কোন কিছুই দেখা যাচ্ছে না। সে একটু থামল, আধো–অন্ধকার ভেদ করে দেখার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো। তারপর ঘুরতেই জামালের সাথে ধাক্কা খেল। সে আর জামাল শক্ত করে হাত ধরে আবার বালিয়াড়ির এই পাশ দিয়ে উপরে উঠার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। উপরে দাঁড়িয়ে থাকা অসম্ভব ছিল, অন্য পাশ দিয়ে ওরা গড়িয়ে গড়িয়ে নেমে তাঁবুর কাছে হুমড়ি খেয়ে পড়ল।
তাঁবুর গোড়ার চারপাশে ইতোমধ্যে বালু জমে গেছে। পর্দা সরিয়ে কেইন তাঁবুর ভেতরে ঢুকতেই রুথ কানিংহাম তার দিকে ভয়ার্ত চোখে তাকাল। আর কতক্ষণ চলবে এরকম?’ সে জানতে চাইল।
কেইন মাথা থেকে কেফায়াটা খুলে নিরুদ্বেগ ভাব দেখাবার চেষ্টা করে বলল। এক কি দুইঘণ্টা। হয়তো আরো বেশিক্ষণ। শেষের দিকে বাতাস বালুগুলো উড়িয়ে নিয়ে যায়। এখানে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।’
জামাল খুব সাবধানে তাবুর প্রবেশমুখের ফিতাগুলো শক্ত করে বেঁধে ওর উপর বসল। কানিংহাম এক হাত তার স্ত্রীর কাঁধের উপর দিয়ে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখল। আপনি এখন কেমন আছেন? কেইন তাকে জিজ্ঞেস করল।
যখন সে কথা বলল, তার কণ্ঠস্বর অস্বাভাবিক আর ক্লান্ত শোনালো। ‘আমি আশা করিনি যে আবার আপনাদের দেখা পাবো। গতরাতের সংঘষের পর স্কিরোজ আমাদের জানিয়েছিল আপনারা পাহাড়ের নিচে চাপা পড়েছেন।
কেইন বলল ‘পুরো ঘটনাটা আপনি খুলে বলুন,’। আজ সারাদিন কি কি ঘটেছে আর কেনইবা ওরা দুই দলে আলাদা হলো।
রুথ এক গুচ্ছ চুল এক হাতে সামনে থেকে পেছনে ঠেলে দিল। পুরো বিষয়টা ভয়াবহ বলা চলে। আমরা সকালে দুটো ট্রাকে করে গিরিখাত থেকে বের হই। সামনের ট্রাকে ছিল স্কিরোজ, মুলার আর মেরি; সেলিম তার লোকজন আর আমি ছিলাম অন্যটাতে।’
‘তুমি সেলিমের সাথে ছিলে কেন?’ তার স্বামী জিজ্ঞেস করল।
তার মুখ লাল হলো। সে একটু উত্তেজিত হলো। স্কিরোজ তার সাথে একধরনের চুক্তিতে এসেছিল। দাহরান পৌঁছাবার পর তার সেলিমের সহযোগিতার প্রয়োজন ছিল। অবশ্য আমি জানি না সেটা কি, তবে তার জন্য মূল্য হিসেবে সেলিম আমাকে চেয়েছিল।
একটু খানি নিরবতা নেমে এল। কানিংহাম এক হাত তার স্ত্রীর কাঁধে রাখতেই কেইন আবার বলল, কিন্তু ওরা দু’দল আলাদা কেন হলো?
সে কাঁধ ঝাঁকাল। ট্রাকটার ইঞ্জিনে সমস্যা দেখা দিয়েছিল। এটা সারাবার জন্য সেলিম এখানে থামল আর স্কিরোজ আর মুলার মেরিকে নিয়ে এগিয়ে গেল। ওদের মধ্যে কথা হয়েছিল বার আল-মাদানির কাছে হাজার নামে একটা জায়গায় ওরা আমাদের জন্য অপেক্ষা করবে।
‘সেলিমের জন্য ওদের অনেক দিন অপেক্ষা করতে হবে, কানিংহাম বলল।
রুথ তার দুহাত কোলে রেখে নার্ভাস হয়ে বার বার মোচড়াচ্ছিল। সে বার বার আমাকে শোনাচ্ছিল রাতে ক্যাম্প করার পর আমার সাথে কি কি করবে। এমন জঘন্য ছিল লোকটা।’
কানিংহাম তাকে কাছে টেনে নিজেই সে তার বুকে মাথা রেখে কাঁদতে শুরু করল। কান্নার দমকের সাথে সাথে তার পুরো দেহ ভিষণভাবে কাঁপতে শুরু করল।
বাইরে বাতাসের গর্জন শোনা যাচ্ছে। ঝড়ো বাতাস বালু উড়িয়ে নিয়ে প্রচণ্ডভাবে পলকা তাবুর গায়ে অনবরত আছড়াচ্ছিল। কেইন দু’হাটুর মাঝে মাথা গুজলো। অর্ধেক খোলা মুখে গভীর ভাবে নিঃশ্বাস নিতে নিতে ক্লান্ত পেশিগুলো শিথিল করল।
চারদিক ক্রমশ সম্পূর্ণ অন্ধকার হয়ে গেল। আর বাতাসের বেগ এমন প্রচণ্ডভাবে বেড়ে গেল যে, জামাল আর তাকে তাবুর দুইপাশে দুটো খুঁটি শক্ত করে ধরে রাখতে হলো যাতে প্রবল বাতাসের তোড়ে তাবুটা ছিঁড়ে উড়ে না যায়।
চার ঘণ্টা পর যে রকম হঠাৎ ঝড়টা এসেছিল সে রকমই হঠাৎ চলে গেল। কেইন তাবুর পর্দার ফিতার জোড়গুলো খুলে হামাগুড়ি দিয়ে বাইরে বের হলো। রাতের আকাশ পরিষ্কার আর কোটি কোটি তারা মোমবাতির মতো আকাশে জ্বলছে। পূর্ণিমার উজ্জ্বল আলোয় গর্তটার সব জায়গা আলোকিত হয়ে উঠেছে।
তাবুর দুদিক বালুর ওজনে বসে গিয়েছিল আর ট্রাকটা বালুতে অর্ধেক ডেবে গিয়েছিল। কানিংহামও তাঁবুর নিচ দিয়ে বের হয়ে এল। এখন আমরা কী করব?
‘দেখি উটগুলোকে খুঁজে পাওয়া যায় কী না,’ কেইন বলল। আমি জামালকে সাথে নিয়ে যাচ্ছি।’
‘আপনাকে খুব একটা আশাবাদী মনে হচ্ছে না, কানিংহাম বলল।
‘ঝড়টা খুব খারাপ ছিল। আমরা ওদের পা বেঁধে রেখেছিলাম, কিন্তু একটা ভীত উটের আশ্চর্যরকম শক্তি আছে। কোন কারণে আতঙ্কিত হলে এরা লাথি মেরে বাঁধন মুক্ত হতে পারে।
সে জামালকে ডেকে নিয়ে ক্যাম্পের উল্টোদিকে বালিয়াড়ির খাড়া বেয়ে উঠতে শুরু করল। উপর থেকে চারদিকের দৃশ্যটা চমৎকার দেখাচ্ছিল। একের পর এক বালিয়াড়ি গড়িয়ে চলেছে দিগন্ত রেখা পর্যন্ত। এগুলোর মাঝখানের গর্তগুলো দেখতে অন্ধকার আর ভীতিপ্রদ মনে হচ্ছিল। তবে সাদা চাঁদের আলোয় মাটির উঁচু জায়গাগুলো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল।
ওরা বালিয়াড়ির অন্য পাশ দিয়ে নেমে যেখানে উটগুলো বেঁধে রেখেছিল। সেদিকে এগোল। ধুলিঝড়ে সমস্ত চিহ্ন মুছে গেছে, কেইনের মন ভেঙে গেল। সে থেমে কয়েকবার শিস দিল, রাতের শীতল বাতাসে শিসের শব্দটা তীক্ষ্ণ শোনালো। কিন্তু উত্তরে কোন চিৎকার শোনা গেল না।
দুজন আলাদা হয়ে, কেইন গেল একদিকে আর জামাল গেল অন্য দিকে। কিন্তু কোন লাভ হলো না। এক ঘণ্টা পর উট ছাড়াই ওরা ক্যাম্পে ফিরে এল।
