গাছগুলো যেখানে শেষ হয়েছে সে পর্যন্ত পৌঁছে কেইন দেখতে পেল, অন্য বেদুঈনটা খনিকুপের মুখের কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে। লোকটার হাতে রাইফেল নেই। কেইন অপেক্ষা করতে লাগল, তারপর বেদুঈন লোকটা অন্ধকার উপত্যকার দিকে মুখ ফেরাতেই সে নিঃশব্দে বালুর উপর দিয়ে এগোল। লোকটা কোন সুযোগ পেল না। এক হাত দিয়ে সে তার গলা এমন শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরল, যেন তার মুখ থেকে কোন শব্দ বের না হয়। তারপর ধীরে ধীরে চাপ দিতে থাকল। এক দুই মুহূর্ত লোকটা চেষ্টা করল বজ্রআঁটুনি ছাড়াতে তারপর তার দেহ শিথিল হয়ে পড়ল। কেইন দেহটা টেনে নিয়ে পেছনে গাছগুলোর আড়ালে ছায়ার মাঝে শুইয়ে রাখল।
দড়িটা তখনো সেই গাছের সাথে কুন্ডলী পাকানো অবস্থায় বেঁধে রাখা ছিল।
কেইন দড়িটা নিচে কূপের ভেতরে ছুঁড়ে ফেলে মৃদু কণ্ঠে ডেকে উঠল, ‘যত জলদি পারেন উপরে উঠে আসুন।
সে উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে ক্যাম্পের সামনের গাছগুলোর দিকে নযর রেখে অপেক্ষা করতে লাগল। কয়েক মিনিটের মধ্যে কানিংহাম তারপর জামাল তার পাশে এসে দাঁড়াল।
ওরা পাম গাছগুলোর দিকে এগিয়ে চলল, কেইন দ্রুত পরিস্থিতি বুঝিয়ে বলল।
‘মেয়ে দুজনকে পাহারা দিয়ে একটা তাবুতে রেখেছে। আমি যা বুঝতে পারছি, কোন অস্ত্ৰছাড়া ক্যাম্প আক্রমণ করে লাভ হবে না। তাই বলতে চাচ্ছি যে গুহাতে স্কিরোজ অস্ত্রশস্ত্র রেখেছে সেখানে বরং যাই। সেখানে একটা রেডিও আছে। মুকাল্লা কিংবা এডেন ধরতে না পারলেও অন্তত জর্ডনের সাথে যোগাযোগ করতে পারব।’
কানিংহাম বলল, এটাই আমার কাছে সবচেয়ে ভাল উপায় মনে হচ্ছে।’
কেইন দ্রুত আরবিতে জামালকে সব বুঝিয়ে বলল। তারপর গাছের ফাঁক দিয়ে তাঁবুগুলোর দিকে এগিয়ে চলল। আগুনটা এড়িয়ে গেল, বেদুঈনরা তখন আগুনের চারপাশ ঘিরে নেচে চলছিল। এরপর ওরা মাটির উপর হামাগুড়ি দিয়ে ক্যাম্পের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলল।
সবচেয়ে বড় ভাবুটার শেষ প্রান্ত পার হতেই রাতের বাতাসে পরিষ্কার মুলারের গলার শব্দ শোনা যেতেই কেইন একটু থামল। সে কানিংহামের এক কাঁধ আলতো করে ছুঁয়ে তাবুটার কাছে এগোল।
এবার স্কিরোজ কথা বলছিল, বেশ খুশি খুশি মনে হচ্ছিল তাকে। আমার খুব ভাল লাগছে হেডকোয়ার্টারের সাথে রেডিওতে যোগাযোগ করে, সে বলল, আমার সৌভাগ্য যে আমি রোমেরোর সাথেও যোগাযোগ করতে পেরেছিলাম। ওরা আজ রাতেই আসছে।
মুলার বলল, কিন্তু আমি এর কোন অর্থ খুঁজে পাচ্ছি না।’
স্কিরোজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল–”তুমি অসম্ভব একজন বোকা লোক, মুলার। এখানে আমাদের কাজ শেষ। কেইনকে যে রকম আমি এর আগে বলেছিলাম, অন্তত এক মাসের জন্য আমরা নিরাপদ, কিন্তু অনেক সময় মানুষের জীবনে অনেক অযৌক্তিক খেলা খেলে যায়। সেজন্য আমরা রোমেরোর সাথে ক্যাটালিনাতে চড়ে উড়ে যাওয়ার চমৎকার সুযোগটা নিতে যাচ্ছি, মুলার। আনন্দ করো। তুমি ইতিহাসের একটা অংশ হতে যাচ্ছো।’
‘বন্দিদের কি হবে? সেলিম মাঝখানে বাধা দিয়ে বলল।
কেইনের চোখে ভেসে উঠল স্কিরোজের স্ফীত মুখের মদ হাসি। ‘পুরুষদের আমি তোমার জিম্মায় রেখে যাবো। মেয়েরা আমাদের সাথে ক্যাটালিনাতে যাবে।
কিন্তু আমাকে কথা দিয়েছিলে কানিংহাম মেয়েটাকে আমার হাতে ছেড়ে দেবে, সেলিম রাগত স্বরে বলল।
‘আমি আমার মত বদলেছি এর পরেই, শীতল কণ্ঠে বলল স্কিরোজ। ‘এখানে কে বস সেটা ভুলে যেও না। তুমি অন্য কোন মেয়ে খুঁজে নিও।
‘ওদের কী হবে?’ মুলার জিজ্ঞেস করল।
স্কিরোজ তাকে বলল, ‘আমি ঠিক বলতে পারব না। তবে পেরেট মেয়েটাকে আমি একটা ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে চাই। ওকে কাবু করতে অনেক মজা হবে।’
রাতের বাতাসে দুর থেকে মৃদু গুঞ্জন শোনা গেল। স্কিরোজ উঠে দাঁড়াল। ‘ঐ যে ঠিক সময়ে প্লেন আসছে ভদ্রমহোদয়গণ। মেয়েদেরকে নিচে ট্রাকে নিয়ে যাও সেলিম। মুলার আর আমি একটু পরেই আসছি।’
কানিংহাম হঠাৎ নড়ে উঠল। কিন্তু কেইন তার কাধ শক্ত করে চেপে ধরে টেনে নামাল মাটিতে। বোকার মত কাজ করবেন না, সে তার কানে ফিস ফিস করে বলল।
হামাগুড়ি দিয়ে তাঁবুগুলোর মধ্য থেকে বেরিয়ে ওরা ছায়ার মাঝে অদৃশ্য হয়ে গেল। কেইন ওদেরকে পথ দেখিয়ে পাহাড় চূড়ার দিকে এগিয়ে চলল, তখন কানিংহাম বলল, এখন আমরা কী করব?
কেইন তাকে বলল, “এখন একটি মাত্র কাজ আমাদের করতে হবে। প্লেনটা থামাতে হবে। তবে খুব দ্রুত কাজ করতে হবে।’
পাথরের র্যাম্প দিয়ে ওরা নিঃশব্দে হেঁটে চলল, তারপর অতি সাবধানে সেই গুহামুখটার কাছে এগোল যেখানে অস্ত্রের ভান্ডারটা রয়েছে। একজন মাত্র আরব পিঠে রাইফেল ঝুলিয়ে পাথরে বসে বসে দুলছিল আর আকাশের দিতে তাকিয়ে একঘেয়ে সুরে একটা বিষাদক্লিষ্ট রাখালি গান গেয়ে চলছিল।
কেইন জামালের কাঁধে চাপ দিল, বিশালকায় সোমালি নিঃশব্দে এগোল। উঁচু সুরে পৌঁছার পর গানটা হঠাৎ মাঝখানে থেমে গেল। তারপর হঠাৎ মট করে একটা শব্দ হলো, যেন কোন শুকনো ডাল ভেঙেছে। জামাল মৃতদেহটা মাটিতে নামিয়ে রাখল।
গুহার ভেতরে অন্ধকার, সামনে যেতে যেতে কেইন একটা ম্যাচ জ্বাললো। রেডিওর উপরে একটা বড় স্পট ল্যাম্প দেখা গেল। কেইন তাড়াতাড়ি বোতাম টিপে ল্যাম্পটা জ্বেলে অস্ত্রের বাক্সগুলোর দিকে ঘোরাল।
আর মাত্র কয়েকটা বাক্স অবশিষ্ট রয়েছে। প্রথম দুটো পরীক্ষা করে সে। দেখল গাদাগাদি করে রাইফেল রাখা আছে। তবে তৃতীয়টাতে সাবমেশিন গান রয়েছে। আরো খুঁজে এক বাক্স ভর্তি গোলাকার একশো রাউন্ড বুলেটের ক্লিপ পেল। কানিংহাম আর জামাল, দুজনকে কেইন দুটো করে ক্লিপ দিল।
