কানিংহাম ক্যাম্পের বাইরে বসে ছিল। রাতের ঠাণ্ডা এড়াতে সে বেদুঈন আলখাল্লাটা তার পোশাকের উপর পরেছিল। ওদেরকে ফিরতে দেখে সে উঠে দাঁড়াল। তার স্ত্রীও তাবু থেকে বের হয়ে ওদের কাছে এল।
‘কপাল খারাপ,’ কেইন বলল। এতক্ষণে উটগুলো হয়তো কয়েক মাইল দূরে চলে গেছে। আর আমাদের পানির শেষ মশকটাও ওদের সাথে চলে গেছে।’
কানিংহাম এক হাতে তার স্ত্রীর কাধ জড়িয়ে ধরে বলল, ‘এখন কী হবে?
কেইন কাঁধ ঝাঁকাল। আর কোন উপায় নেই–চলুন আমরা হাঁটতে শুরু করি।’
‘কিন্তু সবচেয়ে কাছে পানি পাওয়া যাবে শাবওয়াতে আর সেটা অন্তত চল্লিশ মাইল দূরে, কানিংহাম বলল। এটা অসম্ভব, বিশেষ করে রুথের পক্ষে।’
কেইন ট্রাকের কাছে গিয়ে ভেতরে ঝুঁকে কেবিন থেকে কম্পাসটা খুলে ফেলল। যখন ঘুরল তখন তার মুখ কঠোর দেখাল। এ বিষয়ে কোন যদি বা কিন্তু নেই। আমরা হাঁটবো আর এখনই হাঁটা শুরু করতে হবে। ভাগ্য ভাল থাকলে ভোর হবার আগে আমরা বিশ থেকে পঁচিশ মাইল হেঁটে পার হতে পারব। আর যদি তা না পারি তবে আমরা শেষ হয়ে যায়।
কানিংহামের কাঁধ ঝুলে পড়ল। সে তার স্ত্রীর দিকে ফিরল। তোমাকে এ অবস্থায় আনার জন্য আমি দায়ী। এর জন্য আমি দুঃখিত।
রুথ আলতোভাবে তার মুখ ছুঁয়ে মৃদু হাসল। এ জায়গা ছাড়া আমি আর অন্য কোথাও থাকতে চাই না।’
ওরা দুজনে পরস্পরের চোখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, যেন আশেপাশে আর কেউ নেই কেবল ওরা দুজন ছাড়া। কেইন তাড়াতাড়ি ঘুরে জামালের সাথে কথা বলতে গেল।
১৬. প্রচুর খাবার পাওয়া গেল
১৬.
ক্যাম্পটা তন্ন তন্ন করে খুঁজে প্রচুর খাবার পাওয়া গেল, তবে পানির এলুমিনিয়াম বোতল পাওয়া গেল মাত্র একটা। মধ্য রাতে যখন ওরা যাত্রা শুরু করল তখন কেইন বোতলটা এক কাঁধে ঝুলিয়ে নিল।
পানিটা চারভাগে ভাগ করলে এর কোন মূল্য নেই। আর কোন পথও নেই, তবে সে সিদ্ধান্ত নিল একেবারে শেষ মুহূর্তে বোতলটা ব্যবহার করবে।
সে বার বার কম্পাস দেখে দিক নির্ণয় করে দ্রুত পদক্ষেপে হেঁটে দলটাকে এগিয়ে নিয়ে চলল। কনকনে ঠাণ্ডায় সে বেশ সতেজ হয়ে দেহে পূর্ণ শক্তি পেল। অবশ্য ভাগ্যের কী পরিহাস, আর ছয় ঘণ্টা পরই মাথার উপর সূর্যের প্রখর রৌদ্রের তেজে ওরা ঝলসাবে। তারপর আর কতক্ষণ ওরা চলতে পারবে সেটা একটা ভাবনার বিষয়।
একমাত্র মহিলাটিকে নিয়ে সমস্যা হতে পারে। কেইন আবার থেমে কম্পাসটা পরীক্ষা করল, তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল। জামাল ওর কাছেই পিছু পিছু আসছে, আর কানিংহাম তার স্ত্রীকে নিয়ে ত্রিশ গজ পেছনে রয়েছে।
কেইন আবার সামনে চলতে শুরু করল, চেষ্টা করল বালিয়াড়ির মাঝের সহজ পথ দিয়ে চলতে। তবে কোন কোন জায়গায় এটা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল, সেক্ষেত্রে তাকে কিছু কিছু বালুর পাহাড়ের খাড়া দিক বেয়ে পার হতে হচ্ছিল। প্রতিটা পদক্ষেপ কষ্ট করে এগোতে হচ্ছিল।
প্রায় দুই ঘণ্টা পর ওরা বালিয়াড়িগুলো থেকে বের হয়ে এল, এরপর বিশাল এক সমতলভূমির উপর দিয়ে যেতে থাকল। শক্ত পোড়া মাটি আর নুড়ি পাথরে ছাওয়া সমতল ভূমিটা সামনে অনেক দূর পর্যন্ত চলে গেছে। কম্পাস দেখে সঠিক অবস্থান আর দিক নির্ণয় করার জন্য কেইন আবার থামল, জামাল পেছন থেকে এগিয়ে এসে ওর কাঁধে একটা টোকা দিল। কেইন ঘুরে তাকাতেই জামাল পেছন দিকে দেখাল।
কানিংহাম আর তার স্ত্রী প্রায় দুশো গজ পেছনে পড়ে রয়েছে। কেইন বালুতে বসে পড়ে ওদের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। ওরা কাছে এসে পৌঁছাতেই কেইন ওদের জন্য উঠে দাঁড়াল। রুথ কানিংহাম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বালুতে বসে পড়ল। আমার মনে হচ্ছে যেন বিশ মাইল হেঁটেছি।’
‘আমরা বড়জোর আট কী নয় মাইল হেঁটেছি,’ কেইন তাকে জানাল। সূর্য মাথার উপর পুরোপুরি তেজ ছড়াবার আগে আমাদের অন্তত পঁচিশ মাইল পেরোতে হবে, আর নয়তো কোন আশা নেই।
‘এটা আপনার জন্য ঠিক আছে, কানিংহাম বলল। কিন্তু রুথ তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না। আপনি খুব দ্রুত হাঁটছেন।
রুথ সাথে সাথে ওর স্বামীর হাত ছুঁলো। গ্যাভিন কেবল সোজা কথাটা বলছে, জন। আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না, আমি ঠিক থাকব।’
‘আমি জানি এটা খুবই কষ্টকর, কেইন বলল। কিন্তু এটা পারতেই হবে আমাদের।’
কানিংহাম উঠে দাঁড়াল, ‘তাহলে আর দেরি করছি কেন?
প্রায় তিন ঘণ্টা লাগল ওদের পোড়া-মাটির প্রান্তরটা পেরোতে। তবে শক্ত মাটির উপর ওরা বেশ দ্রুত চলতে পেরেছিল। রুথ কানিংহাম আগের চেয়ে দ্রুত চলছিল। ওরা সবাই কাছাকাছি থেকে পোড়া মাটির প্রান্তরের অপর দিকের বালিয়াড়িতে এসে পৌঁছাল।
কেইন মোটেই ক্লান্ত হয় নি। বছরের পর বছর ধরে পরিশ্রমী জীবন যাপনের কারণে শক্তিশালী লম্বা লম্বা পা ফেলে সে অনায়াসেই হেঁটে চলল। তার চিন্তা বর্তমানে ছিল না, সে ভাবছিল সকালের কথা, কি হবে তখন। জোর করে মন থেকে এসব চিন্তা হটিয়ে দিয়ে সে অন্য কিছু ভাবার চেষ্টা করতে লাগল।
ঠিক তখনই তার মনে পড়ল আলেক্সিয়া এর আগে এই পথ দিয়েই গিয়েছিলেন আর তার কাছে কোন কম্পাস ছিল না। সে আবার সেই পাণ্ডুলিপিটা আরেকবার মনে মনে পড়তে শুরু করল। সেই প্রথমবার পড়ার পর লোকটির যে পরিষ্কার ছবি তার মনে ভেসে উঠেছিল তা আবার স্মরণ করার চেষ্টা করল।
