তারপর নিঃস্তব্ধতা ভেদ করে শোনা গেল একটা নিচু লয়ে কেঁপে কেঁপে ওঠা গুঞ্জন, শব্দটা বাড়তে বাড়তে কান ফাটিয়ে ফেলছে। রুথ কানিংহাম আতঙ্কে ফিরে তাকাল। মেরি তার হাতে হাত রেখে আস্বস্ত করল। ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তাপের পরিবর্তনের কারণে এটা হচ্ছে। বালুর একটা স্তর অন্য স্তরটির উপর উঠে যাচ্ছে।
কেইন মৃদুস্বরে বলল, ‘গান গাওয়া বালু, ভাবছি আলেক্সিয়াসও কি এটা শুনেছিলেন?
রুথ কানিংহাম বলল, তবে একটা বিষয় নিশ্চিত, তিনি তেমন কাউকে পান নি যে তাকে এ বিষয়ের কোন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিতে পারতো।
‘একই কথা। আমার মনে হয় না তিনি এতে ভীত হতেন,’ কেইন শান্ত স্বরে বলল। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পরে সে একটা দোমরানো সিগারেটের প্যাকেট বের করল। এখন আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, এরপর আমরা কি করব।’
মেরি একটা সিগারেট নিয়ে স্পিরিট–স্টোভের আগুন থেকে ধরাল। যখন সে উঠে বসল, তখন তার মুখ দেখে মনে হল কিছু একটা ভাবছে সে। শাবওয়া থেকে এই মন্দিরটার অবস্থান আলেক্সিয়াস কতদূর বলেছিল?
‘প্রায় নব্বই মাইল, কেইন বলল।
‘আমরা এখন শাবওয়া থেকে প্রায় চল্লিশ মাইল এসেছি, তাই না?
কেইন ঘাড় কাত করে সায় দিল। মেরি শুয়ে পড়ল, তার মুখ অর্ধেকটা ছায়ায় ঢেকে গেছে। একটু পর সে ধীরে ধীরে বলল, আমার মনে হয়, এখন আমাদের উচিত হবে ঘুরে গিয়ে মারিবের পথ খুঁজে বের করা। যদি অন্য স্তম্ভগুলো দাঁড়ানো অবস্থায় নাও পাই, তারপরও আমাদের উচিত আলেক্সিয়াসের বর্ণনা মাফিক ঐ মাটি খুঁড়ে গজিয়ে উঠা শিলাস্তূপটা খুঁজে বার করা।
রুথ কানিংহাম সাগ্রহে কেইনের দিকে তাকাল, আপনার কি মনে হয় আমরা তা পারব?
সে মাথা নাড়ল—না পারার তো কোন কারণ দেখি না। আমাদের হাতে যথেষ্ট তেল, পানি আছে। এখন রওয়ানা দিলে ভোরের মধ্যে সেখানে পৌঁছতে পারব। প্রচুর চাঁদের আলোয় দিনে চলার চেয়ে রাতে চলা অনেক আরামপ্রদ হবে।’
মেরি উঠে দাঁড়াল–তাহলে এ সিদ্ধান্তই হল। আমরা সবকিছু গোছগাছ। করে এখুনি রওয়ানা দেব। কেইন ঘুরতেই সে তার শার্টের হাতা ধরল। ‘তোমার একটু ঘুমানো দরকার গ্যাভিন। কয়েক ঘণ্টা আমি চালাই–তারপর আবার তুমি চালিও।
সে প্রত্যাখান করতে চাইছিল, কিন্তু ক্লান্তি তার কাঁধে ভারী একটা কম্বলের মতো চেপে বসায় আধা ঘণ্টা পর সে পেছনে মালপত্রের মাঝে সটান ঘুমিয়ে পড়ল।
মুখে একটা তিক্ত স্বাদ নিয়ে সে জেগে উঠল। কনকনে শীত, উঠে বসে সামনে ঝুঁকল। জামাল পাশেই ঢুলছে আর রুথ কানিংহাম ঘুমিয়ে রয়েছে, তার মাথা একটু পর পর পেছন দিকে হেলে পড়ছে।
সে সামনের সিটে এল। মেরি তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসতেই সে লক্ষ করল তার চেহারায় ক্লান্তির ছাপ। কেইনের মনের অন্তঃস্থলে এক অজানা আর তাৎক্ষণিক কোমলতা জেগে উঠল।
সে বলল, কয়টা বেজেছে?’
‘প্রায় সাড়ে তিনটা।’
সে অন্য পাশ থেকে স্টিয়ারিং হুইলটা তার হাতে নিল। তুমি সরো, আমি চালাবো। আরো এক ঘণ্টা আগেই তোমার উচিত ছিল আমাকে জাগানো।’
মেরি একটা সিগারেট ধরিয়ে কেইনের ঠোঁটে গুঁজে দিল। তারপর দুহাত ভাঁজ করে কেইনের কাঁধে মাথা রেখে তার গায়ে হেলান দিল। এখন আমি ক্লান্তি বোধ করছি।
কেইন সিগারেটে একটা টান দিয়ে মৃদু হাসল, আমার সৌভাগ্য।’
সে সন্তষ্ট হয়ে বলল, “এটা চমৎকার।
ওরা একটা সমতল এলাকা অতিক্রম করছিল। কেইন এক হাতে স্টিয়ারিং হুইল ধরে গাড়ি চালাচ্ছিল আর অন্য হাত দিয়ে মেরির কাধ ধরে তাকে কাছে টেনে নিল। অনেক কিছুই তার বলার ছিল, কিন্তু কোন কিছু বলারও প্রয়োজন নেই।
একটু পর মেরি মুখ তুলে কেইনের গালে একটা চুমু খেলো। চোখে কৌতুক নিয়ে সে বলল, ‘বেচারি গ্যাভিন।’
সে বলল, “যাও তুমি! উচ্ছন্নে যাক সমস্ত নারী!
মেরি মৃদু হাসল-এটা নিয়ে আমরা এখন কি করব?
সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল–আর কি, যা সবাই করে তাই করব। মুকাল্লাতে ফাদার ও’ব্রায়ান আছে। তাকে দিয়ে তোমার কাজ চলবে?’
‘অবশ্যই–আমি ফাদার ও’ব্রায়ানকে পছন্দ করি,’ সে বলল। তারপর কি হবে?
কেইন কাঁধ ঝাঁকাল। এরপর ঘটনাপ্রবাহ আমাদের টেনে নিয়ে যাবে।’
এই ব্যাপারটা নিয়ে মেরি একটু তর্ক করতে চাচ্ছিল, তারপর সে কাঁধ ঝাঁকাল, যেন এই মুহূর্তে সে সন্তুষ্ট হয়েছে। “আচ্ছা সে দেখা যাবে।
একটু পর সে ঘুমিয়ে পড়ল আর কেইন তাকে এক হাতে ধরে রেখে উইন্ডস্ক্রিন দিয়ে সামনে তাকিয়ে রইল। মনে মনে বলছিল, জীবন তাকে আবার ধরে ফেলছে। তবে ভেবে খুশি হলো যে এই পরিবর্তনে সে কিছু মনে করেনি। আগাছাভরা জমি শেষ হয়ে এলে সে ধীরে ধীরে মেরিকে এক কোনে শুইয়ে দিল। লো গিয়ারে বদল করে ট্রাকটা বালিয়াড়ির খাড়া দিক দিয়ে উপরের দিকে উঠতে লাগল।
চাঁদ মলিন হয়ে এসেছে। পুব আকাশে ভোর ছুঁতেই দিগন্তের উপরে ছোট ছোট আলোর টুকরো দেখা দিল। অনিদ্রায় তার চোখ জুলছিল আর গত কয়েক ঘণ্টা অনবরত ট্রাক চালাবার কারণে দুই হাত ব্যথা করছিল।
একটা বালিয়াড়ির উপর এক মুহূর্ত থেমে ফিল্ড গ্লাস দিয়ে মরুভুমির চার পাশ খুঁজে দেখল। দিগন্তের উপর সুর্য উঠল, আকাশ আলোয় ভেসে যেতেই দূরে কিছু একটা চিক চিক করে উঠল। সে ফিল্ড গ্লাস ফোকাস করল। মরুভুমির ছয় সাত মাইল দূরে মাটি খুঁড়ে উঠে আসা লালচে রঙের বিশাল একটা শিলাস্তূপ দেখা গেল।
