অল্পের জন্য রক্ষা, বৃষ্টি দেখে মনক মন্তব্য করল।
গেইটের পর চওড়া খোলা জায়গা দেখা গেল। ওখানে দুটো অংশে কটেজ ভাগ করা রয়েছে। মূল ভবন একদম নাক বরাবর সামনে অবস্থিত। মাত্র দুই তলা বিশিষ্ট। তবে ছাদে থাকা স্লেট টাইলগুলো ভবনটিকে একটু রাজকীয়ভাব এনে দিয়েছে।
মাথার ওপরে বিদ্যুতের ঝলকানি খেলে গেল।
একটু আগে ওরা যে ক্যাসল দেখেছিল সেটা এস্টেটের ওপর দিয়ে পেছনে দেখা যাচ্ছে এখন। দেখে মনে হচ্ছে ওটা যেন কটেজের ওপর আবছাভাবে আবির্ভূত হয়েছে।
ওই! হাঁক ছাড়ল একজন।
গ্রে তাকাল।
বৃষ্টির ভেতরে এক সাইকেল চালক ছুটতে ছুটতে আর একটু হলেই গাড়ির নিচে এসে পড়তো। সাইকেল আরোহী বয়সে তরুণ, পরনে হলুদ জার্সি আর বাইকার শর্টস। বিএমডব্লিউ-এর হুডে চাপড় মারল সে।
বন্ধুরা যাচ্ছ কোথায়? গ্রের দিকে তাকিয়ে বলল।
ফিওনা ইতোমধ্যে পপছনে জানালা নামিয়ে ফেলেছে। বাইরে মাথা বের করে বলল, ভাগো শালা! এতটুকু প্যান্ট পরে ঘুরে বেড়াচ্ছি, সেদিকে নজর দাও! বেহায়া কোথাকার!
মাথা নাড়ল মনক। মনে হচ্ছে, ফিওনা সামনে একটা ডেটিং পাবে।
তরুণকে এড়িয়ে মূল ভবনের কাছে গাড়ি নিয়ে এলো গ্রে। এখানে গাড়ি আছে মাত্র একটা। কিন্তু গ্রে খেয়াল করে দেখল, এখানে অনেক মাউন্টেইন আর রেসিং বাইক আছে। এক ঝাঁক তরুণ-তরুণী বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচার জন্য চাঁদোয়ার নিচে দাঁড়িয়ে আছে। নিচে নামিয়ে রেখেছে ব্যাকপ্যাকগুলো। ইঞ্জিন বন্ধ করার পর ওদের কথাবার্তা কানে এলো গ্রের। স্প্যানিশ। এটা তাহলে হোস্টেল। অন্তত এখন তো তা ই মনে হচ্ছে।
ঠিক জায়গায় এসেছে তো ওরা?
যদি ঠিক জায়গায় এসেও থাকে তারপরও কাজের কাজ হবে কি-না সেটা নিয়ে গ্রের সন্দেহ আছে। কিন্তু এতদূর যখন চলেই এসেছে…
থাকো এখানে, বলল ও। মনক, তুমি ফিওনার সাথে…
গাড়ির পেছনের দরজা খুলে ফিওনা বের হলো।
পরের বার থেকে গাড়ি থেকে নামতে নামতে বলল মনক, যে গাড়িতে বাচ্চাদের জন্য লক সিস্টেম থাকে সেটা নিয়ো।
আসো। ফিওনার পেছন পেছন এগোল গ্রে।
কাঁধে ব্যাকপ্যাক নিয়ে মূল ভবনের সামনের দরজার দিকে বড় বড় পা ফেলে ফিওনা এগোচ্ছে।
এগিয়ে গিয়ে ওর কনুই ধরল গ্রে।
আমরা একসাথে থাকব। কোনো দৌড়াদৌড়ি চলবে না।
ফিওনা ওর দিকে ঘুরল। গ্রের মতো সে-ও রেগে আছে। একদম ঠিক! আমরা। একসাথে থাকব। কোনো দৌড়াদৌড়ি চলবে না। তার মানে আমাকে প্লেন কিংবা গাড়ির ভেতরে রেখে চলে যাওয়াও যাবে না। কনুই ছাড়িয়ে দরজা ঠেলল ও।
এক ঘণ্টা বেজে উঠে ওদের আগমনের জানান দিল।
মেহগনি কাঠের রিসিপশন ডেস্ক থেকে চোখ মেলল ক্লার্ক। ফায়ারপ্লেসে আগুন জ্বলে ঠাণ্ডা দূর করার চেষ্টা করছে। হলরুম কড়ি কাঠে সাজানো এবং স্লেট টালি দেয়া। নির্বাক ছবি ঝুলছে দেয়ালে। একশ বছরেরও পুরোনো হবে ওগুলো। জায়গা পুরোনো হলেও দেখে মনে হচ্ছে এই ভবন কখনও মেরামত করা হয়নি। প্লাস্টারের বেহাল দশা, তক্তায় ধুলো-বালি, মেঝের করুণ অবস্থা সেটাই জানান দিচ্ছে। যৌবনকাল পেরিয়ে বার্ধক্যে পৌঁছেছে ভবন।
ক্লার্ক ওদের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। স্বাস্থ্যবান শরীরে রাগবি শার্ট আর সবুজ ঢোলা ট্রাউজার পরে আছে সে। বয়স বিশের আশেপাশে। কলেজের নতুন ছাত্রের মতো লাগছে তাকে।
Guten morgen, গ্রে কাউন্টারের দিকে এগোতেই স্বাগতম জানাল সে।
বজ্রপাতে গর্জন শুনতে শুনতে পুরো হল রুমে চোখ বুলাল মনক। আজ সকালের কোনো কিছুই ভাল নয়। ও বিড়বিড় করল।
ও, আচ্ছা। আমেরিকান, বলল ক্লার্ক। মনকের বিড়বিড়ানি শুনতে পেয়েছে।
গলা পরিষ্কার করল গ্রে। এটা কী হিরজফিল্ড এস্টেট
ক্লার্কের চোখ একটু বড় হলো। Ja, aber… আমরা এখানে বিগত ২০ বছর যাবত BurgschloB হোস্টেল চালাচ্ছি। উত্তরাধিকারসূত্রে আমার বাবা জহান হিরজফিল্ড এই জায়গা পাওয়ার পর থেকে এই হোস্টেল চলছে।
তাহলে ওরা ঠিক জায়গাতেই এসেছে। ফিওনার দিকে তাকাল গ্রে। ভ্রু কুঁচকে ওর দিকে কী চাই? দৃষ্টি নিয়ে তাকাল ফিওনা। ব্যাকপ্যাকের ভেতরে কী যেন খুঁজছে। গ্রে মনে মনে প্রার্থনা করল, মনকের কথাই যেন সত্যি হয়, এই ব্যাগে যেন কোনো বোম না থাকে।
ক্লার্কের দিকে ফিরল গ্রে। যদি আপনার বাবার সাথে কথা বলা সম্ভব হতো…
কারণ…? ক্লার্কের কণ্ঠে একটু দুশ্চিন্তার রেশ।
গ্রেকে একপাশে সরিয়ে দিয়ে নিজের জায়গা করে নিল ফিওনা। কারণ : এটা। রিসিপশন কাউন্টারের ওপর একটি পরিচিত বই রাখল ও। ডারউইন বাইবেল।
ওরে খোদা!… গ্রে বাইবেলটাকে জেট প্লেনে লুকিয়ে রেখে এসেছিল।
লুকিয়ে রাখাটা যথাযথ হয়নি। প্রমাণিত।
ফিওনা, সতর্ককরার সুরে বলল গ্রে।
এটা আমার, চট করে জবাব দিল ও।
বইটি তুলে নিয়ে ক্লার্ক পৃষ্ঠা ওল্টাল। এই বই সে চিনতে পারেনি। বাইবেল? এই হোস্টেলে আমরা ধর্মান্তরিত করণকে অনুমিত দিই না। বই বন্ধ করে ফিওনাকে ফিরিয়ে দিল সে। তাছাড়া, আমার বাবা ইহুদি।
ভণিতা বাদ দিয়ে সরাসরি মূল প্রসঙ্গে গেল গ্রে। এটা চার্লস ডারউইনের বাইবেল। আমরা মনে করি, এটা এক সময় আপনাদের পারিবারিক লাইব্রেরিতে ছিল। এই ব্যাপারটা নিয়ে যদি আপনার বাবার সাথে বিস্তারিত কথা বলতে পারতাম…
বাইবেলের দিকে আগের চেয়ে একটু মনোযোগ দিয়ে তাকাল ক্লার্ক। আমার বাবা এখানে ওঠার আগেই লাইব্রেরি বিক্রি হয়ে গিয়েছিল, ধীরে ধীরে বলল সে। আমি কখনও লাইব্রেরি দেখতে যাইনি। তবে প্রতিবেশীদের মুখ থেকে শুনেছি ১০০ বছর ধরে ওটা ছিল।
