কেইন লোহার মজবুত দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে বেল চেইন ধরে টান দিল। একটু পর অন্যপাশে লোকজনের সাড়া পাওয়া গেল, তারপর দরজা নিঃশব্দে খুলে গেল।
দরজায় দাঁড়ানো লোকটির দৈহিক গঠন অত্যন্ত অসাধারণ। সোমালি বংশোদ্ভূত লোকটির আবলুস কাঠের মতো কালো মুখ আর কাঁধ পর্যন্ত লম্বা ঢেউ খেলানো কালো চুল। ছয় ফুট ছয় ইঞ্চি লম্বা আর সেই অনুপাতে চওড়া লোকটির পরনে সাদা আলখাল্লা।
দাঁত বের করে হেসে এক পাশে সরে দাঁড়িয়ে সে কেইকে ভেতরে ঢুকতে ইশারা করল। কেইন মৃদু হেসে আরবিতে বলল, “তোমার মিসট্রেস বাড়িতে আছেন, জামাল?’
সোমালি লোকটি দরজা থেকে সরে গিয়ে মাথা নোয়ালো। ইয়েমনের বিশেষ কয়েকটি এলাকার রীতি অনুযায়ী তার কপালের মাঝখানে একটা ছাপ মারা রয়েছে। সে তার প্রভুর কাছ থেকে পালাতে চেষ্টা করেছিল তারপর ধরা পড়ার পর উক্ত বাজারে তার জিহ্বা কেটে নেওয়া হয় অন্যদের সাবধান করার জন্য।
এর পরের বার অবশ্য পালাতে গিয়ে সে সফল হয়। মরুভুমিতে পানির তেষ্টায় যখন সে মৃতপ্রায়, তখন মেরি পেরেট তাকে খুঁজে পায়। সেবা শুশ্রূষা করে তাকে বাঁচিয়ে তুলে। সেই থেকে সে ছায়ার মতোই তার সাথে রয়েছে।
সারি সারি ডুমুর গাছের মাঝখান দিয়ে খোয়া ছড়ানো পথ দিয়ে সে কেইনকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল একটা ঢাকা বারান্দার দিকে। একটা চেয়ারে বসতে ইঙ্গিত করে ঘরের ভিতরে অদৃশ্য হলো।
কেইন বাগানের সুঘ্রাণ নিঃশাসে টেনে নিল। চারপাশে বিভিন্ন রঙের সমারোহ, রাতের বাতাস ফুলের সুঘ্রাণে ভারী হয়ে আছে। কয়েকটা পাম গাছ। দেয়াল ছাড়িয়ে উপরে উঠে মৃদু বাতাসে দুলছে। পাতাগুলো রাতের আকাশ ছুঁয়ে রয়েছে। গাছের মাঝখানে একটা ফোয়ারা থেকে পানি ছড়িয়ে পড়ছে একটা মাছের চৌবাচ্চায়। পেছনে হালকা পায়ের শব্দ পেতেই সে তাড়াতাড়ি ঘুরল আর মেরি পেরেট বারান্দায় আসতেই সে উঠে দাঁড়াল।
ছোটখাট গড়নের পঁচিশ বছর বয়সি সুন্দর একটি মেয়ে। যোধপুর প্যান্ট আর খাকি বুশ শার্টে তাকে অপূর্ব লাগছিল। আরব মায়ের কাছ থেকে সে উত্তরাধিকার সূত্রে কালো চুল পেয়েছে,আর বড় বড় পটলচেরা চোখ আর পুরুষ্ট ঠোঁট।
বাদবাকি সব বিশুদ্ধ ফরাসি। সে মৃদু হেসে একটা চেয়ারে বসল। কেমন আছো গ্যাভিন? কী সুন্দর রাত। আমি এখুনি কিছুক্ষণ ঘোড়ায় চড়ে এলাম।
কেইন দাঁত বের করে হেসে তাকে একটা সিগারেট অফার করল। লাইটার দিয়ে সিগারেট জ্বালিয়ে নেবার পর সে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল। ‘মুকাল্লাতে সব কিছু ঠিকঠাক ছিল তো?
কেইন পকেট থেকে একটা চিঠি বের করে তার হাতে দিল। দুঃখিত, আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। গতকালই আমি তোমার এজেন্টের সাথে দেখা করেছি। সে এটা দিল তোমার জন্য।’
চিঠিটা পড়ার সময়ে কেইন তার দিকে লক্ষ করে তার পরিবর্তিত মুখভাব দেখে অবাক হলো–শীতল, ব্যবসায়ী সুলভ আর উদ্দেশ্য প্রণোদিত। যখন তার বিশ বছর বয়স, তখন তার বাবা মারা যান, আর সে থেকেই সে লৌহ কঠিন হাতে পেরেট এন্ড কোম্পানির কর্তৃত্ব করে যাচ্ছে। লোহিত সাগর থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত তার নাম একটি কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। অত্যন্ত সৎ তবে যে কোন বাজারের ব্যবসায়ীর চেয়েও সে সুচতুর।
মেরি একটু ভ্রুকুটি করে ডেকে উঠল, ‘আহমেদ, একটু এদিকে আসবেন এক মিনিট!
শক্তিশালী গড়নের পাকাঁচলের অধিকারী একজন আরব বারান্দায় বেরিয়ে এলেন। ইউরাপীয় পোশাক পরা লোকটির হাতে একট কলম ধরা, যেন তার কোন জরুরি কাজে ব্যাঘাত ঘটেছে। তিনি এই ফার্মের জেনারেল ম্যানেজার আর, মেরির বাবার একজন পুরোনো ও বিশ্বস্ত বন্ধু।
তিনি কেইনের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে মাথা নোয়ালেন। মেরি চিঠিটা তার হাতে দিল। এটা একটু পড়ে দেখবেন? গ্যাভিন এটা মুকাল্লা থেকে এনেছে। লাভাল বলছে সে তিল তেল যা পায় তাই নেবে। একটু তাড়াতাড়ি চেষ্টা করলে আমরা সমস্ত স্টক কিনে নিতে পারব।’
আহমেদ মাথা নেড়ে ভেতরে ফিরে যেতে উদ্যত হতেই কেইন বলে উঠল। এক মিনিট আহমেদ। আপনি হয়তো আমাকে একটু সাহায্য করতে পারেন।
আহমেদ ঘুরে একটু মৃদু হাসলেন, তারপর পরিষ্কার ইংরেজিতে বললেন, “কি ব্যাপার গ্যাভিন?’
মিসেস কানিংহাম নামে একজন মহিলা এখন দাহরান শহরে আছেন। তিনি তার স্বামীকে খুঁজছেন। তার সম্পর্কে সব শেষের খবর জানা গেছে তিনি দাহরান এসেছেন। কিন্তু কেউ তার সম্পর্ক কিছু বলতে পারছে না।
আহমেদ ভ্রূকুঁচকে এক মুহূর্ত পর মাথা নাড়লেন। কানিংহাম–জন কানিংহাম। হা মনে পড়েছে। তিনি আপ-কান্ট্রিতে শাবওয়া যেতে চাচ্ছিলেন।
‘কখন সেটা? কেইন জানতে চাইল।
তিনি কাঁধ ঝাঁকালেন। প্রায় দুই মাস আগে। তারপর মেরির দিকে ফিরে বললেন। এটা ঘটেছে যখন তুমি বোম্বে গিয়েছিলে। ইংরেজ লোকটি বোট থেকে বন্দরে নেমে আমার সাথে অফিসে দেখা করলেন। তিনি শাবওয়া যেতে চাচ্ছিলেন। আমি তাকে সেখানকার বিপজ্জনক পরিস্থিতির কথা বলে সাবধান করলাম, কিন্তু কোন কথা শুনতে রাজি নন তিনি। জর্ডনের কাছে যন্ত্রপাতি পৌঁছাতে আমাদের চারটা ট্রাকের একটা কনভয় যাচ্ছিল সেদিকে। আমি তাকে ওদের সাথে যেতে দিলাম।’
তারপর কখন সে ফিরে আসে?’ মেরি বলল।
আহমেদ কাধ ঝাঁকালেন। সে ব্যাপারে আমি কিছু জানি না। আমার যতদুর মনে পড়ে তিনি শাবওয়ার সবচেয়ে কাছের গ্রাম-বার আল মাদানি পর্যন্ত ভাড়া দিয়েছিলেন। তারপর তার কি হয়েছে আমি বলতে পারব না।’
