হোটেল থেকে বের হয়ে দেখল চারদিক নিরব, জনশুন্য। কিন্তু কড়া রোদ তাকে এমনভাবে ঢেকে ফেলল যে শরীরের প্রত্যেকটা ছিদ্র থেকে ঘাম বের হয়ে শার্ট আর প্যান্ট ভিজিয়ে দিল। সে ধীরে ধীরে রাস্তার ছায়াময় পাশ দিয়ে হেঁটে মুলারের বাসার দিকে চলল। স্কিরোজের সাথে তার আলোচনাটা সে আবার বিবেচনা করে একটু ভ্রু কুঁচকালো।
যদি কানিংহাম দাহরান এসেই থাকে, এটা আশ্চর্য যে স্কিরোজ তা জানে না। এই ছোট্ট শহরে কোন কিছুই তার নজর এড়ায় না। সম্ভবত কানিংহাম আদৌ দাহরান আসেনি। হয়তো সে তার মত বদলেছিল? শুধুমাত্র তার স্ত্রীকে লেখা চিঠিতেই এ জায়গার কথা লেখা ছিল। আবার অন্যভাবে ভাবলে এটা থোপে টিকে না। সে মেইল বোটে চড়ে এডেন ত্যাগ করেছিল, ব্রিটিশ কনসাল তা নিশ্চিত করেছে। তাহলে সে অবশ্যই দাহরানে পা রেখেছিল। হয়তো সে আগে থেকেই আপ-কান্ট্রির দিকে যাওয়ার ব্যবস্থা করে রেখেছিল আর সেজন্যই হোটেলে কামরা বুক করেনি। তার স্ত্রী যতটুকু বলেছেন, তাতে বোঝা যায় তার হাতে তেমন টাকা ছিল না।
মুলারের বাড়ির অবস্থান বন্দরের উত্তরে একটা সরু গলির মাঝে। প্রবেশদ্বারটা একটা উঁচু দেয়ালের মধ্যে লাগানো। কেইন পুরনো বেল চেইনটা কয়েকবার টানল। উত্তরের অপেক্ষা করতে করতে সে জার্মান লোকটির কথা ভাবলো। মুলার প্রথমবার প্রায় এক বছর আগে দাহরান এসেছিল। সে কঠিন আদব-কায়দা দুরস্ত আপাদমস্তক একজন প্রুশিয়ান। তার আগ্রহ গ্রাফিটির প্রতি-পাহাড়ের গায়ে কঠিন পাথরে আঁকা যেসব প্রাচীন শিলালিপি পাওয়া যেত সে সবের প্রতি। সব সময় ট্রাকে চড়ে সে তার অভিযান চালাতে। সীমান্তের অনেক ভিতরে অনেক বন্য এলাকায় চলে যেত। কখনো দুই কি তিনজনের বেশি আরবীয় লোক সাথে নিত না। কোন অস্ত্রও বহন করতো না। মুসাবেইনরা তাকে একজন পাগল মানুষ মনে করতো। আর সম্ভবত সে কারণেই এতদিন সে টিকে থাকতে পেরেছে।
দরজা খুলে গেল আর কেইন ভেতরে ঢুকতেই পরিষ্কার সাদা আলখাল্লা পরা একজন আরব পরিচারক এক পাশে দাঁড়িয়ে মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানাল। ওরা একটা চমৎকার উঠানে এসে ঢুকল, যার মাঝখানে একটা ঝর্ণা রোদের আলোয় ঝিকমিক করছে। মাথার উপরে দোতলার জানালা থেকে বেরিয়ে আসা বেলকনি দেখা গেল। মুলার সেখানে উদয় হয়ে তার দিকে তাকাল। তার মুখে খুশির হাসি দেখা গেল, সে হাত তুলে ইশারা করল। আহ কেইন, আমার প্রিয় বন্ধু। ঠিক লোকটি এসেছে। উপরে এসো। এখুনি উপরে চলে এসো!’
কেইন পরিচারকের পিছু পিছু ঘরের ভেতরে ঢুকল। সিঁড়ি বেয়ে একটা সরু করিডোরে পৌঁছে পরিচারক একটা দরজা খুলে একপাশে সরে দাঁড়িয়ে কেইনকে ভেতরে ঢুকতে ইশারা করল।
হাফহাতা শার্ট পরা মুলার একটা বিরাট টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। মাথা নুইয়ে অভিবাদন করার সময় সে প্রায় দুপা ঠুকে মৃদু হেসে বলল। ‘আমার কাছে এমন একটা জিনিস আছে যা তোমার মনোযোগ আকর্ষণ করবে। শাবওয়ার কাছে একটা গিরিখাত থেকে একটা শিলালিপির ল্যাটেক্স ছাপ তুলে এনেছি। এটা দেখে তোমার মতামত দাও।
কেইন লম্বা রাবারের টুকরাটা পরীক্ষা করল। শিলালিপির ছাপ তুলতে প্রফেসার একটা নতুন পদ্ধতি অনুসরণ করেছে। রাবারের একটা দ্রবণ পাথরের উপর ঘসে লাগানো হতো। সূর্যের তাপে এটা খুব তাড়াতাড়ি শুকিয়ে শক্ত হলে লম্বা ফালিটা টেনে ভোলা হতো একটা নিখুঁত অনুলিপি সহ।
কেইন বেশ আগ্রহ নিয়ে পাথরে খোদাই করা শব্দগুলো পরীক্ষা করল। এক মুহূর্ত পর মুখ তুলে বলল, ‘কুতাবানিয়ান, তাই না?
মুলার মাথা নেড়ে সায় দিল–হ্যাঁ। এটা আমি প্রাচীন উটে চলার পথ থেকে সামান্য দূরে একটা পাথরের গায়ে পেয়েছি। সঠিক অনুবাদ করার সময় পাই নি, তবে মনে হচ্ছে খ্রিষ্ট পূর্ব ৭ অব্দে শেবার রাজ্যের সাথে একটা যুদ্ধের কথা বলা হয়েছে এখানে।
কেইন টেবিলের কিনারায় বসল। তুমি জানো, আমার জানা মতে গত চার মাসের মধ্যে এই নিয়ে তৃতীয়বার তুমি শাবওয়া এলাকায় গিয়েছ। তোমার কি মনে হয় না এতে তুমি নিজের বিপদ ডেকে আনছো?”
মুলার নাক টেনে বলল, দেশ চালায় কে তা নিয়ে আমার মাথা ব্যথা নেই, যতক্ষণ না আমাকে একাকী আমার কাজ করতে দেয়। উপজাতীয়রা এটা জানে, তাই তারা আমাকে বিরক্ত করে না।
কেইন কাঁধ ঝাঁকি দিল, “ঠিক আছে। পরে এটা বলো না যে আমি তোমাকে সাবধান করিনি। আচ্ছা বল তো গত দুই মাসে তুমি শাবওয়া এলাকায় কোন ইউরোপীয় মানুষের দেখা পেয়েছ?
মুলার অবাক হয়ে ওর দিকে তাকাল–’কেবল জর্ডন। তোমার দেশি সেই পাগল লোকটা। একথা জিজ্ঞেস করছো কেন?
কেইন তাকে জানাল, শহরে একজন মহিলা তার স্বামীকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন। কানিংহাম নামে একজন প্রত্নতত্ত্ববিদ, তার দুমাস আগে শাবওয়ার দিকে যাওয়ার কথা। তারপর থেকে কেউ তার কোন হদিশ পাচ্ছে না।
মুলার পেছনে মাথা হেলিয়ে কর্কশভাবে হেসে উঠল ‘পাওয়ার কথাও নয়, যদি তিনি এক গিয়ে থাকেন। কিন্তু ঐ ভদ্রলোক শাবওয়ায় কি খুঁজছিলেন?
কেইন কাঁধ ঝাঁকাল। আমার মনে হয় তিনি তোমার মতো গ্রাফিটি খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন।
ধন্যবাদ,আমার কোন প্রতিযোগিতার প্রয়োজন নেই। মুলার উঠে জানালার কাছে গেল, তার ভ্রু কুচকে রয়েছে। না, আমি এই লোকের দেখা পাই নি। সে মাথা নাড়ল। ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত। আরেকজন ইউরোপিয়ান এই পাহাড়ে এলে আমি নিশ্চয়ই জানতাম।
