দীর্ঘকাল ধরে এটা এখানে রয়েছে মনে হচ্ছে,’ কানিংহাম বলল।
কেইন মাথা নেড়ে সায় দিল। কিন্তু কি কাজের জন্য এটা এখানে রয়েছে সেটাই প্রশ্ন।
সে জামালের কাছ থেকে স্পট ল্যাম্পটা নিয়ে উপরে উঠল। দেয়ালটা প্রায় দশ ফুট উঁচু আর এর অসংখ্য ফাটল থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় পানি ঝরে পড়ছে। তারপর দেয়ালটা বাঁকা হয়ে নিচের দিকে চলে গেছে। অন্ধকারে পানি পড়ার শব্দ প্রতিধ্বনি তুলছে।
‘এটা নিশ্চয়ই মূল নদীপথ ছিল, কেইন বলল। দেয়ালটা এখানে তৈরি করা হয়েছে এর গতিপথ বদলাবার জন্য।’
সে ল্যাম্পটা হাতে নিয়ে নিচের গভীর খাড়ির কালো পানির দিকে আলোটা ফেলল। এর অর্থ হলো এই পানি বের হওয়ার জন্য ওরা একটা কৃত্রিম বহির্গমন পথ তৈরি করেছে।
‘কিন্তু কেন?’ কানিংহাম বলল।
ঈশ্বর জানেন? কারণটা এখন গুরুত্বপূর্ণ নয়। এ জায়গা থেকে বের হবার পথ বের করাটাই আসল কাজ। কেইন তার সাব-মেশিনগানটা দেয়ালের উপর রেখে ল্যাম্পটা কানিংহামের হাতে দিল। আপনি আমাকে যতদূর সম্ভব আলো দেখান। আমি নিচে গিয়ে একবার দেখে আসি।’
সে পানিতে নামল, তারপর লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে পানির নিচে গেল। জলাধারটা প্রায় দশ ফুট গভীর আর উপর থেকে ল্যাম্পের আলো পানির মধ্য দিয়ে তাকে সাথে সাথে দেখতে সহায়তা করল যা সে দেখতে চেয়েছিল। এটা একটা নিচু খিলানযুক্ত প্রায় চার ফুট উঁচু টানেলের প্রবেশ পথ।
সে ভেতরের দিকে এগোলো, তার আঙুল দুপাশের পিচ্ছিল ও মসৃন দেয়ালে ঘষা খেল। তারপর অন্ধকার-ঘুটঘুঁটে অন্ধকার দেখে সে আতঙ্কিত হয়ে ঘুরল। তারপর পেছন দিকে সাঁতার কেটে ল্যাম্পের হালকা আলোর দিকে ফিরে উপরে ভেসে উঠে বাতাসের জন্য হাঁসফাস করতে লাগল।
‘কী দেখলেন?’ কানিংহাম জানতে চাইল।
কেইন পানির মধ্য থেকে হেঁটে বের হয়ে দেয়ালের পাশে নরম শিলা স্তরের উপরে দাঁড়াল। ব্লাডি মার্ডার, ওখানে খুব সরু একটা টানেল রয়েছে যার মধ্য দিয়ে কোনমতে হামাগুড়ি দিয়ে যাওয়া যায়। আমি কয়েক গজ সাঁতার কেটে এগিয়ে ছিলাম, কিন্তু কোথায় গিয়ে এটা পৌঁছেছে সেটা বোঝার উপায় নেই।
সে উপরে উঠে দেয়ালের উপরে বসল। কানিংহাম নিচের ফাঁকটার দিকে ল্যাম্পটা মেলে ধরল। মনে হয় আবার আমরা একটা গ্যাড়াকলে আটকা পড়লাম, আর কোন উপায় আছে?
নিচের দিকে নামতে কোন সমস্যা নেই। পাথরের ব্লকগুলো মাঝে মাঝে ক্ষয়ে যাওয়ায় গভীর ফাটল সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে যথেষ্ট পা রাখার জায়গা হয়েছে। ফাটলগুলো দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা পানি অনবরত ঝরে চলেছে।
নিচের খাড়া ও বাঁকা হয়ে নেমে যাওয়া মেঝেটা পিচ্ছিল আর পা হড়কে যাওয়ার সম্ভাবনা সব সময় রয়েছে। কেইন সাবধানে পঞ্চাশ গজ এগোল। তারপর ছাদটা নিচু হয়ে নেমে এসেছে আর ওরা একটা নিকশ অন্ধকার পথের মুখোমুখি হলো।
এখানে পানি পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত নেমে এসেছে। কেইন ল্যাম্পটা এক পাশ থেকে অন্য পাশ পর্যন্ত ঘোরাল। মসৃণ দেয়ালে আলো পড়তেই হাজার হাজার ছোট ছোট গাইতির দাগ চোখে ভেসে উঠল।
‘নদীটা প্রথমে নিশ্চয়ই এই পথ দিয়েই গিয়েছিল, কানিংহাম মন্তব্য করল।তবে তার পর কেউ এর মধ্যে প্রচুর কাজ করেছে।
কেইন ধীরে ধীরে সামনে এগোল, তার মনে এক অদ্ভুত উত্তেজনা জেগে উঠেছে। নদীর শব্দ পেছনে মিলিয়ে গেছে,ওরা এখন একাকী দাঁড়িয়ে রয়েছে। এক অন্ধকার ও রহস্যময় জগতে।
প্যাসেজটা এঁকেবেঁকে ঘুরে ঘুরে নিচের দিকে এগিয়ে চলেছে। পানির গভীরতা ক্রমশ বেড়ে চলেছে। একটা বাঁক ঘুরতেই ওরা এক পাশে একটা শাখার সামনে এল।
কানিংহাম জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে কেইনের দিকে তাকাল। দেখি কি আছে!
প্রায় দশ ফুট আয়তনের একটা চৌকোনা কামরায় ওরা প্রবেশ করল। দেয়ালগুলো রাজমিস্ত্রির হাতে তৈরি। দুই ধারে মানুষ সমান উঁচু বিশাল বিশাল রসদ রাখার পাত্র দাঁড়িয়ে আছে নিরব প্রহরীর মতো।
‘শস্য ভান্ডার,’ কেইন বলল।
সে ঘুরতেই ল্যাম্পের আলো অপর দিকের দেয়ালে পড়তেই পরিষ্কার রঙিন আঁকা ছবি ভেসে উঠল।
পেইনটিংগুলো প্রাচীন কোন যুদ্ধ বিজয়ের দৃশ্য তুলে ধরেছে। পায়ে শিকল বাঁধা বন্দিরা সারিবদ্ধভাবে চলছে, বেশিরভাগের মুখে ছোট কোকড়ানো দাড়ি। তাদের পিঠ বাঁকা হয়ে রয়েছে মাছের লেজের আকারের বর্ম আর শিরস্ত্রাণ পড়া সৈন্যদের চাবুকের আঘাতে।
‘মাই গড, কানিংহাম বলল। এরকম কোন কিছু এর আগে আর কোথাও দেখেছেন?
‘কেবল নীল নদীর উপত্যকায় দেখেছি, কেইন জানাল তাকে। আরবে অবশ্যই নয়।
ওরা বাইরে বের হয়ে প্যাসেজে ঢুকল। তারপর আরো কয়েকটা কামরা পার হয়ে শেষ পর্যন্ত দুপাশে চওড়া পিলারওয়ালা একটা প্যাসেজে এলো। এর দেয়ালগুলো চিত্রকলায় পরিপূর্ণ।
এক জায়গায় কেইন একটা কুলুঙ্গির পাশে এসে থামল। এতে দুপাশে রং করা কয়েকটা মাটির বয়াম রাখা আছে। সে একটা তুলে পরীক্ষা করতে লাগল। কানিংহাম উত্তেজিত হয়ে কাছে এগিয়ে এল। এগুলো ভস্মাধার, তাই না?
কেইন মাথা কাত করে সায় দিল। পুরো ব্যাপারটা এবার ঠিক ঠিক মিলতে শুরু করেছে। ঐ শস্য রাখার পাত্র আর এগুলো। নিরাপদ যাত্রার জন্য ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত বস্তু। আমরা নিশ্চয়ই একটা সমাধির কাছে এসে পড়েছি।’
সে বয়ামটার গোল ঢাকনিটা তুলে ভেতরে তাকালো। ভেতরে কিছু নেই।
