‘এবার,’ সে আরবিতে বলার সাথে সাথে জামাল তার শক্তিশালী হাত কেইনের পায়ের নিচে দিয়ে তাকে সরাসরি উপরের দিকে উঠাতে শুরু করল।
কেইন আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল দুহাত দিয়ে কিছু একটা খামচে ধরার। জামালের হাত কাঁপা শুরু হতেই তার মনে আতঙ্ক জেগে উঠল। ঠিক তখনই দেয়ালে পাথরের গায়ে ভাঙ্গা একটা অংশে আঙ্গুলে ঠেকতেই সে তা আঁকড়ে ধরে দুলতে শুরু করল। এক মুহূর্ত পর সে গুহার গায়ে শরীর আটকাতে পারল। এক পাশের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে অন্য পাশের দেয়ালে পা ঠেকালো।
এভাবে সে দেয়াল বেয়ে সোজা উপরের দিকে ধীরে ধীরে উঠতে শুরু করল। একটু পর পর বিশ্রাম নিল। এবড়ো থেবড়ো পাথরগুলো তার পিঠে বিধতেই মাঝে মাঝে খুব যন্ত্রণা হচ্ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও মুখ কামড়ে যন্ত্রণা সহ্য করে উপরের দিকে উঠতে লাগল। কিছুক্ষণ পর কূপের মুখ আকারে বড় হলো। কূপের মুখের কাছে আসতেই সে এক ফুট নিচে পা রেখে একটু বিশ্রাম নিল। তারপর দ্রুত কুপের ভেতর থেকে বাইরে বের হয়ে হামাগুড়ি দিয়ে দড়িটার দিকে এগিয়ে চলল।
ঠিক সেই মুহূর্তে দুজন বেদুঈন পাম গাছগুলোর মধ্য থেকে বের হয়ে কূপের কয়েক ফুট দূরত্বে এসে এক ফালি চাঁদের আলোর মাঝে দাঁড়িয়ে অলসভাবে গল্প করতে লাগল।
প্রথম শব্দটা পেতেই কেইন লম্বা হয়ে মাটিতে শুয়ে পড়েছিল। এবার বেশ সাবধানে এক ইঞ্চি ইঞ্চি করে হামাগুড়ি দিয়ে ছায়ার মধ্য দিয়ে পাম গাছগুলোর দিকে এগোতে লাগল। এ মুহূর্তে কানিংহাম আর জামালের জন্য তার কিছুই করার নেই। দুই বেদুঈনই সশস্ত্র আর একজন হাতে রাইফেল ধরে রেখেছে। দুজনকে কাবু করা অসম্ভব ব্যাপার।
সে উঠে দাঁড়িয়ে পাম গাছগুলোর মধ্য দিয়ে নিঃশব্দে ক্যাম্পের দিকে হেঁটে চলল। কাছে পৌঁছতেই গানবাজনার আওয়াজ শোনা গেল। বেদুঈনরা এক তূপ আগুন জ্বালিয়ে তার চারপাশে গোল হয়ে আসন গেড়ে বসেছিল। কয়েকজন দলবদ্ধভাবে নেচে বেড়াচ্ছে অদ্ভুত ভঙ্গিতে। একজন একটি রাখালের বাঁশি বাজাচ্ছিল, আর একজন ছোট একটা চামড়ার ঢোলকে অনবরত একঘেয়ে তালে বাজিয়ে চলছিল। বাকিরা গোল হয়ে বসে গানের সুরের সাথে তাল মিলিয়ে দুই হাতে তালি দিচ্ছিল আর সামনে পেছনে শরীর দোলাচ্ছিল। সে অগ্নিকুন্ডকে পাশ কাটিয়ে ছায়ার মধ্য দিয়ে তাঁবুগুলোর মাঝে চলতে শুরু করল। প্রথম দুটো তাবু খালি আর সবচেয়ে বড়টা সে এড়িয়ে গেল।
ক্যাম্প থেকে একটু দূরত্বে দুজন প্রহরী একটা তাঁবুর সামনে দাঁড়িয়েছিল। সে ঘুরে তাবুটার পেছন দিকে গিয়ে তাঁবুর নিচে ছায়ার মধ্যে হামাগুড়ি দিতে লাগল। ভেতর থেকে নড়াচড়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। রুথ কানিংহাম মৃদু কণ্ঠে কিছু বলে উঠল আর মেরি উত্তর দিল। তবে ঠিক মতো বোঝা গেল না
কেইন খুব আস্তে তাঁবুর মোটা দড়িটা ঢিলা করে তাঁবুর নিচের প্রান্তটা কয়েক ইঞ্চি উঁচু করল। এবার মাটিতে চিৎ হয়ে সে ভেতরের দৃশ্য দেখতে পেল।
মেরি একটা স্লিপিং ব্যাগের উপর বসেছিল, তার পেছনটা কেইনের কাছ থেকে মাত্র ছয় ইঞ্চি দূরত্বে। আর রুথ কানিংহাম রয়েছে তাঁবুর দরজার কাছে।
কেইন খুব নরম গলায় বলল,’মেরি পেছনে তাকিও না। রুথকে কথা চালিয়ে যেতে বলো।’
পাতলা শার্টের নিচে মেরির কাধ হঠাৎ শক্ত হয়ে গেল। সে সামনে ঝুঁকে রুখকে মদুস্বরে কিছু বলল। রুথ কানিংহাম প্রথমে আঁতকে উঠে মদুস্বরে কিছু একটা বলে উঠলেও, সাথে সাথে নিজেকে সামলে নিল। এরপর সে জোরে জোরে কথা চালিয়ে যেতে লাগল, কী কী হয়েছে আর ভবিষ্যতে ওদের কপালে আর কী আছে সে সব বলে যেতে লাগল।
মেরি সোজা চিৎ হয়ে স্লিপিং ব্যাগে শুয়ে মাথা অর্ধেক ফেরাতেই সরাসরি কেইনের দিকে তাকাল। দুজনের মুখের মাঝে কেবল তিন চার ইঞ্চি ফাঁক।
‘এই মুহূর্তে আমি কিছুই করতে পারব না, আমার কাছে কোন অস্ত্র নেই, সে বলল। ওরা তোমাদের সাথে কি ধরনের আচরণ করেছে?
‘এখন পর্যন্ত সবই ঠিক আছে, তবে সেলিম যে দৃষ্টিতে রুথের দিকে তাকাচ্ছিল সেটা আমার খুব একটা ভাল মনে হলো না। তাকে দেখে মনে হলো সে চরম খারাপ কোন কিছু করে ফেলতে পারে।’
কেইন ওকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে বলল। এই ব্যাপারটা নিয়ে আমাদের কিছু একটা করতে হবে। আমি এখন ওদের কাছে যাই। যাই হোক চিন্তা করো না। ভাগ্য ভাল হলে আমরা এক ঘণ্টার মধ্যে ফিরে আসবো, তোমাদেরকে এখান থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যেতে।
সে চলে যাবার জন্য ঘুরতেই একটু থামল। রুথকে বলো তার স্বামী সুস্থ এবং ভাল আছেন।’
মেরি তাবুর নিচ দিয়ে হাত বাড়িয়ে কেইনের মুখে আলতো করে বোলালো। তার চোখ কালো পানির মতো টলটলে, যেখানে রয়েছে ভয়ংকর স্রোত যা তাকে টেনে নিতে পারে। সে তাঁবুর মাথাটা আরেকটু উপরে তুলল, মেরি তার মুখ বাড়িয়ে দিতেই তার ঠোঁট স্পর্শ করল। এটা কোন আবেগের চুম্বন নয়–এটা ছিল একজন নারীর চুম্বন যে তার কোমল হৃদয়ের সমস্ত তন্ত্রী দিয়ে গভীরভাবে ভালোবাসতে পারে। এক মুহূর্ত সে তার হাত দিয়ে মেরির হাত চেপে ধরল তারপর সেখান থেকে দ্রুত চলে এল।
সাবধানে গাছগুলোর মধ্য দিয়ে সে খনি-কুপটির দিকে এগোতে লাগল। হঠাৎ সামনে থেকে কারও আসার শব্দ পেয়ে একটা গাছের পেছনে উপুড় হয়ে মাটিতে শুয়ে পড়ল। একটা লোক তার এতো কাছ দিয়ে পাশ কাটালো যে কেইন অতি সহজেই তার আলখাল্লার প্রান্ত ছুঁতে পারতো।
