পিরু মাথা নেড়ে সায় দিতেই কেইন নিচে তার শীতল কেবিনে নেমে গেল। একটা ড্রিংক তৈরি করে পোশাক খুলল। তারপর বাংকে শুয়ে রুথ কানিংহাম তাকে যে খামটা দিয়েছিল সেটা হাতে নিল।
পান্ডুলিপির টাইপ করা অনুবাদটা পড়তে শুরু করল। এক ঘণ্টা ধরে নিবিষ্ট মনে পুরোটা পড়ে শেষ করল। তারপর কিছুক্ষণ কেবিনের ছাদের দিকে তাকিয়ে আলেক্সিয়াসের কথা ভাবলো। পাণ্ডুলিপির পাতাগুলো থেকে উঠে এসে তার চোখের সামনে ভেসে উঠল একজন মানুষের সুনির্দিষ্ট অবয়ব। অদম্য দুঃসাহসী, শক্তিশালী, অত্যন্ত বুদ্ধিমান এবং স্বভাবজাত নেতৃত্বের অধিকারী একজন মানুষ। একজন স্বপ্নদর্শী পুরুষ। পান্ডুলিপির সেই অংশটুকু কেইন আবার পড়ল, যেখানে আলেক্সিয়াস মরুভূমির মাঝে মন্দিরটি খুঁজতে গিয়ে তার অনুভূতি তুলে ধরেছে। তার কথার আলোকে লোকটির চরিত্রের দৃঢ়তা পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে। একজন জন্মগত অভিযাত্রীক, সর্বদা অস্থির, সবসময় পাহাড়ের ওপারে তার দৃষ্টি প্রসারিত। কিছু একটা খুঁজে বেড়াচ্ছে সবসময় কিন্তু কখনো তা পায়নি।
সে কি শুধু শেবার মন্দির অনুসন্ধান করছিল না অন্য কিছুরও অনুসন্ধান করছিল? সে কী নিজ সত্ত্বার অনুসন্ধানে ছিল? যা অধিকাংশ মানুষ সারা জীবন খুঁজে বেড়ায় কিন্তু কখনও তা পায় না। সে পান্ডুলিপির শেষ পাতায় গিয়ে শেষ বাক্যটুকু আবার পড়ল।
… আমি, আলেক্সিয়াস, ১০ম লিজিয়নের সিনিয়র সেঞ্চুরিয়ান, বার—-শেবার অধিনায়ক এখানেই এই বিবরণ সমাপ্ত করছি। যদি কেউ শেবার মন্দিরের খোঁজে সাতটি স্তম্ভের পথ ধরে অনুসন্ধান করতে চায়, তাদের জন্য এটি একটি সতর্ক বার্তা। কেননা ঐ সাতটি স্তম্ভ তাদের কেবল মৃতু্যর পথেই এগিয়ে নিয়ে যাবে।
কেইন উপরে ছাদের দিকে তাকাল। তার মাথার উপরে পোর্টহোল দিয়ে ভেতরে আসা রোদের আলোয় যে ধুলির নৃত্য দেখা যাচ্ছিল সেদিকে সে তাকিয়ে ভাবতে লাগল সেই গ্রিক সৈনিকের কথা। একটি ইথিওপিয় প্রবাদ বাক্যে বলা হয়েছে নরকের পথে সাতটি স্তম্ভ রয়েছে। আর ইথিওপিয়রাই একবার স্বল্প সময়ের জন্য দক্ষিণ আরব জয় করেছিল। একটা মুহূর্ত সে ভাবলো এ দুয়ের মাঝে কোন যোগসুত্র আছে কিনা। তারপর ধারণাটিকে অসম্ভব বলে বাতিল করল। ইথিওপিয়রা অনেক পড়ে এটি বিজয় করেছিল। এসব ভাবতে ভাবতে সে ঘুমিয়ে পড়ল।
হঠাৎ ঘুম ভেঙে যেতেই সে অন্ধকারে চোখ মেলল। অবচেতন মনের অতল থেকে একটি বিশেষ অনুভূতি তাকে একটি বিপদ সংকেত দিতে লাগল। বাংকে শুয়ে হাতের আঙুলগুলো বাঁকা করল, ঠিক যেমনটি কোন শিকারীর উপস্থিতি কাছে টের পেলে কোন বন্য প্রাণী করে থাকে।
প্রথমে একটা গন্ধ টের পেলবাসি আর হালকা পঁচা গন্ধ। অলিভ অয়েল কিংবা কোন ধরনের গ্রিজের গন্ধ। তারপর কারো নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ শুনতে পেল আর হঠাৎ টেবিলের গায়ে ধাক্কা লেগে কারো মৃদু শাপান্ত করার শব্দ। সে দম বন্ধ করে অপেক্ষা করতে লাগল। পোর্টাল দিয়ে ভেতরে আসা উজ্জল চাঁদের আলোয় চোখের পাতা অর্ধেকটা খুলে সে দেখতে লাগল।
তারপর নিঃশ্বাসের শব্দ খুব কাছে আসতেই উঁচু করা একটা ছুরির ফলা চাঁদের আলোয় দীপ্তিমান হলো। সে একটা মোচড় দিয়ে দ্রুত গতিতে তার হাঁটুটা একপাশে উঁচু করল। আততায়ীর পেটে ওর হাঁটু জোরে আঘাত করতেই চাপা আর্তনাদ শোনা গেল। ডান হাত দিয়ে কেইন লোকটার কব্জি ধরে জোরে একটা মোচড় দিল। একটা আর্তনাদ শোনা গেল। তারপর ছুরিটা মেঝেতে পড়ে গেল।
কেইন বাংকে উঠে আততায়ীকে ধরার জন্য হাত বাড়াল, কিন্তু লোকটার সারা শরীরে তেল মাখানো ছিল। ফলে সে হাত দিয়ে তাকে শক্তভাবে জাপটে ধরতে পারলো না। বাইন মাছের মতো শরীর মুচড়ে তার হাত থেকে পিছলে দরজার দিকে ছুটে গেল। ডেকে উঠতেই পিরুও লাফ দিয়ে তাকে ধরতে চেষ্টা করল। দুজনের দেহের মাঝে সংঘর্ষ হতেই পিরু যন্ত্রণায় কাতরে উঠল। আততায়ী লোকটা তার হাতের নিচ দিয়ে ছুটে রেইল টপকে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
কেইন কান খাড়া করে শুনতে চেষ্টা করল, কিন্তু কোন শব্দ শোনা গেল না। সে ধীরে ধীরে ঘুরে বলল, তুমি ঠিক আছে তো?
পিরু কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, সাহেব, আমাকে মাপ করুন। আমি যখন ঘুমিয়ে ছিলাম তখন লোকটা জাহাজে উঠে আপনার উপর আক্রমণ চালিয়ে আপনাকে প্রায় মেরে ফেলছিল।’
কেইন তার কাঁধে চাপড় মেরে বলল, ‘দূর বোকা। এতে লজ্জিত হওয়ার কী আছে। লোকটা সম্ভবত পেশাদার খুনি। এরাই কেবল মাত্র কোন কাজে যাবার আগে সারা শরীরে তেল মেখে নেয়। এটা নিয়ে চিন্তা করো না। যাও ডিঙ্গিটা রেডি করো। আমরা এখন সেলিম সাহেবের ওখানে যাবো।
সে নিচে গিয়ে দ্রুত পোশাক পরে নিল। জ্যাকেটের পকেটে কোল্ট অটোমেটিকটা নিয়ে উপরের ডেকে ফিরে এল। সে ভাবলো এবার সেলিমকে একটু শিক্ষা দেবার সময় এসেছে। মাছ ধরার নৌকাগুলোর মধ্য দিয়ে ওরা ফারাহর দিকে যেতে লাগল। ওদের ডিঙ্গিটা বিশাল ধাউটার গায়ে ঘসা খেতেই সে পিরুকে অপেক্ষা করতে বলল। তারপর একটা দড়ির সিঁড়ি বেয়ে উঠে রেইল টপকালো। ডেকে কেউ নেই। স্টার্ণ–ডেকের নিচে ক্যাপ্টেনের কেবিনের দরজাটা দেখা গেল। সে সাবধানে এগোতে লাগল। একমুহূর্ত বাইরে দাঁড়িয়ে একটু ইতস্তত করল, তারপর কান পেতে শুনতে চেষ্টা করে এক লাথিতে দরজা খুলে ডান হাতে কোল্ট অটোমেটিকটা নিয়ে ভেতরে ঢুকল।
