এবার কেইনের আগ্রহ বাড়তে লাগল। সেটিও কি আরবিতে ছিল?
সে মাথা নেড়ে বলল। সেটা ছিল গ্রিক ভাষায়। আলেক্সিয়াস নামে একজন গ্রিক অভিযাত্রির একটি বিশেষ অভিযানের বর্ণনা। তিনি রোমান সেনাবাহিনীর দশম লিজিয়নে একজন সেঞ্চুরিয়ান ছিলেন। রুথ চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল। আপনি এলিয়াস গ্যালাস নামে একজন রোমান জেনারেলের নাম শুনেছেন?’
কেইন দ্রুত মাথা নাড়ল। খ্রিষ্টপূর্ব ২৪ শতকে তিনি দক্ষিণ আরব বিজয়ের চেষ্টা করেছিলেন। দক্ষিণে শেবা পর্যন্ত গিয়ে মারিব শহর দখল করেন। ফেরার পথে অত্যন্ত প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখিন হন। মরুভূমিতে তার সৈনিকদের বেশির ভাগই হারিয়ে যায়।’
রুথ মাথা নেড়ে সায় দিল। আলেক্সিয়াসের বর্ণনা অনুযায়ী তারা আরো দক্ষিণে এগিয়ে টিমনা পর্যন্ত এগোন। তারপর শাওয়ার দিকে মার্চ করতে থাকেন। সেখানে পৌঁছে এলিয়াস গ্যালাস শেবার মন্দিরের কথা শোনেন। এর অবস্থান হওয়ার কথা শাবওয়া আর মারিবের মাঝে প্রাচীন মশলার রুটের কাছে। পথটা মরুভূমির এক কোন দিয়ে অতিক্রম করেছে। সেই জায়গার সম্পদ সম্পর্কে অনেক গল্প প্রচলিত ছিল। আলেক্সিয়াসের প্রতি নির্দেশ ছিল একদল অশ্বারোহী নিয়ে মরুভূমিতে অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে পরবর্তীতে মারিবে মূল বাহিনীর সাথে মিলিত হওয়া।’
রুথ একটু বিরতি দিতেই কেইন বলল, বলে যান। সে কি তা খুঁজে পেয়েছিল না পায়নি?
রুথ মৃদু হাসল। হ্যাঁ, সে অবশ্যই তা খুঁজে পেয়েছিল। মরুভূমির মাঝে সাতটি পাথরের স্তম্ভ দিয়ে পথটি চিহ্নিত ছিল আর মন্দিরটি ছিল শাবওয়া থেকে আশি নব্বই মাইল দূরে। একটি গিরিখাতের মাঝে এক বিশাল পাথরের ভ্রুপের মাঝে এটি অবস্থিত ছিল আর আলেক্সিয়াসের বর্ণনানুযায়ী অপ্রত্যাশিত ভাবে এটি বালিয়াড়ির ভেতর থেকে বের হয়ে এসেছিল। যখন তারা সেখানে পৌঁছাল তখন মন্দিরটি শূন্য ছিল কেবল একজন পুরোহিত–বৃদ্ধা রমণী উঁচু বেদিতে প্রদীপ জ্বালিয়ে বসেছিল। প্রথমে যারা ঢুকেছিল তারা কোন ধনরত্ন না দেখতে পেয়ে এত নিরাশ হয়ে গিয়েছিল যে তারা ঐ বৃদ্ধা রমণীটিকে নির্যাতন শুরু করল, কথা বলতে। আলেক্সিয়াস অনেক দেরিতে আসায় ওদের থামাতে পারল না। ততক্ষণে ওদেরকে অভিসম্পাত করতে করতে বৃদ্ধা মারা গেল।
তারপর নিরবতা নেমে এল। কেইন হঠাৎ এক ধরনের শিহরন অনুভব করল। সে বলল, ওরা কি মন্দিরের গুপ্তধন খুঁজে পেয়েছিল?
রুথ মাথা নাড়ল। এটা খুব গোপনে সংরক্ষিত ছিল। দুটো দিন অনেক খোঁজাখুঁজি করেও সফল হলো না। তারপর ওরা শাবওয়ার দিকে ফিরে চলল। ফেরার পথে খোলা প্রান্তরে প্রথম রাতে ওরা ভয়ংকর বালু ঝড়ের কবলে পড়ল। একদিনের বেশি চলল এই ঝড়। কয়েকটা ঘোড়া হারিয়ে ওরা একটা ঘোড়ার পিঠে দুজন করে চলতে লাগল। এরপর পানির প্রথম কুপটির কাছে পৌঁছে দেখল তাতে বিষ মেশানো হয়েছে।’ রুথ কাঁধ খানিকটা উঁচু করে ঝাঁকি দিল। বাদবাকি ঝঞ্ঝাটপূর্ণ বিবরণ বাদ দিলে এটুকু বলতে হয় যে, একমাত্র আলেক্সিয়াস মরুভুমি থেকে পায়ে হেঁটে জীবিত ফিরে এসেছিলেন।
কেইন বলল, তিনি সত্যিকার একজন মানুষ ছিলেন বটে।
সে মাথা নেড়ে সায় দিল। আমি আপনাকে পান্ডুলিপির অনুবাদটা পড়তে দেব। আপনি নিজেই বিবেচনা করতে পারবেন। তিনি ব্যাখ্যা করেননি কেম করে মূল সেনাবাহিনীর সাথে মিলিত হয়েছিলেন, তবে যে করেই হোক কি তা পেরেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি প্যালেস্টাইনে বার-শেবা দূর্গের অধিনে ছিলেন।
কেইন উঠে সামনে এগিয়ে প্যারাপেটের কিনারায় এসে দাঁড়াল। তার দৃষ্টি চলে গেল এডেন উপসাগরের দিকে।
ক্যাটালিনা বন্দরে পানি ছড়িয়ে শহর পার হয়ে যাচ্ছে। একটা পণ্যবাহী জাহাজ দিগন্ত দিয়ে ধীরে ধীরে ভারত উপমহাসাগরের দিকে যাচ্ছে। আর তিনটা ধাও বড় বড় পাখির মতো বন্দরের দিকে এগিয়ে আসছে।
সে এসব কিছুই দেখেনি। তার চোখের সামনে তখন শূন্য এলাকা রাব আল-খালি ভেসে রয়েছে, যার মাঝে কোথাও লুকিয়ে রয়েছে শেবার মন্দির।
যখন সে সিগারেট ধরাল তখন তার হাত কাঁপছিল আর সারা শরীর অজানা উত্তেজনায় শক্ত হয়ে গিয়েছিল। এ ধরনের অভিজ্ঞতা ইতোপূর্বে তার জীবনে কেবল দুবার ঘটেছিল। দুবারই সে একটি অভিযাত্রী দলের অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ কোন আবিষ্কারের সন্ধিক্ষণে ছিল।
কিন্তু এটি সম্পূর্ণ আলাদা। এটি এমন এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়–যা সারা জীবনে কেবল একবারই পাওয়া যায়। এমন একটি বিষয় যা নসোস কিংবা ভ্যালি অফ দি কিংএ তুতেনখামেনের সমাধি আবিষ্কারের সাথে তুলনীয় হতে পারে।
যখন সে ফিরে রুথের মুখোমুখি হল, তখন সে নিজের স্থির কণ্ঠস্বর দেখে অবাক হল। আপনার কি কোন ধারণা আছে আপনি এখন আমাকে যা বলেছেন তা যদি সত্য হয় তবে এর গুরুত্ব কতটুকু?
রুথ ভুরু কুঁচকে বলল, “আপনি কি গুপ্তধনের কথা বলছেন?
রাখুন আপনার গুপ্তধন!’ সে টেবিলে ফিরে এসে চেয়ারে বসল। শেবার সম্পর্কে যা কিছু আমরা জানি তা কেবল বাইবেলে আছে। তার নাম উল্লেখ করে কোথাও কোন শিলালিপি পাওয়া যায়নি, এমনকি মারিবেও নেই। যে জায়গাকে বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞ তার রাজধানী ছিল মনে করেন। এরকম একটা আবিষ্কার শুধু একাডেমিক জগতেই নয়, সারা দুনিয়ায় আলোড়ন তুলবে।
