গিরিখাতের মধ্যে প্রবেশ করার সময় একটা উঁচু ঢিবি পার হতে গিয়ে ট্রাকটা হঠাৎ শূন্যে লাফিয়ে উঠল। কেইন একপাশে কাত হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। তাল সামলাতে না পেরে সাব মেশিন গানটা তার হাত থেকে ছুটে মাটিতে পড়ে গেল আর সে নরম বালুতে পড়ে গড়াতে লাগল।
ত্রিশ চল্লিশ গজ এগিয়ে ট্রাকটা ব্রেক করে থামতেই ওদের উপর ভারী গোলাবর্ষণ শুরু হলো। কেইন দেখল কয়েকজন বেদুঈন এক জায়গায় পড়ে থাকা কিছু বোল্ডারের পেছন থেকে উদয় হলো।
ট্রাকের গায়ে গুলির ধুপ ধুপ শব্দ শুনতে পেয়ে সে কোনমতে উঠে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠলকানিংহাম, এখান থেকে বেরিয়ে যাও। মেয়েদেরকে উদ্ধার কর!
সাথে সাথে ট্রাকটা চলে গেল আর কেইন নিচু হয়ে সাব-মেশিনগানটা হন্যে হয়ে খুঁজতে লাগল। দেখতে পেল ওটা এক টুকরা চাঁদের আলোর মাঝে মাটিতে পড়ে রয়েছে। সাথে সাথে দৌড়ে চলল ওটা নিতে। এক দুই মুহূর্ত সম্পূর্ণ নিরবতা, তারপর একটা পাথরের টুকরা গড়িয়ে পড়ার খট খট আওয়াজ পাওয়া গেল। সে রাতের আকাশে গুলি ছুঁড়লো। উল্টোদিক থেকে কয়েকটা গুলি তার মাথার উপর দিয়ে শন শন করে উড়ে পাহাড়ের গায়ে লেগে ঠিকরে পড়ল। গুলি থামতেই সে একলাফে একটা বোল্ডারের পেছনে চলে গেল। তারপর ছায়ার মাঝে থেকে উপত্যকা দিয়ে দৌড়াতে শুরু করল।
ওদিকে পেছন থেকে ওরা তখনো অন্ধের মতো গুলি চালিয়ে যাচ্ছে, তবে এ মুহূর্তে সে একা। মন্দিরের দিকে চলে যাওয়া চওড়া রাজপথ দিয়ে সে ছুটলো। তারপর মন্দির অতিক্রম করে মরুদ্যানের দিকে ছুটে চলল।
খালি জায়গাটার কিনারায় পৌঁছে সে একটু থামল, তারপর নিচে ক্যাম্পের দিকে তাকাল। কানিংহাম তাঁবুগুলো থেকে বিশ-ত্রিশ গজ দূরত্বে ট্রাকটা থামিয়েছে। সে আর জামাল এর পেছনে আশ্রয় নিয়েছে।
কয়েকজন বেদুঈন ডানদিক দিয়ে উঁচু ঢাল বেয়ে উপরে ওঠার চেষ্টা করছে, যাতে উপর থেকে ওদের উপর গুলিবর্ষণ করতে পারে। কেইন সাবধান করার আগেই কানিংহাম উপরের দিকে তাকিয়ে বিপদটা টের পেল। সে জামালের কাঁধে একটা টোকা দিল, তারপর দুজনেই ছায়ার মাঝ থেকে ঘুরে ঢাল বেয়ে উপরে সেই গুহাটার দিকে উঠতে শুরু করল, যেখানে অস্ত্রভান্ডার রয়েছে।
তখনো ওদের দেখা যায় নি। আর স্কিরোজ বুঝে উঠতে পারেনি যে ওরা সেখান থেকে চলে গেছে। কিছুক্ষণ নিঃশব্দে কাটলো, তারপর কেইন ঢাল বেয়ে কোণাকুণি উঠতে শুরু করল।
একটা বোল্ডারের পেছনে থেমে উপরের দিকে তাকাল। কানিংহাম আর জামাল পাহাড়ের সরু তাকটার কাছে পৌঁছাতেই দেখল কয়েকজন বেদুঈন ওদের আগেই বুকে হেঁটে ঢাল বেয়ে উঠে ওদের সামনের পথ বন্ধ করে ফেলেছে। কানিংহাম একটানা দীর্ঘ এক রাউন্ড গুলি চালিয়ে ওদের মাথা নিচু করে রাখতে বাধ্য করল। এই ফাঁকে সে আর জামাল দৌড়ে অন্য গুহাটার আশ্রয়ে চলে গেল। কেইন বোল্ডারের পেছন থেকে বের হয়ে ঢাল বেয়ে ওদের কাছে যেতে শুরু করল, আশা করল অন্ধকার ছায়া তাকে ঢেকে রাখবে।
নিচে উপত্যকা থেকে সেলিমের রাগি চিৎকার শোনা গেল, আর সাথে সাথে ভারী গুলি বর্ষণ শুরু হলো। কেইন দম নিতে নিতে এক হাতে সাব মেশিনগানটা বুকে চেপে ধরল আর অন্য হাত দিয়ে আলগা মাটি আঁকড়ে ধরল। সে পেছন থেকে অনুসরণরত লোকজনের গর্জনের শব্দ শুনতে পেল, তারপর মাথার উপরের দিক থেকে একটানা বন্দুকের গুলির আওয়াজ ভেসে এল। সে উপরের দিকে তাকিয়ে দেখল পাহাড়ের একটা তাকের কিনারায় কানিংহাম সাব-মেশিনগান কাঁধে নিয়ে হাঁটুগেড়ে বসে আছে।
কেইন মুখ থুবড়ে সামনের দিকে পড়ে যেতেই জামাল শক্ত হাতে তাকে ধরে উপরে তুলল, তারপর টেনে গুহার ভেতরে নিয়ে গেল। তারা ভেতরে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। কানিংহাম গুহামুখের ধারে হাঁটু গেড়ে বসে আছে। চাঁদের আলোয় তার মুখ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।
বিপদটা বেশ ভয়ানক ছিল,’ একটু পর কেইন বলল।
কানিংহাম সায় দিল, মেয়েদের গায়ে গুলি লাগবে এই ভয়ে আমরা খুব জোড়ালো আক্রমণ চালাতে পারিনি।
কেইন সায় দিয়ে বলল, সেটাই ওর ট্রাম্প কার্ড আর স্কিরোজ সেটা জানে।’
কয়েকটা বুলেট শন শন করে গুহামুখ দিয়ে ছুটে এসে উল্টোদিকের দেয়ালে আছড়ে পড়ল। সে সাবধানে বাইরে তাকাল। পুরো উপত্যকা চাঁদের আলোয় ভেসে রয়েছে, আর পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে শত্রুরা এক বোল্ডার থেকে অন্য বোল্ডার পার হয়ে সামনে এগোচ্ছে।
‘ঢাল বেয়ে অর্ধেক আসা পর্যন্ত অপেক্ষা কর, তারপর আমি বলা মাত্রই গুলি শুরু করো, কেইন বলল।
ওরা নিঃশব্দে অপেক্ষা করতে লাগল। স্কিরোজ ছিল একদম সামনে, সে উপরের দিকে তাকাতেই তার মুখে চাঁদের আলো এসে পড়ল। কেইন বলল, ‘বেজন্মা লোকটার সাহস আছে, বলতে হবে।’
চাঁদের আলোয় আলোকিত বড় যে বোল্ডারটাকে কেইন অর্ধেক পথের চিহ্ন হিসেবে ধরে নিয়েছিল, তার কাছে স্কিরোজ পৌঁছাতেই কেইন বলে উঠল, ‘এবার’ তারপর সে ট্রিগার চাপলো। তিনটে বন্দুক এক সাথে গর্জে উঠতেই নিচে থেকে চিৎকার আর আর্তনাদ ভেসে এল, কয়েকজন আরব ঢাল বেয়ে
গড়িয়ে নিচে উপত্যকার মাটিতে পড়ল।
বাকিরা দ্রুত পিছু হটতে শুরু করল, পিছন পিছন স্কিরোজও পিছুতে লাগল। সে জার্মান ভাষায় চিৎকার করে গালাগাল করতে লাগল।
তারপর একটু নিরব হলে কানিংহাম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, যাক এই মুহূর্তের জন্য বাঁচা গেল।
