খাঁকারি দিয়ে গলা পরিষ্কার করলেন অ্যানা। ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন নিয়ে যেসব তর্ক-বিতর্ক হয় সেগুলোর অধিকাংশই বিভ্রান্তমূলক। তাপগতিবিদ্যার ২য় সূত্রের ভুল ব্যাখ্যা, হাঁটুভাঙ্গা পরিসংখ্যান দেখানো, পাথরের রেডিওমেট্রিক দিককে ভুলভাবে উপস্থাপন করা, ইত্যাদি। বিভ্রান্তির তালিকা করতে গেলে আরও বড় হতে থাকবে। এগুলোর কোনোটাই কোনো কাজের নয়। অথচ ঠিকই একটা ধোঁয়াশার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
লিসা মাথা নাড়ল। হাই স্কুলের জীববিদ্যা ক্লাস নেয়ার মতো করে কথা বলছেন অ্যানা। গড়পড়তা পিএইচডি ডিগ্রিধারী একজন ডক্টরেটেড-এর পক্ষে এগুলো হজম করা একটু কষ্টসাধ্য তাই নিজেকে হাই স্কুল ছাত্রী ভেবে নেয়াই ভাল।
অ্যানার এখনও বলা শেষ হয়নি। সেগুলোর মতে, ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইনের একটা বিষয় বিবেচনায় করতে হবে।
কী?
মিউটেশন বা রূপান্তর হওয়ার এলোমেলো ধরন। সবকিছু নিখুঁত হলে এত ভিন্ন। ভিন্ন ধরনের মিউটেশন পাওয়া সম্ভব হতো না। কটিযুক্ত জন্মগ্রহণও যে লাভজনক পরিবর্তন আনতে পারে, সে-সম্পর্কে আপনার কোনো ধারণা আছে? এরকম কয়টা ঘটনা জানেন আপনি?
এই তর্ক লিসা এর আগেও শুনেছে। দ্রুতগতিতে নিখুঁতভাবে জীবন বিকশিত হওয়ার বিষয়টা আসলে খুব একটা যুক্তিসঙ্গত নয়। অবশ্য ও এটা নিয়ে কোনো মাখা ঘামায় না।
বিবর্তন কোনো নিখুঁত জিনিস নয়। বলল লিসা। এটা প্রাকৃতিক বাছাই প্রক্রিয়া কিংবা আবহাওয়ার প্রভাব, যার ফলে আগাছা ধাচের ক্ষতিকর পরিবর্তনগুলোকে ছাঁটাই করে শুধু ভাল অঙ্গ-প্রতঙ্গগুলোকে জিন বহন করে।
সেরাদের জয়, তাই তো?
সেরা না হলেও অন্তত টিকে থাকবার মতো হতে হয়। একদম নিখুঁত হওয়ার জন্য পরিবর্তন সংগঠিত হয় না। সেটা থেকে সুবিধা নেয়ার জন্য পরিবর্তন আসে। আর এভাবে অল্প অল্প করে বিভিন্ন পরিবর্তন আসতে আসতে এই শত শত মিলিয়ন বছর পর এসে আমরা এরকম বৈচিত্র্যতা দেখতে পাচ্ছি।
শত শত মিলিয়ন বছর? আচ্ছা, আপনার কথা মেনে নিলাম, সময়টা অনেক দীর্ঘ। কিন্তু এখনও কী বিবর্তন হওয়ার মতো সুযোগ আছে? আর বিবর্তনের সেই বিশেষ অংশ সম্পর্কে কী বলবেন, যখন অনেক কিছু বেশ দ্রুত পরিবর্তন হয়েছিল?
আমার মনে হয়, আপনি ক্যামব্রিয়ান বিস্ফোরণের কথা বলছেন? প্রশ্ন করল লিসা। ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইনের মূল বিষয়গুলোর মধ্যে এটা একটা বিষয়। ক্যামব্রিয়ান সময়কালটা বেশ ছোট ছিল। মাত্র ১৫ মিলিয়ন বছর। কিন্তু সেই সময়ের ভেতরে অনেক নতুন জাতের জীবনের আবির্ভাব ঘটেছিল। যেমন : পরজীবী, শামুক, জেলিফিস, ট্রাইলোবাইট ইত্যাদি। যারা বিবর্তনবাদের বিপক্ষে তাদের জন্য এই অংশটুকু খুব কাজে দেয়।
না। ফসিল রেকর্ড থেকে জানা যায়, হঠাৎ উদয় হওয়ার বিষয়টা আসলে হঠাৎ করে উদয় হয়নি। ক্যামব্রিয়ান সময়ের আগেও অনেক পরজীবী ও মেটাজোয়ানের মতো পোকামাকড় ছিল। এমনকি সেই সময়কার বৈচিত্র্যের ব্যাপারটাকে হত্ন জিনের জেনেটিক কোড দিয়ে বিচার করা সম্ভব।
হক্স জিন?
চার কিংবা ছয় জিনের একটা সেট যেটা জেনেটিক কোডে তাদের উপস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ করতো। প্রাথমিক উন্নতিগুলোর ওপর প্রচ্ছন্ন নিয়ন্ত্রণ ছিল তাদের। উপরে, নিচে, ডানে, বামে, আগা, গোড়া; অর্থাৎ পুরো শরীরের অবয়ব তৈরি করার বিষয়টা নিয়ন্ত্রণ করতে ওরা। ফলের মাছি, ব্যাঙ, মানুষ; এদের সবারই এই হক্স জিন আছে। একটা মাছি থেকে হক্স জিন এনে ব্যাঙের ডিএনএ-তে প্রতিস্থাপিত করা হলে ব্যাঙ দিব্যি চলতে পারবে। কোনো সমস্যা হবে না। যেহেতু এই জিনগুলো প্রাথমিক উন্নতির একদম মূল চাবিকাঠি তাই এগুলোতে অতিক্ষুদ্র পরিবর্তন করলেই শরীরের অবয়বে ব্যাপক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
এত তথ্য জেনে আসলে ওদের আলোচনা কোনদিকে সেটা বোঝা না গেলেও এই বিষয়ে মহিলার জ্ঞানের গভীরতা দেখে মুগ্ধ হলো লিসা। ওর নিজের মধ্যে প্রতিযোগী মনোভাব জেগে উঠল। অ্যানা যদি ওর কোনো কনফারেন্সের সহকর্মী হতেন তাহলে ও এগুলো বেশ ভালভাবে উপভোগ করতো। এই মহিলার সাথে কথা বলার সময় এখন থেকে সমঝে কথা বলতে হবে, মনে গেঁথে নিল লিসা।
আচ্ছা তাহলে হক্স জিনের মাধ্যমে ক্যামব্রিয়ান সময়কালে প্রাণীদের উদ্ভব সম্পর্কে ব্যাখ্যা করা গেল। কিন্তু…
বাধা দিলেন অ্যানা। হক্স জিন কিন্তু দ্রুত বিবর্তনের অন্যান্য অংশের ব্যাপারে কোনো ব্যাখ্যা দেয় না।
যেমন? আলোচনা এখন ইন্টারেস্টিং দিকে মোড় নিচ্ছে।
যেমন : গোলমরিচ পোকা। গল্পটা জানেন তো?
মাথা নাড়ল লিসা। জানে। গোলমরিচ পোকা গাছের কাঠের মধ্যে বাস করতো। গায়ের রং : বিচিত্র বর্ণে সাদা ফুটকি। বাকলের রঙের সাথে ওদের গায়ের রং মিলে যাওয়ায় পাখিরা ওদেরকে খেতে পারতো না। ম্যানচেস্টার এলাকায় কয়লা কেন্দ্র স্থাপিত হওয়ার পর গাছগুলো একদম কালো কুচকুচে হয়ে গেল। বিপদে পড়ল গোলমরিচ পোকারা। ওদের সাদা ফুটকিঅলা শরীরগুলো পাখিরা খুব সহজেই খুঁজে পেতে শুরু করল। কিন্তু পাকাগুলোর রং কালো হয়ে গেল মাত্র কয়েক প্রজন্মের মধ্যে। ঝুলযুক্ত কালো গাছের সাথে মিশে থাকার জন্য পোকাদের ছদ্মবেশ তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
মিউটেশন যদি এলোভাবে হয়ে থাকে, ভিন্নমত পোষণ করলেন অ্যানা, তাহলে তো দেখা যাচ্ছে, ঠিক যখন পরিবর্তনের প্রয়োজন হয় তখুনি মিউটেশন হয়ে যায়! কথা হলো, এটা যদি এলোমেলো প্রক্রিয়ায়ই হয়ে থাকে তাহলে লাল, সবুজ আর রক্তবর্ণের পোকাগুলো গেল কোথায়? এমনকি দুই মাথাঅলা গোলমরিচ পোকা? সেটাইবা কোথায় গায়েব হলো?
