কালো কাগজ সরিয়ে গ্রে কভারের মূল পেস্টবোর্ড উন্মুক্ত করল। এখানে ডারউইন বংশতালিকা পরিষ্কারভাবে লেখা ছিল। জহান ঠিকই বলেছিলেন।
ভয়াবহ, বললেন জহান। দাদা এটা করতে যাবেন কেন? বাইবেলের এই হাল করে কী লাভ? পৃষ্ঠায় থাকা বংশতালিকার ওপর কালো কালি ছড়িয়ে একটি অদ্ভুত প্রতীক আঁকা হয়েছে।
প্রতীকের নিচে সেই একই কালিতে কছু লেখাও রয়েছে জার্মান ভাষায়।
Gott, verzeihen mir. অনুবাদ করল গ্রে।
ঈশ্বর, আমাকে ক্ষমা করো।
প্রতীকের দিকে নির্দেশ করে প্রশ্ন করল মনক। এটা কীসের চিহ্ন?
একটা প্রাচীন বর্ণ। হাতের ওপর চাপ কমিয়ে হুইল চেয়ারের সিটে বসলেন তিনি। আমার দাদার পাগলামো।
গ্রে তার দিকে ফিরল।
প্রাচীন বর্ণের জাদুতে বিশ্বাস করত ঠুলি সোসাইটি। স্ক্যান্ডেনেভিয়ান প্রতীকগুলোর সাথে আদিম শক্তির সম্পর্ক আছে। যেহেতু নাসিরা ঠুলি সোসাইটির সুপারম্যান দর্শনকে বুকে ধারণ করেছিল, তাই এই বর্ণ সংক্রান্ত মিথেও আস্থা ছিল তাদের।
নাৎসিদের প্রতীক আর প্রাচীন বর্ণের সাথে তাদের সম্পর্কের ব্যাপারে গ্রের ধারণা আছে। কিন্তু সেগুলোর সাথে এখানকার কী সম্পর্ক?
এই চিহ্নের ব্যাপারে বিশেষ কিছু জানেন? প্রশ্ন করল গ্রে।
না। যুদ্ধের পর কোনো জার্মান ইহুদি এসব নিয়ে মাথা ঘামায়নি। চেয়ার ঘুরিয়ে আবার ঝড় দেখায় মনোযোগ দিলেন তিনি। দূরে বজ্রপাতের শব্দ হচ্ছে… ধীরে ধীরে শব্দটা এগিয়ে আসছে এদিকে। তবে আপনাকে সাহায্য করতে পারবে, এরকম একজনকে আমি চিনি। ওখানকার জাদুঘরের কিউরেটর।
বাইবেল বন্ধ করে জাহানের কাছে এগিয়ে গেল গ্রে। কীসের জাদুঘর?
বিদ্যুতের আলোক ঝলকানিতে কনজারভেটরি জ্বলে উঠল। ওপরের দিকে দেখালেন জহান। তাঁর নির্দেশ অনুসরণ করে বজ্রপাত আর বৃষ্টির ভেতর দিয়ে গ্রে দেখতে পেল সেটাকে। সেই ক্যাসল।
Historisches Museum des Hochstifts Paderborn, ক্যাসলের ভেতরে ওটা। আজকে খোলা আছে। এই চিহ্নের অর্থ সে অবশ্যই জানে।
কীভাবে?
জহান গ্রের দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন ও একটা নির্বোধ। তাছাড়া আর কে জানবে? ওটা হলো উইউইলসবার্গ ক্যাসল গ্রে কিছু বলছে না দেখে আবার বলতে শুরু করলেন জহান। হিমল্যারের আস্তানা। নাৎসি এসএস-এর দুর্গ।
ড্রাকুলার দুর্গ, মনক বিড়বিড় করল।
জহান বলে যাচ্ছেন, সতেরশ শতাব্দীতে ডাইনি মারার একটা হুজুগ লেগেছিল। হাজার হাজার মহিলাকে নির্যাতন করে মারা হয়েছিল তখন। হিমল্যার স্রেফ সেটাকে আরও রক্তে রঞ্জিত করেছেন। ক্যাসল নির্মাণের জন্যে ক্যাম্প থেকে আনা ইহুদিদের মধ্যে ১২শ ইহুদি মারা গিয়েছিল তখন অভিশপ্ত জায়গা ওটা। ভেঙে ফেলা দরকার।
কিন্তু ওখানে থাকা জাদুঘর…, বৃদ্ধের রাগ থেকে প্রসঙ্গ সরিয়ে নিল গ্রে। ওখানকার লোকজন প্রাচীন চিহ্ন সম্পর্কে জানে?
জহান মাথা নাড়লেন। হেনরিক হিমল্যার ঠুলি সোসাইটির সদস্য ছিলেন। বর্ণ বিদ্যায় মনোযোগ দিয়েছিলেন। আসলে এভাবেই তার নজরে পড়েছিলেন আমার দাদা। তখন থেকে প্রাচীন বর্ণমালা নিয়ে দুজন একত্রে ঘাটাঘাটি শুরু করেছিলেন।
গ্রে খেয়াল করে দেখল সবকিছুর কেন্দ্র হয়ে উঠছে এই ঠুলি সোসাইটি। কিন্তু কেন? ওর আরও তথ্য লাগবে। জাদুঘরে এক চক্কর যেতেই হবে।
হুইল চেয়ার ঠেলে গ্রের কাছ থেকে সরে গেলেন জহান। হিমল্যার আর আমার পরিবারের সদস্যের আগ্রহের বিষয়বস্তু এক হওয়ার সুবাদে আমাদের পরিবারকে শংকরজাত হিসেবে ছাড় দেয়া হয়েছিল। ক্ষমা করে দেয়া হয়েছিল। আমাদেরকে ক্যাম্পে যেতে হয়নি।
কারণ-হিমল্যার।
এখন গ্রে এই বৃদ্ধের রাগের কারণ বুঝতে পারছে। কেন ছেলেকে রুম থেকে চলে যেতে বলেছেন সেটাও বুঝতে পারছে বেশ ভালভাবে। পরিবারের এই বোঝ অজানা থাকাই ভাল। বাইরের ঝড় দেখছেন জহান।
বাইবেল হাতে নিয়ে গ্রে সবাইকে বের হওয়ার জন্য ইশারা করল।
আসছি। বৃদ্ধকে ডাকল ও।
বৃদ্ধ জবাব দিলেন না। অতীত হারিয়ে গেছেন।
ওরা সবাই সামনের প্রবেশপথে চলে এসেছে। আকাশ থেকে বৃষ্টি পড়ছে তো পড়ছেই। সামনের খোলা অংশে কেউ নেই। আজ কোনো বাইকিং করা চলবে না।
চলো, বৃষ্টির ভেতরে দিয়ে পা বাড়াতে বাড়াতে বলল গ্রে।
আজ ক্যাসলে যাচ্ছি আর আজকেই মরার ঝড় হচ্ছে। ভাল তো! মনক ব্যঙ্গ করল।
সামনের ফাঁকা অংশ দ্রুত পার হতে গিয়ে গ্রে খেয়াল করল ওদের গাড়ির পাশে একটি নতুন গাড়ি পার্ক করে রাখা আছে। খালি। তবে বৃষ্টির মধ্যে ইঞ্জিন থেকে বাষ্প বেরোচ্ছে। মাত্রই এসেছে বোধহয়।
বরফ-সাদা মার্সেডিজ।
০৯. স্যাবোটিউর
০৯. স্যাবোটিউর
দুপুর ১২টা ৩২ মিনিট।
হিমালয়।
সিগন্যাল আসছে কোত্থেকে? প্রশ্ন করলেন অ্যানা।
গানধারের কল পাওয়ার পর মেইনটেন্যান্স রুমে ছুটে এসেছেন তিনি। লিসাকে সাথে আনেননি, সে লাইব্রেরিতে রয়ে গেছে। পেইন্টার ভাবল, অ্যানা এখনও ওদের দুজনকে একটু আলাদা করে রাখতে চান।
অবশ্য এর ভাল দিকও আছে। লিসার ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকবে।
তার ওপর স্যাবোটেজকারীকে খুঁজে বের করার জন্য এটাই যদি সঠিক পথ হয় তাহলে তো কথাই নেই।
ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে ঝুঁকে আঙুলের ডগা ডলল পেইন্টার। ওর নখের ওখানটায় কেমন যেন টনটন করছে, চুলকাচ্ছে প্রতিনিয়ত। ক্যাসলের থ্রিডি নকশায় পয়েন্ট করার জন্য আঙুল ডলা বন্ধ করল।
