কেইন গাড়ি থেকে নামতেই রুথ কানিংহামও তার পিছু পিছু নামল। “ওমরের সাথে কথা বলার পর আমরা শাবওয়া এলাকায় আকাশে প্লেন নিয়ে একটা চক্কর দেব।’ সে মেরিকে বলল।
সে মাথা কাত করল। সাবধানে থেকো গ্যাভিন, আর মরুভূমির খুব বেশি ভেতরে যেও না। ওড়ার জন্য জায়গটা ভাল নয়। সে তার হাত ঘড়ির দিকে তাকাল। হয়তো–ভাগ্য ভাল হলে, আমরা দুপুরের আগেই এখানে ফিরে আসতে পারব।’
কেইন মৃদু হাসল। আমরাও সহজেই তার আগেই চলে আসতে পারব।’
গিয়ার বদলাবার শব্দ করে ধুলার মেঘ উড়িয়ে ট্রাকটা চলে গেল। রুথ কানিংহামের সাথে কথা বলার জন্য ঘুরতেই কেইন দেখল গ্রামের গোত্র প্রধান তার দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ওদেরকে অভুর্থনা জানাবার জন্য অপেক্ষা করছে।
‘তুমি আমার ঘরকে সম্মানিত করছে ক্যাপ্টেন কেইন, সে আরবিতে বলল।
কেইন মৃদু হাসল। সবসময় আমি কোন কিছুর দরকার পড়লে আসি, বন্ধু। ভেতরে চল। বাইরে খুব গরম আর গত আধ ঘণ্টার ঘটনার পর আমার খুব ইচ্ছা হচ্ছে একটু বসে আরাম করার।
ওমর ওদেরকে তার জানালাবিহীন কাদামাটির ইটের তৈরি বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেল। বাড়িটায় দুটো কামরা। একটাতে পরিবারের ছাগল আর মুরগির পাল আর অন্যটায় সবার জন্য থাকার জায়গা। রাতে ওমর তার পরিবার নিয়ে লম্বা গালিচায় ঘুমায়।
দরিদ্র এলাকা হলেও ওমর বিন নাসেরের মধ্যে স্থানীয় আরব রীতি অনুযায়ী শিষ্টাচার ও মর্যাদা বোধ ছিল। সে কেইন এবং রুথ কানিংহামকে দুটো কুশনের কাছে নিয়ে গিয়ে দুহাতে তালি দিল। এক মুহূর্তের মধ্যে একজন মহিলা কামরায় প্রবেশ করল। লম্বা কালো একটা বোরকা জাতীয় আলখাল্লা পরে রয়েছে, যা দিয়ে তার মুখও সম্পূর্ণ ঢাকা। মহিলাটির বাম হাতে একটা তামার পাত্র আর অন্য হাতে তিনটে কাপ।
স্থানীয় প্রথা অনুযায়ী কেইন প্রথমে প্রত্যাখানের ভান করে একটা কাপ গ্রহণ করল, আর সেই সাথে রুথ কানিংহামকেও ইশারা করল তাকে অনুসরণ করতে। মহিলাটি কয়েকফোঁটা কাপে ঢেলে অপেক্ষা করতে লাগল মতামতের জন্য। এটি ছিল ইয়েমনি মোছা–পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ কফি। কেইন মৃদু হেসে কাপটা তুলে ধরল। মহিলাটি সাথে সাথে কাপটা ভরে দিল।
ওমর হাতের ইশারায় মহিলাটিকে বিদায় করল। কেইন তাকে একটা সিগারেট বাড়িয়ে ধরতেই গোত্র প্রধান আগ্রহ ভরে সেটা গ্রহণ করল।
সিগারেট টেনে সন্তুষ্ট হওয়ার পর সে আরাম করে বসে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বলল। বল তোমার জন্য কী খেদমত করতে পারি?
কেইন রুথ কানিংহামকে দেখিয়ে বলল। আমি এই মহিলার স্বামীর অনুসন্ধান করছি। তিনি প্রায় দুমাস আগে এখানে এসেছেন। তার সম্পর্কে তুমি কিছু বলতে পারবে?
ওমরের চোখের তারা কৌতূহলে নেচে উঠল। সে রুথ কানিংহামের দিকে মাথা হেলিয়ে একটু মৃদু হেসে কেইনকে বলল। এই মহিলা সম্ভবত আরবি জানেন না?’ যখন কেইন মাথা নেড়ে সায় দিল, তখন সে বলল। প্রায় দুই মাস আগে ঠিকই একজন লোক এখানে এসেছিল। সে একটা ট্রাকের কনভয়ের সাথে এসেছিল। ট্রাকটা আমেরিকান জর্ডনের ক্যাম্পে চলে গেল তবে লোকটি বার আল মাদানিতে রয়ে গেল।’
এখান থেকে তারপর সে কোথায় গেল? কেইন বলল।
ওমর কাঁধ ঝাঁকাল। কে জানে? লোকটা একটা পাগল-বদ্ধ উন্মাদ ছিল। সে শাবওয়া থেকে মারিব উটে চড়ে যেতে চেয়েছিল। সে জন্য গাইড খুঁজছিল।’
‘তুমি তাকে লোক দিয়েছিলে? কেইন বলল।
ওমর মাথা নাড়ল। আমি উট দিতে পেরেছিলাম। তবে পথপ্রদর্শক সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। তুমিতো জানোই কেউ রাব আল খালিতে যেতে সাহস করে না, যদি না সে মাথার উপর মূল্য ধার্য করা একজন অপরাধি হয়ে থাকে।’
তারপর সে কী একাই গেল?
গোত্র প্রধান মাথা নাড়ল। সে সময়ে একজন পাগল বেদুঈন–একজন রশিদ এখান দিয়ে যাচ্ছিল। তুমি তো জানোই তারা কী ধরনের হয়ে থাকে। যে কোন এডভেঞ্চারপ্রিয়, গর্বিত, বেপরোয়া মানুষ। সে স্বেচ্ছায় ইংলিশ লোকটার সাথে গেল।
‘তারপর আর তাদের কোন খবর পেয়েছিলে?’ কেইন বলল।
ওমর হালকাভাবে মৃদু হেসে বলল। ক্যাপ্টেন কেইন, এই মুহূর্তে তাদের হাড় রোদে ঝলসাচ্ছে। যে সব বোকা মানুষ রাব আল খালিতে যাবার দুঃসাহস দেখায় তাদের শেষ পরিণতি সেটাই হয়।’
কিছুক্ষণ কেইন ভুরু কুঁচকে বসে রইল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে রুথ কানিংহামের দিকে এক হাত বাড়াল। কিছু জানতে পারলেন?’ সে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল।
সে ঘাড় কাত করল। অনেক কিছু। আপনার স্বামী এখানে এসেছিলেন। তিনি এখান থেকে উট আর রশিদ গোত্রের একজন বেদুঈনক সাথি হিসেবে পেয়েছিলেন। ওমরকে জানিয়েছিলেন যে তিনি শাবওয়া থেকে রাব আল খালি অতিক্রম করে মারিব যাবেন।
তার চোখে একটু ভীতি দেখা গেল। কেইন তার বাহুতে চাপড় দিয়ে আশ্বাস দিল। তারপর ওমরের দিকে ফিরে বলল। অশেষ ধন্যবাদ বন্ধু। তবে এখন আমাদের যেতে হবে। আমি এই মহিলাকে সাথে নিয়ে প্লেন নিয়ে উড়ে শাবওয়া যাবো তারপর আরেকটু ভেতরে মরুভূমিতে দেখবো। সম্ভবত কিছু একটা দেখা যেতে পারে।
ওমর সায় দিয়ে ওদের সাথে দরজা পর্যন্ত গেল। বাইরে রাস্তায় বেরুতেই ওরা দেখল গ্রামের কয়েকজন লোক মৃতদেহগুলো একটা ঠেলা জাতীয় কিছুতে করে নিয়ে গেল।
তাদের আলখাল্লা রক্তে মাখামাখি হয়ে রয়েছে আর মৃতদেহগুলোর উপর মাছি ভন ভন করছে। রুস্থ কানিংহাম থর থর করে কাঁপতে লাগল। ওমর বলল, তুমি জোর বাঁচা বেঁচে গেছ ক্যাপ্টেন কেইন, সে জন্য আমি আনন্দিত।’
