তিনি যে কষ্টসহিষ্ণু ছিলেন সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। দৃঢ় ও পাকানো দড়ির মতো শক্ত আর প্রবল ইচ্ছাশক্তির অধিকারী একজন মানুষ। যিনি তার নিয়তি এবং সকল বাধা বিপত্তি জয় করার ক্ষমতায় বিশ্বাস করতেন। তারপরও শুধু এগুলোই কি যথেষ্ট ছিল? নিশ্চয়ই আরো কিছু একটা কারণ ছিল। এমন কিছু যার কারণে কেবল পায়ে হেঁটে তিনি এই মরুভূমি অতিক্রম করতে পেরেছিলেন, যেখানে যে কোন যুক্তিতে তার মৃত্যু অবধারিত ছিল। তাহলে কি একজন নারী তার জন্য তার দেশে অপেক্ষা করেছিল?
এটি এমন একটি প্রশ্ন, যার কোন উত্তর পাওয়া যাবে না। সে একটু থেমে আবার অবস্থান পরীক্ষা করল। প্রায় পাঁচটা বেজেছে, সে মাটিতে বসে অন্যদের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।
ক্ষয়িষ্ণু চাঁদের আলোয় রুথ কানিংহামের চেহারা মলিন আর মুখ ঝুলে পড়েছে মনে হল। তার স্বামীকে বেশ উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে। সে যত্ন করে তার স্ত্রীকে কেইনের পাশে মাটিতে বসালো। জামাল একটা ন্যাপস্যাক খুলে খেজুর আর সিদ্ধ ভাত বের করে সবার হাতে হাতে দিল।
রুথ কানিংহাম হাতের ইশারায় তার খাবারের অংশ সরিয়ে দিতে চেষ্টা করল। কিন্তু কেইন সেটা জামালের হাতে থেকে নিয়ে তার সামনে ধরল। ‘আপনাকে শক্তি সঞ্চয় করতে হবে।’
রুথ ম্লান হেসে সামান্য সিদ্ধ ভাত মুখে দিল। কানিংহাম বলল, ‘আমরা কতদূর এসেছি বলে মনে হয়?
কেইন কাঁধে ঝাঁকি দিল। “বিশ থেকে পঁচিশ মাইল হবে। সমতল ভূমিতে আমরা ভাল দূরত্ব অতিক্রম করতে পেরেছি।’
কানিংহাম উপরে বিশাল আকাশের দিকে চেয়ে বলল। ফর্সা হয়ে আসছে মনে হয়।
‘এক ঘণ্টার মধ্যেই ভোর হবে,’ কেইন বলল। সূর্য ওঠার আগে আমরা আর সম্ভবত এক ঘণ্টা সময় পাবো তারপরই প্রচণ্ড রোদে সত্যিকার কষ্ট শুরু হবে।’
‘আর তারপর কী হবে?
কেইন কাধ ঝাঁকাল। সেটা সময় এলে দেখা যাবে।’
সে উঠে সামনের দিকে হাঁটা শুরু করল। একটা বালিয়াড়ির মাথায় উঠে পেছন ফিরে দেখল ওরা বেশ জোরে হেঁটে তার কাছাকাছি থেকে তাকে অনুসরণ করছে।
দিগন্তের কিনারায় সূর্য উদয় হওয়ার আগে ওরা আর সাত কি আট মাইল অতিক্রম করতে পেরেছে। শরীর থেকে রাতের ঠাণ্ডা দূর করে একটা রক্তলাল চাকতির মতো সূর্য ওদেরকে উষ্ণতায় ভরিয়ে দিল।
কেইন হাটার গতি বাড়িয়ে দিল। তার চোখ দিগন্ত রেখার দিকে, সূর্য উঠছে দেখে সে নিরাশ হয়ে পড়ল। প্রথমবারের মতো এবার তার মনে হলো কোন লাভ নেই, ওরা যা করার চেষ্টা করছে তা সম্পন্ন করা অসম্ভব। দুপুর পর্যন্ত যদি ওরা হাঁটতে পারে সেটা একটা অলৌকিক ঘটনা হবে।
সূর্য একটা কমলা রঙের অগ্নিগোলক। এর রশ্মি তাদের মাথার খুলি ভেদ করে পোড়াতে লাগল। সে কেফায়ার একপ্রান্ত টেনে মুখ ঢেকে ফেলল, শুধু চোখ খোলা রেখে। মৃদু বাতাসে মাটি থেকে ধুলো উড়ছিল।
ফুসফুসে টেনে নেবার মতো কোন বাতাস নেই। কেবল আগুনের মতো সূর্যের গরম হলকা গায়ের চামড়ায় হেঁকা দিচ্ছে। ঠোঁট ফেটে একাকার আর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।
পানির বোতলটার কথা মনে করতেই তার আঙুল চলে গেল বোতলের গায়ে। পা টেনে টেনে ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে বোতলটার দিকে তাকাল, কল্পনা করতে লাগল বোতলের ভেতরের পানির শীতলতা, এর আদ্রতা, তার জ্বলতে থাকা গলার মধ্য দিয়ে পানি টপটপ করে গড়িয়ে সারা দেহে ছড়িয়ে পড়ছে। সে বোতলটা ঠেলে পিঠের দিকে সরিয়ে দিল, যাতে আর চোখে না পড়ে। তারপর একটা বিরাট বালিয়াড়ির খাড়া গা বেয়ে ধীরে ধীরে উঠতে শুরু করল।
উপরে পৌঁছার পর এই প্রথম সে টের পেল তার সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছে। দেহের প্রত্যেকটা লোমকুপ থেকে ঘাম বের হয়ে বেঁচে থাকার জন্য শরীরের প্রয়োজনীয় সমস্ত পানি শুষে নিচ্ছে।
সে চোখের উপর হাত দিয়ে আড়াল করে সামনে তাকাল আর হঠাৎ চোখে পড়ল দূরে সূর্যের আলো পড়ে লাল রঙের কিছু একটা ঝিকমিক করে উঠল। ওটা সেই র্যাপিড প্লেনের ধ্বংসাবশেষ, যেটা চার দিন আগে সে আর রুথ চালিয়ে নিয়ে আসার সময় এখানে ক্র্যাশ করেছিল।
হঠাৎ তার মনে আশা জেগে উঠল। প্লেনটার মধ্যে পানি ভর্তি একটা জেরিক্যান ছিল। এই কয়দিনের প্রচণ্ড গরমের পরও আশা করা যায় যে কিছু পানি হয়তো এখনো অবশিষ্ট আছে।
তারপর হঠাৎ মনে পড়ল অনেকক্ষণ হলো সে তার সঙ্গীদের কোন খোঁজ খবর নেয় নি। ঘাড় ফিরিয়ে দেখল বালিয়াড়ির নিচে জামাল তার বিশাল হাতে রুথ কানিংহামকে কোলে করে নিয়েছে। কানিংহাম বালিয়াড়ির খাড়া গা বেয়ে উঠতে আপ্রাণ চেষ্টা করছে। ফোলা মুখে তার চোখ জ্বরে আক্রান্ত রোগীর মতো জ্বলছিল।
সে কেইনের কয়েক ফুট কাছে এসে মাটিতে হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল। আর ধীরে ধীরে এক হাত দিয়ে মুখ মুছলো। তারপর অতিকষ্টে সোজা হয়ে দাঁড়াল। কথা বলতেই মনে হলো অনেক দূর থেকে বলছে, আমাদের একটু বিশ্রাম নিতে হবে।’
কেইন ফাটা ঠোঁট ভেজাবার চেষ্টা করে বলল, “আমাদের চলতেই হবে।’
কানিংহাম একগুয়েভাবে মাথা নেড়ে চলল। বিশ্রাম নিতে হবে।’
সে টলতে টলতে সামনে এক পা এগোতেই হাঁটু ভেঙে পড়ল। কেইন তাকে ধরতেই নরম বালুর মধ্যে তার পা ফসকে গেল। ওরা দুজনেই বালিয়াড়ির খাড়া গা বেয়ে নিচের দিকে গড়াতে গড়াতে এক রাশ বালু ছড়িয়ে মাটিতে পড়ল।
