নিজের চোখ পাকানো ঠেকানো চেষ্টা করল লিসা। আমি বলব, অন্য রঙের পোকাগুলোকে পাখি খেয়ে ফেলেছিল। দুই মাথাঅলা পোকাও মারা পড়েছিল তখন। কিন্তু আপনি উদাহরণটাকে ভুল বুঝছেন। পোকালোর রঙের পরিবর্তন কোনো মিউটেশন নয়। এই পোকাদের ভেতরে আগে থেকেই কালো জিন ছিল। প্রতি প্রজন্মেই কিছু কালো পোকা জন্ম নিতো। কিন্তু অধিকাংশই খাওয়া পড়তে ওগুলোর। সংখ্যাগরিষ্ঠ হিসেবে টিকে থাকতো সাদাগুলো। গাছ কালো হয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে গেল। সাদা পোকা খাওয়া পড়তে শুরু করায় কালোরা টিকে গেল এবং ধীরে ধীরে সংখ্যায় বাড়তে লাগল। এই উদাহরণটাকে মিউটেশনের দিকে টেনে না গিয়ে অন্যভাবে দেখা যায়। যেমন : পরিবেশ পরিস্থিতি সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর প্রভাব রাখতে সক্ষম। এখানে কোনো মিউটেশন হয়নি। কালো জিন ওদের ভেতরে আগে থেকেই ছিল।
ওর দিকে তাকিয়ে হাসলেন অ্যানা।
লিসার মনে হলো, এই মহিলা ওর জ্ঞান পরীক্ষা করছিলেন। একদম সটান হয়ে মোটামুটি রাগী অবস্থায় আছেন তিনি।
ভেরি গুড, অ্যানা বললেন। ঠিক আছে, আমি আরেকটা ঘটনার কথা বলি। এবারের ঘটনাটা ল্যাবের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সংগঠিত হয়েছিল। একজন গবেষক একটা ই, কলি ব্যাকটেরিয়া তৈরি করলেন যেটা ল্যাকটোজ (সুগার) হজম করতে পারে না। তারপর তিনি সেই ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বাড়িয়ে এমন একটা জায়গায় রাখলেন যেখানে খাদ্যের উৎস হিসেবে শুধু ল্যাকটোজ ছিল। বিজ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে বলুন তো… এরপর কী হবে?
শ্রাগ করল লিসা। ল্যাকটোজ হজম করতে না পেরে ব্যাকটেরিয়া অভুক্ত থাকতে থাকতে মারা যাবে।
ঠিক। ৯৮% ব্যাকটেরিয়ার তা-ই হয়েছিল। কিন্তু বাকি ২% বেশ সুন্দরভাবে টিকে রইল। ল্যাকটোজ হজম করার জন্য নিজেরাই নিজেদের জিনে মিউটেশন ঘটিয়ে নিয়েছিল ওরা। তা-ও মাত্র এক প্রজন্মে। অবাক লাগছে, তাই না? এই ঘটনা এলোমেলোভাবে কোনোকিছু ঘটার সম্পূর্ণ বিপক্ষে যায়। মাত্র ২% কেন বেঁচে থাকার তাদের একটা জিন মিউটেশন ঘটিয়ে পরিবর্তন আনল? না, এলোমেলোভাবে এ জিনিস হবে না।
বিষয়টি অদ্ভুত মনে হলো লিসার কাছে। হয়তো ল্যাবে কোনো সমস্যা…
এই পরীক্ষা বারবার চালিয়ে একই ফল পাওয়া গেছে।
কিন্তু লিসা মানতে পারল না।
আমি আপনার চোখে দ্বিধা দেখতে পাচ্ছি। ঠিক আছে, এলোমেলোভাবে মিউটেশন হয় না, এই বিষয়ে আপনাকে আরেকটা উদাহরণ দিই।
বলুন?
প্রাণের একদম শুরুতে চলুন। একদম আদিকালে। যেখানে বিবর্তনের ইঞ্জিন প্রথম চালু হয়েছিল।
লিসার মনে পড়ল, অ্যানা একবার বলেছিলেন প্রাণের উৎসের সাথে বেল-এর সম্পর্ক আছে। এখন কী তিনি সেদিকেই কথা বলবেন? নিজের কানকে পুরোপুরি খাড়া করল লিসা। দেখা যাক আলোচনা ওকে কোথায় নিয়ে যায়।
পিছনে ফিরি চলুন, অ্যানা বললেন। একদম প্রথম কোষেরও আগে। ডারউইনের মতবাদ মনে রাখুন : সাধারণ থেকে জন্ম নেয়া জন্মানো সবকিছু একটু জটিল হয়ে থাকে। তাহলে এককোষীর আগে কী ছিল? প্রাণের কত অতীত পর্যন্ত যাওয়ার পরও আমরা তাকে প্রাণ বলে ডাকব? ডিএনএ কী জীবিত? জিন জীবিত? প্রোটিন আর এনজাইমের-ই বা কী অবস্থা? প্রাণ আর রসায়নের মধ্যেকার সীমারেখাটা কোথায়?
তা ঠিক আছে। কিন্তু প্রশ্নটা বেশি জটিল হয়ে গেছে, লিসা স্বীকার করল।
তাহলে আরেকটা প্রশ্ন করছি।
এই প্রশ্নের উত্তর লিসা জানে। আদিকালে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের পুরোটা হাইড্রোজেন, মিথেন আর পানিতে ভরা ছিল। এগুলোর সাথে একটু শক্তি, ধরা যাক বজ্রপাত। তো একটু শক্তি যোগ হলে এই গ্যাসগুলো সাধারণ দেহযন্ত্রে পরিণত হতে পারে। তারপর এগুলো থেকে অণুর জন্ম হয়েছিল।
আর সেটা ল্যাবে প্রমাণিতও হয়েছে, সহমত পোষণ করলেন অ্যানা। এক বোতল ভর্তি মৌল গ্যাস থেকে অর্ধ তরল মিশ্রণের অ্যামিনো অ্যাসিড পাওয়া যায়। প্রোটিনের ব্লক তৈরি করে ওগুলো।
এবং প্রাণের শুরু হয়।
আহা, আপনার বেশ তাড়া আছে বলে মনে হচ্ছে। সবকিছু ডিঙিয়ে একদম প্রাণে লাফ দিচ্ছেন! অ্যানা খোঁচা মারলেন। মাত্র অ্যামিনো অ্যাসিড আর ব্লক তৈরি হলো। সামান্য অ্যামিনো অ্যাসিড় থেকে আমরা কীভাবে প্রোটিনে পৌঁছুব?
যথেষ্ট পরিমাণ অ্যামিনো অ্যাসিডের মিশ্রণ থেকে ধীরে ধীরে হয়ে যাবে।
এলোমেলোভাবে?
মাথা নাড়ল লিসা।
ড. কামিংস, এতক্ষণে আমরা সমস্যার গোড়ায় আসতে পেরেছি। আমি হয়তো আপনার সাথে একমত যে, নিজেই নিজের কপি তৈরি করতে সক্ষম প্রোটিন প্রথমবার তৈরি হওয়ার পর থেকে ডারউইনের বিবর্তনবাদ যা বলেছে সেটা ঠিক আছে। কিন্তু আপনি কী জানেন প্রথমবার প্রোটিন তৈরি হতে কী পরিমাণ অ্যামিনো অ্যাসিড প্রয়োজন?
না।
কমপক্ষে ৩২ অ্যামিনো অ্যাসিড। তার ফলে একদম সবচেয়ে ছোট্ট প্রোটিন তৈরি হবে। আর সেই ছোট্ট প্রোটিনটা নিজেই নিজের কপি করার ক্ষমতা রাখে। এলোমেলোভাবে এই প্রোটিনের জন্ম হয়েছে–সেটার সম্ভাবনা অনেক ক্ষীণ। গাণিতিকভাবে বলতে গেলে : টেন টু দ্য পাওয়ার ফোরটি-ওয়ান।
সংখ্যার পরিমাণ শুনে শ্রাগ করল লিসা। এই মহিলার প্রতি ওর রাগ থাকলেও এখন ধীরে ধীরে শ্রদ্ধাবোধও জেগে উঠছে।
যদি পৃথিবীর সকল বৃষ্টিপ্রধান জঙ্গলকে অ্যামিনো অ্যাসিডের স্যুপে রূপান্তরিত করা হয়, তারপরও ৩২ অ্যামিনো অ্যাসিড চেইন পূরণ হতে আরও অনেক বাকি থাকবে। অনেক বলতে, ব্যাপক। জঙ্গল থেকে পাওয়া অ্যামিনো অ্যাসিডের চেয়ে আর ৫ হাজার গুণ বেশি অ্যাসিড প্রয়োজন পড়বে। তাহলে বলুন, অর্ধ মিশ্রণযুক্ত অ্যামিনো অ্যাসিড থেকে কীভাবে প্রথমবার প্রোটিন তৈরি হয়েছিল? প্রাণের প্রথম সঞ্চার হয়েছিল কীভাবে?
