কানিংহাম বলল, রেডিওর কী হবে?
মেশিনগানে গোলা ভরতে ভরতে কেইন মাথা নাড়ল–এখন আর তার সময় হবে না।
বাইরে বের হতেই একটা ইঞ্জিনের শব্দ শোনা গেল, ওরা দেখল একটা ট্রাক মন্দির হয়ে বাইরে মরুভুমির দিকে যাওয়ার রাস্তার দিকে ছুটে চলেছে।
বেশিরভাগ বেদুঈন তখনো আগুনের চারপাশে বসে রয়েছে। কেইন দ্রুত ছায়ার মধ্য দিয়ে ক্যাম্পের অন্যপাশে যেতে লাগল।
যে ট্রাকে চড়ে ওরা সকালে পৌঁছেছিল সেটা তখনো তাঁবুগুলোর পাশে উজ্জ্বল চাঁদের আলোয় দাঁড় করিয়ে রাখা আছে। সে কানিংহামকে বলল, এটা এখন আমাদের। আপনি ড্রাইভ করব, এমন জোরে চালাবে যেন জীবনে কখনো তেমন জোরে চালান নি।
ওরা ছায়া থেকে বের হয়ে ট্রাকটায় চড়ে বসল। কানিংহাম স্টাট দিতেই পেছন থেকে তীক্ষ্ণ চিৎকার শোনা গেল। কয়েকজন বেদুঈন দৌড়ে সামনে এগোতেই কেইন পেছনে ঘুরল। সাব-মেশিন গানটা তুলে দ্রুত এক রাউন্ড গুলি চালালো। লোকগুলো অন্ধকারে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল। ঠিক তখনই কানিংহাম প্রচণ্ড গতিতে ট্রাক ছুটিয়ে চলল।
মন্দিরের সামনের উঁচু টিলাটার উপরে উঠে ওরা গিরিপথে ঢোকার প্রবেশ পথের দিকে ছুটে চলল। ঠিক তখনই মাথার উপরে ক্যাটালিনার গর্জন শোনা গেল, চাকা আর ফ্ল্যাপ নামানো রয়েছে, বাইরে সমতল জায়গায় নামার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
কেইন চেঁচিয়ে বলল, “যত জোরে পারেন ট্রাকটা চালাতে থাকুন। কানিংহাম সাথে সাথে তার পা পাদানিতে দাবিয়ে রাখল। উপত্যকার উঁচু নি পাথুরে ভুমির উপর দিয়ে ট্রাকটা লাফিয়ে লাফিয়ে চলতে শুরু করল। সে শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখল, তারপর একটু পরেই খোলা জায়গায় বের হয়ে প্লেনটার পিছু পিছু চলতে শুরু করল।
তাদের ঠিক ডান পাশে চাঁদের আলোয় অপর ট্রাকটিকে পরিষ্কার দেখা গেল। সামনে এগোতেই কেইন পরিষ্কার দেখতে পেল সেলিম পেছনে বসে আছে, স্কিরোজ আর মুলার সামনের সিটে।
স্কিরোজের মুখ রাগে মুচড়িয়ে রয়েছে, সে ঘাড় ফিরিয়ে চিৎকার করে পেছনে বসা সেলিমকে কিছু বলল। ট্রাক দুটো সমান সমান হতেই সেলিম একটা রাইফেল তুলে গুলি করল। স্কিরোজ অন্য ট্রাকটি ঘুরিয়ে ওদের কাছে যেতেই সেলিম আবার গুলি করল। গুলি লেগে উইন্ডস্ক্রিন ভেঙে চুর্ণবিচুর্ণ হতেই কেইন মাথা নিচু করে নিজেকে বাঁচাল। কানিংহাম প্রাণপনে স্টিয়ারিং হুইলটা ঝাঁকি দিয়ে ট্রাকটা এক পাশে নিয়ে গেল, তারপর ট্রাকটা স্কিড করে পুরো এক চক্কর ঘুরল।
এই মুহূর্তে ওরা নিরাপদ এবং প্লেনটার দিকে তাদের মনোযোগ ফেরালো। প্লেনটা তখন নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। রোমেরো ব্রেক চাপতেই রাতের আকাশে উপরের দিকে ধুলা-বালুর একটা বিরাট মেঘ সৃষ্টি হলো।
সেকেন্ড পাইলটের সিটে বসা নোভাল ঘুরে তাকিয়ে হঠাৎ রোমেরোর কাঁধ আঁকড়ে ধরল। পেছনে গোলাগুলি চলছে। চল আমরা এখান থেকে বেরিয়ে পড়ি।’
‘ফর গড’স সেক একটা সুযোগতো নিতে দাও আমাকে,’ এ কথা বলে রোমেরো পাওয়ার বাড়িয়ে দিল।
কেইন পেছন ফিরে দেখল অপর ট্রাকটি দ্রুত ওদেরকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। কানিংহাম অর্ধচন্দ্রকারে হুইল ঘুরিয়ে ট্রাকটাকে বিশাল ধুলির মেঘের ঠিক মাঝখানে আনল যেদিক দিয়ে প্লেনটা আবার উড়বে।
কয়েকটা মুহূর্ত ওরা অন্ধের মতো চলতে লাগল। কাশতে কাশতে দম আটকে, মাথা নিচু করে সামনে থেকে উড়ে আসা ছোট ছোট পাথরের টুকরা সামলে ওরা চলতে লাগল। তারপর কানিংহাম হুইল ঘোরাতেই ওরা আবার চাঁদের আলোর মাঝে বেরিয়ে এল।
ক্যাটালিনাটা এখন ঘণ্টায় বিশ থেকে ত্রিশ মাইল গতিতে ট্যাক্সি করে উপত্যকার প্রবেশ পথের দিকে এগোচ্ছিল। কানিংহাম হুইলে আরেকটা ঝাঁকি মেরে ট্রাকটা ঘুরালো, তারপর এক মুহূর্ত পরেই ওরা সমান্তরাল পথে ছুটতে শুরু করল।
কানিংহাম ট্রাকটা কাছাকাছি আনতেই কেইন আর জামাল দাঁড়িয়ে প্লেনটা লক্ষ করে পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জে একটানা গুলি বৃষ্টি করে চলল। কেইন রোমেরোকে দেখতে পেল প্লেনের উঁচু নাকের মধ্যে। ইট্রুমেন্ট প্যানেলের হালকা আলোয় তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। সে সাব মেশিনগানটা তুলে কেবিনের ভেতরে কয়েক রাউন্ড গুলি করল। রোমেরো মাথা নিচু করে অদৃশ্য হল তারপর প্লেনের লেজটা বিশাল এক বৃত্ত জুড়ে উল্টো দিকে ঘুরল। বাতাসে বালুর মেঘ উড়তে শুরু করল।
কানিংহাম হুইল ঘুরিয়ে প্লেনের সাথে সংঘর্ষ এড়াতে ট্রাকটা সরিয়ে নিল। প্লেনটা বৃত্তাকারে ঘুরতে ঘুরতে আবার মরুভূমির দিকে এগোতে লাগল। রোমেরো টেক অফ করার প্রস্তুতি নিতেই ইঞ্জিনের গর্জন বাড়তে লাগল।
তারপর পুরো প্লেনটা এক পাশ থেকে অন্য পাশে ভিষণভাবে কাঁপতে কাঁপতে বামদিকে ঘুরে গেল। একমুহূর্ত পর নাকটা সামনে গোত্তা খেল, তারপর জমিতে লাঙ্গল দেওয়ার মতো সামনের দিকে প্রায় একশো গজ বালুর মাঝে ছুটে গিয়ে একটা দোমড়ানো মোচড়ানো ধাতুর স্তূপে পরিণত হয়ে থামল। রাতের আকাশে কমলা রঙের আগুনের লকলকে শিখা উপরের দিকে লাফিয়ে উঠল।
প্রচণ্ড একটা বিস্ফোরণ হলো, তারপর পেট্রল ট্যাংকে আগুন লাগতেই আরেকটা বিস্ফোরণ হলো। আগুনের শিখা আর ধাতুর ছোট ছোট টুকরা বাতাসে উড়ে ওদের কাছে আসার আগেই কানিংহাম দ্রুত হুইল ঘুরিয়ে ট্রাকটা সরিয়ে নিল।
এদিকে অন্য ট্রাকটা দ্রুত গিরিখাতের দিকে ছুটছিল। ওরা ট্রাকটার পিছু নিল। মাটির উপর দিয়ে এমনভাবে ওরা ছুটছিল যেন জীবন্ত কিছু একটা ছুটছে। কেইন সাবমেশিন গান হাতে নিয়ে প্রস্তুত হয়ে এক পা রানিং বোর্ডে রেখে দাঁড়াল। তাকিয়ে রইল অন্য গাড়িটার টেইল লাইটের দিকে।
