কেইন জামালের দিকে তাকাল। সে তখন স্পিরিট স্টোভের পাশে বসে একটা বোল থেকে ভাত খাচ্ছে। জর্ডনের লোকেরা তার দিকে চেয়ে রয়েছে। ‘আমি মনে করি আমাদের সবার জীবন রক্ষা পেয়েছে তার কারণে।
‘সেটা ঠিক বলেছো তুমি, জর্ডন বলল। এখন পুরো ব্যাপারটা খুলে বলো। প্লেনটা ক্র্যাশ করার পর তোমরা কোথায় ছিলে? আর মেরির কি হয়েছে?
যত সংক্ষেপে সম্ভব কেইন গত চারদিনের ঘটনার বিবরণ খুলে বলল। তার বলা শেষ হবার পর জর্ডন তার মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, স্কিরোজ একজন নাৎসি–এটা আশ্চর্য।
‘এটাই সত্যি, কেইন বলল। তবে আমি যেরির ব্যাপারে চিন্তিত। রুথ কানিংহাম বলেছে ওদের হাজার অপেক্ষা করার কথা।
জর্ডন কুঁচকালো। দু’সপ্তাহ আগে আমি ঐ জায়গাটা পার হয়ে এসেছি। ওখানে বাল হারিস নামে একটা বেদুঈন গোষ্ঠি ডেরা গেড়েছে। ওদের সর্দার মোহাম্মদ নামে পাকা দাড়িওয়ালা একজন অভিজ্ঞ বর্ষীয়ান ব্যক্তি।
কেইন মাথা নাড়ল। তুমি যার কথা বলছো তাকে আমি চিনি। অতীতে তার সাথে আমি ব্যবসা করেছি। তারপর সে চোখ সরু করে বলল, ব্যাপারটা একটু ভেবে দেখো। আমি শুনেছিলাম মূলারের সাথে বাল হারিসের খুব মাখামাখি সম্পর্ক। হয়তো সে জানতো বাল হারিস এখন হাজারএ ক্যাম্প করেছে।’
জর্ডন দেঁতো হাসি দিল। এ ধরনের বন্ধুই স্কিরোজের এখন দরকার। যখনই আমি পাশ দিয়ে যাই ভয়ংকর চেহারার এই লোকগুলো তখনই দাঁত বের করে রাইফেলে আঙুল বোলায়। এক জোড়া গোঁজার জন্য ওরা তোমার গলা কাটতে পারে।
কেইন মাথা নাড়ল। মোহাম্মদ সে রকম মানুষ নয়। সে পুরোনো জমানার বেদুঈন সর্দার। সে তার সম্মান আর পুরোনো আদবকায়দা অত্যন্ত কঠোরভাবে মেনে চলে।
সে উঠে দাঁড়িয়ে ছাউনির বাইরে বের হল। মাথা আবার ঘুরে উঠতেই সে টলে উঠল। তাড়াতাড়ি নিজেকে সোজা করে দাঁড়াল। জর্ডন উদ্বিগ্ন হয়ে বলল, ‘তুমি ঠিক আছে তো?’
‘স্কিরোজকে ধরতে পারলে আমি একদম ঠিক হয়ে যাবো, কেইন তাকে বলল। এখন তোমার একটা ট্রাক নিতে পারব?
জর্ডন মাথা নেড়ে বলল, কোন দরকার নাই। আমিও তোমার সাথে যাচ্ছি। আমি নিজেও মেরি পেরেটকে নিয়ে বেশ চিন্তিত আছি।
কানিংহাম আর তার স্ত্রীর কি হবে?
জর্ডন কাঁধ ঝাঁকাল। এখন ওরা বেশ কয়েক ঘণ্টা ঘুমাবে। ওদের দেখাশুনা করার জন্য আমার লোক থাকবে।
কেইন আর তর্ক করল না। সে জামালকে ডেকে সবকিছু বুঝিয়ে বলল। তারপর ওরা একটা ট্রাকে চড়ে জর্ডনের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। সে ওর লোকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে এল।
কয়েক মিনিট পর ট্রাক চলতে শুরু করল। জর্ডন চালকের আসনে আর কেইন দুচোখ বুজে সিটে হেলান দিয়ে বসল। গত কয়েকদিনের কর্মকান্ড আর চিন্তাভাবনা যেন তার শরীরের সমস্ত শক্তি নিংড়ে নিঃশেষ করে নিয়েছে। সামনে কি হবে না হবে সেসব নিয়ে সে আর ভাবলো না।
এক ঘণ্টার মধ্যেই ওরা হ্যাঁজারে পৌঁছে গেল। চওড়া উপত্যকার মাথায় জর্ডন ট্রাকের ব্রেক কষলো। নিচে বেদুঈনদের কালো তাবুগুলো দেখা যাচ্ছে।
যাই ঘটুক না কেন, কথা বলার ভার আমার উপর ছেড়ে দাও, কেইন বলল। আমি জানি ঠিক কীভাবে ওদেরকে সামলাতে হবে।
মরুদ্যানের পাম গাছের সারি উপত্যকার কয়েকশ গজ পর্যন্ত ছড়িয়ে রয়েছে। পাতাগুলো একটা ছাদের মতো হয়ে সূর্য কিরণ থেকে মরুদ্যানকে ছায়া দিয়েছে। ওরা বেদুঈন বসতির দিকে ট্রাক চালিয়ে এগোতেই সামনে থেকে উট আর ছাগলগুলো চারপাশে ছত্রভঙ্গ হয়ে ছড়িয়ে পড়ল। বাচ্চারা ভয়ার্ত কণ্ঠে চিৎকার করতে করতে তাঁবুর দিকে ছুটে গেল। দীর্ঘদেহী কালো দাড়িওয়ালা আলখাল্লা পরা লোকজন রাইফেল হাতে তাবুগুলো থেকে বের হয়ে এল।
বসতির মাঝখানে পৌঁছার পর কেইন সিটে সোজা হয়ে বসল। জামাল তার কাঁধে আলতো করে ‘লো। পঞ্চাশ ষাট গজ দুরে দুটো ট্রাক পার্ক করা রয়েছে।
জর্ডনও একই সাথে ট্রাকগুলো দেখল। মনে হচ্ছে আমরা ঠিক জায়গাতেই এসেছি।’
সে সবচেয়ে বড় তাবুটার সামনে ব্রেক কষে ট্রাকটা থামাল। একজন সর্দার গোছের ব্যক্তি বাইরে বের হয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
মাহমুদ অত্যন্ত বয়স্ক একজন মানুষ। তার লম্বা দাড়ি বেশিরভাগ রুপালি রঙের। গায়ের চামড়া অনেকটা পার্চমেন্ট কাগজের মতো হাড়ের সাথে লেগে রয়েছে। তার আলখাল্লা চকচকে উজ্জ্বল সাদা আর জাম্বিয়ার বাট খাঁটি সোনার।
গোত্রের লোকজন নিঃশব্দে এগিয়ে গাড়িসহ পালাবার পথ বন্ধ করে ওদেরকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলল। আর যাই হোক ওদেরকে বন্ধুসুলভ মনে হচ্ছে না।
জর্ডন বলল, ওদের রাইফেলগুলো দেখছ? সর্বাধুনিক। এবার বোঝা যাচ্ছে স্কিরোজ কেন অপেক্ষা করার জন্য এ জায়গা বেছে নিয়েছিল।
কেইন ট্রাক থেকে নেমে ধীরে ধীরে সামনে এগোলো, তারপর মোহাম্মদের কয়েক পা দূরে থামল। কয়েক মুহূর্ত দুজন দুজনের চোখের দিকে চেয়ে রইল, তারপর বর্ষীয়ান আরব লোকটি মৃদু হেসে হাত বাড়াল। এই যে আমার বন্ধু কেইন। সেই কবে আমরা এক সাথে বাজপাখি নিয়ে শিকার করেছি। অনেক দিন হয়ে গেল তাই না।’
কেইন বাড়ানো হাতটি ধরে মৃদু হাসল। সময় কিন্তু তোমাকে আরো ভাল করেছে, মাহমুদ। একেক বছর যায় আর তোমার বয়স যেন কমতে থাকে। সে জর্ডনের দিকে ফিরে বলল, “ইনি আমার একজন বন্ধু।
মাহমুদ মুখ বিকৃত করল। একে আমি চিনি। এই যুবক মাটি খুঁড়ে তার মেশিন দিয়ে বাতাস দুষিত করছে।’ জর্ডনের চেহারায় অস্বস্তির ভাব ফুটে উঠল। কিন্তু বৃদ্ধ মানুষটি মৃদু হেসে এক হাত তুলে ভদ্রতাসূচক ইঙ্গিত করল। তবে এই যাত্রায় আমি আমার এক বন্ধুর খাতিরে তাকে স্বাগত জানাচ্ছি।’
