কেইন বলার মতো কিছু ভেবে পেল না। সে জামালের দিকে তাকিয়ে ঘাড় কাত করে দেয়ালের কাছে গেল। জামাল যন্ত্রপাতিগুলো হাতে হাতে দিতেই ওরা কাজ শুরু করে দিল।
আধ ঘণ্টা লাগল প্রথম পাথরটা তুলতে, জামালের প্রচণ্ড শক্তি খুব কাজে দিল। শেষ কয়েক ইঞ্চি পানির চাপ পাথরটার গায়ে জোর ঠেলা দিল, বোতলের ছিপিতে যে রকম হয়। তারপর পানি ছিটকে বেরিয়ে ফেনা তুলে ফাঁকের মধ্য দিয়ে নিচে অন্ধকারে প্রবল বেগে পড়তে লাগল।
একটা ফাঁক তৈরি করার পর বাকি কাজটা বেশ সহজ হয়ে পড়ল। জামাল এগিয়ে গেল, পানি তার পিঠ বেয়ে নেমে চলেছে, সে পরের পাথরটা দুহাতে টেনে সরালো।
এক মিনিটের মধ্যে পানি হাঁটু পর্যন্ত নেমে এলো। কেইন কানিংহামের দিকে তাকিয়ে তাড়াতাড়ি বলল। একবার যখন পথটা আমরা ভেঙেছি, কাজেই একটু পরেই পুরোটা ভেঙে পড়বে। চলুন কোন ক্ষতি হওয়ার আগেই তাড়াতাড়ি আমরা অন্য পাশে চলে যাই।
ওরা দেয়াল বেয়ে উপরে উঠে নরম শিলাস্তর আর বালুর উপরে এসে দাঁড়াল। বছরের পর বছর ধরে দেয়াল আর গুহার কোণে বালুর স্তর জমা হয়েছিল। ধীরে ধীরে জলাধারের পানির স্তর নেমে যেতে লাগল।
এখন নদীর পানি ফাঁক থেকে বের হয়ে নতুন পথ খুঁজে পেয়ে সেখান দিয়ে বের হয়ে যেতে লাগল। এই ধাক্কায় দেয়ালটা কাঁপতে শুরু করল। প্রায় আধ ঘণ্টা পর এটি মাঝখানে ধ্বসে পড়ল, তারপর পানি জলপ্রপাতের মতো ফাঁক দিয়ে বাইরের দিকে চলতে লাগল।
ইতোমধ্যে টানেলের উপরিভাগ দষ্টিগোচর হলো আর দশ মিনিটের মধ্যে পানি দুই ফুটে নেমে এল। জামাল ল্যাম্পটা নিয়ে মাথা নিচু করে টানেলে ঢুকে পড়ল। আর কেইন সাব-মেশিনগানটা কাঁধে ঝুলিয়ে তাকে অনুসরণ করল।
সামনে অন্ধকারে ঢুকতেই পানি তার হাঁটুর চারপাশে ঘুরতে শুরু করল। তার মনে পড়ল সেই লোকগুলোর কথা যারা বহু বছর আগে মাটির নিচে এই অন্ধকারে বছরের পর বছর ধৈর্য ধরে কাজ করে চলেছিল এই আশায় যেন তাদের রানি মৃত্যুর পর একটি নিরাপদ বিশ্রামের জায়গা পায়।
নদীটা হঠাৎ একটি চওড়া লেকে এসে পড়ল। কেইন আবার সাঁতার কাটতে লাগল। জামাল আলো উঁচু করে ধরতেই দূর প্রান্তে কতগুলো কারুকাজ করা স্তম্ভ আর একটা নৌকার ঘাট দেখা গেল।
জামাল প্রথমে সেখানে পৌঁছে সহজেই উপরে উঠে পড়ল যদিও লেকের পানি কয়েক ফুট নেমে গেছে। তারপর সে নিচু হয়ে একের পর এক কেইন আর কানিংহামকে উপরে তুলল।
কেইন ল্যাম্পটা নিয়ে স্তম্ভগুলোর মধ্য দিয়ে সামনে এগোলো। তারপর একটা চওড়া প্যাসেজে ঢুকল। প্যাসেজটা একটু উপরের দিকে উঠে গেছে। কয়েক মুহূর্ত পর ল্যাম্পের আলো গিয়ে পড়ল একটা খালি দেয়ালে।
কেইন হাঁটু গেড়ে বসে দেয়ালটা নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করল। দেখে মনে হচ্ছে এই মাঝখানের ব্লকটাই ঘুরবে।’ সে কানিংহামকে বলল।
সে দ্রুত আরবিতে জামালকে কিছু বলল আর জামাল হাঁটু গেড়ে বসে সর্বশক্তি দিয়ে ঐ পাথরটা ঠেলতে শুরু করল। পাথরটা একচুলও নড়লো না। জামাল ঘোৎ করে একবার শব্দ করে উঠল, তার পিঠ বাকা হলো আর পেশিগুলো দড়ির মতো ফুলে উঠল। তারপরও পাথরটা তখনো নড়ছে না।
কেইন হাঁটু গেড়ে বসে কাঁধ দিয়ে ঠেলতে শুরু করল। আর কানিংহাম অন্য দিকে দিয়ে কাঁধ দিল। একটা মুহূর্ত মনে হলো ওরা পৃথিবীর সমস্ত শক্তির সামনে দাঁড়িয়েছে। যেন কোন এক অলৌকিক শক্তি বলে তারা দৃঢ় সংকল্পিত হয়েছে যে এখান থেকে সরবে না। তারপর একটা গোঙানি দিয়ে পাথরটা ঘুরল।
কেইন উঠে দাঁড়াল তারপর চারপাশে তাকাল। ওরা এখন মন্দিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে আর এই পাথরটা সেই উঁচু বেদির তলায় বসানো ছিল।
ওরা পাথরটা আবার আগের জায়গায় ঠেলে বসিয়ে বাইরে বের হয়ে এলো। বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াতেই ভোরের সূর্যের আলো তাদের চোখে পড়ল। ওদের সামনে গিরিপথটা স্থির আর শান্ত হয়ে আছে। কানিংহাম কুঁচকালো। ‘খুব বেশি নিরব মনে হচ্ছে।
বেশিরভাগ বেদুঈনই গতকাল বিকেলে তাদের কাফেলা নিয়ে চলে গেছে, কেইন বলল। বাদবাকি যারা ছিল তারা হয়তো আজ ভোরেই রওয়ানা দিয়েছে।’
সে সাবধানে যদূর সম্ভব আড়ালে থেকে তাঁবুগুলো যেখানে ছিল সেদিকে ওদের এগিয়ে নিয়ে চলল। গর্তটার কিনারার কাছে পৌঁছে সে পেটের উপর ভর দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে বাকি পথটা গেল।
অস্থায়ী ক্যাম্পটা আর নেই। তবু, ট্রাক–কিছুই নেই। এক মুহূর্ত সেখানে শুয়ে ভ্রু কুঁচকে সে ভাবলো। তারপর জামাল তার কাঁধে টোকা দিয়ে আঙুল নির্দেশ করে মরুদ্যানের বাইরে একটা জায়গা দেখাল–সকালের বাতাসে হালকা ধোঁয়া উড়ছে।
সাব-মেশিনগানটা কাঁধ থেকে নামিয়ে কেইন ওদেরকে পেছনে নিয়ে আগে আগে গর্তে নামল। গাছগুলোর কাছে আসতেই একটা উট কেশে উঠল আর তার সাথে হাসির শব্দ শোনা গেল।
মরুদ্যানের অপর ধারে দুটি বেদুঈন তাঁবু তখনো দাঁড়িয়ে আছে, কাছেই অন্তত এক ডজন উটের দু’পা বেঁধে রাখা হয়েছে। একজন লোক আগুনের সামনে আসন পেতে বসে কিছু রান্না করছে। আর বাকি তিনজন ডোবার হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে গা ধুচ্ছে।
কেইন কানিংহামের দিকে ফিরে চুপিচুপি বলল, আপনি তাঁবুর পেছন দিক দিয়ে আসুন। জামাল ডেরাটার অন্য পাশ থেকে আর আমি এখান থেকে এগোবো।’
বাকি দুজন জায়গামতো পজিশন না নেওয়া পর্যন্ত সে অপেক্ষা করল। তারপর একটা গাছের আড়াল থেকে বের হয়ে সে ধীরে ধীরে সামনে এগোলো। আগুনের একগজ দূরত্বে এসে সে থামল। বেদুঈন লোকটি হাঁড়িতে কিছু একটা নাড়ছিল। সে হেসে উঠে ডোবার পানিতে থাকা লোকগুলিকে ডাকার জন্য মুখ তুলতেই সামনে কেইনকে দেখতে পেল। তার হাসি থেমে গেল।
