিস্যুগুলোতে সচ্ছ একধনের উপাদান এসে সব কোষকে একদম ভেতর থেকে