উঁচু হোটেলটির সামনে একটা সরু প্রবেশ পথ রাস্তা পর্যন্ত চলে এসেছে। ভেতরে এই শ্বাসরুদ্ধকর গরমে পুরনো একটা ফ্যান আস্তে আস্তে ঘুরছে। কেইন প্রবেশ ঘরটি পার হয়ে বারের দিকে পথ দেখিয়ে চলল।
ভেতরে কেউ নেই, কেবল সাগর থেকে বয়ে আসা মৃদু মন্দ বাতাসে ফ্রেন্চ উইন্ডোগুলো হালকা শব্দ করছে। রুথ কানিংহাম সানগ্লাস খুলে একটু ভ্রু কুঁচকালো।
‘এই জায়গায় কি কোন সার্ভিস পাওয়া যাবে না?
কেইন কাঁধে ঝাঁকি দিল। এই এলাকায় খুব একটা কাজকর্ম নেই। বেশিরভাগ মানুষ বিকেলে ঘুমিয়ে কাটায়। তাদের ধারণা এই প্রচণ্ড গরমে আর কিছু করার নেই।’
রুথ মৃদু হাসল। হু, তাই বলা হয়, ভ্রমণে অনেক কিছু জানা যায়।
কেইন বারের পিছনে গিয়ে বলল, “আপনি বরং বাইরে বারান্দায় গিয়ে বসুন, আমি ড্রিংকস নিয়ে আসছি। সাগর থেকে আসা হাওয়ায় ওখানে একটু ঠাণ্ডা পাওয়া যাবে।’
সে মাথা নেড়ে ফ্রেন্চ উইন্ডো দিয়ে বাইরে গিয়ে একটা রঙ্গিন ছাতার নিচে একটা বড় বেতের চেয়ারে বসল। কেইন বারের নিচে থেকে পুরনো আইসবক্স খুলে বড় দুই বোতল লেজার বিয়ার নিল। বোতলদুটো এত ঠাণ্ডা যে বাইরের দিকে আদ্রতা জমে ফোঁটা ফোঁটা বরফ হয়ে গিয়েছে। সে বারের গায়ে ঠেকিয়ে এক টানে বোতলের ক্যাপ খুলে দুটো লম্বা পাতলা গ্লাসে ঠাণ্ডা বিয়ার ঢেলে নিয়ে বাইরে বারান্দায় গেল।
গ্লাসটা রুথের হাতে তুলে দিতেই সে কৃতজ্ঞ চিত্তে তার দিকে তাকিয়ে তাড়াতাড়ি গ্লাসে একটা চুমুক দিল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল। আমি প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম যে এত ঠাণ্ডা কোন কিছু আছে। এই জায়গাটা একটা চুল্লির মতো। সত্যি বলতে কি, আমি ভাবতেই পারিনা যে কেউ এখানে ইচ্ছা করে থাকছে।’
‘কেইন একটা সিগারেট এগিয়ে দিয়ে বলল, “ই, আপনার কথায় কিছু যুক্তি আছে অবশ্য।
রুথ একটু মৃদু হাসল, মনে হয় তা আমার নজর এড়িয়ে গেছে। চেয়ারের রঙ চটা কুশনে হেলান দিয়ে সে বলল, “মি. এন্ড্রুজ বলেছেন আপনি নিউইয়র্ক থেকে এসেছেন। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্নতত্ত্বের প্রভাষক ছিলেন।
সে মাথা নাড়ল। সে তো অনেক দিন আগের কথা।’
রুথ বলল, আচ্ছা আপনি কি বিবাহিত?
সে কাঁধে একটা ঝাঁকি দিল, ‘ডিভোর্স হয়েছে। আমার স্ত্রী আর আমার মধ্যে কখনো মেলে নি।
রুথ ক্যানিংহাম একটু লজ্জিত হল, আমি দুঃখিত এই বিষয়টা এভাবে টেনে আনার জন্য। আপনি মনে কিছু করেননি তো?
‘ঠিক উল্টোটা,’ সে বলল। আমরা সবাই ভুল করি। আমার স্ত্রীর ধারণা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা ভালই উপার্জন করে।
আর আপনার মনে কী ছিল?
‘আমার মনে একটা ধারণা জন্মেছিল যে আমি হয়তো একাডেমিক জীবনে সন্তুষ্ট থাকতে পারব। শুধু লিলিয়ানের জন্যই আমি সেখানে লেগে ছিলাম। একদিক দিয়ে বলতে গেলে সে আমাকে মুক্ত করেছে।
তারপর আপনি প্রাচ্যে চলে এলেন?
না প্রথমে তা নয়। বিমান বাহিনী এক বছরের জন্য একটা ফুল টাইম চাইং কোর্স দিয়েছিল, তারপর চার বছর রিজার্ভে। আমি সেটা নিয়ে নিলাম। রেগুলার পাইলট হিসেবে প্রশিক্ষণ নিলাম। এরপর চলে এলাম এখানে। ছয় বছর আগে একটা আমেরিকান অভিযানে জর্ডানে ছিলাম, তারপর কিছুদিন মিশরীয় সরকারের অধীনে কাজ করলাম, তবে সেটা বেশি দিন টিকলো না। এরপর একজন জার্মান ভূতত্ত্ববিদের সাথে দাহরান চলে এলাম। তিনি আরবি জানা একজন লোক খুঁজছিলেন। তিনি চলে যাওয়ার পর আমি এখানেই রয়ে গেলাম।
কখনো দেশে ফিরে যেতে ইচ্ছা হয় না?
সে বলল, “কি করব গিয়ে? একজন সহকারি অধ্যাপকের চাকরি যে প্রাচীন ইতিহাস পড়াবে, যা ছাত্ররা জানতে চায় না?
‘দাহরানে এর চেয়ে ভাল কিছু অফার পাননি?”
সে মাথা নাড়ল। এই জায়গার মধ্যে এমন কিছু আছে যা আপনার মজ্জার মধ্যে ঢুকে যায়। এককালে এটি ছিল এরাবিয়া ফেলিক্স–সুখী আরব। প্রাচীন জগতে এ জায়গাটি ছিল সম্পদশালী দেশগুলোর মাঝে অন্যতম। তখনকার সময়ে ভারত থেকে মশলার রুটটা এখান দিয়েই ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত পৌঁছেছিল। এখন তা একটা শূন্য মরুভূমি। তবে ঐ পাহাড় আর উত্তরে ইয়েমনে রয়েছে প্রত্নতত্ত্ববিদদের জন্য বিশাল এক গুপ্ত ধনের ভান্ডার। শহরের পর শহর, কিছু কিছু ধ্বংস্তূপের মাঝে প্রত্নতাত্ত্বিক বিষয়–যেমন মারিব, যেখানে সম্ভবত শেবার রানি রাজত্ব করেছিলেন। অন্যগুলো শত শত বছর ধরে বালুর নিচে চাপা পড়ে আছে।’
‘তাহলে প্রত্নতত্ত্ব হচ্ছে আপনার প্রথম প্রেম, রুথ বলল।
‘অবশ্যই তাই। কিন্তু এখানে আমার সম্পর্কে আলোচনা করার জন্য আমরা আসিনি মিসেস কানিংহাম। এখন কি আপনার সময় হয়নি স্বামীর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করার?
রুথ তার পার্স থেকে একটা পাতলা সোনার সিগারেট কেস বের করে একটা সিগারেট হাতে নিয়ে বলল, কোথা থেকে শুরু করব বুঝতে পারছি না। সে একটা দুঃখের হাসি হাসল। আমার ধারণা আমি জীবনের শুরু থেকেই একটু বখে গিয়েছিলাম।’
কেইন মাথা নেড়ে সায় দিল। এটা হতেই পারে। আর আপনার স্বামীর বিষয়টা কি?
রুথ ভ্রু কুঁচকে বলল, ‘জন কানিংহামের সাথে আমার দেশেই কোন এক অনুষ্ঠানে দেখা হয়েছিল। লন্ডন স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল স্টাডি থেকে পাশ করা একজন ইংরেজ। বছরে একবার হার্ভার্ডে লেকচার দিতে যেত। তারপর আমরা বিয়ে করলাম।’
