ভেতরে বেশ গরম আর বাতাস ভারী হয়ে আছে ধুলা ও বিস্ফোরকের তীব্র গন্ধে। এবার আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী?’ কানিংহাম বলল।
কেইন পরনের শার্ট খুলতে শুরু করল। আমার আগেই ভাবা উচিত ছিল। যে এটাই স্বাভাবিক হতে পারতো। আমাদের অনেকদূর খুঁড়ে যেতে হবে। অন্তত, যন্ত্রপাতিগুলো আছে, এটাও কম নয়।
‘আর বাইরে আমাদের বন্ধুদের কী হবে?
তাদের এখন যদুর ধারণা আমরা মৃত, কেইন বলল। ওরা সম্ভবত ভেবেছে সম্পূর্ণ পাহাড়টা আমাদের চাপা দিয়েছে।’
‘খুব একটা ভুল কথা ভাবেনি ওরা,’ কানিংহাম তাকে বলল। সে ল্যাম্পটা উপরের দিকে তুলে ছাদ আর দেয়াল পরীক্ষা করল। পুরো জায়গাটা আমার কাছে দেখতে নড়বড়ে মনে হচ্ছে।
কেইন তার হাত থেকে ল্যাম্পটা নিয়ে এমনভাবে মেঝেতে রাখল যাতে আলো সরাসরি পাথরচাপা প্রবেশ পথের দিকে পড়ে। এখন আমাদের শুধু একটা বিষয় নিয়ে দুশ্চিন্তা, সেটা হলো এই স্পট ল্যাম্পের ব্যাটারি। আপনি বরং প্রার্থনা করুন যেন অনেক বেশি সময় এটা কাজ করে।
কিন্তু দুশ্চিন্তার আরো অনেক বিষয় ছিল এবং রয়েছে। ওরা কোমর পর্যন্ত। খালি গায়ে সেই অদ্ভুত ধুলায় ভরা আলোর মাঝে পরিশ্রম করে যাচ্ছিল। ঘাম দর দর করে ওদের নগ্ন দেহ থেকে ঝরে পড়ছে।
জামাল এমন এক ব্যক্তি যার উপর নির্ভয়ে নির্ভর করা যায়। সে তার বিশাল হাত দিয়ে যে পাথরগুলো অবলীলায় তুলতে পারছিল সেগুলো কেইন আর কানিংহাম দুজনে মিলেও নড়াতে পারেনি। কাজ করতে করতে সময় সম্পর্কে ধারণা ওরা ভুলে গেছে। আঙুল কেটে ছড়ে গিয়েছে। শেষ পর্যন্ত জামাল আজব এক ধরনের জান্তব গোঙানি দিয়ে পেছন ফিরে তাকাল। সে কেইনের একটু সামনে কাজ করছিল।
কী ব্যাপার? কেইন আরবিতে জানতে চাইল।
জামাল ঘুরল, তার চোখের সাদা অংশ বাতির আলোয় জ্বলজ্বল করছে। সে আঙুল দিয়ে দেখাল আর কেইন হামাগুড়ি দিয়ে সামনে পাথর সরিয়ে সদ্য তৈরি করা সরু পথটা দিয়ে এগোল।
স্পট ল্যাম্পের আলোয় দেখা গেল তিন কিংবা চার টন ওজনের একটা বিশাল পাথরের স্লাব সামনের পথ জুড়ে রয়েছে। স্ল্যাবটা বিভিন্ন আকৃতির পাথরের সাথে শক্তভাবে আটকানো।
কানিংহাম তার কাঁধের উপর দিয়ে ঝুঁকে দেখল তারপর মৃদু শিস দিল। ‘মাই গড। ঐ জিনিসটা সরাবার কোন আশাই নেই।’
সে সত্য কথাই বলেছে, এর কোন উত্তরও নেই। ধীরে ধীরে পিছু হটে ওরা প্যাসেজের প্রবেশ পথের কাছেই দেয়ালে হেলান দিয়ে ধপ করে বসে পড়ল।
কেইন একটা মুহূর্ত ল্যাম্পের আলোর দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর সামনে ঝুঁকে ল্যাম্পের সুইচ অফ করে দিল। ব্যাটারি খরচ করার কোন মানে হয় না।
কানিংহাম হালকাভাবে হেসে উঠল, কেইন বুঝতে পারল সে প্রায় ভেঙে পড়েছে। ভীষণ গরম এখানে, একটা সিগারেট খেলে ভালো হতো।
কেউ কোন শব্দ উচ্চারণ করেনি, তারপরও এটা ওদের মাঝে একটা তরবারির মতো ঝুলে রয়েছে। অকথিত, অস্বীকার্য সত্যটি–যে ওরা একদম শেষ হয়ে গেছে। আর কোন আশা নেই।
অন্ধকার একটা ওজনহীন চাপের মতো ওদের উপর চেপে বসেছে। কিছু একটা ওজনহীন ঢেউয়ের মতো এর মধ্য দিয়ে নড়ছে আর গুহার দেয়ালে ফিসফিসানি প্রতিধ্বনিতু হচ্ছে। যেন কেউ দীর্ঘশ্বাস ফেলছে আর শব্দগুলো একটা পুকুরে ছোট ছোট ঢেউয়ের মতো অন্তহীন ভেসে চলেছে।
কেইন শিউড়ে উঠল। অশুভ চিন্তাটা সে মন থেকে ঠেলে সরিয়ে দিল। এত তাড়াতাতি হাল ছেড়ে দেওয়া মোটেই কাজের কথা নয়। এখন তার মনকে সচল রাখতে হবে। এই অন্ধকার বাক্সের কথা ছাড়া তাকে অন্য কোন বিষয় নিয়ে ভাবতে হবে।
সে পেছনের জীবনের কথা স্মরণ করতে শুরু করল, চিন্তাকে পেছনের দিকে ভাসিয়ে দিল। জীবনের প্রতিটা মাইলস্টোন, ভাল মন্দ সব কিছু নিয়ে। পরীক্ষা করতে লাগল।
এর আগে কেবল একবার সে এরকম নৈরাশ্যজনক অবস্থায় পড়েছিল-আর্মি এয়ার কোরে সেকেন্ড পাইলট হিসেবে প্রশান্ত মহাসাগর এলাকার গুয়ামে ডিসি-৩ চালাবার সময়। যাত্রীসহ দশজন মানুষ আর একটা মাত্র লাইফ র্যাফট নিয়ে ওরা প্রশান্ত মহাসাগরে পড়ে গিয়েছিল। ঘণ্টা খানেকের মধ্যে অনেকগুলো শার্ক চারপাশে ঘুর ঘুর করতে শুরু করেছিল। তৃতীয় দিনে ওরা তিনজনে এসে দাঁড়ায়, সপ্তম দিনে কেবল দুজন রইল। আর ঠিক যখনই ভাবছিল সে মরতে চলেছে তখনই আকাশে গুঞ্জন শোনা গেল। সে উপরে তাকিয়ে দেখল একটা ক্যাটালিনা প্লেন পানিতে ল্যান্ড করতে যাচ্ছে। তার জীবনে দুবার ক্যাটালিনা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। একটি তার জীবন বাঁচিয়েছে আর একটি সে ধ্বংস করেছে।
তারপর বাড়ি ফেরা। তার মনে পড়ল সেই প্রথম দিনটির কথা, লা গার্ডিয়া এয়ারপোর্টে পৌঁছে আবার নিউইয়র্ক দেখা। কিন্তু বাড়ি কোথায়? সেন্ট্রাল পার্কের দিকে মুখ করা এপার্টমেন্টটা? নাকি কানেকটিকাটে তার বাবার খামার? এর কোনটাই তার বাড়ি নয়। আসলে এর কোন অস্তিত্ব ছিল না, এটা ছিল তার মনে। সে অনেকদিন ধরে খুঁজে বেড়াচ্ছিল এটা, কোন দিন পায় নি, এখনও খুঁজে বেড়াচ্ছে।
অন্ধকারে মেরির মুখটা তার সামনে একটা প্রদীপ শিখার মতো ভেসে উঠল। সে মৃদ হাসল। অন্তত একটা ভালো জিনিস এর মধ্য থেকে বের হয়ে এসেছে। সে এখন বুঝতে পেরেছে মেরি তার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ জীবনের অন্য সব কিছু থেকে গুরুত্বপূর্ণ। তার ভাবনা কেইনের মনে উষ্ণতা আর আনন্দ জাগিয়ে তুলল। অনেকটা তার ঠোঁটে যে চুম্বন সে এঁকে দিয়েছিল সেরকম। তবে এসব কথা সে আর তাকে জানাতে পারবে না।
