নিচে ক্যাম্পের দিকে যেতে যেতে সে অবাক হলো লোকজন আর উটের সংখ্যা দেখে। সব দিকেই সূর্যের প্রচণ্ড তাপে ঘর্মাক্ত লোকজন ভারী ভারী বাক্স উটগুলোর পিঠে ওঠাচ্ছিল। যেন কোথাও যাবার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
এখানে কয়টি গোত্রের লোক এসেছে সে গুণে শেষ করতে পারল না। রঙিন পাগড়ি পরা অর্ধনগ্ন ইয়েমনি, শরীরে উল্কি আঁকা আর নীলের ছোপ সারা গায়ে। রশিদ বেদুঈন, মুসাবেইন, বাল হারিস–সব গোত্রই রয়েছে সেখানে। দুই প্রহরী তাকে ভিড়ের মাঝ দিয়ে সামনে ঠেলতেই সবাই মাথা ঘুরিয়ে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকাল।
সবচেয়ে বড় তাবুটার সামনে থেমে ওরা কেইনকে ভেতরে ঢুকতে ইশারা করল। তাঁবুর ঝাঁপ সরিয়ে কেইন ভেতরে ঢুকল। ছোট একটা ফোল্ডিং টেবিলে বসে কফি পান করতে করতে মুলার ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে ভাঙ্গা মৃৎপাত্রের একটা টুকরা পরীক্ষা করছিল। সে মুখ তুলেই মৃদু হাসল, ‘আহ, কেইন এসো এসো! ভেতরে এসো!
কেইন উল্টোদিকে একটা ক্যাম্প টুলে বসল। মুলার কফির পট তুলে আবার মৃদু হাসল–কফি?’ কেইন সায় দিতেই একটা কাপ ভরে সামনে ঠেলে দিল।
কেইন সামনে ঝুঁকে টেবিলে দুহাত রেখে বলল–’মহিলা দুজনকে নিয়ে তোমরা কি করেছো?
মুলার ব্যথিত চেহারা নিয়ে বলল, “আমরা বর্বর নই। কাছেই একটা তাবুতে তাদেরকে পাহারা দিয়ে রাখা হয়েছে। মন্দিরের চেয়ে এখানে তারা আরামে থাকবেন।
‘অসীম দয়া তোমার, কেইন বলল। আর কানিংহামকে কি করেছো?’
‘এখন আমরা তার কাছেই যাচ্ছি, মুলার শান্ত স্বরে বলল। তবে প্রথমে স্কিরোজ তোমার সাথে দেখা করতে চায়।
কেইন বলল। আচ্ছা এখানে আসলে কি হচ্ছে বলো তো?
মুলার উঠে দাঁড়িয়ে হ্যাট হাতে নিল। সে জন্যইতো আমি তোমাকে ডেকে আনতে বলেছি বন্ধু, এখনই সব জানতে পারবে।
সে তাঁবুর ঝাঁপ ঠেলে বেরুতেই কেইন তাকে অনুসরণ করল। মরুদ্যানের মধ্য দিয়ে ওরা সামনেই গিরিখাতের এক পাশ দিয়ে উপরের দিকে উঠতে শুরু করল। দুই বেদুঈন ঠিক পেছনে পেছনে আসছে। ভারী ভারী বাক্স কাঁধে করে লোজন ওদের পাশ কাটিয়ে নিচের মরুদ্যানের দিকে যাচ্ছিল।
ওরা একটা সরু র্যাম্পের উপর উঠল, যেটা সম্ভবত নিরেট পাথর কেটে তৈরি করা হয়েছে। উপরে একটা গুহায় ঢুকবার মুখ, পাশে প্রহরী দাঁড়ানো। কোমর পর্যন্ত খালি গায়ে অনেক মানুষ কাজ করছে। লোকগুলো আরো বাক্স টেনে এনে এখানে গাদা করে রাখছে। তারপর সেগুলো নিচে ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মুলার ওদের পাশ কাটিয়ে সামনে এগোল আর কেইনও সাথে সাথে তাকে অনুসরণ করে চলল।
গুহাটা বেশি বড় না হলেও চারপাশে বিভিন্ন ধরনের টেকনিকেল যন্ত্রপাতি সারি সারি সাজিয়ে রাখা হয়েছে। স্কিরোজ একটা জটিল শর্ট-ওয়েভ ট্রান্সমিটিং ও রিসিভিং সেটের সামনে বসে রয়েছে। ওরা ভেতরে ঢুকতেই সে মাথা থেকে ইয়ারফোন খুলে রিভলভিং টুলটা ঘুরিয়ে তাকাল। এই যে ক্যাপ্টেন কেইন। তুমি এসেছো তাহলে?
তার মুখে কৌতুকপূর্ণ মৃদু হাসি দেখা দিল, যেন কোন পার্টি চলছে আর কেইন বহু প্রতিক্ষিত একজন অতিথি।
কেইন বলল, তোমরা তো বেশ ভাল একটা সেটআপ গড়ে তুলেছো?’।
স্কিরোজ মাথা নেড়ে সায় দিল। এটি নিয়ে আমরা গর্বিত।’ বুক পকেট থেকে একটা প্যাকেট বের করে সামনে ধরল–সিগারেট?
কেইন একটা সিগারেট নিয়ে বলল, “আচ্ছা তোমাদের কি এখনো সময় হয় নি এখানে কি চলছে সে সম্পর্কে আমাকে কিছু বলার?
স্কিরোজ মাথা নাড়ল। তাতে অবশ্যই। এখানে আর কি জন্য তোমাকে আনা হয়েছে?’ স্তূপীকৃত বাক্সগুলো দেখিয়ে সে বলল, “নিজেই খুলে দ্যাখো।’
ধাতুর তৈরি বাক্সগুলো হালকা ছাই রঙের। কেইন একটা বাক্স সামনে টেনে ঢাকনিটা খুলল। বাক্স ভর্তি সুন্দর করে সাজানো সদ্য ফ্যাক্টরি থেকে আনা নতুন, গ্রিজ মাখা চকচকে রাইফেল। পরের বাক্সটায় রয়েছে সাবমেশিন গান।
সে একটা তলে পরীক্ষা করল–জার্মানিতে তৈরি। সে ঘুরে কঠিন চোখে তাকাল। আমি তোমাকে আন্ডারএস্টিমেট করেছিলাম। ভেবেছিলাম তুমি প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ দেশের বাইরে বেআইনীভাবে পাচার করছে, কিন্তু এই…’।
স্কিরোজ আত্মতুষ্টির হাসি দিল। হ্যাঁ। এটি সত্যি একটা বিশাল ব্যাপার, তাই না? আমরা সত্যি ভাগ্যবান যে, এরকম একটা জায়গা খুঁজে পেয়েছিলাম। এ জন্য মুলারকে ধন্যবাদ।’
‘কানিংহাম আসা পর্যন্ত। এটা নিশ্চয়ই তোমাদেরকে একটা ধাক্কা দিয়েছিল।’
স্কিরোজ মাথা নাড়ল। সামান্য একটু অসুবিধা হয়েছে। ব্যস আর কিছু না।’
কেইন আবার ঘুরে স্থূপীকৃত অস্ত্রশস্ত্রের বাক্সগুলোর দিকে ফিরে একটা বাক্সের গায়ে লাথি মারল। আমার মনে হয় এ কারণেই ওমান সীমান্তে বিভিন্ন উপজাতির সাথে ব্রিটিশদের এত ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে?
স্কিরোজ মৃদু হাসল। আমরা আমাদের তরফ থেকে যথাসাধ্য করছি। তবে এই অস্ত্রগুলো আমাদের সাহায্য করার জন্য বিভিন্ন গোত্রদের প্রতি পারিশ্রমিক বলতে পারো। এরপর এগুলো নিয়ে ওরা কি করে তা ওদের নিজেদের ব্যাপার।’
কেইন আবার বাক্সগুলোর দিকে তাকাল–ঐ সাবমেশিনগুলো জার্মানির তৈরি?
‘এম পি ৪০, সর্বশ্রেষ্ঠ।
‘তাহলে তুমি গ্রিক নও?
‘আমার মা ছিল গ্রিক, তার নাম ছিল স্কিরোজ। তবে আমি বলতে গর্ব বোধ করি যে আমার বাবা একজন জার্মান ছিলেন। তার নাম যাই হোক না কেন?’
