ভেতরে বেশ ঠাণ্ডা আর খুব নিস্তব্ধ পরিবেশ। ক্ষিণ আলোয় তার চোখ সয়ে এল। গোলাপি রঙের মার্বেল পাথরের মেঝে। সুদক্ষ মিস্ত্রির হাতে নিপুনভাবে কাটা চৌকোণ পাথরের স্তম্ভগুলো সোজা উঠে গেছে উপরে। জমকালো মূল অংশের অন্যপ্রান্তে এক বিশাল প্রতিমুর্তি অন্ধকার থেকে আবছা বেরিয়ে এসেছে।
সেলিম নির্দেশ দিতেই দলটি সেখানেই থামল। তিনজন প্রহরি ছাড়া বাদবাকি সব বেদুঈনদেরকে সে বাইরে থাকার নির্দেশ দিল। কেইনের দিকে ফিরে বলল, তোমরা সবাই এখানেই থাকবে। যদি কেউ পালাবার বা সন্দেজনক কোন কিছু করার চেষ্টা করো, প্রহরিদের নির্দেশ দেওয়া আছে সাথে সাথে গুলি করে মারবে।
কেইন বলল, “ঠিক আছে, তুমিইতো এখানে বস। তবে যাবার আগে একটা কথা আমাদের বলে যেতে পারো। মিসেস কানিংহামের স্বামীর কী হয়েছে? কেননা তার কারণেই আমাদের এখানে আসা।’
সেলিম কাঁধ ঝাঁকাল। সে জীবিত এবং সুস্থ আছে–অন্তত এই মুহূর্ত পর্যন্ত।
ক্লথ কানিংহাম সামনে এগোল। আমি কখন তাকে দেখতে পাবো? প্লিজ আমাকে তার কাছে নিয়ে চলুন।
তার গাল রক্তিম হলো। চোখ জ্বল জ্বল করছিল। সেলিম এমনভাবে তার দিকে তাকাল যেন এই প্রথম তাকে দেখছে। কয়েক মুহূর্ত পর সে ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল–এই মুহূর্তে সম্ভব নয়। যদি ঠিক মত আচরণ করেন, তবে পরে তার দেখা পাবেন। এখন এখানেই অপেক্ষা করতে হবে।
‘কেইন জানতে চাইল, ‘কিন্তু কেন?। ফায়ারিং স্কোয়াড, গলা কাটবে না নতুন কেউ আসবে?
সেলিম মৃদু হাসল। আমি এখানে প্রশ্নের উত্তর দিতে আসিনি। সে ঘুরে দ্রুত সেখান থেকে চলে গেল। কেইন পকেট থেকে দোমড়ানো সিগারেটের প্যাকেটটা বের করল। একটা মাত্র সিগারেট অবশিষ্ট ছিল। সিগারেট ধরিয়ে একটা টান দিয়ে সে মূর্তিটির দিকে তাকাল।
এরকম কোন কিছু ইতোপূর্বে সে কখনো দেখেনি। নিরেট পাথরের তৈরি। ইন্দ্রিয়পরায়ণ পুরুষ্টু ঠোঁট। উঁচু কপোলের উপরে উপরের দিকে তির্যক দৃষ্টিতে তাকানো চোখদুটো বন্ধ, যেন ঘুমিয়ে রয়েছে। হিন্দু দেবী কালী মূর্তির সাথে এর বেশ মিল রয়েছে। ইতোপূর্বে ভারতীয় বিভিন্ন মন্দিরে সে অনেকবার কালী মূর্তি দেখেছে। একটু ভুরু কুঁচকালো, এই সমস্যার একাডেমিক দিকটি নিয়ে তার মনে চিন্তা শুরু হলো। এরপর চোখে পড়ল উঁচু বেদিটা, লক্ষ করল আগুন জ্বালাবার বাঁকা ধুনচি। মনে পড়ল রোমান অশ্বারোহীদল আর সেই বৃদ্ধা পূজারিণীর কথা, যে বেদিতে আগুন জ্বালাতে রয়ে গিয়েছিল। মনে হলো সময়ের কোন অর্থ নেই। এটি একটি বৃত্ত, আপনা আপনি এর মাঝে অনন্তকাল ধরে ঘুরছে।
মেরি তার পাশে এসে দাঁড়িয়ে মৃদু স্বরে বলল, আমার একটা অদ্ভুত অনুভতি হচ্ছে এটা জেনে, যে সে–মানে আমি বলতে চাচ্ছি আলেক্সিয়াস হয়তো এখানেই দাঁড়িয়েছিল।’
কোন কথা না বলে কেইন ঘাড় কাত করে সায় দিল। এক মুহূর্ত পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ওরা একই কথা ভাবছিল। হঠাৎ দরজার কাছে একটা শব্দ শোনা গেল। কেইন ঘুরতেই দেখল ধুলিধুসরিত খাকি পোশাক পরা একজন লোক ওদের দিকে এগিয়ে আসছে। তার মাথায় আরবি স্টাইলে কাপড় জড়ানো আর চোখ ঢাকা রয়েছে বালু নিরোধক গগলসে। কয়েক ফুট দূরত্বে থেমে সে নিশব্দে ওদেরকে লক্ষ করল,তারপর চোখ থেকে গগলস খুলল। ইনি হলেন প্রফেসর মুলার।
সে আড়ষ্টভাবে একটুখানি মাথা নোয়ালো। আশা করি ভদ্রমহিলাদের কোন ধরনের অসুবিধা হয় নি?
কেই এক পা এগোল, কিন্ত সে কিছু বলার আগেই একটা পরিচিত কণ্ঠস্বর শোনা গেল। “আহা আমার বন্ধু ক্যাপ্টেন কেইন। শেষ পর্যন্ত তুমি এখানে পৌঁছতে পারলে?’ স্কিরোজ অন্ধকার থেকে বের হয়ে এল।
.
১১.
প্রায় দুপুরবেলা দুজন প্রহরী কেইনকে নিয়ে যেতে মন্দিরে এল। ইতোপূর্বে সকালেই মেরি আর রুথ কানিংহামকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তার একটু পর জামালকেও নিয়ে যাওয়া হয়।
প্রহরীদের সাথে মন্দিরে একা বসে কেইন একের পর এক ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো বার বার ভাবছিল, কিন্তু কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। কোন অর্থই সে খুঁজে পেল না। যদি মুলার এই মন্দির হঠাৎ আবিষ্কার করেই থাকে, তবে সে কেন সারা বিশ্বকে এই আবিষ্কারের কথা জানাল না? এতে তো সে জগৎ বিখ্যাত হয়ে যেতো। আর স্কিরোজ আর সেলিমের ব্যাপারটাই বা কি? ওরা কীভাবে এখানে এল? সমস্যাগুলোর কোন সমাধান খুঁজে না পেয়ে অধৈর্য হয়ে সে অপেক্ষা করতে লাগল। ঠিক এই সময়ে ওকে নিয়ে যেতে বেদুঈন দুটো ফিরে এল।
মন্দিরের ভেতরের শীতল আবছা আলো থেকে বের হয়ে প্রখর সূর্যের আলোয় তার চোখ মুহূর্তের জন্য ধাঁধিয়ে যেতেই সে সিঁড়ির সর্বোচ্চ ধাপে একটু থামল। একজন প্রহরী তাকে সামনে ঠেলতেই সে প্রায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কয়েক ধাপ হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল।
এই ঘটনায় লোকদুটো বেশ মজা পেল। কেইন অনেক চেষ্টা করে রাগ সামলে ওদের দুজনের মধ্য দিয়ে শান্তভাবে হেঁটে চলল। যেতে যেতে তীক্ষ্ণ দষ্টিতে সে উপত্যকার সবকিছুর দিকে নজর দিয়ে চলল।
পাথরের দেয়ালগুলোর উপর অনেক শিলালিপি খোদাই করা। কয়েক জায়গায় অন্ধকার গুহামুখ দেখতে পেল। হঠাৎ গিরিখাতের মেঝে সামান্য ঢালু হয়ে গেছে। এর নিচে একটি শূন্য গর্ভের মধ্যে একটি মরুদ্যানের সবুজ পাম গাছের কাছে কয়েকটি তাঁবু খাটানো হয়েছে দেখতে পেল।
