লিসা মাথা নাড়ল।
লিসাকে আটকে দিতে পেরে সন্তুষ্ট হয়ে অ্যানা নিজের দুই হাত আড়াআড়ি করে রাখলেন। বিবর্তনবাদের এখানে একটা ফাঁক আছে। ডারউইন এখানে লাফ মেরেছেন।
কিন্তু, লিসা হার মানতে নারাজ, এই ফাঁকা অংশ পূরণ করার জন্য ঈশ্বরের হাতকে টেনে এনে সেটাকে বিজ্ঞান বলে চালিয়ে দেয়া চলবে না। সেই ফাঁকটুকু পূরণ করার জন্য আমরা এখনও যথাযথ উত্তর খুঁজে পাইনি। তারমানে এই না যে, ওখানে অলৌকিক ব্যাপার-স্যাপার আছে।
আমি অলৌকিকতা নিয়ে কিছু বলছি না। আর আপনাকে কে বলল, সেই ফাঁক পূরণ করার জন্য আমার কাছে যথাযথ উত্তর নেই?
তার দিকে তাকাল লিসা। কী উত্তর?
বেল-কে নিয়ে গবেষণা করে আমরা গত কয়েক দশক আগেই কিছু একটা আবিষ্কার করে ফেলেছিলাম। সেই জিনিসটা নিয়ে আজকের গবেষকরা মাত্র একটু নাড়াচাড়া শুরু করেছে।
সেটা কী? সোজা হয়ে বসল লিসা। বেল সম্পর্কে ওর অদম্য কৌতূহল লুকোনোর আর কোনো চেষ্টা করল না।
আমরা ওটার নাম দিয়েছি : কোয়ান্টাম বিবর্তন।
লিসা ইতিহাসে পড়েছে, বেল ও নাৎসিরা মিলে অদ্ভুত জিনিসপত্র নিয়ে গবেষণা করছিল। পরমাণুর অতিক্ষুদ্র কণা ও কোয়ান্টাম ফিজিক্স ছিল তাদের গবেষণাক্ষেত্র। এদের সাথে বিবর্তনের সম্পর্ক আছে?
ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইনকে সমর্থন দেয়ার জন্য এই কোয়ান্টাম বিবর্তন শুধু নতুন ক্ষেত্ৰই তৈরি করেনি, সেইসাথে ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইনের ডিজাইনারকে সেটারও উত্তর দিয়েছে।
আপনি মজা করছেন। ডিজাইনার কে? ঈশ্বর?
নাহ। লিসার চোখের দিকে তাকালেন অ্যানা। আমরা।
অ্যানা বিস্তারিত কিছু ব্যাখ্যা করার আগেই পুরাতন রেডিও থেকে আওয়াজ ভেসে এলো। গানথার বলছে, স্যাবোটাজকারীর হদিস পেয়েছি। আমরা কাজে নামার জন্য তৈরি।
.
সকাল ৭টা ৩৭ মিনিট।
বারেন, জার্মানি।
পুরোনা ফার্ম ট্রাকের পাশ দিয়ে বিএমডব্লিউকে এগিয়ে নিল গ্রে। ট্রাকে খড় বোঝাই করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ৫ নম্বর গিয়ারে নামল ও, সামনে বাঁক। অবশ্য এটাই শেষ বাঁক। পাহাড়ের উপরের দিকে ওঠার পর ও এখন সামনের উপতক্যার বিস্তৃত দৃশ্য দেখতে পাচ্ছে।
আলমি ভ্যালি, বলল মনক। গ্রের পাশে বসে আছে ও। হাত দিয়ে শক্ত করে দরজার পাশে থাকা হাতল ধরে রেখেছে।
গিয়ার নামিয়ে গতি কমাল গ্রে।
মনক ওর দিকে তাকাল। র্যাচেল তোমাকে বেশ ভালভাবেই ইটালিয়ান স্টাইলে ড্রাইভিং শিখিয়েছে দেখছি।
রোমে যখন..
আমরা এখন রোমে নই।
তা তো ঠিক। ওরা এখন রোমে নয়। আরও খাড়াইতে ওঠার পর ওদের সামনে উপতক্যার একটি চওড়া নদী, সবুজ তৃণভূমি, জঙ্গল আর টিলার মাঠ উদয় হলো। ছবির মতো সুন্দর মফস্বল দেখা গেল উপত্যকার ওদিকে। লাল টাইলসঅলা ছাদ আর পাথুরে ঘরগুলোর পাশ দিয়ে সরু, বাঁকা রাস্তা চলে গেছে।
তবে ওদের সবার চোখ আটকে গেল দূরে অবস্থিত একটি বিশাল ক্যাসলে। জঙ্গলের ভেতরে ওটা, মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। উঁচু টাওয়ার, পতাকা শোভা পাচ্ছে ওখানে। রিহনি নদীর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অন্যান্য দুর্গের মতো এই ক্যাসলকেও কেমন যেন রূপকথার কোনো প্রাসাদের মতো মনে হয়। মোহিনী শক্তির রাজকুমারী আর সাদা ঘোড়ার ওপর চড়া বীর যেন আস্তানা গেড়েছে ওখানে।
যদি ড্রাকুলা সমকামী হয়ে থাকে, বলল মনক, তাহলে ওই ক্যাসল তার-ই হবে।
মনক কথাটি বলে কী বুঝাতে চেয়েছে সেটা গ্রে জানে। ওই জায়গাকে কেমন যেন অশুভ বলে মনে হচ্ছে। তবে সেটা উত্তর দিকের নিচু আকাশের জন্যও মনে হতে পারে। ঝড় আসার আগে ওরা এখন নিচের গ্রামে পৌঁছে যেতে পারলে তবেই রক্ষা।
এবার? গ্রে প্রশ্ন করল।
আওয়াজ শোনা গেল পেছনের সিট থেকে। ফিওনা ম্যাপ চেক করছে। মনকের কাছ থেকে ওটা বাজেয়াপ্ত করে নিজেই দিকনিদের্শনার দায়িত্ব পালন করছে ও। কোন জায়গায় যাওয়া হচ্ছে সে-ব্যাপারে ও এখনও আগেভাগে মুখ খুলতে নারাজ।
সামনে ঝুঁকে নদীর দিকে ইশারা করল ও। ব্রিজ পার হতে হবে।
তুমি নিশ্চিত?
হ্যাঁ, আমি নিশ্চিত। ম্যাপ কীভাবে পড়তে হয় তা আমার জানা আছে। বাইসাইকেল আরোহীদের একটি লম্বা লাইনকে পাশ কাটিয়ে উপত্যকার নিচের দিকে রওনা হলো গ্রে। বিএমডব্লিউ নিয়ে গ্রামের প্রান্তদেশে পৌঁছে গেল।
এ যেন আরও একশ বছর পেছনের এলাকা। সব জানালার পাশে থাকা বাক্সে টিউলিপ ফুল ফুটে আছে। চাঁদোয়ারি দেয়া আছে প্রত্যেকটি উঁচু ছাদে। মূল সড়ক থেকে পাথর বিছানো রাস্তা চলে গেছে ভেতরে। বাইরে থাকা ক্যাফে, বিয়ার বাগান আর কেন্দ্রীয় ব্যান্ডস্ট্যান্ডের পাশ দিয়ে চলে গেছে ওগুলো। গ্রে নিশ্চিত এই ব্যান্ডস্ট্যান্ডে প্রতিরাতে একটি পলকা ব্যান্ড বাজানো হয়।
ব্রিজ পার হওয়ার পর দেখা গেল ওরা খামার সংলগ্ন বাড়ি আর তৃণভূমির পাশে চলে এসেছে।
বাম দিকে যাও! চিৎকার করল ফিওনা।
কষে ব্রেক দিল গ্রে। বিএমডব্লিউটাকে তীক্ষ্ণভাবে ঘোরাল। এরপর থেকে একটু আগেভাগে বলবে।
রাস্তা সরু হয়ে গেছে এখানে। মসৃণ রাস্তা এখন পাপুরে রাস্তায় পরিণত হয়েছে। এগিয়ে চলল বিএমডব্লিউ। সামনে একটি লোহার গেইট উদয় হলো। খোলা রয়েছে।
গাড়ির গতি কমাল গ্রে। আমরা কোথায়?
জায়গামতো চলে এসেছি, ফিওনা জবাব দিল। দ্য হিরজফিল্ড এস্টেট। ডারউইন বাইবেল এখান থেকেই এসেছিল।
গেইট দিয়ে বিএমডব্লিউকে প্রবেশ করাল ঘে। মেঘাচ্ছন্ন আকাশ থেকে বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। প্রথমে গুঁড়িগুড়ি দিয়ে শুরু… তারপর একদম ঝুম বৃষ্টি।
