তার বলা শেষ হওয়ার পর কানিংহাম উঠে বসল, তারপর ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। প্ল্যানটা ভালই। অন্তত একটা সুযোগ নেওয়া যায়।
সে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করতেই কেইন তার শার্টের হাতা টেনে ধরল। ‘এটা আমি সামলাবো। আপনার অবস্থা দেখে খুব একটা ভাল মনে হচ্ছে না।’
চোয়াল শক্ত করে সে মাথা নাড়ল। সে আমার স্ত্রী, শুধু এ কথাটাই বলল, কাজেই এটা আমার কাজ।
কেইন তার সাথে আর তর্ক করার চেষ্টা করল না। কানিংহাম সাব মেশিনগানটি একবার পরীক্ষা করে আলখাল্লার নিচে লুকিয়ে এক হাতে ধরে রাখল। একবার মৃদু হেসে মাথার কাপড়টা পেছনের দিকে ঠেলে সরিয়ে বালিয়াড়ির চূড়ার উপর উঠে দাঁড়াল।
প্রথমে তারা ওকে দেখতে পায়নি, তারপর সে মুখ খুলে কর্কশ ও ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল, ‘পানি! পানি, ঈশ্বরের দোহাই আমাকে পানি দিন! সে ইচ্ছে করে হাতড়ে হাতড়ে এক পা এগোলো, তারপর হুড়মুড় করে বালুর উপর মাথা নিচু করে পড়ে গেল। গড়াতে গড়াতে নিচে শূন্য গর্ভের দিকে পড়তে লাগল।
প্রথম চিৎকারটা শুনেই সেলিম আর তার সঙ্গীরা বিপদাশঙ্কা করে সাথে সাথে রাইফেল হাতে নিয়ে প্রস্তুত হলো। কানিংহাম গড়াতে গড়াতে বালিয়াড়ির নিচে এসে থামতেই কেইন সাবধানে সামনে এগিয়ে বালিয়াড়ির চূড়ার কিনারা দিয়ে নিচে উঁকি দিল। কানিংহাম কিছুক্ষণ মাটিতে পড়ে থাকল, তারপর খুব কষ্ট করে পায়ের উপর ভর দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে আবার সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। পানি!’ সে গুঙিয়ে উঠল, তারপর মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে গেল।
রুথ কানিংহাম লাফিয়ে উঠল। চোখে অবিশ্বাস নিয়ে একটা মুহূর্ত সে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল, তারপর সামনে এগোতে শুরু করল। সেলিম তার কাঁধ ধরে তাকে টেনে তাঁবুর দিকে নিয়ে ঠেলে ভেতরে ঢুকিয়ে দিল। তারপর ঘুরে তাকাল।
কানিংহাম এক হাঁটুর উপর ভর দিয়ে কাতর প্রার্থনার ভঙ্গীতে তার দিকে এক হাত বাড়াতেই সেলিম হেসে উঠল। সে তার সঙ্গীর উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে কিছু একটা বলে রাইফেলটা মাটিতে রেখে সামনে এগোল।
এবার কানিংহাম উঠে দাঁড়িয়ে সাব-মেশিনগানটা বের করতেই সেলিম ঘুরে দৌড়াতে শুরু করল। সাব-মেশিনগানের লম্বা একটানা গুলির সবগুলো তার পিঠে গিয়ে পড়ল। পিঠ ঝাঁঝরা হয়ে গেল।
অন্য লোকটি তখনও রাইফেল হাতে ট্রাকটার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। সে রাইফেল উঠিয়ে লক্ষহীন ভাবে একটা শট ফায়ার করল। কানিংহাম তার দিকে ঘুরল, এক লাইনে গুলি বালু উড়িয়ে নিয়ে লোকটিকে পেছনের দিকে ঠেলে ট্রাকটার গায়ে ছুঁড়ে ফেলল।
তারপর সে গুলি করা থামাল। হেঁটে সামনের দিকে এগিয়ে মাটিতে পড়ে থাকা সেলিমের উপরে এসে দাঁড়াল। তখনই তাঁবুর পর্দা সরিয়ে রুথ বেরিয়ে এসে কানিংহামের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
কেইন বালিয়াড়ির চূড়ায় উঠে দাঁড়িয়ে ওদের দিকে তাকাল। বাতাসের ঝটকায় বালুকণা উড়িয়ে নিয়ে এসে ওর মুখে ঝাপটা মারল। সে টিলাটা বেয়ে নিচে নেমে পড়ল, জামালও তার সাথে সর সর করে ঢাল বেয়ে নামল।
কানিংহাম তার স্ত্রীকে শক্ত করে ধরে রাখল। আকস্মিক ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় সে কাঁপতে শুরু করল। সব ঠিক হয়ে গেছে, সে বলল। সে আর তোমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না।
সেলিম মারা গেছে, তার আঙুলগুলো বালু আঁকড়ে ধরে রয়েছে। কেইন তার দিকে তাকাল, তার মনে কোন অনুকম্পা জাগলো না। অন্য লোকটা ভয়ানকভাবে গোঙাচ্ছিল। জামাল তার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে লোকটার মাথা তুলল। কেইন এগোতেই লোকটার শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মুখ থেকে রক্ত বের হতে লাগল। মাথা পেছনের দিকে হেলে পড়ল আর জামাল আস্তে করে তাকে মাটিতে শোয়াল।
কেইন জিজ্ঞেস করল, ‘লোকটা কি মরে গেছে?
জামাল মাথা নেড়ে সায় দিল, তারপর ট্রাকের দিকে আঙুল উঁচিয়ে দেখাল। ট্রাকের এক পাশের বডিতে পরিষ্কার এক লাইন বেঁধে বুলেটের ছিদ্র দেখা গেল। গাড়ির গায়ে ব্রাকেটে আটকানো পানির জেরি ক্যানগুলো সব খালি হয়ে গেছে। তারপর কেইন ইঞ্জিন পরীক্ষা করে দেখল এটা আর সারানো যাবে না।
সে কানিংহাম আর তার স্ত্রীর দিকে ফিরে তাকাল। শেষের গুলিগুলো ট্রাকের গায়েও লেগেছে। এখন একমাত্র উটের উপর ভরসা করেই আমাদের এখান থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। আপনার কী অবস্থা?
কানিংহামের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে রয়েছে। তারপরও সে মৃদু হাসল। ‘যেহেতু রুথ এখন নিরাপদ, কাজেই আমি আগের চেয়ে ভাল আছি।’
বাতাসের গতি বেড়ে যাচ্ছিল। শূন্যগর্ভের মাঝে বালু উড়িয়ে নিয়ে ট্রাকটির চতুর্দিকে শোঁ শোঁ শব্দ করে ঘুরছিল। কেইন সাব-মেশিনগানটা কাঁধে ঝুলিয়ে তাড়াতাড়ি বলল, মনে হচ্ছে আমরা খারাপ আবহওয়ার মধ্যে পড়তে যাচ্ছি। আপনারা দুজনে তাঁবুর ভেতরে ঢুকে পড়ুন, আমি জামালকে নিয়ে উঁটগুলোকে নিয়ে আসছি।’
সে আরবিতে জামালকে সংক্ষিপ্তভাবে বিষয়টা বুঝিয়ে বলল। তারপর ওরা দ্রুত পেছনের দিকে গিয়ে বালিয়াড়ির উপরে উঠতে শুরু করল। উপরে পৌঁছার পর বাতাস প্রচণ্ড বেগে বইতে শুরু করল। একটা বালুর পর্দা এসে সব কিছু মুছে ফেলল।
কেইন তার কেফায়ার কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে বালিয়াড়ির অন্যপাশ দিয়ে নামতে শুরু করল। ওদের পায়ের দাগ ইতোমধ্যেই মুছে গেছে আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ওরা একা হয়ে গেল। ঘুর্ণিবায়ুর মতো একটা ঘন বালুর মেঘ ওদেরকে ঢেকে ফেলল।
