রিসিপশন ডেস্ক থেকে বেরিয়ে ফায়ারপ্লেস পার হয়ে পাশে থাকা ছোট্ট হলের দরজা খুলে সেদিকে ওদের নিয়ে চলল ক্লার্ক। হলের একপাশের দেয়ালে সারি সারি লম্বা জানালা রুমকে কেমন যেন নিঃসঙ্গ করে দিয়েছে। দেয়ালের অন্যপাশে আরেকটি ফায়ারপ্লেস থাকলেও ওটা এখন ঠাণ্ডা। ফায়ারপ্লেসটা বেশ বড়সড়। এই রুমে সারি সারি টেবিল, বেঞ্চ আছে। মেঝে মোছর কাজ করছে এক বয়স্কা মহিলা… সে ছাড়া এই রুমে আর কেউ নেই, খালি।
এটা আগে আমাদের পরিবারের লাইব্রেরি ও স্টাডিরুম হিসেবে ব্যবহার করা হতো। তবে এখন হোস্টেলের ডাইনিং হল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এস্টেট বিক্রি করার প্রতি মত ছিল না বাবার, কিন্তু ওদিকে বেশ মোটা অংকের ট্যাক্স দিতে হয়। হয়তো সেজন্য ৫০ বছর আগেই লাইব্রেরি বিক্রি করা হয়েছে। অরজিন্যাল আসবাবপত্রগুলোর অধিকাংশকে বাবা নিলামে তুলেছিলেন। প্রতি প্রজন্মে ইতিহাস একটু একটু করে বিলুপ্ত হয়েছে।
লজ্জাজনক। বলল গ্রে।
মাথা নেড়ে ক্লার্ক অন্যদিকে ঘুরল। বাবাকে বলে দেখি, আপনাদের সাথে কথা বলিয়ে দিতে পারি কি-না।
কিছুক্ষণ পর ওদেরকে একজোড়া চওড়া দরজা পেরিয়ে ভেতরে নিয়ে গেল সে। এই দরজা দিয়ে এস্টেটের ব্যক্তিগত অংশে যাওয়া যায়।
ওদেরকে এস্টেটের পেছন দিকে নিয়ে কনজারভেটরি (গাছ রাখার জন্য কাঁচ আর ব্রোঞ্জের তৈরি উদ্যান) পেরোতে পেরোতে নিজেকে রায়ান হিরজফিল্ড বলে পরিচয় দিলো সে। বিভিন্ন রকম গাছ আছে এখানে। তবে কতগুলোকে দেখে আগাছা বলে মনে হলো। জায়গাটায় কেমন যেন পুরোনো ও অগোছালো একটা ভাব আছে।
সানরুমে সূর্যের কোনো দেখা নেই। কনজারভেটরির মাঝখানে পলকা স্বাস্থ্যের একজন ব্যক্তি হুইলচেয়ারে বসে আছেন। তার কোলের ওপরে একটি কম্বল রাখা আছে। বাইরে বৃষ্টি পড়া দেখছেন।
তার দিকে এগোল রায়ান, খুব সংকোচবোধ করছে। Vater. Hier sind die Leute mit der Bibel.
Auf Englisch, Ryan… auf Englisch. হুইল চেয়ার ঘুরিয়ে ওদের মুখোমুখি হলেন তিনি। তাঁর চামড়া কাগজের মতো পাতলা বলে মনে হলো। শনশনে কণ্ঠস্বর। ফুসফুসের রোগে ভুগছেন বোধহয়, ভাবল গ্রে।
আমি জহান হিরজফিল, বললেন বৃদ্ধ। আপনারা তাহলে পুরোনো লাইব্রেরি নিয়ে কথা বলতে এসেছেন। ইদানীং ওটা নিয়ে বেশ কৌতূহল জাগছে কেন বুঝলাম না। কয়েক দশক কোনো খবরই ছিল না, অথচ এবছরে ২ বার খোঁজ পড়ল।
ফিওনার বলা সেই রহস্যময় ব্যক্তির কথা মনে করল গ্রে। গ্রিট্রির বুকশপে গিয়ে ফাইলপত্র চেক করেছিল সেই ব্যক্তি। বিলের কাগজ দেখে সে-ও নিশ্চয়ই এখানে হাজির হয়েছিল।
রায়ান বলল আপনাদের কাছে নাকি লাইব্রেরির একটা বই আছে।
ডারউইন বাইবেল। বলল গ্রে।
বৃদ্ধ লোকটি সামনে হাত বাড়িয়ে দিতেই ফিওনা সামনে এগিয়ে গিয়ে তাঁর হাতে বাইবেল দিলো। ওটাকে কোলের ওপর রাখলেন তিনি। ছোটবেলার পর এটাকে আর দেখিনি। ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, রায়ান, তুমি ডেস্কে গিয়ে বসো।
মাথা নেড়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও কয়েক পা পিছাল রায়ান, তারপর মুখ ঘুরিয়ে চলে গেল।
ছেলে কনজারভেটরির দরজা বন্ধ করে দেয়ার আগপর্যন্ত জহান অপেক্ষা করলেন। তারপর বাইবেলের দিকে নজর দিলেন তিনি। বাইবেলের সামনের কভার খুলে চোখ বুলালেন ডারউইন-এর বংশতালিকায়। আমার পরিবার যেসব বইকে খুব যত্ন করে আগলে রেখেছিল তার মধ্যে এটা একটা। ব্রিটিশ রয়্যাল সোসাইটি থেকে আমার পরদাদাকে (দাদার বাবা) ১৯০১ সালে এই বাইবেল উপহার হিসেবে দেয়া হয়েছিল। সেই যুগের স্বনামধন্য উদ্ভিদবিজ্ঞানী ছিলেন তিনি।
গ্রে বৃদ্ধের কণ্ঠে বিষাদের সুর শুনতে পেল।
বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করাটা আমাদের পরিবারের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। ডারউইন-এর মতো বড় কিছু না করলেও আমাদেরও কিছু অর্জন আছে। তবে সেগুলো অনেক আগের কথা। এখন আমাদের পরিচয় হলো : হোস্টেল চালিয়ে চলি; এই পর্যন্তই।
আচ্ছা, বাইবেলের ব্যাপারে আমাকে কিছু জানাতে পারেন? বলল গ্রে। লাইব্রেরি কী সবসময় এখানেই থাকতো?
বাইরে গবেষণার জন্য পরিবার থেকে যখন কেউ যেতো তখন কেউ কেউ এখান থেকে কিছু বই সাথে করে নিয়ে গেছে। একমাত্র এই বইটাই ফিরে এসেছিল। আমার দাদা মেইল করে পাঠিয়েছিলেন। অবশ্য কারণও ছিল।
কী সেটা?
আমি জানতাম আপনি হয়তো প্রশ্নটা করবেন তাই রায়ানকে বের করে দিলাম। ওর এসব না জানাই ভাল।
আচ্ছা।
আমার দাদা হিউগো, তিনি নাৎসিদের হয়ে কাজ করতেন। তার মেয়ে অর্থাৎ আমার ফুফু টোলাও করতেন। এরা দুইজন একদম মানিকজোড় ছিল। পরবর্তীতে বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনদের কানাঘুষা করতে শুনেছি, কোনো একটা গোপন রিসার্চ প্রজেক্টের সাথে জড়িত ছিল ওরা। দুজনই নামকরা জীববিজ্ঞানী ছিল।
কীরকম রিসার্চ? এবার মনক প্রশ্ন করল।
তা কেউ জানে না। যুদ্ধের শেষের দিকে আমার দাদা আর ফুফু মারা যান। কিন্তু তার একমাস আগে আমার দাদার পাঠানো একটা বাক্স আসে এখানে। লাইব্রেরি থেকে নিয়ে বইয়ের একাংশ সেটায় ফেরত পাঠানো হয়েছিল। হয়তো উনি বুঝেছিলেন সামনে ওনার অবস্থা ভাল নয়, তাই বইগুলোকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন বোধহয়। মোটমাট ৫টা বই। বাইবেলে টোকা দিয়ে বললেন, এটা সেই ৫ বইয়ের একটা। এই বাইবেলটাকে কী ভেবে রিসার্চ করার জন্য নিয়েছিলেন সেটা আজ পর্যন্তও কেউ আমাকে জানাতে পারল না।
