‘আমি যা করতে বলছি তা করলে তোমার কোন ক্ষতি হবে না, কেইন আরবিতে বলল।
লোকটি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। আমি অতো বোকা নাই।
কেইন প্রথমে যা ভেবেছিল, তার থেকে লোকটি বেশি বয়স্ক। চমৎকার বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা, মুখ ভর্তি বলিরেখা আর কাঁচাপাকা দাড়ি। বাকি তিন সঙ্গী ডোবার পানি ঠেলে তার কাছে উঠে এল। জামাল আর কানিংহামও ওদের পেছনে এসে দাঁড়াল।
‘বাকি লোকজন কোথায়? কেইন জিজ্ঞেস করল।
‘সবাই মনে করেছিল তোমরা মরে গেছো,’ বৃদ্ধ লোকটি বলল।
‘সাহেব দুটো আর তাদের লোকজন ভোরের আলো ফোঁটার আগেই ট্রাকে করে চলে গেছে। এরপর ইয়েমনিরা ভোরবেলায় চলে যায়।
‘তোমরা রয়ে গেলে কেন?
‘আমরা রশিদ,’ বৃদ্ধ সহজভাবে বলল। আমরা আমাদের আত্মীয়কে ছেড়ে চলে যেতে পারি না। আমার জ্ঞাতি ভাই একটা তাঁবুতে শুয়ে আছে। গত রাতে তোমার বন্দুকের গুলি তার কাঁধে লেগেছিল। ঐ সাহেবদের একজন চলে যাওয়ার আগে গুলিটা বের করে দেয়।
‘আর মেয়েরা?’
বৃদ্ধ কাঁধে একটা ঝাঁকি দিল। ওরাও ট্রাকে আছে।
কেইন কানিংহামের দিকে তাকাল। আপনি বুঝতে পেরেছেন সব কথা?
সে ঘাড় কাত করল। এখন আমরা কি করব?
‘একমাত্র যে কাজটি আমরা করতে পারি, তা হলো ওদের পেছনে যাওয়া।’ কেইন বৃদ্ধ রশিদ গোত্রের লোকটির দিকে ঘুরল। তোমাকে আমাদের সাহায্য করতে হবে।
অন্য তিন সঙ্গী বিড় বিড় করে বিরক্তি প্রকাশ করল। আর বৃদ্ধ এক হাত উঠিয়ে ওদের থামাল। কেন সাহায্য করব আমরা? তোমরা আমাদের শত্রু।’
কারণ, এছাড়া তোমাদের আর কোন উপায় নেই, সাব-মেশিনগানটা উঁচু করে কেইন বলল। আমাদের খাওয়াদাওয়া শেষ হবার পর তোমার সবচেয়ে ভাল তিনটা উট বেছে দেবে। জেনে রাখ এই সোমালি লোকটি কিন্তু এ ব্যাপারে একজন ওস্তাদ।’
বৃদ্ধ রশিদ বলে উঠল, ‘আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন। তার তিন সঙ্গী পা ভাঁজ করে গোমরামুখে বসে রইল। আর বৃদ্ধ দুটো টিনের মগে কফি ঢেলে বিনয়ের সাথে কেইন আর কানিংহামকে দিল।
কেইন কৃতজ্ঞতার সাথে একটু কফি পান করল। কানিংহাম বলল, কিন্তু ওদেরকে ধরার তো কোন আশা নেই।’
কেইন সায় দিল। আমি জানি, তবে যদি আমরা অল্প সময়ের মধ্যে বার আল-মাদানিতে পৌঁছে জর্ডনের কাছ থেকে একটা ট্রাক নিতে পারি, তাহলে ওদের আগেই দাহরান পৌঁছার একটা আশা আছে।’
‘মাই গড, আমার মনে হয় আপনি ঠিক বলছেন, কানিংহাম ব্যগ্র হয়ে বলল। আমার যখনই রুথের কথা মনে পড়ে…’ তার গলা থেমে গেল। সে তাড়াতাড়ি এক ঢোক কফি খেল।
কেইন দৃঢ়বিশ্বাস নিয়ে বলতে চেষ্টা করল। আপনি কোন চিন্তা করবেন না। স্কিরোজ খুব তাড়াতাড়ি দাহরান ছেড়ে যাবে না। তাড়াহুড়া করার তো কারণ নেই তার।
কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে খুব একটা নিশ্চিত ছিল না। স্কিরোজ নিশ্চয়ই খুব দুঃশ্চিন্তায় আছে। এছাড়া তার হঠাৎ করে চলে যাবার আর কী কারণ থাকতে পারে? হয়তো সে বুঝতে পেরেছে তার সুদিন শেষ হয়ে এসেছে। আর তাই একজন ভালো জুয়ারির মতো খেলায় এগিয়ে থাকতে থাকতে সে উঠে যাচ্ছে।
কেইন চোখ কুঁচকে নীল আকাশের দিকে তাকাল। দেখলো একটা বাজ পাখি বিরাট একটা বৃত্ত ঘুরে ঘুরে নিচের দিকে নামার আগের প্রস্তুতি নিচ্ছে। জীবনে কী হতে পারে তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না। এই দেশ যদি কিছু তাকে শিখিয়ে থাকে, সেটা এই।
.
১৫.
জামাল সবচেয়ে ভালো তিনটা উট বেছে নিল। তারপর ঘণ্টাখানেক পর ওরা রওয়ানা হলো। কেইন আর কানিংহাম বেদুঈনদের ঢিলাঢালা আলখাল্লা আর মাথায় আরবি স্টাইলে কাপড় জড়িয়ে নিল। জামাল পানি ভর্তি দুটো ছাগলের চামড়ার মশক নিয়ে তার উটের পিঠের গদির দুপাশে ঝুলিয়ে নিল। বৃদ্ধ রশিদ আর তার সঙ্গী বেদুঈনরা অনিচ্ছাসত্ত্বেও এগুলো দিতে বাধ্য হলো।
কেইন একটা মদ্দা উটের পিঠে সওয়ার হয়েছিল। বিশাল, শক্তিশালী কালো উটটা অসম্ভব দ্রুত গতিতে গিরিখাতের বাইরের সমতল ভূমির উপর দিয়ে ছুটতে শুরু করল।
ক্যাটালিনা প্লেনটার টুকরো টুকরো দোমরানো মোড়ানো ধাতব অংশ আর ফিউজলেজটা বিরাট জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। আগুনে পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া ধ্বংসাবশেষ পার হওয়ার সময় কেইন অবাক হয়ে তাকাল। তার বিশ্বাসই হচ্ছিল না কত সহজে ওরা এটা ধ্বংস করেছিল।
সমতল ভূমি পার হয়ে বালিয়াড়ির মাঝে ঢুকতেই প্রচণ্ড দাবদাহ থেকে মুখ বাঁচাবার জন্য সে মাথার কাপড়ের একটা ভাজ তুলে মুখ ঢাকলো।
বিশাল বিশাল বালুর ঢেউ নিয়ে যতদূর চোখ যায় মরুভূমি গড়িয়ে চলেছে সামনে। সে উটের পিঠে কাঠের গদিতে আরো আরাম করে বসে উটটিকে চালিয়ে নিতে লাগল। গতিই একমাত্র জিনিস যা এখন তাদের সাহায্য করতে পারে। সেটা আর এই সত্যটা যে স্কিরোজ হয়তো আশা করবে না যে ওরা তার পিছু নেবে।
পেছন ফিরে দেখল জামাল কাছেই আছে আর তার পিছনে কানিংহাম অনুসরণ করছে। তাকে দেখে কানিংহাম হাত তুলে স্যালুট করল। কেইন মুখ ফিরিয়ে সামনের পদচিহ্নের দিকে মনোনিবেশ করল।
লম্বা লম্বা পা ফেলে চলার পথে উটটি একবারও হোঁচট খায়নি। বিশাল পা দিয়ে অক্লান্ত ভাবে মরুভূমি পার হয়ে চলেছে। কড়া রোদের তাপে কেইন চোখ অর্ধেক বন্ধ করে ধীরে ধীরে আধো ঘুম আধো জাগ্রত এমন একটা অবস্থায় চলে গেল।
সে ভাবছিল স্কিরোজের পরবর্তী পদক্ষেপ কি হতে পারে। সম্ভবত সে দাহরানের দিকে যেতে চেষ্টা করবে, কেননা সে নিশ্চিত ধরে নিয়েছে তাকে অনুসরণ করার মতো আর কেউ নেই। আমেরিকান কনসাল কোন ধরনের খোঁজ খবর নেওয়ার আগেই সেখানে কয়েকদিন থেকে সব কিছু গুছিয়ে নেবে, তারপর সেখান থেকে চলে যাবে।
