মেয়েদেরকে নিয়ে কি করবে সেটা ভাবনার বিষয়। আগের রাতে তাবুর বাইরে থেকে যে আলোচনা শুনেছিল সে কথাগুলো স্মরণ করল। স্কিরোজ কি বলেছিল? সে মেরি পেরেটকে একটা ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে।
কথাটা ভাবতেই কেইন শিউরে উঠল। সেই সাথে এ চিন্তাটা মন থেকে ঠেলে সরালো। এখন তাকে বার আল-মাদানিতে পৌঁছার বিষয়ে পূর্ণ মনোযোগ দিতে হবে। সে আরো আরাম করে গদিতে বসে উটটিকে তাড়া দিল।
.
স্বপ্নের মতো সকালটা পেরিয়ে গেল, তারপর যেন একটা বিশাল জাহাজে চড়ে বালুর উপর ভাসতে ভাসতেই দুপুর গড়ালো। বেশ কয়েকবার ওদেরকে নিচে নেমে বড় বড় বালিয়াড়ির খাড়া দিক দিয়ে উটগুলোকে টেনে নিতে হয়েছিল। একবার থেমে শুকনো খেজুর আর পানি খেলো।
কানিংহামকে দেখে পরিশ্রান্ত মনে হচ্ছিল। তার দুচোখে ক্ষত আর চারপাশ লাল হয়ে উঠেছে। পাতলা, সংবেদনশীল মুখ বালুতে মাখামাখি হয়ে রয়েছে। কেইন অত্যন্ত কটু আর বিস্বাদ পানি একটু খানি গিলে সামান্য মুখ বিকৃত করল। তারপর কানিংহামের দিকে উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে তাকাল। আপনি ঠিক আছেন তো?’
কানিংহাম ঠোঁট সামান্য ফাঁক করে একটু হাসল। একটু ক্লান্ত বোধ করছি। তবে ঠিক হয়ে যাবে। ভুলে যাবেন না এই পথ দিয়েই আমি উল্টো দিকে গিয়েছিলাম।’
ওরা আবার উটের পিঠে চড়ে চলতে শুরু করল। সূর্য এখন ঠিক মাথার উপর। প্রচণ্ড তাপ আগুনের চাবুক দিয়ে যেন ওদের পিঠ চাবকাচ্ছে। কেইনের মাথা ঝুঁকে রয়েছে ওর বুকের কাছে, ওর উটটি নিজের ইচ্ছে মতো পথ চলছে। সে ক্লান্ত–খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। গত তিন চার দিনে অনেক কিছু ঘটে গেছে। একজন মানুষের পক্ষে যা অত্যন্ত বেশি।
সে ধারণা করল বিকেলের বাকি সময়টা সে উটের পিঠে অজ্ঞান অবস্থায় ছিল, কেননা হঠাৎ অনুভব করল সূর্য পশ্চিম দিগন্তে ডুবে যাচ্ছে আর মৃদু বাতাস তার মুখে হুল ফোঁটাচ্ছে। জামাল তার উটের লাগাম হাতে নিয়ে পাশে পাশে চলছিল।
কেইন উটের পিঠ থেকে নেমে মাটিতে বসে পড়ল। এপাশ ওপাশ মাথা আঁকিয়ে জেগে উঠতে চেষ্টা করতে লাগল। তার মুখ শুকনো হয়ে রয়েছে আর মুখ ভর্তি বালু। কানিংহাম তার পাশে এসে ঢলে পড়তেই জামাল একটা ছাগলের চামড়ার পানির মশক নিয়ে ওদের হাতে দিল।
ওরা দুজনে দু’বার করে পানি খেতেই মশকটা খালি হয়ে গেল। জামাল খালি মশকটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে তার উটের কাছে গিয়ে দূরে তাকিয়ে রইল।
কানিংহামের মুখ বসে পড়েছে। মুখের চামড়া চিবুকের হাড়ের উপর টাইট হয়ে লেগে রয়েছে। সে একজন বুড়ো মানুষের মতো কর্কশ গলায় বলে উঠল, ‘এখন আমরা কী করব–রাতেও কী চলবো?”
কেইন সায় দিল। “উটগুলো এখনও ভাল অবস্থায় আছে। ওদের আগেই আমরা পানির অভাব অনুভব করব। রাতের ঠাণ্ডায় আমাদের চলতে সুবিধা হবে।
‘আর স্কিরোজ কী করবে?
কেইন বলল, সেটা আরেক বিষয়। সেও হয়তো শীঘ্রই ক্যাম্প করবে।’
তারপর সে অনেক কষ্ট করে দুপায়ে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল। বাতাসে বালু উডে এসে তার মুখে পড়ছে। এমন সময় জামাল ওর দিকে দ্রুত ছুটে এল চোখ বড় বড় করে।
সে ওর এক কানে হাত গোল করে ধরল, অর্থাৎ বোঝাতে চেষ্টা করল কিছু শুনতে। কেইন শুনলো। দূর থেকে বাতাসে ভেসে আসছে মানুষের অস্পষ্ট কণ্ঠস্বর।
তার মাঝে উত্তেজনা জেগে উঠতেই সমস্ত ক্লান্তি তার কাঁধের উপর থেকে একটা পুরোনো আলখাল্লার মতো ঝরে পড়লো। আপনি শুনতে পেয়েছেন? সে কানিংহামকে জিজ্ঞেস করল।
কানিংহাম মাথা নাড়ল। কিছু একটা ঘটেছে, সেজন্য ওরা আগেভাগেই ক্যাম্প করেছে।’
‘কারণটা যাই হোক, ওদের জন্য একটা চমক অপেক্ষা করছে, কেইন বলল।
ওরা উটগুলোকে বেঁধে রেখে সাবধানে পায়ে হেঁটে সামনে এগোতে লাগল। গাড়ির চাকার দাগ একটা বড় বালিয়াড়ির গোড়া ঘিরে ঘুরে গেছে কেইন এক মুহূর্ত ইতস্তত করল, তারপর বালিয়াড়ির খাড়া দিক দিয়ে উঠতে শুরু করল। নরম বালুতে হাঁটু পর্যন্ত ওদের পা ডুবে যেতে লাগল।
চূড়ার শেষ কয়েক ফুট সে পেটে ভর দিয়ে বেয়ে উঠল তারপর সাবধানে মাথা তুলল। সত্তর কি আশি ফুট নিচে একটা শূন্য গর্ভে একটা তাঁবু খাটানো রয়েছে। তাবুর পাশে হুড উঠানো অবস্থায় একটা ট্রাক রয়েছে। একজন আরব ইঞ্জিনের মধ্যে কিছু মেরামতি কাজ করছে।
কানিংহাম যখন উপরে উঠে এলো, তখন দেখা গেল তাবুর পর্দা সরিয়ে রুথ কানিংহাম বের হলো। সেলিম তাকে পেছন থেকে ঠেলছে। মনে হলো রুথ সমস্ত আশা হারিয়ে পা টেনে টেনে সামনে একটা জ্বলন্ত স্পিরিট স্টোভের দিকে এগোচ্ছে। সে একটা পাত্র নিয়ে স্টোভের উপর বসালো। সেলিম তার কাছে দাঁড়িয়ে হাসছে।
কানিংহাম উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করতেই কেইন তাকে টেনে বালিয়াড়ির চূড়ার প্রান্তের নিচে বসালো। বোকামি করবেন না। সেলিমকে আঘাত করতে গেলে রুথ আহত হতে পারে। আর যদি আপনি হেঁটে যাওয়ার চেষ্টা করেন, তবে অর্ধেক পথ যাওয়ার আগেই সে রাইফেল তাক করবে রুথের দিকে।
‘কিন্তু কিছু একটা তো করতে হবে, কানিংহাম মরিয়া হয়ে বলল। ‘অন্ধকার হওয়া পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করতে পারব না।’
কেইন চোখ সরু করে একটা সমাধানের পথ খুঁজতে লাগল। তারপর হঠাৎ একটা উত্তেজনায় তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। আমার মনে হয়ে একটা উপায় পেয়েছি, তারপর সে দ্রুত প্ল্যানটা খুলে বলল।
