‘সম্ভবত তেল, মশলা কিংবা এ জাতীয় কিছু একটা ছিল–এত বছরে এটা উবে গেছে।
কানিংহাম আরেকটা বয়াম নিয়ে দেখল সেটাও খালি। কেইন ঘুরতে যাবে, এমন সময় তার চোখে পড়ল একটা ছোট বয়াম কুলুঙ্গির পেছনে একটা ছোট তাকের উপর দাঁড় করানো রয়েছে। উপরে মাটির সীলমোহর করা।
সে ল্যাম্পটা মাটিতে রেখে অন্য হাত দিয়ে বয়ামটা তুলে আনল। এক পা পিছুতেই পাত্রটা তার আঙুল ফসকে পাথরের মেঝেতে পড়ে ভেঙে খান খান হয়ে গেল।
সে ল্যাম্পটা তুলে মেঝের কাছে আলো ফেলে দেখল ভাঙ্গা মাটির টুকরোগুলোর মাঝে সোনার মতো কিছু একটা চক চক করছে আর এক ঝলক সবুজ আগুনের মতো দেখা গেল।
সে হাঁটু গেড়ে বসে সাবধানে জিনিসটা তুলে ধরল। চমৎকার একটা সোনার নেকলেস আর একটা পেনডেন্ট।
সোনার নেকলেসের মধ্যে অত্যন্ত যত্ন সহকারে তিনটে নিখুঁত পান্না সেট করা হয়েছে। পাথরগুলো ল্যাম্পের আলোয় চমকাচ্ছিল।
কানিংহাম মৃদু শিস দিয়ে উঠল। এটার জন্য ব্রিটিশ মিউজিয়াম যে কোন মূল্য দিতে পারে।’
কেইন রুমাল বের করে নেকলেসটা এর মধ্যে রেখে রুমালের চার কোণে গিঁট দিয়ে পকেটে রাখল।
আবার ল্যাম্পটা তুলে নিল। আমার মনে হয় সামনে আরো আছে। অনেক বেশি আছে।’
সে দ্রুত এগোতে লাগল। তারপর কয়েক ধাপ সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে একটা ব্রোঞ্জের তৈরি দরজার সামনে এলো। এখানে পানি উরু পর্যন্ত উঠেছে। কানিংহাম পানি ঠেলে সামনে এগিয়ে দরজা বন্ধ করে রাখার ডান্ডাটা উপরে তুলল, তারপর সে আর জামাল দুজনে মিলে ভারী দরজাটা ধীরে ধীরে সামনের দিকে ঠেলে খুলল।
দরজার সুইং পিনগুলো কঠিন পাথরে ড্রিল করে ছিদ্রে আটকানো ছিল আর দরজাটা অতি সহজেই কোন ধরনের চেষ্টা ছাড়াই সামান্য ক্যাচ ক্যাচ শব্দ করে খুলে গেল।
একটা মুহূর্ত কেইন সেখানে দাঁড়িয়ে রইল, তার মনের মধ্য দিয়ে এক ধরনের কালো ঢেউ বয়ে গেল, যেন ওরা সাংঘাতিক কোন কিছুর সামনে এসেছে। কিন্তু কানিংহাম অধৈর্য হয়ে তাকে সামনে ঠেলে দিল।
.
১৪.
ওরা একটার বড় চেম্বারে প্রবেশ করল। ভেতরে পানির গভীরতা প্রায় তিন ফুট। এছাড়া কামরাটা সম্পূর্ণ খালি, তবে দেয়ালগুলো পেইনটিংয়ে পরিপূর্ণ। কেইন ধীরে ধীরে আলোটা ঘুরিয়ে পেইনটিংগুলো পরীক্ষা করতে লাগল। তারপর কিছু একটা যেন লাফিয়ে উঠে প্রচণ্ড শক্তিতে তাকে ধাক্কা মারল।
একটি দৃশ্যে দেখা যাচ্ছে একজন রাজা কয়েক ধাপ সিঁড়ির উপরে একটি সিংহাসনের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তার গলায় ঝুলে রয়েছে স্টার অফ ডেভিড়। তিনি দুহাত বাড়িয়ে স্বাগতম করছেন একজন নারীকে, যিনি তার দিকে এগিয়ে আসছেন। তার পোশাকের দীর্ঘ ঝুল বহন করছে বারোজন কুমারী।
এক মুহূর্ত মনে হলো এই নারী অন্ধকার থেকে ভেসে উঠেছেন কিন্তু সেটা আসলে আলোর একটা কারসাজি। যেন অনেক দূর থেকে রাজার দিকে তাকিয়ে আছেন তার সৌন্দর্য নিয়ে। তার সৌন্দর্য চিরন্তন। আর রাজাও তার দিকে চেয়ে রয়েছেন। পেইনটিংয়ের উপরে সাবেঈন ভাষায় কিছু লিপি উৎকীর্ণ করা রয়েছে। কেইন ধীরে ধীরে এর অর্থোদ্ধার করতে লাগল। যখন পুরো লিপির মর্মোদ্ধার শেষ হলো তখন মনে হলো যেন দেয়ালটা দুলছে, আর অজানা একটা নিঃশব্দের ফিসফিসানি কামরার মাঝে ঢেউ খেলে বেড়াচ্ছে। যেন সময়ের অন্য প্রান্ত থেকে সেই নারীর কণ্ঠ তাকে ডাকছে।
সে এক হাত সামনে বাড়িয়ে মাথা ঠেকালো ঠাণ্ডা পাথরের দেয়ালের গায়ে। কানিংহাম বলল, “এখানে কী বলছে?
কেইন সোজা হলো। এখানে সোলায়মান বাদশাহ বিলকিসকে স্বাগতম জানাচ্ছেন।”
কানিংহাম এক পাশে হেলে পড়তেই, জামাল দ্রুত এগিয়ে এসে তাকে ধরল। ল্যাম্পের আলোয় দেখা গেল ইংরেজ লোকটির মুখ সাদা হয়ে ঝুলে পড়েছে, আর চোখ বড় বড় হয়ে গেছে।
বিলকিস, সে ফিস ফিস করে বলল, ‘শেবার রানি।’
জামালের হাত ছাড়িয়ে সে সামনে এগোল তারপর আঙ্গুলের ডগা দিয়ে আঁকা চিত্রটি অত্যন্ত যত্ন সহকারে স্পর্শ করল। যখন সে মুখ খুলল তখন তার কণ্ঠে বিস্ময়। বাইবেলের একটি কাহিনীকে আমরা জীবন দিয়েছি।
কেইন পানি ঠেলে কামরার অন্য প্রান্তে হেঁটে গেল। ল্যাম্পের আলোয় সেখানে আরেকটা প্রবেশ পথ দেখা গেল, এর চারপাশে বাঁকা পিলার। দরজার বদলে এখানে পাথর সাজানো রয়েছে।
কানিংহাম তার পাশে এসে দাঁড়াল। আপনি কি মনে করেন? তার কণ্ঠস্বর অস্বাভাবিক আর অন্যরকম মনে হচ্ছে।
‘আমি বলেছিলাম এখানে প্রচণ্ড রকম মিশরীয় প্রভাব রয়েছে, কেইন তাকে বলল। অপর পাশে একটা পাথরের সমাধি কক্ষ অবশ্যই থাকার কথা।
কানিংহামের কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিল। সে একটা ঢোক গিলে বলল, ‘আপনার কি তাই মনে হয় এটা সেখানে আছে?
‘এসব বিষয়ে যে কোন কিছু সম্ভবপর’ কেইন বলল। এটা আমি যেমন জানি আপনিও তেমন জানেন।’
কানিংহাম মাথা নাড়ল, তারপর ঘুরে দেয়ালের পেইনটিংগুলোর দিকে তাকাল। তাদের চলাফেরার কারণে পানিতে যে ঢেউ সৃষ্টি হয়েছিল তা আছড়ে পড়ছিল দেয়ালের গায়ে। তার দাঁতের মাঝ দিয়ে হিশশ শব্দ করে নিঃশ্বাস বেড়িয়ে এল।
সে কেইনের হাত থেকে ল্যাম্পটা নিয়ে সামনে চলতে শুরু করল। পানি তার চারপাশে বুদবুদ সৃষ্টি করছে। সে সোলায়মান আর বিলিকিসের পেইনটিংয়ের নিচে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
সে ককিয়ে উঠল। পানি পেইনটিংটা নষ্ট করছে, কেইন। কিছু অংশ ইতোমধ্যেই নষ্ট হয়ে গেছে।’
