কানিংহাম হাত পা ছড়িয়ে মাটিতে শুয়ে পড়ল। আর কেইন ওর পাশে হাঁটু গেড়ে বসে ওর ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে একটুখানি পানি ঢোকাবার চেষ্টা করল। জামাল বালিয়াড়ির উপরে উঠল, তারপর নিচে ওদের কাছে এসে পৌঁছলো। সে রুথ কানিংহামকে তার স্বামীর পাশেই শোয়াল, তারপর কেইনের দিকে তাকাল।
কেইন প্লেনটার ব্যাপারে তাকে বুঝিয়ে বলল। তার চোখে আশার আলো ঝিলিক দিয়ে উঠল। ঠিক সেই সময়েই কানিংহাম গুঙিয়ে উঠল, তারপর উঠে বসল। আমি কোথায়? কী হয়েছে?
তার কণ্ঠস্বর এতো দূর্বল আর নিস্তেজ শোনালো যে মনে হলো এটা তার কণ্ঠস্বর নয়।
কেইন তাকে ধরে দাঁড় করাল আর এক হাত দিয়ে তার কাঁধ পেচিয়ে ধরল। চিন্তা করবেন না, সে তাকে শান্ত করে বলল। এখন আমাদের আর বেশি দূর যেতে হবে না। খুব বেশি দূর নয়।’
সে ঘুরে জামালের দিকে তাকিয়ে ঘাড় কাত করল। জামাল আবার রুথ কানিংহামকে কোলে তুলে নিল। তারপর আবার ওরা হাঁটতে শুরু করল।
ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ওরা প্লেনটার কাছে এসে পৌঁছালো। সেখানে পৌঁছতে পৌঁছতেই কানিংহাম কেইনের কাঁধে একটা বোঝা হয়ে দাঁড়াল। সে তাকে মাটিতে বসালো, তারপর টেনে নিয়ে গেল প্লেনটার ডানার নিচের ছায়ায়। প্লেনের গায়ে কানিংহামের পিঠ ঠেস দিয়ে বসালো। জামালকে বলল রুথকে দেখতে, তারপর সে প্লেনের কেবিনে উঠল।
একটু খুঁজতেই পানির জেরিক্যানটা গেয়ে গেল। এটা নিয়ে আসার সময় তার হাত কাঁপতে লাগল। ভেতরে কিছু একটা নড়ছে বুঝে তাড়াতাড়ি মেটাল স্টপারটা খুলে ক্যানটা মুখে নিল। একটু লোনা, গরম আর জঘন্য স্বাদ পানিটার, তারপরও সেটা পানি। চার পাঁচ পাইন্টের মতো অবশিষ্ট আছে।
সে প্লেনটার ডানার নিচে হামাগুড়ি দিয়ে রুথ কানিংহামের মুখে একটু পানি ছিটালো। সে গোঙানির মতো শব্দ করে আস্তে আস্তে চোখ মেলল। মুখের চামড়া শক্ত হয়ে রয়েছে আর ঠোঁট কয়েক জায়গায় ফেটে গেছে। কেইন আস্তে তার মাথা তুলে ধরে একটু পানি দিল তার মুখে।
রুথ কেশে উঠল, কিছু পানি তার চিবুক বেয়ে গড়িয়ে নিচে পড়ল। তারপর মনে হলো সে জেগে উঠে হাত বাড়িয়ে পানির বোতলটা তুলে নিয়ে ঢক ঢক করে বেশ খানিকটা পান করল।
তারপর একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে হেলান দিয়ে বসল। এরপর কেইন কানিংহামের কাছে গেল, সে অবশ্য ইতোমধ্যে নিজেকে অনেকটা সামলে নিয়েছে। একটু দূর্বল হাসল। দূঃখিত আমি অনেক বিড়ম্বনা সৃষ্টি করেছি। এখন কি করবেন?
কেইন জেরিক্যানটা দেখিয়ে বলল, এর মধ্যে চার পাইন্টের মতো পানি পাবেন, এই পানিতে আপনাদের সারাদিন চলে যাবে।
কানিংহাম একটু ভুরু কুঁচকালো। আপনার আর জামালের কি হবে?
কেইন বলল, ‘আমরা এগোতে থাকব, এছাড়া আমাদের আর কোন উপায় নেই। আপনি আর আপনার স্ত্রী আর হাঁটতে পারবেন না। আমরা যদি আপনাদের সাথে এখানে থাকি তাহলে সবাই মরবো। যদি জামাল কিংবা আমি এ জায়গা থেকে বের হতে পারি, তাহলে শিগগির আপনাদের জন্য সাহায্য আনতে পারব।’
এক মুহূর্তের জন্য সবাই নিরব হলো, তারপর কানিংহাম একটু নিস্তেজ হাসল। আপনি যে রকম বলেছেন, আসলেই আর কোন পথ নেই।’ সে হাত বাড়াল। কেবল শুভ কামনা করা ছাড়া আর তো আমার কিছু বলার নেই। তাহলে আর অপেক্ষা করছেন কেন?’
একটু বেশিক্ষণ ওরা হাত ধরে থাকল তারপর কেইন জামালের দিকে ফিরল। পানির বোতলটা নিয়ে অর্ধেক পানি খেল। বাকিটা জামালের হাতে দিল, সে বাকি পানিটুকু শেষ করে খালি বোতলটা ছুঁড়ে ফেলে দিল। এক মুহূর্ত দুজন দুজনের দিকে তাকাল তারপর ওরা হাঁটতে শুরু করল। ছোট একটা টিলার উপর ওঠার পর কেইন একবার পেছন ফিরে তাকাল,তারপর একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে টিলাটার অপর পাশে নেমে গেল।
.
সূর্য যেন একটা জীবন্ত সত্তা, যা কোনভাবে তার একটা অংশে পরিণত হয়েছে। এখন ওরা দুজনে একটি সত্তা হয়ে হাঁটছে। এরোপ্লেনটা ছেড়ে আসার পর কত সময় পার হয়েছে তা নির্ণয় করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে, কেননা এখানে সময়ের কোন অস্তিত্ব নেই আর সময়ের কোন মানেও নেই।
বুকে আর হাটুতে বর্ম পরে একজন মানুষ হাঁটতে পারে না। এটা অসম্ভব। বরং এগুলো ফেলে দেয়াই ভাল। হেলমেটটা অনেক আগেই চলে গেছে, এখন শুধু রোমান সৈন্যরা ছোরার মতো যে রকম ছোট তরবারি ব্যবহার করে, সেটা একটা বোঝার মতো নিয়ে হাঁটছে। ঘোড়ায় চড়ার সময় পিঠে যে আলখাল্লাটা ব্যবহার করতো সেটা ভাঁজ করে মাথায় পেঁচিয়ে রেখেছে, সূর্যের প্রচণ্ড তাপ থেকে মগজ বাঁচাতে। তাকে যেতেই হবে, ফিরে গিয়ে সেনাপতির কাছে রিপোর্ট পৌঁছাতে হবে। দায়িত্ব কর্তব্য সবার আগে, যা একজন সৈন্যের বেলায় হয়ে থাকে, তবে আরো একটা কারণ ছিল। সেই মেয়েটি–কালো চুল, দুধ-সাদা হুক আর একটা শীতল কুয়ার মতো যার মুখ। এথেন্সে সেই পিরায়েসের কাছে সাগরের মতো শীতল। যেখানে সে ছোটকালে সাঁতার কাটতো, ঝাঁপিয়ে পড়তে সবুজ গভীরতায়। মাছগুলোর মাঝে একেবেকে সাঁতার কেটে বেড়াতো। ভয় পেয়ে মাছের দল বিশাল চকচকে মেঘের মতো দুরে পালিয়ে যেতো। তারপর সে আবার ধীরে ধীরে গোলাকার বুদবুদ ছড়িয়ে পানির উপরে ভেসে উঠতো।
সে সামনে মাটিতে পড়ে গেল। কিছুক্ষণ হাঁটুর উপর উবু হয়ে বসে রইল, তারপর তাকে এক ঝটকা মেরে টেনে তুলে দাঁড় করিয়ে একটা হাত তার মুখে থাপড় কষালো। জামাল তাকে শক্ত করে ধরে তার চোখের দিকে উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে তাকাল। কেইন কথা বলতে চেষ্টা করে কিছুই বলতে পারল না। তারপর কয়েকবার মাথা নেড়ে সে আবার সামনের দিকে হাঁটা শুরু করল।
