গ্রিক লোকটি মুখ থেকে চুরুট সরিয়ে বলে উঠল, ‘বাপরে বাপ, কি গরম পড়েছে। ভেতরে এসে আমার সাথে একটা ড্রিংকস নেবে?
একটা মুহূর্ত কেইন ভাবছিল তার আমন্ত্রণ প্রত্যাখান করবে। তারপর কি ভেবে মত বদলালো। দাহরানে খুব কম ব্যাপারই স্কিরোজের নজর এড়িয়ে ঘটে। সে সায় দিয়ে সামনে এগোল। ঠিক আছে, যদি তুমি বেশ লম্বা আর ঠাণ্ডা একটা ড্রিংকস বানাও তবে আমি রাজি আছি আসতে।’
স্কিরোজ কামরায় ঢুকল রুমালে মুখ মুছতে মুছতে। জানালার পাশে একটা বড় বেতের চেয়ারে ধপাশ করে বসে পড়ল। টেবিলে রাখা কয়েকটা বোতল আর একটা বড় জগে বরফজলের দিকে ইঙ্গিত করে বলল, তুমি বরং ড্রিংকসটা বরফ জল দিয়ে মেশাও, বন্ধু। আমার আর বোতল তোলার শক্তি নেই।’
কেইন দরজা বন্ধ করে টেবিলের কাছে এগোল। সে তাড়াতাড়ি দুটো বড় জিন-স্লিং তৈরি করে একটা গ্লাস স্কিরোজের হাতে তুলে দিল। সে এক ঢোকে। অর্ধেকটা গিলে ঘোঁতঘোঁত করে উঠল। ক্রিস্ট, ওহ, আরাম পেলাম। প্রত্যেক বছরের শুরুতে আমি ভাবি এটাই হবে এই অভিশপ্ত জায়গায় আমার শেষ বছর। আমি আমার মায়ের কবরের নামে শপথ নেই যে আমি গ্রিসে আমার বাড়িতে ফিরে যাবো, কিন্তু…’ তারপর সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার দুকাঁধ ঝুলে পড়ল।
‘কেন যাও না? কেইন বলল।
স্কিরোজ এক সারি ক্ষয়ে যাওয়া দাঁত বের করে হাসল।
কারণ আমি লোভী। এখানে আমি খুব সহজেই অনেক টাকা কামাতে পারি।’ গ্লাসে আরেক চুমুক দিয়ে বলে চলল, কিন্তু আমি তোমাকেও একই কথা জিজ্ঞেস করতে পারি। তোমার মত একজন মানুষের জন্য দাহরানে কি আকর্ষণ থাকতে পারে? সে আবার দেতো হাসি দিতেই তার চোখ জোড়া জুল জ্বল করে উঠল। এটা কি সেই চমৎকার মাদমোয়াজেল পেরেট হতে পারে না?’
কেইন শান্তভাবে কাঁধে ঝাঁকি দিল। নারী আমার কাছে তেমন কিছু নয় স্কিরোজ। আমিও তোমার মত একই কারণে দাহরানে আছি। আমি এখানে টাকা কামাতে পারি–অতি সহজে আর কোন ট্যাক্স না দিয়ে। আজকাল তেমন জায়গা খুব বেশি একটা নেই, যেখানে মানুষ এ কাজ করতে পারে।’
স্কিরোজ মুখ টিপে হাসল। আর ইউরোপকে এড়ানো, যুদ্ধকে এড়ানো।
‘তুমি কি মনে কর এটা ঘটবে? কেইন জিজ্ঞেস করল।
‘অবশ্যই ঘটবে। হিটলার যা চেয়েছে তাই পেয়েছে। পোলান্ড কি আলাদা কিছু?
‘সেটা আমার দেখার বিষয় নয়। কেইন বলল।
‘আমারও নয়, স্কিরোজ গ্লাসটা শেষ করল। আর এই সুন্দরী মিসেস কানিংহামের বিষয়টা কি? রোজ রোজ দাহরানে এত সুন্দর অতিথি কিন্তু আমরা তেমন পাই না।’
কেইন টেবিলের একটা হাতির দাঁতের বাক্স থেকে একটা সিগারেট নিয়ে ধরাল। কেন উনি তোমাকে বলেন নি কেন এসেছেন এখানে?
স্কিরোজ মাথা নেড়ে জানাল, তিনি জাহাজ থেকে সরাসরি হোটেলে চলে আসেন। কামরা বুকিং করার পরপরই তোমার খোঁজ করেন। তবে তার কোন কারণ বলেননি। প্রথমে আমি ভাবলাম তোমরা হয়তো পুরোনো বন্ধু। সত্যি বলতে কি আমি ভেবেছিলাম তোমার অতীত হয়তো ফিরে এসেছে।
কেইন হেঁটে জানালার কাছে গেল। বন্দরের দিকে তাকিয়ে পেছন না ফিরেই সে বলল, তিনি তার স্বামীকে খুঁজতে এসেছেন। আপাত মনে হয় তিনি তাকে ছেড়ে চলে এসেছেন। সর্বশেষ সংবাদ অনুযায়ী তিনি জানতে পেরেছেন ভদ্রলোক এদিকেই রওয়ানা দিয়েছিলেন।
স্কিরোজ অবাক হয়ে ঘোৎ ঘোঁৎ করে উঠল–”কিন্তু এখানে কেন আসবে?
কেইন এবার ফিরে তার মুখোমুখি হয়ে কাঁধে একটা ঝাঁকি দিল। তিনি ইংল্যান্ডের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতুবিদ্যার প্রভাষক। সম্ভবত শাবওয়া এলাকায় ধ্বংসাবশেষগুলো দেখতে এসেছেন।
স্কিরোজ ভ্রু কুঁচকালো। কিন্তু সেখানে তো সেই পাগল আমেরিকান জর্ডন ছাড়া আর কেউ টিকতে পারেনি।’
কেইন ঘাড় কাত করে বলল, ‘সেটা সত্যি। কিন্তু প্রফেসর মুলার? তিনি তো কয়েকমাস ধরে সেই এলাকায় পাথরের উপর খোদাই করা লিপি খুঁজে বেড়াচ্ছন। তিনিওতো সেখানে টিকে রয়েছেন।’
স্কিরোজ নাক টানল। “ওহ সেই জার্মান কুকুরটা।’ সে মাটিতে এক দলা থুথু ফেলে জুতার ডগা দিয়ে কার্পেটে ঘসলো। তাকে পাহারা দিচ্ছে স্বয়ং শয়তান। তবে একদিন সে খুব বেশি দূর যাবে। তারপর একদিন তাকে পাওয়া যাবে মাথায় একটা বুলেট নিয়ে পড়ে আছে।
কেইন বলল, সে কি এখন শহরে আছে?
স্কিরোজ মাথা নেড়ে বলল। হ্যাঁ, গত রাতে সে বাই-রোড এসেছে। ঠিক রাত এগারোটার সময় হোটেলের পাশ কাটিয়ে গেল যখন আমি এক ব্যাটাকে লাথি মেরে ভাগাচ্ছিলাম।
কেইন টেবিলের পাশে গিয়ে আরেকটা ড্রিংক নিল। তাহলে তুমি এই কানিংহাম নামে লোকটার সম্পর্কে কিছুই জানো না?’
স্কিরোজ তার বিশাল কাঁধে ঝাঁকি মেরে বলল, না। তার আসার কথা ছিল কবে? যখন কেইন তাকে তারিখটা জানাল তখন সে এক মুহূর্ত ভুরু কুঁচকে তারপর মাথা নেড়ে বলল, না তেমন কিছু মনে পড়ছে না।
কেইন ড্রিংকস শেষ করে হেঁটে দরজার কাছে গেল। আমার মনে হয় একবার মুলারের সাথে দেখা করি। তার সাথে হয়তো কানিংহামের দেখা হয়ে থাকতে পারে।
সে দরজা খুলতেই স্কিরোজ বলল, কিন্তু বন্ধু, তুমি এত ঝামেলা পোহাতে যাচ্ছো কেন? আমি কিন্তু সত্যি বলছি কিছুই বুঝতে পারছি না।’
কেইন ঘুরে দাঁত বের করে হাসল। সে একটা হাত তুলে অপর হাতের তালুতে বুড়ো আঙুল দিয়ে একটা ঘসা দিল, যেটা বিশ্বের সব জায়গায় একটি বিশ্বজনীন ভাষা হিসেবে সহজেই বোঝা যায়। টাকার জন্য।’ সে বলল, আর কি?
