কেইন ভ্রূ উপরের দিকে তুলল, ব্যস এই?’
রুথ মাথা নাড়ল। সে ছিল একজন দীর্ঘদেহী বিশিষ্ট ইংলিশম্যান। তার মতো এমন শান্ত প্রকৃতির মানুষ আমি কখনো দেখিনি।
সমস্যাটা কখন শুরু হল?’
রুথ একটু মৃদু হাসল। আপনার উপলব্ধির ক্ষমতা খুব বেশি, ক্যাপ্টেন কেইন।’ তারপর কয়েক মুহূর্ত সে হাতের গ্লাসের দিকে তাকিয়ে থাকল। সত্যি বলতে কি প্রায় সাথে সাথেই শুরু হল। আমি খুব শিগগিরই আবিষ্কার করলাম, অত্যন্ত নীতিবান একজন মানুষকে আমি বিয়ে করেছি, যে কেবল তার নিজের পায়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকাতেই বিশ্বাস করে।
“সে তো ভালই মনে হচ্ছে।
রুথ মাথা নেড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কিন্তু আমার বাবার কাছে নয়। তিনি চাচ্ছিলেন সে তার ফার্মে যোগ দিক, কিন্তু জন সে কথা শুনতেই চাচ্ছিল না।
কেইন দাঁত বের করে হাসল। ব্যস, জনের খেলা শুরু হয়ে গেল। তারপর কি হল?
রুথ চেয়ারে হেলান দিল, আমরা লন্ডনে থাকতাম। জন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার কাজ করতো। অবশ্য বেতন খুব বেশি ছিল না। তবে আমার বাবা আমাকে বেশ ভাল অংকের হাত খরচ দিতেন।
মানে যে স্টাইলে আপনি জীবন যাপন করতে অভ্যস্ত ছিলেন তার খরচ পোষাতে? কেইন বলল। তার কণ্ঠস্বরে খানিকটা সন্দেহপূর্ণ কৌতুকের আভাস পাওয়া গেল।
রুথ মাথা নিচু করে বলল, অনেকটা সে রকমই।
“আর আপনার স্বামী সেটা পছন্দ করতেন না?
বুথ উঠে দাঁড়াল। হেঁটে একটু সামনে এগিয়ে সাগরের দিকে তাকাল। না, সে মোটেও তা পছন্দ করতো না। একঘেয়ে–কণ্ঠস্বরে সে বলল, তারপর ঘুরে যখন কেইনের মুখোমুখি হল, তখন সে টের পেল রুথের চোখে পানি এসে যাচ্ছে। কিন্তু তারপরও সে এটা মেনে নিয়েছিল, কেননা সে আমাকে ভালোবাসতো।
তারপর সে ফিরে এসে চেয়ারে বসল। কেইন আলতোভাবে রুথের হাতের উপর হাত রাখল। আরেকটা ড্রিংক দেব?’ সে মাথা নেড়ে মানা করল। কেইন কাঁধে একটা ঝাঁকি দিয়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল।
রুথ মুখের সামনে থেকে একগুচ্ছ চুল হাত দিয়ে পেছনে ঠেলে দিয়ে বলল, দেখুন আমার বাবা নিজের চেষ্টায় জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়া একজন মানুষ। জীবনের প্রতিটা ইঞ্চি তাকে যুদ্ধ করে এগোতে হয়েছে। তিনি জনকে সাদামাটাভাবে বলেছিলেন তিনি তার কাছ থেকে বেশি কিছু আশা করেন না।
‘আর এতে আপনার স্বামীর কী প্রতিক্রিয়া হল?’
রুথ বলল, আমি যেরকম জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিলাম সে রকমভাবে চলার জন্য জোর খাটালাম। আর এতে আমার নিজের টাকা থেকে দিতে হতো। কাজেই জন নিজেকে অযোগ্য মনে করতে লাগল। ধীরে ধীরে গুটিয়ে নিল নিজেকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার কাজে আরো বেশি সময় কাটাতে লাগল। আমার মনে হয় সে একজন পাগলের মতো ভাবছিল যে এতে তার সুনাম হবে।
কেইন একটা লম্বা শ্বাস নিল। বুঝলাম, তারপর সে আপনাকে ছেড়ে চলে গেল, তাইতো?’
রুথ মাথা নেড়ে সায় দিল। এক রাতে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সে আর ফিরে এল না। আমার জন্য তার অফিসে একটা চিঠি রেখে গেল। আমাকে বলল কোন চিন্তা না করতে। খুব জরুরি একটা ব্যাপারে তাকে কয়েক সপ্তাহের জন্য দূরে যেতে হচ্ছে।’
‘এতে কিন্তু এখনও বোঝা যাচ্ছে না কেন আপনি দাহরানে আপনার স্বামীর খোঁজে এসেছেন?’
‘সে কথাতেই আসছি এখন,’ সে বলল। চারদিন আগে এডেনের ব্রিটিশ কনসালের কাছ থেকে আমার কাছে একটা প্যাকেট আসে। তাতে কিছু কাগজপত্র আর জনের একটা চিঠি ছিল। তাতে লেখা সে উপকুলীয় স্টিমারে দাহরান যাচ্ছে। সেখান থেকে আরো ভেতরের দিকে শাবওয়া যাবে। প্যাকেটটা কনসালের হাতে দিয়ে কঠোর নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিল, যদি দু’সপ্তাহের মধ্যে সে নিজে এসে সেটা দাবী না করে, তাহলে যেন ওটা আমার কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
কেইন অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। কিন্তু শাবওয়া তো মোটেই নিরাপদ জায়গা নয়। সে বলল। দুনিয়ার সবচেয়ে বড় একটা মরুভূমি শাবআল-খালি–শূন্য এলাকার ঠিক কিনারায়। সেখানে তিনি কি করতে গেছেন?
একটা মুহূর্ত রুথ একটু ইতস্তত করল, তারপর ধীরে ধীরে বলল, আপনি কখনো অ্যাসথারের কথা শুনেছেন, ক্যাপ্টেন কেইন?
সে একটু ভ্রু কুঁচকে বলল। এক প্রাচীন আরবি দেবী ভেনাসের সমতুল্য। শেবার আমলে তার পুজা হতো।
রুথ মাথা নেড়ে সায় দিল। ঠিক বলেছেন। শেবার রানিও এই গোষ্ঠির একজন উচ্চ পুরোহিত ছিলেন। ওদের মাঝে এক মুহূর্তের নিরবতা নেমে এল। এরপর সে আবার বলতে শুরু করল। আমার স্বামী কোন কারণে বিশ্বাস করতেন ঐ শূন্য এলাকার কোথাও শেবার তৈরি করা অ্যাসথার দেবীর একটা মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ আছে।
আবার কিছুক্ষণের জন্য নিরবতা নেমে এল, তারপর কেইন হতবাক হয়ে তার তাকিয়ে দুদিকে মাথা নাড়তে লাগল। না, মিসেস কানিংহাম, আপনার স্বামী যদি সেই জিনিস খুঁজতে গিয়ে থাকেন, সেক্ষেত্রে অবাক হওয়ার কোন কারণ নেই–কেন আপনার স্বামী আর যোগাযোগ করেন নি। ঐ জায়গায় কেবল বালু, গরম আর তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছু নেই।
‘কিন্তু আমার স্বামী অন্য উপায়ে কিছু জেনেছিলেন। দেখুন কয়েকমাস আগে তিনি একটি অত্যাশ্চর্য বিষয় আবিষ্কার করেছিলেন। তার গবেষণার কাজের অংশ হিসেবে তাকে প্রাচীন আরবি পান্ডুলিপি আর ভুর্জপত্র অনুবাদ করতে হয়েছিল। এর বেশিরভাগ সিনাই পর্বত এলাকার সেইন্ট ক্যাথারিন মঠ থেকে এসেছিল। এগুলো নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি লক্ষ করলেন এর একটি ইতোপূর্বে ব্যবহার করা হয়েছে। ঐ পুরনো হস্তলিপির কিছু অংশ মুছে গেছে। তখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষায়িত যন্ত্র ব্যবহার করে মূল লেখাটার একটা অনুলিপি তৈরি করলেন।
