কেইন উঠে দাঁড়িয়ে ট্রাকের ভেতরে দেখল। রুথ কানিংহাম একটা প্যাসেঞ্জার সিটে গুটিশুটি মেরে ঘুমিয়ে রয়েছে। কেইন মেরির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল, তারপর ড্রাইভিং সিটে বসল। মেরি আর জামাল ঘুরে অন্য পাশে গিয়ে বসল। কেইন আস্তে ক্লাচ ছেড়ে ট্রাকটা এগিয়ে নিয়ে চলল।
গাড়ির ড্যাশবোর্ডে একটা কার কম্পাস ছিল। কেইন সিদ্ধান্ত নিল উটের রাস্তা ছেড়ে আরো সরাসরি পথ খুঁজে নিয়ে শাবওয়া যাবে।
একটু পর একটা বিরাট কমলা রঙের বলের মতো সূর্য দিগন্তে ডুবতে শুরু করল। দ্রুত রাত নেমে এলো, যে রকম হয়ে থাকে মরুভূমিতে। আকাশ পরিষ্কার। হিরের টুকরার মতো দিগন্ত জুড়ে তারার মালা ছড়িয়ে রয়েছে আর চাঁদের অপার্থিব সাদা আলো যেন মরুভূমিকে ধুয়ে রেখেছে।
কেইনের কাঁধে মাথা রেখে মেরি ঘুমে ঢুলছিল। সে সিটে হেলান দিয়ে স্টিয়ারিং হুইলে হাত স্থির রেখে সামনে রাতের অন্ধকারের দিকে সোজা চেয়ে রয়েছে।
হঠাৎ দৃশ্যটা দেখে সে এমন একটা ধাক্কা খেল যে সাথে সাথে সজোরে ব্রেকে পা চাপতেই ট্রাকটা এমন জোরে থামাল যে সবাই সিটের সামনের দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। তাদের ঘুম ভেঙে গেল।
কী হয়েছে গ্যাভিন? মেরি ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠল।
সে কোন কথা না বলে গাড়িটার ডান দিকে আঙুল তুলে দেখাল।
সামনে একটা ঢিবির উপর সুন্দর একটা পাথরের স্তম্ভ। চাঁদের আলোয় বালুতে তার লম্বা ছায়া পড়েছে।
কেইন ট্রাক থেকে নামল। মেরিও নেমে তার পিছু পিছু স্তম্ভটার দিকে এগোল। কয়েক ফুট দূরত্বে পৌঁছার পর তার পায়ের সাথে ধাতব কিছু একটার ধাক্কা লাগল।
সে নিচু হয়ে কয়েকটা ক্যান তুললো হাতে। কনড বিফ আর স্যুপ। লোকটা যেই হোক আরব নয়, এটা নিশ্চিত।’
তারপর সে নিচু হয়ে আরেকটা বস্তু তুলে নিল। এমন সময় রুথ কানিংহাম আর জামালও ওদের সাথে যোগ দিল। প্রথমে বুঝা গেল না জিনিসটা কি। তারপর উল্টো করে ওদের দিকে তুলে ধরল–বেশ বড় একটা খালি এলুমিনিয়ামের পানির বোতল।
.
১০.
জামাল সযত্নে স্তম্ভটার গোড়া থেকে আলগা বালু পরিষ্কার করতে লাগল। আর কেইন তার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে একটা শক্তিশালী ইলেট্রিক টর্চ ধরে থাকল।
খানিকক্ষণ পর জামাল কাজ শেষ করে কেইনকে দেখাল। কেইন সামনে ঝুঁকে দেখল পরিষ্কার খোদাই করা একটি দীর্ঘ সঙ্কেতলিপি ফুটে উঠেছে। কয়েক মিনিট নিবিষ্টভাবে লিপিগুলো পড়ে দেখল, তারপর উঠে দাঁড়িয়ে ট্রাকের দিকে হেঁটে গেল।
একটা স্পিরিট স্টোভ জ্বালানো হয়েছে। মেরি আর রুথ কানিংহাম একটা পাত্রে গরম পানিতে মটরশুটি গরম করছে। কেইন ওদের পাশে এসে বসতেই রুথ একটা টিনের মগে কফি ঢেলে তার হাতে দিল–আর কিছু পেলেন?
কেইন কফিতে চুমুক দিয়ে বলল, একটা দীর্ঘ সাবেঈন শিলালিপি প্রাচীন শেবা রাজ্যের ভাষা। দুর্ভাগ্যবশত সাথে কোন বই নেই আর আমার স্মৃতিতেও একটু মরচে পড়েছে। মগটা আরো কফির জন্য সামনে এগিয়ে ধরল। দু’একটা সঙ্কেতলিপির অর্থোদ্ধার করতে পেরেছি। যেমন, অ্যাসথার আর দূরত্ব নিয়ে কিছু লেখা, যার সাথে আমি পরিচিত নই।’
মেরি এক হাতে চুল ঠেলে সরালো। স্পিরিট–স্টোভের আলো বাতাসে ভেসে এসে তার মুখের উপর নেচে বেড়াচ্ছিল। তুমি বলতে চাও এটা এক ধরনের মাইলস্টোন?
কেইন মাথা কাত করল। এটা সেই আলেক্সিয়াস কথিত সাতটি স্তম্ভের একটি।
সে বলল, “কিন্তু তা কি করে সম্ভব? রানি শেবার সময়ে যদি স্তম্ভটি প্রোথিত হয়ে থাকে, তাহলে তো এটা প্রায় তিন হাজার বছর পুরোনো।
কেইন বলল, মরুভুমির শুষ্ক তাপের কারণে তা অবশ্যই সম্ভব। আমি মারিবে আড়াই হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো শিলালিপি দেখেছি। সেগুলো দেখে এমন মনে হয়েছে যেন মাত্র গত কাল কোন রাজমিস্ত্রি সেগুলো খোদাই করেছে। আরেকটা বিষয়, তুমি তো জানোই কত ঘন ঘন এখানে বালুঝড় হয়ে থাকে। এগুলি হয়তো বালুর নিচে চাপা পড়েছিল, তারপর বাইরে উঠে এসেছে, বছরের পর বছর ধরে এরকম অনেকবার হয়েছে।’
‘আর ঐ পানির বোতল আর খালি ক্যানটা সম্পর্কে কী মনে করেন? কেইনের হাতে এক প্লেট মটরশুটি তুলে দিয়ে রুথ বলল।
‘আমার মনে হয় আপনার স্বামী এগুলো এখানে ফেলে রেখে গেছেন। এটা তো আমরা জানি তিনি শাবওয়া থেকে উটে চড়ে যাত্রা শুরু করেছেন। এরপর তার যাই হোক না কেন, বোঝা যাচ্ছে তিনি এ পর্যন্ত এসেছিলেন।’
রুথ বলল, কিন্তু ঐ তিন ডাকাত?’ এরকম ডাকাততো আরো থাকতে পারে।
সে মাথা নাড়ল–তাও সত্যি। সমস্ত মানুষ ওদের ধরতে চায় বলে ডাকাতগুলো এমন জায়গায় যায়, যেখানে অন্য কোন মানুষ যেতে সাহস করে না। কিন্তু কোন এক রীতি অনুযায়ী এখান পর্যন্ত ওরাও আসে না। ওরা মরুভুমির ধারে ঘুরে বেড়ায় আর যেখানে পানি পাওয়া যায় তার কাছাকাছি থাকে। যাইহোক শুধু ইউরোপিয়ানরাই এ ধরনের পানির বোতল ব্যবহার করে। বেদুঈনরা ছাগলের চামড়ার তৈরি মশক ব্যবহার করে।
একটু পর মেরি বলল, তাহলে সবই সত্যি–শেবা আর তার মন্দির। আলেক্সিয়াস আর তার রোমান অশ্বারোহী বাহিনী!
‘হ্যাঁ, তারা হয়তো এই পথ দিয়েই গিয়েছিল। কেইন বলল।
তার কথার পর এক ধরনের ভূতুড়ে নিরবতা নেমে এল, মনে হল কেউ নিঃশ্বাস নিচ্ছে না। আর একটা মুহূর্ত সে প্রায় আশা করে বসেছিল, যেন শুনতে পাবে দুরে ঘোড়ার রাশের টুং টাং শব্দ আর দেখতে পাবে বালিয়াড়ির উপরে রোমান অশ্বারোহী বাহিনী উপস্থিত হয়েছে। নেতৃত্বে আলেক্সিয়াস, তার বর্মের উপর চাঁদের আলো ঠিকরে পড়ে চিক চিক করছে। ঘোড়ার রাশ টেনে ধরে তিনি সামনে মরুভুমির দিকে তাকিয়ে রয়েছেন।
