.
০৮.
কেইন জেটি পার হয়ে ওয়াটার ফ্রন্ট ধরে হাঁটতে হাঁটতে দেখতে পেল মাছ ধরা নৌকাগুলো বন্দরের প্রবেশ পথ দিয়ে উপসাগরের দিকে চলে যাচ্ছে। দিনের প্রথম সিগারেট ধরাল সে। সিগারেটের ধোঁয়া গলার পেছনে আটকাতেই কাশতে শুরু করল। একটু ক্লান্ত লাগছে আর ডান চোখের পেছনে একটু ব্যথা মনে হচ্ছে। এক মুহূর্ত থেমে সে ভোরের আলোয় মাছ ধরা নৌকাগুলোর সাদা পালগুলোর পত পত করে ওড়া দেখল তারপর ঘুরে হোটেলের পথ ধরল।
তার পরনে খাকি শার্ট প্যান্ট আর বহুল ব্যবহৃত একটা বুশ হ্যাট। কি মনে করে সে লঞ্চ ছাড়ার আগে কোল্ট অটোমেটিকটা হিপ পকেটে ভরে নিয়েছিল। শাবওয়া এলাকার উপজাতিদের মধ্যে তার অনেক বন্ধু থাকলেও বলাতো যায় না কখন কি ঘটে।
হোটেলে পৌঁছেই রুথ কানিংহামকে দেখতে পেল সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়ানো। একটা গলা খোলা সাদা ব্লাউজ আর ক্রিম রঙের হুইপ কর্ডের প্যান্ট পরে রয়েছেন। চুল বাঁধা রয়েছে সেই একই নীল স্কার্ফ দিয়ে যেটা পরেছিলেন প্রথম দিন। কেইনকে দেখে মৃদু হাসতেই অত্যন্ত আকর্ষণীয় দেখাল তাকে।
‘আমার এই পোশাকে চলবে তো?’ দুদিকে হাত ছড়িয়ে সে বলল।
কেইন মাথা নুইয়ে বলল, “বেশ সাজসজ্জা তবে কাজ চলবে। সে হাত ঘড়ির দিকে তাকাল। আমাদের জলদি পা চালাতে হবে। আমি মেরিকে অপেক্ষা করিয়ে রাখতে চাই না।’
সরু অলিগলির গোলকধাঁধার মধ্য দিয়ে চলার সময় তাদের মাঝে,তেমন কোন কথা হলো না। শেষ পর্যন্ত ওরা শহরের শেষ মাথায় পৌঁছাল। রুথের চোখের নিচে কালো কালির ছাপ, মনে হলো রাতে ভাল ঘুম হয়নি। এছাড়া তার চেহারায় বেশ উদ্বিগ্ন ভাব দেখা যাচ্ছে। এটা কেইনের খুব একটা ভাল মনে হলো না।
কোয়ার্টার মাইল দীর্ঘ বিমানক্ষেত্রটা দাহরানের বাইরে একটা গিরিপথের মুখের কাছে। গিরিপথটা পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে। এটা প্রধান প্রধান এয়ারলাইনসের বিমান অবতরনের জন্য অফিসিয়াল বিমানক্ষেত্র নয়। স্পেনিশ বিমান বাহিনী তাদের বিমান জরুরি অবতরণের জন্য এটা তৈরি করেছিল।
শুধু একটা হ্যাঙ্গার রয়েছে, উপরে করোগেটেড ছাদওয়ালা একটা পড়েপড়ো আর জরাজীর্ণ কংক্রিটের বিল্ডিং। ওরা বেশ দূর থেকে দেখতে পেল প্লেনটা রানওয়ের উপর দাঁড়িয়ে আছে–লাল আর রুপালি রং করা একটা ডি হ্যাঁভিল্যান্ড ব্যাপিড। ওরা এগোতেই দেখল এর টুইন ইঞ্জিন ইতোমধ্যেই টিক টিক করতে শুরু করেছে।
জামাল পেছনের একটা সিটে বসা ছিল। মেরি লাফ দিয়ে প্লেন থেকে মাটিতে নামল কেইনের সাথে দেখা করার জন্য। কেইন পরিচয় করিয়ে দেবার পর দুই মহিলা হাত মেলালো।
‘আমাদেরকে সাহায্য করার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।’ রুথ কানিংহাম বলল।
মেরি কাঁধে একটা ঝাঁকি দিয়ে বলল, “এটা তেমন কিছু নয়, মিসেস কানিংহাম। আমিতো এমনিতেই ব্যবসার কারণে বার আল-মাদানি যাচ্ছিলাম। তারপর সে কেইনের দিকে ফিরে তাকাল, ঠোঁটে মৃদু হাসি আর চোখে দুষ্টুমির ঝিলিক। আশা করি রাতে ভাল ঘুম হয়েছে গ্যাভিন। একটু তাড়াহুড়া করছি বলে দুঃখিত, কিন্তু জর্ডনকে কথা দিয়েছি সাড়ে সাতটার মধ্যে সেখানে পৌঁছাবো।
রুথ কানিংহাম প্লেনে উঠে জামালের পাশের সিটে বসল। সে সরাসরি সামনে তাকিয়ে রইল রুথকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে। মেরি পাইলটের আসনে বসল তারপর কেইনের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি প্লেনটা চালাবে?
সে সম্মতি জানাতেই মেরি পাইলটের আসন ছেড়ে পাশের সিটে সরে বসল। কেইন ধীরে ধীরে ট্যাক্সি করে প্লেনটাকে বাতাসের অনুকুলে ফেরালো। এক মুহূর্ত পরেই রানওয়ের শেষ মাথা তাদের দিকে দ্রুত ধেয়ে এল। সে ধীরে ধীরে কলামটা পেছনের দিকে টানতেই র্যাপিড প্লেনটা গিরিপথের মধ্য দিয়ে উপরে উঠল। দুপাশের পাথুরে দেয়াল দ্রুত পেছনের দিকে ধেয়ে চলল।
গিরিপথ থেকে বের হতেই প্লেনটা ঝাঁকুনি খেতে শুরু করল। কেননা পাহাড়ের মাঝ দিয়ে বাতাস বইছিল ৪০ নটিকেল মাইল গতিতে। ওরা গরম কুয়াশার মধ্য দিয়ে উঠতে থাকল, কুয়াশা চারপাশ অস্পষ্ট করে তুলেছে। ছয় হাজার ফুট উচ্চতায় উঠে আসার পর লেভেল হল উপসাগর রেঞ্জ অতিক্রম করার জন্য।
পাহাড়ের পরই উজ্জ্বল নীল আকাশ। আধ ঘন্টার মধ্যে দূরে আসল মরুভূমি নজরে এল। মরুভূমির রং সোনালি আর গাঢ় লালের মাঝে খেলা করছিল।
তারপর হঠাৎ একটা উঁচু তেলের খনন-স্তম্ভ আর তার চারপাশ ঘিরে থাকা অনেকগুলো তাঁবু আর মোটর গাড়ির উপর দিয়ে ওরা উড়তে লাগল। রুথ কানিংহাম হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল, “ঐ যে দেখুন নিচে একটা ট্রাক দেখা যাচ্ছে!
কেইন জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখল একটা ট্রাক দ্রুত গতিতে ওদের দিকেই ছুটে আসছে। একটু পরেই দুরে কাল ছোপ ছোপ নজরে পড়ল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেগুলো বড় হয়ে একগুচ্ছ সবুজ পাম গাছ আর ছড়িয়ে ছিটিয়ে তৈরি করা সমতল ছাদের কতগুলো বাড়ি হয়ে গেল।
বিমান অবতরন ক্ষেত্রটা ছিল দুটো বালিয়াড়ির মাঝখানে একটা সরু পথ। এর এক মাথায় বাতাসের গতি নির্দেশের জন্য একটা লম্বা খুঁটির উপর উইন্ডসক ওড়ানো রয়েছে। কেইন উপরে একটা চক্কর দিয়ে নিখুঁতভাবে দুই সারি ড্রামের মাঝে অবতরণ করার জন্য বাতাসের অনুকুলে পজিশন নিল। টেক্সিং করে রানওয়ের শেষ মাথায় পৌঁছাতেই ট্রাকটি বাড়িগুলোর মাঝখান দিয়ে ধুলোর ঝড় তুলে ওদের দিকে এগিয়ে এল।
