হয়তো বাড়ির স্মৃতি হিসেবে নিয়েছিলেন, নরম স্বরে বলল ফিওনা।
এতক্ষণে বোধহয় ফিওনাকে দেখতে পেলেন জহান। ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন তিনি। হয়তো। এমনও হতে পারে, এটা তিনি তার বাবার স্মৃতি হিসেবে রেখেছিলেন। তবে নাৎসির হয়ে কাজ করা ভয়াবহ ব্যাপার।
রায়ানের বলা একটি কথা মনে পড়ল গ্রের। কিন্তু আপনারা তো ইহুদি, তাই না?
হ্যাঁ। কিন্তু আপনাকে বুঝতে হবে, আমার পরদাদী অর্থাৎ হিউগোর মা ছিলেন জার্মান। গোড়া জার্মান যাকে বলে। নাৎসিদের সাথে যোগ দেয়ার জন্য সেটা একটা মাধ্যম। এমনকী হিটলার যখন লুঠপাট শুরু করেছিল আমাদেরকে ছাড় দেয়া হয়েছিল তখন। আমাদেরকে Mischlinge নামে আলাদা করে রাখা হয়েছিল। মিক্সড ব্লাড়। শংকর জাত। মৃত্যুদণ্ডের হাত থেকে বেঁচে গেলেও বিশ্বস্ততার পরীক্ষা দিয়ে তবেই দাদা ও ফুফু নাৎসিদের সাথে যোগ দিতে পেরেছিলেন। বিজ্ঞানীদের গরু খোঁজার মতো খুঁজে খুঁজে নিজেদের দলে ঢুকিয়েছিল নাৎসিরা।
তারমানে জোর করে। গ্রে বলল।
বাইরের ঝড়ের দিকে তাকালেন বৃদ্ধ। সময়টা কঠিন ছিল। আমার দাদা কিছু অদ্ভুত জিনিসে বিশ্বাস করতেন।
যেমন?
জহানকে দেখে মনে হলো তিনি প্রশ্নটা শুনতে পাননি। বাইবেল খুলে পাতা ওল্টাতে লাগলেন। বাইবেলে থাকা হাতে আঁকা ছবিগুলো দেখিয়ে দিল ও।
ҮХУКУТ Күн
এগুলো আসলে কী বুঝতে পারছি না। বলল গ্রে।
ঠুলি সোসাইটির কথা জানেন? উত্তর না দিয়ে বৃদ্ধ পাল্টা প্রশ্ন করলেন।
গ্রে মাথা নাড়ল। জানে না।
তারা ছিলেন একদম গোড়া জার্মান সংঘ। আমার দাদা ২২ বছর বয়সে সেখানে যোগ দিয়েছিলেন। তার মা ও পরিবারের বিভিন্ন সদ্যস সংঘটির সাথে শুরু থেকেই জড়িত ছিলেন। Ubermenschদর্শনে বিশ্বাস করতেন তারা।
Ubermensch, সুপারম্যান।
হ্যাঁ। ঠুলি নামের এক পৌরাণিক জায়গার নামানুসারে সোসাইটির নামকরণ করা হয়েছিল। আটলান্টাস সাম্রাজ্যের কোনো এক জায়গা হবে হয়তো। সেখানে নাকি সেরা জাতের মানুষ ছিল।
নাক দিয়ে আপত্তিসূচক ঘোত শব্দ করল মনক।
আগে বলেছি, আমার দাদার কিছু অদ্ভুত বিশ্বাস ছিল। তবে সেসময় শুধু তিনিই এমন ছিলেন তা নয়। তার আশেপাশের অনেকেই এরকম ছিল। প্রচলিত ছিল, রোমান আর জার্মানির মধ্যে থাকা সীমনায় নাকি জার্মানিক টিউটন গোত্রের মানুষরা জার্মানকে রক্ষা করার জন্য জঙ্গলে পাহারা দেয়। ঠুলি সোসাইটির লোকজন মনে করতেন, এই টিউটন যোদ্ধারা হলো সেই সেরা জাতের মানুষদের বংশধর।
মিথ বা পৌরাণিক গল্পের প্রভাব যে কতটা শক্তিশালী হতে পারে, টের পেল গ্রে। যদি জার্মানের সেই সময়কার সুপারম্যান হতে পারে তাহলে তাদের উত্তরসূরি এই সময়কার জার্মানদের জিনেও সেই সুপারম্যান আছে? আর্য জাতিদের নিয়ে দর্শনের শুরু এখানেই।
তাদের সেই বিশ্বাসের সাথে মিথ আর অতিপ্রাকৃত ব্যাপার স্যাপার মিশে গিয়েছিল। আমার অবশ্য এসব কখনও মাথায় ধরেনি। তবে আমার পরিবার সূত্রে জেনেছি, দাদা ভিন্ন রকমের মানুষ ছিলেন। সবসময় অদ্ভুত জিনিসের সন্ধানে থাকতেন, ঘাটাঘাটি করতেন ঐতিহাসিক রহস্য নিয়ে। এমনকি অবসর সময়েও নিজের মনকে বিশ্রাম দিতেন না। বিভিন্ন কৌশল রপ্ত করা আর জিগস পাজল নিয়ে পড়ে থাকতেন। এভাবে এক সময় তিনি অতিপ্রাকৃত গল্পের খোঁজ পান ও পরবর্তীতে সেগুলোর পেছনে থাকা সত্যতা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। একেবারে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন ওগুলো নিয়ে।
বলতে বলতে বাইবেলের দিকে নজর দিলেন বৃদ্ধ। পৃষ্ঠা ওল্টাতে ওল্টাতে একদম শেষে গিয়ে পেছনের কভারের ভেতরের অংশ পরীক্ষা করে দেখলেন। আশ্চর্য!
গ্রে কাছে এগিয়ে এসে বৃদ্ধের কাঁধের ওপর দিয়ে তাকাল।
কী?
বইয়ের ভেতরের কভারে একটি হাড্ডিসার আঙুল চালালেন তিনি। একবার সামনের কভার দেখে আমার পেছনে চলে গেলেন। ডারউইন বংশতালিকা শুধু বইয়ের রুর অংশে ছিল না… বইয়ের শেষের অংশেও ছিল। আমি তখন নিতান্তই ছেলেমানুষ, তবুও এটা আমার বেশ ভালভাবে মনে আছে।
বাইবেল মেলে ধরলেন জহান। বইয়ের পেছনের অংশে থাকা বংশতালিকা নেই!
দেখি। বই হাতে নিয়ে পেছনের কভার আরও ভাল করে পরীক্ষা করল গ্রে। ফিওনা ও মনকও যোগ দিল। গ্রে বইয়ের বাইন্ডিং অংশে হাত বুলাল।
এখানে দেখ, বলল গ্রে। দেখে মনে হচ্ছে, কেউ বাইবেলের পেছনে থাকা ফাঁকা পৃষ্ঠাটা ছিঁড়ে নিয়ে পেছনের কভারে আঠা দিয়ে লাগিয়ে দিয়েছে। ফিওনার দিকে তাকাল ও। গ্রিট্টি করেছিলেন নাকি?
অসম্ভব। তারচে বরং নানু মোনালিসা ছিঁড়ে ফেলবে!
আচ্ছা, যদি গ্রিট্টি না করে থাকেন তাহলে…
জহানের দিকে তাকাল গ্রে।
আমি নিশ্চিত, আমার পরিবারের কেউ এই কাজ করেনি। যুদ্ধের কয়েক বছর পরেই লাইব্রেরি বিক্রি করে দেয়া হয়েছিল। এখানে এটাকে মেইল করে ফিরিয়ে দেয়ার পর কেউ ছুঁয়ে দেখেছে কি-না সন্দেহ।
তাহলে বাকি রইল হিউগো হিরজফিল্ড।
ছুরি, বলল গ্রে।
নিজের প্যাক থেকে সুইস আর্মি নাইফ বের করে মনক গ্রের দিকে এগিয়ে দিল। ছুরি ব্যবহার করে বাইবেলের পেছনের আঠা লাগানো পৃষ্ঠা খুলে ফেলল গ্রে। অল্প করে আঠা লাগানো থাকায় কাজটা করতে খুব একটা বেগ পেতে হলো না।
হুইল চেয়ার ঠেলে ওদের সাথে যোগ দিলেন জহান। নিজের হাতের ওপর ভর দিয়ে একটু উঁচু হয়ে তাকালেন তিনি। টেবিলের ওপর গ্রে কাজ করছে। গ্রে অবশ্য ওর কাজ কোনোর কোনো চেষ্টা করছে না। কারণ–কাগজ কেটে সরানোর পর যা-ই বের হোক না কেন সেটার ব্যাপারে জাহানের সাহায্য লাগতে পারে।
