সে উঠে দাঁড়াল হাত পায়ের খিল ছাড়াতে, ঠিক তখনই প্যাসেজ থেকে বয়ে আসা শীতল বাতাস তার চামড়ায় আঙুল ছুঁইয়ে গেল। সে কেঁপে উঠল।
এ বিষয়টার সঠিক অর্থ তার মনে জাগতেই সে হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে ল্যাম্পটা খুঁজতে লাগল। হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে চোখ কুঁচকে কানিংহাম বলল, “কি ব্যাপার?
টানেলের দিক থেকে ঠাণ্ডা বাতাস ভেসে আসছে,’ কেইন তাকে জানাল।
কানিংহাম ভুরু কুঁচকে বলল, ‘অসম্ভব! কোত্থেকে আসবে বাতাস?
‘একটিই উপায় আছে কেবল তা জানার, কেইন বলল।
সে জামালকে আরবিতে বিষয়টা বুঝিয়ে বলল তারপর কানিংহামের পিছু পিছু প্যাসেজ ধরে এগিয়ে চলল সেই জায়গায় যেখানে ওরা সেদিন এর আগে কাজ শেষ করেছিল। কানিংহাম খোয়া আর পাথর কুচির স্তূপের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তারপর সাথে সাথে চিৎকার করে উঠল, আপনার কথাই সঠিক কেইন, আমি আমার শরীরে হাওয়া টের পাচ্ছি।
কেইন তার পাশেই বসে পড়ল আর সাথে সাথে সেও তার উদোম বুকে বাতাসের চাপ অনুভব করল। একটা বিষয় নিশ্চিত হওয়া গেল, সে বলল। ‘মুলার ভুল করেছে। এটা আর যাই হোক, অন্তত পাথরের সমাধির প্রবেশ পথ নয়।’
‘তাহলে কোথায় গেছে এটা?’ কানিংহাম জানতে চাইল।
কেইন দাঁত বের করে হাসল। এর চেয়ে ভালো কোন গর্তে হবে–এটা নিশ্চিত।
জামাল যন্ত্রপাতিগুলো নিয়ে ফিরে এল। কেইন আর কানিংহাম খুঁড়তে শুরু করল। জায়গাটা বেশ সংকীর্ণ, কিছুক্ষণ পর জামাল ওদের দুজনকে হটিয়ে বড় একটা পাথর দুহাতে ধরে সরালো। একটা ছিদ্র দেখা গেল, যেখান দিয়ে হঠাৎ বাতাসের ঝটকা ভেসে এলো। জামাল সাবধানে আরো কয়েকটা পাথর সরিয়ে ফাঁকটা আরো একটু বড় করে উপুড় হয়ে শুয়ে হামাগুড়ি দিয়ে সামনে এগোতে লাগল। কেইন ল্যাম্পটা তুলে ধরল। তারপর ওরা লক্ষ করল জামালকে অদৃশ্য হয়ে যেতে।
একটু পরই তার মাথা উদয় হলো মুখ ভরা হাসি নিয়ে। সে ওদেরকে ইশারা করতেই কানিংহাম উপুড় হয়ে শুয়ে হামাগুড়ি দিয়ে সামনে এগোলো, কেইনও তাকে অনুসরণ করল।
পাথরের দেয়ালের অন্য পাশে প্যাসেজটা পরিষ্কার। কিন্তু এখানে ছাদ খুব নিচু হওয়ায় ওদেরকে উবু হয়ে হাঁটতে হচ্ছিল। কেইন ল্যাম্পটা সামনে এগিয়ে ধরে কানিংহামকে অনুসরণ করছিল।
ওরা টানেলটার শেষ মাথায় এসে পৌঁছাল। তারপর হামাগুড়ি দিয়ে থাক থাক করে রাখা নরম শিলাস্তরের কাছে এসে পৌঁছাল। শিলাস্তরটা খাড়া হয়ে নিচে অন্ধকারে পঞ্চাশ কিংবা ষাট ফুট নেমে গেছে একটা কালো ছলছল করা নদীর পানিতে। নদীটা গুহার মূল থেকে উঠে এসে পাথরের মাঝে সরু একটা ফাঁকের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চলেছে। কেইন ল্যাম্পটা অর্ধবৃত্তাকারে ঘোরাল। ছাদটা অন্ধকারে ঢেকে রয়েছে, তার মানে ছাদটা অ পাথরের দেয়ালগুলো কালো আর ভেজা ভেজা।
কানিংহাম হাঁটু গেড়ে বসল। আর কোন উপায় নেই, কী বলেন?’
‘অনেকটা সেরকমই, কেইন তাকে জানাল। আপনি এখানে অপেক্ষা করুন, আমি বন্দুকগুলো নিয়ে আসি।
সে ফিরে এসে দেখল জামাল আর কানিংহাম পানির কিনারায় এসে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কেইন খাড়া পার বেয়ে সাবধানে নামল। জামাল ধীরে ধীরে নদীর মাঝে পিছুতে লাগল। কানিংহাম তার দুই হাত ধরে রয়েছে।
পানি কোমর পর্যন্ত উঠে থেমে পড়েছে। কেইন দুহাত সামনে বাড়িয়ে সাবধানে এগোলো। হাতের আঙ্গুলের ডগা উল্টোদিকের দেয়াল ছুঁতেই সে মুখে চওড়া হাসি নিয়ে পেছন দিকে হেঁটে এলো। কানিংহাম উত্তেজিত হয়ে হেসে উঠল। মনে হচ্ছে ভাগ্যদেবী সদয় হতে শুরু করেছে।
‘আশা করি তাই যেন হয়, কেইন বলল।
সে সবার হাতে হাতে বন্দুকগুলো দিয়ে ল্যাম্পটা জামালের হাতে দিল। জামাল পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল আর কেইন আর কানিংহাম পানিতে নেমে তাকে অনুসরণ করতে লাগল।
কনকনে ঠাণ্ডা পানি, একটু পর পানির স্তর কেইনের বাহুমুল পর্যন্ত উঠে এলো। প্রথমে সে সাব-মেশিনগানটা মাথার উপরে উঁচু করে ধরে রেখেছিল, কিন্তু এভাবে ধরে রাখায় একটু পর হাত ব্যাথা করতেই সে বন্দুকটা কাঁধে ঝুলিয়ে নিল।
পানির স্রোতের শক্তি ক্রমশ বেড়ে উঠতে শুরু করল। কেননা যে পথ দিয়ে পানির স্রোতটা বয়ে যাচ্ছিল তা ক্রমশ সরু হয়ে এসেছে। কেইন কানিংহামের এক ফুট পেছনে ছিল আর জামালকে দেখতে পাচ্ছিল সামনে ল্যাম্পটা উঁচু করে ধরে রেখেছে।
ছাদটা মনে হলো নিচের দিকে ঢালু হয়ে নেমে এসেছে, সে বুঝতে পারল এটা মাথা থেকে দুই কি তিন ফুট উচ্চতায় রয়েছে। পানির প্রবল স্রোত তাকে উপরের দিকে উঠাতেই সে প্রাণপণে সামনের দিকে ঠেলে এগোতে লাগল। তারপর তার মনে হলো সে নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে, পানিতে তার মাথা ডুবে গেল।
পা মাটি ছুঁতেই সে নিচের দিকে লাথি দিয়ে আবার উপরে ভেসে উঠল। উজ্জ্বল আলোয় চোখ ধাধিয়ে গেল আর ঢালু হয়ে আসা নরম শিলার সাথে হাঁটুর ধাক্কা লাগল।
এক মুহূর্ত সেখানে অপেক্ষা করল, বুক যন্ত্রণায় উঠানামা করছে। একটু পর বুঝতে পারল কানিংহাম তার পাশেই শুয়ে রয়েছে। জামাল হাত বাড়িয়ে দুজনকে তুলে হাঁটু পানিতে দাঁড় করাল। কনকনে ঠাণ্ডায় ওরা কাঁপছিল।
নদীটা একটা বিশাল গোলাকার জলাধারে এসে পড়েছে। আর আপাত বহির্গমনের পথ হচ্ছে পাথরের মাঝে সরু একটা ফাঁক। পথটা পাথর সাজিয়ে বন্ধ করে রাখা হয়েছে। পানির উপরিভাগ থেকে তিন ফুট উঁচুতে এর অবস্থান।
