সে লো গিয়ার দিয়ে বালিয়াড়ির খাড়া ঢাল বেয়ে নিচের দিকে নামতে শুরু করল। একদম নিচে পৌঁছার পর একটা ফাঁকের মাঝ দিয়ে ট্রাক চালিয়ে আরেকটা বালু ও আগাছায় ভরা সমতল জমিতে পৌঁছাল। এবার স্পিড বাড়িয়ে দূরের পাথরের পাহাড়টির দিকে ছুটে চলল।
টাকটা হঠাৎ লাফিয়ে উঠে দ্রুত চলতেই সবাই জেগে উঠল। মেরি উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কি হয়েছে?
সে দূরের দিকে মাথা কাত করে দেখাল–’আমরা প্রায় পৌঁছে গেছি।’
রুথ কানিংহাম সামনে ঝুঁকল। সে দুহাত দিয়ে এত শক্ত করে সিটের প্রান্ত ধরে রেখেছে যে তার আঙ্গুলের গাঁটগুলো সাদা হয়ে গেছে।
শিলাস্তূপ বড় হতে হতে একটা পাহাড় সমান আকৃতি নিয়ে ওদের মাথার উপরে উঠে এসেছে, এরপর ওরা একটা গভীর গিরিখাতের মধ্যে প্রবেশ করল যা এঁকে বেঁকে এর অন্তঃস্থলে ঢুকে গেছে। কেইন ব্রেক কষে ট্রাকের ইঞ্জিন বন্ধ করল। চারপাশ একদম নিস্তব্ধ, এক মুহূর্ত পর সে একটা রাইফেল হাতে নিয়ে মাটিতে পা রাখল—ট্রাকটা এখানে রেখে যাওয়া যেতে পারে। সামনে কি দেখতে পাবো আমরা জানি না।’
জামাল অন্য রাইফেলটা নিল, তারপর ওরা গিরিখাতের জমাট শিলাস্তরের উপর দিয়ে হাঁটতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ রুথ কানিংহাম অবাক বিস্ময়ে চেঁচিয়ে উপরের দিকে দেখাল। পাথরের গায়ে ওটা কি একটা শিলালিপি নয়?
গিরিখাতের মধ্যে সূর্যকিরণ প্রবেশ করতেই পাথরের গায়ে উত্তীর্ণ শিলালিপিগুলো হঠাৎ ওদের চোখে পড়ল। কেইন কাছে গিয়ে উপরে তাকাল। এক মুহূর্ত পর সে মাথা নাড়ল। এগুলো সাবেঈন লিপি। আমরা ঠিক জায়গায়ই এসেছি।’
সে সামনে এগোল, অন্যরাও তার পিছু পিছু চলল। আরো কয়েকটা শিলালিপি ওরা পার হল। তারপর একটা পাথরের দেয়াল ঘুরে এসে থামল।
দুই পাশে স্তম্ভ শোভিত একটি প্রশস্ত পথ সামনে প্রসারিত হয়ে রয়েছে। কিছু কিছু স্তম্ভ ধ্বসে পড়েছে, অন্যগুলো এখনও অক্ষত। পথের শেষ মাথায় দেখা গেল একটি বিশাল মন্দিরের প্রায় ভেঙে পড়া সম্মুখভাগ। মন্দিরটি গিরিখাতের মুখেই নির্মিত।
কেইনের মুখ শুকিয়ে গেল। এই রকম মুহূর্ত তার জীবনে কখনো আসেনি। সে দ্রুত সামনে এগোতে শুরু করল। অন্যরাও তার পিছু চলতে লাগল।
স্তম্ভশোভিত প্রশস্ত পথের শেষ মাথায়, মন্দিরের ঠিক সামনে একটি গভীর জলাধার। টলটলে পরিষ্কার পানি, কোন এক অদৃশ্য ঝর্না থেকে নেমে আসছে। সে এক লাফে জলাধারের পাশে নিচু হয়ে দুহাতে আঁজলা ভরে পানি পান করল।
পেছনে অন্যদের আসার শব্দ পেল। দুই মহিলা উত্তেজিত কণ্ঠে কথা বলছিল। সে চেঁচিয়ে উঠল, এই পানি বরফের মতো ঠাণ্ডা।
হঠাৎ তাদের কথা বলা থেমে গেল। আর কেইন মুখ তুলতেই পানিতে একটা প্রতিবিম্ব দেখে রাইফেলটা তুলতে গেল।
একটা বুলেট ছুটে এসে জলাধারের কিনারায় পাথরের টুকরো ভেঙে ফেলল। দুই হাত মাথার উপর তুলে সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। জলাধারের অন্যপাশে জনাছয়েক অর্ধনগ্ন বেদুঈন দাঁড়িয়ে আছে, সবার হাতে অত্যাধুনিক লি এনফিল্ড রাইফেল। তাদের ঠিক সামনে বিদ্রুপাত্মক হাসি নিয়ে সেলিম দাঁড়িয়ে আছে।
প্লিজ বোকার মত কিছু করার চেষ্টা করো না, সে তার অতি সতর্ক কাটা কাটা ইংরেজিতে বলল।
বেদুঈনের দলটি দ্রুত জলাধার ঘুরে এপারে এল, তারপর দুভাগ হয়ে দ্রুততার সাথে কেইন আর তার সঙ্গীদের চারপাশে থেকে ঘিরে ফেলল। সেলিম ধীরে সুস্থে এগোল, এক হাত জাম্বিয়ার বাঁটে রেখে অন্য হাত দিয়ে ধীরে ধীরে দাড়ি টানতে লাগল। এক দুই ফুট দূরত্বে এসে থামতেই কেইন মৃদুস্বরে বলল-’পৃথিবীটা বেশ ছোট।
সেলিম মাথা কাত করে সায় দিল–”তোমাকে মারা বড়ই শক্ত। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে ডান হাতের মুঠো দিয়ে কেইনের মুখ বরাবর একটা ঘুসি চালালো।
কেইন কিছুক্ষণ মাটিতে পড়ে রইল। তারপর মাথা ঝাড়া দিতেই টের পেল কতগুলো রাইফেলের মাজল তার দিকে তাক করে রাখা হয়েছে। সে মুখ থেকে রক্ত মুছে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
সেলিম মৃদু হাসল–পুরনো একটা ঋণের ডাউন পেমেন্ট করা হলো। বাদবাকি পরে দেওয়া হবে। আমি কোন সময় ঋণ ভুলি না। সে বেদুঈনদের উদ্দেশ্যে দ্রুত কিছু নির্দেশ দিতেই ওরা গোল হয়ে কাছে এগোল। তারপর কর্কশ স্বরে চেঁচিয়ে বন্দিদের সামনে এগোতে বলল।
মন্দিরে ওঠার বিশাল সিঁড়ির ধাপগুলোর দিকে হোঁচট খেয়ে এগোতে এগোতে কেইন ঘটনাপ্রবাহের হঠাৎ এই পরিবর্তনের কথাটা ভাবলো। প্রথম থেকেই তার বোঝা উচিত ছিল, জন কানিংহাম হয়তো ঠিকই মরুভূমি অতিক্রম করতে পেরেছিল-তবে কোন মানুষ তার ফিরে আসার পথ রুদ্ধ করে রেখেছিল। কিন্তু এখানে সেলিম কেন? এর কোন অর্থ সে খুঁজে পেল না।
সিঁড়ির সর্বোচ্চ ধাপে পা রেখে যখন সে বারান্দা অতিক্রম করল, তখন একেবারে কাছ থেকে মন্দিরের দৃশ্য দেখার পর তার মন থেকে অন্যসব চিন্তাভাবনা দূর হয়ে গেল। মন্দিরটি পাহাড়ের মুখে তৈরি করা হয়েছে। দ্বারমন্ডপ ও পুরো প্রবেশ পথকে ঘিরে রাখা বিশাল স্তম্ভগুলো কমপক্ষে ষাট ফুট উঁচু।
মেরি ওর কাঁধের কাছে এসে হতবাক কণ্ঠে বলল–এরকম কোন কিছু আমি কখনো দেখিনি। পুরো আরবে এমন কিছু নেই যা একে স্পর্শ করতে পারে।’
কেইন ঘাড় কাত করে সায় দিল। আমার মনে হচ্ছে, প্রচণ্ড মিশরীয় প্রভাব রয়েছে। একই রকম দ্বারমন্ডপ কারনাকের মন্দিরে দেখা যায়।
